সম্পাদকীয়

গুলফিশা ফতিমা। গত দেড় বছরেরও বেশি সময় ধরে জেল বন্দী। অপরাধ, নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন ও এনআরসি-র মতো ঘাতক নীতির বিরোধিতা। ২০১৯-এর শেষ ভাগে যখন সারা দেশ এই আইনের বিরুদ্ধে পথে নেমেছিল, এমবিএ-র ছাত্রী ২৮ বছরের গুল ছিল লড়াইয়ের সামনের সারিতে। দিল্লির সিলামপুরে মুসলিম মহিলাদের অবস্থানে নেতৃত্ব দিয়েছিল গুল। 

রাষ্ট্র ক্ষমতা বিরোধিতা সহ্য করে না। আর সেই বিরোধী অবস্থানে যখন থাকে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষ, তখন সেই বিরোধিতাকে গুঁড়িয়ে দিতে নিজের নৃশংসতম অস্ত্র শানায় রাষ্ট্র। সিএএ-এনআরসি বিরোধী আন্দোলনেও তার অন্যথা হয়নি। আন্দোলন যখন ছড়িয়ে পড়ছে দেশের প্রতিটি কোণায়, শহরে শহরে জোট বাঁধছেন মানুষ, নেতৃত্বে থাকছেন সংখ্যালঘু মহিলারা ঠিক সেই সময়ই উত্তর দিল্লি জুড়ে শুরু হয় সরকারী মদতপুষ্ট মুসলিম নিধন যজ্ঞ। কেন্দ্রে ক্ষমতাশীন দলের সদস্যদের প্রত্যক্ষ হস্তক্ষেপে জ্বালিয়ে দেওয়া হয় মুসলিম বস্তি, উজার হয়ে যায় সংখ্যালঘু মহল্লা। এরপর অভিনীত হয় সেই চিত্রনাট্য, ইতিহাস ঘাঁটলে যার নজির মিলবে ভুড়ি ভুড়ি। রাষ্ট্রীয় দলের এই হিংসাকে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার নাম দিয়ে গ্রেফতার করা হয় একের পর এক আন্দোলনকারীকে। গ্রেফতার হন গুলফিসা, সাফুরা, শরজীল, উমর, ইশরত, খালিদ, নাতাশা, দেবাঙ্গনা, ও নাম না জানা আরও অনেকে, যাদের গ্রেফতারী খবর হয়না। নাতাশা, দেবাঙ্গনা, সাফুরারা জামিনে মুক্ত হলেও রাষ্ট্রদ্রোহিতা, দাঙ্গায় প্ররোচনার মত অভিযোগের খাঁড়া ঝুলছে তাদের ওপর।

আরও পড়ুন

ন্যায় বিচারের অপেক্ষায় তিলে তিলে মৃত কাঞ্চন ন্যানাওয়ার- সোমা সেন, অনুবাদ- রিমঝিম সিনহা

 অরুণের সম্মতি ও সই ছাড়াই এবং তাঁকে তাঁর স্ত্রীর সাথে দেখা করার অনুমতি না দিয়েই, কাঞ্চনের মস্তিষ্কের অস্ত্রোপচার করা হয়। ফলস্বরূপ, সাসুন হাসপাতালের আইসিইউতে মারা যান কাঞ্চন। মাত্র ৩৭ বছর বয়সে।

ভালবাসায়, বিদ্রোহে…৬ নং তিহার জেল থেকে দেবাঙ্গনা নাতাশার চিঠি, অনুবাদ- ঝিলম রায়

আমি আমার সহবন্দীদের কথা চিঠিতে লিখতে পারবো না, কিন্তু এই কারাগারের একটা নাম দেওয়া যায়: ‘হম গুনেহগার আউরাতে’ (‘আমরা পাপী নারীরা’ – পাকিস্তানী কবি কিশওয়ার নাহিদের একটি বিখ্যাত কবিতার লাইন)।

কারাগারশূন্য ভারত বিষয়ক কিছু ভাবনা, দিব্যা চান্দ, অনুবাদ- তৃষ্ণিকা ভৌমিক

 মনুস্মৃতির বিধান স্বাধীন ভারতের আইনে সেভাবে প্রতফলিত নাহলেও দলিত বা আদিবাসী সম্প্রদায়ের মানুষদের প্রান্তিকায়নের ক্ষেত্রে তা সম্পূর্ণভাবে পরিলক্ষিত হয়।

জেলবন্দী প্রজাতন্ত্রে এক কয়েদীর স্ত্রী, নেহা দিক্ষিত, অনুবাদ- শাশ্বত গাঙ্গুলী

তাদেরকে অস্ত্র আইন আর ভারতীয় দণ্ডবিধির নানা ধারায় অভিযুক্ত করা হয় – বিপদজনক অস্ত্র নিয়ে দাঙ্গা বাঁধানো, বেআইনি জমায়েত, সরকারী কর্মচারীদের কাজে বাধা দেওয়া, খুনের চেষ্টা। পাশাপাশি ছেলেটাকে সন্ত্রাস বিরোধী আইন বা ইউএপিএ (UAPA) তেও অভিযুক্ত করা হয়।

মেরি টাইলারের পথ ধরে, বি.অনুরাধা, অনুবাদ- সানন্দা দাসগুপ্ত

মেরি যে আদিবাসী সম্প্রদায়ের মধ্যে কাজ করতে ঝাড়খন্ড গেছিলেন, যাদের মধ্যে কাজ করার জন্য তাঁকে জেলে যেতে হয়, সেই সাঁওতাল গোষ্ঠীর মেয়ে শীলা মারান্ডি বিপ্লবী আন্দোলনে প্রভাবিত হন। রাজনৈতিক কাজের মধ্যে দিয়ে নিজেকে শিক্ষিত করেন, মাওবাদী পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য হন, এবং ২০১৩ সালে সেই একই জেলে যান। উৎসাহের সঙ্গে মেরির আত্মজীবনী পড়েন শীলা। এটাই হয়তো এই পুরো গল্পের যৌক্তিক সমাপ্তি হতে পারে… অথবা ধারাবাহিকতা।     

গানের এক জীবন: উডি গাথরী ও তার সময় (দ্বিতীয় কিস্তি), পৃথা চট্টোপাধ্যায়

১৯৪০ সালে প্রকাশিত ডাস্ট বোওল রিফিউজিদের দুর্দশা আর বেঁচে থাকার লড়াই নিয়ে উডি গাথরীর প্রথম আধা – আত্মজীবনীমূলক গানের অ্যালবাম – ‘ডাস্ট বোওল ব্যালাডস্‘-এর গানগুলি যে ধুলো ঝড়ে বিধ্বস্ত, সব হারানো মানুষগুলোর নিজেদের গান হয়ে উঠতে পারল এবং বিশ শতকের আমেরিকার সবচেয়ে ভয়াবহ এক জলবায়ু বিপর্যয়ের আর্থ–সামাজিক এবং রাজনৈতিক অভিঘাতের সঙ্গে এই যে উডি গাথরীর নাম চিরকালের জন্য জুড়ে গেল – তার কারণ বোধহয় এই গানগুলোর আদ্যন্ত সহজ সরল ভাষা আর লৌকিক সুর।

পিতৃতন্ত্রের হিংসা: যুদ্ধ, ধর্ষণ, নারী, প্রত্যয় নাথ

পৃথিবীর যে কোনও জায়গাতেই মহিলারা যুদ্ধবিগ্রহের একটা বড় শিকার হন। মহিলাদের ধর্ষণ করা সামরিক হিংসার একটা মাধ্যম হয়ে উঠেছে ইতিহাসের বিভিন্ন পর্বে। এর উদাহরণ সুদূর অতীতের ক্রুসেডের যুদ্ধ (১১-১৩ শতক) ও মঙ্গোল আক্রমণ (১৩-১৪ শতক) থেকে শুরু করে হাল আমলের মার্কিন-ভিয়েতনাম সংঘর্ষ (১৯৫৪-১৯৭৫) ও বসনিয়ার যুদ্ধে (১৯৯২-১৯৯৫) ছড়ানো। এই ঘটনা কেন ঘটে, এর পিছনে পিতৃতন্ত্রের কী ভূমিকা, তারই উত্তর খুঁজব এই লেখার পাতায় আমাদের পরিচিত এক উদাহরণের মধ্যে দিয়ে – ১৯৭১ সালের বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ।

ভীমা কোরেগাঁও বা এলগার পরিষদ মামলায় কী হচ্ছে (প্রথম কিস্তি), অতীন্দ্রিয় চক্রবর্তী

আগস্ট ২৩, ২০২১। ন্যাশনাল ইনভেস্টিগেটিং এজেন্সি (এনআইএ)-র বিশেষ আদালতে জাস্টিস কোঠালিকার-সমক্ষে ভীমা কোরেগাঁও তথা এলগার পরিষদ মামলায় চার্জশীট আনে এনআইএ। রাজদ্রোহের মামলা। ১৬ জন অভিযুক্ত এই মুহুর্তে জেলে। তাঁদের মধ্যে একজন এই চার্জগুলি আসার আগে বন্দীদশায় মারা গিয়েছেন রাষ্ট্রের হাতে খুন হয়েছেন।

মেহেন্দোর সাথে সাক্ষাতে – ‘উরগেনের ঘোড়া’ উপন্যাসের পাঠ প্রতিক্রিয়া , ঊর্মিমালা রায়

প্রতিটা অধ্যায়ে আসা চরিত্রগুলি এক একটা বিষ্ময়৷ একটা একটা নতুন গল্প বলে৷ তারপর মেহেন্দোর জীবনের পথ বেয়ে ছুঁয়ে ফেলে  উর্গেনের ঘোড়াকে। মেহেন্দো এই উপন্যাসের কেন্দ্রীয় নারীচরিত্র।  যোদ্ধা মেয়ে চরিত্রকে প্রধান চরিত্রে রেখে বিশেষ রাজনৈতিক সময়কাল নিয়ে লেখা উপন্যাস আমার এই প্রথম পড়া৷

বধূ না মাওবাদী , নিশা বিশ্বাস

সকাল ১১টা নাগাদ মেদিনীপুর জেল গেটে সম্পদ এসেছে দেখা করার জন্য নাম লেখাতে। টেবিলের ওপার থেকে প্রশ্ন এলো, ‘বধূ না মাওবাদী’। সম্পদ চকিতে বুঝতে পেরে বলে ‘মাওবাদী’। ‘২ টোয় আসবেন’ শুনে সম্পদ মুচকি হেসে চলে যায়। 

গরাদ স্মৃতি (প্রথম কিস্তি), রাজশ্রী দাশগুপ্ত

আরেক দিন আমাদের ডাকছে, ‘মাসি, মাসি তোদের শাড়ি আকাশে উড়ে গেল! দেখ আকাশে উড়ছে!’ আমরা অবাক হয়ে ভাবছি, সেল থেকে আবার আমাদের শাড়ি উড়ে কি করে যাবে। সব তো বন্ধ। 

কমিউনিস্ট যোদ্ধা বেলা (প্রথম কিস্তি), স্বপ্না

‘ঐ সভা থেকে বেরিয়ে আমরা মিছিলে যোগ দিই। বিশাল মিছিল চলছে কলকাতার রাজপথ জুড়ে। সেদিন ‘স্বাধীন’ ভারতের সদ্যোজাত রাষ্ট্রের পুলিশ আক্রমণ করল মিছিল। মেয়েদের হত্যা করল। মেয়েরা গুলি খেয়ে রাস্তায় একে একে পড়ে গেলেন৷ শহিদ হলেন গীতা, লতিকা, প্রতিভা, অমিয়া, যমুনা। কলকাতার রাজপথ মেয়েদের রক্তে লাল হয়ে গেল।’ বলতে বলতে আবেগে, ব্যথায় জ্বলে উঠছিল বেলার চোখ, যেন প্রত্যক্ষ করছেন সেই দৃপ্ত মিছিল।

রক্ত-চোষা, মীনাক্ষী সেন

না, কেউ আসেনি। কী করে মৃত্যু হলো ক্ষীরোদার, এ প্রশ্ন তুলে জেল কর্তৃপক্ষকে কেউ বিব্রত করেনি। কত পাগলই তো পাগল বাড়িতে বন্দী। দু’চারদিন বাদে-বাদে একজন করে মারাও যাচ্ছে। তাদের মধ্যে কেউ বেওয়ারিশ! আত্মীয়-স্বজন নেই, থাকলেও তাদের সঙ্গে পাগলের সম্পর্ক ছেদ হয়েছে বহু আগেই। যাদের ওয়ারিশ আছে– মৃত্যুর খবর পেলে তাদের কেউ-কেউ আসে, কেউ বা আসেও না। যারা আসে, সামর্থ্য থাকলে মৃতদেহের সৎকার করে। কিন্তু কেউ কোনো প্রশ্ন করেনা। 

লেসবিয়ানস অ্যান্ড গে-স্ সাপোর্ট মাইনার্স

এলজিএসএমের সদস্য ক্লাইভ ব্র্যাডলির বয়ানে, “আমরা অনেকেই বুঝেছিলাম আমাদের অধিকার, আমাদের মুক্তি জড়িয়ে ছিল সমাজের অন্যান্য মানুষদের মুক্তির সাথে, বিশেষ করে শ্রমিক আন্দোলনের সাথে। তাই আমাদের যাপনে আপাতভাবে পার্থক্য যাই থাক, তার থেকেও অনেক বেশি ভাবে আমরা আন্দোলনরত খনি শ্রমিকদের সাথে একাত্ম বোধ করেছিলাম”।  আর এই একাত্মতা থেকেই তৈরি হলো এক নতুন ইতিহাস।

পোষ্য , অলোকপর্ণা

রত্নদীপের সরু সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে সুখময় পাল এক তীব্র আকর্ষণ বোধ করলেন তাঁর দেহের প্রতিটা অণুতে, পরমাণুতে। এই অপরূপ টান বোধ করা মাত্র সিঁড়ির দেওয়ালে পিঠ ঠেকে গেল তাঁর। কোনোক্রমে ঘাড় ঘুরিয়ে সিঁড়ির উপরের ধাপগুলোর দিকে তাকালেন। দেখলেন, খয়েরি প্যান্ট আর ঘিয়ে শার্ট পরে, সিঁড়ি বেয়ে উপরের দিকে উঠে যাচ্ছেন তরুন সাহা। তাঁর হাতের হলুদ প্লাস্টিকের কেজো ব্যাগও সাথে সাথে উঠে যাচ্ছে রত্নদীপের সিঁড়ি বেয়ে। বিবশ সুখময়ের শ্বাস প্রশ্বাস স্বাভাবিক হতে কিছু সময় নিল। 

রাজবন্দী, সেঁজুতি দত্ত

অন্ধকার ঘরটায় চোখ খুলতেই ঠাণ্ডা লাগে প্রথমে। প্রাথমিক হতভম্ব ভাবটা কাটিয়ে উঠতেই অন্ধকারও চোখ সওয়া হয়ে যায়। আবছা কিছু অবয়ব যেন স্পষ্ট হয়। আন্দাজে যা মনে হয়, ঘরটি খুবই ছোট এবং আসবাবও প্রায় কিছু নেই বললেই চলে। যে খাটটিতে আমি শুয়ে আছি তাতে প্রায় পাশ ফেরা যায় না। খাটের সাথেই লাগোয়া, মাথার কাছে, একটা ছোট্ট টেবিল আর একটা চেয়ার। আমার পায়ের কাছে, অর্থাৎ খাটের অপর প্রান্তে দেয়ালের সাথে সাঁটা একটা বইয়ের তাক মতন, আর তার পাশেই দরজা। মস্ত বড় দরজা। খুব সম্ভবত লোহার কিন্তু এত কম আলোতে খুব যে কিছু বুঝতে পারছি তা নয়।

চতুর্থ তোরণ, মণিদীপা সিংহ

ডুবে যাচ্ছি স্বপ্নের মত কোন সমুদ্রে, রোজ ডুবে যাচ্ছি, কথা বলছি নিজেই নিজের সাথে সমস্ত কাজ, সমস্ত ব্যাধি, সমস্ত দায়িত্ব ভুলে এইভাবে তোমাকে অভ্যাস করছি, অথচ তুমি ভাবছ কিভাবে নেবে আমায়! এই তোমার পাঠপ্রবণতা! আমি জীবনের মত শ্বাসরোধী ভালোবাসায় টেনে নামাবো তোমাকে এই নরকের রাজত্বে। দেখ প্রিয়তমা, বাড়াও আঙুল, ছুঁয়ে দেখ ভিন্ন এ রাজপথ একটিবারের জন্যে হলেও!

একটি গান এবং… , জয়শীলা গুহ বাগচী

এমত অবস্থায় একখানা নির্জীব হৃৎপিণ্ড হঠাত ধ্বক ধ্বক করিয়া জানাইল “দীর্ঘস্বপ্নজ্বর” শব্দখানির ব্যুৎপত্তিগত অর্থ এ ভুবনে খুঁজিয়া পাওয়া যায় না। আমি নদী খাইতে লাগিলাম কিন্তু নদীজাত ভূখণ্ডে কৃত্রিম পারিপাট্য দেখিয়া যন্ত্রণাকাতর আত্মকে কোনোরূপ সান্ত্বনা ছাড়াই পুরাতন ভাষ্যে নিক্ষেপ করিলাম। যদি কিছু মেরামত হইয়া আসে, যদি তাহার গাত্রে শূন্যতাকেও উৎসব বলিয়া মনে হয়। 

ছুটি-রুটির গল্প (শেষ পর্ব), শাশ্বত গাঙ্গুলী

ভারী রাগ হয়ে গেল ছুটির। নাহয় ছুটি একটু আপনভোলাই, ক্লাসের পড়া শুনতে শুনতে মাঝেমধ্যে ইডেন গার্ডেন্সে ব্যাট নিয়ে ছয় মারতে বসে, বা খেতে বসে গালে ভাত পোঁটলা করে গভীর সমুদ্রে গুপ্তধনের খোঁজে ডুব দিয়ে ফেলে – তা বলে এরকম কাঠপিঁপড়ের মতো করে চিমটি কাটতে হবে?

প্রতিরোধের ছবি - ধ্রুপদী ঘোষ বোর্ডেস
শেয়ার করুন