নারীবিদ্বেষ ও যৌন হেনস্থা: কবে সমাজ চিৎকার করে উঠবে?

প্রীতি কুমার রায়। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক। একাধিক যৌন হেনস্থার ঘটনায় অভিযুক্ত। বিশ্ববিদ্যালয়ের তদন্ত কমিটির রিপোর্টে দোষী সাব্যস্তও হয়েছেন। আসন্ন ভোটে দক্ষিণ বনগাঁ থেকে সিপিআইএম তাঁকে প্রার্থী ঘোষণা করে। সোশ্যাল মিডিয়াতে চূড়ান্ত বিতর্ক, গণহারে প্রতিবাদ জানিয়ে ইমেল যাওয়ার পর প্রার্থীপদ প্রত্যাহার করতে বাধ্য হয় সিপিআইএম। কারণ হিসেবে জানানো হয় “অসুস্থতা”। বলা হয়, যেহেতু আদালতের বিচারাধীন, তাই অসুস্থতার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু জানা যায় না, “যৌন হেনস্থায় অভিযুক্ত” এটা লিখতে আদালতের বিচারাধীন হওয়া কিভাবে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। 

মনোরঞ্জন ব্যাপারী। বাংলা সাহিত্য জগতের সেলিব্রিটি। আসন্ন ভোটে তৃণমূলের ক্যান্ডিডেট। ফেসবুকে একজন আদিবাসী মহিলাকে মলেস্ট করার কাহিনী লিখেছেন গর্ব করে। সোশ্যাল মিডিয়াতে বাচ্চা মেয়েদের পোশাক নিয়ে মর‍্যাল পুলিসিং করতেও পিছপা হননি। প্রত্যাশিতভাবেই প্রতিবাদ জানিয়ে গণ ইমেল করার পরেও ওঁর প্রার্থীপদ অক্ষুণ্ণই আছে।

উপরের উদাহরণ দুটি দলের, যারা আসন্ন ভোটে তিনটি প্রধান প্রতিযোগীর মধ্যে আছে। তৃতীয় দলটি, অর্থাৎ বিজেপি, নিয়ে আলাদা করে উদাহরণ দেবার প্রয়োজন নেই। ধর্ষকদের সমর্থনে মিছিল ইত্যাদি অভূতপূর্ব ঘটনা তারাই ঘটিয়েছে, এবং এটাই তাদের অ্যাজেণ্ডা। সবচেয়ে বেশি সংখ্যক ধর্ষণে অভিযুক্ত বিধায়ক এবং মন্ত্রী তাদের দলেরই। হাথ্রাস, উন্নাও, কাঠুয়া–  প্রতিটি ক্ষেত্রেই তারা বুঝিয়ে দিয়েছে, যে ধর্ষণ তাদের কাছে খুবই সাধারণ ঘটনা, এমনকি রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবেও তা ব্যবহারে তারা দ্বিধাগ্রস্ত নয়। মনুস্মৃতিকে আদর্শ মেনে চলা একটি দলের কাছ থেকে এর থেকে আলাদা কিছু প্রত্যাশিতও নয়। সমস্যা হল, বিজেপি বাদে বাকি দলগুলিতেও যৌন হেনস্থায় অভিযুক্ত সদস্যের সংখ্যা কম নেই, এমনকি আসন্ন নির্বাচনে তাদের প্রার্থীদের তালিকাতেও এরা স্থান পেয়েছে, যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। 

যে কোনো যৌন হেনস্থার অভিযোগ উঠলেই সবার আগে যেটা শুনতে পাওয়া যায়, সেটা হল, বিভিন্ন প্রকারের ভিক্টিম ব্লেমিং। অভিযোগের ধরন বদলায়, অভিযুক্তের রাজনৈতিক পরিচয় বদলায়, সোশ্যাল স্ট্যাটাস বদলায়, কন্সট্যান্ট থাকে শুধু সারভাইভরের ট্রমা আর তার দিকে ধেয়ে আসা এই অদ্ভুত নির্লজ্জ অযৌক্তিক প্রশ্নের ঝড়। অভিযুক্তের সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা যত বেশি, ভিকটিম ব্লেমিং-এর হিংস্রতার পারদ তত উঁচু। অভিযুক্ত সেলিব্রিটি হলে তো কথাই নেই। রিতম সেন থেকে রচিষ্ণু সান্যাল – সব ক্ষেত্রেই সারভাইভরকে কী ভয়াবহ আক্রমণের সামনে পড়তে হয়েছে তা আমাদের অজানা নয়। এই আক্রমণের কারণ আমাদের সমাজে যৌন হেনস্থা এতটাই নরমালাইজড, যে তার বিরুদ্ধে মুখ খোলাটাকেই অধিকাংশ মানুষ অ্যাবনরম্যাল মনে করেন। ফলে সারভাইভর যখন অ্যাবিউজের ট্রমা কাটিয়ে উঠে (বহু ক্ষেত্রে সেটাও সম্ভব হয় না) তাঁর ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা প্রকাশ্যে আনতে চান, তখন সারভাইভরদের এনারা যথেষ্ট অবিশ্বাসের চোখে দেখেন। এর সঙ্গে যোগ হয় সেলিব্রিটি, সাহিত্য- চলচ্চিত্র-রাজনৈতিক তারকাদের সাধারণ মানুষের চেয়ে অনেক উঁচু আসনে বসিয়ে ‘hero worship’ করার পরিণতি। এই আইকনরা যে আসলে রক্ত- মাংসের মানুষ, তাঁরা যে এই সমাজেরই অংশ এবং তার ফলে এই সমাজের যাবতীয় রিগ্রেসিভ এলিমেন্ট তাঁদের রক্তেও বিদ্যমান- এই সহজ সত্যিটা প্রায়শই ঢাকা পড়ে যায় আমাদের মাত্রাছাড়া তারকা-ভক্তির চাপে। ফলে এই তারকাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলেই আমরা প্রথমেই ভেবে ফেলি তা মিথ্যে, এবং এই সামাজিক প্রতিপত্তিকে কাজে লাগিয়েই প্রায় সমস্ত ঘটনায় পার পেয়ে যান তাঁরা, এবং আমাদের সচেতনতার অভাবের মূল্য চোকাতে হয় সারভাইভরদের। 

এই ভয়াবহ পরিস্থিতি আরো বিপজ্জনক হয়ে ওঠে যখন কোনোরকম দ্বিধাবোধ ছাড়াই রাজনৈতিক পার্টিগুলো থেকে যৌন হেনস্থায় অভিযুক্তদের ভোটের টিকিট দেওয়া হয়। গণতান্ত্রিক নির্বাচনে যারা ক্যান্ডিডেট হন, তারা প্রতিযোগিতা করেন মানুষের প্রতিনিধি হবার জন্য। প্রশ্ন হল, যে ব্যক্তি যৌন হেনস্থা্র দায়ে অভিযুক্ত, যিনি বেসিক কনসেন্ট বোঝেন না, তিনি কী করে হতে পারেন জন সাধারণের প্রতিনিধি? মানুষের ‘না’ বলার অধিকারকে যিনি সম্মান করতে অক্ষম, তিনি মানুষের দাবিকে সম্মান জানাবেন, তার দাবি আদায়ের জন্য লড়বেন- এই দাবি আদৌ বিশ্বাসযোগ্য? কারণ যৌন হেনস্থা তো একধরনের ক্ষমতার আস্ফালন। নিজের শরীরের উপর মানুষের অধিকারকে গায়ের জোরে, প্রাতিষ্ঠানিক বা আর্থিক ক্ষমতার জোরে যে অস্বীকার করতে পারে, রাজনৈতিক ক্ষমতা পেলে সে কত ভয়ংকর হয়ে উঠতে পারে তা সহজেই অনুমেয়। ক্ষমতার অপব্যবহারের দৃষ্টান্ত আছে যার, তাকে নির্বাচনে প্রার্থী হিসেবে দাঁড় করানো আসলে গণতন্ত্রেরই পরিপন্থী। 

যৌন নির্যাতকদের নির্বাচনের টিকিট দেওয়ার একটাই অর্থ হয়- সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক দলটি যৌন নির্যাতনকে আদৌ গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করে না। এই গুরুত্ব না দেওয়াতেই যাবতীয় সমস্যার বীজ।  

কারণ আমরা এমন একটি মিসোজিনিস্ট রিয়েলিটিতে বসবাস করি, যেখানে দেশের সুপ্রিম কোর্ট  আদেশ দেয় ধর্ষকের এর সঙ্গে ধর্ষিতার বিয়ে দেওয়ার। আমরা একটি এমন দেশে বসবাস করি, যেখানে ম্যারিটাল রেপ আইনের চোখে অপরাধ নয়। মোট যৌন নির্যাতনের ঘটনার অতি সামান্য শতাংশই অভিযোগ হিসেবে নথিবদ্ধ হয়, আদালত অবধি পৌঁছয় আরও সামান্য, জাস্টিস পাওয়ার কথা তো ছেড়েই দিলাম। এদেশে আসিফার ধর্ষণের ভিডিওর খোঁজ এত বেশী, যে পর্ণ সাইটের সবচেয়ে বেশিবার সার্চ হওয়ার লিস্টের প্রথমে থাকে। যৌন নির্যাতন নিয়ে সাধারণ মানুষের এই পরিমাণ ডিসেন্সেটাইজড হবার কারণ আমাদের দৈনন্দিন জীবনে রেপ কালচারের জাঁকিয়ে বসা। এবং এই রেপ কালচার আরো পুষ্ট হয় ক্রমাগত রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের নারীবিদ্বেষী বক্তব্যে। পার্ক স্ট্রিটে ধর্ষণের ঘটনায় রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী যখন অবলীলায় বলে দেন তা ‘সাজানো ঘটনা’ তখন তাতে শুধু তাঁর ব্যক্তিগত দৃষ্টিভঙ্গিতে ধর্ষণকে লঘু করে দেখা হয় না, বরং রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীর সামাজিক প্রভাবে এহেন মন্তব্য ধর্ষণকে সামাজিক ভাবে মানুষের মননে আরো গুরুত্বহীন করে দেয়। রেপ কালচার সমাজে আরো বেশি করে গেঁড়ে বসার মূলে থাকেন এই রাজনীতিক ও সেলিব্রিটিরাই, কারণ তাদের সামাজিক প্রভাব অনেক বেশি। ফলে এই বিপুল সোশ্যাল ক্যাপিটাল নিয়ে যখন কবীর সুমন রেপ থ্রেট দেন, তখন তার অগণিত ফ্যানদের কাছে এই বার্তাই যায়, যে প্রতিপক্ষকে রেপ থ্রেট দেওয়া আদৌ অপরাধ নয়, কারণ কবীর সুমন অবধি তাই করে থাকেন। (প্রাক্তন) মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসু যখন বানতলায় ধর্ষণের ঘটনার পর বলেন “এমন তো কতই ঘটে”, তখন তা মানুষের কাছে এই বার্তাই দেয়, ধর্ষণ একটি তুচ্ছ ব্যাপার। জনগণের প্রতিনিধিদের সোশ্যাল ক্যাপিটাল এত বেশি বলেই তাদের বক্তব্য থেকে রেগুলার বেসিসে উপছে পড়া নারীবিদ্বেষ এত বিপজ্জনক। এবং একটিও রাজনৈতিক দল নেই, যাদের একাধিক সদস্য এর দায়ে দোষী নয়। এই পরিস্থিতিতে যখন ধর্ষক কোনও রাজনৈতিক পার্টির জনগণের মুখ হিসেবে ভোটে দাঁড়ান, তখন পার্টির তাকে টিকিট দেবার সিদ্ধান্ত শুধু সারভাইভরদের ট্রমাকেই অগ্রাহ্য করে না, বরং সামাজিকভাবে মানুষের কাছে কন্সেন্ট ভায়োলেশনের ঘটনাকে আরো গুরুত্বহীন করে দেয়। পরিসংখ্যান বলছে ২০০৯ থেকে ২০১৯- এই দশ বছরে লোকসভা নির্বাচনে ক্যান্ডিডেটদের মধ্যে ‘ক্রাইম এগেইন্সট উইমেন’ এর দায়ে অভিযুক্তের সংখ্যা ২৩১ শতাংশ বেড়েছে (অ্যাসোসিয়েশন ফর ডেমোক্রেটিক রিফরমস এবং ন্যাশনাল ইলেকশন ওয়াচ এর সার্ভে অনুযায়ী)। পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ। 

তাই এই অবস্থায় যেকোন দলের যৌন হেনস্থায় বা যেকোন প্রান্তিক কমিউনিটির বিরুদ্ধে বিদ্বেষমূলক কাজে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে ক্যান্ডিডেট দাঁড় করানোর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করা প্রয়োজন।

একজন ধর্ষকের সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা বাড়িয়ে তোলার অর্থ শুধু সারভাইভরদের আরো কোণঠাসা করে দেওয়াই নয়, সেই ধর্ষককে আরো সুযোগ করে দেওয়া তার সামাজিক প্রভাবের অপব্যবহার করার এবং বিপদের মুখে ঠেলে দেওয়া আরো বহু মানুষকে। ধর্ষক রাজনৈতিক ক্ষমতায় বলীয়ান হবার ফল কী হতে পারে, তা উন্নাও-এর ঘটনা আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে। সেই ভয়াবহ ঘটনার পরেও ভোটে অংশগ্রহণকারী রাজনৈতিক দলগুলির কাছে নিজেদের সংশোধনের কোন ইনসেন্টিভ নেই, কারণ বছরের পর বছর যৌন নির্যাতনে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে ভোটে দাঁড় করিয়েও তাদের প্রার্থীপদ প্রত্যাহারের দাবিতে সেভাবে সংগঠিত প্রতিবাদের সামনে পড়ার দৃষ্টান্ত তাদের চোখের সামনে নেই। সেজন্যই রাজারহাট-নিউটাউনের সিপিআইএম ক্যান্ডিডেট সপ্তর্ষি দেবের নামে একাধিক রেপ থ্রেট, অ্যাসিড অ্যাটাক থ্রেট, এমনকি মলেস্টেশনের অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও তার প্রার্থীপদ প্রত্যাহার করা হয় না, আইনজীবীর আত্মহত্যার সঙ্গে তৃণমূল নেতা মদন মিত্রের যোগ নিয়ে তদন্ত হয় না সরকারি চাপে, মনোরঞ্জন ব্যাপারী প্রকাশ্যে শ্লীলতাহানির কথা বুক ফুলিয়ে বলেও ভোটের টিকিট পেয়ে যান। বিনা প্রতিবাদে এদের নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে দেওয়া আসলে এদের অপরাধকে উপেক্ষা করা, যে বিলাসিতা আমাদের পক্ষে অসম্ভব। প্রতিটি দলকে তাদের সমস্যাজনক প্রার্থীদের টিকিট প্রত্যাহার করতে বাধ্য করা প্রয়োজন, যদি তা সম্ভব নাও হয়, অন্তত প্রতিবাদটুকু রেজিস্টার করা প্রয়োজন। প্রতিটি দলের, প্রতিটি সমস্যাজনক প্রার্থীর বিরুদ্ধে। নারীবিদ্বেষ এবং যৌন হেনস্থাকে নরম্যালাইজড হতে দেওয়ার বিরুদ্ধে প্রতি পদক্ষেপে প্রতিরোধ না গড়ে তুলতে পারলে এই রাজ্যকে উত্তরপ্রদেশ হওয়ার থেকে আটকানো যাবে না। 

শেয়ার করুন

1 thought on “নারীবিদ্বেষ ও যৌন হেনস্থা: কবে সমাজ চিৎকার করে উঠবে?”

  1. সায়নী ব্যানার্জ্জী

    খুব গুরুত্বপূর্ণ সৎ একটা লেখা। কবীর সুমনও রেপ থ্রেট দিয়েছিলেন সেটা আমার একেবারেই অজানা ছিল। এই বিষয়ে বিস্তারিত জানতে চাই।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *