খাবার চাই, চাই রুটি- আমেরিকার ১৯১৭-এর খাদ্য দাঙ্গা

১৯১৭ সালের ফেব্রুয়ারি মাস। আমেরিকা তখনও বিশ্বযুদ্ধে সরাসরি যোগ না দিলেও যুদ্ধের আঁচ এসে পড়েছে সাধারণ মানুষরে জীবনে। বাড়ছে যুদ্ধকালীন সংকট। সঙ্গে বাড়ছে জিনিসপত্রের দাম। বিশেষত খাবার জিনিসের দাম আকাশ ছোঁয়া। টান পড়ছে শহরের শ্রমজীবী ও গরীব মানুষদের পেটে, বন্ধক রাখতে হচ্ছে পারিবারিক যা কিছু সম্পদ, বদলাতে হচ্ছে খাদ্যাভ্যাস, কখনও বা পুরোপুরি অভুক্ত অবস্থায় দিন কাটছে গোটা পরিবারের। 

মাসের মাঝামাঝি নাগাদ, শহরগুলির ইহুদি বস্তিতে খবর ছড়ায় খাবারের জিনিসের দাম আরও বাড়ানোর চক্রান্ত করছে মুনাফালোভী ব্যবসায়ীরা, মজুদ করছে খাদ্য। উৎকন্ঠা বাড়তে থাকে দরিদ্র পরিবারগুলির, জমতে থাকে ক্ষোভ। ১৯ তারিখ সকালে বাজার করতে গিয়ে মহিলারা দেখেন এক ধাক্কায় ৫-৭ সেন্ট প্রতি পাউন্ড দাম বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে আলু ও পেঁয়াজের। ধৈর্যের বাঁধ ভাঙে। নিউইয়র্ক সহ আমেরিকার বিভিন্ন শহর দেখে ক্রুদ্ধ মায়েদের বিক্ষোভ, ইতিহাসে যা ১৯১৭-র খাদ্য দাঙ্গা নামে পরিচিত। ভাঙচুর হয় দোকান, পুড়িয়ে দেওয়া হয় খাদ্যসামগ্রী, চলে পিকেটিং।

বিক্ষোভে অংশগ্রহণকারী এক আন্দোলনকারীর দেওয়া হিসেব অনুযায়ী ১৯১৬ সালে, মাঝারি মাপের একটি পরিবারের রাতের খাবার তৈরির খরচ ছিল ০.৭৬ সেন্ট প্রতি মিল, অর্থাৎ মাসের খরচ ২২ ডলার (শুধুমাত্র একবেলার খাবারে)। একজন পূর্ণ সময়ের কর্মী মাসে উপার্জন করতে পারতেন ৪০ ডলার মতো। একমাসের বাড়িভাড়া ছিল ন্যূনতম ১৫ ডলার। ১৯১৭-র গোড়ার দিকে এই খরচ বেড়ে দাঁড়ায় ১.৯৯ ডলার প্রতি মিল অর্থাৎ প্রতিমাসে একবেলার খাবার খরচ ৫৯ ডলার।

নিউইয়র্ক টাইমস-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে একজন আন্দোলনকারী জানান তাঁদের চারজনের পরিবারের একদিনের ব্রেকফাস্ট-এর খরচ ছিল ৪৯ সেন্ট, কয়েক মাসের মধ্যে সেই খরচ বেড়ে দাঁড়ায় ১.০২ ডলারে। তিনি বলেন বহু মাস তাঁরা ডিম খাননি, পাতে একটুকরো আলু পড়াও বিলাসিতা।   

১৯ ফেব্রুয়ারি, ব্রুকলিনের ব্রাউনসভিল-এর বেলমন্ট অ্যাভেনিউতে বাজার করতে আসা এক মহিলা দেখলেন তাঁরা কাছে যা টাকা আছে তাতে খালি হাতেই বাড়ি ফিরতে হবে। রাগে ক্ষোভে উল্টে দিলেন ঠেলাগাড়ি। দোকানি সেই মহিলাকে আক্রমণ করার জন্য তাড়া করলে রুখে দাঁড়ালেন শ’য়ে শ’য়ে মহিলা। একের পর এক দোকানির ঠেলা উল্টে দিতে থাকলেন তাঁরা, কেরোসিন ঢেলে আগুন লাগিয়ে দিলেন। পুলিস বাধা দিতে এলে ঘন্টার পর ঘন্টা চলল সংঘর্ষ।

এই বিক্ষোভের খবর ছড়িয়ে পড়তেই আন্দোলন ছড়াল বস্টন, ম্যাসাচুসেটস্, ফিলাডেলফিয়া, পেনসিলভেনিয়ার দরিদ্র এলাকাগুলিতে।

নিউ ইয়র্ক শহরের লোয়ার ইস্ট সাইড-এ, কয়েকশো মহিলা ঢুকে পড়লেন স্থানীয় পোল্ট্রি বাজারে, বন্ধ করে দিলেন বিক্রি-বাটা, এই আন্দোলনকারীদের বেশিরভাগই ছিলেন ইমিগ্র্যান্ট ইহুদি পরিবারের।

নিউ ইয়র্ক শহরে আন্দোলনের নেতৃত্বে ছিলেন সমাজতন্ত্রী দল ‘মাদার্স ভিজিল্যান্স কমিটি’র প্রেসিডেন্ট ইদা হ্যারিস ও অ্যানার্কিস্ট নেত্রী মেরি গানজ্। বামপন্থী মহলে তিনি পরিচিত ছিলেন স্যুইট মেরি নামে। ইদা ও মেরির নেতৃত্বে গঠিত হয় ‘মাদার’স অ্যান্টি-হাই প্রাইস লিগ’ (কোনও কোনও সূত্র অনুযায়ী ‘মাদার’স অ্যান্টি-হাই কস্ট লিগ’)।

পরদিন, অর্থাৎ ফেব্রুয়ারি মাসের ২০ তারিখ জমায়েতের ডাক দেয় ‘মাদার’স অ্যান্টি-হাই প্রাইস লিগ’। হাজার হাজার মহিলা যোগ দেন জমায়েতে। সভা শেষে ইদা হ্যারিস ও মেরি গানজ্-এর নেতৃত্বে মিছিল এগিয়ে চলে সিটি হলের দিকে। খবর পেয়ে তড়িঘড়ি মেয়র-এর অফিসের লোহার দরজা বন্ধ করে দেওয়া হয়। ৪০০ জনেরও বেশি মহিলা উঠে যান সিটি হলের সিঁড়ি বেয়ে। অনেকেরই পিঠে বাচ্চা। ইংরেজি ও ইদ্দিশ ভাষায় স্লোগান ওঠে, “খাবার চাই, চাই রুটি, খাবার চাই আমাদের সন্তানদের!”

সিটি হল-এর জমায়েতে বক্তব্য রাখতে গিয়ে ইদা হ্যারিস বলেন, “আমরা এখানে ঝামেলা পাকাতে আসিনি, আমরা মার্কিন দেশের সভ্য নাগরিক। আমরা শুধু চাই, মেয়র জিনিসের দাম কমানোর ব্যবস্থা করুন। জিনিসের দাম ঠিক করার জন্য যদি কোনও আইন থাকে আমরা চাই তিনি তা লাগু করুন আর যদি না থাকে তাহলে আইন তৈরি করুন। আমরা অনাহারে দিন কাটাচ্ছি –  আমাদের সন্তানরা অনাহারে দিন কাটাচ্ছে।”

মেয়রের প্রতিনিধি জানলা দিয়ে উঁকি মেরে বিক্ষোভকারীদের জানান, সবাই যদি শান্তিপূর্ণভাবে বাড়ি ফিরে যায় তাহলে তিনজন আন্দোলনকারীর সঙ্গে দেখা করে আলোচনা করবেন মেয়র। ভাষার সমস্যায় সাময়িকভাবে তৈরি হয় বিভ্রান্তি। উপস্থিত বিক্ষোভকারীরা ক্ষোভ উগরে দিতে থাকেন, ফিরে যেতে অস্বীকার করেন।

দীর্ঘ টালবাহানর পর ইদা হ্যারিস ও মেরি গানজ্ সহ চারজনের প্রতিনিধিদলের সঙ্গে দেখা করেন মেয়র। তিনি জানান, পর্যাপ্ত পুষ্টির অভাবে শহরের শ্রমিক শ্রেণি ও গরীব মানুষের মধ্যে অনাহার ও অসুস্থতা রয়েছে কি না তা খতিয়ে দেখা হবে।

ছবি সৌজন্য- ন্যাশনাল আর্কাইভ

মেয়রের সঙ্গে দেখা করে বেরিয়ে যখন উপস্থিত বিক্ষোভকারীদের উদ্দেশে ভাষণ দিচ্ছেন মেরি, হঠাৎই তাঁকে গ্রেফতার করে পুলিস। ঘটনাস্থলে উপস্থিত পুলিস ইন্সপেক্টর জানান বিক্ষোভকারী মহিলাদের দাঙ্গায় ইন্ধন যুগিয়েছেন তিনি। তাঁকে যখন পুলিসের গাড়িতে তোলা হচ্ছে, ক্ষোভে ফেটে পড়েন বিক্ষোভকারী মহিলারা। মেরিকে ম্যাজিস্ট্রেট-এর সামনে পেশ করা হলে সেদিনই ছাড়া পান মেরি। সেদিন রাতে নিউইয়র্ক শহরের ফরওয়ার্ড হল-এ জড়ো হন প্রায় ১০,০০০ মহিলা। হল ভর্তি হয়ে যাওয়ায় দরজা বন্ধ করে দেওয়ার পরও আসতে থাকেন শ’য়ে শ’য়ে মহিলা। তাদের চাপে ভেঙে পড়ে দরজা। সভায় আন্দোলেনের রূপরেখা আলোচিত হয়। উপস্থিত বক্তারা পুঁজিবাদকেই এই সংকটের জন্য দায়ী করেন। সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় ওয়াল-স্ট্রিট জুড়ে মিছিল করা হবে, বিক্ষোভ দেখানো হবে জে.পি মর্গ্যান এন্ড কো. এর অফিসের সামনে।   

অন্যদিকে বস্টনে প্রায় ৮০০ জন মহিলা ও শিশুর দল লুঠপাট চালায় শহরের বিভিন্ন গ্রসারি স্টোর-এ। সমস্ত ফিলাডেলফিয়া জুড়ে কার্যত সেনা শাসন জারি হয়। সেখানে সেই সময়ে শ্রমিক বিদ্রোহ চলছিল, তার সাথে যোগ দেন খাদ্য আন্দোলনকারীরা। গুলিতে মৃত্যু  হয় এক প্রতিবাদীর, পদদলিত হয়ে মারা যান আরেক বৃদ্ধা। শ’য়ে শ’য়ে মহিলা দোকান ও খাদ্যদ্রব্য বিক্রির ঠেলা ভাঙচুর করেন। খাবারের জিনিসের দোকান বয়কটের ডাক দেন আন্দোলনকারীরা। 

পরিস্থিতি যখন ক্রমেই হাতের বাইরে বেরিয়ে যাচ্ছে, কর্তৃপক্ষের তরফ থেকে আন্দোলনকারীদের চাল ও অন্যান্য সস্তার খাবার খাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়। ইমিগ্রান্ট এই আন্দোলনকারীদের ইউরোপীয় খাদ্যাভাস বর্জন করার কথা বলা হয়, বলা হয় দুধের বদলে ডিম ও আলুর বদলে চাল ব্যবহার করতে। 

১ মার্চ নিউ ইয়র্ক শহরে অশান্তি চরমে পৌঁছয়। গ্রেফতার হন প্রায় ১০০ জন বিক্ষোভকারী। এর পরের দিনগুলিতে দোকানি ও আন্দোলনকারীদের মধ্যে বিক্ষিপ্ত সংঘর্ষের ঘটনা নিয়মিত হয়ে ওঠে বিভিন্ন শহরে। কোথাও কোথাও ছুরি নিয়ে আন্দোলনকারীদের ওপর চড়াও হন মাংস বিক্রেতারা। নিয়মিত পিকেটিং চালিয়ে যেতে থাকেন আন্দোলনকারী মহিলারা।

কিছুদিনের মধ্যে খুচরো ব্যবসায়ীরাও যোগ দেন আন্দোলনে। পাইকারি ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে বয়কটের ডাক দেন বিভিন্ন বাজার এলাকার খুচরো বিক্রেতারা। কার্যত বন্ধ হয়ে যায় বাজার।

বিক্ষোভের চাপে নিউইয়র্কের স্টেট গভর্নর আপৎকালীন ভিত্তিতে মূল্য নিয়ন্ত্রণের জন্য কিছু পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হন। 

এই ঘটনার মাস খানেকের মধ্যে পরিস্থিত সম্পূর্ণ বদলে যায়, প্রথম বিশ্বযুদ্ধে যোগ দেয় আমেরিকা। যুদ্ধে যোগ দেওয়ার প্রস্তুতি হিসেবে দেশজুড়ে যে জাতীয়তাবাদী হাওয়া তোলা হয়েছিল তা আরও জোরদার হয়। র‌্যাডিকাল বামপন্থী রাজনৈতিক কর্মী ও ইমিগ্রান্টদের বিরুদ্ধে এক সন্দেহের বাতাবরণ তৈরি করা হয় দেশজুড়ে। আন্দোলন চলাকালীনই প্রচার ছিল আন্দোলনকারীরা জার্মানির টাকায় পুষ্ট, যুদ্ধে আমেরিকার যোগদানের পর এই প্রচার নতুন মাত্রা পায়। রাস্তাঘাটে হেনস্থার স্বীকার হতে হয় শুধুমাত্র ইমিগ্রান্ট পরিচয়ের জন্য। গরীব পরিবারগুলি পুরুষদের একটা বড় অংশকে যুদ্ধে যেতে হয়। যুদ্ধবিরোধী প্রচার চালানোর ‘অপরাধে’ গ্রেফতার হন সমাজতন্ত্রী দলের একাধিক সদস্য। শুরু হয় এক কঠোরতর বাস্তবতার সঙ্গে লড়াই।

লড়াইয়ের প্রাথমিক দাবি পূরণে সম্পূর্ণ সফল না হলেও আমেরিকার ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ অংশ ইমিগ্রান্ট মহিলাদের এই নাছোড় লড়াই। আমেরিকার বিপুল প্রাচুর্যের মধ্যে চরম দারিদ্র্যের ছবিকে নগ্ন করে দেয় এই আন্দোলন। খাবারের দামের ওপর সরকারি নিয়ন্ত্রণের পক্ষে সওয়াল চলে সংসদে। 

রুটি-রুজির দাবিতে, জীবনের দাবিতে ইতিহাসজুড়ে বারবার পথে নেমেছেন মহিলারা। শাসকের চোখে চোখ রেখে সামনের সারিতে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন আন্দোলনে। অথচ মূলধারার ইতিহাসে অশ্রুতই থেকে যায় সমাজের প্রান্তে থাকা মহিলাদের এই লড়াইয়ের কথা। ইতিহাস রচিত হয় ক্ষমতাবানের ভাষ্যে, আর তাই স্বাভাবিকভাবেই সেখানে স্থান পায়না এই লড়াইয়ের আখ্যান। সাধে কী আর ঐতিহাসিক লোরি গিনসবার্গ বলেছেন ‘যা কিছু স্বাভাবিক তাই নারীবাদের পরিপন্থী’ ( “Normal is anti-feminist”)! আর তাই এই স্বাভাবিকত্বের বিপরীতে দাঁড়িয়ে ইতিহাসকে ক্ষমতাবানের মালিকানা থেকে ছিনিয়ে আনাও এক রাজনৈতিক কর্তব্য বই কী। 

শেয়ার করুন

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *