বেড়ালরা হাসে না কেন?

তোমরা, যাদের জগৎ দেখার চোখ একদম আনকোরা, নিশ্চয়ই লক্ষ্য করেছ যে বেড়ালরা হাসে না। যেমন ধরো, কুকুররা হাসে। কুকুরদের বিস্কুট দাও, তারা হাসে। কোন কুকুর যদি তোমার চেনা হয় আর অনেকদিন পর (ওদের কাছে তোমার কয়েক ঘন্টা প্রায় একটা দিনের সমান) যদি তোমার সঙ্গে দেখা হয়, ওরা হাসে। কুকুররা নার্ভাস হলে হাসে, ভ্যাবাচ্যাকা হলেও হাসে – কিন্তু বেড়ালরা হাসে না।

তোমাদের মধ্যে যারা আমার গল্পের চাইতেও উচ্চমানের গল্প পড়েছ, তারা হয়ত একটা ইংরেজি গল্প পড়ে থাকবে যেখানে একটা বেড়াল হাসে; অথবা একটা বাংলা গল্প যেখানে একটা বেড়াল ভারি বিশ্রীভাবে হাসে। আমি আবোল-তাবোল ইংরেজি বা হযবরল বাংলা লিখতে পারিনা, কিন্তু আমারও একটা গল্প জানা আছে – যেখানে বেড়াল কেন হাসে না তার ঐতিহাসিক সত্য বলা আছে। সেটাই বলছি; অন্য কারুর কাছে গল্পটার উন্নততর কাহিনী শুনে নিও পরে।

সব ভাল গল্পই এক যে ছিল দেশ আর তার ছিল এক রাজা দিয়ে শুরু হয়। আমাদের গল্পেও জুবজুপুর নামে এক দেশ ছিল, আর তার রাজা ছিল জুব্জরাজ। সে রাজা বেশ বয়স্ক, মাথা বেশ খারাপ, মন’ও, আর ভারি অত্যাচারী। সে দেশের প্রজাদের তার অত্যাচারে তিষ্ঠতে পারার জো ছিল না। নিজের দেশ ছেড়েছুড়ে চলে যেতে পারলেই নিস্তার পাওয়া যায়, কিন্তু কজনেরই বা নিজের দেশ আর ভাষা ছেড়ে যাওয়ার ইচ্ছে করে বলো, তাই সেই দেশের মানুষ এই পাগল রাজার অত্যাচারে নিজের দেশেই আর নিজেদের ভাষাতেই কষ্ট পেত।

সেই রাজার ছিল এক বেড়াল, তার নাম রামবিয়ালি। সে হাসতো।

রাজার বেড়াল, তাই সে রাজ্যের বেড়ালদের রাজা হওয়ার কথা। কিন্তু তা হয়নি, দেশের বেড়ালরা তাকে যথেষ্ঠ মান্যিগন্যি করলেও। কারণ রামবিয়ালি হুলো না মিনি সেটা কেউ জানতো না। এটা না জানলে যা হয় – সে দেশের বেড়ালদের রাজা হবে না রানি – সেই নিয়ে অনিশ্চয়তা থেকে যায়। রামবিয়ালি দাপট আর সম্মান নিয়েই খুশি; তার এক চোখ বাদামী, আরেক চোখ সবজে – এই জন্যও বেড়ালরা তাকে সমঝে চলতো। সে রাজপ্রাসাদের দুধটা, মাছটা সাপ্টে খায়, তারপর রাজ্য বেড়াতে যায়। ফিরে এসে দেশের রকম সকম দেখে হেসে কুটিপাটি হয় আর ঘুমের মধ্যেও হেসে ওঠে। তবে সপ্তাহে পাঁচদিন যখন দরবার বসে, তখন রামবিয়ালি রাজার পাশে বসে থাকে আর রাজ্যপাটের নিত্যনৈমিত্ত দেখে হেসে হুটোপাটি করে।

রামবিয়ালি কী কী দেখে হাসে তার উদাহরণ দিলে উপন্যাস হয়ে যাবে; তাই আমরা একদম সোজাসুজি মূল দৃশ্যে চলে যাবো। জুবজুপুরের জুব্জরাজ্যে এক ব্যওসাদার ছিল, তার নাম ছিল সব্বঘাসি ধনধনাধন; তাকে নিয়ে রামবিয়ালি হেসে একেবারে হসন্ত আর কি! তাতে রাজা প্রশ্ন করলেন – “একে নিয়ে হাসার আছেটা কী?”

কারণ সব্বঘাসির রকমসকমে মজার কিছুই নেই; চিমটে রোগা একটা লোক, রাজার মতই ব্যাজার বলে রাজার ভারি পছন্দ। কিন্তু তার আসল গুরুত্ব এই যে সে রাজাকে সবচাইতে বেশি খাজনা, আর নানান দেশের বহুমূল্য এটা সেটা দিয়ে থাকে। আর, রামবিয়ালি কেন হাসছে, এটা তো রাজার প্রতিদিনে অন্তত পাঁচবার মনে আসা প্রশ্ন।

“চোদ্দ টাকার জিনিস ষোল টাকায় বিক্রি করে! এইবার দু টাকা কিসের দাম? কিছুরই না। হো হো হো হো!”

এতে হাসির কী আছে তা জুব্জরাজ বুঝলেন না। আর রামবিয়ালির হাসির কারণ না বুঝতে পারলেই ওনার মনে ছায়া ঘনিয়ে ওঠে, তাহলে কি তার বুদ্ধি কম? তাহলে কি তার ঘনিয়ে এলো? তাহলে কি তার মূর্তিতে কাকে ইয়ে করে দেবে? রামবিয়ালির হাসির কারণ যত বোঝা যাবে তত তার আর তার রাজত্বের আয়ু বাড়বে – এই তার বিশ্বাস।

“কিসের দাম চোদ্দ টাকা? জিনিসটা কী”

“সেটা ইম্পরট্যান্ট নয়। জিনিসটা কী আবার? চোদ্দ টাকার যে কোন জিনিস – হাঃ হাঃ হাঃ হাঃ!”

রাজা দুর্ভাবনায় ঘামতে আরম্ভ করেছেন, তাই দেখে রামবিয়ালি বলে – “প্রশ্নটা হল যে কোন জিনিসের দাম চোদ্দ টাকা কেন হয়।”

“কেন হয়? অর্থমন্ত্রী!”

“আরে খিটখিটেটাকে ডেকো না, দেবে আমেজ মাটি করে। কাঁচামালের দাম সাত টাকা, পরিবহনের তিন টাকা, কারিগরের মজুরি চার টাকা – এর উনিশ বিশ। বাকি দু’টাকা কিসের?”

“তুই জানিস কিসের?”

“আরে কেউ জানে না বলেই তো হাসিতে আর তিষ্ঠোতে পারছি না! দু’টাকাটা কোত্থেকে এলো? হি হি হি হি!”

“তাই তো – কোত্থেকে এলো” – চিন্তায় জুব্জরাজের পেট পাকিয়ে ওঠে।

“ভুতুড়ে! ভেবে দ্যাখো – কোথাও একটা দু’টাকা বেঘোরে মরে গেছে – আর সেটা প্রেত হয়ে সব্বঘাসির ভাঁড়ারে!”

জুব্জরাজের সবচাইতে ভয় ভুতে। তার জীবনে টেনশন বাড়লেই তিনি কারাগারে গিয়ে চোর-ছ্যাঁচর-ছিনতাইবাজ কাউকে অত্যাচার করে মেরে ফেলেন। না মারলে মাথা ঠান্ডা হয় না, এদিকে সেগুলো যাতে ভুতে না পরিণত হয় তার জন্যেও এলাহি ব্যবস্থা করতে হয়। ভুত-প্রেত মোটেও তিনি সহ্য করেন না; তায় টাকার ভুত!

“দ্যাখ তুই এমনি আবোল তাবোল ভেবে হাসবি না। আমি হাসলাম না। তোর হাসাতে পারার ক্ষমতা চলে যাচ্ছে। যত্তসব!” তিনি ভারি বিরক্ত হলেন; আর নার্ভাস হয়ে আখরোট চেবাতে আরম্ভ করলেন।

“সে আমি কি দরবারি সং নাকি যে হাসাবো? শোনো, ক্ষমতা তোমারও চলে যাচ্ছে।”

এই শুনে জুব্জরাজের গলায় আখরোট আটকে গিয়ে সে এক অবস্থা। এ তাকে জল দেয়, সে তাকে হাওয়া দেয়, তার মায়ের ছবি বলে ‘ষাট ষাট’ – তিনি সামলে সুমলে বলেন – “কিই! আমার ক্ষমতা কে কাড়ে? তার গর্দান -“

“যদি সব্বঘাসির তোমার চাইতে বেশি টাকা হয়ে যায়? ভুতুড়ে টাকা? ভেবে দ্যাখো, এই দেশে ক’টা মানুষ থাকে? আর সেই পরাগৈতিহাসিক কাল থেকে যত মানুষ ছিল তারা ভুত হয়ে থাকলে তাদের সংখ্যা কত? হো হো হো -“

“থাম তো!” রাজা গর্জে উঠলেন বিষম খাওয়া গলায় – “সব্বঘাসির অত টাকা না হলে আমাকে সবচাইতে বেশি খাজনা দেবে কে? ওর আমার মত রাজপ্রাসাদ আছে?”

রামবিয়ালি এর জবাবে কী বললো তার আগে জুবজুপুরের রাজপ্রাসাদের গল্প ছোট্ট করে বলে রাখি। সে এক রাজপ্রাসাদ তো নয়, গোলোকধাঁধা! একটা দূর্গ, তার পেটে যেন আস্ত একটা শহর। সে শহরের অলিগলি, রাস্তা-করিডোর, ঘর-ঘুপচি যেন জড়ানো-প্যাঁচানো তন্ত্র, রাজার মনের মতই জটিল। কত মানুষ, কত রাজঅতিথি যে তাতে একা একা হাঁটতে আরম্ভ করে পথ হারিয়ে ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেছে তার ইয়ত্তা নেই! তারপর তাদের উদ্ধার করে দরবারে আনার পর দরবার জুড়ে সে কী হাসির রোল, অতিথিও ঘামতে ঘামতে হাসতে থাকেন। জুব্জরাজের ঠাকুর্দা এই প্রাসাদ তৈরি করেছিলেন, যাতে শত্রু আক্রমণ করলে তারা দূর্গের পেটে সেঁদিয়ে ঘুরপাক খেয়ে হারিয়ে গিয়ে চোদ্দ আনা হেরে বসে থাকে যুদ্ধের আগেই। রাজার ঘর একদম সেই গোলোকধাঁধার কেন্দ্রে।

রামবিয়ালি বলে – “হ্যাঁ, সে নাকি একখান পুতুল রাজবাড়ি তৈরি করেছে তোমারটার মত, তাতে ছাদ-টাদ নেই! হো হো হো হো!”

“জানি!” – রাজা ভ্যাঙচালেন – “এটা হাসির কিছু না। এক, সে সেখানে থাকে না; দুই, সেটা সে বানিয়েছে রাজ্যের প্রান্তে অন্য দেশের লোককে দেখাতে যে আমার প্রাসাদ কত জটিল; তিন, সেই প্রাসাদ আমারটার সাইজের এক-চতুর্থাংশ ছোট! চার, ওটা বানানোর জন্য প্রতি মাসে আমি এত্ত এত্ত প্রমোদকর পাই!”

“আর সেখানে লোক ঢুকে ঘুরপাক খেতে যায় শখ করে! ঘুরপাক খেয়ে হারিয়ে যায়! তারপর উপর থেকে কপিকল নেমে এসে তাদের উদ্ধার করে – হা হা হা হা!”

“হ্যাঁ – ওইটা দেখেই তো শত্তুরের দল এমন ঘাবড়ায় যে তারা আর রাজ্য পার করে আমার বাড়ির দোরগোড়ায় আসার কথা ভাবেনা”, এইবার রাজার ঠোঁটেও হাসি ফুটলো।

“তার চাইতেও মজার ব্যাপার হল – লোকজন ঘুরতে ঘুরতে হারিয়ে যাবে বলে চার আনার টিকিট কাটে!” – এইবার রামবিয়ালির হাসিতে দম আটকে যায় আর কি!

জুব্জরাজ এতে হাসির কারণ পেয়ে নিশ্চিন্ত হলেন।

“ভেবে দ্যাখো – সব্বঘাসি লোকজনকে চোদ্দ টাকার খাটনি খাটিয়ে তাদের ষোল টাকায় জিনিস বেচে – তারপর তাদের হাতে যা রইলো তার চার আনা, বউ বাচ্চা পার হেড, তারা এই গোলোকধাঁধায় ভিরমি খাবে বলে খরচা করে আসে! ওরে বাবা রে!”

রাজ্যের মানুষের বোকামির কথা বুঝে জুব্জরাজ নিশ্চিন্ত হলেন। আরো নিশ্চিন্ত হলেন এই বুঝে যে তিনি রামবিয়ালির হাসির কারণ বুঝেছেন।

এই গেল রামবিয়ালির হাসির কথা। যেহেতু আমাকে বেশি সময় দেওয়া হয়নি তাই আমি গল্পের মধ্যভাগটা বাদ দিয়ে শেষভাগে চলে আসবো।

রামবিয়ালি কিন্তু রাজাকে চেতাবনি দিয়েছিল, রাজা শোনেননি। সব্বঘাসি ধনধনাধনের খাজনা, কর, উপহারে তৃপ্ত হয়ে তিনি তাকে পরম মিত্র ভাবতেন; কিন্তু একদিন তিনি দেখলেন দেশে বিদ্রোহ হাজির, আর তাতে নেতৃত্ব দিচ্ছে কিনা স্বয়ং ধনধনাধন! এইবার, ক্ষ্যাপা প্রজার ক্ষেপচুরিয়ামি ম্যানেজ করা রাজাদের অভ্যেস আছে; কিন্তু একটা জিনিস – রামবিয়ালির সাবধান করা সত্ত্বেও – জুব্জরাজ খেয়াল করেননি।

সেটা হল – ওই যে রাজপ্রাসাদের ছোট সংস্করণ (যার ছাদ নেই) – সেটায় সব্বঘাসির পেটোয়া লোকজন, এমনকি হাঘরে সাধারণ প্রজাও, আসলে লুকিয়ে প্র্যাক্টিস করছে গোলোকধাঁধার মধ্যে পথের হদিশ বের করার। রাজপ্রাসাদেরই ছক থেকেই তো সেই প্রমোদের গোলোকধাঁধা তৈরি! নিজের প্রচারের কথা ভেবে সেই ছক তো রাজাই তার হাতে তুলে দিয়েছিলেন! লাভের মধ্যে হল কী, যখন রাজপ্রাসাদে আক্রমণ হল – তখন সেই বিদ্রোহী মানুষজনের তো প্রাসাদের সব গলি-ঘুঁজি-পথ-ঘুপচি মুখস্থ! জুব্জরাজের অপশাসনের হল পতন। তার দরবার তখন হয়ে গেল অত্যাচারিত সাধারণ মানুষদের পরিচালিত বিচারক্ষেত্র – সব কটা মন্ত্রী সান্ত্রীর বিচার বসলো। অত্যাচারীর জুব্জরাজের গলা পড়লো কাটা, মুন্ডু বসলো শুলে – সেই মুন্ডুর মুখ দেখে মনে হয় তিনি যেন নিজের ভুতের ভয়েই ত্রস্থ!

রাজার মুন্ডু খসে পড়ার সময় নিশ্ছিদ্র নীরবতা। তার মধ্যে সহসা একটি বিড়ালের হাসি শোনা গেল, যে নাকি হুলো না মিনি কেউ জানে না, যার এক চোখ বাদামী আরেক চোখ সবজে – “খিক খিক খিক খিক!”

সেই বিচারসভায় কি শুধু মানুষরা ছিল? বেড়ালরাও ছিল; রাজ্যের সব বেড়াল। বেড়ালরাও বিদ্রোহ করেছিল। করবেই তো; যাদের বাড়ির দুধের সর-মাছের কাঁটা-এটা-সেটা খেয়ে তারা বাঁচে, তাদেরই উপর যদি অত্যাচার, অনর্থ হয়, তাদেরই যদি টান পড়ে পেটে – বেড়ালরা সহ্য করবে কেন? তাই বহুদিন হল বেড়ালরা খুব সিরিয়াস হয়ে গেছে। রাজার লোকেদের ওপর তারা কত অন্ধকারে অন্তর্ঘাতী গেরিলা অ্যাটাক করেছে, কত পুলিসের মাথায় ছাদ থেকে মাটি ভর্তি ফুলের টব ফেলেছে তার ইয়ত্তা নেই। গুপ্তচর-সান্ত্রী-খোচর সবাই খুঁজছে বিদ্রোহী মানুষজনকে, তারা জানতেও পারেনি যে এই সব গোপন নাশকতার কার্যকলাপ করেছে খুব গম্ভীর, সিরিয়াস বেড়ালরা – যারা আলসেতে বসে সবার উপর নজর রাখে। এইসব বেড়ালেরা রামবিয়ালিকে আর আগের মত সম্মান করতো না।

সব্বঘাসি কিন্তু রাজার সিংহাসনে বসেননি। যতক্ষণ অত্যাচারীদের বিচার চলছিল ততক্ষণ তিনি সভার কোনায় ঘাপটি মেরে ঝিমোচ্ছিলেন। তিনি সেই “খিক খিক” শুনে বললেন – “হাসির কী হল?”

রামবিয়ালি বলে – “জুবজুপুর নাকি মালিকহীন হল! এ ভেবেই পেট গুলিয়ে উঠছে হাসিতে। এই যে সক্কলে তোমাকে নেতা ভাবছে এতেই পেল্লায় রগড় হচ্চে” – তার কথা শেষ হওয়ার আগেই তিনি – “ইহা পেটোয়া মার্জার – ইহার বিচার হউক!” বলে আবার ঝিমোতে চলে গেলেন।

রামবিয়ালি রাজসভায় প্রতিদিন যেখানে বসে সেখানেই ছিল। তাকে ঘিরে ধরলো ডেঞ্জারাস দেখতে কুকুরের দল, তার বিচার শুরু হল।

একটি বৃদ্ধ কুকুর যা বললো তার সারমেয়-মর্ম হল এই – রামবিয়ালি অত্যন্ত দায়িত্বহীন বেড়াল। এতদিন ধরে রাজসভায় কত প্রজা-কৃষক-শ্রমিক কেঁদেছে, কত অপদস্থ হয়েছে, কত সর্বস্বান্ত হয়েছে – সেই দেখে এই ‘মস্কর’ খালি হেসেছে। এই অন্যায় সহ্য করা যায় না। কিন্তু বিচারসভায় মানুষের গর্দান যায়, প্রাণীদের নয়, তাই রামবিয়ালির বাকি জীবনের জন্য দুধ আর মাছ নিষিদ্ধ করা হোক। সে এখন থাকবে গারদে আর তার খাদ্য হবে সব্জি-ফল-মূল-সাবু।

ঠিক ঠিক ঠিক ঠিক – সবাই যখন সায় দিচ্ছে তখন সব্বঘাসি চোখ বুজেই বলে উঠলেন – “গর্দান যাবে!”

এটা বাড়াবাড়ি – গুঞ্জন উঠলো – আর তার জবাবে বোজা চোখেই সব্বঘাসি বলেন – “মার্জার হাসে। বা বলা ভাল, সে মানুষ নিয়ে হাসাহাসি করে। নতুন জুব্জুপুরে তা নিষিদ্ধ হইল। শাস্তি দৃষ্টান্তমূলক – গর্দানের গুস্তাকির কোন মাপ নেই!”

অগত্যা। রামবিয়ালি এমনিতেই মোটা-সোটা কেঁদো, নড়তে চড়তে ছ’মাস। তাকে তুলে যথাস্থানে দাঁড় করিয়ে যেই ফাঁসির ফাঁস গলায় পরিয়ে পায়ের তলার পাটাতন সরিয়ে দেওয়া হল –

ওমনি যেটা হল তা জুব্জুপুরে কেউ কোনদিনও দ্যাখেনি!

দেখা গেল শূন্য ফাঁস যেমন দোলার দুলছে, ফাঁকা – আর রাজসভার ছাদ থেকে, শূন্যে এক জোড়া চোখ, একটা বাদামী একটা সবজে, আর একটা হাসি (যেটা অনেক পরে বড়মাপের এক লেখক বলবেন ‘চামুক হাসি’) আর কিচ্ছু না – ঝুলছে!

“আমার গুস্তাকির গর্দানের কোন মাপ নেই – হা হা হা হাঃ! নে, পরা ফাঁস!”

সত্যিই তো! গলাই নেই! ফাঁস কিসে পরাবে?

সব্বাই হতবাক হয়ে দেখতে থাকে এই অদ্ভুত দৃশ্য – শুধু এক জোড়া চোখ আর যে কান দুটো নেই সেই নাকর্ণবিস্তৃত একখানা হাসি (এই হাসিকেই পরে বলা হবে ‘চেশায়ার’ (ইং) হাসি)। 

রাজসভায় রামবিয়ালির কন্ঠ প্রতিধ্বনিত হয় –

“তোমরা তো জানো, বিড়ালের নয় জান! আমি শ্রীমানমতি রামবিয়ালি – আমার একটা চোখ পৃথিবীকে হুলোর মত দ্যাখে, আরেকটা দ্যাখে মিনির মত – এই দ্যাখায় যে কী রগড় তা যেহেতু আমার স্বজাতি ম্যাও-রা বোঝোনা – থাক তোমরা আর হেসো না। আর তোমাদের আর যত মুখ্যু ভৌ-দের যারা পোষে সেই রাগী মানুষরা শোনো, তোমরাও কিন্তু কুকুরবেড়ালদের মালিকই রইলে – হি হি হি – আর তোমাদের এই নতুন মালিক হল সব্বঘটে কাঠালিকলা! হ্যাঃ হ্যাঃ হ্যাঃ!”

কেউ হাসছে না। এইবার দুজোড়া চোখ জ্বলজ্বল করে ওঠে –

“আচ্ছা বলো তো – ‘রগড়’-এর প্রথম ‘র’ ব-য়ে শূন্য আর দ্বিতীয় ‘র’ ড-য়ে শূন্য কেন? আর কোন একটার ফুটকি হারিয়ে গেলে কী হবে? সাবধান! সবকিছু উলটে যাবে, এখন যা নিমিত্ত কালে কালে ঘন হবে – দে দনাদ্দন লে গুবলুশ! – হা হা হা হা!”

বলে রামবিয়ালি অট্টহাস্য করতে করতে বিলীন হয়ে যায়।

এই হাসি আর ধাঁধার অর্থ বেড়ালরা উদ্ধার করতে পারলো না, মানুষ আর কুকুররা তো কোন ছাড়। এরপর থেকে, বেড়ালরা খালি অন্তর্হিত হওয়ার আগে রামবিয়ালির শেষ হাসির অর্থ ভাবে – এবং আর হাসে না।

 

ছবি- আর্থার র‍্যাকহাম অলংকৃত চেশায়ার ক্যাট, অ্যালিস ইন ওয়ান্ডারল্যান্ড, ১৯০৭ সংস্করণ। 

শেয়ার করুন

3 thoughts on “বেড়ালরা হাসে না কেন?”

  1. কল্যাণ

    কী সাংঘাতিক গল্পো। বিড়াল হাসুক না হাসুক। আমার তো হাসতে হাসতে জীবন বেরিয়ে যাচ্ছে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *