এ শুধু এই ফসলের লড়াই নয়, এ বহু প্রজন্মের লড়াই…

দিল্লিতে চলমান কৃষক আন্দোলন আসলে বহু বছরের পুঞ্জীভূত ক্ষোভের, বহু বছরের সংগ্রামের ইতিহাসের, আপসহীন লড়াইয়ের বিস্ফোরণ। লড়াইয়ের ময়দান থেকে বিকেইউ ক্রান্তিকারির অন্যতম নেত্রী সুখবিন্দর কৌরের কথায় উঠে এল কৃষকদের এই জানকবুল লড়াইয়ের বিভিন্ন চিত্রকল্প। তিনি বললেন গ্যাট চুক্তির ফলে পাঞ্জাবের কৃষিক্ষেত্রে যে সংকট এসেছে, সেখানে মেয়েদের ভূমিকা নিয়ে। বললেন পাঞ্জাবের ইতিহাসে ফুটনোট হয়ে থাকা লড়াকু মেয়েদের কথা। দুর্গা ভাবির কথা। ভাগোর কথা। গুলাব কৌরের কথা। মাহিন্দর কৌর, কেবল কৌরদের কথা। বললেন সিংঘু বর্ডারে সংগ্রামরত মেয়েদের গল্প। ছায়াছবির চিত্রনাট্যের থেকে কম রোমহষর্ক  নয়, এমন বিভিন্ন লড়াইয়ের দৃশ্য তিনি দেখালেন, যে সব লড়াই শাসকের ভিত নড়িয়ে দিয়েছে। সিংঘু বর্ডারে নারীদিবসের প্রস্তুতির ব্যস্ততার মধ্যে কথা বললেন ঝিলমের সঙ্গে

আপনি আপনার ব্যক্তিগত-রাজনৈতিক জার্নি নিয়ে যদি কিছু বলেন, আপনি কীভাবে আন্দোলনে এলেন, আপনি বিকেইউ (ক্রান্তিকারী)-র সঙ্গে কীভাবে যুক্ত হলেন?

সুখবিন্দর কাউর, বিকেইউ (ক্রান্তিকারী)

আমি অনেক আগে থেকেই আন্দোলনে আছি। আগে ছাত্রাবস্থায় ছাত্র সংগঠনে ছিলাম। তারপর কৃষক আন্দোলনে আসা, পাঞ্জাবে অনেকদিনে আগে থেকে এই আন্দোলনে যুক্ত।

আন্দোলনে মহিলাদের অংশগ্রহণ কেমন সে বিষয় যদি কিছু বলেন

একটা সময় ছিল যখন আমরা খুব চেষ্টা করতাম কিন্তু মহিলাদের আন্দোলনে তেমন পাওয়া যেত না। এখন আর সেই পরিস্থিতি নেই। এখন অনেক মহিলা যোগদান করছেন। তাঁরা নেতৃত্ব দিচ্ছেন, কথা বলছেন। একটা সময়ে ছিল যখন কেউ কথা বলার ছিল না। মহিলারা নেতৃত্বে আসতেন না। এখন আর সে সমস্যা নেই। বিশেষ করে এই যে কৃষক আন্দোলন হচ্ছে, এখন তো অনেক অনেক মহিলা যোগ দিচ্ছেন। মহিলারা নিজেরাই সামনে আসছেন। গ্রামে কমিটি বানাচ্ছেন, দিল্লি যাচ্ছেন। আর এখানে যে রাস্তা, টোল প্লাজা অবরোধ হচ্ছে সেখানেও প্রচুর মহিলা অংশ নিচ্ছেন।  

এই পরিবর্তনটা কীভাবে সম্ভব হল? এই যে আগে মহিলারা সেভাবে আসতেন না কিন্তু এখন এত মহিলারা অংশগ্রহণ করছেন।

আমার এখানে দু-তিনটে কথা মনে হয়। এক, পাঞ্জাবে গণ সংগঠনের একটা লম্বা ইতিহাস আছে। লাগাতার ভাবে লোকজনের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানোর জন্য কাজ হয়েছে। আরও একটা ব্যাপার আছে, যখন এই কৃষির সংকট দেখা দিল, পাঞ্জাবে একটা ব্যাপার ঘটল। মেয়েরা অনেক পড়াশোনা করতে শুরু করল। তারা বাইরে যেতে শুরু করল, পুরো পরিবারকেও নিয়ে গেল তাদের সঙ্গে। মহিলারা যে সংকটের সময়ে পরিবারের পাশে দাঁড়াতে পারে সেই ভাবনা সমাজে প্রতিষ্ঠিত হল, স্বীকৃতিও পেল। একটা সময় ছিল যখন মেয়েদের বাইরে বেরনোতে বাধা ছিল। একা যাতায়াত করতে দেওয়া হত না, স্কুলে ছেড়ে দিয়ে আসা হত, কলেজে ছেড়ে দিয়ে আসা হত। এই ব্যাপারগুলো অনেক কমে গেল। মেয়েরা দেখিয়ে দিল যে আমরা একা যেতে পারি, আমরা করে দেখাতে পারি, আমরা প্রতিষ্ঠিত হতে পারি। পুরো পরিবারের পাশে দাঁড়াতে পারি। এই কৃষি সংকটে অনেক পরিবারে মেয়েরা এই ভূমিকা নিয়েছে। প্রচুর পরিশ্রম করে তারা এই কাজ করেছে। গরিব ঘরের মেয়েরা প্রচুর পরিশ্রম করেছে। তাদের এই ভূমিকা একটা মান্যতা এনে দেয়। সামগ্রিকভাবে পড়াশোনা ইত্যাদিতেও ভূমিকা রেখেছে। একটা খারাপ দিকও আছে। অনেকেই মেয়েদের পড়াশোনার জন্য টাকা খরচ করে শুধু মেয়েদের বিয়ের কথা মাথায় রেখে। এটা একটা নেগেটিভ দিক। কিন্তু মেয়েরা যে অনেকে কিছুই করতে পারে তার স্বীকৃতি পাওয়া গেছে। 

আর বর্তমান আন্দোলন যে শুরু হল, তার আগে আমরা অন্য একটা আন্দোলনে ছিলাম। অন্য এক রকম মহিলাদের আন্দোলন। মাইক্রোফিন্যান্স কোম্পানিগুলো গ্রামের মহিলাদের যে ধার দিয়েছিল, লকডাউন হওয়ার ফলে মহিলারা সেটা ফেরত দিতে পারছিল না। কোম্পানিগুলো সেই টাকা উসুল করতে চাইছিল। আমরা তাদের বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু করি। প্রচুর মহিলা পথে নামে। তার কিছুদিনের মধ্যেই এই আন্দোলন শুরু হয়ে যায়।

সংগঠনগুলোতে মহিলাদের অবস্থা কেমন? মহিলাদের অংশগ্রহণ কেমন?

দেখুন আমাদের সমাজে তো পুরুষের আধিপত্য রয়েছেই। পাঞ্জাবের ইতিহাসেও যদি দেখেন, পুরুষদেরই আধিপত্য। মহিলাদেরও ভূমিকা রয়েছে কিন্তু সেগুলো নিয়ে অত কথা হয় না। ঐতিহাসিকভাবে যে পুরুষ আধিপত্য সেখানে মহিলাদের ভূমিকাকে অত স্বীকৃতি দেওয়া হয় না। যখন সংগঠন তৈরি হয়, স্বীকৃতি পাওয়া ইত্যাদির জন্য খানিক লড়াই করতে হয়। একবার আপনি এগিয়ে গেলে, ঠিক আছে, তার পর ধীরে ধীরে স্বীকৃতি পাওয়া যায়। কিন্তু পরিবার, ঘর, বাচ্চা এসবের থেকে বেরনো অত সহজ না। তাও মেয়েরা বেরোচ্ছে। আর ইউনিভার্সিটিতে যেসব মেয়েরা পড়ে তারা খুবই ভাল কাজ করেছে। পাঞ্জাব ইউনিভার্সিটি (চণ্ডিগড়) আর পাঞ্জাব ইউনিভার্সিটি (পাতিয়ালা) দুটোতেই ‘পিঞ্জরা-তোড়’ এর ভাল ভূমিকা ছিল। সেই মেয়েরা তারপর কাগজে লিখতে শুরু করে, তাদের বিরুদ্ধে কেস হয়, তাদের জন্য লোকে রাস্তায় নামে। এই সব মিলে যত সংকট বাড়ছে, তত লোকে বুঝতে পারছে যে আমাদের লড়তে হবে। মহিলারাও সেটা বুঝতে পারছে। এবং লড়াইয়ের মর্যাদাও পাওয়া যাচ্ছে। 

১৯৯১তে যখন ডাঙ্কেল প্রস্তাব এল, ওটা পড়ে আমরা তখন গ্রামে গেছিলাম। আমরা বললাম, এটা তো খুব খারাপ, চাষের জন্য খুব ক্ষতিকর, এটার বিরোধিতা করা উচিত। কিন্তু লোকজনের মধ্যে খুব একটা প্রতিক্রিয়া ছিল না। কিছু শিক্ষিত লোক আমাদের সঙ্গে তর্ক করত, বলত আমরা বেশি বেশি প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছি। তাদের বক্তব্য ছিল, সরকার ব্যর্থ হয়েছে, বেসরকারি সংস্থা এলে ভালই হবে। সেই সময়ে সার্ভিস সেক্টরও সরকারের হাতে ছিল। সরকারি সার্ভিস সেক্টরের বেসরকারিকরণ হলে কী হয় মানুষ দেখেছে। তারা দেখছে বিএসএনএল-এর কী হয়েছে, স্কুলগুলোর কী হয়েছে, স্বাস্থ্য পরিষেবার কী হয়েছে, স্যানিটেশন-এর কী হয়েছে। সব ডিপার্টমেন্টই তো বেসরকারি হয়ে গেছে। এসব দেখে তাদের মধ্যে এই সচেতনতা এসেছে যে কৃষিতে যদি বেসরকারি সংস্থা চলে আসে তাহলে এখানেও কিছু বাঁচবে না। যেমন আমি আপনাকে একটা উদাহরণ দিই। আমাদের আগে যে চাকরি-বাকরি ছিল, যে অফিসে জল খাওয়ানোর কাজ করে তারও মাইনে ৩০-৩৫ হাজারের কম নয়। যাদের স্থায়ী চাকরি, যত বেশিদিন কাজ করছে তত বেশি বেতন। অন্যদিকে আজকের পিএইচডি করা একজন, সে কলেজে পড়াতে যায়, ফ্যাকাল্টি। সে মাসে পায় ২১,৪০০ টাকা, তারও অনেকটাই হাতে আসে না। এগুলি লোকে দেখছে, সহ্য করছে। একটা জিনিস যা কৃষকদের এতটা লড়াইমুখী করেছে, তা হল, এটা আমাদের শেষ সুযোগ। জমিই তো শুধু রয়েছে আমাদের বাকি, সব তো বেসরকারি হয়ে গেছে। আর এটা সবুজ বিপ্লবের এলাকা হওয়ায় এখানে এমএসপি ছিল। এখন এই এমএসপি থাকবে না। দাম অর্ধেক হয়ে যাবে। এটা সহ্য করা সম্ভব হবে না। এমনিতেই আত্মহত্যা করছে, ঋণের সমস্যা রয়েছে, বেকারত্ব এত বেশি। এই ফসলের দামও যদি অর্ধেক হয়ে যায়, আর আমাদের চাষের ওপর, পেস্টিসাইডের ওপর, ইনসেক্টিসাইডের ওপর কোনও নিয়ন্ত্রণ থাকবে না। আমাদের হাতে তো কোনও নিয়ন্ত্রণই নেই। ফসলের যে দাম এখন পাচ্ছি সেটাও থাকবে না, তাহলে কী করে চলবে? এই কারণেই সব কৃষক— মহিলা-পুরুষ সবাই— নিজেদের বিপদগ্রস্ত মনে করছে৷ আর কিছু বাঁচবে না।  আর একটা কথা হল কৃষির সঙ্গে আমাদের সংস্কৃতি জড়িয়ে আছে। আমাদের সাংস্কৃতিক যে পরিকাঠামো সেটা কৃষির ওপর ভিত্তি করে তৈরি। সব গান তৈরি হয় গ্রামকে ঘিরে, এখন সেই গ্রামই বিপদের মুখে। এই জন্য আমাদের গায়ক-গায়িকারা, সবাই প্রেম-ভালবাসার গান ছেড়ে কৃষকের গান গাইছে। দিল্লির সঙ্গে লড়াইয়ের গান গাইছে। কারণ তাঁদের জমি চলে যাচ্ছে। এখন অবধি দুশোর বেশি গান তৈরি হয়ে গেছে। এই গানগুলোর কিন্তু অনেকটাই ভূমিকা আছে। এইসব গান ব্যান হচ্ছে। এখানকার বড় বড় গায়করা যারা দু-ঘন্টা গান গাওয়ার জন্য লাখ লাখ টাকা নিত, তারা এখন ঝাড়ু নিয়ে এটা-সেটা পরিষ্কার করছে, সারাদিন ধর্নায় ঘুরে বেড়ায়। তারা গান বানাচ্ছে, গান গাইছে।

খুব প্রাথমিক জিনিসে হাত পড়েছে, আমাদের জমিতে। ফলে পুরো সমাজ আলোড়িত হয়েছে। দিল্লির সঙ্গে তো পাঞ্জাবের পুরনো শত্রুতা। এটা আমাদের সংস্কৃতিতেই রয়েছে। এই আন্দোলনের আগেও অনেক গান ছিল দিল্লিকে নিয়ে। এইসব কিছু মিলে এই লড়াই এই জায়গায় পৌঁছেছে আর মহিলারা এর বাইরে থাকতে পারেন না। সমাজের সব অংশ, বাচ্চা মহিলা সবাই, যোগ দিয়েছে। 

 জমির অধিকারের বিষয়ে একটু বলুন। কিছুদিন আগে সিজিআই যেমন বলল ‘মহিলাদের কেন এখানে রাখা হয়েছে?’ রাষ্ট্র মহিলাদের কৃষক বা কৃষি মজুর হিসেবে দেখে না, তাদের সেই স্বীকৃতি দেয় না। আমরা জানি ৭৫ শতাংশ মহিলা ক্ষেতে কাজ করেন, কিন্তু ১২ শতাংশের হাতে জমির অধিকার রয়েছে, তাদের নামে পাট্টা আছে। এই বিষয়গুলো নিয়ে আন্দোলনে কেমন চর্চা হচ্ছে বা এই আন্দোলনের পর এই নিয়ে লড়াইয়ের …..

এতে তো লোকজন খুবই রেগে গেছে। দেখুন, আমাদের ইতিহাস কী? যখন মুঘল আমলে লোক লড়েছে, মহিলারা যখন লড়ছে, তাদের সঙ্গে কী করা হয়েছিল? তাদের ছোট ছোট বাচ্চাদের কেটে, শরীরে অংশ দিয়ে হার বানিয়ে গলায় পরেছিল। কিন্তু মহিলারা নতি স্বীকার করেনি। 

এটা ঠিক যে মহিলাদের কৃষক হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়না, তাই আমরা বলি মেয়েরা ভূমিহীন কৃষক। তাদের সবকিছুই তো চাষকে ঘিরে, ঘরে যদি মহিলা না থাকে তাহলে পুরুষকে চাষ ছাড়তে হয়। জমির কাজ সে একা করতে পারবে না। ক্ষেত, ঘর, পশু—এসব নিয়ে পুরো একটা তন্ত্র আছে। একটার থেকে আর একটাকে আলাদা করতে পারবেন না। আর মহিলাদের এতে অনেক বড় ভূমিকা আছে। তাই মেয়েরা তো ভূমিহীন কৃষক, তাই না? সিজিআই-এর বক্তব্য নিয়ে অনেক বিরোধ হয়েছে, কেউ শোনেওনি। নারী হওয়ার বলেই আমরা লড়তে এসেছি, আমরা ফেরৎ যাব না। 

পুরুষের নামে জমি, কিন্তু মহিলদের তার থেকে আলাদা কী করে করবেন? তারাও তো ওই জমির ওপরই নির্ভরশীল। আমাদের পরবর্তী লড়াই হল মহিলাদের জন্য সম্পত্তির অধিকার আদায়। এখন তো আমরা মঞ্চেও বলে দিই, দেখুন মহিলাদের আত্মত্যাগ। তাদের নামে জমিও নেই। তাও লড়ছে। আপনাদের থেকে তারা বেশি আত্মত্যাগ করছে। লোকে এসব কথা ভাল ভাবে শোনে। 

 কৃষক আত্মহত্যার কথা বলছিলেন, খুবই সমস্যার মধ্যে…

 হ্যাঁ খুবই সমস্যা হয়। আপনি যদি পরিবারগুলোর কাছে যান, সেই গল্প আপনি শুনতে পারবেন না, যে তাদের সঙ্গে কী হয়েছে। খাওয়ারও কিছু থাকে না। পাঞ্জাবকে দেখে এমনিতে মনে হবে না যে এখানে লোক খেতে পায় না। কিন্তু যখন অনেক ঋণের বোঝা চেপে যায়, বাচ্চা আছে, মহিলা আছে…তখন পুরুষ আত্মহত্যা করে। মৃতদের বাড়ির মেয়েদের অবস্থার কথা বলে বোঝানো যাবে না। তারা কীভাবে জীবন কাটায়! তারা জামা কাপড় সেলাই করে। জমি থাকে না। সেলাই করে কী ভাবে সংসার চালাবে? অনেক মহিলা যাদের বাড়িতে পুরুষরা আত্মহত্যা করেছে, তারা সেই মৃতদের ছবি নিয়ে এখানে আসে। তারা আন্দোলনও করছে, সংসারও চালাচ্ছে, বাচ্চাদের দেখাশোনাও করছে, ঘরে পুরুষও নেই। এই সমাজও এরকম। প্রশ্ন ওঠে, কোথায় যাচ্ছে? রোজ বেরিয়ে যাচ্ছে? এই সব কথাও তারা সহ্য করে। প্রচুর আত্মত্যাগ।

 পাঞ্জাবে কর্পোরেটদের জমি অধিগ্রহণের বিরুদ্ধেও তো অনেক আন্দোলন হয়েছে…

 হ্যাঁ। এই আন্দোলনের তো এটা একটা জরুরি ব্যাপার যে যারা আমাদের জমি ছিনিয়ে নেবে তাদের বিরুদ্ধেই সরাসরি লড়াই হচ্ছে। দিল্লিতে ধর্না চলছে, পাশাপাশি কর্পোরেটদের দরজায়ও ধর্না চলছে। এখনও সব বন্ধ। টোল প্লাজা সব বন্ধ। বিশেষ করে আম্বানির যে সমস্ত ব্যবসা রয়েছে, তার সামনে লোক বসে আছে। চালাতে দিচ্ছে না। আমার শহরে ইজি-ডে (মাল্টি-চেইন স্টোর) আছে আমি তার সামনে দু মাস ছিলাম। তারপর ওরা একটা অর্ডার এনে দিল যে এখানে এখন আদানির কিছু কেনার অনুমতি নেই। ওখানে জায়গাও ছিল না। দশজনের বেশি বসতেও পারত না। অনেক ট্রাফিক ছিল তাও। কিন্তু তাও আমরা বসেছিলাম। তারপর অর্ডার এনে দিল আমাদের, তারপর আমরা উঠলাম। ওখানে আমাদের খুবই অসুবিধা হচ্ছিল কিন্তু তাও উঠিনি। শহরের ছোট দোকানদাররা খুব আনন্দ পেয়েছিল, তাদের জন্য খুব ভাল হল। এর ফলে শহরেও কৃষকরা সমর্থন পেয়েছে। 

 এই যে এই আন্দোলনে এত মহিলা সামনে এসেছে, অংশ নিচ্ছে, এটা নিয়ে যে এত আলোচনা হচ্ছে, এর কি কোনও প্রভাব পাঞ্জাবের পরিবারগুলোতে পড়ছে? ঘরের ভিতরের যে পিতৃতন্ত্র তার ওপর কি কোনও প্রভাব পড়ছে?

হ্যাঁ হ্যাঁ একদম। লোকে নিশ্চিন্তবোধ করে যে ঘরে ঝগড়াঝাঁটি কমে গেছে। কারণ মহিলারা নিজেদের মতো করে বাঁচার একটা সুযোগ পেয়েছে। এবং তাদের দৃষ্টিভঙ্গি প্রসারিত হয়েছে। এর ফলে বাড়িতে ছোট ছোট বিষয়ে যে সমস্যা হয় সেগুলি কম হয়ে যায়। প্রথম প্রথম তো ছেলেরা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগত যে মেয়েরা বাইরে যাবে, কথা বলবে, নিজে মতামত প্রতিষ্ঠিত করতে শুরু করে দেবে, তাহলে তাদের কী হবে? কিন্তু এখন সংসার ভালো ভাবে চলছে, সেখানে কাউকেই ছোট হতে হচ্ছে না। এতে সম্পর্ক মালিক-চাকরের না হয়ে খানিক সাম্যের দিকে যাচ্ছে। ফলে সেটা সম্পর্ককে ভালই করবে। ছোট ছোট ঝগড়া সেখানে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। সবাই বলছে, ভালই হয়েছে। শুরুর দিকে বিরোধ ছিল।

 সংসারে যে লিঙ্গভূমিকা, যেমন মহিলাদের বাইরে কাজ করে এসেও ঘরে রান্না করতে হয়, সেই সবে কোনও পরিবর্তন এসেছে?

এটা নিয়ে আমরা মজাও করি। এই যারা লঙ্গর চালাচ্ছে তারা সবাই পুরুষ। আমরা তাদের বলি, ‘মহিলাদের এবার ভাল হবে, তোমরা রান্না করা শিখে গেছ।’ তারা বলে, ‘হ্যাঁ, আমরা রান্না করা শিখে গেছি, এখন থেকে রেগে গেলে আর মান ভাঙ্গাতেও হবে না।’ যখন কোনও লঙ্গরে যাই, পুরুষরা খুব সম্মানের সঙ্গে আমাদের খাওয়ায়। আমি রান্না করব এরকম কোনও আশা করে না। এটাতো খুব ভাল, সব রান্না পুরুষরা করছে। এর একটা খুব বড় প্রভাব পড়বে। যেমন পাঞ্জাবে নেশার একটা বড় সমস্যা ছিল। অল্পবয়সীরা নেশা করত। ওভারডোজ হয়ে অনেকের মৃত্যুও হয়। একটা সময়ে খুব হতাশ লাগত। তারপর এই সমাজে আন্দোলন শুরু হল। এই আন্দোলন তরুণদের একদম বদলে দিয়েছে। তরুণদের একদম কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে। তরুণরাই এই আন্দোলনের শক্তি। আমরা জানতামই না আমাদের তরুণদের মধ্যে এতটা শৃঙখলা আছে।  

এই যে আমরা দিল্লি গেলাম, একজন পুলিসের গায়েও হাত ওঠেনি। আমরা শুধু ব্যারিকেড সরিয়েছি। সবাই খুবই শৃঙ্খলা বজায় রেখেছে। সবাই আমাদের সংগঠনের ছিল না। অনেককেই আমরা চিনি না। তারা দিল্লি যাওয়ার জন্য এসেছিল এবং সম্পূর্ণ শৃঙ্খলা বজায় রেখেছে। আমরা দেখছি তরুণরা রান্না করছে, ঝাঁট দিচ্ছে, ওয়াশিং মেশিন এনে রেখেছে। সকলের জামাকাপড় কেচে দিচ্ছে। 

তরুণরা একদম বদলে গেছে এবং সব বিষয়ে বক্তব্য রাখছে। কোনও কিছু ভুল মনে হলে তারা বলে। মঞ্চে কথা বলছে, গণমাধ্যমে কথা বলছে, সমাজমাধ্যমে কথা বলছে, পোস্টার নিয়ে দাঁড়াচ্ছে। আমি তো অবাক হয়ে যাচ্ছি দেখে যে পাঞ্জাবে এত সম্ভাবনা  ছিল! এরা আমাদের সঙ্গে যুক্ত হতে পারছিল না কোনও কারণে। আন্দোলনের আগে আমরা তাদের আকৃষ্ট করতে পারছিলাম না, এই আন্দোলন তাদের আকর্ষণ করেছে।  

আমাদের এখানে ট্রাক্টরে লেখা থাকে, ইয়ে ফসলো কা নেহি নসালো কা ভি মামলা হ্যায় (এটা শুধু এই ফসলের লড়াই নয়, এ বহু প্রজন্মের লড়াই)৷ লোকেরা নিজেরাই বুঝেছে। এটা কোনও সংগঠন বলে দেয়নি। মানুষ নিজেরাই লিখেছে। যার যেমন ইচ্ছে, কেউ ভগৎ সিংয়ের ছবি নিয়ে এসেছে, কেউ গুরু গোবিন্দ সিং-এর ছবি নিয়ে বসেছে, কেউ ব্যানারে কারও কোটেশন লিখে এনেছে। তরুণদের মধ্যে যে এই পরিবর্তন এসেছে, এটা একটা খুব ভাল ব্যাপার। আগে তারা নেশা করত, অশ্লীল গান শুনত, কোনও কাজ করত না। এখন সে সব একদম বন্ধ হয়ে গেছে। আমরা বুঝতে পারছি আমরা একটা বড় জয় হাসিল করতে পেরেছি। পাঞ্জাবে  আলোচনা হত যে আমাদের পরের প্রজন্ম হয় কানাডা যাবে নয়তো নেশা করবে, এর বাইরে কিছুই নেই। ভবিষ্যতে পাঞ্জাবের কী হবে! এখানে কে থাকবে! এই আন্দোলন এই বিষয়টাকে সম্পূর্ণ বদলে দিয়েছে। নতুন মূল্যবোধও তৈরি হয়েছে। 

আরও একটা কথা বলব। এখানে আমরা প্রায় তিন মাস রয়েছি। একটাও অভিযোগ আসেনি যেখানে মহিলাদের উত্ত্যক্ত করা হয়েছে। যেখানে প্রশাসনের তরফ থেকে মহিলাদের পাঠানো হয়েছে, সেখানে তারাও কোনও অভিযোগ করতে পারবে না। মহিলাদের তরফ থেকে আজ অবধি কোনও অভিযোগ আসেনি। আমি সিংঘুতে আছি। একটাও অভিযোগ শুনিনি। এটা একটা খুব ভাল ব্যাপার। মূল্যবোধে এত বড় একটা পরিবর্তন! এমন নয় যে পাঞ্জাবে এসব হয় না, কিন্তু এখানে হয়নি। আবার ঘরে ফিরে গিয়েও হয়নি। এই আন্দোলন আরও কতদিন চালাতে হবে জানি না। কিন্তু এই আন্দোলনের জন্য পাঞ্জাবের সমাজে অনেক ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে, এর ভালো প্রভাব অনেকদিন থাকবে। মানুষের চিন্তাভাবনা বদলে গেছে। এটা থাকবে।

 আপনি তো সিঙ্ঘুতে আছেন। সিঙ্ঘু, টিকরি, গাজিপুর— প্রতিটা জায়গার নিজস্ব চরিত্র আছে। এই প্রতিটা জায়গায় মহিলাদের অংশগ্রহণ নিয়ে কিছু বলুন।

 বড় ধর্না চলছে টিকরি আর সিঙ্ঘুতে। দুই জায়গাতেই বহু সংখ্যায় মহিলা রয়েছেন। টিকরিতে তো অনেক। কারণ টিকরিতে যে সংগঠন আছে, বিকেইউ (উগ্রহণ), তাদের মহিলাদের আগে থেকেই অনেক কাজ আছে। ওখানে মহিলা আন্দোলনকারীর সংখ্যা বেশি। সিংঘুতে বিষয়টা অন্য। সিঙ্ঘুতে শুধু সংগঠনের লোক নেই। অনেক সংগঠন এখানে আছে, কিন্তু শুধু সংগঠনেরই লোক নেই। নিজে থেকে আসা লোক অনেক এখানে। গ্রাম থেকে নিজের ট্রলি নিয়ে এসেছেন। মহিলাও এসেছেন অনেক। সংগঠনও নিয়ে আসে, নিজে থেকেও আসছে। টিকরি বেশি সংগঠিত আর এখানে নানা ধরনের লোক আছে। সত্যি পাঞ্জাব কোথায় আছে দেখতে গেলে বলতে হয় পাঞ্জাব সিঙ্ঘুতে আছে। এখানে পাঞ্জাবের সব এলাকার লোক আছে, সব ভাবনার লোক আছে, সব ধরনের লোক আছে। এখন টিকরিতেও বিষয়টা বদলাচ্ছে। খাপের নেতৃত্বে হরিয়ানা থেকে অনেকে ওখানে এসেছেন। সিঙ্ঘুতেও হরিয়ানা থেকে এসেছেন মানুষ। মহিলা নেত্রী টিকরিতে বেশি আছে। এখানেও আছে। কৃষক সংগঠনের মহিলা নেতৃত্ব টিকরিতে বেশি। এখানেও অনেক মহিলা নেতৃত্বে রয়েছেন। অনেক অল্প বয়সের মেয়েরা আছে। যেমন একজন নিউজিল্যান্ড থেকে চলে এসেছে। এয়ারপোর্ট থেকে সোজা সিঙ্ঘু চলে এসেছে। এরকম লোকও আছে। আমাদের এক সাথীর মেয়ে এসেছিল। অনেকদিন এখানেই ছিল। তারপর বাড়ি চলে গেছে। 

উৎসবের মতো হয়ে গেছে…

হ্যাঁ, উৎসবের মতো হয়ে গেছে। সকলকে অংশ নিতে হবে। এখানে শুরু থেকে একটা জিনিস আছে। উপর উপর শুধু নয়,  গভীরে লড়াই করার একটা জোরদার আবেগ আছে। শৃঙ্খলাও আছে।

হ্যাঁ তিনমাস ধরে চলছে…

হ্যাঁ ধৈর্য ভাঙতে পারে। আমিও জানতাম না মানুষ এতদিন ধর্না চালাতে পারবে। সংগঠনগুলো এই ধারণাটা তৈরি করেছে যে আমাদের অনেক দিন ধরে বসে থাকতে হবে, আর শান্ত হয়ে বসে থাকতে হবে। এখন তো গ্রামে গ্রামে মানুষ গ্রাম স্তরের কমিটি বানিয়েছে। সেখানে গ্রামের সব সংস্থা রয়েছে। জমির হিসেবে তারা চাঁদা তুলেছে, গ্রাম থেকে প্রতি সপ্তাহে একটা করে গাড়ি যাবে। নতুন লোকদের ছেড়ে আসবে আর পুরনোদের ফিরিয়ে আনবে। জীবনের অঙ্গ হয়ে গেছে এটা। আগে আমাদের ভাবতে হত যে আমাদের লোকদের নিয়ে আসতে হবে। লোকে এখন আমাদের সেই চিন্তা দূর করে দিয়েছে। প্রতিটা গ্রামে আমাদের এই সংগঠন থেকে স্বতন্ত্র কমিটি তৈরি হয়ে গেছে। এই আন্দোলনের জন্য। তাদের একটাই কাজ। চাঁদা সংগ্রহ, লোকদের প্রস্তুত করা আর তাদের পাঠানো। যে গাড়ি যাবে সেটা পুরনো। যারা কয়েক সপ্তাহ আগে গেছে তাদের নিয়ে আসবে আর নতুনদের ছেড়ে আসবে। আবার পরের সপ্তাহে যাবে।

 দেখছিলাম চাষের কাজও সেভাবেই ভাগ করা হয়েছে…

 হ্যাঁ। যারা ধর্নায় রয়েছেন তাঁদের জমির কাজ অন্যরা দেখছে। সামনে মরশুম আসছে। গম কাটার সময়, ধানও রুইতে হবে। ফসল কাটার পর কিছুটা ফাঁকা সময় থাকবে। তখনও এরকমই হবে। যারা এখানে থাকবে তাদের যদি কোনও কাজ থাকে তাহলে সেটা অন্যরা করে দেবে। আমার মনে হয় কৃষকদের মধ্যে এই সংস্কৃতি সব জায়গাতেই আছে। 

এই আন্দোলনে তো বিভিন্ন সংগঠন রয়েছে, খাপও রয়েছে। আমরা জানি খাপের একটা পিতৃতান্ত্রিক ঐতিহ্য রয়েছে। এটার সঙ্গে আপনারা কীভাবে মানিয়ে চলছেন?

দেখুন, খাপদেরও এখানে নতুন রূপ। অনেক মহিলা ট্রাক্টর চালিয়ে আসছে। আমরা এখন এখানে একসঙ্গে রয়েছি। আমরাও খাপদের সম্পর্কে শুধুই খারাপই ভাবতাম। এই নেগেটিভ বিষয়টা এই আন্দোলনে একটা পজিটিভ জিনিস হয়ে গেছে। আপনি যদি খাপদের মহাপঞ্চায়েত দেখেন, বহু সংখ্যক মহিলারা সেখানে আসছে। ঘোমটা সরিয়ে জোরদার ভাষণ দিচ্ছে। আমরা যে ট্রাক্টর মিছিল করেছিলাম সেখানে অনেক ট্রাক্টর হরিয়ানা থেকে মহিলারা চালিয়ে এসেছিলেন। এখন পাঞ্জাব আর হরিয়ানা একসঙ্গে ধর্নায় রয়েছে, সেখানে সাংস্কৃতিক আদানপ্রদানও হচ্ছে। আমরা একসঙ্গে খেতে যাই মহিলারা। কোনও দিন হয়তো ঠিক করলাম হরিয়ানার লঙ্গরে যাব। ওরাও এখানে লঙ্গর খুলেছে। সেখানে খেতে গেলে খুবই সম্মান দেয়। এরকম কোনো মনোভাব দেখায় না যে মহিলারা এখানে কেন! এভাবেও কোথাও একটা গিয়ে পিতৃতন্ত্রকে পিছু হটতে হচ্ছে। কিছু না কিছু ইতিবাচক পরিবর্তন তো আসবে। যতটা সম্ভব। কারণ খাপ খুব সংগঠিত। কতটা হবে জানিনা, কিন্তু সাংস্কৃতিক প্রভাব তো পড়বেই। খাপ, যাদের সম্পর্কে পুরোটাই খারাপ ভাবনা ছিল, সেই খাপই আমাদের এখানে আবার বসার সুযোগ করে দিয়েছে। 

দমন-পীড়ন যেমন  বাড়ছে, জল, বিদ্যুৎ, ইন্টারনেট, সব বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল..

লোকে খুব ধৈর্য ধরে সেগুলো সহ্য করেছে। একে তো আমাদের কাছে কোনও খবরই আসছিল না কী হচ্ছে। ফোন করে জানতে হচ্ছিল কী চলছে। ইন্টারনেট ছিল না। ২৬ তারিখ কাগজের অফিস বন্ধ ছিল, ২৭ তারিখের খবরও কোনও খবরের কাগজে আসেনি। তার উপর ইলেকট্রনিক মিডিয়া ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। যারা বাড়িতে ছিল তাদের মধ্যে উৎকন্ঠা ছড়িয়েছিল। এখানে আমরা কীভাবে থাকছি! হামলা হয়ে যেতে পারে! এখান থেকে সবাই বলে, ‘হামলা হবে না। আমরা ভাল আছি। আমরা আমাদের রক্ষা করব। ভয় পেয়োনা। সব ঠিক আছে। খাবার আছে। লঙ্গর আছে।’ দু-তিন রাত তরুণরা রাতে পাহারা বসিয়েছিল। হরিয়ানা এতে যে ভূমিকা নেয় সেটা তো ঐতিহাসিক। ওরা ট্রলি নিয়ে চলে আসে। বলে কেউ পাঞ্জাবকে কিছু করবে না। আমাদের লাশের ওপর দিয়ে যেতে হবে। এটা পুরো পরিস্থিতি বদলে দেয়। মানুষ অনেক ধৈর্য দেখিয়েছেন। এই আন্দোলন দেখিয়েছে মানুষ কত বুদ্ধিমান। আমাদের নামে নানা অপপ্রচার করা হয়েছে। কখনও খালিস্তানি বলা হয়েছে, কখনও মাওবাদী বলা হয়েছে। কী না বলেছে! কিন্তু কিছুই কাজ করেনি। মানুষ বলেছে,  ‘হ্যাঁ, বেশ, আমরা এই সবকিছু। কিন্তু এই যে তিনটে বিল আছে সেগুলো প্রত্যাহার কর।’

সেদিন দেখছিলাম শামলি যাওয়ার কথা ছিল বিজেপি নেতাদের। একটাই গ্রামে গেছিল। তাকে তো কেউ কথাই বলতে দিচ্ছে না। সবাই বলছে যাও গিয়ে বল বিল প্রত্যাহার করতে আর এমএসপি দিতে। অন্য গ্রামে তো আর যায়ই নি। আপাতত তো এদের একেবারে কোণ-ঠাসা করে দেওয়া গেছে। পরে কী হবে জানি না। এত বড় দেশ। এত বাহিনী আছে, এত কিছু আছে। এখন অবধি তো আমরা বিজেপিকে ভাল মতো চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছি। এবার আপনারা বাংলার লোকরা বলবেন যে কতটা চ্যালেঞ্জ করা গেছে। সবাই আপনাদের নির্বাচনের দিকে তাকিয়ে আছে।

হ্যাঁ আমাদের এখানেও বিজেপি রথযাত্রা করছে, লোক সেভাবে হয়নি…

বাহ! এতো খুব ভাল কথা। কৃষকরা তো আসলে সমাজের ভিত্তি। তাকে যদি তুমি উপড়ে ফেলতে চাও, তাহলে এটাই হবে। আরেকটা কথা হল মানুষের মনে ক্ষোভ জমে ছিল। বিভিন্ন জিনিস নিয়ে প্রচুর রাগ ছিল। কিন্তু সেটা বেরোনোর কোনও পথ পাচ্ছিল না। এই যে পুরো ন্যারেটিভ ছিল যে মোদি অপরাজেয়, সেটা সরাসরি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে।

এই আন্দোলন বিভিন্ন বিষয়কে একসঙ্গে যুক্ত করেছে। রাজনৈতিক মুক্তির দাবিও উঠেছে এই আন্দোলনে। আওয়াজ উঠেছে সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে। এইসব বিষয়গুলো একসঙ্গে যুক্ত হওয়াও বোধহয় সরকারকে চ্যালেঞ্জ দিয়েছে।

একদমই। এই জিনিসগুলো নিয়ে মানুষকে কথা বলতে দিচ্ছিল না, এখন এগুলো নিয়ে লোকে কথা বলছে। আর একটা ব্যাপারও আছে। পাঞ্জাবের লোক সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে আছে। আর দেশের সঙ্গে খুব সম্পৃক্তও। আমরা এখানে ট্রাক্টর মিছিল করলাম, কানাডাতেও হল, ইউকে-তে হল। এতে আন্দোলনের একটা বড় সাহায্য হয়েছে। ওখানকার সংগঠনগুলোও আমাদের সমর্থন করছে। আমি কালই পড়ছিলাম আমেরিকার সাতাশিটা কৃষক সংগঠন সমর্থন করছে। সুপারলিগ-এ সিঙ্ঘু বর্ডার দেখাচ্ছে ত্রিশ সেকেন্ড-এর জন্য। বিশ্বের কাছে একটা বার্তা গেছে যে মোদি সরকার অন্যায় করছে। কৃষকদের দাবি সঠিক। তাদের আন্দোলন সঠিক। নীতিগত ভাবে আমরা জিতে গেছি। নীতিগত ভাবে আমরা বিশ্বের কাছে প্রতিষ্ঠিত করেছি যে আমাদের দাবি ঠিক। 

ঐতিহাসিকভাবে পাঞ্জাবের যে কৃষক আন্দোলন হয়েছে, জমির আন্দোলন, সেখানে মেয়েদের অংশগ্রহণ কেমন ছিল? যেমন আমরা দেখেছি তেভাগা হোক বা নকশালবাড়ি কিংবা সিঙ্গুর নন্দীগ্রামের সময়ও মহিলারা একদম সামনে থেকে লড়েছেন।

এখানে অতটা নেই, অতটা স্বীকৃতিও নেই। ইতিহাসে মহিলা নেত্রীদের নাম আছে। শিখ ইতিহাসেও আছে। দু-চার জনের নাম আছে ইতিহাসে। তারপর মহিলারা কী করেছে, তার কোনও স্বীকৃতি নেই। এখানে ইতিহাসে পুরুষদের কথাই জানা যায়। যেমন তেভাগা হয়েছিল, এখানেও মুজারা আন্দোলন হয়েছিল। অনেক মহিলারা সেই আন্দোলনে ছিল। জমি দখল করা ইত্যাদি সবই তারা করেছে। কিন্তু ইতিহাসে তাদের কোথাও নাম নেই। এই সমস্যা তো রয়েছে। পাঞ্জাব এত এগিয়ে, পাঞ্জাবের সংস্কৃতি এত শক্তিশালী, কিন্তু কোথাও গিয়ে মহিলাদের স্বীকৃতি দেওয়ার বিষয়টা বুঝতে হবে। আমরা এই প্রশ্নগুলো তুলি, ইউনিভার্সিটির লোকজনের সঙ্গে এটা নিয়ে কথা হয়। আমি তো এই কথাটা বারবার তুলি যে মহিলাদের ভূমিকাটা লিখুন। 

পাঞ্জাবের একটা ব্যাপার আছে। পাঞ্জাবে শুরু থেকে লড়াইয়ে ইতিহাস রয়েছে। এমনিতেই এখানকার ইতিহাস কম লেখা হয়েছে। এই সব লড়াইয়ের মধ্যে শান্তিতে বসে ইতিহাস লিখবে এরকম বুদ্ধিজীবী ছিলই বা কোথায়!  

শিখ ইতিহাস ইংরেজরা এসে লিখেছে, আগে কেউ লেখেইনি। সামগ্রিক ভাবেই লড়াইয়ের ইতিহাস কম লেখা হয়েছে। মেয়েদের কথা তো আরওই কম। অংশগ্রহণ কিন্তু ছিল। নেতৃত্বে খুব বেশি ছিল না। কিন্তু যখন জমি দখল হয়েছে, তখন সেখানে গেছে মহিলারা। 

 এরকম কোনও গল্প কি আপনার মনে আছে বা এক দুজন এরকম কোনও মহিলা নেত্রীর নাম, ইতিহাসে যদি না থাকে আমাদের তো লেখা উচিত। আজ যখন আমরা কথা বলছি…

 নকশালবাড়িতে দু-তিনজন ছিলেন। মহিন্দর কৌর আছেন, কেবল কৌর ছিলেন। কখনও কখনও আপনি দেখতে পাবেন, ফেসবুকে অনেক পুরনো একটা ছবি পোস্ট হল। ভগৎ সিংয়ের যে দল ছিল সেখানে দুর্গা ভাবি ছিলেন। অ্যাসেম্বলি আক্রমণের যে মিটিং সেই জায়গা তো তিনি দিয়েছিলেন। নেতৃত্বও দিয়েছিলেন দুর্গা ভাবি। অনেক অ্যাকশনেও অংশ নিতেন।  

আরও পিছনে গেলে ভাগো বলে একজন আছেন। গুরু গোবিন্দ সিং-এর অনন্তপুরের কেল্লা ছেড়েছিলেন, মোঘল সেনা আক্রমণ করেছিল। অনেকে শহীদ হয়েছিলেন, অনেকে গ্রেপ্তার হয়েছিলেন। লোকে হাল ছেড়ে দিয়ে গ্রামে ফেরত চলে গেছিল, যে আমরা এমনি এমনি মরতে চাইনা। সেই গ্রামে ভাগো বলে এক মহিলা নেত্রী ছিলেন। উনি ঘোড়ায় চড়ে গিয়ে ওনাদের আবার উদ্বুদ্ধ করে লড়াইয়ের ময়দানে নিয়ে এসেছিলেন।

গদর আন্দোলনে গুলাব কাউর ছিলেন। উনি যাচ্ছিলেন আমেরিকাতে, ওখান থেকে গদর দলের সদস্যরা আসছিলেন ভারতে। তারা আসার পথে জাহাজে প্রচার করছিলেন। গুলাব কাউর তার বরের সঙ্গে কথা বলেন যে আমাদেরও ফিরে যাওয়া উচিত। বর বলেন যে তিনি ফিরবেন না। তখন গুলাব কৌর বরকে ছেড়ে ফিরে আসে। গদরদের সঙ্গে থাকেন। তাদের জন্য শেল্টার-এর ব্যবস্থা করেন, ছদ্মবেশে বিভিন্ন কাজ করেন। গুলাব কৌরের নাম আছে। গদরি গুলাব কৌর বলে পরিচিত। এটাই আমি বলছিলাম আপনাকে, নেতৃত্বে তো ছিল সব আন্দোলনেই কিন্তু তারপরের স্তরের যে মহিলারা তাদের বেশি উল্লেখ পাওয়া যায় না। এটা খোঁজা দরকার। এটা হতে পারেনা যে মহিলারা ছিল না। এই গুলাব কাউর খুব বড় বা রাজনৈতিক পরিবারের ছিলেন না, তিনি গরিব পরিবারের মেয়ে ছিলেন। তিনি যাচ্ছিলেন আর প্রচার শুনে সিদ্ধান্ত নিয়ে নিলেন। এবং শেষ অবধি ছিলেন।

আমাদের তো এসব ইতিহাস মনে রাখা দরকার…

হ্যাঁ। আমি তো ইউনিভার্সিটিতে যারা আছে তাদের বলি, আমি তো সারাক্ষণ মাঠে-ময়দানে থাকি, আমি তো নিজে এটা করতে পারি না। কিন্তু করা তো দরকার। আমি ঘুরে বেড়়াই। গ্রামে গ্রামে যাই। এখানে মিটিং করলাম, ওখানে কমিটি বানালাম, সেখানে ধর্নায় বসে গেলাম, কোথাও ভাষণ দিয়ে দিলাম। আমার অত সময় হয় না যে দশ দিন বা কুড়ি দিন বসে পড়ব। রোজই গ্রামে গিয়ে কাজ করতে হয়, পড়াশোনা করার খুব বেশি সময় থাকে না। আমি চাই, খুবই ইচ্ছে আছে করার, কিন্তু সীমাবদ্ধতা আছে। সেজন্য স্কলারদের বলতে থাকি। কেউ না কেউ করবে।

আপনাদের যে অভিজ্ঞতা সেটাও তো খুবই মূল্যবান

এখন পড়াশোনা জানা মেয়েরা আছে যারা এভাবে ভাবে যে, আমাদের এগুলো খুঁজে বার করতে হবে। মহিলাদের ভূমিকা প্রতিষ্ঠা করতে হবে। ছাত্র সংগঠনের মেয়েরা ডাকেও আলোচনার জন্য। যাই সেখানে, অভিজ্ঞতা ভাগ করে নিই।

 হ্যাঁ, একেবারেই…

 আমাকে তো বিভিন্ন জায়গায় যেতে হয়। কোথাও ঝগড়া হলে সেখানেও যেতে হয়, কোথাও বিয়ে হলে সেখানেও যেতে হয়। কোনও ঝামেলা হলে যেতে হয়। সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলনেও থাকতে হয়। এতে খুবই ব্যস্ত হয়ে যাই। করতে পারি না এগুলো। এখন অবশ্য পাঞ্জাবের পরিস্থিতি অনেক ভাল হচ্ছে। 

এই আন্দোলনের আপনাদের যে অভিজ্ঞতা সেটাও তো পরবর্তী প্রজন্মের জন্য সংগ্রহ করে রাখা উচিত।

 হ্যাঁ, সে তো ঠিকই। আমি দেখছি এখন গ্রামে যে মহিলারা আন্দোলনে আসছে তারা নিজেদের গল্প বলে। তারা কখনও বাড়ি থেকে বেরয়েনি, তারপর এখন কমিটিতে এসেছে। ৮মার্চ এখানে অনুষ্ঠান হবে। আমরা তো পাঞ্জাবেও করার পরিকল্পনা করছি। মহিলাদের নিয়ে ওখানেও কর্মসূচি রাখব। কারণ মহিলাদের সংগঠিত করার এটা একটা খুব ভাল সময়। এখন পুরুষরাও বাধা দেবে না। যতজন সম্ভব মহিলাকে এখন বাড়ি থেকে বের করে আনতে হবে। আমরা এটাকে একটা সুযোগ হিসেবে দেখছি। একবার যদি যথেষ্ট সংখ্যক মহিলা এসে যায় তাহলে নিজে থেকেই সেটা একটা চুম্বকের মতো কাজ করে। কিন্তু এই চুম্বকটা তৈরি করা জরুরি। তাতে জোর দিতে হবে।  

 হ্যাঁ, গুলাব কাউরের গল্প নিশ্চয়ই মহিলাদের অনুপ্রাণিত করবে..

হ্যাঁ, আমি বলি তো গিয়ে। আমার নিজের অভিজ্ঞতার কথাও শুনতে চায়। মানুষের ভাল লাগে শুনতে। আমি যখন কারও বাড়ি যাই, মহিলারা ভাবেন, আমাদের প্রতিনিধি এসে গেছে। ভাবে আমি কথা বললে কাজ হয়ে যাবে। সেই জন্য আমাকে ফোন করে ডাকে। একবার এরকম একজন আমাকে ফোন করেছিল যাওয়ার জন্য। আমি তখন অনেক দূরে ছিলাম, বললাম আমি কিছুতেই যেতে পারব না। তখন তিনি বললেন যে ঠিক আছে, কথা বলুন, কথা বললেই অনেক কাজ হয়ে যায়। মহিলাদের মধ্যে অনেক কিছু জমে আছে। কোনও রাস্তা পেলে নেতৃত্বে তারা উঠে আসবে, সেটা কোনও সমস্যা না। যেমন আমরা যখন প্রথম বক্তব্য রাখা শিখছিলাম, তখন এটা একটা খুব বড় ইস্যু ছিল যে কীভাবে বলব। এখন সোশ্যাল মিডিয়া অনেক কিছু সমাধান করে দিয়েছে। যে কোনও মেয়েই সেখানে কথা বলতে পারে। যেমন সিঙ্ঘুতে একজন মহিলা আছেন। তাঁর ছেলে করোনাতে মারা গেছে। ওঁর ধারণা হাসপাতালের লোক মেরে ফেলেছে। তারপর তিনি বাড়িতে একা ছিলেন। আন্দোলন শুরু হওয়ার পর উনি নিজেই গ্রামের অন্য মহিলাদের নিয়ে আন্দোলনে চলে এলেন। শুরু থেকে এখনও এখানেই আছেন। সবাইকে নিজের সন্তান মনে করেন। তাঁকে মঞ্চে তুলে দিলে ভাষণও দেন। একদিন বৃষ্টি এসেছে, সবাই এদিক ওদিক ছুটছে, তিনি বৃষ্টির মধ্যে দাঁড়িয়ে স্লোগান দিতে থাকলেন। সবাই আবার বৃষ্টির মধ্যে দাঁড়িয়ে পড়লেন। তিনি কোনও সংগঠনের সঙ্গে নেই। নিজের সমস্যার মধ্যে ছিলেন। সেই সমস্যাকে অঙ্গীকারে পরিণত করেছেন। এখন উনি ভাষণ দেন, ধর্নায় আছেন, কাজও করেন, রোজ ভাষণ শোনেন, কখনও কখনও বলেনও। আমরা তো শেখাইনি, জীবনই শিখিয়ে দিয়েছে। এবার গরমে আমাদের পরীক্ষা হবে। গরমে কী করে ওখানে আমরা থাকি।

 আপনারা কী এই বিষয়ে ব্যবস্থা করছেন ওখানে?

হ্যাঁ করছি। আমাদের তাঁবু ইত্যাদি বদলাচ্ছি। গরমের কথা মাথায় রেখে। কুলার ইত্যাদি আনা হবে। হয়ে যাবে, সমস্যা হবে না। মনে হয় না সমস্যা হবে। এমনিতেও আমরা কাজের লোক। ক্ষেতেও তো থাকি, রাস্তায় থেকে যাব। কিছু সমস্যা তো থাকবেই। খাবার নষ্ট হয়ে যাবে। দেখা যাক। ফ্রিজ নিয়ে আসব। কিছু একটা ব্যবস্থা হয়ে যাবে। পাঞ্জাবে চাঁদা দেওয়ার একটা সংস্কৃতি রয়েছে তো। তার ওপরই ভরসা। সংগঠনগুলোর পক্ষে এত ব্যবস্থা করা সম্ভব ছিল না। কেউ না কেউ করছেই। পুরো খাবার ব্যবস্থা… আমরা তো জানিও না কোথা থেকে খাবার আসছে, কী করে ব্যবস্থা হচ্ছে। ফেসবুকে কেউ পোস্ট করল গম কম আছে, পরের দিন দেখবেন কেউ না কেউ ট্রাক নিয়ে এসে দিয়ে গেছে। তারপর সে ঘুরে ঘুরে সব লঙ্গরে দিতে যাবে। 

শেয়ার করুন

1 thought on “এ শুধু এই ফসলের লড়াই নয়, এ বহু প্রজন্মের লড়াই…”

  1. Nilanjana

    Cholomaan itihaash lekha dorkar ekhonkar…aar sei sob somoykar…bhago – gulab kaur- mohinder kaur-der. Chol–sobai mile likhi.

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *