সম্পাদকীয়

গত ১লা ডিসেম্বর ভীমা-কোরেগাঁও মামলায় অভিযুক্ত সুধা ভরদ্বাজকে জামিনে মুক্তি দিয়েছে বম্বে হাই কোর্ট। বামা পত্রিকায় সেই মামলার বিশ্লেষণ করছেন অতীন্দ্রিয় চক্রবর্তী। এই সংখ্যায় থাকছে তার দ্বিতীয় এবং শেষ কিস্তি।

এই সংখ্যা থেকে ‘বামা’ দ্বিমাসিক পত্রিকা হতে চলেছে। পত্রিকার এই পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে এবারের সংখ্যার কেন্দ্রে থাকছে ‘ছোটদের জন্য’ বিভাগটি। চেষ্টা করা হল নারীবাদী ভাবনাচিন্তার সঙ্গে সঙ্গে আমোদ, আনন্দ, শৈশব এবং মুক্তির স্বাদ খুঁজে নেওয়ার। ছোটদের জন্য লেখা যতটা ছোটদের ততটা তো বড়দেরও বটে। তাদের জন্য লিখতে গিয়ে নিজের ভেতরকার ছোট মানুষটিকে যদি খুঁজে পাওয়া যায় তাহলে মন্দ কী! যে ভাষা আমরা হারিয়ে ফেলেছি, যে সাহস খুঁজতে থাকি বেঁচে থাকার প্রতিটি মুহূর্তে তার অনেকটাই খুঁজে পাওয়া সম্ভব ছোটদের জগতে – তাদের সাথে, তাদের ভাষায় কথা বলার চেষ্টার মাধ্যমে, তাদের জগত থেকে সাহস সংগ্রহ করার মাধ্যমে।

গত দু’বছরের কাছাকাছি সময় ধরে আমাদের দেশের শিশু এবং কিশোররা স্কুলছাড়া। আমরা খবর পেতে থেকেছি এর ফলে স্কুলছুটের সংখ্যা বেড়েছে। জানতে পেরেছি বান্ধবহীন জীবন কাটানোয় ছোট ছোট কত মনেই না কালো মেঘ ভর করে আছে। বাইরের জগত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে বাড়ির নিয়মকানুনের ঘেরাটোপে বাড়ছে মান-অভিমানের পালা। এটা আমাদের বাস্তব হতে পারে না, এই অবস্থাকে স্বাভাবিক বলা যায় না।

আরও পড়ুন

নিয়মিত বিভাগ

ভীমা কোরেগাঁও বা এলগার পরিষদ মামলায় কী হচ্ছে? – অতীন্দ্রিয় চক্রবর্তী

রোমিলা থাপার এবং অন্যান্যরা এই মামলায় কোর্টে যে পিটিশনের কাগজ জমা করেছিলেন তাতে স্পষ্টতঃই উল্লেখ ছিল দুই হিন্দুত্ববাদী গুণ্ডা একবোটে ও ভিড়ে কী ভাবে প্রকাশ আম্বেদকর, সোনি সোরি, জিগনেশ মেওয়ানিদের নেতৃত্বে হওয়া শান্তিপূর্ণ দলিত-আদিবাসী র‍্যালির উপর ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন। যে এফ আই আর-এর ভিত্তিতে অভিযুক্ত এই ১৬জনের জেল হলো, সেই এফ আই আর টি-ও দাখিল করা হয়েছিল হিন্দুত্ববাদী গোষ্ঠীদের তরফ থেকে। 

চতুর্থ তোরণ – মণিদীপা সিংহ

ওহে অতল জল, বল দেখি গুনে গুনে কজন হল?

-অগুনতি, হরি হে, অগুনতি!

– ওহে অতল জল, বল দেখি কজনের নাম জান?

– নামে কি যায় আসে, হরি হে, শরীর শুধু ডোবে!

– ওহে অতল জল, বল দেখি, খোঁজে কি তাদের কেউ?

ছোটদের জন্য

দেশ – সাদিক হোসেন

দেশ কি পাল্টে যাচ্ছে?
রুকুর বয়েস দশ। সে এতোসব জটিল প্রশ্নের উত্তর জানে না। তবু সে বুঝতে পারছে চারদিকে কিছু বাজে ঘটনা নিশ্চয় ঘটছে। এইতো সেদিন আব্বা কাজ থেকে ফিরে টিনের বাক্সটা খুলল। এই বাক্সের ভেতর কতো পুরনো কাগজপত্র থাকে। আব্বা ধুলো ঝেড়ে কাগজগুলো দেখছিল। দেখতে দেখতে মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়ল একসময়। মা তখন রান্নাঘরে। রাতের খাবার বানাচ্ছিল। আব্বা মাকে ডেকে বলল, কাগজগুলোয় তো গন্ডগোল রয়েছে।

পিংকি গেল ইশকুলে – চূর্ণী ভৌমিক (আস্ত্রিড লিন্দগ্রেনের লেখা ‘পিপ্পি লংস্টকিং’-এর অনুবাদ)

ঘন্টা আর মিমি দুজনেই রোজ ইশকুলে যেত। সকাল আটটা বাজলেই তারা ভাইবোন হাত ধরাধরি করে বগলে বই-খাতা নিয়ে, পা টেনে টেনে, হাই তুলে তুলে, ইশকুলের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়ত। পিংকি সেই সময়ে হয় তার পোষা গরুটাকে জাবনা খেতে দিত, কিংবা ওর পোষা বাঁদর শ্রীমান নরেন্দ্রকে রংবেরঙের পোষাক পরিয়ে সাজাতে ব্যস্ত থাকত। 

রুকু আর ওর ফ্রেন্ড সত্যজিৎ – অনিন্দ্য সেনগুপ্ত

মরাল সায়েন্সের মিস সবাইকে জিগ্যেস করেছিল যে তারা বড় হয়ে কী হতে চায়। তাতে রুকু বলেছিল যে সে সিনেমা বানাবে। ‘ইন্টারেস্টিং’, বলে মিস যখন জিগ্যেস করল কেন এটা সে বলছে তখন সে বলেছিল যে সত্যজিৎ রায় সিনেমা বানায় বলে। ব্যস! তারপর ‘সিনেমা বানাতে গেলে কী করতে হয়?’, ‘কেন সিনেমা – সত্যজিৎ রায় তো ছোটদের গল্পও লিখতেন’ ইত্যাদি প্রশ্নের উত্তর দিতে রুকুর ইচ্ছে করছিল না।

গল্প বলেন সুখলতা – শ্রুতি গোস্বামী

হযবরল আর আবোল তাবোলের নাম হয়ত তোমরা শুনেছ সবাই। নিশ্চয়ই জানো লেখক সুকুমার রায়ের নাম। আজ যাঁর কথা বলব, তিনি সুকুমারের দিদি, ভাল নাম সুখলতা। রবীন্দ্রনাথের রাজর্ষি উপন্যাসের দুই শিশু হাসি-তাতার নাম অনুসরণেই সুকুমারের নাম হয় তাতা, সুখলতার নাম হাসি। কিন্তু, সুকুমার রায়ের দিদি, এটুকুই কি তাঁর পরিচয়? না। বাংলায় রূপকথা লেখা, নাটক লেখা, কমিক্স আঁকা, ছোটদের লেখাপড়া শেখার নতুন পদ্ধতি খোঁজা, ওড়িয়া সাহিত্যের অনুবাদ, অনেক কিছু করেছেন সুখলতা। 

অদ-ভূতুড়ে – কৌশিক মজুমদার

মানুষকে বিশ্বাস না করার হাজারো কারণ থাকতেই পারে, কিন্তু অলৌকিক আর ভূতে যারা বিশ্বাস করেন না, তাঁরা নিতান্তই হর্দম, মানে হাঁদা। চাঁদ থই থই নিঝুম রাতে বাড়ির সবাই যখন ঘুমে বেহুঁশ, তখন ঘরে উত্তরের জানলাটা আমি খুলি না কেন? কারণ বাইরে কয়েকশো গজ দূরে রমাপিসিদের খোলা ছাদের ধারে পা ঝুলিয়ে কারা যেন বসে থাকে। লাল লাল চোখ। ফ্যাকফ্যাকে চেহারা। ড্যাবড্যাব করে ওরা তাকায় আমার ঘরের দিকে। খাটের থেকে পা নামাতেই কে যেন সড়াৎ করে পিছলে সরে যায় ভিতরের দিকে। 

কমলার পোষা আমড়া আর একটা সহজ তেঁতুলের আচারের রেসিপি – সেঁজুতি দত্ত

আমাদের ছোটবেলায়, মানে অনেক অনেক আগে, ইস্কুলের সামনে এসব পাওয়া যেত। আমার এর মধ্যে সবচেয়ে ভালো লাগত কালো আমসত্ত্ব, বিট নুন মাখিয়ে। মা বলত ওগুলো পচা আম দিয়ে বানায় তাই খেতে নেই। মিছে কথা! যাতে বাইরের খাবার না খাই তাই সব বানিয়ে বানিয়ে বলত, আমি নিশ্চিত। তা সেরকম সময়ের একটা গল্প বলছি তোমাদের, পোষা খাবারের গল্প। আসলে গল্প না, সত্যি। আমার বন্ধু কমলার কথা।

রান্নার খাতা – চূর্ণী ভৌমিক

আমাদের ইস্কুল একটু একটু করে খুলছে। কিন্তু গত প্রায় দু’বছর ধরে আমরা ঘরবন্দী। বন্ধুদের সঙ্গে দেখা করা, খেলতে যাওয়া, দুষ্টুমি করা কিছুই প্রায় হয়ে উঠছিল না। তাই বন্ধুর কথা মনে রেখেই চূর্নী এই বইটি বানিয়েছিল। যখন দেখা হবে তখন সবাই একসাথে মিলে রান্না করবে, খাবে। দেখা হবার আগে অবধি বন্ধু নিজে একটু হাত পাকিয়ে নিক সেটাই ভেবেছে হয়ত। সেই বই আগামী কয়েক সংখ্যায় আমরা আমাদের ছোট পাঠিকাদের জন্য ছাপব। এবার রইল প্রথম কিস্তি।

আয়নাদেশের কিস্‌সা – সর্বজিৎ ঘোষ

ওকে দেখে বয়স বোঝা যায় না। একদল যদি বলে সে মোটে একটা বাচ্চা, তো অমনি আরেকদল সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠবে, মোটেই না, অমন কুঁচকোনো চামড়া, তোবড়ানো গাল আর জিরজিরে হাড় কি বাচ্চাদের হয় নাকি? উত্তর আসবে, তাহলে অমন ছোট্টখাট্টো চেহারা হয় কী করে? কী করে আবার, বয়েস হতে থাকলে মানুষ আবার ছোট হয়ে যায়, কুঁচকে কিসমিস হয়ে যায়, জানা নেই নাকি? ব্যাস, শুরু হয়ে যাবে ঝগড়া! সত্যি, এত বোকা-বোকা জিনিস নিয়ে যে-লোকে ঝগড়া করে, কী বলব!

মায়ার গল্প – প্রিয়ক মিত্র

টি১২। এটাই ভাল নাম মায়ার। মায়া অবশ্যই সকলের দেওয়া ডাকনাম। বলা ভাল, বনবিভাগই মায়া নামটা রেখেছিল ওর। পর্যটকরাও ওই নামেই চেনে ওকে। মায়াকে প্রথম যখন আমি দেখেছিলাম, তখন ২০১৫ সাল। জঙ্গলের বুক চিরে রানির মতো হেঁটে গিয়েছিল মায়া। একপাশে সার দিয়ে দাঁড়িয়েছিল টুরিস্ট জিপগুলো। সকলে মায়াকে দেখছিল একদৃষ্টে। মায়া কিন্তু মোটেও পাত্তা দিচ্ছিল না কাউকে। 

‘অঙ্ক কী কঠিন!’ – শ্রীরূপা মান্না

‘অঙ্ক কী কঠিন’ এই বাক্যবন্ধটা বলে বলে পৃথিবীর তাবত মানুষকে শিশু অবস্থা থেকেই ভয় দেখানো হয়। ঠিক যেমন করে মিথ্যে কল্পিত ভুতের গল্প বলে শিশুকে ভয় দেখানো হয়, এটাও অনেকটা একইরকম। অথচ কোনও বিষয়েরই এরকম ‘সহজ’ বা ‘কঠিন’ বলে কোনও মাপকাঠি হয় না। যা হয় তা হল ‘ভালো লাগা’ বা ‘না লাগা’।

‘৯৭ কে লেখা চিঠি – অলোকপর্ণা

তুমি ভেবেছিলে একবার জ্যোতির্বিদ হবে, যাকে এস্ট্রোনমার বলা হয়। তারা দেখতে তোমার খুব ভালো লাগতো। তুমি মনে করতে সব তারাদের রঙ সবুজ। সবুজ প্রিয় রঙ ছিল তোমার, কারণ তুমি মাটি, গাছপালাদের ভালোবাসতে। এখন, বড়বেলায় অবশ্য তোমার নীল রঙ পছন্দ। তোমার চোখদুটো বড় হতে হতে আকাশ ছাড়িয়ে চলে গেছে, তোমার হৃদয়টা এখনো মুঠোয় ধরা যায়। সে বাড়েনি তেমন।

ছোটোদের থিয়েটার – সুচেতনা চন্দ

১৯৯৮ সাল নাগাদ, কিছু মানুষ, যারা নিজেরাই সেই সময় ছোটোদের নিয়ে নাটকের কাজ করছিলেন মূলতঃ দক্ষিণ বঙ্গের মফস্বলে এবং শহরে, তারা ঠিক করলেন বছরের একটা নির্দিষ্ট সময়ে যদি নানা জায়গায় ছোটোদের এক সঙ্গে করে একটা আবাসিক নাট্য কর্মশালার আয়োজন করা যায় তাহলে ছোটোদের সাথে সাথে যারা কাজ করান তাদের মধ্যেও একটা ভাবনা আর কর্ম পদ্ধতির দেওয়া নেওয়া হতে পারবে। 

খাতা – রূপকথা
আমাদের সকলেরই একটা গোপন খাতা থাকে। আমাদের একটু ছেলেমানুষি করার জায়গা সেই ডায়েরি। যখন আমরা আরো ছোট ছিলাম, মনে পড়ে, সারাক্ষণ নজরদারিতে থাকা আমরা, স্বাধীন ভাবে এলোমেলো বাক্য, রঙিন আঁকিবুকি কাটার জন্য মাঝে মাঝেই পেন পেন্সিল নিয়ে বসে যেতাম। এখন যতই ফোন আমাদের হাতে আসুক না কেন, ছোট্ট ছোট্ট রঙিন মলাটের খাতার যে কী চাহিদা, তা আমার বন্ধুদের দেখলেই খুব বোঝা যায়। এত এত বছর ধরে বাচ্চাদের জীবনের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত এই খাতা নিয়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এক গল্প লিখেছিলেন। সেই গল্পের নামও খাতা।

ছোটদের রঙ্গতামাশা - চূর্ণী ভৌমিক
শেয়ার করুন