আমরা বামা। বামপন্থা এবং নারীবাদের সম্পৃক্ততায় আমরা একই সঙ্গে নারী, বিমুখী এবং প্রতিকূলাও বটে৷ ভারত ও বৃহত্তর বিশ্ব জুড়ে যা কিছু লিঙ্গরাজনৈতিক উত্থান পতন, যা কিছু থেকে যাচ্ছে মূলধারার আলোচনাবৃত্তের বাইরে, তাকে সসম্মানে প্রচারের আলোয় আনা ও ঐতিহাসিক দায়বদ্ধতা থেকে তাকে সংরক্ষিত করার আশু প্রয়োজন বোধ করছি আমরা। প্রয়োজন বোধ করছি বাংলা ভাষায় লিঙ্গ রাজনীতি আলোচনার পরিসর তৈরির। আর সেই রাজনৈতিক দায়বদ্ধতা ও তাগিদ থেকেই নারীবাদ সম্পর্কিত তাত্ত্বিক থেকে জনমুখী – নানা ধরনের লেখা বাংলা ভাষাতে প্রকাশের এই উদ্যোগ।

সাম্য, স্বাধিকার এবং বন্ধুত্বের দাবিতে, নারীবাদের বৈচিত্রময় ও বিপরীতমুখী ভাবনাগুলিকে এক পরিসরে বেঁধে রাখতে, তর্ক চালিয়ে যেতে, এবং কল্পনার ডানা মেলে ধরতেই এই পত্রিকার পথ চলা। বৌবাজার ক্রসিং-এ এক ফলকে লেখা আছে পুলিশের গুলিতে নিহত প্রতিভা, লতিকা আর অমিয়ার নাম। অথচ আমরা তাদের চিনি না। যেমন জানি না তেভাগার চাষী মেয়েদের নাম। আমরা খুঁজতে চাইছি বাম তথা গণআন্দোলনে মেয়েদের অবস্থান। আমরা বুঝতে চাইছি, নেত্রী ইলা মিত্রর ধর্ষণ কেন তেভাগার ইতিহাসে উপেক্ষিত৷ আমরা খুঁজতে চাইছি তেভাগা থেকে নকশাল আন্দোলন থেকে নাগরিক-পঞ্জি আন্দোলনের, কৃষক আন্দোলনের অচেনা মেয়েদের। আমরা কৃষক নারী ও শ্রমিক নারী-র আখ্যান ভদ্রবিত্ত পিতৃতান্ত্রিক পরিসরে শোনাতে চাই। আবার গৃহহিংসায় বা যৌন নির্যাতনে ভুক্তভোগী প্রান্তিক স্বরগুলি আমাদের দৈনন্দিন আলোচনার সন্দর্ভে নিয়ে আসতে চাই।

এলেন সিক্সুর কথায় নারীর লেখা, নারীর ভাষা তার অভিজ্ঞতার কারণে স্বাভাবিক ভাবেই আলাদা হয়ে যায় পুরুষের থেকে। এ’কথা আমাদের ভাবায়। লিঙ্গভিত্তিক কলমের স্বাতন্ত্র্য, বৈচিত্র্য এবং তফাত নিয়ে ভাবনা আজকের নয়। এই ভাবনা মাথায় রেখে ‘বামা’ নারীদের লেখার ওপর জোর দেবে সেই ইতিহাসের অংশ হিসেবে।

জাত, ধর্ম এবং শ্রেণিগত পরিচয়ের নিরিখে, লিঙ্গ নির্বাচনের অধিকারে, যৌনতার পছন্দের ভিত্তিতে এই নারীর সংজ্ঞা এবং অবস্থানও যে পাল্টাতে থাকে সেই জটিল প্রক্রিয়ার সাক্ষী হতে চায় ‘বামা’। বামা চায় লিঙ্গ বর্ণালীর বিভিন্ন অবস্থানে থাকা নারীবাদী স্বরের আদান-প্রদানের ক্ষেত্র হয়ে উঠতে।

সেই স্বর কখনও হবে গম্ভীর এবং তাত্ত্বিক আবার কখনও বা রঙ্গতামাশার, কখনও সেই স্বর শিল্পীর তুলির ছোঁয়ায় রং পাবে অথবা কখনও ধরা পড়বে চিত্র পরিচালকের ক্যামেরার লেন্সে।

‘বামা’ জানে শৈশবের সারল্য পিতৃতন্ত্রের নাগালের বাইরে নয়। নরম থাকতেই ইস্পাতকে আকার দিতে হয়, আর দিতে হয় ধারালো হয়ে ওঠার সাহস। বাকিটা তারা নিজেরাই করে নেবে। তাই একটি নারীবাদী পত্রিকা হিসেবে ‘বামা’ শুধুই বড়দের জন্য নয়। ‘যাহাই কঠোরভাবে প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য তাহাই শৈশবের কৌতূহল উদ্রেককারী’ সেরকম ভাবনা থেকেই ‘বামা’তে থাকছে ‘ছোটোদের জন্য’ নামে একটি বিভাগ। বড়দের সঙ্গে এই বিভাগে ছোটরাও লিখবে।

এই সব অঙ্গীকার নিয়েই আন্তর্জাতিক শ্রমজীবী নারীদিবসে বামা যাত্রা শুরু করল। পথেই হবে পথ চেনা৷ চিন্তায়, কল্পনায়, প্রতিরোধে আমরা হাতে হাত রেখে চলতে চাই।

শেয়ার করুন