পুরুষালি ভোট-উপত্যকায় অপর

অসমের সংবাদপত্রে প্রকাশিত একটি ঘটনায় চোখ পড়েছিল গত মাসে। অসমে গত ২২শে মার্চ তারিখ থেকে ঘরে ঘরে ভোটকর্মীরা আশি-ঊর্ধ্ব বয়স্কদের, সত্তর-ঊর্ধ্ব করোনা থেকে বেঁচে ফেরা রোগীদের বা শারীরিকভাবে অসুস্থ নাগরিকদের ভোট আনছিলেন। আমাদের রাজ্যেও এই পদ্ধতিতে ভোট হয়েছে। বয়স্ক ভোটারের সংখ্যা কম কিছু নয়। এবছর ইলেকশন কমিশন তাঁদের কথা মাথায় রেখে এই আপাত মানবিক নিয়ম চালু করেছে। চলচ্ছক্তিহীন মানুষেরা বাড়ি বসেই পোস্টাল ব্যালটে ভোট দিয়েছেন। কিন্তু যে খবরটির কথা বলছি, তা ভয়ংকর অভিযোগ বহন করে। অসমের এক বৃদ্ধা ইতোমধ্যেই অভিযোগ করেছেন,  জোর করে তাঁকে দিয়ে নির্বাচন কমিশনের লোক পদ্মফুলে ভোট দিতে বাধ্য করেছেন৷ সেই সময় বদ্ধ ঘরে পরিবারের লোকেরা ছিলেন না নিয়ম মেনে, ছিলেন শুধু ভোটার ও নির্বাচন কমিশনের লোক। সেই সুযোগের অপব্যবহার করে সরকারী কর্মী একটি নির্দিষ্ট চিহ্নে তাঁকে ছাপ দিতে বাধ্য করেন বলে অভিযোগ।

নিঃসন্দেহে ন্যক্কারজনক অসততা। কিন্তু তার বাইরেও ঘটনাটি আমার চোখে ধরা পড়েছিল এক বৃহত্তর সত্যের রূপক হিসেবে। জানতে ইচ্ছা জেগেছিল, অচেনা সেই বৃদ্ধার ভোট কি কোনোদিনই ছিল তাঁর নিজস্ব? মহিলাদের ভোট, সে যে বয়সের মহিলাই হোন, তা কি সত্যি মহিলার? পরিবার থেকে রাষ্ট্র, কে তাকে নিয়ন্ত্রণ করে কীভাবে?

প্রিসাইডিং অফিসার হিসেবে ভোট নিতে গিয়েছিলাম দক্ষিণ চব্বিশ পরগণার এক প্রত্যন্ত গ্রামে। সারাদিনমান অশক্ত বৃদ্ধারা এলেন কেউ নাতি, কেউ ছেলের কাঁধে ভর দিয়ে। সেই ছেলেরা-নাতিরা  মা-দিদিমার ভোটটি দিয়ে দিতে চাইলেন৷ তাদের কড়জোড়ে জানালাম, ভোটকক্ষ পর্যন্ত এগিয়ে দিতে পারেন, ভোটটা ভোটার নিজে দিলেই ভাল হয়৷ পুত্র-পৌত্ররা সকলেই খালি বলেন, ভোটার ‘অত বোঝে না।’ ইঙ্গিত মহিলার মানসিক ও বৌদ্ধিক অপরিপক্কতার দিকে। বয়োজ্যেষ্ঠা নারীও তাঁদের কাছে শিশুতুল্য, কারণ সে নারী। নারী কি ভোটের কিছু বোঝে? তাও জোর করি, নিজের ভোটটি নিজেকেই দিতে হবে। কারণ কক্ষ পর্যন্ত এগিয়ে দিলেও একটি বোতাম টিপতে পারবেন না, অতটা অশক্ত সেই নারীদের মনে হয় না৷ দেখি, সেই মহিলারাও যেন সংশয়ে। সত্যি কি তিনি নিজে ‘অত বোঝেন?’

আর যে নারীরা অশক্ত নন, যাঁরা নিজের পায়ে হেঁটেই ভোট দিতে এলেন, তাঁরা? হিন্দু বিয়েতে যেমন করে নারীর গোত্রান্তর হয়, তেমন করেই পিতৃগৃহের রাজনৈতিক চিহ্ন ত্যাগ করে নারী পতিগৃহের প্রিয় রাজনৈতিক চিহ্নে আত্মসমর্পণ করেছে, এমনটা বিরল নয়, বরং এমনটাই দস্তুর। প্রায়শই পাড়া-প্রচারে দেখা যায়, কোনো শ্বশুরমশায় হয়ত পার্টি প্রচারককে কথা দেন, ‘আমাদের বাড়ির সব ভোট তোমার পার্টিতেই যাবে’৷  কোন ভরসায় কথা দেন তিনি? তিনি কী করে বিবাহ-হেতু পরিবারে আগত নারীটির রাজনৈতিক বিশ্বাস সম্পর্কে অবগত হলেন? তাঁর নিজের স্ত্রী বা কন্যাই বা কেন তাঁর পছন্দের দলেই ভোট দেবে, যদি না তারা ঘটনাচক্রে একই দলের সমর্থক হয়?

দুপুরের দিকটায় যখন বুথ প্রায় ফাঁকা, তখন তিনজনের মধ্যে একজন পোলিং এজেন্টের বিশেষ তৎপরতা বলে দেয়, বিশেষ কেউ এসেছে। ওড়নায় মাথা ঢাকা এক মেয়ে। উক্ত এজেন্টের স্ত্রী। ইভিএম-এর পাশে নতুন এক যন্ত্র  বসেছে, যার নাম ভিভিপ্যাট। সে সম্পর্কে সে অবগত ছিল না৷ এজেন্ট তাকে বাইরে থেকে আদেশ দেয়, পাশের যন্ত্রতে খেয়াল রাখতে হবে কোন চিহ্ন দেখা যায়৷ সে বেচারা হকচকিয়ে যায়। ‘তোমার দ্বারা কিস্যু হবে না’, বলে তাকে ধমকে দেয় এজেন্ট সর্বসমক্ষে।

অবশ্য বাড়ির মহিলা শুধু নয়, মহিলা পোলিং অফিসারদের সম্পর্কেও ‘কিস্যু জানে না’ অভিব্যক্তি থাকে এঁদের চোখে মুখে প্রথম কয়েক ঘণ্টা। আবার কখনও এঁরা শিভ্যালরি দেখিয়ে মহিলা পোলিং অফিসারের সুরক্ষা সম্পর্কে আশ্বাস দেন, ‘ভাববেন না, আমরা তো আছি৷’ মহিলা প্রিসাইডিংকে কর্তব্যে দ্বিগুণ তৎপর থাকতে হয়। তিনি ডিসিআরসিতে পুরুষ সহকর্মীদের কাগজপত্রে ভুল করতে দেখেছেন বহুবার। কিন্তু জানেন, তাঁর যে কোনো ত্রুটি দাখিল করা হবে একটি লিঙ্গ প্রজাতির অযোগ্যতার প্রমাণ হিসেবে।

*****

ভোটের মাস যখন ঘনিয়ে আসে, তখন গণতন্ত্রের সার্কাসের নানা স্তরে নারীবিদ্বেষ ও লিঙ্গ-অসাম্যের ঢালাও প্রদর্শনীও জমে ওঠে। প্রার্থী নারীও বাদ যান না এই বিদ্বেষের কোপ থেকে৷ কোথাও প্রার্থীর নামে ভুয়ো পর্ন ছবি প্রচার করা হয়, যেমনটা হয়েছে মুর্শিদাবাদের জলঙ্গি বিধানসভায় নির্দল প্রার্থী রাফিকা সুলতানার ক্ষেত্রে। আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার পর অপরাধী ধরা পড়েছে। কিন্তু এসেছে অনলাইন হুমকিও। ‘পরীর ডানা কাইটা ফেলবো।’

এ অবশ্য নতুন কিছু নয়। ঊনত্রিশটি দেশে সমীক্ষা করে দেখা গেছে যে  ৪৪% মহিলা রাজনীতিবিদদের খুন,ধর্ষণ বা অপহরণের হুমকি পেতে হয়, বা সত্যিই এসব অপরাধ ঘটে তাঁদের সঙ্গে। যেমন নন্দীগ্রামে যেতে গেলে আটকে দেওয়া হয় মহিলা প্রার্থী মীনাক্ষী মুখার্জীকে আর বলা হয়, তাঁর আসার কথা  ‘আগে জানলে ভয়ংকর পরিণতি হত’৷ এ কিসের হুমকি?

ভোট এলে নিরন্তর যে নারীবিদ্বেষী ভাষা আমারা শুনি নেতাদের মুখে, তার সঙ্গে মেলালে বেমানান ঠেকে যাবতীয় ইস্তেহারের নারীভোটার-মুখী প্রতিশ্রুতি। পশ্চিমবঙ্গে শোবিজ-খ্যাত কয়েকজন নারী গোমাংস রান্না করার কথা বলায় গণধর্ষণের হুমকি পেয়েছিলেন একটি রাজনৈতিক দলের কর্মী-সমর্থকদের থেকে। এ ঘটনায় প্রিভিলেজ-প্রাপ্ত, শহুরে নারীরাও আতঙ্কিত হয়ে পড়েছিলেন। তবে কি তাঁদের যেমন খুশি খাওয়া-থাকা-পোশাক পরার আপাত স্বাধীন যাপনের দিন শেষ হতে চলল? পরবর্তীকালে অবশ্য দেখা গেল, সেই আক্রান্ত নারীদের একজন ভোটে দাঁড়ালেন৷ সংসদীয় রাজনীতি তাঁর ভিক্টিমহুডকে কাজে লাগাল, যেমন প্রায়শই লাগায়৷

ওদিকে নন্দীগ্রাম পর্ব নিয়ে মুখ্যমন্ত্রীর নতুন বয়ানের পর তরজা জমে উঠল। রটানো হল, ২০০৭ সালে ধর্ষিত ও মৃত তাপসী মালিক নাকি আসলে ধর্ষিতই হয়নি৷ এমনটাই নাকি বলেছেন তার বাবা। খোঁজ নিয়ে অবশ্য জানা গেল, তেমন কিছুই তিনি বলেননি। এখনও একই ব্যক্তিবর্গ ও একই দলকে নিষ্ফল আক্রোশে দুষে চলেছেন তিনি। অথচ তাপসী মালিকের ধর্ষণ সেদিনও অস্বীকার করা হয়েছিল, আজও করা হল৷ একুশ বছরের ব্যবধানে একই অস্বীকারের ধারাবিবরণী রচিত হল।

রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী নারী হওয়ার তাঁকে ঘিরে নারীবিদ্বেষী মন্তব্যও কম হল না৷ সম্প্রতি খবর, যে সুরে প্রধানমন্ত্রী ‘দিদি, ও দিদি’ বলে মুখ্যমন্ত্রীকে ডেকেছিলেন দু-একটি জনসভা থেকে, সেই সুর নাকি ভারি পছন্দ হয়েছে এ রাজ্যের রাস্তার রোমিওদের। সেই সুরেই নাকি তারা ‘ইভটিজিং’ করছে আজকাল৷ দেশের প্রধানমন্ত্রী যদি রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীর উদ্দেশে এমন ভঙ্গিতে কথা বলেন, তাহলে বাকিরা অভব্যতার সাহস পান। কার্যক্ষেত্রে দেখা গেল, মুখ্যমন্ত্রীর তথাকথিত ‘চোট পাওয়া’ পাটি সভায় ঈষৎ তুলে রাখতে হচ্ছে বলে, গোড়ালি দেখা যাচ্ছে বলে, বিরোধী দলের রাজ্য সম্পাদক সামাজিক শালীনতার ধ্বজাধারী হয়ে ওঠেন৷ বলেন, ‘মেয়েদের ঠ্যাং দেখানো শোভা পায় না।’ মুখ্যমন্ত্রীকে বারমুডা পরার পরামর্শ দেন তিনি। তা নিয়ে যখন তাঁকে টিভি চ্যানেলে প্রশ্ন করা হয়, তখন প্রশ্নকারিনীকে পুরুষালি ধমক দিয়ে তিনি বললেন, ‘ন্যাকামি করবেন না।’ আসলে বলতে চাইলেন, ‘প্রশ্ন করবেন না।’ কোনো পুরুষ প্রশ্ন করলে হয়ত তাঁকে এই ঔদ্ধত্যের সম্মুখীন হতে হত  না। একই অনুষ্ঠানে (যার বিষয় ছিল ‘ভাষার সৌজন্য’) অনিল বসু বা বিনয় কোঙারদের নামও উঠে আসে। অনিল আর বিনয় কুমুখ হিসেবে কুখ্যাত হয়েছিলেন ওই নন্দীগ্রামের সময়ে, যে নন্দীগ্রাম নাকি ‘ঘটেনি’। মেধা পাটকার নন্দীগ্রামে যেতে চাইলে, বলা হয়েছিল, নন্দীগ্রামের মেয়েরা নাকি তাঁকে ‘পাছা দেখাবে’। বর্তমান মুখ্যমন্ত্রীর বেশ্যায়নও হয়েছিল।

যাইহোক, বর্তমান শো-এ  স্বতঃপ্রণোদিত ভাবে একজনই মনে করালেন,’ফ্যাসিজমের অনেক বৈশিষ্ট্যের একটি হল মহিলাদের অসম্মান করা।’ অন্যরা বোধহয় ভয় পাচ্ছিলেন, দুর্মুখের সঙ্গে বিবাদ করলে না অপদস্থ হতে হয়! অথচ শান্ত গলাতেও প্রতিবাদ করা যায়, এবং অপদস্থ হওয়ার ঝুঁকি নিয়েও প্রতিবাদ করাই উচিত। সঞ্চালকের হাতে অনুষ্ঠানের রশিটি ধরা থাকে। তিনি দুর্মুখ বক্তাকে থামাতেও পারতেন৷ কিন্তু তা করেননি তিনি। খানিক পরেই সংখ্যাগুরু পুরুষ অন্য আলোচনায় ঢুকে গেলেন এত মোলেয়েম ভাবে, যেন কিছুই ঘটেনি৷

ভোটের হোর্ডিং, ভোটের স্লোগান, ভোটের গান, ভোটের মিমেও নারীবিদ্বেষের ছড়াছড়ি। ‘বাংলা নিজের মেয়েকেই চায়’-এর উত্তরে বলা হয়, মেয়ে ‘পরায়া ধন’, তাকে বাপের বাড়ি থেকে উৎখাত করাই ভাল৷ কখনও আবার নারীবিদ্বেষ আর সাম্প্রদায়িকতা মেশে একে অপরের সঙ্গে। বলা হয় ‘বেগম’ জিতলে বাংলা ‘মিনি পাকিস্তান’ হবে৷ কখনও এক পার্টির মহিলা প্রার্থীর সঙ্গে আরেক প্রার্থীর মহিলা প্রার্থীর শারীরিক সৌন্দর্যের তুলনা করে বিরোধী মহিলা প্রার্থীকে বলা হয় ‘কাজের মাসি’। ‘কাজের মাসি’ শ্রেণির প্রতি বাবু মহলের শ্রেণিগত ঘৃণা বে-আব্রু হয়ে পড়ে।

আট বছরে আসিফার ধর্ষণ ও মৃত্যুর পাপ ঢাকতে বাংলাদেশের পূর্ণিমা শীলের নাম তুলে আনা হয় এক রাজনৈতিক পার্টির গানের ভিডিওতে। পূর্ণিমা শীল বাংলাদেশের একজন সম্মাননীয় ‘সারভাইভার’ তথা সাংসদ। বাংলাদেশে তের বছর বয়সে ধর্ষিতা হয়েছিলেন এই সংখ্যালঘু (অর্থাৎ হিন্দু) মেয়েটি। তাঁর অনুমতি ছাড়াই তাঁর নাম হাজার বার উচ্চারণ করে বর্ডারের এই পারে গান বাঁধা হয় মুসলিম-বিদ্বেষ উস্কাতে। ভুলিয়ে দেওয়া হয়, গুলিয়ে দেওয়া হয় এই সত্য যে পূর্ণিমা শীল ও আসিফা,  দুজনেই স্ব স্ব দেশে সংখ্যালঘু ধর্মীয় সম্প্রদায়ের বালিকা ছিল ধর্ষণকালে এবং সেটাই ধর্ষণের কারণ। অবশ্য পূর্ণিমা শীলের ধর্ষণের পর ধর্ষকের সমর্থনে বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা নিয়ে মিছিল হয়নি, এখানে তা-ও হয়েছে।

*****

ভোট চলাকালীন যে প্রত্যক্ষ হিংসা তথা হিংসার হুমকি দেখা গেল, তাও ভীষণভাবে পুরুষকারের প্রকাশ। শীতলকুচির একটি দুটি কেন্দ্রে যখন ভোটারের রক্ত ঝরল, তখন তাকে আমরা লজ্জাজনক ভেবেছিলাম। কিন্তু দেখা গেল শীতলকুচিতে ‘গলি মারো সালোঁকো’ -র যে বাস্তবায়ন ঘটেছে, তাকে শুধু সমর্থনই করা হল না, তাকেই মডেল মেনে বুথে বুথে রক্ত ঝরানোর হুমকি দিতে থাকলেন এক নির্দিষ্ট দলের নেতারা। এই বিষবৎ পৌরুষের আস্ফালনই এই ভোটের নির্যাস।

ভোট রঙ্গে লিঙ্গগত হিংসার নিরিখে সবচেয়ে দুর্ভাগ্যজনক ঘটনাটি ঘটল তারকেশ্বরে গত ৫ই এপ্রিল তারিখে।  রামনগর বোর্ড প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যে ভোটকেন্দ্র হয়েছিল ৬ তারিখের ভোটের জন্য, সেখানে ভোটের ডিউটিতে মোতায়েন এক সেনা জওয়ান এক বালিকাকে যৌন হেনস্থা করে বলে অভিযোগ। রাত আটটা নাগাদ বালিকা যখন বাড়ি ফিরছিল, তখন তাকে জোর করে বাগানে টেনে নিয়ে গিয়ে টাকার লোভ দেখিয়ে সেই জওয়ান যৌনতা করতে চায়। গ্রামের লোক চিৎকারে ছুটে আসে৷ মেয়েটিকে উদ্ধার করে। থানায় রিপোর্ট করে৷ শিশু সুরক্ষা বিভাগে খবর যায় ও চেয়ারপার্সন অকুস্থলে ছুটে যান। তিনি চিঠি দেন নির্বাচন কমিশনকে যে জওয়ানকে আটকে রাখা হোক, আইনকে যথাবিহিত ব্যবস্থা নিতে দেওয়া হোক। POCSO, ২০১২-তে তাকে অভিযুক্ত করা হোক।

কিন্তু দুদিন পর প্রেস বিবৃতিতে শিশু সুরক্ষা বিভাগের চেয়ার পার্সন জানালেন যে, নির্বাচন কমিশন সেই জওয়ানকে ছেড়ে দিয়েছে। তাকে পাঠিয়ে দিয়েছে দশ তারিখের ডিউটিতে পরের নির্বাচন কেন্দ্রে। শুধু তাই নয়, উলটো এফআইআর করেছে সিএপিএফ, বাচ্চা মেয়েটি ও তার পরিবারের বিরুদ্ধে। তারা মেয়েটির চরিত্র তুলে দোষারোপ করতেও ছাড়েনি৷ আট দফায় নাকি রাজ্যে ভোট হচ্ছে সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ ভোট নিশ্চিত করতে। অথচ নাগরিকের সুরক্ষা নিশ্চিত করার ছলে খুনের সঙ্গে সঙ্গে যৌন নির্যাতনও করা যাচ্ছে৷ যখন রাষ্ট্র সেই নির্যাতক সেনার হয়েই সাফাই গায়, তখন যৌন নির্যাতন তথা ভিক্টিম ব্লেমিং এক রাষ্ট্রীয় শোষণের রূপ পায়। ছোটবেলার ছড়া মনে পড়ে যায়।

‘এলাটিং বেলাটিং সই লো

কিসের খবর হইল

রাজা একটি বালিকা চাইল

 কোন বালিকা চাইল?’

******

সার্বিকভাবে যে সমাজ পিতৃতান্ত্রিক, সেখানে স্বাভাবিক ভাবেই ভোটে নারীর ভূমিকাও ক্রীড়নকের বা নির্যাতিতার৷ প্রিসাইডিং অফিসার লিঙ্গ-রাজনৈতিক কর্মী হলে নজরে পড়ে, তাঁর বুথে, একই স্কুলবাড়িতে অবস্থিত পাশের দুটি বুথে, এবং ডিসিআরসিতে মোলাকাত হওয়া অন্য প্রিসাইডিং অফিসারেদের বুথেও, একজনও ট্রান্সজেন্ডার ভোটার নেই। নজরে পড়ে, সেক্টর অফিসার ভোট শেষে পুরুষ -মহিলা ভোটারের সংখ্যা নিয়ে যান, ট্রান্সজেন্ডার ভোটারের কথা জিজ্ঞাসাও করেন না। নজরে পড়ে, তাঁর ফার্স্ট পোলিং অফিসারের হাতে কমিশনের দেওয়া একটি ‘ট্যালি শিট’ ছিল, যেখানে তিনি প্রতি পুরুষ ও নারী ভোটারের ক্ষেত্রে যথাক্রমে  ‘মেল’ ও ‘ফিমেল’ ঘরে একটি করে টিক দেবেন৷ কিন্তু সেই ট্যালি শিটেও ট্রান্সজেন্ডার কোনো স্থান ছিল না৷ অথচ প্রিসাডিং অফিসারের জন্য  নির্দিষ্ট কিছু ফর্মে প্রথামাফিক ট্রান্সজেন্ডার কলাম-টি আছে, যেখানে চোখ বন্ধ করে তাঁকে আর্যভট্ট আবিষ্কৃত শূন্য বসাতে হবে। সেইসব সরকারি কলাম পরিহাস হয়ে থেকে যায়। তাঁরা কোথায় গেলেন? ক’জন ভোট দিলেন? না দিলেই বা কেন দিলেন না? হিসেব পাওয়া যায়?

ভোট আসে ডি-ভোটারের দেশেও। অসম এনআরসিতে ভোট দিয়ে সরকার আনার পর যে নাগরিকরা বেনাগরিক হয়ে গেছে, তাদের মধ্যেও যে সংখ্যাগরিষ্ঠই মহিলা বা ট্রান্সজেন্ডার! রেজিয়া বিবি মারা গিয়েছিল লাইনে। কামরূপ থেকে সে এসেছিল নগাঁও। ৬০ বছর বয়সে ২৫০ কিমি পথ পাড়ি দিয়ে এসেছিল এনআরসির শুনানিতে৷ লাইনে জানিয়েছিল, অসুস্থ লাগছে, পাত্তা পায়নি আধিকারিকদের কাছে। তারপর রেজিয়া বিবি ঢলে পড়ে। সায়েরা বেগমেরও একই বয়স। তার নাম লিস্টে উঠেছিল শেষ পর্যন্ত। কিন্তু লিস্ট দেখার আগেই উদ্বেগে কুয়োয় ঝাঁপ দেয় সে। শেফালি হাজং আদিবাসী মেয়ে। সে ইট বইছিল নির্মীয়মান ডিটেনশন ক্যাম্পের জন্য। অথচ তার নিজেরই নাম বাদ গেছে নাগরিক তালিকা থেকে৷ যে বাবা শৈশবেই মা-মেয়েকে ছেড়ে গেছে, তার সঙ্গে লিংকেজ প্রমাণ করবে কী করে সে? দিনমজুরকে রুজি-রুটির ব্যবস্থাও দেখতে হয়। ঠিকাদার তাকে ডিটেনশন ক্যাম্প তৈরির কাজে লাগাল, যে ডিটেনশন ক্যাম্পই শেফালির ভবিষ্যৎ ঠিকানা।

ভোটাধিকারের নিজস্ব যা কিছু সীমাবদ্ধতা, তা নারী ও ট্রান্সজেন্ডার-এর ক্ষেত্রে আরওই প্রকট হয়ে ওঠে। ভোটের প্রান্তরেও লিঙ্গগত অপর, অপর হয়েই থেকে যায়। তাকে সামনে রেখে পুরুষালি রাজনীতি ফায়দা তোলে। পরিবারের পুরুষ পরিবারের নারীকে প্রার্থী করে দেয় দলীয় বা ব্যক্তিগত স্বার্থে৷ অথবা নিদেন পরিবারের নারীকে বাধ্য করে নিজের পছন্দের দলে ভোট দিতে। চাইলে ভোটের খাতিরে তাকে নির্যাতন করা যায়, বাচিক ভাবে অপমানও করা যায়। আবার প্রয়োজন মতো অদৃশ্য বা বেনাগরিক করে দেওয়াও চলে। এভাবেই ভোট আসে, ভোট যায়, পিতৃতান্ত্রিক উপত্যকায়।

শেয়ার করুন

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *