ঝাঁঝ

সক্কাল সক্কাল নিতিনদা খুব ঝাঁঝ মারতে মারতে বেরিয়ে গেল।

তনিমার অ্যান্টেনা খুব সূক্ষ্ম তরঙ্গ ধরতে পারে। তখনই বুঝেছে ওদের দিকে একটা গরম আছে। অথচ ঝাঁঝটা মারল দাসী তরঙ্গিনীকে।

ঝি বেটি বাথরুমে ঢুকেছে ঠিক তাক বুঝে বে টাইমে। সবসময় ওর ওটাই নিয়ম।

এমনিতেই তো বারোয়ারি  কাপড় ভেজাতে বসবে মুখ হাঁড়ি করে। তার ওপর সব্বার বাথরুম যাবার টাইমে। আর ঝাড়টাও খাবে তাই ।  এক কাঁড়ি সাবান, প্লাসটিকের টুল এইসব নিয়ে বসেছে থেবড়ে। নিতিনদা, পুতুদির কাপড় ক’টা আছে। আবার পুচুন-তনিমারও কাপড়চোপড়ের রাশও আছে। 

তখনই নিতিনদা ব্যাগ বগলে বাথরুমের সামনে এসে হাঁক পাড়ল, এ্যাই তরি, বেরো, বেরো বলছি বাথরুম থেকে। কথা কানে যায় না, না? তরি গজগজ করল, একন ভিজিয়ে দিই না , কাচব তো পরে, ময়লা ওঠে না নইলে… একটুখানি সবুর করো না বাপু।

চুপ কর, বেশি মুখে কথা ফুটেছে, না? বাথরুম তোমার শোবার ঘর? যা যাঃ অন্য কাজ করগে যা, পরে সাবান কাচবি। যাদের বাথরুম তারা যেতে পাবে না, খালি অন্য লোকের দখলদারি।

নিতিনদার গজগজানি শুনলেই হুজুরে বান্দা হয়ে নিতিনদার মা, মানে তনিমার পিশশাশুড়ি, মানে নলিনীবালা এসে হাজির হবেন। আর জানাই কথা, কেবল একজনের হয়েই, নিতিনদার হয়েই কথা বলবেন। তবে ঝাঁঝ নেই, মুখে মিষ্টি। 

এ্যাই, এ্যাই তরি, আয় না একটু বেরিয়ে আয়, ক’মিনিটের তো ব্যাপার। পিশি তরিকে বেশি বকতেও পায়না, কাজের লোক সমঝিয়ে চলে। যেরকম পোলাও সমঝাতে হাঁড়ির বুক ধরে গেলেই অল্প অল্প জল ঢালা, হাঁড়ির মাথায় চাপানো কাঁসিতে যে জল গরম হচ্ছে। কাজের লোক সামলানো ওই পোলাও সমঝানোর মতই। অথবা আরো অনেক বেশিই কঠিন। লোক  চলে গেলে ত কাঁড়ি কাপড়ে পিশিকেও হাত লাগাতে হবে। সে এক নিত্যি অশান্তির ব্যাপার। তরির কাছেও ভয় খেয়ে আছে পিসি। মাঝে মাঝেই ত সে জানান দেয় তার দর্প। বলে বসে কাজ ছেড়ে দেবে। সে জন্যেই বোঝানোর চেষ্টা করছে।

তবে পিশি নিতিনদার ভয়ে যেন জুজু! বাব্বাঃ! ছেলে পেটে ধরেছিল বটে।

তনিমার পিশশাশুড়ি তনিমার শ্বশুরবাড়ির হাল ধরেছিল সেই কবে। তনিমার শ্বশুর শাশুড়ি দুজনেই মরে ভূত, যখন শাশুড়ি চোখ বুজলেন তখনই পিশির আগমন ঘটেছে। তার অনেক পরে তনিমার বিয়ে হয়ে এই বাড়িতে বউ হয়ে আসা।

তার চার বছরের মাথায় তরুণের পটল উত্তোলন।

তনিমার বরটা যে এইভাবে টেঁশে যাবে ভাবেনি কেউ, তনিমা ত ভাবেইনি। বরটা থাকলে তনিমারও পায়ের তলায় জমি থাকত। বাড়ির মালিকানা সরাসরি তনিমার ও তার বছর সতেরো-আঠারোর মেয়ে পুচুনের ওপর বর্তায়, অথচ এ বাড়িতে তারাই যেন থাকে দু নম্বরির মত, আশ্রিতের মত,  জড়োসড়ো হয়ে, পিশির আন্ডারে, নিতিনদার হাততোলা খেয়ে। এমন সোনায় বাঁধানো কপাল নিয়ে এসেছিল এ সংসারে তনিমা!

উত্তর কলকাতার এমন একখানা বাড়ি। যত ভাঙাচোরাই হোক, তার ভ্যালু তো আছে। মাথা গোঁজার ঠাঁই কে দিচ্ছে এ সংসারে এই বাজারে, অন্যথা। লাথিঝাঁটা খেয়ে হলেও এ বাড়ি থেকে নড়বে না তনিমা। হকের জিনিস, নড়ার প্রশ্নই নেই। বাড়ি সারায় না ওরা। কে সারাবে। তবু ভাঙা ফাটা নিয়েই থাকতে হবে। বাসস্থান বড় বালাই। শরিকি বাড়িতে ত হাত লাগালেই মামলা মোকদ্দমা। তনিমার শ্বশুরগুষ্টির আরো খান কয়েক মেম্বার এদিক ওদিক অন্ধকার ঘরগুলোতে সেঁধিয়ে আছে। একটা ইঁট বা পাটকেল ভেঙে পড়ুক একবার, উঠোনে গিসগিসে হয়ে বেরোবে, চেঁচাবে, গাল মন্দ করবে পরস্পরকে, ইঁট কোথা থেকে ভেঙে বেরুল তার ইতিহাস অনুসন্ধান করবে, কার দোষে পাটকেল পড়ল তা নিয়ে পাড়া মাথায় করবে। গ্রীষ্মে ফাঁকা পিঠে যেরকম হঠাত গুড়িগুড়ি ঘামাচির উদয়, তেমনি কোন ঝামেলা হলেই কুটুম্ব আত্মীয় তুতোভাইদের উদয় ও ঝালাপালা করে পারস্পরিক দোষারোপ। 

ওদিকে পিশির মেয়ে পুতুদি, সে তনিমার পিশতুতো ননদ হয়। ও মা, কোথাত্থেক কিছু না, হঠাৎ দু বছর আগে,  বিয়ে ভেঙে সেও এসে জুটে গেল। তনিমা ত বলে, এবাড়িতে কারুর আস্ত বিয়ে নেই। পিশি আর তনিমার কপাল পোড়া, তাই বৈধব্যযাতনা। ননদের ডাইভোর্স, আর নিতিনদা বিয়েই করল না। পুচুন মাঝে মাঝে রেগে গিয়ে গালাগাল দিয়ে বলে, এ শালার বাড়িতে সব অ্যাবনর্মাল। সায়েন্স পড়ছে পুচুন। টুয়েলভে উঠেছে। বলে, মা, হারগিস এ বাড়িতে থাকব না। বাইরেই যাব পড়তে। সে,  ও যদি বাইরে যায় ত কে ওকে আটকাবে। মানাই বা করে কে। তবে বাইরে পড়ারও তো খরচ অনেক। তনিমার বাপের বাড়ি থেকে আনা সোনাগুলো সব শেষের দিকে। তনিমার ছোট্ট চাকরিতে আর ক’টাকা হয়। টিউশন করে এখন চালালেও, এর পর ইঞ্জিনিয়ারিং-এ চান্স পেলে টেলে সে তো আর টিউশন করতে সময় পাবে না। বরং অনার্স নিয়ে কলকাতাতেই থাকুক, তনিমার সঙ্গে থাকুক। পুচুন না থাকলে ত নিতিনদারা আরো পায়ের তলায় চেপে রাখবে তনিমাকে, একলা পেয়ে। কোণঠাসা বেড়ালের মত হয়ে যাবে ও। ফ্যাঁস ফোঁস করেও পার পাবে না। 

চাই কি, তনিমাকে কোন ছুতো করে বাড়ির বাইরেও করে দিতে পারে। পুচুন তনিমার সব। তনিমাকে বাঁচায় বুক দিয়ে। ও না থাকলে ওর মায়ের তো আরো কেউ নেই।

 ২

বাড়িটা ভেঙেচুরে পড়ছে। নিতিনদা সবসময় এমন ভাব করে যে পরের বাড়ি সারাতে সারাতে ওর জান কয়লা হয়ে গেল। অবশ্য ওর দিকটাও ভাবার আছে। মায়ের দায়িত্ব নিতে গিয়ে বেচারা বিয়েই করতে পারল না। এ বাড়ি ওর মামার বাড়ি অথচ মামারা চোখ বোজার পর, মামাতো ভাইটাও মরে গেল। সব পুরুষমানুষের দায়িত্ব গিয়ে পড়ল নিতিনদার ওপর। বোন ডাইভোর্স নিয়ে চলে এল, বোনের বিয়েতে খরচাপাতি যা করেছিল সব লস। স্টিলের আলমারি, রট আয়রনের খাট সব গিলে বসে গেল বোনের শ্বশুরবাড়ি। 

এমতাবস্থায় , কারুকেই দুষবার তো নেই। কেউই আবার কারুর হাত তোলাও খেয়ে নেই।

সকালে রোজ তনিমার ঘরের বাইরের উঠোনে নানা রকম নাটক হয়, দেখতে থাকে সে। এই নাটকগুলো যত তেতো লাগে, ততই এ নাটকে মজে যায়। মনে হয় এর বাইরে জগত নেই।

পুচুন জানালা বন্ধ করে পড়তে বসে। পারলে এ বাড়ি ছাড়া এক আকাশবাড়ি করে সে। নিজের মত জগত পারলে বানায়।

তনিমাকে বকে, মা তুমি এঁটুলির মত এদের সব বাজে কথা, বাজে ভাবনার মধ্যে লেগে রয়েছ? মা, মন তুলে নাও। জানালা আটকে থাকো, গান শোন।

যেমন নিতিনদার খাওয়াদাওয়ার গল্পগুলো।

রোজ একই আখ্যান।

নিতিনদাকে ভগবান নেই নেই করেও বপু একখান দিয়েছে বটে। বেশ মোটা। বেশি স্ফীত উদরপ্রদেশটাই। সে উদরের চিন্তা ওর একমাত্র আনন্দ, ধ্যান জ্ঞান।

আর সব আবদারটাই মায়ের ওপর। মানে তনিমার পিশশাশুড়ির ওপর।

রোজ সকালে অফিস বেরোনর আগে একপ্রস্ত খাবার নিয়ে কথা বলবে। পিশির হাত থেকে টিফিনবক্স নিতে নিতে বলবে, কী দিয়েছ ওতে? রুটি? রুটি কেন কর, রোজ রোজ, পরোটা করতে পারো না? এই  দিয়ে শুরু হয়।

তরকারি সেই একই করেছ। টিফিনে খাবার সময় জুড়িয়ে যায়, কোনো টেস্ট তো পাইনা। কেন, আলুপেঁয়াজভাজা করতে পারো না ? কতটুকুই বা তেল লাগত। বড্ড কিপ্টে তুমি, মা।

পিশি যেদিন কলমি শাক করবে সেদিন কচুর শাক না হওয়ার দুঃখ করবে, যেদিন পুঁই করবে সেদিন পালং না করার জন্য অনুযোগ জানাবে। সদাই খাওয়া নিয়ে ঘ্যানর ঘ্যানর।

বিগত কুড়ি বাইশ  বছর ধরে এই দেখছে তনিমা।  না অতদিন না, তনিমার বর যতদিন ছিল ওকে নিয়ে, ছোট্ট পুচুনকে নিয়ে ব্যস্ত ছিল, কেই বা কাকে দেখত। তার পর পর দিয়েই লক্ষ্য করতে শুরু করল, নিতিনদার এই খাওয়ার পাঁচালি।

তনিমার রান্না খুব কম, ছিমছাম। মেয়ে যা খায় তাই রাঁধে। মেয়ে যা খায় না, বাড়িতে ঢোকায় না। তনিমার নিজের আবার সাধ আহ্লাদ আছে? একটা আলাদা রান্নাঘর আর কোত্থেকে পাবে, একটা চিলতে বারান্দার কোন টিন দিয়ে ঢেকে রান্নাবাড়ি খেলতে খেলতেই গোটা সংসার হয়ে গেল তার। জীবন আদ্ধেক চলে গেল। 

পুচুন যেমন ফুলকপি ভাজা ভালবাসে। ওইটা করে রুটি দিয়ে। কিম্বা বেগুনভাজা রুটি। আর মাংস। পারলে অল্প চিকেন এনে রাঁধে। ওকে কয়েকটুকরো দেয় আর ঝোল আলু তনিমা খেয়ে নেয়। বিধবা তনিমার ঢং দেখে পিসশাশুড়ি বাঁচেন না যেন। ওঁর মুখ সদাই বেঁকে আছে। নাক শিঁটকে আছে তনিমার রান্নাঘরের গন্ধে। নিজে নিরামিষ খেয়ে আছেন সেই কবে থেকে, তাই ত আজো তনিমার আমিষ খাওয়া দেখলে তাঁর গা গুলোয়। তার চুল বাঁধা, হালকা রঙ শাড়ি না পরে উজ্জ্বল রং পরা। সবেই কেমন কেমন লাগে। 

তনিমার রান্নাঘরে চিকেন হচ্ছে, গন্ধ পেলে নিতিনদার নোলা সকসকায় বুঝি। পিশি আবার চিকেনটা আনাই পছন্দ করেনা। রাঁধেও না। পুতুদিও রাঁধে না। মাঝে মধ্যে ওরা মাটন আনে। রোববার করে। সারা দুনিয়া গন্ধে ম ম করে। অনেক কষে কষে মাংসটা করে।

সেই সেই দিনগুলো আবার পুচুনের জন্য তনিমার খুব কষ্ট হয়। কিন্তু পুচুন দাঁতে দাঁত চিপে সেদিন আবার বলবে, আজ  আমাকে খিচুড়ি করে দাও মা। পরে অনেক টাকা করব, তখন মাটন খাব… এখন কী দরকার।

তনিমারো কেমন একটা লাগে। এত খরচা করে দু টুকরো মাটন কার পাতে দেবে। তার চেয়ে সপ্তাহে দু’দিন চিকেনটা করে, মেয়েটা একটু প্রোটিন পাক।

নিজে আপিসে টিফিন নিয়ে যেত না তনিমা। ছোট সদাগরি আপিস, জনা চার পাঁচেক লোক। বড় সাহেবের কাচের ঘরে চা বানানো হয়, সে চা তনিমাই বানায়, আর তখনই বিস্কুট চায়ের ভাগ পায়। বেরুলেই বাইরে মুড়িমাখা পায়, সে মুড়ি অনেকটা কিনে চা দিয়ে খেয়ে তার টিফিন হয়ে যায়। এমনিও কম খাওয়া ভাল, অম্বল কম হয়, রোগা থাকা যায়। 

বড় সাহেবে ঘোষবাবু প্রায়ই তনিমার দিকে কেমন একটা করে তাকিয়ে বলেন, এখন ত রাস্তার চায়ের দোকানেও ইনডাকশন, একটা নিজেও নিয়ে দেখুন না তনিমা ম্যাডাম। যে জিনিস বেচছেন, তা নতুন পোযুক্তি। নিলে জীবনটাই হয়ত পালটে যাবে। 

সত্যিই রাস্তার চায়ের স্টলেও ইনডাকশনের ওপর মগ রেখে জল গরম করে। দেখেছে তনিমা। তাদের কোম্পানি ওটাই বেচে। ওই কালো চ্যাপটা যন্তরটা। কিন্তু নিজে কখনো ব্যবহার করার কথা আগে ভাবেনি তনিমা।

এককালে নলিনীবালার শ্বশুরঘর ছিল, স্বামীর পদবির মাপ মতন জমিদারি প্যাটার্নের বাড়ি ছিল, গয়না শাড়ি জমিজমার অহংকার ছিল। কিন্তু স্বামী ছিলেন রাগি, চন্ডাল। 

উচ্চন্ড রাগের কারণে সামনে যা পেতেন একদা সব ভেঙে চুরে দিতেন দিব্যপ্রসাদ বাবু। বউ নলিনী , বাচ্চাগুলো, মানে নিতিনদা আর পুতুদি, সব্বাই তটস্থ থাকত। এ ব্যাপারটা ভেতরে ভেতরে উপভোগও করতেন দিব্য, রক্তে জমিদারি, রক্তে বিশাল বংশের মর্যাদা কিনা। লোকে আড়ালে তাঁর পৌরুষের খ্যাতি করত, তাও টের পেতেন।

নলিনীবালা কখনো সরাসরি কথা বলতে পারেননি স্বামীর মুখে। আর একবার যদি তুমি সরাসরি কথা  বলার অভ্যাস হারাও, কারোর সাথেই আর বলতে পারবে না। জমাদার বা কলের মিস্তিরি-র সংগেও না। মানে পুরুষমানুষ হলেই তাকে কোনো কথা বলার আগে পাঁচবার ভাবতেন, মুখ যেন কে আটকে ধরত। মেয়েদের সঙ্গে অবশ্য কোনো সমস্যা নেই। কাজের মেয়ে, তস্য মেয়ে, তাদের মুখ খারাপ করেন নি, কিন্তু বিঁধিয়ে বিঁধিয়ে শুনিয়ে দিতে পারতেন বেশ। সে ভাবে ভেবে দেখলে পুরুষদের সব অন্যায় আবদার সহ্য করে নেওয়া আর মেয়েদের কারুকে কোনদিন ছেড়ে কথা বলেননি নলিনী। মেয়েদের পোশাক, মেয়েদের চলনবলনের উপর খবরদারি করে স্বামীসকাশে  নিজের কথা না বলাটাকে উশুল করে নিতেন উনি। 

শুরু হয়েছিল একেবারে শুরুতেই।  সামান্য সামান্য কারণে স্বামীর চটে ওঠা দিয়ে। অথবা কিছুটি না বলে ভুরু কুঁচকোন দিয়ে। তারপর দাঁত খিঁচুনি, তারপর চীৎকার। এক বছরের মাথায় চীৎকার আর বছর চারেকের মাথায় রেগে জিনিস ভাঙা। 

এই সব হতে হতেই কেমন পাভলভ সাহেবের কুত্তার মত কন্ডিশন হয়ে গেলেন নলিনী। যে কোনো কথা বলতেই দু’বার ভাবতে শুরু করলেন, এতে স্বামী চটে যাবেন কিনা। চটবেন না হয়ত সত্যি তাও চটতে পারেন ভেবেই সব কথাকে একটা অদ্ভুত আধাখ্যাঁচড়া করে ভাসিয়ে দিতেন হাওয়ায়। 

কয়লা ফুরলে বাতাসকে ঘোষণা করতেন কয়লাটা ফুরিয়েছে। ঘোষণাও না, প্রায় মিনমিন বা ফিসফিস করেই বলতেন। 

এভাবেই কথা হত ওদের বাড়িতে। রান্নাঘরে প্রথম যখন ঠান্ডা মেশিন কিনেছেন সে মেশিনের কাগজ থাকে দিব্যবাবুর হাত- আলমারির ভেতরে। গিন্নি মিস্তিরি ডেকে ফেলেছিলেন ঠান্ডা মেশিনে ঠান্ডা হচ্ছেনা বলে, সে এসে বলেছিল কাগজ দেখাতে, কিন্তু দিব্যবাবুকে সরাসরি বলার সাহস নেই “কাগজটা বের করে দাও”। 

দিব্যবাবু কাগজ পড়ছিলেন, তখন নলিনী ঘুর ঘুর করতে লাগলেন আসেপাশে। মিস্তিরি এসে রান্নাঘর ততক্ষণে  অধীর হচ্ছে, বলছে কাগজটা বার করুন, কই ম্যাডাম। 

গিন্নি এটা ওটা ঝাড়ছেন মুছছেন যেন, এমনি একটা ভাব। কত্তা মুখ তুলে বললেন কী খুঁজছ?

গিন্নি আমতা আমতা করে বললেন, আচ্ছা সেই যে ফ্রিজিডেয়ার কেনা হয়েছিল না? কাগজটা যেন কোথায় রাখা হল সেবার…

কত্তা হুম! বলে উঠলেন। কাগজ বার করলেন। গিন্নি বকের মত গলা বাগিয়ে দেখতে লাগলেন। কিছু বললেন না। হাত ও বাড়ালেন না। 

যেন ছুঁতে নেই, অস্পৃশ্য, কিছুতেই তিনি ছোঁবেন না ওই ফাইল। যেন তাঁর অধিকার নেই। 

মধ্য বয়স গেল, প্রৌঢ়ত্ব এল। স্বামী মরতেই পুত্র নিতিন ওই জায়গাটি নিল। কাগজ মানেই লেখাপড়া, আর ম্যাট্রিক পাস, দুপুরে গপ্পোবই পড়া নলিনী যেন পড়তেই জানেন না। যেন অন্ধ। খঞ্জ ও অশক্ত এসব রাখতে। তাই আজো, জিনিসপত্রের এ এমসি, ইলেকট্রিক কোম্পানির বিল, কর্পোরেশনের কাগজ, যা কিছু  জমতে জমতে ফাইল ফুলতে থাকে সব নিতিনদার জিম্মায়। পুত্র বলে কথা। কত জিনিস এল গেল। কয়লয়ার উনুন গিয়ে কেরোসিনের স্টোভ, স্টোভ গিয়ে গ্যাস এল। তবু, প্রৌঢ়া হয়েও, নলিনী আজও স্পষ্ট করে কোন কথা বলেন না।  সব কথা ভাসিয়ে দেন। সপাটে সত্যি কথা এক লাইনে বলতে পারেন না। ভাসা ভাসা ছায়া ছায়া, সন্ধাভাষায় কথা বলেন। ততদিনে বড় হয়ে যাওয়া, মুশকো, ভদদরলোক হয়ে যাওয়া  নিতিনদাকেও কখনো কিছু বলতে পারলেন না। এইটা কোরো না, ওইটা ধোরো না এসব ত দূরস্থান। সমালোচনা বা নিন্দার ত প্রশ্নই ওঠেনা। 

আর তত বাবার মত মেজাজ হয়ে উঠতে লাগল নিতিনের। ধমক দিয়ে ছাড়া কথা বলেনা। অফিসে বেরুবার সময়ে সে অবধারিত শার্ট পায়না খুঁজে। 

   – মা, মা , আমার  শার্ট কই? 

সারা মহল্লা, শরিকি আত্মীয়দের জানান দিয়ে নিতিনের সকালের চিৎকার। 

অপরপক্ষ নীরব। আঙুল দিয়ে দেখান নলিনী।  

   -না না ওইটা না,  দামি শার্টটা। এই যে সেদিন কিনলাম?

   -কোথায় দেখলাম যেন। দাঁড়া খুঁজি।

ছেলে জানে যে মা-ই রাখে সব। মা ভাবটা করে, আসলে কিছুই রাখে না সে।  সব যেন পড়ে পড়ে থাকে। 

ঝাঁঝালো তিরিক্ষি মেজাজের নিতিনদা মাঝে মাঝে ট্যুরে চলে যায়। সে অনেকটা নিশ্চিন্তির সময় নলিনীবালার। ডিভোর্সি  বলে যে পুতুদি দাদার সামনে রা কাড়েনা সেও সে সময়ে মোবাইল ফোনে জোরে জোরে হিন্দি গান চালায়। চুল ব্রাশ করতে করতে বারান্দায় আসে, হাসে, তনিমার সঙ্গে গল্প করে। 

এবার কোভিডের ঢেউ আছড়ে পড়ার ঠিক আগে আগেই নিতিনদা গিয়েছিল লখনৌ, আর সেই যে মার্চের বাইশ তারিখ সেখানে আটকে পড়ল, পাক্কা চার মাসের ধাক্কা। আসতেই পারল না। কাজের জায়গা হলেও সেখানে ব্যবস্থাপাতি মন্দ ছিল না। লখনৌতে তার বন্ধুর বাড়ি, কলিগ কাম বন্ধু। তারা আদরেই রেখেছিল নিতিনদাকে। ঝাড়াঝাপটা মানুষ, বউবাচ্চা নেই, তাই ফেরার তেমন তাড়াও দেখা গেল না নিতিনদার। ফোন করে হা হুতাশ করত অবশ্য মুখে। নলিনী মুখ চুন করে রইলেন ক’দিন। নিজে আদর করে খাওয়াতে পারছেন না তাই নিতিনদা কত রোগা হয়ে ফিরবে এ শংকা বার বার প্রকাশ করেও নলিনী আড়াল করতে আর পারলেন না তাঁর ফাঁকা ফাঁকা ঘরের আরামটা। 

মেজাজি পুরুষের শার্ট হাতে কাছে এগিয়ে দেওয়া আর রোজ রোজ লুচিপরোটা করে টিফিন ভরে দেবার  চক্কর থেকে কিছুদিনের নিষ্কৃতি, কে বাজারে যাবে আর কে মাছ কিনে আনবের দুশ্চিন্তাকে হারিয়ে দিল।

প্রথমটা বাজার রেশন নিয়ে তনিমা আর নলিনী দুজনেই ব্যতিব্যস্ত হয়েছিলেন। তনিমাদের আপিস বন্ধ, ছোট একটা কনসার্ন বড়বাজারে, ইনডাকশন বিক্কিরি হয় দিল্লি থেকে এনে। সে বন্ধ হলে তনিমার মাইনেও বন্ধ। দু’মাস এভাবে বসে বসেই গেল। পুচুনের পড়া অনলাইন। সে মোবাইলে ডেটা ভরে ভরে জেরবার। তাও ক্লাসের পড়া কেটে কেটে আসছে। চ্যাঁ ক্যাঁ ভ্যাঁ সারাদিন। সকাল থেকে তনিমা জানালা ধরে দাঁড়িয়ে লকডাউন দেখত। 

দিন কতকের মধ্যে বাড়ি বয়ে সব্জি দিতে এল কিছু নতুন নতুন মুখের সবজিওয়ালা। কেউ ছিল কাগজ ওলা, কাগজ নেওয়া বন্ধ হয়েছে তাই সব্জির ব্যবসা ধরে নিয়েছে। এভাবেই মাছওয়ালাও এসে গলির মুখে রোজ সকালে হাঁক ডাক করে মাছ বেচতে লাগল। শুধু মুখোশ চড়াও আর বাড়ির সদরে নেমে গিয়ে হুকুম কর। 

রেঁধে কুল পাচ্ছিল না তখন তনিমা। ফাঁকা সময় কী দিয়ে ভরায়? বন্ধ হবার ঠিক আগে আগেই আপিস থেকে ওদের সবাইকে একটা করে ইনডাকশন দিয়েছিল, ফ্রি তে। সে আগুনে ধোঁয়া নেই, কালি নেই, মুখ লাল হয়না। গ্যাসের দাম আকাশ ছুঁচ্ছে, তাই নিয়ে পিসিশাশুড়ির সর্বদা মুখ ভার। কিন্তু তনিমার হেঁশেলে ইনডাকশন ঢুকেছে, সে ইশতক তার গ্যাস অর্ডার করা আর কবে পাওয়া যাবে সে চিন্তাও নেই। রান্না করা কত সহজ। শুধু স্টিলের বাটি স্টিলের গামলা বসাও আর নামাও। 

তার উশকো খুশকো, ঘামতেল গড়ানো মুখ হঠাৎ অদৃশ্য, এটা দেখে নলিনীর খুব বুক জ্বলেছিল। বলেছিলেন, আকাশে ভাসিয়ে, ও ইনডাকশন নিল, আমরাও ত নিলে পারি… নিতিনদা কর্ণপাত করেনি অবিশ্যি । তনিমার রাঁধা নিয়েও ঝাঁঝ মেরেছিল, খরচা বাড়ল আবার, ইলেকট্রিকের বিল ত সে-ই ভরে।  কত খরচ বাড়ল মিটারে, বিলে, তার নাকি সে হিসেব রাখবে, শাসিয়ে রেখেছিল। তা, হঠাৎ লকডাউন এসে পড়ে সেসব হিসেব এখন মুলতুবি আছে।

মার্চ এপ্রিল মে , খুব টেনেটুনে সংসার চলেছে। পাউডার সাবান কেনাও হয়নি। দেওয়াল ঘড়িও থেমে। ব্যাটারি কোথায় পাবে। পুচুনের খাতা ফুরিয়েছে কিন্তু সেসবও এখন নিত্যপ্রয়োজনীয়ের তালিকায় পড়েনা। তাই পেন্সিল খাতা কেনা হয়নি।

জুনমাসে একদিন তার আপিস ডেকে পাঠাল। মুখোশ এঁটে পৌঁছে গেল তনিমা। আপিস চার মাস আগেকার একটা আটকে রাখা মাইনের অংশ হাতে ধরিয়ে ওকে বাড়ি ফেরাল, তবে চাকরি যায়নি, এক শর্তে। সামান্য কমিশনে যদি কিছু আটকে থাকা ইনডাকশন উনুন বিক্রি করে দিতে পারে তনিমা। 

সেদিন ও বাড়ি ফিরল একটা বাড়তি ইনডাকশন নিয়ে। নলিনীর হাতে দিল। নলিনী অবাক। 

তনিমা বলল, আপিস থেকে দিয়েছে। 

দাম নিল না তনিমা। তার খাতে ইলেকট্রিকের বিল ত বাড়বে। সে নাহয় নতুন উনুনটার দাম নিজেই দিয়ে দেবে আপিসে। এমনিতেও ত কমিশন পেত। অনেকটাই সস্তা হচ্ছে এভাবে।

নলিনী অবাক আর হাসি হাসি মুখে তার দিকে তাকালেন। তারপরই যেন তাঁর ধাঁ করে কী একটা মনে পড়ে গেল। ছুট্টে ঘরে গিয়ে লাল কালিতে ছাপা একটা কাগজ এনে তনিমার সামনে ফেলে দিলেন। 

হাওয়ায় ভাসিয়ে বললেন, এই কাগজে কী লেখা আছে দেখ ত তনিমা। বলছে লাইন কেটে দেবে। কী যে হবে বাড়িটার! ভগবান আরো কত কী দেখব। এই বিশ সালটা বিষে বিষময় …

ইলেকট্রিক বিল। গত চার মাস ত বিল ভরাই হয়নি। নিতিনদা ত বাড়িতে নেই। লাইন দিয়ে ক্যাশে বিল দেয় এ বাড়িতে ত একজনই পুরুষমানুষ। 

তনিমা চুপটি করে বিল নিয়ে ফিরল। রাগে গা জ্বলছিল। ইনডাকশন দিয়ে খুশি করতে গেছিল সে কাকে? এই পিসিমা কি সহজ বস্তু? হাড়ে হাড়ে শয়তানি, বুদ্ধির তালগাছ। মুখ টিপে সংসারে থেকে থেকে এইসব প্যাঁচের বুদ্ধি পাকিয়েছেন ত খুব। ঠিক বিল জমা দেবার কাজটা তনিমার ঘাড়ে চাপিয়ে দিলেন ত?

পুচুন এক মিনিটে নিজের ফোনের অ্যাপ দিয়ে বিল ভরে দিল। তারপর মায়ের দিকে তাকিয়ে বলল, এবার থেকে তুমিই বিল  পে করে  দিও। আমি এক সেকেন্ডে করে দেব। আর এভাবে ত অনেক রিবেট ও পাবে। তাছাড়া তোমার রান্না আর আমার রাত জাগা নিয়ে কথা শোনাতেও ত ওরা পারবে না আর। 

শ্রমিক ট্রেনেই টিকিট কেটে শেষ মেশ ফিরে এসেছিল নিতিনদা। ফিরে দেখেছে মায়ের গ্যাসের ঘ্যানঘ্যান, তেল ময়লা ধুলোর কাঁদুনি, সব উধাও। কেমন যেন অন্য রকম আবহাওয়া। তনিমা নলিনীকে নতুন প্রযুক্তির উনুন দিয়ে যেন কিনে নিয়েছে। আর তনিমাই নাকি ইলেকট্রিক বিল ভরছে গত  দু তিন মাস। চারিদিক এমন দশ মাইল শান্তি কল্যাণ হয়ে গেছে যে বাড়িটাকেই আর চেনা যায়না। 

পুতু, এমনকি পুতুও আগের চেয়ে বেশি হাসিখুশি হয়ে গেছে যেন। আর নিচের, পাশের , ও দিকের, যত শরিক আছে সবাইকে টোয়েন্টি পারসেন্ট অফে ইনডাকশন বেচে চলেছে তনিমা। সারা পাড়া, যারা গ্রীষ্মের বিজবিজে ঘামাচির মতন যখন তখন জোট বেঁধে লাগতে আসত, ঝগড়া পাকাত তনিমা আর নলিনীদের সঙ্গে, সবাই কেমন যেন বন্ধু হয়ে গেছে এখন। 

আর হঠাৎ, একদিন, বাথরুমের নর্দমা আটকাল। নলিনী দেখেই ছুটে এসে ছেলেকে বললেন, অ্যাই নিতিন,  যা তো, জমাদারকে ডেকে নিয়ে আয়। নয়ত একটা প্লাম্বিং মিস্ত্রিই ধরে আন। 

মায়ের এমন সরাসরি কথা নিতিন জন্ম ইশতক শোনেনি। প্রথমেই খুব ব্যস্ততা দেখিয়ে  গজগজ করল। চির অভ্যেসে, ঝাঁঝ দেখাল, বলল, সে হবে খন, জমাদারকে অমন ডাকলেই পাওয়া যায় নাকি? এক ত এই ভাঙাচোরা বাড়ি।  ছাতে শ্যাওলা জমেছে, দেওয়ালে সব ঘড়ি অচল, আলো কেটে গেছে পাল্টানো হয়নি বারান্দার। বাড়িটার দেখভাল করা এক হয়রানি! 

আগের অভ্যেস ভুলে সটান সপাট উত্তর দিলেন নলিনীবালা, একেবারে ছেলের চোখে চোখ রেখেঃ

   -এদ্দিন ত আমরা তিনটে মেয়ে মানুষ ওই পুঁচকে মেয়েটাকে নিয়ে বেশ ত চালিয়ে নিচ্ছিলাম তখন তুই কোথায় ছিলি রে?  দাঁড়া, পুচুনকে বলি। এখন বোধ হয় মিস্তিরি ডাকারও একটা অ্যাপ বেরিয়েছে। ও ই ডেকে দেবে, তোকে লাগবে না। 

নিতিনের মুখ সেই যে হাঁ হল, বহুক্ষণ বন্ধ হল না চোয়াল।

শেয়ার করুন

6 thoughts on “ঝাঁঝ”

  1. Sebanti Ghosh

    সপাটে থাপ্পড়ের গল্প। চমৎকার ❤️

  2. prajnadipa halder

    দারুণ। দারুণ। জীবন বদলাক। জীবন বদলায়।

  3. দময়ন্তী

    এক্দম ঝাঁঝালো গল্প। দারুণ।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *