বাংলা সাহিত্যে ছোট মেয়েরা

বিশ্বের সাহিত্যে আছে ছোট মেয়েদের নানাভাবে উপস্থিতি। আমাদের পড়া বিদেশী নানা উপকথা-রূপকথায় উঁকি মেরেছে নানা ছোট ছোট রাজকন্যা, গরিব ঘরের দাসী, ভালোমানুষ ছোট্ট মেয়ে। কেউ পিতৃমাতৃহীন, কারোর বা এক ডাকেই ছুটে আসে হাজার লোক-লশকর। কেউ দৈত্যপুরী থেকে রক্ষা পায় রাজকুমারের হাত ধরে, কেউ বা কাজে লাগায় নিজের মগজাস্ত্র।

ইংরেজি সাহিত্যে দেখা মেলে কিছু মেয়েদের, যাদের মা-রা (প্রধানত) সবসময়ই একজন বেশ ধনী জামাই খোঁজায় ব্যস্ত রাখেন তাঁদের মেয়েদের,তা সে এগারো থেকে আঠেরো যে বয়েসেরই হোক না কেন।

বাংলার সাহিত্য ভাণ্ডারে আছে বহু কালের বহু যুগের নানারকম মেয়ের উপস্থিতি। কেমন?

সময়ের দিক দিয়ে ভাবতে গেলে বাংলায় প্রথমে-ই মনে পড়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গল্পগুচ্ছ-এর সুভা-র কথা। সুভাষিণী। কিছু নির্বোধ লোকের সাথে তার তফাৎ ছিল সে মুখ দিয়ে না বলে কথা বলত চোখ দিয়ে। বোবা হলেও সমাজের নিয়মে তার বহু কষ্টে বিয়েও হয়েছিল। কিন্তু স্বামী পরিত্যাগ করেছিল তাকে। তার নীরব কথাগুলি বুঝতে পারেনি তারা, অথচ দোষ হয়েছিল সুভার। সে ফিরে এসেছিল বাল্য সাথী প্রতাপের কাছে, মা বাবার কাছে। তার ইচ্ছের বিরুদ্ধে বিয়ে, তার ইচ্ছের বিরুদ্ধেই তাকে বোবা তকমায় পরিত্যাগ- এসব সে পারেনি সহ্য করতে। তার সবাক চোখে ফুটে উঠেছিল অভিমান। বাংলার অধিকাংশ ছোট মেয়ের গল্প এই। সুভাকে তাড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল তার কণ্ঠ ছিল না বলে। এদিকে সংসারে অধিকাংশ ‘সরব’ মেয়েরই কণ্ঠ রোধ করা হয়েছিল।

রাধারানী দেবীর একটি গল্প আছে- বিস্তীর্ণ বারিধির একটি বুদ্বুদ। সেখানে বিন্দু বলে একটি মেয়ে আছে। তার একগুঁয়ে স্বভাব ও ‘ছেলেদের মত ভাবভঙ্গি’র জন্য সে জীবনে অনেক দুঃখ পাবে, এই ছিল তার মায়ের মত। সেই বিন্দুর অনিচ্ছায়ই তাকে ঘিরে নানা কার্য কলাপ চলতে থাকে, যার মধ্যে দিয়েই ক্রমশ সে বুঝতে পারে তার ইচ্ছা বা অনিচ্ছার কোনো দাম নেই তার জীবনে। তার সিঁথির সিঁদুর চোদ্দ বছরেই মুছে যাওয়ার পর সে মনে মনে স্থির করে সে প্রকৃতপক্ষে যা কামনা করে ঠিক তার উল্টোটাই চাওয়ার অভ্যাস করবে। সে দেখতে চায় তার ইচ্ছা ব্যর্থ হয়েও সার্থক হয় কিনা। কঠোর বৈধব্য গ্রহণ করে সে। এই দুটো গল্পতে আমরা বুঝি সেকালে মেয়েদের মতামত বা ইচ্ছে অনিচ্ছে সংসারে গ্রাহ্যই করা হত না। দুই লেখকই অত্যন্ত প্রগতিশীল। তাঁরা ফুটিয়ে তুলেছেন সেকালের অন্দর মহল চিত্র।

এঁদের মধ্যবর্তী এক লেখক রাজশেখর বসু শ্রেষ্ঠ কৌতুক ও ব্যাঙ্গরসপূর্ণ ছোটগল্পের লেখক। তাঁর লেখা কৃষ্ণকলি এক ছোট্ট মেয়ের গল্প। কালিন্দীর বিয়ে হয় সাত বছরেই। লেখকের সাথে দাদু পাতিয়েছে সে। দাদুর চাকর তাকে গাছে উঠতে সাহায্য করতে গেলে, সে প্রত্যাখ্যান করে তাঁর সাহায্য, পরপুরুষের ছোঁয়া লাগবে বলে। সংসারের নিয়মে সে ছোটবেলাতেই বুঝে গেছে কী করতে নেই, কী করতে হয়। অথচ স্বামী ‘রেমো’-র সাথে মারপিট করা বা তাকে হিড়হিড় করে টেনে এনে দাদুর কাছে বেড়াতে আনা – কিছুতেই সে পিছুপা নয়। বাল্যবিবাহ বন্ধ হওয়ার পরেও মেয়েকে অরক্ষিত না রেখে কালিন্দীর পালিতা মা তাকে বিবাহ দেন নিজের দশ বছরের ছেলের সাথে।

এছাড়া আছে বাংলা সাহিত্যের সবচেয়ে প্রিয় কিশোরী চরিত্র দুর্গা, সাহিত্যিক বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের পথের পাঁচালি উপন্যাসে। তার চলাফেরা, চুরি করে খাওয়া, ভাইয়ের সাথে খেলাধুলা, সবকিছুর মধ্যে খুঁজে পাই আমাদেরই ছায়া। তার জ্বরের বিকারে মৃত্যু তাই হঠাৎ আমাদের মনে ঘনিয়ে আনে গভীর দুঃখ। দুর্গা ছাড়া অপুকে ভাল লাগে না আর তখন। লেখক দুর্গার মত সমাজের পরোয়া না করা মেয়ের চরিত্র বেশিদিন বাঁচিয়ে রাখতে পারেননি।

কখনও আমরা দেখা পেয়েছি মতি নন্দীর লেখা কোনি গল্পে, কোনির মত লড়াকু মেয়ের। কোনির সাঁতার প্রশিক্ষণ চলে নিজের পরিবারের সমস্ত দারিদ্র্য বাধা কাটিয়ে। বিরোধী ক্লাবের নানা ঝামেলা পেরিয়ে সে ও তার কোচ ক্ষিতীশ সিংহ যেভাবে  অদম্য লড়াই চালিয়ে যান, সে গল্প বহু মেয়েকে এগিয়ে চলার অনুপ্রেরণা যোগায়।

এরকমই আছে গণ্ডালু, নলিনী দাশের লেখা চার হস্টেলবাসী বন্ধুর গোয়েন্দাগিরির কাহিনী। আছে ঋতা বসুর লেখা বাঘার ডায়েরির তুলি আর বুলি। চোদ্দর দিদি আর পাঁচের বোন। বাঘার মতে তারাই পায় বাড়ির সমস্ত আদর যত্ন। তারা দুষ্টুমি করলে কেউ কিছু বলে না। অথচ তার মধ্যেই পাঁচ বছরের বোনের গভীর দুঃখ থাকে মনে, কারণ পাশের বাড়ির শীলুপিসি বলেছে সে কালো, ওর বিয়ে হবে না।

আরো কত তো চরিত্র লুকিয়ে থাকে বইয়ের পাতায় পাতায়, আমাদের মনের কোণে কোণে। বাংলা সাহিত্যের মধ্যে এরকম নানা ছোট মেয়ের গল্প আমি বললাম। কোনো বইয়ে এদের অস্তিত্ব থাকে কারোর উপর নির্ভরশীল হয়ে, কোথাও বা এরা নিজেরাই স্বতন্ত্র একটি চরিত্র। কিছু জায়গায় অবশ্য স্পষ্টভাবে রয়েছে ছেলে মেয়ে বৈষম্য। যেমন, বুদ্ধদেব গুহর ঋজুদা। তিতির নামে একটি মেয়ে তাদের দলে ঢুকতে চাইলে তাদের মতামত ছিল “পথি নারী বিবর্জিতা”। অবশ্য পরে তিতিরই নানা ভাবে নানা গুণে তাক লাগিয়ে দেয় সকলকে। পাণ্ডব গোয়েন্দা-তেও বাচ্চু-বিচ্চুকে পিছিয়ে রাখা হত নানা কাজে।

আশা রাখি গোয়েন্দা গন্ডালুর চার বন্ধু কালু, বুলু, টুলু, মালুর মত, কোনির মত, কলাবতীর মত সব চরিত্ররাই একদিন হয়ে উঠবে স্বাবলম্বী।

Background photo created by denamorado – www.freepik.com</a>

শেয়ার করুন

4 thoughts on “বাংলা সাহিত্যে ছোট মেয়েরা”

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *