আর কী বা দিতে পারি?

মাম্মাম,

একটা নীল প্রজাপতি, ডানা ভাঙা বুঝি তার৷ নাহলে মাটিতে ঘষটাতে ঘষটাতে যাবে কেন? জোজোর চোখদুটি তাতে নিবদ্ধ। সেই চোখ অনুসরণ করছিল মাটির আনুভূমিকে প্রজাপতির ফরফর। তারপর হঠাৎ মাটি থেকে অল্প উচ্চতায় …নীল নয়, এবার লাল…  চেনা লাল দুটো জুতো। জোজো বিস্ফারিত চোখে উপরে তাকায়। ফাঁসিতে লটকানো শরীরটার পা দুটো জড়িয়ে ধরে। আলগা হয়ে আসা ফিতে বেঁধে দেয় লাল জুতোর। এ দৃশ্যে তুমি কঁকিয়ে উঠেছিলে, মনে পড়ে? আমার হাতার খুঁট জড়িয়ে ধরেছিলে। অন্ধকারে স্পষ্ট শুনলাম তোমার ফোঁপানি, কান্না-ডোবা স্বর, ‘মা…’  

লকডাউনের আগে সেই আমাদের শেষ হলে ছবি দেখা। ‘জোজো র‍্যাবিট’। ‘দ্য ফ্যুরার’-এর ফাঁপানো বেলুনে মুগ্ধ জার্মান বালক জোজো। মা যে তার গুপ্ত কমিউনিস্ট দল করেন, বাবা যে ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেই হত, তা সে জানে না৷ সে ভাবে বাবা গেছে হিটলারের বাহিনীতে যুদ্ধ করতে। সে ভাবে মা  থার্ড রাইখের অনুগত। নাজি পার্টি নিয়ে তার মোহভঙ্গ হয় পরে, মায়ের মৃত্যু দিয়ে যার শুরু। এ ছবি দেখতে দেখতে আমরা তুলনা টানছিলাম বর্তমান ভারতের। হাসছিলাম ফ্যুরারকে নিয়ে মজাকিতে, যতক্ষণ না জোজোর মা মারা গেল। তারপর থেকে তুমি সেই যে কান্না শুরু করলে…’জোজো এখন কী ভাবে বাঁচবে? বাবা-মাকে ছাড়া?’

তুমি কি উত্তরপ্রদেশের দেড় বছরের চম্পকের কথা জানো? উনিশ সালের শেষ মাসে যার বাবা-মা উভয়েই বন্দি ছিল বারাণসীর জেলে? সে তখন আক্ষরিক অর্থে দুধের শিশু। স্তন্যের গন্ধে-ওমে-সোয়াদে ম ম জীবন৷ তারপর কী করে দীর্ঘকাল কাটাল সে মা-ছাড়া? তার মা, তার বাবা আসলে গিয়েছিল নতুন নাগরিকত্ব আইনের প্রতিবাদ করতে। সে এক আজব কানুন। মানুষ রাতারাতি না-মানুষ হয়ে যায়। ভয়ের, না? সেখান থেকে তারা সটান গেল জেলে। 

তারপর ধরো, বিশের শুরুতে দাঙ্গা লাগানো হল এক৷ আরও হত্যা, আরও ভয়। মা-বাবাকে হারালো আরও কতজন। মুসাদির খানের ছোট ছেলেটির কান্না মনে আছে? যে  কান্না ভাইরাল হয়ে দাঙ্গার মূর্ত ছবি হয়ে গেল? অথচ প্রকাশ্যে গুলি ছোঁড়া লোকেদের সাজা হল না। সাজা হল, আবারও, সেই নাগরিকত্বের অধিকার নিয়ে লড়া আন্দোলনকারীদের। 

অতঃপর আমরা তলিয়ে গেলাম মারীর গভীর গর্ভে। কেমন করে কেটে গেল গোটা বছর! প্রেক্ষাগৃহ বন্ধ হয়ে খুলেছে আবার৷ কিন্তু শাহীনবাগের জমায়েত ভেঙে গেছে। পার্ক সার্কাসের সেই ধর্ণাও আর জমেনি, যেখানে যেতাম দুজনে। বরং মারী মানুষকে যত অসহায় করেছে, ফ্যুরার শক্তিশালী হয়েছে তত। পথে ঝোলানো লাশ দেখতে হয়নি এখনও, কিন্তু পুলিশ লাশ পুড়িয়েছে গম ক্ষেতের অন্ধকারে৷ কতজন যে স্বজনহারা হল, কতজন হল বন্দি! অসহায় ভাবে তোমায় দেখি। ইচ্ছে করে, তোমায় মুঠো খুলে অন্য পৃথিবী দিই। মুঠো আলগা করে দেখি, শুধু অশান্ত দিনকাল। তাই প্রতিরোধের দীক্ষা ছাড়া আর কিছু নেই দেওয়ার মতো। যেমন জোজোর মা রোজির প্রতিরোধ। যেমন ডলোরাস ইবারুরির হুঙ্কার ‘নো পাসারন’। ভয়ের উত্তরাধিকার দেওয়ার চাইতে স্পর্ধার উত্তরাধিকার দিয়ে যাওয়াই শ্রেয়, তাই না? ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে মেয়েদের নির্ভীক যা কিছু উচ্চারণ, তার ব্যাটন দিয়ে যাই বরং। তারপর দৌড়াও, মেয়ে।  

আমরা জানি, যে শক্তিই সরকারে আসুক, নারীর প্রতি হিংসায় সে ঔদাসীন্য দেখাবেই। বারবার তাকে মনে করিয়ে দিতে হবে নারীর অধিকার। তবু অতি দক্ষিণপন্থী ফ্যাসিস্ট সরকার নারীবিদ্বেষে আলাদা এক মাত্রা যোগ করে। ধর্ষকের সমর্থনে মিছিল বা ধর্ষিতাকে খুন করে জ্বালিয়ে দেওয়া, কোথাও জ্বালিয়ে দেওয়ার দায়িত্বটি খোদ পুলিশের নিজ কাঁধে তুলে নেওয়া—এসব নজির তুলনাবিহীন। কিন্তু এমনটাই হওয়ার ছিল, জানো? কারণ ফ্যাসিবাদ ঐতিহাসিকভাবে নারী-অধিকার-বিরোধী। 

ফ্যাসিজম সম্পর্কে সবটা হয়ত এখনই বোঝা যাবে না। তবে ধরে নিতে পারো, তার মধ্যে আছে অন্ধ দেশভক্তি। ফ্যাসিজম দেশকে ‘নারীর মতো রক্ষণীয়’ ভেবে পূজা করে। অথচ ব্যক্তিনারী হয় লাঞ্ছিত। ফ্যাসিজম হল  জাতির উচ্চম্মন্যতাও। সেই উচ্চম্মন্যতার প্রতিনিধি সর্বদাই উচ্চবংশীয় উচ্চবর্ণীয় পুরুষ, কখনও নারী নয়। ফ্যাসিজম দেখায় এক নেতার প্রতি অন্ধ আসক্তি, এবং অবশ্যই সেই নেতাও সর্বদাই এক পুরুষ, সে হিটলার বা মুসোলিনি— যেই হোক। ফ্যাসিজম মানে একটি বিশেষ বর্ণ/ জাতি/ রাজনৈতিক গোষ্ঠীর প্রতি অযৌক্তিক ঘৃণা ও প্রতিহিংসাও। যেমন হিটলারের ইহুদির প্রতি, মুসোলিনির বলশেভিকদের প্রতি আর মোদীর মুসলমানের প্রতি। তাকে খতম করার মাধ্যমেই ফ্যাসিস্ট পৌরুষ স্বীকৃতি পায়।

এই ফ্যাসিজম বিশ্বাস করে মুক্তচিন্তাই জাতির অধঃপাতের কারণ। ফ্যাসিস্টরা মনে করে নারীর স্থান গৃহে, তার ভূমিকা গেরস্তালি কাজ,পরিচর্যা ও সন্তান উৎপাদন। জার্মানি, ইতালি, ক্রোয়েশিয়া—কোথাও এর ব্যতিক্রম হয়নি। পৃথিবীর কোনো দেশে ফ্যাসিজম কখনও নারীবান্ধব হয়নি।

১৯৩০ এর দশকে ফ্যাসিবাদের উত্থান যখন হল, তখন নারীর ঠিক কী ভূমিকা সে চেয়েছিল? নারী অবশ্যই ফ্যাসিস্ট দলে যোগদান করবে, চাঁদা তুলবে। কিন্তু পার্টির নীতিনির্ধারণের দায়িত্ব থাকবে পুরুষের। নারী বরং চাকরি ছাড়বে, বাড়িতে থাকবে, সন্তান প্রতিপালন করবে।  ‘Kinder, Küche, Kirche’ ( সন্তান, হেঁসেল ও গীর্জা)-র ত্রি-নীতি দিয়ে নাজি-রা বাঁধতে চেয়েছিল মেয়েদের৷ জার্মানিতে আর্যদের দেওয়া হচ্ছিল বিশেষ আর্থিক সাহায্য, যাতে তারা বিয়ে করে সন্তান উৎপন্ন করে৷ গর্ভনিরোধ নিষিদ্ধ হয়েছিল। গর্ভপাতের শাস্তি কঠোরতর হয়েছিল৷ ১৯৩০ দশকের শেষের দিকে জাতিগতভাবে উৎকৃষ্ট নারীদের বাছাই করে ‘ব্রিডিং ক্যাম্পে’ নিয়ে যাওয়া শুরু হয়েছিল, যাতে আর্য পুরুষের দ্বারা গর্ভসঞ্চার করানো যায় তাদের, যাতে আর্য সেনানী গড়ে ওঠে। আচ্ছা, সেই নারীদের অনুমতি বা ইচ্ছা ছিল? অবান্তর প্রশ্ন। উত্তর অজানা নয়৷ 

আজও দেখো, তোমার দেশে শাসকদলের এমএলএ বা এমপিরা হিন্দু নারীকে চারটি, পাঁচটি বা দশটি সন্তান উৎপন্ন করতে বলেন। সাধ্বী প্রাচী তো আরও এক ধাপ এগিয়ে চারটির বেশি সন্তানের জনককে (জননীকে নয় কিন্তু) বিশেষ সম্মান দেন মঞ্চে ডেকে।  

মুসোলিনির ইতালিতেও বলা হয়েছিল, সৈন্যদলের স্বার্থে আদর্শ দম্পতির অন্তত বারোটি সন্তান থাকা উচিত৷ বন্ধ্যাত্ব বা পুরুষের অকারণ ব্রহ্মচর্যের উপর তিনি ট্যাক্স বসিয়েছিলেন। সন্তানহীন বিবাহের উপরেও ট্যাক্স বসাতে চেয়েছিলেন। 

তীব্র নারীবিরোধী মুসোলিনি বিভিন্ন ফার্মে নোটিস পাঠিয়েছিলেন, যেন শুধু পুরুষদেরই নিয়োগ করা হয়। বিবাহিত পুরুষদের বলেছিলেন, বাড়ির মেয়েদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে। বলেছিলেন, মেয়েরা বাইরের কাজ করলে তাদের প্রজনন ক্ষমতা হ্রাস পায়। আরও স্পষ্ট করে বলেছিলেন, এতে নারীদের স্বাধীনতা ও সক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে, আর তাতে নষ্ট হবে সামাজিক কাঠামো। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর মেয়েরা তখন সদ্য বাইরের কাজে বেরোতে শুরু করেছে। মুসোলিনি বললেন, জাতি না হয় আপাতত কিছু অর্থনৈতিক ক্ষতিই স্বীকার করুক মেয়েদের কাজ থেকে তাড়িয়ে। তবু পিতৃতান্ত্রিক পরিকাঠামো বাঁচুক। ‘It is necessary to convince ourselves that the same work that causes woman to lose her reproductive attributes furnishes man with an extremely powerful physical and moral virility.’ ভারতেও দেখো একই প্রতিচ্ছবি। প্রধানমন্ত্রী কন্যাভ্রূণ বাঁচানোর প্রকল্প ঘোষণা করলেও বেটির সঙ্গে রোটির অন্ত্যমিল জমে ওঠে। ‘যদি না বাঁচে বেটি/ কে বানাবে রুটি?’ সেই মুসোলিনির নিদান মনে পড়ে-‘ঘরে সেঁধিয়ে যাক মেয়েরা’৷ সেই হিটলারীয় ‘Kinder, Küche, Kirche’!

কিন্তু প্রায় একশ বছর আগেও মেয়েরা কি মেনে নিয়েছিল এইসব নিদান? না। বরং ইতালি, ফ্রান্স আর পোল্যান্ডের মেয়েরা যুদ্ধে যোগ দিয়েছে ফ্যাসিস্টদের বিরুদ্ধে। সোভিয়েত রাশিয়ায় মেয়েরা লড়েছেন বিমানবাহিনীতে, রাতের বিমানহানার জন্য বিখ্যাত ছিলেন মহিলা পাইলটরা। তাঁরা যোগ দিয়েছেন আন্ডারগ্রাউন্ড গুপ্ত সমিতিতে৷ আশ্রয় দিয়েছেন তাদের, যাদের সরকার হন্যে হয়ে খুঁজছে। গলা তুলেছেন লেখক হিসেবে, বুদ্ধিজীবী হিসেবে, শিল্পী হিসেবে৷  

আর খোদ হিটলারের জার্মানির রোজি-রা? ত্রিশের দশকে যে জার্মান মেয়েরা নাজি হিটলারের বিরুদ্ধাচরণ করছিলেন, তাঁরা প্রায় সকলেই ছিলেন বাম দলের৷ যখন হিটলার ক্ষমতায় এল, তখন বলা হল, নারী সংগঠনগুলিকে হয় নাজি পার্টির অধীনতা স্বীকার করে নিতে হবে, নয় তাদের ভেঙে দেওয়া হবে৷ নেত্রীরা অনেকেই গেলেন কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পে বা নির্বাসনে। তা সত্ত্বেও সে সময় জার্মান কমিউনিস্ট পার্টির নারী-কমিটি কী বলল? ১৯৩২ সালে তাঁরা ঘোষণা করলেন –

‘হে জার্মানিবাসী শ্রমজীবী স্ত্রীরা, মায়েরা, মেয়েরা! 

এই সঙ্কটের সময়ে ফ্যাসিবিরোধী কর্মসূচিতে তোমাদের আহ্বান জানাই।  

নাজিরা বলছে, তারা নাকি আমাদের পরিবারকে বাঁচাবে! অথচ ব্রনশউইগে এক নাজি শাসক ক্লাগেস রাজত্ব করছে, আর সেখানে শ্রমজীবী মানুষের উপর অত্যাচার বাড়ছে। টিবি রুগী এক শ্রমিক, তার গর্ভবতী স্ত্রী ও দুই সন্তানকে তারা বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছে। কাজে আসা মায়েদের জন্য হোম আর নার্সারির সব পরিকল্পনা তারা বাতিল করেছে। গর্ভবতী মায়েরা ছয় স্কোয়ারফিটের জানালাহীন ঘরে বৃষ্টির জল চুঁয়ে পড়া ছাদের তলায় শিশুর জন্ম দিচ্ছে৷ 

নাজিরা বলছে গর্ভপাত করলে নাকি মৃত্যুদণ্ড দেবে। তারা বাধ্য সন্তান-উৎপাদক যন্ত্র চায়৷ তোমাদের পুরুষমানুষের চাকর হয়ে থাকতে হবে৷ তোমাদের আত্মসম্মান দলিত হবে৷ খিদেয় অস্থির হবে পরিবার। এই নাজিরা নারীর স্বাধীনতা ও সমানাধিকারের ভীষণ শত্রু। তাদের সাথে কোনো সমঝোতা নয়। তোমার রাজনীতি, তোমার দল, তোমার মতাদর্শ যাই হোক, এসো এই মুহূর্তে আমরা ফ্যাসিবিরোধী কর্মসূচিতে একত্রিত হই। ক্ষুধা, ফ্যাসিবাদ ও যুদ্ধের বিরুদ্ধে সংযুক্ত সংগঠন ও লড়াই গড়ে তোলো।’ (I Will Not Bow My Head: Documenting Political Women In World History)

ডলোরাস ইবারুরির নাম তো আগেই বলেছি। সেই আশ্চর্যময়ী, যিনি স্প্যানিশ গৃহযুদ্ধের সময় স্বেচ্ছাচারী ফ্র‍্যান্সিস্কো ফ্র‍্যাঙ্কোর বিরুদ্ধে গর্জে উঠেছিলেন। তার সুরেলা অথচ প্রত্যয়ী স্বর ঘোষণা করেছে রেডিওতে—’ফ্যাসিবাদীরা যেন ঢুকতে না পারে।’ তিনি বলেছেন, ‘নিজের পায়ে ঋজু দাঁড়িয়ে মৃত্যুবরণ করো, কিন্তু ফ্যাসিবাদের সামনে হাঁটু মুড়ে বোসো না।’ বলেছেন, ‘We dip our colours in honour of you, dear women comrades, who march into battle together with the men. All honour to you, women anti-fascists!’ প্রতিরোধের রঙ কেমন? হয়ত লাল? হয়ত রামধনু? তীব্র সব রঙ। সেই রঙে নিজেকে রাঙিয়ে নেওয়ার সময় এখন। 

******

সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীকে চিঠি পাঠিয়েছেন একশ পঁচাত্তরটি নারী সংগঠন। আবার আরও এক বিবৃতি দিয়েছেন এগারো হাজার নারীবাদীর এক দল। তাঁরা সকলেই বলেছেন, ‘ভোট দাও বিজেপিকে, নয়ত ধর্ষিত হও, এই কি আপনার বার্তা, প্রিয় প্রধানমন্ত্রী? না যদি হয়, তবে আপনার দলের লোকেরা তা বলছে কেন?’ তাঁরা বলেছেন, ‘ভোট সংবিধান স্বীকৃত পন্থায় লড়ুন, এমন উপায়ে না, যা নারীদের ভয় দেখায়, সন্ত্রস্ত করে।’ কেন তাঁরা এমন বলছেন? কারণ গত ছ বছরে ঘটল কত কিছু! 

শবরমতীতে পুজো করতে যেতে চাইলে ঋতুমতী নারী ধর্ষিতা হওয়ার হুমকি পান। বিধর্মীকে বিয়ে করলে তাঁকে নিক্ষেপ করা হয় জেলখানায়, যেখানে তাঁর গর্ভপাত হয়৷ উত্তরপ্রদেশের মতো রাজ্যে হু হু করে বাড়ছে নারী নির্যাতন, আর কমছে অপরাধীর শাস্তির হার। বর্তমান শাসকদল বিজেপি হল সেই দল যার সাংসদ ও বিধায়কদের উপর সর্বাধিক সংখ্যক নারী নির্যাতনের অভিযোগ।

সমাজমাধ্যমে হোক বা বাস্তব, শাসক দলের বিরোধিতা করলেই নারীরা হয়ে যাচ্ছেন কেবলমাত্র অপমান-যোগ্য নারীশরীর। বর্ণভেদ-বিরোধী সমাজকর্মী মীনা কন্ডস্বামী বা কিরুবা মুনুস্বামীরা তো সমাজমাধ্যমে রোজ লাঞ্ছনার শিকার হন। তাদের জাত তুলে অপমান করে দক্ষিণপন্থী ট্রলরা। সাংবাদিক রাণা আয়ুব থেকে শুরু করে অভিনেত্রী তাপসী পন্নু বা স্বরা ভাস্করকে ‘বেশ্যা’ বলে গাল দেওয়া হয়। ‘বেশ্যা’ হল সেই নারী, যে কোনো না কোনো ভাবে সীমানা-লঙ্ঘনকারী৷ তাই না? এক্ষেত্রে সে আবার লঙ্ঘন করছে হিন্দুরাষ্ট্রের হুকুম-নামা, রাষ্ট্র-নির্ধারিত নির্জীব আজ্ঞাবহর ভূমিকা।

এখানেই শেষ নয়। সোশাল মিডিয়ায় সরব মেয়েদের ধমক, ধর্ষণের হুমকি জুটতই, চলতি ভাষায় যাকে বলে ট্রলের অত্যাচার৷ কিন্তু এখন ট্রলের জায়গা নিয়েছে রাষ্ট্র স্বয়ং। প্রতিবাদের অধিকার যে নেই নারীর, তা বারবার চোখে আঙুল তুলে বোঝাচ্ছে খোদ সরকার। মনুস্মৃতি-অনুসারী, ব্রাহ্মণ্যবাদী ও পিতৃতান্ত্রিক রাষ্ট্রকে যেন আত্মবিশ্বাসী, প্রতিবাদী নতুন নারীকে মুছে ফেলতেই হবে।

দলিত আর মুসলিম নারীর উপরেই সরকারের রাগ যেন বেশি৷ কী ভাষায় আক্রান্ত হয় তারা? চব্বিশের সফুরা জারগর, এমফিল স্কলার ও জামিয়া ছাত্র-ছাত্রী কো-অর্ডিনেশন কমিটির সদস্য। নাগরিকত্ব আইনের প্রতিবাদ করায় তিনি গ্রেফতার হলেন গর্ভবতী অবস্থায়। শুরু হল কুৎসা। শাহীনবাগে নাকি যৌন লীলাক্ষেত্র৷ সেখানেই নাকি তিনি গর্ভবতী হয়েছেন। সারা বিশ্বজুড়ে তোলপাড় হওয়ার পর, একাধিক আন্তর্জাতিক মানবতাবাদী সংগঠন সফুরাকে নিয়ে বিবৃতি দেওয়ার পর, অবশেষে তিনি ছাড়া পান। আবার একুশ বছরের পরিবেশ কর্মী দিশাকে যখন কৃষক আন্দোলনের সপক্ষে ‘টুলকিট’ এডিট করা ও তা ছড়ানোর অভিযোগে ধরা হল, তখন কেউ কেউ বলল, ‘একেও গর্ভবতী করে দাও৷ তাহলেই একমাত্র বেইল পাবে সফুরার মতো’। এও কি ধর্ষণের হুমকি নয়? 

দিশা রবি ‘ফ্রাইডে ফর ফিউচার’  গ্রুপের সদস্য।  তা ভারতের পরিবেশ-নীতির তীব্র সমালোচক। মোদী সরকার কর্পোরেটের মুনাফার কথা ভেবে পারিবেশিক ন্যায়ের তোয়াক্কা করেন না৷ সুধা ভরদ্বাজ আর স্ট্যান স্বামীও তো মধ্যভারতে জঙ্গল-জমি-জল কেড়ে নেওয়ারই প্রতিবাদ করছিলেন। এই দেখো, এসে পড়ল মধ্যবয়সী নারীর কথাও। অধ্যাপক সোমা সেন বা সুধা ভরদ্বাজরা আদিবাসী মানুষের অধিকার চেয়েছিলেন। রাতারাতি তাঁরা হয়ে গেলেন ভয়ংকর ‘অ্যান্টিন্যাশনাল’। ভীমা কোরেগাঁও মামলায় তাঁরাও গ্রেফতার। ওই মামলায় যে ষোলোজন বুদ্ধিজীবীকে ধরা হয়েছিল, তাদের মধ্যে বয়সে সবচেয়ে নবীনা আরেক মেয়ে। তেত্রিশের জ্যোতি জগতপ, কবীর কলামঞ্চের কর্মী সে। এলগার পরিষদের ডাকে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান করতে গেছিল, সেটুকুই তার ‘দেশদ্রোহ’। গত বছরের শুরুতে পুলিশ আরও তুলে নিয়ে গিয়েছিল ‘পিঞ্জরা তোড়’ এর সদস্য দেবাঙ্গনা ও নাতাশাকে। তাদের বিরুদ্ধেও ছিল দিল্লির সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় উস্কানি দেওয়ার অভিযোগ। একবার বেইল পাওয়ার পরে তাদের আবারও গ্রেফতার করা হয়। গুলফিশা ফাতিমা নামের আরেক মেয়ের নামও ছিল সেই কেসে। জামিন হলেও তার বিরুদ্ধে অভিযোগ খারিজ হয়নি এখনও। 

এ বছরটা শুরু হল নোদীপ কৌরের গ্রেফতার দিয়ে। দলিত শ্রমিক নেত্রী নোদীপকে গ্রেফতার করেছিল হরিয়ানা পুলিশ সিংঘু সীমান্ত থেকে। সে হরিয়ানার কুন্ডলিতে ‘মজদুর অধিকার সংগঠন’-এর হয়ে বিক্ষোভ দেখাচ্ছিল। সিংঘু সীমান্তের কাছেই সেই ঘটনাস্থল,  ফলে কৃষক আন্দোলনেও সে অংশগ্রহণ করছিল।  রুপি কৌর ও মীনা হ্যারিসের মতো হাই-প্রোফাইল টুইটার-অ্যাকাউন্ট থেকে বারবার তার খবর জানতে চাওয়া হচ্ছিল। অথচ কোনো স্বচ্ছ উত্তর পাওয়া যাচ্ছিল না৷ সে কার্নাল জেলে কেমন ছিল? কেন তার জামিনের আবেদন সোনিপাত কোর্টে গ্রাহ্য হচ্ছিল না? পাঞ্জাবের তপশিলি জাতি রাজ্য কমিশন সুয়ো মোটো করে রিপোর্ট পেশ করতে বলেছিল ফেব্রুয়ারির তেইশের মধ্যে। তাই অবশেষে সে জামিন পেল।

ছাড়া পাওয়ার পর চব্বিশ বছরের নোদীপ বলছেন, ‘১২ জানুয়ারি ওরা আমাকে চুল ধরে হিড়হিড় করে টেনে নিয়ে গেল। ভ্যানে তুলল। লাঠি দিয়ে পিটতে লাগল। লাঠি বারবার আমার যৌনাঙ্গে এসে পড়ছিল। কোনো মহিলা পুলিশ ছিল না। চারজন ছেলে পুলিশ আমার উপর চেপে বসে বেধড়ক মারছিল। পরে আমাকে সোনিপত পুলিস স্টেশনে নিয়ে গেল৷ সেখানেও অত্যাচার চলল। আমাকে কোয়ারেন্টাইন করা হল দুদিন অথচ সেখানেও মারধোর করা হল। আমার কোনো মেডিকাল রিপোর্ট তৈরি হল না৷ চোদ্দ দিন পরে আমার উকিল কোর্ট থেকে অনুমতি নিলেন যাতে অন্তত ডাক্তারি পরীক্ষাটুকু হয়৷’ 

নোদীপ দলিত। তাকে পুলিশি হেফাজতে বলা হয়, ‘তোদের কাজ নালা-নর্দমা সাফ করা, বড় মানুষদের বিরুদ্ধে আন্দোলন করার অধিকার কে দিয়েছে?’ ছেচল্লিশ দিন হাজতবাসের পর মুক্তি পেয়েছে সে। তার কণ্ঠ রোধ করা যায়নি৷ সে বলছে জেলে থাকা অন্য মেয়েদের কথা,’ওরা সবাই দরিদ্র, অন্ত্যজ, ছোটখাটো অপরাধে দোষী। আমি যখন আমার উপর পুলিশি অত্যাচারের গল্প তাদের বলেছি, তারা বলেছে ওসবে তাদের অভ্যেস হয়ে গেছে।’ সেই  নোদীপ আবার হাসিমুখে সিংঘু সীমান্তে হাজির। সে আবার সরব কৃষি-আইনের, শ্রমকোডের বিরুদ্ধে৷ 

আসলে দিল্লিতে প্রথম বার আশি-ঊর্ধ্ব বিলকিস দাদি যেদিন এলেন শাহীনবাগে ধর্ণা মঞ্চে, সেদিনই ইতিহাস বদলে গিয়েছিল৷ জামিয়া, হজ রানি, নিজামুদ্দিন, সিলামপুরের মেয়েরা জেগে উঠতেই সাড়া দিয়েছিল পার্কসার্কাস, মালদা, মুর্শিদাবাদ। তাদের হাতে ছিল সাবিত্রী বাঈ ফুলে আর ফাতিমা শেখের ছবি। সফুরা, গুলফানিসা, ইশরাত, নোদীপ বা দিশাদের জেগে ওঠা তারপর ছিল শুধু সময়ের অপেক্ষা। সর্বোচ্চ আদালতের প্রধান বিচারপতি যখন বলেন, ‘কৃষক আন্দোলনে আবার নারীরা কেন? ওদের জড়াবেন না’, তখন আরও হাজার হাজার কৃষক নারী জড়ো হন গাজিপুর সীমান্তে। পুরুষালি মহাপঞ্চায়েত তাদের অস্তিত্বকে ম্লান করতে পারে কই? কৃষক বলতে লাঙল কাঁধে বা ট্রাক্টরে আসীন যে পুরুষের ছবি তোমার মনে ভেসে ওঠে, তাকে চ্যালেঞ্জ করে এই মুহূর্তে দিল্লির সীমান্তে বিনিদ্র রাত কাটানো তিন লাখ মহিলা কৃষক। 

অস্বীকার করি না, তোমার পারিপার্শ্বিকে লেলিহান সময় রেখে যাচ্ছি। পুড়ে যাচ্ছে কয়েক দশকের গণতান্ত্রিক অর্জন। কিন্তু সেই আগুন থেকে ফিনিক্সীয় উত্তরণ যাদের, তাদের থেকে দীক্ষা নাও। সে সংখ্যাও বড় কম নয়। আম্বেদকরের সংবিধানে আছে প্রতিবাদের অধিকার, বাকস্বাধীনতার আশ্বাস৷ স্বাধীনতার পর থেকে কি কম পথ চলল ভারতীয় নারী? সাতচল্লিশ-উত্তর সময়ে নারী-আন্দোলন ধীরে ধীরে যেমন হয়েছে পুরুষের ছত্রছায়া থেকে মুক্ত, তেমনই তা ধীরে ধীরে ‘নারীবাদী’ আন্দোলন হয়ে উঠেছে। তা সময়ে সময়ে লিঙ্গভিত্তিক শ্রমবিভাজন, নারীর সামাজিক ভূমিকাকে প্রশ্ন করেছে। স্বাধীনতার সূচনা লগ্নে মনে করা হয়েছিল নারীর স্থান উন্নীত হবে নিজে থেকেই, দেশের উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে। তা হয়নি৷ বরং জমির অধিকার, পণহীন বিবাহের অধিকার, কর্মক্ষত্রে নিরাপত্তা ও সমান মজুরি, সামাজিক সুরক্ষা নিয়ে তাকে লড়াই করতে হয়েছে, আজও হচ্ছে৷ সে লড়াইতে আজও তার ভরসা সংবিধানের ১৪-১৬ নং ধারা, যেখানে সাম্যের কথা স্পষ্ট বলা আছে। তেভাগা থেকে খাদ্য আন্দোলন থেকে নকশাল আন্দোলন, নবনির্মাণ যুব আন্দোলন বা চিপকো আন্দোলন বা হালের এনআরসি আন্দোলন বা কৃষক আন্দোলন—নারীর ভূমিকা সবেতেই অবিসংবাদিত। আজকের মতো দুঃসময় আগে আসেনি ঠিকই, কিন্তু অতীতের লড়াই অভিযোজিত হয়েছে আমাদের জিনে৷ আজও সরকার ভয় পাচ্ছে তরুণীর প্রতিস্পর্ধাকে, মধ্যবয়সিনীর মূল্যবোধকে, অশীতিপরার-র জেদকে। দেশদ্রোহী দাগিয়ে বা ইউএপিএ চাপিয়ে তাদের রোখা যাচ্ছে না। 

চুপি চুপি বলি, আমার তোমাকে নিয়ে অনিষ্টচিন্তা হয়। ততটা সাহসী আমি নই, যতটা এতক্ষণ চিঠি পড়ে মনে হল। নিজেকে নিয়ে নয়, অপত্যকে নিয়ে অনিষ্টচিন্তা আমারও হয়৷ এই যে তুমি দ্রুত ছুটছ, দিশার বয়সের দিকে, সফুরার বয়সের দিকে, অথচ আমি তোমার বাসযোগ্য করে যেতে পারছি না পৃথিবীকে, গ্লানি হয় তার জন্য৷ আগলাতে পারলে বেশ হত। অন্যথায় বর্ম-টুকু দিয়ে যাই। বড় হয়ে যদি একই স্বৈরাচার, একই অসাম্য দেখো, তাহলে জেনো, মা-মাসিরা লুকিয়ে পড়েনি, পিছু হটেনি। হয়ত পারেনি, কিন্তু চেষ্টা তারা করেছিল। প্রতিরোধ এক যাত্রা। সে যাত্রার শরিক হোয়ো তুমিও। মিছিল-শেষে মিছিলের জনতার মুখের আলো দেখেছ? প্রতিরোধ এক উৎসবও। তাতে সামিল হোয়ো।

প্রতিরোধই একমাত্র বর্ম। তা ছাড়া আর কী বা দিতে পারি? 

শুভেচ্ছা—

মাম্মাম।

শেয়ার করুন

2 thoughts on “আর কী বা দিতে পারি?”

  1. সমাপ্তি সরকার

    প্রতিরোধই একমাত্র বর্ম, আমাদের মেয়েরা যেন সেই প্রতিরোধের পথের যাত্রী হতে পারে।

  2. Raj Kumar Gupta

    অসম্ভব শক্তিশালী লেখা। লেখাটি বহু মানুষ পড়ুক এই কামনা করি।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *