তোমার গল্প বলতেই হবে- অনুরাধা গান্ধীকে লেখা ভার্নন গঞ্জালভেস-এর চিঠি

ছাত্রজীবন থেকেই অনুরাধা গান্ধীর সঙ্গে কাজ করেন বিপ্লবী আন্দোলন কর্মী ভার্নন গঞ্জালভেস। ২০০৮ সালের ১২ এপ্রিল অনুরাধা গান্ধীর মৃত্যুর সময়ে মুম্বইয়ে জেলে বন্দি ভার্নন। জেলে বসেই দীর্ঘদিনের কমরেড আন্দোলনের সাথী অনুরাধার শহিদ হওয়ার খবর পান। সেখানেই  কমরেড অনু-র উদ্দেশে এই চিঠি-টি লেখেন। বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষিতে চিঠিটির গুরুত্বের কথা মাথায় রেখে মূল ইংরেজি থেকে বাংলা করে চিঠিটি আমরা প্রকাশ করলাম।

বর্তমানে, ভীমা কোরেগাঁও মামালায় অভিযুক্ত হয়ে গত আড়াই বছরেরও বেশি সময়ে জেলবন্দি ভার্নন সহ ১৫ জন আন্দোলনকারী। প্রান্তিক মানুষের লড়াইয়ের পাশে থাকা নিরন্তর যোদ্ধা ভার্ননসহ সকল রাজনৈতিক বন্দির মুক্তি চাই। 

প্রিয় অনু,

গরাদ প্রায় ইঞ্চি খানেক পুরু…তবু, প্রতি সকালে সূর্যের আলো এসে পড়ে জেলের এই ঘরে। এই গরমের দিনে সেই রোদ যেন আরও কড়া, আরও গনগনে…আগুনেরই মত হয়তো বা।

অথবা ’৭৩-এর সেই দিনটার মতো, যেদিন আমরা বিশ্ববিদ্যালয় বিল-এর বিরুদ্ধে মিছিলে হাঁটছিলাম? মনে পড়ে, তোমার? গনগনে রোদের মধ্যে, মিছিলের এমাথা থেকে ওমাথা লাফিয়ে বেড়াচ্ছ তুমি। আমার প্রথম মিছিল, আমার প্রথম তোমাকে দেখার অভিজ্ঞতা- প্রাণশক্তিতে উচ্ছল, উচ্চতা পাঁচ ফুটের খানিক বেশি হবে? আকাশের দিকে হাতের মুঠো ছুঁড়ে দিয়ে স্লোগান তুলছ তুমি। আর প্রতিটি স্লোগানের সঙ্গে লাফিয়ে উঠছ অল্প, ছুঁয়ে ফেলছ তপতপে সূর্যটাকে। হাতের মুঠোয় আকাশে আঘাত হানার স্পর্ধা যার, উচ্চতা কি তাকে আর আটকাতে পারে!

প্রথম দর্শনে তৈরি হওয়া ধারণা অনেক ক্ষেত্রেই স্থায়ী হয় না। কিন্তু তোমাকে প্রথমবার দেখে যে ছবিটা গেঁথে গেছিল, বহু বছর, বহু দশকেও সেই ধারণার বিশেষ বদল ঘটেনি। আরও কয়েকবছর পর তোমাকে মিটিং-মিছিলে বক্তব্য রাখতে দেখব, সংখ্যা দিয়ে, তথ্য আর তত্ত্বের নিখুঁত মিশেলে মেশিন-গানের গতিতে বলে যাচ্ছ তুমি। জানতে পারব তোমার আদর্শ, পরে যা হয়ে উঠবে আমাদের আদর্শ – আরও জানতে পারব এই মতাদর্শের প্রবক্তাদের মধ্যে তুমি এক অতি পরিচিত মুখ। কিন্তু আমি তোমাকে কোনওদিনই স্রেফ তাত্ত্বিক, দার্শনিক বা চিন্তাবিদের ধাঁচে ঠিক কল্পনা করতে পারিনি। এইসব বিশেষণে ধরা যাবে না তোমার এক আকাশ ব্যাপ্ত জীবন আর রাজনীতি – বিশেষ করে যখন তুমি শপথ নিয়েছ পৃথিবীকে স্রেফ ব্যাখ্যা নয়, বদলে দেওয়ার। নিজের জীবন দিয়ে বারবার দেখিয়ে দিয়েছ, তাত্ত্বিক বোঝাপড়া ও তার ব্যাখ্যাই যথেষ্ট নয়, মতাদর্শের জন্য লড়তে হবে – ছোট বড় নানা যুদ্ধক্ষেত্রে।

আর এই লড়াকু মানসিকতা তোমার কাছে ঠিক কতটা জরুরি ছিল তা আমি দেখি এক ফেব্রুয়ারির সন্ধ্যায়, তোমার নাগপুরের লক্ষ্মীনগরের ঘরে। আমি তখন সদ্য মুম্বই থেকে গেছি, বাইরের কনকনে ঠান্ডাকে ঠেকাতে জানলা বন্ধ করতে চাইছিলাম… আর তুমি ছিলে সেই যোদ্ধা যে দক্ষিণ মেরু অভিযানের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করছে। 

আচ্ছা, অনেক বছর পর যখন বস্তারের জঙ্গলের পথে পথে হাঁটছ, কাঁধে ঝুলছে রাইফেল, তোমার সেই প্রস্তুতি কি কাজে এসেছিল? এসেছিল নিশ্চয়ই। নাহলে আর তোমার ওই হাঁটুর বাত নিয়ে পাহাড় চড়লে কী করে! তবে, ছাত্র আন্দোলন, বস্তি আন্দোলন, নাগরিক অধিকার আন্দোলন, ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলন, নারী আন্দোলন, জাতি বৈষম্য বিরোধী আন্দোলন, সাংস্কৃতিক আন্দোলন ও আরও নানা ফ্রন্টের যুদ্ধে টিঁকে থাকতে শারীরিক প্রস্তুতির থেকেও বেশি জরুরি ছিল মানসিক প্রস্তুতি।

মানুষের মন জয় করা তোমার জন্য কোনওদিনই কঠিন ছিল না। লড়াকু মানুষ সব জায়গাতেই এক, তাই সংগ্রামের ভাষার সূত্রে খুব সহজেই তাদের লড়াইয়ের ভাগীদার হয়ে উঠতে পারতে, তাদের সঙ্গে মিশে যেতে পারতে তুমি। যদি বা কখনও ভাষা বাধা হয়ে উঠত, মাত্র কয়েক সপ্তাহেই তুমি শিখে নিতে নতুন ভাষা। ইংরেজি, মারাঠি, হিন্দির পাশাপাশি শিখে নিয়েছিলে গুজরাতি আর গোন্ডি, এমনকি দিব্যি কাজ চালিয়ে নেওয়ার মত তেলুগুও।

অনু জানো, সেদিন আমি ইপিডব্লিউ-তে কৃষ্ণা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অভিজ্ঞতার কথা পড়ছিলাম! আর সেটা পড়তে পড়তেই মনে হল, আচ্ছা তোমার অভিজ্ঞতার গল্প কেমন হত? আমাদের পুরুষ কমরেডদের পিতৃতন্ত্র যা কখনও সূক্ষ্ম, কখনও বা ঠিক ততটাও সূক্ষ্ম নয়, তার সঙ্গে যুঝে চলার অভিজ্ঞতা কেমন ছিল তোমার? একজন আন্দোলন কর্মী, নেত্রী, সংগঠক, কমিটি সদস্য, নীতি-নির্ধারক হিসেবে কী কী অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়ে যেতে হয়েছিল তোমায়, বিশেষত সেইসব পরীক্ষার মধ্যে দিয়ে যাওয়ার অভিজ্ঞতা কেমন ছিল, যে পরীক্ষা শুধুমাত্র মহিলাদের জন্যই ধার্য, সেই মহিলারা যারা বিপ্লবে অংশ নেওয়ার পথ বেছে নিয়েছে, এবং যাদের ওপর ন্যস্ত হয়েছে নেতৃত্বের ভার।

আমি অবশ্য এই অভিজ্ঞতাকে সবসময়ই খুব দূর থেকে বিক্ষিপ্তভাবেই ‘জানতে’ পারব। যেমন আমি জানি, আমাদের পুরুষদের মন কত সহজেই তোমার কাজকে আমাদের সর্বোত্তম পুরুষ কমরেডদের কাজের মাপকাঠিতে তুলনা করে নিক্তিতে মেপে নিতে চাইবে, অঙ্ক কষে নেবে মনে মনে। এও জানি, একজন পুরুষ সাথীর যে কথাকে সুচিন্তিত পরামর্শ মনে করা হয়, একজন মহিলা কমরেডের সেই একই কথাকে রাগারাগি বকাবকি হিসেবে ধরে নেওয়াটাই রীতি। পুরুষের ক্রোধকে যেখানে মনে করা হয় গৌরবের, মেয়েদের রাগ সেখানে শুধুই নাকিকান্না, পুরুষের চোখের জল মহান আর মহিলার ক্ষেত্রে তা শুধুই কাজ বাগিয়ে নেওয়ার অছিলা।  জানি, বিপ্লবী মননে কিভাবে উচ্চাকাঙ্ক্ষী পৌরুষ তার আধিপত্য বিস্তার করে, আর সেই পিতৃতান্ত্রিক ধাঁচার ভিতরে মহিলা কমরেডদের জোর করে পুরে ফেলার চেষ্টার বিরুদ্ধে তোমাদের মেয়েদের কী নিরন্তর এক লড়াই চালিয়ে যেতে হয়।

অনু, আমি জানি, আজ যা কিছু পরিবর্তন আসছে তুমিই প্রথম সেখানে কাজে নামতে। পিতৃতন্ত্র বিরোধী শুদ্ধিকরণ অভিযান আর সাধারণ সদস্য ও নেতৃত্বের মধ্যে মহিলাদের সংখ্যা বৃদ্ধি, আন্দোলনের ভিতরে ও বাইরে, পুরুষ আধিপত্যকে ধ্বংস করতে না পারলেও তীব্র আঘাত তো হানছে বটেই। কিন্তু, এ কথা তুমি ভালই বোঝো যখন কোনও পরিবর্তন আসে, তখনই আবার এমন কিছু জিনিসও রয়ে যায়, যা কিছুতেই বদলাতে চায় না। আর তাই শুধরানোর জন্য বারবার ধাক্কা দিয়ে যেতেই হবে। আর তোমার এবং/অথবা অন্য মহিলা কমরেডদের দৃষ্টিভঙ্গী থেকে তোমাদের গল্প বলে যেতেই হবে।

শুধু তোমার অভিজ্ঞতাই নয়, তুমি দেশের প্রতিটি কোণার যে হাজার হাজার আন্দোলনকর্মীর সঙ্গে কাজ করেছ তাদের প্রত্যেকের চোখ দিয়ে সবটা দেখেছ তুমি। মহিলাদের জন্য নীতি তৈরিতে অংশগ্রহণ করেছ, নেতৃত্ব দিয়েছ সেই নীতির প্রয়োগ কর্মসূচিতে। তোমার গল্পে তাই তফাৎ থাকবে, আর এই গল্পটা তো বলতেই হবে।    

এপ্রিলের যে সপ্তাহে কৃষ্ণা ইপিডব্লিউ-তে তাঁর কথা লেখেন, তখন আমি তোমাকে এটাই লিখতে চেয়েছিলাম। তোমাকে বলতে চেয়েছিলাম তোমার গল্পটা বলার চেষ্টা কর, কৃষ্ণার গল্পের সঙ্গে যে গল্প কথা বলবে কয়েক দশকের দূরত্ব থেকে। একটা গল্প যা দশ হাজার গল্প বলবে… কথা বলবে কৃষ্ণাদের সঙ্গে, অনুদের সঙ্গে এবং আগামীর  অসংখ্য মেয়ে আর ছেলেদের সঙ্গে।

কিন্তু অনু, তোমার সঙ্গে যোগাযোগ করা আদৌ সম্ভব কিনা সেটা বুঝে ওঠার আগেই খবরের কাগজ জানাল তুমি সেরেব্রাল ম্যালেরিয়ায় শহীদ হয়েছ – সেই সপ্তাহেই।

স্মৃতির পাহাড় নেমে আসছে, আর মাঝে মাঝে দু-এক ফোঁটা চোখের জল। প্রতিটা স্মৃতি চিৎকার করে সেই গল্প বলতে চাইছে– তোমার গল্প, সেই মেয়েটার গল্প, আমাদের গল্প। একটা গল্প যা নীতিবাগিশ না হয়েও হাজারটা নৈতিকতার জন্ম দেয়, একটা গল্প যা দাহ্য না হয়েও লক্ষ লক্ষ মনে আগুন জ্বালায়। একটা গল্প, যা কোনওদিন কোনও এক অনু বলবে।   

অনু, জেলের গরাদ প্রায় ইঞ্চি খানেক পুরু। কিন্তু লক্ষ লক্ষ মগজ আর কোটি কোটি মনের আগুনকে রুখবে তার সাধ্য কী!

হাজার হাজার আর এখন লক্ষ লক্ষ নতুন আন্দোলনকারী তোমার পদাঙ্ক অনুসরণ করছে, এগিয়ে যাচ্ছে তাকে ছাপিয়ে, তৈরি করছে নতুন দিগন্ত, সমস্ত বাধা-বিপত্তি এবং তাদের ধারকদের ভেঙেচুরে দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে তারা।

সারা পৃথিবীতে, এমনকি ভারতেও সাম্রাজ্যবাদ ও তাদের দালালরা আজ সংকটে, ক্রুদ্ধ জনতার মুষ্টিবদ্ধ হাতের সারি জানিয়ে দিচ্ছে শাসনের পুরনো উপায় তারা মানছে না, আর এই জনগণের সামনে পিছু হঠছে সাম্রাজ্যবাদ। হয়তো আমরা এভাবে কল্পনা করিনি…কিন্তু আমরা যে ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখেছিলাম জন্ম নিচ্ছে সেই আগামী…….আর অনু… সেই আগামীতে থাকব আমরাও।

তোমার,

ভার্নন।

শেয়ার করুন

3 thoughts on “তোমার গল্প বলতেই হবে- অনুরাধা গান্ধীকে লেখা ভার্নন গঞ্জালভেস-এর চিঠি”

  1. Prasanta Bhattacharyya

    এ তো চিঠি নয়, ইতিহাস ও পথনির্দেশিকা। যেমন আবেগঘন তেমনই যুক্তিনিষ্ঠ। মন ভরে গেল। ❤❤❤

  2. দীপাঞ্জন

    ধন্যবাদ, অনুবাদ করার জন্য, এই চিঠিকে বেছে নেওয়ার জন্য।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *