কিছু কথা

অটোয় বসেছিলাম। আমার পাশে আমার সহকর্মী প্রদীপ্ত স্যার। একটা বাড়ির সামনে সুন্দর গেট বানিয়েছে। বড় শোলার বোর্ডে জ্বলজ্বল করছে ‘শুভ উপনয়ন’। প্রদীপ্ত স্যার ব্রাহ্মণসন্তান, তায় ‘সান্যাল’। ওনাকে জিগালাম, “স্যার, ব্রাহ্মণ ছেলেদের পৈতে হয়, মেয়েদের হয় না কেন?” স্যার ইতিহাস পড়ান। একটু চুপ থেকে বললেন, “প্রাক-বৈদিক যুগে মেয়েরাও উপবীত পরতো। বৈদিক যুগের শেষের দিকে মেয়েদের যখন সমতা খর্ব করা হলো, মানে অন্তঃপুরে ঢোকানো শুরু হলো, তখন এই অধিকার কেড়ে নেওয়া হয়।”

–  “ও। তাহলে ছেলেরা ব্রাহ্মণ, মেয়েরা নয়। তাই তো?”

স্যার একটু ইতস্তত করে বললেন, “হ্যাঁ,তাই। মেয়েরা তো বয়ে চলে। তাই যে পরিবারে যায়, সেটাই তার জাত। ছেলেরা যেহেতু স্ট্যাটিক থাকে, তাই…”। স্যারের একটা মেয়ে আছে। বাচ্চা। ফাইভে পড়ে। উনি ব্রাহ্মণ, কিন্তু ওনার মেয়ে নয়, এটা ভেবে থেমে গেলেন কিনা কে জানে!

আমার সহকর্মী আনসেল স্যার লোক ভালো। সজ্জন। কিন্তু তাঁর কথায় বোঝা যায়, মেয়েদের বুদ্ধিতে উনি সন্দিহান। কথায় কথায় বলেন, “এই মেয়েছেলে জাতটা না…।” এই নেই-মামার ইস্কুলেও আমরা একটা ইলেকট্রিক টি-মেকার রেখেছি। মানে, জিনিসটা আমার। আমার কাজে আসে না বলে ইস্কুলে নিয়ে এসেছি। টিফিন পিরিয়ডে একটু চা-মুড়ি অন্তত জোটে। তা, প্রথম তিনদিন চা করার পর দেখলাম, আমার সহকর্মীরা ধরেই নিয়েছেন চা-টা আমিই করবো। কারণ আমি একাই মেয়ে। চতুর্থদিন স্যারেরা যেই বলেছেন, “একটু চা কি হবে?”, আমিও হেসে বললাম, “হবে না কেন? বানান,আমিও খাবো।” প্রদীপ্ত স্যার কিছু না বলে চা বানাতে চলে গেলেন। আনসেল স্যার বললেন, “তোমরা মেয়েরা না! একটু চা করবে, তা না!” হেসে বললাম, “আরে,রোজই তো করি স্যার। আপনিও একটু করুন। হাত পাকুক। মিসেস না থাকলে তো সমস্যায় পড়বেন।” স্যার সিধে হয়ে বসে বুক ফুলিয়ে বললেন, “আটতিরিশ বছর বিয়ে হয়েছে। রান্না তো রান্না, চা-ও বানাইনি কখনো। গিন্নী না থাকলে এর ওর বাড়িতে ঢুকে পড়ি। বৌদি, বৌমারা তো আছে”। অমায়িক হাসি, “ও স্যার,আপনি তো তবে হ্যান্ডিক্যাপ্ড! কিস্যুই জানেন না।” স্যার আমার কাছ থেকে cheeky answer পেতে অভ্যস্ত। জানেন,আমার ঘাড় ত্যাঁড়া। তাই নিমপাতা হাসি দিলেন। ততক্ষণে চা চলে এসেছে। প্রদীপ্ত স্যারকে বললাম, “চা-টা ভালো হয়েছে স্যার”। স্যার গর্বিত হাসি দিলেন, “আমি রান্নাবাড়া পারি”। কাপে চুমুক দিয়ে বলি, “পারাই তো উচিত। না পারার মধ্যে গৌরবের কী আছে!”

ইস্কুলের উল্টোদিকে হাইদার বাড়ি। বাড়ির সামনে ছোট দোকান। ইস্কুলের বাচ্চারা সেখান থেকে নানা অখাদ্য-কুখাদ্য কেনে। দোকান চালায় হাইদার বউ। মাজা গায়ের রঙে হাসিখুশি একটা মানুষ। মোহর আমার ইস্কুলে এলে ঐ বাড়িতে আমায় নিয়ে যেতে হয় ওকে। ওদের বাড়িতে ছাগল আছে। গরু,মুরগী,হাঁস আছে। গিয়ে দেখেছি, বাড়িটা তকতকে পরিষ্কার। হাইদার বউ ঝুপঝাপ দোকানদারী করে এসে রান্না বসিয়ে দেয় কাঠের জ্বালে, গরু স্নান করায়, ছাগলের জন্য লগা দিয়ে লম্বুপাতা পাড়ে। বাড়ি ভর্তি হাঁস-মুরগি। সেগুলোর ডিম বেচে। হাঁস-মুরগিও বেচে। হাইদার আয় সম্বন্ধে আমার ধারণা নেই। তবে তার মাল্টিটাস্কার বউ ঘরে বসেই অনেকগুলি টাকা আয় করে। গতকাল শুনলাম, হাইদা প্রদীপ্ত স্যারের কাছে দুঃখ করেছে, “সুন্দরী বউ  বিয়ে করে কী জ্বালা! পড়াশুনো জানে না। আমার মেয়েটারও পড়াশুনো হবে না ঐজন্য”। হাইদা পড়াশুনো জানে। তবু মেয়ের পড়াশুনো হবে না একমাত্র মায়ের জন্যই!

বিয়ের পর আমার ভালোমানুষ শ্বশুরমশাই বলেছিলেন নিজের পদবী আর সার্টিফিকেট-টিকেট শ্বশুরবাড়ির হিসেবে করবার জন্য উনিই ব্যবস্থা করবেন। আমার ননদের বিয়ের পরও উনিই মেয়ের কাগজপত্র স্বামীর নাম-ঠিকানায় করে দিয়েছেন। আমি খুব নিরীহ মুখে জানিয়েছিলাম যে তার দরকার নেই। আমার পদবী-ঠিকানা-গার্জিয়ানশিপ সব মায়ের নামে আছে। ওটাতেই আমি স্বচ্ছন্দ। আমার শ্বশুরমশাই নিরীহ মানুষ। অবাক হয়ে বললেন, “তোমার তো বিয়ে হয়ে গেছে। বাবু (ওঁর ছেলে) তো এখন তোমার গার্জিয়ান”। মিষ্টি হাসি দিই, “আমি তা মনে করি না। আমার মা-বাবা আমার গার্জিয়ান। তাঁদের অবর্তমানে আমার দায়িত্ব আমার। আমার তো আঠারো অনেকদিন পেরিয়েছে”। গত প্রজন্মের মানুষ উনি। আমার কথায় সোয়াস্তি পাননি নিশ্চিত। তবে জোর করে চাপিয়েও দেননি।

প্রদীপ্ত স্যার গল্প করছিলেন, “আমার এক দাদা কায়স্থ পরিবারের মেয়ে বিয়ে করেছিলেন বলে দীর্ঘদিন একঘরে হয়ে গিয়েছিলেন। বাড়ির দুর্গাপুজোয় দাদা যেতেন বৌদিকে ছাড়া। শেষে আমার বাবা বোঝালেন সবাইকে, “বৌমার তো গোত্রান্তর হয়েছে বিয়ের পর। ও তো এখন সান্যাল পদবীর মানুষ। ও কেন পুজোয় যাবে না!”

সবাই মেনে নিলো বাবার কথা”। শুনি চুপ করে। মনে মনে হাসি পায় একটা কথা ভেবে। আমার বর শিবাজী আর আমি দুজনের গোত্রই কাশ্যপ। তার মানে বিয়ের সময় আমার গোত্রান্তর হয়নি। বাহ্। বেশ,বেশ। আমার কন্যা মোহর ঘুমোয় আমার গায়ে পা তুলে। ঘুমের ঘোরে ডাকে,”মামমাম।”

-“হুম?”

-“তোমায় একতা মেয়ে আয় একতা ছেয়ে।”

মোহরকে ঠিক করে শোয়াতে শোয়াতে বলি,”আমার একটাই মেয়ে। তুই ঘুমো।”

শেয়ার করুন

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *