এই গোলামি থেকে মেয়েদের মুক্তি প্রয়োজন

হায়দ্রাবাদের নারী আন্দোলন কর্মী বি.অনুরাধা। গত ৩০ বছরেরও বেশি সময় ধরে সমাজের প্রান্তিকতম মানুষের মধ্যে নিরলসভাবে কাজ করে চলেছেন অনুরাধা। রাজনৈতিক কার্যকলাপের জন্য বারবার রাষ্ট্রের রোষের মুখে পড়তে হয়েছে তাঁকে। ফ্যাসিবাদ বিরোধী মঞ্চ গড়ে তোলার ‘অপরাধে’ ২০১৯-এর শেষভাগ থেকে আট মাস জেলে ছিলেন অনুরাধা। এর আগে ২০০৯ সালে গ্রেফতার হয়ে চার বছর বিচারাধীন বন্দী হিসেবে ছিলেন হাজারিবাগ জেলে। বিপ্লবী নেত্রী অনুরাধা গান্ধীকে কাছ থেকে দেখেছেন, কাজ করেছেন দেশের বিভিন্ন প্রান্তিক এলাকায়, আদিবাসী ও দলিত মহিলাদের মধ্যে। বামা-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে অনুরাধা আলোচনা করলেন ভারতে বিপ্লবী আন্দোলন ও নারীবাদী আন্দোলনে অনুরাধা গান্ধীর ভূমিকা নিয়ে। আন্দোলনের ভিতরে পিতৃতন্ত্র বিরোধী পদক্ষেপগুলো নিয়ে। কথা হল গৃহশ্রম, পরিবার ও বিবাহ প্রতিষ্ঠানের গণতান্ত্রিকীকরণের বিষয়ে। উঠে এল প্রান্তিক লিঙ্গপরিচয়ের মানুষদের লড়াইয়ের কথা। একজন দলিত মহিলা হিসেবে আন্দোলনে থাকার অভিজ্ঞতার কথা বললেন অনুরাধা। বামা-র তরফে বি.অনুরাধার সঙ্গে কথা বলেছেন সানন্দা।

১২ এপ্রিল অনুরাধা গান্ধীর শাহাদাতের তেরো বছর পূর্ণ হচ্ছে। এই দিনে আমরা যখন তাঁকে স্মরণ করছি আপনার কাছে জানতে চাইব অনুরাধাকে জানার অভিজ্ঞতা কেমন ছিল? একজন কমরেড হিসেবে, একজন বিপ্লবী হিসেবে তাঁকে কীভাবে পেয়েছেন? ভারতের বিপ্লবী আন্দোলন এবং নারীবাদী আন্দোলনে তাঁর অবদানকে কীভাবে বিশ্লেষণ করবেন? 

অনুর সঙ্গে আমার পরিচয় নব্বই দশকের গোড়ার দিকে। সে সময়ে অনু AILRC (অল ইন্ডিয়া লিগ ফর রেভোল্যুশনারি কালচার)-এর কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য। ১৯৯৩ সালের মে মাসে, পাটনায় AILRC একটি সেমিনারের আয়োজন করে– ‘নারী মুক্তি – শ্রেণি সংগ্রাম’। আমি সেই সেমিনারে গেছিলাম। অনু সেখানে ‘ট্রেন্ডস ইন ফেমিনিজম’ শীর্ষক একটি পেপার পড়ে। সেমিনারে দণ্ডকারণ্যের KAMS (ক্রান্তিকারী আদিবাসী মহিলা সংগঠন ) এই সেমিনারে একটি পেপার পাঠায়। অনু সেই সেশন-এর সভাপতিত্ব করছিল। পেপারটা তখনই অনুর কাছে  এসে পৌঁছয়, ভাষা ছিল ইংরেজি আর অনুর সেটা হিন্দিতে প্রেজেন্ট করার কথা। অনু একবার পেপারটা দেখল আর এমনভাবে হিন্দিতে প্রেজেন্ট করতে শুরু করল, যেন ওটা হিন্দিতেই লেখা। অনুর এমনই অসাধারণ সব প্রতিভা ছিল। পাশাপাশি অনু ছিল নম্র ও বিনয়ী। আজ ১৩ বছর পরও অনুর বিষয়ে কথা বলার সময়ে পাস্ট টেন্স-এ কথা বলা আমার পক্ষে খুবই কঠিন।   

অনু উচ্চ মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে এলেও সে সাফল্যের সঙ্গে নিজেকে ডি-ক্লাস করেছিল। অনু কারখানার শ্রমিক, দলিত ও মহিলাদের মধ্যে কাজ করে ও তাদের সংগঠিত করে। মহারাষ্ট্রের ইন্দোরাতে বস্তিতে থাকত অনু। ৪০ বছর বয়সে যখন আন্ডারগ্রাউন্ড-এ গেল, দণ্ডকারণ্যের জঙ্গলে থাকতে বা গেরিলার জীবন বেছে নিতে এতটুকু ইতস্ততঃ করেনি। সেখানে গোন্ডি জনজাতির মানুষদের সঙ্গে ছিল তিনবছর, হয়ে উঠেছিল তাঁদের প্রিয় জানকীদি।  

বিপ্লবী আন্দোলনের তাত্ত্বিক বোঝাপড়ায় অনুর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে, জাতি ও নারী দুই প্রশ্নেই। কাস্ট প্রশ্নে দৃষ্টিভঙ্গী গড়ে তোলার ক্ষেত্রে অনু কেন্দ্রীয় ভূমিকা নেয়। মহিলা প্রশ্নের দৃষ্টিভঙ্গী সংক্রান্ত পেপার-এও অনুর প্রচুর অবদান ছিল। অনু বহু প্রবন্ধ লেখে, বিভিন্ন বিষয়ে ক্লাস নেয়। পার্টির ক্যাডারদের নারীবাদ সম্পর্কে অবহিত করতে নারীবাদী আন্দোলনের ধারাগুলো নিয়েও লেখে, যাতে পার্টি কর্মীরা নারীবাদের বিকাশের ধারা বুঝতে পারে। নারীআন্দোলনের বিভিন্ন ধারাগুলো সম্পর্কে অনুর স্পষ্ট জানাবোঝা ছিল, বুর্জোয়া নারীবাদী আন্দোলন ও সমাজতন্ত্রী নারীবাদী আন্দোলন, দুই ক্ষেত্রেই। এই আন্দোলনগুলির বিভিন্ন প্রগতিশীল অবদানগুলোকে অনু পার্টির বিপ্লবী দৃষ্টিভঙ্গীর মধ্যে নিয়ে আসতে পেরেছিল ও সমন্বিত করতে পেরেছিল। অনু আমাদের যেকোনও নতুন দৃষ্টিভঙ্গীকে বস্তুনিষ্ঠভাবে বুঝতে শিখিয়েছিল। শুরুর দিন থেকে পার্টির মহিলা শাখা, কেন্দ্রীয় মহিলা সাব-কমিটি-র নেতৃত্বে ছিল অনু। অনু যখন শহীদ হয়, সেই সময়ে ও আন্দোলনের মধ্যে থাকা মহিলাদের অবস্থা ও তাদের সমস্যা স্টাডি করছিল। অনু ছিল পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য এবং দক্ষিণ-পশ্চিম আঞ্চলিক ব্যুরো-র সদস্য। অনু ছিল একজন অসাধারণ জননেত্রী এবং অসম্ভব সৃজনশীল মানুষ। তাঁর এই অল্প বয়সে অসময়ে মৃত্যু বিপ্লবী আন্দোলন ও নারী আন্দোলনের একটা বড় ক্ষতি। অনুর এই চলে যাওয়া সমাজেরও একটা বড় ক্ষতি, একটা ইগালিটেরিয়ান সমাজ গড়ে তোলার লড়াইয়ে জরুরি ভূমিকা ছিল অনুর।       

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে, বিপ্লবী আন্দোলনের মধ্যে পিতৃতন্ত্র ও লিঙ্গ-সম্পর্ক বিষয়গুলি সম্পর্কিত বোঝাপড়া কীভাবে এগিয়েছে? অনুরাধা গান্ধীর কাজ ও তাঁর লেগ্যাসি-কে এখানে কোথায় রাখবেন?   

পিতৃতন্ত্রের বিরুদ্ধে প্রচুর গ্রাউন্ডওয়ার্ক করতে হয়েছে, বিষয়টির ওপর বিশেষ জোর দিয়ে চেষ্টা চালিয়ে যেতে হয়েছে, শুদ্ধিকরণ প্রচারাভিযান চালাতে হয়েছে। শহরাঞ্চল, গ্রাম সব জায়গায়ই মহিলা সংগঠন তৈরি করা হয়, মহিলা সংগঠন তৈরি করা হয় আদিবাসী এলাকাগুলোতেও। আন্দোলনের এলাকাগুলোতে পার্টি, মহিলা সমস্যা নিয়ে কথা বলা শুরু করলে আরও অনেক মহিলারা বিপ্লবী আন্দোলনে আকৃষ্ট হন। সশস্ত্র স্কোয়াড-এও তাঁদের অংশগ্রহণ বাড়তে থাকে।  মেয়েদের অংশগ্রহণ বৃদ্ধির ফলে, এতদিন যে সমস্ত পিতৃতান্ত্রিক মানসিকতা লুকিয়ে ছিল তা সামনে চলে আসে। এই সমস্যার সমাধানে পার্টি বিভিন্ন ধরনের পদক্ষেপ নেয়, যেমন- মহিলা প্রশ্নে পার্টির দৃষ্টিভঙ্গী ঘোষণা করা, ক্যাডারদের লিঙ্গ-রাজনীতি প্রশ্নে শিক্ষিত করে তোলা, মহিলাদের শারীরিক বিষয়গুলো যেমন পিরিয়ড ইত্যাদি সম্পর্কে পুরুষ কমরেডদের (বিশেষত সশস্ত্র স্কোয়াড-এর কম্যান্ডারদের) সংবেদনশীল করা, এ বিষয়গুলো নিয়ে খোলাখুলিভাবে আলোচনার পরিবেশ তৈরি করা, মহিলা কমরেডরা কী কী সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছেন সেগুলি জানা ও সেগুলি সমাধানের জন্য সংগঠনের বিভিন্নস্তরের মহিলার কমরেড-দের নিয়ে বিশেষ মিটিং করা, মহিলাদের জন্য ড্রাইফ্রুট, বাদাম, ডিম ইত্যাদি বিশেষ পুষ্টিকর খাবারের ব্যবস্থা করা। এই পদক্ষেপগুলোর ফলে এখন দণ্ডকারণ্যের সশস্ত্র কোম্পানি-র নেতৃত্বে থাকছেন মেয়েরা।

অনু ছিল পার্টির নেতৃত্বকারী ভূমিকায় এবং পরে ও মহিলা সাব কমিটিকে নেতৃত্ব দেয় ফলে এই সব ক্ষেত্রেই অনুর অবদান রয়েছে। মৃত্যুর আগে অনুর শেষ কাজ, মহিলা প্রশ্ন ও আন্দোলনের ইতিহাসে মহিলাদের ভূমিকা নিয়ে ঝাড়খন্ডের নেতৃত্বকারী মহিলাদের (সকলেই আদিবাসী) ক্লাস নেওয়া। সেখানেই অনু ফ্যালসিপেরাম ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হয়, বম্বে যাওয়ার পর অসুস্থতা দেখা দেয়। প্রথমে টেস্ট রেজাল্ট নেগেটিভ আসে, পরে আবার যতদিনে টেস্ট হয় ততদিনে ওর বেশিরভাগ অর্গ্যানই ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে গেছে। মাল্টিপল স্ক্লেরোসিস-এ ভুগছিল, সেটাই মৃত্যু কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

ভারতে, নারীবাদী আন্দোলন আর রাডিক্যাল বাম আন্দোলনের মধ্যে কী ধরনের আদানপ্রদান ঘটেছে এবং তার ফলে একে অন্যের গড়ে ওঠায় কী ভূমিকা রেখেছে?

এক কথায় বলতে গেলে, দুটেোই দুটোকে প্রভাবিত করেছে। বিপ্লবী আন্দোলনে মহিলাদের অংশগ্রহণ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তাদের চেতনা বাড়ে। সেই চেতনার ফলে তারা পার্টির ভিতরের পিতৃতন্ত্রকে প্রশ্ন করতে শুরু করে। এর মধ্যে দিয়ে নারীবাদী চেতনা শক্তিশালী হয়ে ওঠে। আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রেও ৭০ ও ৮০-র দশকে নারীবাদ শক্তিশালী হয়, সেটাও ভারতের নারীবাদী আন্দোলনকে শক্তিশালী করেছে। বিপ্লবী আন্দোলনেও এর প্রভাব পড়েছে। শুধু বিপ্লবী আন্দোলনের মেয়েদের মধ্যেই না, পুরুষদের মধ্যেও এই প্রভাব পড়ে। এটা মহিলা কমরেডদের নিজেদের ভিতরে থাকা, ও পার্টির পুরুষ কমরেডদের মধ্যে থাকা পিতৃতান্ত্রিক মনোভাবগুলোর সঙ্গে লড়াই করতে সাহায্য করেছে। পুরুষদের নিজেদের আচরণ ও মনোভাব সম্পর্কে পর্যালোচনা করতে এবং নিজেদের শুধরাতে সাহায্য করেছে, স্টিরিওটাইপ ভাঙতে সাহায্য করেছে আর মহিলাদের সাহসী করে তুলেছে যাতে তাঁরা সবিস্তারে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পিতৃতান্ত্রিক ঝোঁকগুলোকে প্রশ্ন করতে পারে। নারীবাদী আন্দোলনের তোলা প্রশ্নগুলি, মহিলা প্রশ্নে বিপ্লবী সর্বহারা দৃষ্টিভঙ্গী গড়ে তোলার পদ্ধতিকে খানিকটা পর্যন্ত ত্বরান্বিত করেছে।   

আমরা দেখেছি অনেক নারী আন্দোলন মনে করে পিতৃতন্ত্রের মূল রয়েছে পরিবারে, এবং যে অর্থনৈতিক ও সামাজিক পদ্ধতির মধ্যে দিয়ে পরিবার গড়ে উঠেছে সেই পদ্ধতিটিকে তারা গুরুত্ব দেয় না- এবিষয়ে আপনার মতামত? পরিবার ও বিয়ে প্রতিষ্ঠানগুলো সম্পর্কে আপনার ভাবনার কথা যদি বলেন। 

এবিষয়ে একটা প্রত্যক্ষ উদাহরণ দিতে পারি। ১৯৯২ সালে অবিভক্ত অন্ধ্রপ্রদেশ জুড়ে আরাক (স্থানীয় মদ) বিরোধী আন্দোলন শুরু হয়। এই আন্দোলনে যুক্ত হওয়ার মধ্যে দিয়ে আমার রাজনীতি জীবন শুরু। তখন কিছু নারীবাদী বলেন (লিখিত আকারে), “এই মহিলারা বোকার মতো রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে লড়ছে কেন! এদের বররা মদ খাচ্ছে আর এদের ওপর অত্যাচার করছে। এদের উচিত বর-দের সঙ্গে লড়াই করা।” অন্য আরেকটি ঘটনায়, বিশ্ববিদ্যালয়ের এক দলিত ছাত্রী উচ্চবর্ণের এক ছাত্রের প্ররোচনায় আত্মহত্যা করে। সেই ছাত্র নিজের বর্ণের একটি মেয়েকে বিয়ে করে নেয়। কিছু নারীবাদী কর্মী এই ঘটনাটিতে শুধুমাত্র পিতৃতন্ত্রকে দায়ী করে এবং বর্ণের প্রশ্নটি পুরোপুরি উপেক্ষা করে।     

অন্য যে কোনও প্রতিষ্ঠানের মতোই পরিবার ও বিয়েও নানা পরিবর্তনের মধ্যে দিয়ে গেছে। মনোগ্যামাস পরিবারের ক্ষেত্রে, পরিবার, প্রোডাকশন ও কনসাম্পশন দুটোরই একক হিসেবে কাজ করেছে। সামন্ততান্ত্রিক সমাজে সবকিছুই পরিবার নির্ভর ছিল। শ্রেণিবিভক্ত সমাজে মনোগ্যামাস পরিবার পিতৃতন্ত্রের সুরক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করে চলেছে। পুঁজিবাদী সমাজব্যবস্থা তৈরি হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে যন্ত্রের সাহায্যে ব্যপকহারে উৎপাদন শুরু হয়, উৎপাদনের একক হিসেবে পরিবারের গুরুত্ব হারায়। কিন্তু পরিবারগুলি কনসাম্পশন-এর একক হিসেবে থেকে যায়। এই পুরো প্রক্রিয়াটিতে পরিবারের ভূমিকা দুর্বল হয়েছে কিন্তু পুরোপুরি বিলুপ্ত হয়নি। পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় গার্হস্থ্য শ্রম একটি জরুরি ভূমিকা পালন করে, শ্রম শক্তির পুনঃপ্রতিষ্ঠা ও পুনরুৎপাদনে গার্হস্থ্য শ্রমের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। পুঁজিবাদী উৎপাদন ব্যবস্থায়, পরিবারের ভূমিকা রয়ে গেছে গার্হস্থ্য শ্রমের আকারে। পরিবার ও বিয়ে মহিলাদের জন্য অত্যন্ত দমনমূলক প্রতিষ্ঠান।  এই প্রতিষ্ঠানগুলির মাধ্যমে শাসকশ্রেণি, পুরুষদের পিতৃতান্ত্রিক আচরণের স্বপক্ষে সমর্থন আদায় করে। একজন মেয়ে, পদানত ও নির্ভরশীল হয়ে ওঠার শিক্ষা পায় তার পরিবারে। আর একজন ছেলে শেখে মেয়েদের পদানত করে রাখা, পুরুষ আধিপত্য জাহির ইত্যাদি। পরিবারের মতো দমনমূলক প্রতিষ্ঠান ছাড়া, শাসক শ্রেণির পিতৃতান্ত্রিক ধ্যান ধারণাগুলো সামাজিক স্বীকৃতি পেত না। সুতরাং, যতদিন না উৎপাদনের সঙ্গে পরিবারের সব সম্পর্ক চুকিয়ে দেওয়া যাবে, পরিবারের গণতান্ত্রিকীকরণ সম্ভব নয়। 

ভারতে এখনও বেশিরভাগ বিয়েই হয় দেখাশোনা করে। পণ সেখানে পাত্রের সম্পত্তির অন্যতম মূল উৎস। বিয়ের মধ্যে প্রচুর ভণ্ডামি রয়েছে। এখানে স্বাধীন পছন্দের কোনও জায়গা নেই, এটি বিলিব্যবস্থার বিয়ে। এর পরিবর্তন প্রয়োজন। পরিবারের পিতৃতান্ত্রিক উপাদানগুলি ধ্বংস করতে হবে এবং গণতান্ত্রিকীকরণ করতে হবে। ধর্ম, বর্ণ, অঞ্চল, শ্রেণি, সংস্কৃতি ইত্যাদি বিভিন্ন জিনিসের ওপর স্থির হয় কে  কাকে বিয়ে করবে। পিতৃতন্ত্র ও বর্ণ ব্যবস্থার মূল স্তম্ভ হিসেবে কাজ করে বিয়ে এবং পরিবার। বিয়ে হওয়া উচিত স্বাধীন পছন্দের ভিত্তিতে, বিশেষত ধর্ম, বর্ণ ও শ্রেণির বাধার বাইরে গিয়ে। 

আপনি গার্হস্থ্য শ্রমের কথা বলছিলেন,  নয়া গণতান্ত্রিক সমাজে গার্হস্থ্য শ্রমের ছবিটা কেমন হবে? বিপ্লবী আন্দোলন এটা কীভাবে দেখে?  

শ্রেণিবিভক্ত সমাজ গঠনের আগে গার্হস্থ্য শ্রম বলে কিছু ছিল না। তারপর কৃষি ও পশুপালন শুরু হল এবং মূলতঃ ভারী কৃষি আবিষ্কার হওয়ার পর উৎপাদন বহুগুণ বেড়ে যায়। যাযাবর জীবন ছেড়ে স্থায়ী বসতি স্থাপন হয়। মহিলারা ঘরের ভিতর যে কাজই করুক, তার মূল্য ছিল। কিন্তু পরে আরও অন্যান্য কাজ যেমন রান্না করা, কাপড় কাচা, ঘরদোর পরিষ্কার করা ইত্যাদি আরও নানা কাজ ঘরের কাজের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায়। পশ্চিমি দেশগুলিতে যেমন উৎপাদন ছিল দাস ব্যবস্থাভিত্তিক, ভারতে সেটা শূদ্র ব্যবস্থাভিত্তিক। কিন্তু সেখানেও, পশুপালনভিত্তিক অর্থনীতিতে যে দাস ব্যবস্থা ছিল, সেটা ছিল মূলতঃ মহিলাদের গৃহ দাসত্বের আকারে। পশুদের দেখাশোনা, দুধ দোয়ানো ইত্যাদি সব কাজই করতেন মহিলারা। পুঁজিবাদ মেয়েদের সামাজিক উৎপাদনের ক্ষেত্রে নিয়ে এল। ফলে দ্বিগুণ বোঝা চাপল মেয়েদের ঘাড়ে। এই গোলামি থেকে মেয়েদের মুক্তি প্রয়োজন।      

নয়া গণতান্ত্রিক সমাজ, ব্যক্তিগত ঘরের কাজকে সামাজিক ক্ষেত্রে নিয়ে এসে এই ভার লাঘব করার চেষ্টা করবে। ক্রেশ, কমিউনিটির জন্য স্বাস্থ্যকর ফুড সেন্টার, কমিউনিটি ভিত্তিক লন্ড্রি, কমিউনিটি ভিত্তিক গোয়াল, ভেড়া, শুয়োরের খামার ইত্যাদি তৈরি করা হবে, স্কুলে স্কুলে খাবার দেওয়া হবে, প্রতিটি ঘরে পাইপ-এর জল পৌঁছনো হবে, গ্রামস্তরে গোবর গ্যাসভিত্তিক জ্বালানি সরবরাহ  করা হবে, প্রত্যেক গর্ভবতী মহিলা প্রসবের আগে ও পরে সবেতন ছুটি পাবেন। এগুলি মহিলাদের ওপর চেপে থাকা গার্হস্থ্য শ্রমের বোঝাকে অনেকটাই কমাতে সাহায্য করবে। 

কিন্তু ততদিন পর্যন্ত পারিবারিক কাজের গণতান্ত্রিকীকরণ প্রয়োজন। বিপ্লবী আন্দোলনে, রান্না ও বাসন মাজার কাজ  পালা করে সবাই করে, নারী-পুরুষ নির্বিশেষে। গণ সংগঠনগুলোতে ও আন্দোলনের এলাকাতে, পুরুষ কমরেডদের ঘরের কাজে অংশগ্রহণ করতে শেখানো হয়। আমরা বলি, পুরুষরা যা পারে মেয়েরাও সেইসব কাজই পারে। এখন, জোর দেওয়া হচ্ছে অন্য স্লোগানে, “মহিলারা যে কাজ পারে, পুরুষরাও সেই কাজ করতে পারে।” তাই, বউ বা বাড়ির অন্য মহিলা সদস্যদের সাহায্য করার দরকার নেই, সেই কাজে অংশ নিতে হবে।          

নিওলিবারালিজম সবসময়ই নারীবাদী আন্দোলনকে কো-অপ্ট করে নিতে চায়, এবং কোনও কোনও ক্ষেত্রে তারা এই কাজে সফলও হয়েছে। নিওলিবারাল নারীবাদী তত্ত্বের প্রবক্তাদের হাতে সোশ্যাল মিডিয়া ও অ্যাকাডেমিয়া সহ বিভিন্ন জিনিসের অ্যাক্সেস রয়েছে, এবং অনেক ক্ষেত্রেই সমাজের একটা অংশের মধ্যে তাঁরা তাঁদের নারীবাদের ধারণাকেই ‘প্রকৃত নারীবাদ’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে থাকেন। এই ডিসকোর্স কিভাবে বদলানো সম্ভব বলে মনে হয়? এক্ষেত্রে, ক্রান্তিকারী আদিবাসী মহিলা সংগঠন, নারী মুক্তি সংঘের মতো প্রলেতেরিয়ত মহিলা সংগঠনগুলির কাজ কীভাবে গুরুত্বপূর্ণ?

এটা সত্যি। কিন্তু আদিবাসী মহিলা সংগঠন, নারী মুক্তি সংঘের মতো প্রলেতেরিয়ত মহিলা সংগঠনগুলি মূলতঃ গ্রামীণ ও আদিবাসী এলাকাতে কাজ করে। কিন্তু তারপরেও, একটা পর্যায় পর্যন্ত তারা এই বিষয়গুলোকে মানুষের সামনে উন্মোচন করার চেষ্টা করে, যেমন KAMS নারায়ণপুরে একটি মিছিল ও সভা করে যেখানে তারা বিউটি কনটেস্ট-এর রাজনৈতিক অর্থনীতিকে মানুষের সামনে তুলে ধরেছিল। ২০০৬ সালে ৬-৮ মার্চ রাঁচিতে, আদিবাসী মহিলাদের অবস্থা ও লড়াই নিয়ে নারীমুক্তি সংঘ যে সর্বভারতীয় সেমিনার-এর আয়োজন করে, সেখানে নারীমুক্তি সংঘের নেতৃত্ব, বড় শহরভিত্তিক মহিলা বুদ্ধিজীবীদের সঙ্গে এই বিষয়গুলি নিয়ে আলাপ আলোচনা চালায় ও এই বিষয়ে তাদের মতামত রাখে। কিন্তু এই ধরনের উদ্যোগ খুব বেশি নেওয়া সম্ভব হয় না।     

আমার মনে হয়, শহরাঞ্চলের যে মহিলা সংগঠনগুলো প্রলেতেরিয়ান দৃষ্টিভঙ্গী নিয়ে কাজ করে, এই ধরনের তত্ত্বের বিরুদ্ধে তাদের লড়াই করতে হবে। তারা তাদের পত্রপত্রিকা, সভা ইত্যাদির মাধ্যমে সেটা করে থাকে। বিভিন্ন প্ল্যাটফর্ম থাকা প্রয়োজন যেখানে এই বিষয়গুলো নিয়ে তর্ক-বিতর্ক চালানো যাবে, তাঁদের নারীবাদী ধারণার যা কিছু ভালো তা গ্রহণ করতে হবে এবং যেগুলো মেয়েদের মুক্তির মূল লড়াই থেকে সরিয়ে দেয় সেই ধারণাগুলিকে খণ্ডন করতে হবে। 

শহরাঞ্চলের প্রলেতেরিয়ত দৃষ্টিভঙ্গীর নারী সংগঠনগুলোকে আরও কার্যকরীভাবে সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করতে হবে। আমি বলব, বর্তমানে এবিষয়ে তারা পিছিয়ে রয়েছে।

আপনি সমাজের একেবারে প্রান্তে থাকা মহিলাদের মধ্যে কাজ করেছেন, বিপ্লবী আন্দোলনকে খুব কাছ থেকে দেখেছেন। লড়াইয়ের এলাকায় লিঙ্গ অসাম্য দূর করতে কী ধরনের পদক্ষেপ করা হয়, সেরকম কিছু গল্প যদি বলেন।

আমি আগেই যেমন বলছিলাম সকলে সবধরনের দৈনন্দিন কাজ পালা করে করে। নিয়মিত সময়ের ব্যবধানে মিটিং হয়, সেখানে সাধারণত প্রত্যেককে তাঁর দায়িত্বে থাকা কাজগুলি সম্পর্কে রিপোর্ট করতে হয়, কাজের পর্যালোচনা ও পরিকল্পনা হয়। মিটিং-এর শেষ কিন্তু অন্যতম সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ অ্যাজেন্ডা থাকে আত্ম-সমালোচনা ও সমালোচনা। সেখানে আরও অন্যান্য বিষয়ের সঙ্গে সঙ্গে সবাইকে নিজের মধ্যে থাকা পিতৃতান্ত্রিক ঝোঁকগুলো নিয়ে কথা বলতে উৎসাহিত করা হয়। মেয়েদের জন্যও এটা প্রযোজ্য। কারণ মহিলা কমরেডরাও মনে করেন পুরুষদের তুলনায় তাঁদের দক্ষতা কম। তাঁদের নিজেদের ক্ষমতা নিয়ে সংশয় রয়েছে, তাঁরা নত হয়ে থাকে, কখনও কখন বরের আধিপত্যকে মেনে নেয়। মিটিং-এ এগুলো তাদের ধরিয়ে দেওয়া হয়। আশির দশকের শেষ দিকে ও নব্বই দশকের গোড়ার দিকে যখন মেয়েরা নেতৃত্বে আসতে শুরু করে, সকলে  কিন্তু তাদের সহজে গ্রহণ করেনি। একজন মহিলা কম্যান্ডার হলে, কখনও কখনও অন্য সদস্যরা পুরুষ ডেপুটি কম্যান্ডারকে রিপোর্ট করত। এই বিষয়গুলো, এই ধরনের মিটিং-এ এবং লিঙ্গ বিষয়ক আলোচনার জন্য ধার্য মহিলাদের মিটিং-এ আলোচনা হত। কিছু মহিলা কমরেড দৃষ্টান্তমূলক ভূমিকা রাখে ও অন্যদের পিতৃতান্ত্রিক আচরণ দূর করতে অনুপ্রাণিত করে। পার্টির নেতৃত্ব ধৈর্য ধরে মহিলাদের কথা শুনেছে এবং মহিলাদের আত্মবিশ্বাসী, স্বাধীন ও দৃঢ় হয়ে উঠতে সাহায্য করার জন্য পদক্ষেপ নেয়। ছোট ছোট বিষয়ও নজর দেওয়া হয়। যেমন প্রথমে মহিলা গেরিলারা যে প্যান্ট পরত, সেগুলি পুরুষদের প্যান্টের মতোই ছিল। পরে মহিলারা মনে করে যে চেন দেওয়া প্যান্টের থেকে ইলাস্টিক দেওয়া প্যান্ট তাদের জন্য বেশি সুবিধাজনক, সেটা সঙ্গে সঙ্গে বদলে দেওয়া হয়। লড়াইয়ে ময়দানে বেশিরভাগ মহিলা চুল ছোট করে কেটে রাখেন। কেউ যদি এমন কোন জোকস্ বলে যেখানে পিতৃতান্ত্রিক বক্তব্য রয়েছে, তার সমালোচনা করা হয়। আগে সব গানই পুরুষ হিরো-দের উদ্দেশ করে গাওয়া হত। এখন সেটা অনেকটাই শুধরে নেওয়া হয়েছে। পুরনো গানের শব্দ বদলে আবার লেখা হয়েছে। নতুন গান লিঙ্গ-সংবেদনশীল হয়েছে। গ্রামগুলিতে প্রকাশ্যে এবং সংগঠনের ভিতরে শুদ্ধিকরণ প্রচারাভিযান চালান হয়েছে। গ্রামের গণসংগঠনগুলিকেও এধরনের ক্যাম্পেন চালানোর পরামর্শ দেওয়া হয়। নেতৃত্ব জনগণের সামনে দৃঢ়তার সঙ্গে আত্ম-সমালোচনা করে দৃষ্টান্ত তৈরি করে।      

আমরা আপনার রাজনৈতিক যাত্রা সম্পর্কে জানতে চাইব, আপনি কীভাবে রাডিক্যাল বাম আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হলেন? একজন দলিত মহিলা হিসেবে বিভিন্ন সংগঠন ও গণ আন্দোলনে অংশগ্রহণের অভিজ্ঞতা কেমন? আপনার কী কখনও মনে হয়েছে আপনার লিঙ্গ পরিচয়ের কারণে আন্দোলনে আপনার ভূমিকাকে ছোট করে দেখা হচ্ছে?

আমি বস্তুতঃ বই পড়ে প্রভাবিত হই, বিশেষত প্রগতিশীল উপন্যাস পড়ে। আমাদের বন্ধুদের মধ্যে সেই উপন্যাসগুলো নিয়ে তর্ক-বিতর্ক চলত। তেলুগুতে প্রচুর প্রগতিশীল সাহিত্য রয়েছে। ব্যাঙ্কে চাকরি পেয়ে আমি আমার দেশের বাড়ি ছেড়ে হায়দ্রাবাদে আসি। তার ছ’বছর পর আমার রাডিক্যাল আন্দোলনের লোকজনের সঙ্গে আলাপ হয়। প্রথমে আমি নাগরিক আন্দোলনে সঙ্গে যুক্ত হই ও পরে নারী আন্দোলনে যোগ দিই। জাতি ব্যবস্থা বিলোপ করার লড়াইয়ের জন্য রাজ্যব্যাপী সংগঠন তৈরি হলে আমাকেও সেখানে জনসভায় বক্তব্য রাখতে ডাকা হয়। ঘটনাক্রমে সেটা হয় সেই বিজয়ওয়াড়া শহরে যেখানে আমি ব্যাঙ্কের চাকরির জন্য ইন্টারভিউ দিতে গেছিলাম। ইন্টারভিউ বোর্ড-এ ব্রাহ্মণরা ছিল। আমার জাতিগত পরিচয়ের কারণে তারা আমাকে ভয়ানক অপমান করে, যতদূর অপমান করা যায়। তাদের মধ্যে একজন আমাকে জিজ্ঞেস করেছিল আমাদের দেশে কারা ‘তোমার মতো অচ্ছুত’-দের উন্নতির জন্য কাজ করেছে। আমি বলেছিলাম আম্বেদকর। সে অসম্ভব রেগে উঠে বলে, ‘তুমি মহাত্মা গান্ধীর কথা কি করে ভুলে গেলে, যার জন্য তুমি আজ আমার সামনে এই চেয়ারে বসতে পেরেছ?’ সে আমাকে লেকচার দিতে থাকে এবং প্রতিবারই আমাকে ‘তোমার মতো অচ্ছুত’ বলে সম্বোধন করে। আমি চুপচাপ সহ্য করি। আমি জনসভায় এই ঘটনার কথা বলি। সেদিন অত বিশাল সংখ্যক মানুষের সামনে ব্রাহ্মণ্যবাদী ও হিন্দুত্ব শক্তিকে চ্যালেঞ্জ করতে পেরে খুব ভাল  লেগেছিল, মুক্ত লেগেছিল। সেই মিটিং-এ আমি আবেগতাড়িত হয়ে পড়েছিলাম। এইসব সভাসমিতিতে অংশগ্রহণ আমার আত্মবিশ্বাস ও আত্মসম্মান বাড়িয়েছে। সংগঠনে যুক্ত হওয়ার আগে আমি চুপ করে বৈষম্য সহ্য করেছি। কিন্তু আন্দোলন আমাকে দৃঢ়তার সঙ্গে সেগুলির মুখোমুখি হওয়ার সাহস দিয়েছে, আমাকে আমার নিজের মতো হয়ে ওঠার জোর দিয়েছে।  

লিঙ্গ পরিচয়ের কারণে আমার ভূমিকাকে ছোট করে দেখা হচ্ছে বলে আমার কখনও মনে হয়নি। বরং আমি অনেক সম্মান পেয়েছি। তাছাড়া, আমি লাগাতারভাবে নারী আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত থেকেছি। আমি নব্বই দশকের গোড়ার দিকে যুক্ত হই, সেই সময়ে আন্দোলন অনেকটা লিঙ্গ-সংবেদনশীল হয়েছে। 

আন্দোলনের মধ্যে নারী সংহতি ও পারস্পরিক আস্থা গড়ে অভিজ্ঞতার কথা জানতে চাইব। আন্দোলন কী ধরনের কেয়ার নেটওর্য়াক বা বিকল্প সাপোর্ট স্ট্রাকচার তৈরি করেছে?

আমি আগেই বললাম মহিলা  সাব-কমিটি আছে, এছাড়া মেয়েদের আলাদা করে মিটিং হয়। কোনও কোনও রাজ্যেও মহিলা সাব-কমিটি রয়েছে। কোনও মহিলা কমরেড যদি লিঙ্গ-বৈষম্যের স্বীকার হয় সে তার কমিটিতে সেবিষয়ে সমালোচনা করতে পারে। কমিটি যদি সমাধান করতে ব্যর্থ হয়, তাহলে সবসময়ই উচ্চতর কমিটিতে যাওয়ার সুযোগ রয়েছে। উচ্চতর কমিটি এই বিষয়গুলিকে সংবেদনশীলতার সঙ্গে দেখে এবং যখনই এরকম কোন ইস্যু সামনে আসে, সদস্যদের সচেতনতার মাত্রা বাড়াতে ও শিক্ষিত করতে সার্কুল্যার বের করা হয়। 

ভারতে, বিশেষত গত দশকে এলজিবিটিক্যিউআইএ+ আন্দোলন অনেকটাই এগিয়েছে। কিন্তু বাম আন্দোলনের মধ্যেও এই ইস্যুতে একটা বড়রকমের অস্বস্তি দেখা যায়, কারণ তারা অনেকেই মনে করে হেটেরোনরম্যাটিভিটি-র বাইরে যা কিছু তার সবটাই বিচ্যুতি। আমাদের অভিজ্ঞতা বলছে এই আন্দোলনগুলির অনেকেই বাম চিন্তাধারায় বিশ্বাসী কিন্তু তারপরও দুই আন্দোলেনর মধ্যে বড়সড় একটা ফাঁক থাকছে। এবিষয়ে আপনার মতামত জানতে চাইব। 

হ্যাঁ, এটা সত্যি। কিন্তু আন্দোলন সবসময়ই প্রান্তিক যৌনতা ও লিঙ্গ পরিচয়ের মানুষদের ওপর হিংসা ও বৈষম্যকে নিন্দা করেছে। এখন শহর এলাকায় মহিলা সংগঠনগুলি রূপান্তরকামী গোষ্ঠীদের সঙ্গে কাজ করছে। অন্তত হায়দ্রাবাদের ক্ষেত্রে এটা আমি বলতে পারি। এখন এই বিষয়গুলিতে ধ্যানধারণা ও বোঝাপড়া আগের থেকে অনেকটাই ভাল হয়েছে বলে আমার মনে হয়। আমি মনে করি, একটা সমাজে অসাম্য যখন এতটাই বেশি, সেখানে বিভিন্ন পরিচয় আন্দোলন গড়ে উঠবে। আন্দোলনকে সেটা বুঝতে হবে এবং যে ব্যবস্থা এই সমস্ত বৈষম্যের জন্ম দেয় সেই ব্যবস্থার ভিত্তিকে ধ্বংস করে এই সমস্ত বৈষম্যকে দূর করতে হবে, শেষ পর্যন্ত সেটাই লড়াই। কিন্তু তার আগে আন্দোলনকে এই ফাঁকটা পূরণ করতে বহুদূর যেতে হবে। দৃষ্টিভঙ্গীর বিকাশ একটা চলমান পদ্ধতি। বিদ্যমান সামাজিক পরিবেশও সর্বহারা দৃষ্টিভঙ্গী তৈরিতে ভূমিকা রাখে। মেট্রো শহর, এলিট শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত শ্রেণির সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল ছোট শহর, গ্রামীণ এলাকা ইত্যাদি থেকে অনেকটাই আলাদা। বর্ণ, ধর্ম, এলাকা ইত্যাদির ভিত্তিতে সেটা বদলে বদলে যায়। তাই একই প্রগতিশীল অথবা বিপ্লবী মানদণ্ড সব জায়গায় ব্যবহার করা যায়না। পরিবর্তিত সময়ের সঙ্গে সঙ্গে দৃষ্টিভঙ্গী পরিবর্তন করতে হবে, কিন্তু বাস্তবে প্রয়োগের সময়ে সাংস্কৃতিক তফাৎ ইত্যাদি মাথায় রাখতে হবে, নাহলে, আমরা ‘প্রগতিশীল’ ও ‘বিপ্লবী’ দৃষ্টিভঙ্গী জনগণের মধ্যে নিয়ে যেতে ব্যর্থ হব।     

কমিউনিস্ট আন্দোলনে স্টাডি সার্কেল-এর একটা বড় ভূমিকা রয়েছে। এই ক্লাসগুলিতে লিঙ্গ সম্পর্কিত বিষয়গুলো কীভাবে উঠে আসে? কলোনতাই, ক্লারা জেটকিন—এর মতো মহিলা বিপ্লবীদের কাজ ও অভিজ্ঞতা এই ক্লাসগুলোতে কীভাবে পড়া হয়? 

গণসংগঠনগুলিতে স্টাডিক্লাস এবং স্কোয়াড/প্লাটুন/কোম্পানি-তে স্টাডি আওয়ার ওবিভিন্ন বিষয়ে রাজনৈতিক ক্লাস আন্দোলনের নিয়মিত বিষয়। মার্কসবাদের প্রাথমিক বই, বিপ্লবের নীতি ও কৌশল ইত্যাদি পড়া হয়। নারী প্রশ্নে দৃষ্টিভঙ্গী, আন্দোলনে মহিলাদের অংশগ্রহণের ইতিহাস, ক্লারা জেটকিন, রোজা লুক্সেমবার্গ, কলোনতাই-এ মতো মহান মার্কসবাদী নেতৃত্বের জীবন, আন্তর্জাতিক নারীদিবসের ইতিহাস, নারীবাদী আন্দোলনের বিভিন্ন ধারা ইত্যাদি সেখানে আলোচিত হয়। আদিবাসী ভাষা গোন্ডি, কুয়্যি ও সাঁওতালি ভাষায়ও পড়ানো হয় এগুলি। একই বিষয়ে বিভিন্ন স্তরেও পড়ানো হয়ে থাকে। কোনও সমস্যা তৈরি হলে গ্রুপ ডিসকাশন-ও করা হয়ে থাকে।

শেয়ার করুন

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *