বিয়েবাড়ি

ইংরেজি ভাষার মূল গল্পটির নাম, “বিয়েবাড়ি গেলেন ফ্রাউ ব্রেকেনমেকার”। ক্যাথারিন ম্যানস্ফিল্ডের (১৮৮৮-১৯২৩) প্রথম বই “ইন এ জার্মান পেনশন” (১৯১১) থেকে নেওয়া। বইটির তিনটি এডিশন হয়েছিল তথাপি বইটি পুনর্মুদ্রণে ক্যাথারিন রাজি ছিলেন না কেননা তাঁর ধারণা ছিল, তাঁর ১৯ বছর বয়সের এই লেখাগুলি অপরিণত। তিনি দ্বিতীয় বই ছাপেন ১৯১৭ তে এবং খ্যাতির চূড়ায় পৌঁছান ১৯২০ তে তাঁর “ব্লিস” নামের বইয়ের প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে। কিন্তু গল্পটি পড়লেই পাঠক বুঝবেন প্রথম দিকের রচনাতেও কত সাবলীল তিনি।

অনুবাদ – যশোধরা রায়চৌধুরী

তৈরি হওয়া যে কী ঝকমারির ব্যাপার! বিকেলের খাওয়ার পরে, ফ্রাউ ব্রেকেনমেকার তাঁর পাঁচটি বাচ্চার চারটিকে বিছানায় গুঁজে দিলেন। শুধু রোজা রইল তাঁর সঙ্গে, মিস্টার ব্রেকেনমেকারের ইউনিফর্মের  পিতলের বোতামগুলো পালিশ করায় তাঁকে সাহায্য করার জন্য। তারপর স্বামীর সবচেয়ে ভাল শার্টটা ইস্তিরি করলেন, তাঁর বুটগুলো পালিশ করলেন, কালো সাটিনের নেক টাই -টায় কয়েকটা সেলাইয়ের ফোঁড়ও দিতে হল বইকি। 

রোজা, আমার ড্রেসটা নিয়ে এসে আগুনের সামনে ঝুলিয়ে রাখত, তাহলে ভাঁজগুলো আপনিই সমান হয়ে যাবে।  বললেন ফ্রাউ। আর শোন, ভাইবোনেদের দেখা শোনা করবে কিন্তু, আর নিজে একদম বেশিক্ষণ জাগবে না, সাড়ে আটটার বেশি একদম না। আর মোমবাতির আলোটা ছোঁবে না, তুমি জান ত ছুঁলে কী হবে।  

রোজার বয়স নয়। সে মনে করে সে এতটাই বড় হয়ে গেছে যে চাইলে হাজারটা মোমবাতিকে ঠিক সামলে নিতে পারে। সে বলল, “আমি জেগে থাকিনা আর এট্টূ, মা! বুবু যদি আবার উঠে দুধ খেতে চায়?”

– সাড়ে আটটা মানে সাড়ে আটটাই। ফ্রাউ কড়া গলায় বললেন। বাবাকে বলে দিচ্ছি তোমাকে বলতে। 

ঠোঁট ঝোলাল রোজা। কিন্তু… কিন্তু…

ওই যে বাবা আসছেন। যাও ত শোবার ঘরে গিয়ে আমার নীল রেশমের রুমালটা এনে দাও। আমি যখন থাকব না তুমি আমার কালো শালটা পরতে পার। এবার যাও দিকিনি!!

মায়ের কাঁধ থেকে কালো শালটা নিয়ে রোজা সযত্নে পরে নিল। গায়ে জড়িয়ে পেছনে গিঁট বেঁধে নিল ওটা দিয়ে। ভেবে দেখল, যদি ওকে সাড়ে আটটাতেই শুতে যেতে হয়, ও মায়ের শালটা গায়ে দিয়েই শোবে। এই  একগুঁয়েমিটার ভাবনা ওকে দারুণ আরাম দিল। 

দরজার হাতলে খালি চিঠির থলিটা ঝুলিয়ে, বুট জুতো থেকে বরফ ঝেড়ে ফেলতে ফেলতে, হের ব্রেকেনমেকার হাঁক পাড়লেন – আমার জামাকাপড়গুলো সব কোথায়? কিচ্ছু রেডি নেই বোঝাই যাচ্ছে, আর ওদিকে সব্বাই বিয়েবাড়ি পৌঁছে গেছে!। আসতে আসতে আমি  শুনতেও পেলাম বাজনা শুরু হয়ে গেছে। তোমার ব্যাপারটা কী! কী করছ? এখনো ত তৈরিই হও নি। এভাবে ত বিয়েবাড়ি যেতে পারবে না। 

এই তো তোমার জামাকাপড়, সব রেডি করে দেখ টেবিলে সাজিয়ে রেখেছি। টিনের বেসিনে গরম জল আছে। মুখ ধুয়ে নাও। রোজা বাবাকে তোয়ালেটা এগিয়ে দাও ত। সব রেডি আছে শুধু প্যান্ট ছাড়া। প্যান্টের ঝুল ছোট করার আর সময় পাইনি গো। যাবার পথে তলাগুলো বুটের ভেতর গুঁজে নিতে হবে।

হুঁঃ। হের গজগজ করলেন। এখানে ত নড়াচড়ার জায়গা নেই। আমার ত জামা পরতে আলোটা লাগবে। তুমি বরং প্যাসেজে গিয়ে জামা পর। 

অন্ধকারে তৈরি হওয়া ফ্রাউ ব্রেকেনমেকার এর কাছে কোন ব্যাপারই না। স্কার্ট আর বডিস এর হুক লাগালেন, রেশমি রুমাল গলায় জড়িয়ে তাতে সুন্দর ব্রুচ আঁটলেন,  ব্রুচ থেকে  ভার্জিন মেরিকে নিবেদিত  চারটে মেডেল ঝুলছে। তারপরে মাথা ঢাকা ক্লোকটা টেনেটুনে পরে ফেললেন। 

এদিকে এস, আমার বকলসটা লাগিয়ে দিয়ে যাও, ডাক দিলেন হের ব্রেকেনমেকার। রান্নাঘরের মাঝখানে দাড়িয়ে হের হাঁপাচ্ছিলেন, তাঁর ইউনিফর্মের বোতামগুলো এমন উদ্দীপনায় ঝকঝক করছিল যেটা কোন অফিসারের বোতামের  পক্ষেই করা সম্ভব। “আমাকে কেমন দেখাচ্ছে?”

অপূর্ব! – ছোট্ট ফ্রাউ বললেন, স্বামীর বেল্টের বকলস প্রাণপণে টেনে বাঁধতে বাঁধতে, এদিক ওদিকে ফিটফাট করে জামাকাপড় টেনে দিতে দিতে। রোজা এসে দেখে যাও ত বাবাকে কেমন দেখাচ্ছে। 

হের রান্নাঘরের এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্ত হেঁটে বেড়ালেন, তারপর  কোটটা পরলেন অন্যদের সাহায্য নিয়ে, তারপর বাইরে গিয়ে অপেক্ষা করতে লাগলেন, যতক্ষণ না  ফ্রাউ লন্ঠনটা জ্বেলে বেরোন। 

আরে চলো চলো- কাজ শেষ হল তোমার? পা চালাও এবার!

রোজা, মোমবাতির ব্যাপার টা যেন মনে থাকে! বলে ফ্রাউ সদর দরজাটা  টেনে বন্ধ করে বেরিয়ে এলেন। 

সারাদিন ধরেই যে তুষারপাত হয়েছে তা নয়, তবে পথে তুষারপাতের পর বরফ জমে যাওয়ার ফলে পিছল হয়ে গেছে প্রচন্ড। ফ্রাউ বেশ কয়েক সপ্তাহ বাড়ির বাইরে বেরোন নি – আর সারাদিনের হুড়োহুড়ির ফলে এখন যেন ঘেঁটে গেছেন, বোকা বোকা হয়ে গেছেন পুরো। যেন মনে হচ্ছে রোজা ওঁকে বাড়ি থেকে ঠেলে বের করে দিল, আর সঙ্গের মানুষটি যেন ওঁর কাছ থেকে দৌড়ে পালিয়ে যাচ্ছে। 

দাঁড়াও , দাঁড়াও !  আমার জন্য অপেক্ষা কর । 

ফ্রাউ চেঁচিয়ে ডাক দিলেন ।

না , আমার পা ভিজে যাবে। তুমি তাড়াতাড়ি এসো। 

একবার বসতির কাছাকাছি এসে হাঁটাটা সহজ হয়ে এল, ধরে টাল সামলাবার জন্য বেড়াগুলো ছিল । রেলস্টেশন থেকে সরাইখানা অব্দি পথটুকুতে আবার ছাই ফেলে বিয়েবাড়ির অতিথিদের আসার সুবিধে করে দেওয়া হয়েছে। 

সরাইখানা তখন আমোদ আহ্লাদে ভরা। প্রতি জানালা থেকে আলো ঝলকাচ্ছে। প্রতি জানালার ধাপ থেকে ফার গাছের ডাল ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছে। সামনের দরজাটাও গাছের ডাল দিয়ে সাজানো। দরজাটা  এক ঝটকায় খুলে যেতেই  সরাইমালিককে দেখা গেল বড় হলটায়, দাসদাসীদের বকাঝকা করে নিজের কর্তৃত্ব জানান দিচ্ছেন। দাসীরা বিয়ারের গ্লাস, কাপ-প্লেট ভর্তি ট্রে, সুরার বোতল নিয়ে ক্রমাগত দৌড়োদৌড়ি করছে। 

সিঁঁড়ি দিয়ে ওপরে চলে যান, ওপরে চলে যান, কোটগুলো ল্যান্ডিং এ খুলে রাখুন। সরাইমালিক চেঁচাচ্ছিলেন। হের ব্রেকেনমেকার, এই কান্ডকারখানার বিশালত্বে সম্পূর্ণ অভিভূত হয়ে পড়ে, নিজের পতিসুলভ কর্তব্য , যথা স্ত্রীর কাছ থেকে অনুমতি নেওয়াটুকুও সম্পূর্ণ ভুলে, সিঁড়ির রেলিং ধরে অন্যদের সঙ্গে ধাক্কাধাক্কি করে ওঠার চেষ্টা করে যেতে লাগলেন। বলরুম, মানে উৎসবের ঘরটিতে প্রবেশ করামাত্র হের ব্রেকেনমেকারের  সহকর্মীরা তাঁকে দেখে হৈ হৈ করে উঠলেন। ফ্রাউ ব্রুচটা ঠিক করে নিলেন, হাতদুটি জড়ো করে রাখলেন, একজন পোস্টম্যানের স্ত্রী ও পাঁচ সন্তানের মায়ের ঠিক যেমনটি থাকা উচিত তেমনই সভ্যভদ্র হয়ে রইলেন। 

বলনাচের ঘরটি সত্যিই খুব সুন্দর। তিনটি লম্বা টেবিল ঘরের এক প্রান্তে কাছাকাছি রাখা। বাকি মেঝেটা নাচের জন্য খালি রাখা। তেলের বাতি ছাতের থেকে ঝুলছে আর তার উষ্ণ উজ্জ্বল আলো প্রতিফলিত হচ্ছে কাগজের ফুল আর মালা দিয়ে সাজানো দেওয়ালে দেওয়ালে। সবচেয়ে ভাল পোশাকে সাজগোজ করা অতিথিদের  লালচে মুখে সেই আলো পড়ে আরো উজ্জ্বল ও উষ্ণ  লাগছিল।

কেন্দ্রীয় টেবিলের মাথার দিকে বর বউ বসেছে। কনেটি  রঙিন ও সোনালি ফিতে দিয়ে ডুরে দেওয়া সাদা পোশাকে। রঙিন ফিতের ফুল বসানো পোশাক। তাকে দেখে মনে হচ্ছে একটা আইসিং করা কেক, কেটে কেটে ছোট টুকরো করে পাশে বসা বরটিকে খাওয়ানোর জন্য একেবারে তৈরি। বর পরে আছে সাদা কাপড়ের স্যুট, তার মাপের চেয়ে বেশ খানিকটা বড়ো। তার সাদা রেশমের টাইটা কলারের ওপরে অনেকটা উঠে গেছে। তাদের চারপাশে সম্ভ্রান্ত সুশীলতার প্রতীক হয়ে বসে আছেন তাদের বাবা মায়েরা, আত্মীয়েরা। কনের ডানদিকে একটা টুলের ওপর উঁচুতে চড়ে বসেছে একটি ছোট্ট মেয়ে। তার মসলিনের পোশাকটি কুঁচকেমুচকে আছে। এক কানের ওপর ফরগেট মি নট ফুলে গাঁঁথা একটা মুকুট ঝুলছে। সবাই হাসছে, কথা বলছে,  হ্যান্ডশেক করছে, গেলাস ঠোকাঠুকি করছে, মেঝেতে পা  দাপাচ্ছে। বিয়ার আর ঘামের একটা মিশ্র বদগন্ধ বাতাসকে পরিপূর্ণ করে তুলেছে। 

ফ্রাউ ব্রেকেনমেকার নিজের স্বামীকে অনুসরণ করলেন, বর বউ ইত্যাদিকে নমস্কারাদি সম্ভাষণ ইত্যাদি জানিয়ে।  ফ্রাউ নিশ্চিত জানেন, তিনি আজ উপভোগ করবেনই। তিনি যেন ক্রমশ ফুলে উঠছেন, লালচে হয়ে, উষ্ণ হয়ে ফুটে উঠছেন এখন, চেনা চেনা এক উৎসবের গন্ধ পেয়ে। তাঁর স্কার্টের কোন ধরে টানল কে যেন। তাকিয়ে দেখলেন, ফ্রাউ রাপ, কসাইয়ের স্ত্রী,  তাঁকে ডাকছে। একটা খালি চেয়ার টেনে তাকে পাশে বসতে অনুরোধ করল। 

ফ্রিৎস তোমার জন্য বিয়ার আনছে। বললেন ফ্রাউ রাপ।  অ্যাই, তোমার না,  স্কার্টটা পেছন দিকে ফাঁক হয়ে আছে ,  তুমি যখন ঘরে ঢুকলে আমরা দেখে না হেসে পারলাম না, তোমার পেটিকোটের সাদা টেপটা বেরিয়ে আছে। 

ও মা তাই! এ বাবা, কী যা তা  ব্যাপার। ফ্রাউ ব্রাকেনমেকার  ধপাস করে চেয়ারে বসে পড়তে পড়তে ঠোঁট কামড়ে বললেন। 

যাক গে যা হবার হয়ে গেছে –  ফ্রাউ রাপ বলল, নিজের মোটা মোটা হাত টেবিলের ওপর ছড়িয়ে দিয়ে, নিজের শোকসূচক আঙটি তিনটির দিকে গভীর সন্তুষ্টির সঙ্গে তাকিয়ে। তবে কিনা, একটু সাবধান হতে হয়, বিয়েবাড়ির সাজ বলে কথা। 

আর এইরকম জাঁকজমক যে বিয়েতে সেখানে ত বটেই। চেঁচিয়ে বলল ফ্রাউ লেডেরমান, ফ্রাউ ব্রেকেনমেকার এর উল্টো দিকে বসেছিল। 

কান্ড দেখেছ,  টেরেসা  ওই বাচ্চাটাকে ট্যাঁকে করে এনেছে। ওর নিজের বাচ্চা! নিজেরাই রাখবে।  এটা ত পাপ, বলো, গির্জের অসম্মান, নিজের বিয়েতে নিজেরই কুমারী অবস্থার বাচ্চাকে আনা। 

তিন মহিলা বসে বসে কনের দিকে প্যাঁট প্যাঁট করে দেখতে লাগলেন। কনে একেবারে শান্তভাবে বসা। ঠোঁটে একটা শূন্য ফ্যাকাশে হাসি। শুধু ওর চোখ দুটি এদিক ওদিক অস্বস্তিভরা দৃষ্টি নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। 

বিয়ার দিয়েছে দেখো ওটাকেও! ফিসফিস করে বললেন ফ্রাউ রাপ। সাদা সুরার সঙ্গে এক টুকরো বরফ ও। বাচ্চাটার কি এখন মদ খাবার মত বয়স? বাড়িতে রেখে এল না কেন ওটাকে?

ফ্রাউ ব্রেকেনমেকার ঘুরে তাকালেন কনের মায়ের দিকে। মহিলা মেয়ের দিকে এক দৃষ্টে তাকিয়েই আছেন। একটা বুড়ো বাঁদরের মত বাদামি কপালটা কুঁচকে দেখেই চলেছেন আর খুব গাম্ভীর্যের সঙ্গে মাথা নাড়ছেন মাঝে মাঝে। বিয়ারের মগ তোলার সময়ে তাঁর হাত কাঁপছে। মদ্যপান করার পর বুনোদের মত করে থুতু ফেললেন মেঝেতে, নিজের আস্তিনে মুখ মুছলেন। তারপর  যখন নাচের বাজনা শুরু হল, চোখ দিয়ে টেরেসাকে অনুসরণ করলেন তিনি। সন্দেহভরা চোখে সব পুরুষদের দেখতে লাগলেন, যারাই তার সাথে নাচল। 

স্বামীটি তাঁর কোমরে খোঁচা দিয়ে চেঁচিয়ে বললেন, আরে,  আনন্দ কর বুড়ি!  এটা টেরেসার শবযাত্রা নয় ত! অতিথিদের দিকে চেয়ে উনি চোখ টিপলেন, অতিথিরা অট্টহাস্যে ফেটে পড়ল। 

আমি আনন্দই করছি ত!  প্রৌঢ়া  বিড়বিড় করে বল্লেন। মুঠি দিয়ে টেবিলের ওপর বাজনার তালে তালে ঠেকা দিতে লাগলেন,  এই উৎসবে যে  শামিল হয়েছেন তা প্রমাণ করার উদ্দেশে। 

ফ্রাউ লেডেরমান বললেন, উনি আসলে ভুলতেই পারছেন না, টেরেসা কতটা  বেলাগাম হুল্লোড়ের জীবন কাটিয়েছে। ওই বাচ্চাটা থাকতে কেই বা ভুলতে পারে, শুনি? শুনলাম, গত রোববার সন্ধেবেলা টেরেসা উন্মত্তের মত হয়ে উঠেছিল আর বলেছিল এই লোকটাকে সে বিয়ে করবে না। পাদ্রিকে ডাকতে হয়েছিল ওকে বোঝানোর জন্য। 

অন্যটা কই? ফ্রাউ ব্রেকেনমেকার জিজ্ঞাসা করলেন। সে ছোকরা ওকে বিয়ে করল না কেন?

মহিলারা কাঁধ ঝাঁকালেন। 

চলে গেছে। ভোঁভাঁ। হাপিস হয়ে গেছে। বাইরের লোক, দু রাতের জন্য ওদের বাড়িতে ছিল ত। শার্টের বোতাম বেচতে এসেছিল এখানে। আমি কিন্তু কিনেছিলাম বোতাম। খুব ভাল শার্টের বোতামগুলো। তবে লোকটা একটা শুয়ার। আমি ভাবতেই পারিনা এত সাধারণ দেখতে একটা মেয়ের মধ্যে ও কী দেখল। তবে বলা কিছু যায় না, ওর মা বলে মেয়েটার নাকি খুব গরম সেই ষোল বছর বয়স যবে থেকে হয়েছে তবে থেকেই। 

ফ্রাউ ব্রেকেনমেকার নিজের বিয়ারের গেলাসের ভেতরে তাকালেন। ফুঁ দিয়ে ফেনাটার মধ্যে ছোট্ট একটা ফুটো করলেন। 

সেই, বিয়ের উৎসব, তাও এমন! দুজন পুরুষকে ভালবাসা, এটা ধর্মের বিরুদ্ধে ত।  

ফ্রাউ রাপ ব্যাখ্যা করলেন, এই লোকটার সঙ্গে ওর ভালই কাটবে। এই ছেলেটা আমার বাড়িতে ভাড়া ছিল গত গ্রীষ্মে। আমি ওকে তাড়িয়ে দিতে বাধ্য হই। ছেলেটা দু মাসে একবারও জামা বদলায় নি। আমি যখন ওকে বললাম ওর ঘরে গন্ধ , ও বলল, গন্ধটা কসাইখানা থেকে ভেসে আসছে নিশ্চয়ই। তা, জীবনে প্রত্যেক বউমেয়েকেই ত কিছু না কিছু ঝুটঝামেলা সইতে হয়।  বল, তাই কি না?

ফ্রাউ ব্রেকেনমেকার নিজের স্বামীকে দেখলেন। পাশের টেবিলে নিজের সহকর্মীদের সংগে বসে। উনি জানেন, স্বামীমহাশয় খুব বেশি মদ্যপান করছেন। হাত পা খুব নাড়ছেন বুনোমানুষের মত। কথা বলার সময়ে মুখ থেকে থুতু ছিটকে পড়ছে চারিদিকে। 

হ্যাঁ তা ত বটেই। সম্মতি দিলেন ফ্রাউ ব্রেকেনমেকার।  একেবারে সত্যি। মেয়েদের কত কি যে শিখে উঠতে হয়। 

এই দুই পৃথুলা বয়স্কা মহিলার মাঝখানটিতে গোঁঁজ হয়ে বসে আছেন বলে, ফ্রাউ ব্রেকেনমেকারের নাচতে ওঠার প্রশ্ন নেই। যুগলগুলি গোল গোল ঘুরে ঘুরে  নেচেই চলেছে, দেখছেন উনি। পাঁচটি বাচ্চা, স্বামী সব ভুলে গেলেন ফ্রাউ। নিজেকে আবার এক তরুণী মনে হল যেন। বাজনাটা একটু দুঃখের, খুব মধুর লাগল তাঁর। খড়খড়ে হয়ে ওঠা হাতদুটি ভাঁজ হয়ে আবার খুলে গেল স্কার্টের ওপরে। যতক্ষণ বাজনা বেজে চলল, কারুর মুখের দিকে তাকাতে সাহস হল না তাঁর। মুখ জুড়ে রইল হাসির আদল,  চারপাশে সামান্য নার্ভাস কাঁপুনি। 

ফ্রাউ রাপ চেঁচিয়ে উঠলেন। হে ভগবান! টেরেসার বাচ্চাটাকে একটা সসেজের টুকরো দিয়েছে কারা যেন। চুপ করিয়ে রাখার জন্য নিশ্চয়ই। এখন একটা ঘোষণা হবে। তোমার স্বামী বক্তৃতা দেবেন। 

ফ্রাউ ব্রেকেনমেকার সোজা হয়ে শক্ত হয়ে বসলেন। বাজনা থেমে গেছে। নাচিয়েরা নিজেদের টেবিলে গিয়ে বসেছে। 

হের ব্রেকেনমেকার একাই দাঁড়িয়ে রয়েছেন। হাতে একটা রুপোর বড়  কফির পাত্র ধরে আছেন। সবাই ওঁর বক্তৃতা শুনে হাসছিল, শুধু ফ্রাউ ছাড়া। সবাই হো হো চীৎকার  করছিল ওঁর মুখভঙ্গি দেখে। কফির পাত্রটাকে যেন একটা শিশুকে কোলে নিয়ে যাচ্ছেন এমন ভঙ্গিতে ওঁর বর কনের দিকে নিয়ে যাওয়াটা দেখেও। 

কফির পাত্রের ঢাকনা খুলল কনে। ভেতরে দেখল। তারপর একটা ছোট্ট চীৎকার দিয়ে বন্ধ করে দিল। ঠোঁট কামড়ে ধরে বসে রইল। বরটি কফির পাত্রটা ছিনিয়ে নিল কনের কাছ থেকে। ভেতর থেকে বের করে আনল একটা দুধের বোতল আর  দুটো ছোট চিনেমাটির দোলনা, শিশুপুতুল সহ।  টেরেসার সামনে বরটি এইসব উপহারের খেলনাগুলো ওপর নিচে  দুলিয়ে দুলিয়ে দেখাল। অমনি, গরম হয়ে ওঠা গোটা ঘরটা যেন হাঁসফাঁস করে অট্টহাসিতে ফেটে পড়ল।

ফ্রাউ ব্রেকেনমেকারের একটুও মজা লাগল না। চারধারের প্রতিটি অট্টহাস্যময় মুখের দিকে  তিনি তাকাতে লাগলেন, আর হঠাৎ সব মুখগুলোকেই তাঁর অচেনা মনে হল। বাড়ি ফিরে যেতে ইচ্ছে করল। ইচ্ছে হল আর কোনদিন বাড়ি থেকে বেরুবেন না। তাঁর মনে হল এই সব লোক আসলে তাঁকে নিয়েই হাসছে। এই ঘরে যত লোক, তার চেয়েও বেশি লোক হাসছে তাঁর দিকে চেয়ে। সবাই হাসছে, কারণ তারা আসলে ওর চেয়ে বহুগুণ শক্তিশালী।  

* * *

নীরবে হেঁটে বাড়ি ফিরল তারা। হের ব্রেকেনমেকার লম্বা পা ফেলে সামনে সামনে। ফ্রাউ পেছনে পেছনে হুমড়ি খেতে খেতে।  রেল স্টেশন থেকে বাড়ি অব্দি রাস্তাটা বিষণ্ণ, সাদা ধবধবে, সামনে পড়ে আছে। 

মুখ থেকে খালি কেপের ঢাকনিটা খুলে খুলে যাচ্ছে ঠান্ডা দমকা হাওয়ায়। হঠাৎ তার মনে পড়ল, কীভাবে তারা প্রথম রাত্রে বাড়ি এসেছিল। এখন তাদের পাঁচটা বাচ্চা, টাকাও তখনকার দ্বিগুণ। কিন্তু…

নাহ, এসবের মানে কী ? বিড়বিড়  করলেন ফ্রাউ। কী লাভ এসবে? যতক্ষণ না বাড়ি পৌঁছে গেলেন, আর স্বামীর জন্য মাংস রুটি দিয়ে একটা ছোট নৈশভোজের ব্যবস্থা করতে লেগে গেলেন, এই হাস্যকর প্রশ্নটা তার আগে অব্দি নাছোড় হয়ে রইল তার সংগে। 

হের ব্রেকেনমেকার প্লেটের ওপর রুটিটা ভাঙলেন। কাঁটাচামচ দিয়ে ধরে ঝোলের মধ্যে পাউরুটিটা ডুবিয়ে লোভীর মত খেতে শুরু করলেন। 

ভাল? ফ্রাউ জিজ্ঞাসা করলেন  টেবিলের ওপর বাহুদুটি ভর দিয়ে, বালিশের মত বুকদুটি টেবিলের সঙ্গে ঠেকিয়ে রেখে। 

দিব্যি! 

একটুকরো রুটি ধরে, প্লেটের ঝোল পুঁছে নিয়ে গিন্নির মুখের কাছে তুলে ধরলেন উনি। ফ্রাউ মাথা ঝাঁকালেন। 

খিদে নেই। বললেন গৃহিণী। 

কিন্তু একটা ভাল টুকরো দিলাম ত  তোমায়, ঝোলটাও তেলে মাখোমাখো।  

হের প্লেটটা পরিষ্কার করে ফেললেন। তারপর নিজের বুটজুতো খুলে কোণায় ছুঁড়ে মারলেন। 

এমন কিছু একটা বিয়েবাড়িটা ছিল না , বল?   

উলের মোজার ভেতরে পায়ের আঙুলগুলো নেড়ে চেড়ে, পা দুটো ছড়িয়ে দিয়ে স্বামী বললেন। 

ন্‌ -না, স্ত্রী  ফেলে দেওয়া বুটগুলোকে তুলে উনুনের পাশে রাখতে রাখতে বললেন । 

হের ব্রেকেনমেকার হাই তুললেন,আড়মোড়া ভাঙলেন , তারপর হাসতে হাসতে স্ত্রীর দিকে মুখ তুললেন।

মনে আছে তোমার? প্রথম যে রাতে তুমি এবাড়িতে এলে? কী সরলসাদা মেয়ে ছিলে  তুমি!

সে অনেক দিন আগের কথা ত। আমার মনে টনে নেই। 

তবে মনে ত ওঁর ছিলই। 

তুমি আমাকে সে রাতে রামধাক্কা  মেরেছিলে !!  আমিও তোমাকে শিগগিরই উচিত  শিক্ষা দিয়েছিলাম।

আবার এখন কথা কইতে বসো না। অতিরিক্ত বিয়ার গিলেছ ত। শুতে এস। 

হের চেয়ার  পেছনের দিকে হেলিয়ে আমোদ পেয়ে  খুঁক খুঁক হাসলেন। 

ঐ দিন রাত্রে তুমি মোটেই আমাকে এটা বল নি। ওরে কপাল, তোমাকে পোষ মানাতে আমার যা ঝঞ্ঝাটঝামেলা  করতে হয়েছিল সেদিন!  …

ছোট্ট ফ্রাউ মোমবাতিটা পাকড়ে ধরে পাশের ঘরে চলে গেলেন। বাচ্চারা সবাই অকাতরে ঘুমোচ্ছে। একেবারে ছোটটার বিছানার গদিটা ধরে দেখলেন, ভিজিয়েছে কিনা। তারপর নিজের ব্লাউজ ও স্কার্টের হুক খুলতে শুরু করলেন। 

সবই এক।  ফ্রাউ বিড়বিড়োলেন। সারা পৃথিবীতে, একই রকম। তবে , ঈশ্বর জানেন, কী হাস্যকর বোকা বোকা এই সব ব্যাপার। 

তারপর কোথা দিয়ে জানি, বিয়েবাড়ি যাওয়ার স্মৃতিটাও মুছে গেল। বিছানায় শুয়ে পড়লেন উনি।   হাতখানা মুখের ওপর আড়াল করে রাখলেন, একটা  শিশুকে মারতে এলে সে যেমন করে ভয়েতে মুখ আড়াল করে।

হের ব্রেকেনমেকার টলতে টলতে তখনই ত শোবার  ঘরে ঢুকলেন কিনা!

শেয়ার করুন

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *