ঘুরতে ঘুরতে একলা

প্রায় সাড়ে ন’হাজার ফিট উঁচু পাহাড়ের গা বরাবর রাস্তা ধরে এগোতে এগোতে যেই একটি প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের দিকে মন দেব ভেবেছি, অমনি সামনে দেখি খরস্রোতা একটা পাহাড়ি ঝরনা রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে আমার রাস্তার ওপর দিয়ে নীচে পাথরের গায়ে আছড়ে পড়ছে। নীচের দিকে একটু ঝুঁকলেই  বিশাল পার্বতী নদী দেখা যায়। ট্রেকিং করতে এসে এ’রম বিপদে পড়ব ভাবি নি। একেই আমার ফ্ল্যাট ফুট বলে যেখানে সেখানে ধুপধাপ পড়ে যাই, তার ওপর অ্যাক্রফোবিয়া (সামান্য উচ্চতা থেকে নীচের দিকে তাকালেই মাথা ঘোরে, জ্বর আসে)। আর এ সবকিছু নিয়ে এই পাণ্ডববর্জিত জায়গায় একা একা ট্রেকিং করতে এসেছি। মাঝপথে হোঁচট, গুঁতো ইত্যাদি খেয়ে, কখনো হামাগুড়ি দিয়ে কখনো বাঁশের  ব্রিজ থেকে বাঁদরের মতো ঝুলে দু’চারটে নদী পেরিয়ে বেশ ভেতরের গর্ববোধটা চাগিয়ে উঠেছিল, সেটা এই ঝরনা মারকাটারি রূপ দেখে আবার মুখ থুবড়ে পড়ল।

যেমন আচমকা, ছন্নছাড়া, হঠাৎ, কোত্থাও কিছু নেই তাই  মর্মে এই লেখাটা শুরু হলো, আসলে আমার ঘুরতে যাওয়াগুলোও কতকটা তেমনই। ওই আমারই মতো। ‘ধিঙ্গি মেয়ে টইটই করছে’! শুরুটাও হয়েছিল এমন হঠাৎই। ২০১৪-র এক দুপুর বেলা মুখ-গোমড়া করে বসে আছি। মুম্বইয়ের এক বন্ধুর সঙ্গে কথা হওয়ায় ও বলল ওর কাছে গিয়ে দু’চারদিন থেকে আসতে। ভাগ্য ভালো, লেডিস কোটায় টিকিট পেয়ে গেলাম, রাতে লিঙ্গম্পল্লী স্টেশন থেকে মুম্বই এক্সপ্রেসে। সকালে ঘুম ভাঙল তখন লোনাভালা স্টেশন, দূরে পাহাড় দেখা যায়। আমি কিরম মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে ব্যাগ নিয়ে নেমে পড়লাম। তারপর লোনাভালা- ব্যাঙ্গালোর-পুণে- চেন্নাই ঘুরে হায়দ্রাবাদ ফেরত। আমার প্রথম সোলো ট্রিপ, প্রথম সাহস করে হিচ হাইকিং।

আমার হোস্টেল রুমের এককোণে একটা ডাকব্যাকের ব্যাগে খান দুই টি-শার্ট, এক-আধটা ট্র্যাক প্যান্ট আর টুকিটাকি কিছু জিনিস সবসময় রাখা থাকে। হয়ত একদিন এক্সপেরিমেন্টের রেজাল্ট আসেনি বা মায়ের সঙ্গে ঝগড়া বা চারপাশ একঘেয়ে বা কিচ্ছু ভালো লাগছে না, ওই ব্যাগটি কাঁধে নিয়ে আমি সব ছেড়েছুড়ে বেরিয়ে পড়ি। ট্রেন, বাস, অটো, রিকশা, ঠেলা গাড়ি বা কখনও পায়ে হেঁটে যেদিকে ইচ্ছে চলে যাই, যেখানে ইচ্ছে ঘুরে বেড়াই দিন কয়েকের জন্যে। আচমকা, ছন্নছাড়া, হঠাৎ, কোত্থাও কিছু নেই তাই।

হিমাচল প্রদেশ,
ছবি- সানন্দা

কিন্তু না, যে গল্পটা হচ্ছিল তা আমার প্রথম সোলো ট্রেকিং। আবার ফেরা যাক সেই গল্পে, যেখানে কিছুতেই আমি ফিরে যাইনি। কারণ ওই অবস্থায় ফেরত যাওয়া মানে তা প্রায় ১০ কিমি মতো, এবং সঙ্গে হোঁচট ইত্যাদি আর এগোলে এই ঝরনা ওপর দিয়ে হেঁটে পেরিয়ে আর দু- তিন কিমি চড়লেই ক্ষীরগঙ্গার উষ্ণ-প্রস্রবণ। এগিয়ে যাওয়াই ঠিক করলাম।  আশেপাশে কেউ কোত্থাও নেই। এগিয়ে যেতেই কনকনে ঠান্ডা জলে জুতো মোজা ভিজে সপসপ করছে। বরফ শীতল জলে দাঁড়িয়ে থাকা যায়না, পরের পা ফেলতেই পা হড়কে পিছলে নিচে চলে গেলাম কিছুটা। পাশে একটা বড় পাথর আঁকড়ে ধরতেই জলের থাপ্পড়। প্রবল জলের তোড় পায়ের কাছে আছড়ে পড়ছে, অনবরত ঝাপ্টা দিয়ে নিচে ফেলে দেওয়ার চেষ্টা বিফল হওয়ায় রেগে গিয়ে যেন পরের বার আরো জোরে ধাক্কা দিচ্ছে। পাশে তাকিয়ে দেখি ধপধপে সাদা ঝরনা জলে ছোট ছোট নুড়ি পাথর বয়ে যাচ্ছে নীচের দিকে। ব্যস, আবার যাবতীয় শারীরিক এবং মানসিক শক্তি উধাও। তো এরপর প্রায় মিনিট পনের নাকানিচোবানি খেয়ে ঝরনা প্রবল পরাক্রমী ওই জলপ্রপাতকে হারিয়ে ভিজে চুপচুপে হয়ে সদর্পে এগিয়ে গেলাম ওপরের দিকে। 

হাত পা প্রায় অবশ, আমি গলদঘর্ম, মন উৎফুল্ল। একটু এগিয়ে ছোট্ট একটা খড়ের চালের দোকান, দোকানের সামনে এক মহিলা উল বুনছে, পাশে একটা বাচ্চা ছেলে আমাকে দেখে মিষ্টি হেসে গাছ থেকে আপেল, ন্যাসপাতি পেড়ে দিল। নিষ্পাপ হাসিমুখ আর ভালবাসার বহর দেখে সব ক্লান্তি একমুহূর্তে ভ্যানিশ। 

জীবনের প্রথম সোলো ট্রেকিং  সফল।

স্পিতি উপত্যকা
ছবি- সানন্দা

বাদবাকি হিচহাইকিং গুলো আমার এক্সপেরিমেন্টে আসা এররের মতো। অজস্র।  

হিচ হাইক করতে করতে কখনো পৌঁছেছি কোনো গ্রামে, কখনো মেছুনিদের বস্তিতে, কখনো জঙ্গলে আদিবাসীদের ভিটেয়, আবার কখনো রাস্তায় রাস্তায়। হিচ হাইকিং এর মজা হল, গন্তব্য স্থলের কোনো ঠিক নেই, যেদিকে দু’চোখ যায় এগোলেই হল। কখনও কারো বাইকের পেছনে, কখনো স্কুটিচালককে পেছনে বসিয়ে, কখনও ভ্যানগাড়িতে দিব্যি এদিক সেদিক ঘুরে ফেলেছি।

একবার বেলগাঁও এর একটা ছোট্ট গ্রামে ছিলাম কিছুদিন।  ওদের কাছে আমি অদ্ভুত জামা পরা অদ্ভুত কথা বলা অদ্ভুত জীব। আমরা কেউ কারো ভাষা বুঝিনা, শুধু হাসি দিয়েই পরস্পরের ভাব বিনিময় চলতো। সন্ধ্যেবেলায় ছোট বাচ্চাগুলো ইংরিজি বই নিয়ে আসত আমার কাছে, আমি পড়ে শোনাতাম, তারপর কিচিরমিচির করে একসাথে কিছু একটা খেলতাম, রাতে সবাই একসাথে বসে সাম্বার আর ভাত। 

একবার ছত্তিশগড়ের জঙ্গলে ঘুরতে ঘুরতে খুব খিদে পেয়েছে। ওখানকার আদিবাসীদের একটি ছোট্ট মেয়ে জঙ্গলে কাঠ কুড়োচ্ছিল। রেবতীর সঙ্গে আলাপ হয়ে যায় দিব্যি, প্রায় জোর করেই ওর বাড়ি নিয়ে গিয়ে নিজেদের খাবারের ভাগ থেকে মেঠো ইঁদুরের মাংসের ঝোল-ভাত খাওয়ায় আমাকে। সেদিনের ভালোবাসা মিশ্রিত খাবারের স্বাদ এখনো মুখে লেগে আছে।

ওয়াইনাদের পাহাড়ি রাস্তায় হারিয়ে গেছিলাম একবার, বেশ কিছুক্ষণ হাঁটাহাঁটি করলাম। এদিকে প্রায় সন্ধে হয়ে গেছে, আচমকা এক সহৃদয় ব্যক্তি নিজের বাইকে আমাকে লিফ্ট দিয়ে জনবহুল এলাকায় পৌঁছে দেন। বাজারে ঘুরতে ঘুরতে পরিচয় হয় আকিবের সঙ্গে। তার সঙ্গে গল্প করতে করতে তাদের বাড়ি পৌঁছে যাই। আকিবের বাড়ির লোকেরা কিছুক্ষণের মধ্যেই আমার অত্যন্ত আপন হয়ে ওঠেন, এবং তাদের বাড়িতেই আমি রাত কাটাই।

একবার হিমালয় ঘুরতে গিয়ে ঠান্ডায় হু হু করে কাঁপছি, পাহাড়ি এক মহিলা, পূজা, গরম গরম চা বানিয়ে খাওয়ালেন। ওর কাছেই শুনলাম ওর বর, প্রশান্তের কথা, ভোর বেলা উঠে পেটের দায়ে দু’জন দু’দিকে বেরিয়ে যাওয়ার কথা, সারাদিনের কাজের শেষে ক্লান্ত হয়ে সারাদিনে কী ঘটল বলতে বলতে ঘুম। প্রথমে বউ, পরে বরের সঙ্গে গল্পে রাত ভোর হয়ে যায়, মনেই হয়না অচেনা কারো বাড়িতে আছি। 

কখনো উধেওয়ারির পাহাড় ঘেরা উপত্যকায়, কখনও সূর্যলঙ্কার সমুদ্রতটে মেছুনিদের ডেরায়, কখনও কিতুলগালার ঝরনা-পার্শ্ববর্তী গ্রামে, এভাবেই আলাপ হয় নানান মানুষের সঙ্গে, আলাপ হয় বৃহত্তর পৃথিবীটার সাথে, আলাপ হয় আমাদের নিত্যদিনের স্বার্থপর জীবনযাপনের বাইরের জগৎটার সাথে।

সময় এবং সামর্থ্য দুটোরই অভাব যেসব ভ্রমণপ্রেমীদের, তাদের কাছে হিচ হাইকিং এর তুলনা হয় না। আরাম ও বিলাসিতা হয়না ঠিকই, কিন্তু ওই ক’টা দিনে যা অভিজ্ঞতা সঞ্চিত হয়, তা যেকোনো রকম মন খারাপের ওষুধ হিসেবে বেশ কিছুদিন কাজে লাগানো যায়।

আমার ঘুরতে যাওয়ার বেশির ভাগই হিচ হাইকিং করে। কিছু সোলো ট্রিপ প্ল্যান করেও করেছি অবশ্য।

তবে ট্রিপগুলোতে এক্কেবারে একা একা গেছি তা বললে ভুল হবে, আমার পেপার স্প্রে খানা আমার সাথে সাথে দেশ বিদেশ সব ঘুরে এসেছে। হ্যাঁ, তবে হুটহাট ঘুরতে বেরিয়ে খুব দরকারী কিছু জিনিস শিখে ফেলেছি যেমন প্রত্যেকটা পেট্রোল পাম্পে বাথরুম থাকে বা মেনস্ট্রুয়াল কাপ ব্যবহার করলে মেনস্ট্রুয়েশনের সময় অনেকটা নিশ্চিন্ত থাকা যায় ( এটা ঘুরতে না গেলেও সত্যি ) বা হিচ্ হাইকিং এ যতটা সম্ভব পাবলিক ট্রান্সপোর্ট ব্যবহার এবং প্রাইভেট কারো গাড়িতে গেলে তার ছবি তুলে রাখা বা গাড়ির নাম্বার টুকে রাখা আবশ্যিক।

এবার যাদের মনে হচ্ছে কেন যাই? 

যাই কারণ সাধারণত মেয়েদের একা ঘুরতে যাওয়া সমাজের কাছে খুবই গর্হিত কাজ, তাই বাড়ির লোকেদের অনুমতি একেবারেই পাওয়া যায় না। “লোকে কী বলবে?” “কিছু যদি হয়ে যায়?” “বিয়ের পর বরের সঙ্গে যাস।” “ঘুরতে না গেলে কী এমন আহামরি হবে?”  ইত্যাদি বিভিন্ন টিপ্পনী প্রায় সব ঘরেই। তাই যাই। পুরুষই পারে মেয়েদের নিরাপত্তার দায়িত্ব নিতে এই চিন্তাধারা থেকেই জন্ম নেয় ঘুরতে যাওয়ায় এত বিধিনিষেধের। নিজের শারীরিক নিরাপত্তার দায়িত্ব নিজের কাঁধে নিয়ে, সামাজিক প্রতিকূলতাকে তোয়াক্কা না করে  নারী ভ্রমণকারীর সংখ্যা বাড়ছে, আমি তার ভাগীদার হতে চাই, তাই যাই। একা ঘুরতে যাওয়ার মধ্যে যে খানিকটা ভয় আর একাকীত্ব মিশে থাকে, ট্রিপ শেষ হলে যে মানুষের প্রতি ভালোবাসা, স্বাধীনচেতনা এবং আত্মবিশ্বাস চারগুণ বেড়ে যায়, তাই যাই। 

নিজেকে ভালোবাসতে ভালো লাগে। 

আর ভালোবাসা না থাকলে মেয়ে খাবে কী?

শেয়ার করুন

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *