প্রথম বর্ষ, সংখ্যা ১০, মার্চ ২০২২

সম্পাদকীয়

আমরা এমন একটা সময়ে দাঁড়িয়ে আছি যেখানে পক্ষ বিপক্ষের আপাত সংঘর্ষে পৃথিবী দু’ভাগ। একদিকে ন্যাটোর সামরিক আঁতাত, অপরদিকে রাশিয়ার ইউক্রেন আক্রমণ। আমরা ব্যস্ত এই খেলায় পক্ষ নিতে। কোন সামরিক নেতা বেশি হাসাতে পারেন, কার পৌরুষের আস্ফালন চোখে পড়ার মতো, কে উঠে আসছেন মানবতার নতুন মুখ হয়ে। অথচ, আমরা ভুলে যাচ্ছি যে দেশের সরকার, দেশের সামরিক বাহিনীর লড়াই আর তুলনামূলক শক্তি প্রদর্শনের এই আঙিনায় কোনোদিনই সাধারণ মানুষের মতামতকে পাত্তা দেওয়া হয়নি। সোভিয়েত-উত্তর রাশিয়া এবং ইউক্রেনের এই সামরিক লড়াইয়ে আক্রান্ত হাজার হাজার সাধারণ মানুষের পাশে থাকার জন্য রাষ্ট্রীয় ক্ষমতাসীন সরকারকে সমর্থনের কোন প্রয়োজন পড়েনা। আর তাই হাজার হাজার শান্তিকামী মানুষ পথে নেমেছেন রাশিয়ার বিভিন্ন শহরে, ইউক্রেনের বিভিন্ন রাস্তায়, বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে। তাঁরা বলছেন, তাঁরা ন্যাটো বা রাশিয়া কারুর সামরিক আস্ফালন সমর্থন করেন না। শক্তি প্রদর্শনের এই খেলায় তাঁরা রাষ্ট্রশক্তির বিরুদ্ধে, আর সাধারণ মানুষের পক্ষে। আরও পড়ুন

৮ই মার্চ। আন্তর্জাতিক শ্রমজীবী নারী দিবস। ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যাবে সামাজিক আর অর্থনৈতিক শোষণের বিরুদ্ধে শ্রম আর লিঙ্গের রাজনীতিকে একসাথে প্রতিষ্ঠা করেছিল এই দিন। কর্মস্থলে শ্রমের অধিকার, মহিলাদের ভোট দেওয়ার অধিকার আর সামাজিক অর্থনৈতিক স্বীকৃতির দাবিতে বিশ্বের বিভিন্ন সোশ্যালিস্ট মহিলা সংগঠনের ডাকে প্রতিষ্ঠা পায় শ্রমজীবী নারী দিবস। দশ লক্ষাধিক নারী পথে নামেন মানবাধিকার, শ্রমের স্বীকৃতি, আর মাথা উঁচু করে সমান অধিকার নিয়ে সমজে বেঁচে থাকার দাবিতে। পরবর্তীকালে বিভিন্ন দেশে ধীরে ধীরে এই দিনটি নারী অধিকারের রূপক হিসাবে রূপ নেয়। বর্তমান সময়ে যখন (শ্রমজীবী) নারী দিবস শুধুমাত্র পোশাক, প্রসাধনী আর গয়নায় ছাড় পাওয়ার উপলক্ষ্য হয়ে উঠেছে, সেই সময়ে দাঁড়িয়ে পিতৃতান্ত্রিক, পুঁজিবাদী সমাজে নারী এবং অন্যান্য প্রান্তিক লিঙ্গপরিচয়ের মানুষদের ঘরে এবং বাইরে বিভিন্ন ধরনের শ্রমের সামাজিক স্বীকৃতি এবং অধিকারের কথা আমাদের আবারও মনে করায় ৮ই মার্চ।
hijab row protest

Myriad Resistance: An Overview of Muslim Women’s Struggle

Essay, Hasina Khan

Dress code have always been an contested issue for Muslim women. Over decades Muslim women have been fighting against the fanatical forces within her community that dictated what to wear, what to read, where to go, whom to love. Women’s movements have long accepted a stream of thought that believed that changes in laws related to family and marriage can happen from within the community and also within the framework of Shariat. 

কর্ণাটক হিজাব বিতর্ক: সাংবিধানিক অধিকারের ওপর শাসক গোষ্ঠীর আক্রমণ

নিশা আবদুল্লাহ, প্রবন্ধ

কিন্তু দাদার মৃত্যুর পর দাদি আমাদের জানালেন যে তিনি এবার থেকে হিজাব পরবেন, এমনটাই তার ইচ্ছা। হিজাব পরা ‘আধুনিক’ নয়, এমনটা বলবার জন্য দাদা আর বেঁচে নেই। অন্যদিকে হিজাবের মাধ্যমে দাদি হয়তো বাবরি মসজিদ পরবর্তী ভারতবর্ষে অদৃশ্য হয়ে যাওয়া তার ধর্মীয় পরিচয় পুনরুদ্ধার করার চেষ্টা করছিলেন, দৃশ্যমান হয়ে ওঠার চেষ্টা করছিলেন একজন মুসলমান হিসেবে। 

মৌমিতা আলমের দু’টি কবিতা

মৌমিতা আলম, কবিতা

ভুলে যেও না 

আমার নাম

আমিই ভালোবাসা

আমিই হিজাব পরা মেয়ে

সকলে যার নাম দিয়েছে প্রতিরোধ

গেরুয়া শাল পরে আসা ছেলেমেয়েদের লিখছি

মীনা কন্দস্বামী, ছোটদের জন্য

ভারতীয় শিক্ষা ব্যবস্থার এই ব্রাহ্মণ্যবাদী পিতৃতান্ত্রিকতাকে ধ্বংস করার জন্য, এই শিক্ষায় আমাদের সকলের অধিকার এই দাবি প্রতিষ্ঠিত করার জন্য আমাদের লড়াই আজও চলছে। শিক্ষায় মণ্ডল কমিশনের সুপারিশ লাগু করা হোক বা মেডিক্যাল কলেজগুলোতে ওবিসি সংরক্ষণ লাগু করার লড়াই হোক, NEET বা নয়া শিক্ষা নীতির বিরুদ্ধে লড়াই হোক অথবা রোহিথ ভেমুলা বা ফতিমা লতিফ—সংগ্রাম আজও শেষ হয়নি।  

ভারতে সরকারী শিক্ষা ব্যবস্থা রয়েছে কারণ বঞ্চিত জাতি ও ধর্মীয় সংখ্যালঘু মানুষেরা একসাথে মিলে এটা সম্ভব করেছিলেন, এবং তারা নিশ্চিত করেছিলেন কেউ যেন শিক্ষা ও সৃজনের অধিকার থেকে বঞ্চিত না হয়। সরকারী শিক্ষা ব্যবস্থার ধারণাটাই এটা, কোনও কিছুর ভিত্তিতেই কাউকে বঞ্চিত করা যাবে না।

জঙ্গি ভালবাসা অথবা গুলকন্দ তৈরির রেসিপি

সাবা মাহজুর, গদ্য

৯০-এর দশকের গোড়ার দিকে শ্রীনগরে বড় হয়ে ওঠা তো খুব সহজ ছিল না। প্রতিটা দিন সেখানে মৃত্যু নিয়ে আসত, প্রতিটা ঘন্টায় নতুন নতুন সাজে এসে উপস্থিত হত ভয়, আতঙ্ক, আর হতাশা। জীবন সেখানে এতটাই ভাঙাচোরা, ছেঁড়াখোড়া যে কোনওরকম আশা ধরে রাখাই ছিল কঠিন। যতই চেষ্টা কর না কেন, দামী সুগন্ধীর মতো মৃত্যুর গন্ধ লেপটে থাকে কাপড়ে, জামায়।   

নাদ: আ কল ইন ওয়েটিং

বুশরা পাঞ্জাবী, গদ্য

আধা মৃত। আধা জীবিত। মনে রাখার মধ্যে দিয়ে সে নিজেকে পুনরুজ্জীবিত করে তোলে। তাঁর কাছে, ভুলে না যাওয়া একটি নৈতিক আবশ্যিকতা। এবং মনে রাখা প্রতিরোধের সমান, নিজের অস্তিত্ব জিইয়ে রাখার সমান। এভাবেই তাঁর অতীত তাঁর বর্তমানে জীবিত থাকে। তাঁর ঘরের মানুষদের সঙ্গে বন্ধনসূত্রে, জীবিত এবং মৃত, বেঁচে থাকার কিছু মুহুর্ত, এবং ভাবনাগুলোর মাধ্যমে, সে তাঁর শহর এবং শহরের টুকরোগুলো নিজের সাথে বয়ে নিয়ে চলে।

নিয়মিত বিভাগ

বেয়াদপ মেয়েছেলে 

রোক্সেন গে, অনুবাদ- মালিনী ভট্টাচার্য

একটা ছেলেকে চিনত ছেনাল। দুজনেরই তখন তেইশ। তার অকপট স্বভাবটা ছেনালকে ধাঁধা লাগিয়ে দিত। এই সিধে আন্তরিক ভাবটা বিপজ্জনক, সেই বয়সেই জেনে গেছে ছেনাল। ছেলেটা ওকে মনের কথা বলত, ও কি চায় তা জানতে চাইত। কোমল অথচ দৃঢ় হাতে খুব নিশ্চিত অভিপ্রায়ে ওকে স্পর্শ করত। ছেলেটির শরীরের নিচে শুয়ে ছেনাল নিজেকে ধনুকের মতো বাঁকিয়ে নিত, তখন ওর শরীরজুড়ে তাপ।

আর্ত্যুর র‍্যাঁবোর কবিতা

অনুবাদ- অতীন্দ্রিয় চক্রবর্তী

সেই শান্ত কৃষ্ণ জলরাশি যেখানে তারারাজি ঘুমায় 

শ্বেত ওফেলিয়া ভাসমান যেন এক সুমহান লিলি; 

ধীরে ভাসে সে, লম্বা তার অবগুণ্ঠনে শায়িতা.. 

– দূর বনে শুনো কোন সফল-শিকার-বিউগল।   

দাস মেয়ের জীবন, চতুর্থ কিস্তি

হ্যারিয়েট জেকব, অনুবাদ-সানন্দা দাসগুপ্ত

প্রথমবার যেদিন শাস্তি পেয়েছিলাম আমার মনে আছে। ফেব্রুয়ারি মাস। আমার দিদা আমার পুরনো জুতোজোড়া বদলে নতুন একজোড়া জুতো এনে দিয়েছিল। নতুন জুতোটা আমার দরকার ছিল। বরফের ওপর বরফ পড়ে কয়েক ইঞ্চি পুরু হয়ে গেছিল, তাও বরফ পড়া থামে না। মিসেস ফ্লিন্ট-এর ঘর দিয়ে যাওয়ার সময়ে জুতোয় আওয়াজ হয়, তাতে তার পরিশীলিত মননে আঁচড় লাগে। আমাকে ডেকে জানতে চায়, এমন ভয়ানক বিচ্ছিরি আওয়াজ হচ্ছে কেন, আমি কী করছি! আমি বলি আমার নতুন জুতোর শব্দ। “খুলে ফেল”, মিসেস ফ্লিন্ট বলে, “ফের যদি এটা কোনওদিন পরেছিস, ওটা আমি ছুঁড়ে আগুনে ফেলে দেব।”

একঘণ্টার ভাবনায় প্রতিমা যেভাবে বাঁচতে চাইছিল

প্রবুদ্ধ ঘোষ

বাপির কাটা মাথা ভেসে ওঠে। ‘সিলি হাওয়া ছুঁ গ্যয়ি, সিলা বদন ছিল্‌ গ্যয়া’ গানটা ভেসে আসছে। বাবুদা রেডিও শোনে এখনও। ক্ষয়া ক্ষয়া রেডিওর গায়ে আশি দশক থেকে ধুলো জমেছে। সুরেলা আওয়াজও তাই ধুলোমাখা ধূসর হয়ে আসে। ভাঙা ভাঙা। এসব সারাবে না কেউ আর। ‘বেচে দাও বাবুদা, ভাল ফোন কেনো একটা’- এই অনুরোধের আসরে পাত্তা না দিয়েই বাবুদা চা পাতা ফোটায়।

নন্দনকানন অ্যাপার্টমেন্ট কমপ্লেক্স

শাশ্বত গাঙ্গুলী

একটা বাজে স্বপ্ন দেখে ককিয়ে উঠে মালতীর ঘুমটা ভেঙে গেল। একটা বিশাল পাহাড়ের চুড়ো থেকে সে সোজা নীচে লাফ দিয়েছে। পড়ে যায়নি কেউ ঠেলে দেয়নি পা হড়কায়নি পিছলায়নি মচকে যায়নি – স্রেফ সোজা লাফ দিয়েছে। এক মুহূর্ত পালকের মতো ভাসতে ভাসতে পা কেঁপে উঠেছে, অভ্যাসে নড়ে শক্ত জমি খুঁজেছে। আর পায়নি যখন তখন আলুথালু খাবলাতে খাবলাতে পাহাড়ের গা বেয়ে ধাক্কা খেতে খেতে ঘষটাতে ঘষটাতে সোজা নেমে গেছে খাত বরাবর নীল জলের দিকে নীচে আরো নীচে অন্ধকারের দিকে…

বাংলাদেশের গার্মেন্ট শ্রম সংগঠনের অর্থনৈতিক ও লৈঙ্গিক ইতিহাস এবং রাজনীতি

নাফিসা তানজীম

একবিংশ শতকের বাংলাদেশে এই বামপন্থী শ্রম সংগঠনগুলো বেশ কয়েকটি বড় বড় গার্মেন্ট শ্রমিক আন্দোলন সংগঠিত করেছে। ২০০৬, ২০১০ এবং ২০১৪ সালে তাদের নেতৃত্বে বড় বড় কিছু আন্দোলন ঘটে। ২০০৬ সালে চার হাজার কারখানার শ্রমিকেরা ন্যূনতম মজুরি আন্দোলনে অংশ নেয় এবং আইন শৃংখলা বাহিনীর সাথে তাদের সংঘর্ষ হয়। ২০১০ সালে শ্রমিকেরা আবার মজুরি বৃদ্ধির দাবীতে আন্দোলন করে। 

ভারতীয় নাগরিকত্বের পিতৃতান্ত্রিক ক্রমবিবর্তন এবং আসাম এনআরসি

তানিয়া লস্কর

বংশানুক্রমিক নাগরিকত্বের ভিত্তিই হল ‘পরিবার’। এবং সেই পরিবারের কল্পনা স্বাভাবিক নিয়মেই  প্রতিবারই অত্যন্ত পুরুষতান্ত্রিক এবং বিপরীতকামী। এবং ‘সদস্যপদ’ ‘সমতা’ এবং ‘অধিকার ও কর্তব্য’-এর ধারণা, এই সব সাধারণত শ্বেতাঙ্গ পুরুষদের অভিজ্ঞতা উপর ভিত্তি করে তৈরি। 

গানের এক জীবন: উডি গাথরী ও তার সময় (তৃতীয় পর্ব)

পৃথা চট্টোপাধ্যায়

এই প্রত্যেকটি গানে যেভাবে বারবার কর্মহীন উদ্বাস্তুদের কথা ফিরে ফিরে এসেছে তাতে মনে হয়, সত্যিই তো, যে শিল্পী  বছর কয়েক আগে ধুলোঝড়ে ভিটেহারা মানুষের প্রতিনিধি হয়ে তাদের সমস্যা সমাধানে রাষ্ট্রীয় উদাসীনতা ও ব্যর্থতাকে এত কাছ থেকে দেখেছেন তার পক্ষেই বোধহয় কোন গঠনমূলক রাষ্ট্রীয় কর্মযজ্ঞে এতটা আশাবাদী হওয়া সম্ভব ছিল। 

গরাদ স্মৃতি (শেষ কিস্তি)

রাজশ্রী দাশগুপ্ত

সেই দিন সবাই ঘুমিয়ে গেছে, আমার খাবার রেখে গেছে। খাবারটা তুলে দেখি কেউ আমার রুটিতে চিনি মাখিয়ে রেখেছে। কেউ নিজের জীবন বিপন্ন করে ওই চিনিটা মাখিয়ে গেছে। ওই দেখেই আমি ভয় খেতে শুরু করলাম। কারণ ওই চিনির কথা জানতে পারলেই যে দিয়েছে তাকেও শেষ করে দেবে! সমস্তটা গিলে নিয়েছিলাম যাতে এক দানাও পরে না থাকে। কান্না পেয়ে গেছিল।

এসব লেখার শিরোনাম টিরোনাম হয় না

লাবণ্য দে

অথচ জীবনে যা যা থেকে পালাতে চাই আমরা তাই আমাদের বেশী বেশী করে গ্রাস করে বসে। এই যে দিল্লীর ঘরছাড়া মানুষের গল্প, দেশজুড়ে ঘটে চলা ভায়োলেন্স, ভায়োলেন্সের ইমেজ, রাস্তায় শুয়ে মার খেতে খেতে লাশের জন্ম- এসব কি ভুলে যেতে চাইনি আমরা? ভাবতে চাইনি এসব সত্যি নয়? হয়তো দুঃস্বপ্ন, যা কেটে যাবে রাত ফুরোলেই। কিন্তু তা হয়না৷ আমরা ভুলে যাই, আমাদের স্মৃতিরা থেকে যায় অশরীরির মতো৷ তাই তো একা একা অন্ধকার রাস্তায় হাঁটতে গেলে প্রতিবার প্রতিটা ধর্ষণের গল্প  জ্যান্ত হয়ে গিলে খায় আমাদের৷ 

রান্নার খাতা, দ্বিতীয় কিস্তি

চূর্ণী ভৌমিক

আমাদের ইস্কুল একটু একটু করে খুলছে। কিন্তু গত প্রায় দু’বছর ধরে আমরা ঘরবন্দী। বন্ধুদের সঙ্গে দেখা করা, খেলতে যাওয়া, দুষ্টুমি করা কিছুই প্রায় হয়ে উঠছিল না। তাই বন্ধুর কথা মনে রেখেই চূর্ণী এই বইটি বানিয়েছিল। যখন দেখা হবে তখন সবাই একসাথে মিলে রান্না করবে, খাবে। দেখা হবার আগে অবধি বন্ধু নিজে একটু হাত পাকিয়ে নিক সেটাই ভেবেছে হয়ত। সেই বই আগামী কয়েক সংখ্যায় আমরা আমাদের ছোট পাঠিকাদের জন্য ছাপব। এবার রইল দ্বিতীয় কিস্তি।

শেয়ার করুন