বিউটি এবং বিস্ট

মা বলত, জুতো দেখে মানুষকে চেনা যায়। মানুষটা অগোছালো না পরিপাটি, দুস্থ না রোগগ্রস্থ, অস্থির না সমাহিত, বুর্জোয়া না বামপন্থী, অথবা বুর্জোয়া এবং “বামপন্থী” কিনা- মানুষের দুটো পায়ের পাতায় তা লেখা থাকে বলে মা বিশ্বাস করত। 

শশী সেসময় নিজেদের কথা ভাবত। ভাবত ওদের জীর্ণ, ধূলিধূসরিত জুতো দেখে মানুষ কী ভাবে ওদের সম্পর্কে? মানুষ কি বুঝতে পারে যে ওর বাপ ওদের ছেড়ে চলে গেছে আর মা নিঃশব্দে এবাড়ি ওবাড়ি কাজ করে বেড়ায়? মা বরাবর হাওয়াই চটি। বারবার বদলে নেওয়া ছেঁড়া স্ট্র্যাপ, চলতে চলতে পাতলা কাগজের মত ফিনফিনে হয়ে আসা চটি পরে মা এবাড়ি ওবাড়ি করত, কোনো আওয়াজ হত না। শশী সে বয়সেই জেনে গেছিল, ক্ষয়ে আসা মানুষের ক্ষয়াটে চটিও মানুষটার মত মুখ বুজে হেঁটে চলে বেড়াতে শিখে যায়। 

এই অভ্যাসে শশী এখনো পা দেখে বলে দিতে পারে, আঙুলে আংটি পরা, ক্যাটক্যাটে গোলাপি নখপালিশের বৌদিদের ঘরে গতরে সোহাগ উপচে উপচে পড়ে। এবং শশী মুখ খোলে। সকাল থেকে সন্ধে পর্যন্ত শশীর মুখ চলে, কাস্টমার এলে তাদের সংসারের হাল হকিকত জিজ্ঞেস করে, ত্বকচর্চা সম্পর্কে দীর্ঘ বক্তব্য রাখে আর কাস্টমার না থাকলে টিভি চালিয়ে দিয়ে রঞ্জিত মল্লিকের সিনেমার সাথে সাথে ডায়লগ বলতে থাকে। এমনকি ঘুমের মধ্যেও সে শব্দ হাতড়ায়। আর যখন কারেন্ট চলে যায়, কাস্টমাররাও কেউ থাকে না, শশী মোমবাতি জ্বালিয়ে ডায়েরি খুলে বসে। মোমবাতির শিখার কাছে মনের কথা বলে। 

ন মাসে ছ মাসে শশীর মত ছাল ওঠা নখপালিশ পরা, ক্ষয়ে আসা পা খোলা চটি পরে কিছু মেয়ে এসে বসে শশীর সামনের চেয়ারে। সারাটা বছর ওদের গোড়ালি ফেটে থাকে। আঙুলে কড়া পড়ে থাকে। গোড়ালির হাড়ের উপর মোটা কালো চামড়ার প্রলেপ লেগে থাকে। নখ অনুজ্জ্বল, বাকি পায়ের পাতার সাথে মানানসই। শশী দেখেছে, এদের চুল দিনকে দিন কেমন পাতলা হয়ে আসে। চরা পড়ে যায়। এদের সাথে শশীর আলাপ জমানোর প্রয়োজন নেই কোনো, কারণ, এদের গল্প শশীর জানা, এদের গল্প শশীর নিজেরই গল্প।

পা ঢাকা জুতো পরা মেয়েমানুষগুলো গম্ভীর মুখে পার্লারে ঢুকে আসে। শশী বোঝে অনেকদিন হল এদের কেউ আদর করেনা। শশী বোঝে অভিমান এদের মুখের কথা কেড়ে নিয়েছে। এরা নিজেদের সম্পর্কে কখনোই বেশি কিছু বলে না। শশীকে কথা আদায় করে নিতে হয়। শেষবার চুল কোথায় কেটেছিল- অসমান কেটেছে, এর আগে ভুরু কোথা থেকে প্লাক করেছিল- পাতলা করে দিয়েছে, এসব জানতে চাইলেও কোনো সাড়া পাওয়া যায় না। গুম মেরে থাকে। তখন শশী আন্দাজে হাত বাড়ায়। ঘাড়ে মাসাজ করার অছিলায়, শশীর ক্রিম মাখানো হাত সাপের মত এদের ব্লাউজের ভিতরে ঢুকে আসে। এরা কিচ্ছুটি বলে না। শশীর দুহাত কিছুক্ষণ চুপচাপ এদের বুকের উপর ঘুরঘুর করে নিরাশ হয়ে ঘাড়ে ফিরে আসে। আর টের পায় ঘন থকথকে একটা দীর্ঘশ্বাস মানুষগুলোর ভিতর থেকে বাইরে বেরিয়ে আসছে। শশীর কষ্ট হয়। 

কষ্ট বেশি হলে শশী রেডিও বন্ধ করে দেয়। কষ্ট আরো বেশি হলে দুপুরবেলা পার্লার বন্ধ করে রাখে। টিকটিকি প্রকাশ্যে এসে দেওয়ালের পোস্টারের কারিশমা কাপুরের গালের উপর গিয়ে থমকে দাঁড়ায়। গরমকালে ফ্যানের আওয়াজ স্পষ্ট হয়ে ওঠে। শীতে হৃৎস্পন্দন। ড্রয়ারের ভিতরে রাখা ছোট্ট নোকিয়া সেলফোন বেজে বেজে যায়। শশীর কোনো এক প্রেমিক তাকে এত চেয়েও পায় না। শশী তখন শুধুমাত্র নিজস্ব বিষাদের। ভূতগ্রস্থের মত শশী বিড়বিড় করে, “অবোধ হয়ে বসে থাকি, বৃহত্তর শোকের কাছে গল্প শুনতে বসার মতন, অবোধ হয়ে বসে থাকি।” বাইরের রাস্তায় সাইকেলের ঘন্টি শোনা যায়। কোথাও দূরে কাক ডেকে ওঠে। নানান ক্রিম আর বিভিন্ন প্রসাধনীর সম্মিলিত সুগন্ধের মধ্যে পার্লারের তুলো চোপসানো চামড়া ওঠা সোফায় শশী গুটি পাকিয়ে চোখ খুলে শুয়ে থাকে। 

স্কুলছুট মেয়েগুলো দুপুরের দিকে এদিকে চলে আসে। তখন উঠে টিউবলাইটটা জ্বালাতে হয়। আনকোরা মেয়েটা হয়তো জীবনে প্রথম ভুরু প্লাক করতে এসেছে। শশী জানে, মেয়েরা বেদনাদায়ক প্রথম সবকিছুকে যত্ন করে মনে রেখে দেয়। প্রথম সঙ্গম, অথবা প্রথম বিচ্ছেদ। পরে অবসর সময় এলবাম উল্টানোর মত যত্ন সহকারে শোক উলটে পালটে দেখে মেয়েরা,- জাবর কাটে।

যত্ন করে ভ্রূযুগলে পাউডার মাখায় শশী। তারপর বলে, “ডানহাত দিয়ে চোখের নিচটা টেনে ধরো, বাঁ হাতে কপাল, ছাড়বে না কিন্তু!” মুড়োটা মুখের মধ্যে ভরে সুতোর বাকি অংশ দুইহাতে রেখে ভুরুতে মারপ্যাঁচ চালায় শশী। মেয়েটার চোখ লাল হয়ে যায় যন্ত্রণায়, ছলছল করে। দুটো পায়ের পাতা আসন্নপ্রসবার মত মুচড়ে মুচড়ে ওঠে, “আহা রে,” প্রাণপণে অশ্রু সম্বরণ করে বছর ষোলোর মেয়েটা। অতএব শশীর রেডিও আবার চালু হয়,- “আজ বয়ফ্রেন্ড্র আসবে?” আর দেখে মেয়েটার মুখে হাসি ফুটে উঠল। শশী বলে চলে, “নাম কী? কী করে?”

মা বলত, মেয়েমানুষ নয়, পুরুষমানুষই আসল নরকের দ্বার। বলত, একজন স্ত্রীলোকের পতন তখনই হয় যখন পুরুষেরা তাকে জোর করে সেই দ্বার পার করায়। মায়ের পক্ষে একথা বলা স্বাভাবিক ছিল। শশীর বাপ অন্য স্ত্রীলোকের সাথে ঘর বেঁধেছিল। আবার বাইশ বছর পর শশীদের কাছে ফিরেও এসেছিল খালি হাতে, সারা গায়ে ঘা নিয়ে। কেন কে জানে, মা তাকে ফিরিয়ে দেয়নি। বাপ তখন আর কথা বলতে পারত না। শুধু চেয়ে থাকত। বাঘের দৃষ্টি নিয়ে চেয়ে থাকত মায়ের দিকে, শশীর দিকে। মা তবু কিছুই বলত না। চুপ করে বাঘের ঘায়ে মলম লাগিয়ে দিত। সেই বাঘ একদিন মরেও গেল। আর পচা ঘা থেকে বিকট গন্ধ বেরিয়ে পাড়া প্রতিবেশীকে একেবারে অতিষ্ঠ করে তুলল! মনে পড়ে, নাকে ওড়না বেঁধে, বমি চাপতে চাপতে, শশী বাঘের মুখে আগুন দিয়েছিল। শশী সেদিন বুঝেছিল, নরকের দ্বার না হলে এমনটা হয় না। শশী বুঝেছিল মা ঠিকই বলে। 

তারপর একদিন মাও মরে গেল। বাসন মাজতে মাজতে। অন্য কারোর কলপাড়ে।– হার্ট এটাক।

তবু শশীকে দুপুরের দিকে ফোন করে সুকুমার আর রাতে দোকান বন্ধ হলে বিজনের ফোন আসে শশীর কাছে। বিজন জানেনা সুকুমারবৃত্তি, সুকুমার বিজন সম্পর্কে ওয়াকিবহাল নয়। শশী একই বৃন্তে দুটি কুসুম সুকুমার বিজনকে থেকে থেকে উস্কে দেয়।

সুকুমার আর বিজনের মধ্যে মিল হল তারা দুজনেই শশীকে স্বপ্ন দেখায়। চার দেওয়ালের স্বপ্ন। স্টুডিওতে গিয়ে তোলা ফ্যামিলি ফটোর স্বপ্ন। ছুটিতে বকখালি ঘুরতে যাওয়ার স্বপ্ন। সিফন শাড়ির স্বপ্ন। শ্রাবন্তী স্বপ্ন- কোয়েল স্বপ্ন- কদাচিৎ ঋতুপর্ণা স্বপ্নও। তারা যে কোনো মাদকদ্রব্যের মত শশীকে দুচোখ ভরে স্বপ্ন দেখাতে ভালোবাসে।

স্বপ্নের থেকে জোর করে মুখ ফেরায় শশী, পার্লারের চার দেওয়ালের উপর চোখ পড়ে। দেখে জায়গায় জায়গায় ফলস সিলিং খুলে এসেছে। দেওয়ালে সাঁটানো ওয়ালপেপার ছিঁড়ে গেছে, ফের লাগানো হয়নি। বেসিনের কল থেকে জল পড়ে যায় সারাদিন, বাটিতে ধরে রাখতে হয় সেই জল। দেখে ড্রয়ারগুলোর সানমাইকা খুলে খুলে এসেছে, লাগাতে হবে। প্লাগপয়েন্টগুলো চেপে না ধরলে কাজ করে না। হেয়ারড্রায়ার খারাপ হয়ে পড়ে আছে। পার্ল ফেসিয়ালের ক্রিম মাসদুয়েক হল শেষ। গোল্ডকে পার্ল বলে চালাচ্ছে শশী। দেওয়ালে আটকানো রিভল্ভিং ফ্যানে ঝুল মাখানো। দেখতে দেখতে আয়নায় চোখ আটকে যায় শশীর। দেখে আয়না থেকে একটা বাঘ চেয়ে আছে তার দিকে। শশীর মত করে বাঘও মাথা হেলায়,- ডানদিকে, বাঁদিকে। হাই তোলে। চোখের পাতা ফেলে। জিভ দিয়ে নিজের গা চেটে দেয়। শশীর ডোরাকাটা গায়ে কাঁটা লেগে যায়।

নোকিয়া ফোন থেকে এক এক করে মুছে যায় সুকুমার আর বিজনের নম্বর। 

এরপরেও যখন বিভিন্ন ধরনের জুতো পরে বিভিন্ন মেয়েমানুষ শশী বিউটি এন্ড স্পা- তে ঢুকে আসে, তাদের আর কোনোদিন বেরিয়ে আসতে দেখা যায় না। পরিবর্তে, পালে পালে বুভুক্ষু বাঘ, নখে পালিশ করা, চুল স্পা করা- রঙ মাখানো, পার্ল ফেসিয়াল, গোল্ড ফেসিয়াল করা, লোম ছাঁটা বাঘ বেরিয়ে আসে শশী বিউটি এন্ড স্পা থেকে। তাদের মুখে কোনো শব্দ নেই। চোখে কোনো দ্বিধা নেই। নখর আছে, আর আছে শ্বাদন্ত।
শ্বাদন্ত।
আর নখর।

শেয়ার করুন

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *