প্যারি কমিউন– ইতিহাসের (অ)দৃশ্যমান মেয়েরা

প্যারি কমিউন– শ্রমিক শ্রেণির প্রথম রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের প্রচেষ্টা। প্রথম সর্বহারার একনায়কতন্ত্র। ‘স্টর্মিং দ্য হেভেন’। ৭২ দিনের এই অসমসাহসী লড়াই, যা পরবর্তীতে শ্রেণীসংগ্রামের দিক নির্দেশে নির্ধারণকারী ভূমিকা রাখবে, সেই লড়াইয়ের শুরুর দিন থেকে প্রথম সারিতে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন প্যারিসের শ্রমজীবী মেয়েরা। লড়াইয়ের সূত্রপাত ঘটেছে তাঁদের হাত ধরে।

শ্রেণিসাম্য প্রতিষ্ঠার লড়াই, নারী মুক্তির সংগ্রাম, সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের ইতিহাস, লিঙ্গ-রাজনীতির চলন অথবা এর মাঝের যা কিছু; প্যারি কমিউনে অংশগ্রহণকারী হাজার হাজার শ্রমিক মহিলার গল্প ছাড়া সে আলোচনা অসম্পূর্ণ, সে আলোচনা অসম্পূর্ণ বিপ্লবে অংশগ্রহণকারী সমাজতন্ত্রী নেত্রীদের ছাড়া। অথচ গুগল্-এ এলিজাবেথ সার্চ করলে ব্রিটেন-এর রাণী থেকে হলিউডের অভিনেত্রীর তথ্য ভেসে উঠবে, এলিজাবেথ দিমিত্রিফের হদিশ সেখানে অমিল। একইভাবে প্যারি কমিউন-এর বিভিন্ন তাত্ত্বিক ও প্রায়োগিক আলোচনা-পর্যালোচনায় উঠে আসে না আন্দ্রে লিও, প্যলে মিঙ্ক বা ইউনিওয়ন দে ফামা (Unioin des femmes)-এর কথা।

প্যারি কমিউনের দেড়শো বছর পর, এক অন্ধকারাচ্ছন্ন সময়ে দাঁড়িয়ে আমরা যখন পড়ে নিতে চাইছি সেই ইতিহাস, অতীতের লড়াইয়ের মধ্যে থেকে খুঁজে নিতে চাইছি বর্তমান সংগ্রামের রসদ, তখন জরুরি হয়ে ওঠেন লুইজি মিচেল, নাতালি লেমেল, বিত্রিক্স এক্সকোফন, মেরি-ক্যাথরিন রিগিসার্ত, জোসেফিন ক্যুরবয়িস, অ্যানা জ্যাকলার্ড ও আরও বহু নামহীন ফরাসী শ্রমজীবী মহিলা, যারা আজ থেকে দেড়শো বছর আগে পিতৃতান্ত্রিক সমাজের বেঁধে দেওয়া গন্ডি ছাড়িয়ে বেরিয়ে এসেছিলেন লড়াইয়ের ময়দানে, অস্ত্র তুলে নিয়েছিলেন সমাজব্যবস্থা বদলের আকাঙ্ক্ষায়, শ্রেণিহীন সমাজের স্বপ্নে । 

কমিউনেরর বৌদ্ধিক ও তাত্ত্বিক কর্মকাণ্ডের অন্যতম চালিকাশক্তি ছিলেন মহিলা কমিউনার্ডরা। এই মহিলা কর্মীরা তৈরি করেন রাজনৈতিক ক্লাব ও ভিজিল্যান্স কমিটি, গড়ে তোলেন মেয়েদের শ্রমিক সংগঠন, মেয়েদের স্কুল। নিজেদের রাজনৈতিক মতাদর্শ প্রচারে রাডিক্যাল পত্রপত্রিকা প্রকাশ করেন, মিছিলে হাঁটেন, বক্তব্য রাখেন সভা সমিতিতে। যুদ্ধক্ষেত্রে রান্নার কাজে যুক্ত হন, নার্সের কাজ করেন, যোগ দেন যোদ্ধা হিসেবে। এবং শেষে ভার্সাই বাহিনীর আক্রমণের মুখে, ব্যারিকেডে দাঁড়িয়ে অস্ত্র হাতে সরাসরি লড়াই করেন শত্রুর সঙ্গে।

শ্রেণি ও লিঙ্গ অসাম্যকে ভেঙে চুরমার করে দিতে চান প্যারিসের শ্রমজীবী এই মহিলারা। প্রশ্ন তোলেন গির্জার আধিপত্য ও সম্পদ নিয়ে। বিবাহ ও কনফেশন-এর মতো ব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জ করেন। সমাজ, অর্থনীতি, রাজনীতি ও যুদ্ধক্ষেত্রের লিঙ্গ-ভূমিকাকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করান, তৈরি হয় এক নতুন নারীবাদী ভাষ্য। পরবর্তী শতাব্দীর ইউরোপসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের নারী আন্দোলন ও বিপ্লবী আন্দোলনের রূপরেখা তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে এই সমাজতন্ত্রী নারীবাদী রাজনীতি।   

প্যারি কমিউন: সূত্রপাত

বিসমার্ক শান্তিচুক্তির পর সরকারের নেতৃত্বে এসেই, জাতীয় সুরক্ষাবাহিনীকে নিজের নিয়ন্ত্রণে আনতে সচেষ্ট হন লিউ অ্যাডলফ তিয়েরস। সেনাবাহিনীকে নির্দেশ দেন শহরে থাকা প্রায় ৩০০টি কামান সরিয়ে ফেলতে হবে। নিরস্ত্র করতে হবে জনগণকে। সেই নির্দেশ মতো ১৮ মার্চ, ১৮৭১ ভোররাতে মন্তমার্ত্রে ও বেলেভি এলাকায় পৌঁছে যায় সেনাবাহিনী, দখল নেয় কামানের। কামান বয়ে নিয়ে যেতে যখন ঘোড়ার জন্য অপেক্ষা করছে সেনা, জেগে ওঠে প্যারিসের শ্রমিক বসতিগুলি। নিজেদের শরীর দিয়ে কামান আগলে দাঁড়ান প্যারিসের শ্রমজীবী মহিলারা। ঘোষণা করেন, কামান নিয়ে যেতে দেবেন না।  প্রায় ৬,০০০ সেনাকে ঘিরে ধরলেন প্যারিসের শ্রমজীবী জনতা। পাশাপাশি সৈন্যবাহিনীর সাধারণ কর্মীদের সঙ্গে কথোপকথন চালিয়ে যেতে থাকলেন প্রতিরোধকারীরা। উপস্থিত সেনাকর্মীদের প্রাতরাশে যোগ দেওয়ার আমন্ত্রণ জানালেন শ্রমজীবী এই মহিলারা। মনে করিয়ে দিলেন, সাধারণ সেনাকর্মী ও শ্রমজীবী মানুষের অভিজ্ঞতা, লক্ষ্য ও লড়াইয়ের অভিমুখ একই। বললেন, “আমরা, আমাদের ছেলেরা, আমাদের ভাইরা, সেনাবাহিনীতে রয়েছি আমরাই; আমরা সকলে ফ্রান্সের সন্তান, আমাদের একে অন্যকে হত্যা করার প্রয়োজন নেই”।

কামান নিয়ে যেতে না পেরে, সেনাপতিরা গুলি চালানোর হুকুম দিলে, হুকুম মানতে অস্বীকার করে সেনাবাহিনী। শূন্যে বন্দুকের বাট তুলে বিদ্রোহ ঘোষণা করেন সেনাকর্মীরা। জাতীয় সুরক্ষাবাহিনীর সেনাদের হাতে খুন হন সেনাপতি। বিদ্রোহের খবর পেয়ে ভার্সাই পালিয়ে যান তিয়েরস। ২৬ মার্চ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়, ২৮ মার্চ গঠিত হয় প্যারি কমিউন।

ইউনিওয়ন দে ফামা— এলিজাবেথ দিমিত্রিফ, নাতালি লেমেল 

এলিজাবেথ দিমিত্রিফ

১৮৭১-এর মার্চের ২৮-২৯ তারিখ নাগাদ কার্ল মার্কস ও ইন্টারন্যাশনাল-এর জেনারেল কাউন্সিল-এর দূত হিসেবে প্যারিস এসে পৌঁছন সমাজতন্ত্রী নারীবাদী কর্মী এলিজাবেথ দিমিত্রিফ। তখন তাঁর বয়স ২০। কমিউন বিরোধী প্রশাসনের চোখে ধুলো দিতে, ইন্টারন্যাশনাল-এর দেওয়া নকল পাসপোর্টে বিবাহসূত্রে প্রাপ্ত আইনি পদবী তমোনোভস্কায়া-র পরিবর্তে ঠাকুমার বিবাহপূর্ব পদবী ব্যবহার করেন এলিজাবেথ। দিমিত্রিফ একটি পরিচিত রাশিয়ান পুরুষদের পদবী হওয়ায় তাঁর প্যারিসে আসা প্রশাসনের নজরে পড়েনি। 

এলিজাবেথ দিমিত্রিফ-এর জন্ম রাশিয়ার এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে। অত্যন্ত অল্প বয়সেই কার্ল মার্কস-এর বিপ্লবী চিন্তায় আকৃষ্ট হয়ে রাশিয়ার সেন্ট পিটাসবার্গ-এর সমাজতন্ত্রী গোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত হন এলিজাবেথ।

সেই সময়ে রাশিয়ায় মেয়েদের বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার অনুমতি ছিল না, তাই স্কুলের পড়া শেষ করে দিমিত্রিফ পাড়ি দেন সুইৎজারল্যান্ড-এর জেনেভা শহরে। জেনেভায় যাওয়ার জন্য ‘ম্যারেজ অফ কনভেনিয়েন্স’-এ আবদ্ধ হন এলিজাবেথ। জেনেভাতে থাকাকালীন সেখানকার রুশ বিপ্লবীদের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন হয়। পড়াশোনার পাশাপাশি, সেখানে তিনি শ্রমজীবী মানুষদের সংগঠিত করার কাজে যুক্ত হন। এর কিছুদিনের মধ্যে গড়ে তোলেন ইন্টারন্যাশনাল ওয়ার্কিং মেন’স অ্যাসোসিয়েশন-এর রুশ বিভাগ। এরপর রুশ বিপ্লবীদের প্রতিনিধি হিসেবে লন্ডনে কার্ল মার্ক্স-এর সঙ্গে দেখা করতে যান, সেখান থেকে তাঁকে পাঠানো হয় প্যারিসে।

প্যারিস পৌঁছে, কমিউন সরকার ও স্থানীয় নারী আন্দোলনের কর্মীদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে পরিস্থিতি সম্পর্কে সম্যক ধারণা তৈরি করে নিতে চেষ্টা করেন দিমিত্রিফ। কমিউনের সঙ্গে থেকে আন্দোলনের গতি প্রকৃতি পর্যবেক্ষণ করেন। 

কমিউনে সপ্তাহ দুয়েক কাটানোর পর, এপ্রিল মাসের ১১ ও ১২ তারিখ কমিউন-এর অফিশিয়াল সংবাদপত্র ও কমিউনের দেওয়ালে ‘প্যারিসের মহিলা নাগরিকদের প্রতি আবেদন’ শীর্ষক একটি বিবৃতি প্রকাশ করেন। প্যারিসকে রক্ষা করতে নারী আন্দোলনের ডাক দেওয়া হয় সেই বিবৃতিতে। শ্রম ও সাম্যের রাজত্বকে স্বাগত জানানো হয়। বলা হয় শোষক ও শোষিতের চিরন্তন লড়াইয়ের কথা। শ্রমজীবী মেয়েদের সদ্যগঠিত বিপ্লবী সংগঠন ‘দ্য ইউনিয়ন অফ উইমেন ফর দ্য ডিফেন্স অফ প্যারিস অ্যান্ড এইড টু দ্য উন্ডেড’ (ইউনিওয়ন দে ফামা)-এ সকল শ্রমজীবী নারীকে যোগদানের আহ্বান জানানো হয়। 

গড়ে ওঠে ইউনিওয়ন দে ফামা প্যারি কমিউনের বৃহত্তম ও সবথেকে কার্যকরী সংগঠনগুলোর একটি। ইউনিওয়ন দে ফামা-এর কর্মসূচির মধ্যে অন্যতম ছিল শ্রমিকের মালিকানায় কো-অপারেটিভ তৈরির মাধ্যমে উৎপাদন সম্পর্কের পরিবর্তন, মালিক-শ্রমিকের শোষণমূলক সম্পর্কের অবসান, মহিলাদের কাজের অধিকারের প্রশ্নে অন্তঃশ্রেণি এবং নারী-পুরুষের মধ্যের দ্বন্দ্ব দূর করা।

ইউনিওয়ন দে ফামা-এর নেতৃত্ব মনে করত বিপ্লবের জয়ের জন্য মহিলাদের সম্পূর্ণ অংশগ্রহণ প্রয়োজন। কারণ প্রথমত অবরুদ্ধ শহরকে রক্ষা করতে প্রয়োজন প্রচুর মানুষের অংশগ্রহণ, আর দ্বিতীয়ত নতুন যে সমাজ তৈরি হবে তার প্রকৃতি নির্ভর করবে মহিলাদের অংশগ্রহণের ওপর। 

মেয়েদের কাজের সামাজিক ও অর্থনৈতিক মূল্যের পুনর্মূল্যায়ন ও পুনর্বিন্যাসে জোর দেয় ইউনিওয়ন দে ফামা।  ইউনিয়নের প্রাথমিক লক্ষ্য ছিল সব মেয়ের সবেতন কাজ নিশ্চিত করা ও দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা ছিল মহিলাদের শ্রম ও উৎপাদনের ওপর আত্ম নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা।

কমিউনের আগের বছরগুলিতে ফ্রান্স-এর শ্রমিক সংগঠনগুলি ছিল মূলত পুরুষদের দখলে। ১৮৬৬ সালে জেনেভাতে ইন্টারন্যাশনালের মিটিং-এ ফ্রান্স-এর আটজন প্রতিনিধির মধ্যে পাঁচজনই মেয়েদের বাড়ির বাইরে কাজ করাতে আপত্তি জানিয়ে নথি পেশ করেন। নথিতে তাঁরা বলেন মেয়েদের কারখানায় কাজ করা মনুষ্যজাতির অবক্ষয়ের কারণ এবং এটি একটি পুঁঁজিবাদী চক্রান্ত।

এই পরিস্থিতিতে দিমিত্রিফ মনে করতেন, নারীবাদী ও লিঙ্গভিত্তিক বিষয়গুলো সম্পর্কে ক্রমাগত চাপ সৃষ্টি করে যেতে হবে কমিউন নেতৃত্বের ওপর, তাহলেই পৌঁছনো যাবে সাম্যের পৃথিবীতে। আর সেই জন্যই, কমিউনকে বাইরের শত্রুর হাত থেকে রক্ষা করার পাশাপাশি, মেয়েদের শ্রম ও অধিকারের বিষয়টিকে বিশেষ গুরুত্ব দেয় ইউনিয়ন। এবিষয়ে কমিউন নেতৃত্বের সঙ্গে নিয়মিত আলাপ আলোচনা চালিয়ে যান দিমিত্রিফ সহ অন্যান্য নেতৃত্ব। 

ইউনিয়ন-এর নিয়মাবলীতে বলা হয় ইউনিওয়ন দে ফামা-এর প্রোডাক্টিভ অ্যাসোসিয়েশন-এর সকল সদস্য ইন্টারন্যাশনাল ওয়ার্কিং মেন’স অ্যাসোসিয়েশন-এর সদস্যপদ পাবেন এবং তাঁদের সেই মতো মাসিক চাঁদা দিতে হবে। এর মাধ্যমে, বহু সংখ্যক শ্রমজীবী মহিলাকে ইন্টারন্যাশনাল-এ যুক্ত করে ইন্টারন্যাশনাল-এর লিঙ্গ ভারসাম্য উন্নত করতে সচেষ্ট হন দিমিত্রিফ।  

দিমিত্রিফ ছিলেন একজন দক্ষ নেত্রী ও সংগঠক। গোটা প্যারিস জুড়ে প্রায় ২০০০ সদস্যের এক সুসংগঠিত ও সুবিন্যস্ত সংগঠন গড়ে তোলেন তিনি। কমিউন-এর অন্যান্য নেত্রীদের থেকে বয়স ও অভিজ্ঞতার নিরিখে ছোট হলেও তাঁর রাজনৈতিক দৃঢ়তা ছিল লক্ষ্যণীয়। প্রতিটি ঘটনার গভীর রাজনৈতিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে কর্মসূচি নির্ধারণ করে দীর্ঘমেয়াদী লক্ষ্যে এগিয়ে চলা ছিল তাঁর উদ্দেশ্য।

দিমিত্রিভ, শ্রেণী বৈষম্য ও লিঙ্গ বৈষম্যের আন্তঃসম্পর্কের ওপর বারবার জোর দেন তাঁর বক্তব্য ও লেখায়। তিনি বলেন, বুর্জোয়া ব্যবস্থা টিঁকিয়ে রাখার জন্য বিভিন্ন লিঙ্গ পরিচয়ের মানুষের মধ্যে দ্বন্দ্ব জিইয়ে রাখা প্রয়োজন, তাই পিতৃতন্ত্র ও পুঁজিবাদ একে অপরের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গীভাবে যুক্ত। তবে পাশাপাশি দিমিত্রিফ এবিষয়টিও পরিষ্কার করেন যে শুধুমাত্র পুঁজিবাদের উচ্ছেদই লিঙ্গ সাম্য নিশ্চিত করার জন্য যথেষ্ট নয়। ইউনিয়ন দে ফামা-এর বিভিন্ন নথিতে, মহিলাদের শ্রমের পুনর্বিন্যাসের জন্য নির্দিষ্ট কর্মসূচি নেওয়ার বিষয়টিতে জোর দেওয়া হয়।

এলিজাবেথ দিমিত্রিফ-এর সঙ্গে ইউনিয়ন দে ফামা-র আরেক নেত্রী ছিলেন নাতালি লেমেল। নাতালি ছিলেন ইন্টারন্যাশনাল ওয়ার্কিং মেন’স অ্যাসোসিয়েশন-এর ফরাসী বিভাগের সংগঠক। দিমিত্রিফকে ফ্রান্সের স্থানীয় রাজনীতি ও শ্রমিকদের অবস্থা বুঝতে সাহায্য করেন লেমেল।

নাতালি লেমেল

লেমেল ছিলেন পেশায় বইবাঁধাই কর্মী। ১৮৬০-এর দশক থেকেই বাঁধাই কর্মী ইউনিয়নে সক্রিয় ছিলেন তিনি। ১৮৬৪-৬৫ সালে লেমেল, বইবাঁধাই কর্মী ধর্মঘট কমিটিতে নির্বাচিত হন। সমান কাজের জন্য সমবেতনের দাবিতে প্যারিস জুড়ে বইবাঁধাই কর্মীদের ধর্মঘট সংগঠিত করে এই কমিটি। এই ধর্মঘটের জেরেই লিঙ্গ নির্বিশেষে প্যারিস-এর সকল বাঁধাইকর্মীর সমান বেতন নিশ্চিত হয়। ১৮৬৫ সালেই লেমেল প্রথম ইন্টারন্যাশনাল-এ যোগ দেন ।  

তিনি, ইউজিন ভার্লিন-এর সঙ্গে মিলে লা মার্মাইট নামের কোঅপারেটিভ রেস্টুরেন্ট ও মিটিং-এর স্থান তৈরি করেন। ১৮৭০-এর শেষভাগে প্যারিস যখন অবরুদ্ধ, শহরের গরীব নাগরিকদের হাতে খাবার তুলে দেওয়াতে বিশেষ ভূমিকা রাখে লা মার্মাইট, শহরজুড়ে গঠিত হয় একাধিক শাখা। ইউনিয়ন-এর পাশাপাশি আরও একাধিক ক্লাব-এর সঙ্গেও সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন লেমেল। পাশাপাশি চালিয়ে যান লা মার্মাইট-এর কাজ।   

ইউনিয়ন দে ফামা তৈরির প্রথম সপ্তাহেই ইউনিয়ন-এ যোগ দেন লেমেল। ইউনিয়ন-এর রাজনৈতিক দিশা স্থির করার ক্ষেত্রে লেমেল ও দিমিত্রিফের বিশেষ ভূমিকা ছিল। 

লেমেল ও দিমিত্রিফ ছাড়া ইউনিয়ন-র এক্সিকিউটিভ কমিশন-এর সদস্য ছিলেন ব্লানশ লেফেবভ্রে, টুপি শ্রমিক; মার্শেলিন লিউপ ও অ্যাডেল গভিন, সেলাই শ্রমিক; অ্যালাইন জ্যাকুয়্যার, বই সেলাই শ্রমিক; ও জ্যারি যার নাম ও পেশা সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায় না। ইউনিয়ন-এর কেন্দ্রীয় কমিটির আঠেরো জনের মধ্যে তেরো জন যুক্ত ছিলেন জামাকাপড় সেলাইয়ের কাজে।  

কমিউন গঠনের তিন সপ্তাহ পর, প্যারিসে বোমাবর্ষণ শুরুর এক সপ্তাহের মাথায়, ইউনিয়ন-এর তরফে, কমিউন রক্ষা করার স্বার্থে প্যারিসের সকল মহিলাদের অস্ত্র তুলে নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়। লেমেল বলেন, “কমিউনের জন্য অস্ত্র তুলে নাও আর রক্তের শেষ বিন্দু দিয়ে লড়াই জারি থাক”। 

২১ মে ভার্সাই সেনা প্যারিস শহরে ঢুকে পড়লে এলিজাবেথ দিমিত্রিফ ইউনিয়ন দে ফামা- এর কমিটিকে ইউনিয়নের সব মহিলাকে ততক্ষণাৎ জড়ো করে ব্যারিকেড-এ যাওয়ার নির্দেশ দেন। 

লাল স্কার্ফ, অ্যামবুলেন্স নার্স-দের আর্ম ব্যান্ড ও কাঁধে রাইফেল নিয়ে ব্যারিকেডে দাঁড়িয়ে শত্রুর মুখোমুখি লড়াই করেন ইউনিয়ন দে ফামা-এর সদস্যরা। সেখানেই মৃত্যু হয় কেন্দ্রীয় কমিটি-র সদস্য ব্লানশ লেফেবভ্রে-র।

কমিউনার্ড লুউজি মিচেল তাঁর স্মৃতিকথায় লেখেন, “মেয়েদের মাথায় বাঁধা লাল পতাকা, ব্যারিকেডে তখন ব্লানশ, এলিজাবেথ দিমিত্রিফ, মাদাম [নাতালি] লেমেল…আর [বিত্রিক্স] এক্সকোফন। আন্দ্রে লিও ছিল ব্যাটিগনোয়েস-এ… আমি ক্লিগনানকোর্ট-এ ব্যারিকেড-এ…ব্লানশ লেফেবভ্রে আমার সঙ্গে সেখানে দেখা করতে আসে। আমি ওকে এক কাপ কফি দিতে পেরেছিলাম…ব্লানশ আর আমি দুজন দুজনকে জড়িয়ে ধরলাম, ও নিজের ব্যারিকেড-এ ফিরে গেল”।   

                                                                                                                    (চলবে)

শেয়ার করুন

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *