মহামারী

আজ সময়ের আগেই খিদে লেগেছিল। তাই সময়ের আগেই বরাদ্দের দুটো রুটি একপোয়া দুধে নাড়াচাড়া করে খেয়ে থুয়ে এখন খাটের ওপর বালিশে ঠেকনা দিয়ে বসে ঢুলছেন মঞ্জুরাণী। জন্মের পর নামের শেষে যখন রাণী লেগেছিল তখন ওঁর বাপ-ঠাকুর্দারা কদাপি কল্পনা করেননি যে কোহিনূর হীরে মাথায় নিয়ে ইনি আসূর্যপরিক্রণীয় বিস্তারে সাম্রাজ্য শাসন করবেন। বাস্তবে ঘটেওনি তেমনতর। এই রাণীর রাজা না থাকলেও স্বামী ছিলেন বিলক্ষণ। তবে বারো বছরের সংক্ষিপ্ত স্বামীসঙ্গে ছয়টি জীবিত ও একটি মৃত সন্তানের গর্ভদানের পর তিনি গত হন, অতঃপর দীর্ঘ চল্লিশ বছরের বৈধব্য। ১০ বছর আগে ইস্তক একফালি জমির শাকসব্জী গাঁটরি বেঁধে কলকাতার বাজারে বেচে আসতেন। একদিন রাত্তিরে স্বপ্ন দেখে হাত-পা ছোঁড়াছুড়ি করতে গিয়ে বাম হাতটা কনুই থেকে ভাঙল। ডাক্তার বলেছিল অপারেশন করতে হবে। মঞ্জুরাণীর চোদ্দগুষ্টির কেউ কোনওদিন অপারেশন করায়নি। হঠাৎ এসে মঞ্জুরাণীর জন্য সে নিয়ম বদলাবে এমনটা কল্পনা করা ভুল। বাস্তবেও তেমনতর কিছু ঘটেনি। মঞ্জুরাণীর কনুই থেকে হাতটা তিনকোণা হয়ে বিপ্রতীপ কোণে বেঁকে ঝুলে থাকল। অনেক চেষ্টা করেও মঞ্জুরাণী মনে করতে পারলেন না সেই অলুক্ষুণে স্বপ্নের কথা, স্বপ্নে হাত-পা ছোঁড়াছুড়ির কারণ। ছোট এটাচি বাক্সের মাপের টিভি -টা একটানা দৃশ্য পরম্পরায় বেজে চলেছে। ঘরের একমাত্র দর্শক-শ্রোতার ঝিমুনিতে বিঘ্ন ঘটাতে পারেনি সে। আগে গোল নবের ঘটাঘট ঘাট ঘুরিয়ে চ্যানেল বদলাতে পারতেন মঞ্জুরাণী। কিন্তু নতুন টিভি-তে রিমোটের বোতাম টিপে এসব যন্ত্রবিজ্ঞান তাঁর কাছে রকেট সায়েন্স-এর চেয়ে কম কিছু নয়। ছোটবউ এসে রাত নটায় টিভি বন্ধ করে যাবে। তারপর ঘরের বাতি বুজবে। তারপর ভাঙা হাতটার ব্যথায় নিয়মমাফিক মিনিট দশেক গোঙাতে গোঙাতে সেই গোঙানির শব্দ মিশে যাবে গরগরে নাক ডাকার আওয়াজে। কিন্তু সেসবে এখনও ঢের দেরী। আজ মঞ্জুরাণীর ঝিমুনিটা রোজকারের থেকে একটু বেশি আগেই শুরু হয়েছে। ঝিমুনিটা আসে ‘কে আপন কে পর’-এর তিননম্বর বিজ্ঞাপন বিরতির পর থেকে। আজ ‘কলাপাতার বউ’ শেষ হওয়ার আগেই চোখ লেগে এল। রুটি দুটো আগে খাওয়াই কাল হয়েছে। রুটি খেয়ে এক খিলি পান আর শুকনো জর্দা মুখে দিতেই আপদ ঝিমুনিটা গায়ে শীতের কাঁথার মতো লেগে গেল। আজ তড়িঘড়ি খাওয়ার আরেকটা কারণ রুটিতে পিঁপড়ে লেগেছিল। আজ মেজবউ খাবার দিয়েছে। মেজবউ-এর হাতের রুটি যেমন শক্ত তেমনি ছোট। একটা রুটি হাতের একতালুর মাপের, তারওপর এমন শক্ত যেন মনে হয় চামড়া চিবোচ্ছে। রাতে চার বউ এক একদিন পালা করে রুটি আর দুধটা দিয়ে যায়। দিনের বেলায় ভাঙা হাতে কোনও মতে নেড়েচেড়ে নিজেই রান্না করে নেন। স্বামীর মরণের পর থেকে স্বপাকে নিরামিষ্যি ভোজনের নিদানের থেকে একদিনের জন্যও বিচ্যুত হননি। রাতে অন্নভোজ নিষেধ তাই চার বউ দিন-ক্ষণ বার গুনে রুটি দিয়ে যায়। একটা ছয় ছটাক উদলা উঠোনের চারদিকে চার ছেলের ঘর। আর একদম কোণে পুকুরের পাড়ের একচিলতে দড়মার ঘরটা মঞ্জুরাণীর। আগে ঘর বলতে এটুকুই ছিল। দড়মার ঘর, টালির চালা। এখানেই পিঠোপিঠি ছয় ছেলেমেয়েকে নিয়ে পিঠেপিঠ লাগিয়ে পালন করেছে মঞ্জুরাণী। বড়মেয়ে প্রতিমার ষোলবছর বয়স হতেই ছেলে-ছোকরাদের আগাগোনা শুরু হয়ে গেছিল। মঞ্জুরাণী জানতেন কিছু একটা হলে পারে। হলও তাই, পাশের গ্রামের এক ছোকরার সাথে মাখামাখি শুরু হল, মঞ্জুরাণী জানতেন। ছোকরা সুবিধের ছিল না, মঞ্জুরাণী তাও জানতেন। প্রতিমাকে সামাজিক নিয়ম মোতাবেক দু-একবার লাথি ঝ্যাঁটাও মেরেছিলেন। কিন্তু ভিতরে ভিতরে হাল্কা সায় আর মৃদু প্রশ্রয়ও ছিল। গলার কাছে দুটো মেয়ে আটকে ছিল, প্রতিমা ষোল, আরতি তেরো। আর ক’বছরের মধ্যে দুটো মেয়ের বিয়ের খরচ জোগাড় করা অসাধ্যপ্রায়। একটা যদি পালিয়ে বিয়ে করে, মায়ের খরচ কমায় তবে ধারদেনার ঝক্কি থেকে রেহাই মেলে। পরে মেয়ে-জামাই মেনে নিয়ে ঘরে তুললেই হল।কোনও হ্যাপা নেই, আজকাল তো এসব নিপাতনে সিদ্ধ হয়ে গেছে। মাস ছয়েকের মধ্যেই প্রতিমা পালালো। সেই ছোকরাও দিনকয়েক বেপাত্তা রইল। তার হপ্তাখানেক পর ছোকরা ফিরল, প্রতিমা আর ফিরল না। ছোকরা ঠোঁট উল্টে হাত ঝেড়ে জানাল হপ্তাখানের আসানসোলে দিনমজুরি করতে গেছিল। প্রতিমাকে সে চেনে না বিশেষ। সেই থেকে প্রতিমা আর বাড়ি ফেরেনি। এমন কেলেঙ্কারি কান্ড যে লোকসমাজে একটু দুফোঁটা চোখের জল ফেলবে তার জো নেই। ঘেন্না ছাড়া আর কোনও অনুভূতি সর্বগ্রাহ্য হবে না। মঞ্জুরাণী ছেলেদের পরামর্শে আর ছোটমেয়ের হিতার্থে তিনমাসের মাথায় শ্রাদ্ধশান্তি ক্রিয়াকর্ম সম্পন্ন করেছিলেন। বিয়ের খরচের চেয়ে কিছু কম পড়ল বটে কিন্তু তাও দেনা হল কিছুটা। আরতির বিয়ে দিয়েছিলেন দেখেশুনে। নমাসে ছমাসে আসে বাচ্চাকাচ্চা নিয়ে। তারপর ছেলেরা একে একে বউ নিয়ে এল। নতুন বউয়ের সাথে নতুন ঘর উঠল উঠোনের ন্যাড়া জায়গাটায় ঘেঁষাঘেঁষি ঠেলাঠেলি করে। সংসারেও ঠেলাঠেলি থেকে লাঠালাঠি লাগতে সময় লাগল না। মেজটার সঙ্গে ছোটটার বিবাদ সবচেয়ে খতরনাক। হাতাহাতিও হয়েছে কয়েকবার। পার্টি অফিসে সালিশি সভাও বসেছিল। 

প্রথমে মঞ্জুরাণী খানিকটা ঘাবড়ে গেছিলেন। একা একা অনেক বন্ধুর রাস্তা হেঁটেছেন তিনি। জীবনের প্রতিটা মোড়ই যেন নতুন দন্ত-নখর নিয়ে নতুনভাবে চমকায়। মঞ্জুরাণী চমকান কিন্তু দমকান না। কিছুদিন পর ছেলেদের এই অর্বাচীন ঝুটঝঞ্ঝাটে মাথা গলানো বন্ধ করে দিলেন। লোকমুখে শুনেছেন মেজছেলের বউ ছোটছেলের প্রাক্তন প্রেমিকা। সেই থেকে আশান্তির শুরু। চল্লিশ বছরের দীর্ঘ বৈধব্যের পর নারী-পুরুষের প্রেম-পিরিতির ক্যাঁচালে বীতশ্রদ্ধ অনীহা ছাড়া আর কিছুই অবশিষ্ট নেই তার। মঞ্জুরাণীর নির্লিপ্ত চেতনায় মৃত্যু প্রতীক্ষা ছাড়া আর কিছু বাকি নেই বলেই ধরে নিয়েছে সক্কলে। মঞ্জুরাণী ‘কলাপাতার বউ’-এর চূড়ান্ত সাসপেন্স মিউজিক-এর মধ্যেও আপন মনে ঢুলছিলেন। দরজায় টৌকা পড়ল। দুম দাড়াক্কা দরজা ধাক্কানো নয়, সন্তর্পণে টোকা পড়ল। মঞ্জুরাণীর তন্দ্রা কাটেনা। খুব চাপা গলায় তিনবার ‘মা’ ডাকে নড়েচড়ে বসলেন। টিভির দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে বোঝার চেষ্টা করলেন শব্দটা আদৌ টিভি থেকে এল কিনা! আবার টোকা পড়ায় গায়ের কাপড়চোপর ঠিক করে দরজা খোলেন। মেজছেলে রতন চট করে ঘরে ঢুকে দোর দেয়। 

– মা একটু চুন দাও তো!

– চুন দিয়ে কী করবি রে? কাঁটা ফুটেছে নাকি?

– উফফ এত কথা বল কেন দাও একটু চুন।

মঞ্জুরাণী কথা বাড়ান না। পানের টিফিন বাক্সটা খুলে চুনের ডিবেটা বার করেন। 

-কীসে নিবি?

-হাতে দাও। উফফ একটা কাজ করতে একঘন্টা লাগাও।

-হাতে চুন নিতে নেই। এই নে।

পানের বোঁটায় একচিলতে চুন লাগিয়ে দেন। 

-এতে হবে?

-হয়ে যাবে। 

চুন নিয়ে যাবার আগে আবার রতন শাসিয়ে যায়, চোখ রাঙিয়ে যায়।

-চুন দেওয়ার কথা কাউকে বলে বেরিওনা।

আরও দুবার নিশ্চিত হওয়ার জন্য শাসায়।

-বুঝেছ? বুঝেছ?

মঞ্জুরাণী এটুকু বোঝেন যে বুঝেছি না বললে এ বিড়ম্বনা বিদেয় হবে না। তাই ঘাড় এলিয়ে বলেন, 

-বুঝেছি। 

মঞ্জুরাণীর প্রাজ্ঞ ইন্দ্রিয় এইসব শাঁসানি, রাঙানির নাড়ি টিপে বলে দিতে পারে তাদের ওজনদর। মঞ্জুরাণী বোঝেন রতন যতই শাঁসাক না কেন ভিতরে ভিতরে কাদায় পড়েছে। মঞ্জুরাণীও নরম মাটিতে কোপ মারতে ভুল করেন না, যাবার আগে রতনকে বলেন,

-এই শোন মেজবউকে বলিস রুটি একটু বড় করতে। এই নুচির মতো রুটিতে রাতের খোরাক মেটে না।

রতন মাথা হেলিয়ে চম্পট দেয়।

ছোটবউ এসে টিভি বন্ধ করে দিয়ে গেলে মঞ্জুরাণী ঠাকুরের আসন পরিষ্কার করবেন। ঠাকুরের সামনে রাখা বাতাসাটা মুখে দিয়ে গুরুমন্ত্র জপ করবেন পাঁচ মিনিট। গুরুমন্ত্র কাউকে বলতে নেই। বললে মুখ দিয়ে রক্ত বেরোয়ে। মঞ্জুরাণীর সারাজীবন কত যে গুরুমন্ত্র আছে তা বোধহয় স্বয়ং ঈশ্বরও জানে না। সেসব বললেও কম কিছু রক্ত ঝরবে না। ঠাকুরের সেবা দিয়ে মাথার কাছে এক ঘটি জল রেখে শুতে যাবেন, আবার দরজায় টোকা পড়ল। মঞ্জুরাণী আবার চৌকি থেকে নেমে দরজার ছিটকিনি খুলে দেখলেন বড়ছেলে রবি।

-কিরে রবি?

-মা চালকুমড়োগুলো এবার কাটতে হবে।

-আর দুটো দিন দে, বোঁটার শুঁয়োগুলো মরুক।

-এরপর দাম পড়ে যাবে।

-তালে কাট। তোর কুমড়ো তুই আগায় কাট না পাছায় কাট।

-ও মা, আগে আমাদের এই চালে চাল কুমড়ো হত আর তুমি আমায় তুলে দিতে চালে।

-হুঁ!

-আচ্ছা মা একটু চুন হবে?

-চুন দিয়ে কী হবে?

-একটু দরকার ছিল।

মঞ্জুরাণী এবার আর বেশি কথা না বাড়িয়ে পানের বোঁটায় চুন লাগিয়ে রবির হাতে ধরায়। রবি হাতে বোঁটা ধরে পিছনে ফিরতেই ভুত দেখার মতো দেখল শিবু দাঁড়িয়ে। শিবু সবার ছোট ভাই, শিবুকে দেখে রবি হাতে চুন লাগানো পানের বোঁটাটা নিয়ে কিছুক্ষণ থমকে দাঁড়িয়ে নরম গলায় বলে,

-কি রে শিবু চুন নিবি?

শিবু নতমস্তকে সম্মতি জানায়। ছেলেদের এমন নরম-সরম ভাবভঙ্গি দেখে মঞ্জুরাণী খানিক অবাক হন। ছেলেদের মধ্যে রবি আর শিবুর মধ্যেই একচিলতে যা সুসম্পর্ক আছে। রবি আর শিবুর মাঝে বয়সের ব্যবধান নয় বছরের। বয়সের তফাৎ থাকায় রবির মধ্যে একটা ঈষৎ বাৎসল্য কাজ করে। ইস্কুলে ভর্তি করা থেকে বিড়ি টানা, শিবুর সবকিছুই দাদার হাত ধরে। শিবুটা মায়েরও কম ন্যাওটা নয়। রোজগারপাতিও ভাল করে। আট ক্লাস পাশ করে ইলেকট্রিকের মিস্ত্রীর কাজ শিখেছে। এখন সদরের একটা নার্সিংহোম-এ কাজ করে। মেজ আর সেজটা জামা সেলাইয়ের কাজ করে কারখানায়। সেজছেলে আহমেদাবাদে মালিকের কাছে থেকে কাজ করে। মালিক তিনমাস বিলেতে গেছে মেয়ের কাছে। সপ্তাহখানেক হল সেজটা ঘরে ফিরেছে। বড়টা সবজি বাগানের কাজটা চালাচ্ছে। একটুকরো জমি। মঞ্জুরাণী নিজে বাঁশ কেটে বেড়া দিয়ে স্বামীর সম্পত্তির যেটুকু আগলাতে পেরেছিলেন। ছেলেরা ভাগ চায়। গ্রামের পাঁচজনে বসল মীমাংসা করতে। চারভাই গেল, তক্কাতক্কি গালিগালাজ হল ঘন্টা খানেক। শেষমেশ নিষ্পত্তি হল বড়ভাই বাকি তিন ভাইকে ভাগ বাবদ মাসে মাসে টাকা দেবে। চারভাই গজরাতে গজরাতে ঘরে ফিরল। মঞ্জুরাণী বুঝলেন যা ঘটার তার অজান্তেই ঘটে গেছে। তিনকোণা হাতটা দোলাতে দোলাতে সোজা গিয়ে উঠলেন পাঁচজনের সালিশি বৈঠকে। মাথায় গরম খুন চড়ে যাওয়া ছেলেদের বুঝিয়ে সুঝিয়ে বাড়ি পাঠানোর সাফল্যে পঞ্চজন তখন খোশমেজাজে চা-বিড়ি টানছিল। মঞ্জুরাণীকে দেখে যারপরনাই বিব্রত হয়ে বলল, বাড়ি গিয়ে ছেলেদের কাছে জিজ্ঞাসা কর। মঞ্জুরাণী উবু হয়ে বসে পড়লেন।

-আমারটা চলবে কেমন করে বাপ?

পাঁচ মাথা বিরক্তির উদগার কেটে আবার ছেলেদের ডাক পাঠাল। মাথাদের মাথা, মাথা খাটিয়ে নির্দেশ দিল,

-ভরনপোষণের ভার চারভাইতে ভাগ করে নেবে।

ছোটটা মায়ের বেশি ন্যাওটা। শিবু জানায়,

-তোদের দরকার নেই। মা’রটা আমি দেখে নেব।

সকলে জানে শিবুর মাতৃভক্তি সব্বার চেয়ে বেশি। প্রথম বেতন পেয়ে মাকে নতুন টিভি কিনে দিয়েছে। তবু মেজছেলে তেড়ে উঠল,

-হ্যাঁ মা মরলে মা’র ঘরটা দখল নেওয়ার ধান্দা। 

আবার খিস্তি খেউড় শুরু হল। পাঁচ মাথা হিমশিম খেল খানিকক্ষণ। অবশেষে মায়ের ভাগ হল। চাল ডাল রাতের রুটি পালা করে জোগান দেবে চার ছেলে। মঞ্জুরাণী কোঁচকানো মুখে ছানি কাটানো চোখের মোটা চশমার মধ্য দিয়ে স্থির হয়ে সবটা দেখলেন। ছেলেদের আগে আগে হাঁটা দিলেন ঘরের দিকে।

রাতে এখন শিবুকে দেখে রবি কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে হাতের চুন মাখা পানের বোঁটাটা ভাইকে সস্নেহে দিল। তারপর মাকে বলল,

-আরেকটু চুন দাও তো।

মঞ্জুরাণী চুন মাখিয়ে বোঁটা হাতে দাঁড়িয়েই ছিলেন। দুই ভাই হাতে পানের বোঁটার চুন নিয়ে খুব গোপনে আবছায়ায় দাঁড়িয়ে কিছু গুরুতর আলোচনা করতে থাকে। মঞ্জুরাণীর ফিকে হওয়া কানে যেটুকু শোনা গেল, রবি শিবুকে দাদাসুলভ পরামর্শ দিচ্ছে ‘ডান কানের লতিতে লাগাবি। সামনে পিছনে দুদিকেই’, মঞ্জুরাণী বোঝেন তার উপস্থিতি ছেলেদের এই ভ্রাতৃত্বের দেওয়া নেওযার মাঝে একেবারেই কাম্য নয়। সশব্দে দরজা দিয়ে বিছানাপত্তর পেতে শোবার আয়োজন করেন।

মঞ্জুরাণী সেজছেলের জন্য জেগেছিলেন অনেক রাত অবধি। ঘরের বাতি নিভিয়ে চোখ বুজে এপাশওপাশ করতে করতে অপেক্ষা করছিলেন ভোলার জন্য। কিন্তু ভোলা এল মাঝরাতে। ভোলার ডাকে ঘুম ভাঙল মঞ্জুরাণীর। ‘মা, আমি ভোলা। দরজাটা খোলো একবার,’ মঞ্জুরাণী ভোলার জন্য পানের বোঁটায় চুন লাগিয়েই রেখেছিলেন। দরজা খুলতেই দুদ্দাড় করে ঢুকে পড়ল ঘরে। 

-একটু চুন দাওতো।

মঞ্জুরাণী ঘুমের জড়তা কাটিয়ে চুন মাখা পানের বোঁটা এগিয়ে দেন। ভোলা যাওয়ার সময়ে মাঝরাতের চুনের কাহিনী কাউকে বলতে মানা করে গেল বোধহয়। ঘুমের ঘোরে মঞ্জুরাণী সবটা শুনতেই পাননি। 

কুতুবপুর আর গোলাঘাটার মধ্যে একটা তুমুল উত্তেজনা চলছে রোগটা প্রথম কোথায় ধরা পড়েছে তাই নিয়ে। এমন বেহায়া রকমের রোগ যে নিজে না জানালে জানবার উপায় নেই। রোগ এল কোন হাওয়ায়, রোগের খবরই বা এল কোন বাতাসের ফিসফিসানিতে, রোগের পিছুপিছু রোগের খবর এল নাকি খবরের ঘাড়ে চেপে রোগ এল তা নিয়ে সঠিক সিদ্ধান্তে পৌঁছনো ক্রমশ জটিল হয়ে উঠেছে। রোগের গতিপ্রকৃতি নিয়ে নতুন নতুন গবেষণা জানা যাচ্ছে মুঠোফোনের মধ্য দিয়ে। ডাক্তারবদ্যি করে যে এ রোগের কোনও নিরাময় নেই সেটা মোটামুটি পরিষ্কার হয়ে গেছে। স্থানীয় স্বাস্থ্যকেন্দ্র থেকে সদরের হাসপাতাল সর্বত্র ডাক্তারবাবুরা হাত তুলে দিয়েছেন। ইংরাজী চিকিৎসার এরকম তাচ্ছিল্যের ব্যবহার লোকজনের রাগ আর উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে তুলেছে। চিকিৎসা ব্যবস্থার প্রতি বেড়ে চলা অনাস্থা, মুঠোফোনের বার্তায় বার্তায় ভেসে বেড়ানো সমাচারগুলোকে আরও বেশি গ্রহণীয় করে তুলছে। বিজনের রকমারি স্টোর্স-এর সামনের গজল্লায় সর্বশেষ পাওয়া আক্রান্ত আটাত্তর বছরের বৃদ্ধ মণিরুল শেখ। মণিরুল অসমর্থ শরীরে পেচ্ছাব করতে বাইরে যেতে পারে না। মাঝ রাত্তিকে বউকে ঠেলা মেরে তুলে মগটা পায়ের মাঝখানে রেখে পেচ্ছাব করতে গিয়ে ‘হায় আল্লাহ!’ বলে এমন চেঁচান চেঁচাল যে পাশের ঘর থেকে ছেলে সাদিক আর তার বউ সাকিনা ছুটে এল। মণিরুল লুঙ্গি তুলে দাঁড়িয়ে মাথা চাপড়াচ্ছে। মণিরুল ভয়ে কষ্টে ভেঙে পড়ে আর্তনাদ করতে থাকে,

-গেছে গেছে এক্কেরে ফুলের দানার মতো হয়ে গেছে।

সাদিক এর আগে বাপের নুনু স্বচক্ষে দেখেনি। তাই সঠিক পরিমাপের আন্দাজ পাওয়া তার পক্ষে সম্ভব নয়। তবে রোগটা যে ঘরে ঢুকে পড়ছে সেটা ভেবেই আতঙ্কে শিউরে উঠল সে। শাকিনার পরিস্থিতি সবচেয়ে সঙ্গিন। শ্বশুরের ওরকম উদোম দশা দেখে ঘোমটা টেনে ছুটে ঘরের বাইরে বেরিয়ে গেল। বুড়ি ফরিদা তড়িঘড়ি বরের লুঙ্গি নামিয়ে কানে চুন মাখাতে থাকে। সাদিক ব্যাপারখানা চেপে যাবে ভেবেছিল। কিন্তু এই গোলমেলে হাওয়ায় খবর উড়ছে ফরফর করে ফড়িং-এর মতো। চুনের উপকারিতা এবং কার্যকারীতা নিয়েও সন্দেহ তৈরি হচ্ছে। কিন্তু ডান কানের লতিতে চুন লাগানোটাই একমাত্র দাওয়াই হিসবে মেনে নেওয়া ছাড়া অন্য কোনও উপায় ফড়িংয়ের ডানায় জানান দেয়নি এখনও। কেউ কেউ অতিসাবধানী হয়ে দুকানের লতিতেই চুন লাগাচ্ছে। কায়েত পাড়ার ছেলেরাতো নাকেও চুন ঘষে রাখছে স্নানের পরে। চুনের ক্ষারে কানের চামড়া উঠে ঘা হয়ে যাচ্ছে কিন্তু অনোন্যপায় সকাতর পুরুষের দল কাটা ঘায়ে চুনের প্রলেপ দিয়েই চলেছে। নতুন গবেষণা অনুযায়ী জানা যাচ্ছে পরিণত পুরুষের শিশ্ন দৈর্ঘ্যে দুই থেকে তিন ইঞ্চি কমতে পারে এই নুতন রোগের প্রকোপে। ইতোমধ্যে রোগ সংক্রমণের গতিপ্রকৃতি নিয়েও গবেষণালব্ধ খবরাখবর আসতে শুরু করেছে। জানা যাচ্ছে প্রধানত দৃষ্টি ছোঁয়াচে একজন থেকে অন্যজনে রোগ ছড়ায়।  দৃষ্টি ছোঁয়াচ মানে আক্রান্তের চোখে সুস্থ লোকের চোখ পড়লে আর রক্ষে নেই। দু-তিন দিনের মধ্যেই শিশ্ন ছোট হতে শুরু করবে। পুরুষমানুষ রাস্তাঘাটে এখন চোখাচোখি যাতে না হয় তাই নতমস্তকে রাস্তা থেকে নজর তোলে না। একে অপরের সঙ্গে আকাশপানে চেয়ে কথা বলে। অনেকে আবার বলেছে নাভিতে বা গুহ্যদ্বারে টিকটিকি পড়ে রোগ ছড়িয়েছে প্রথমে। 

রোগ ছড়ানোর প্রক্রিয়া নিয়ে মতভেদ থাকলেও রোগের ভয়াবহতা নিয়ে সকলে একজোট। এব্যাপারে ডাক্তারের ঔদাসিন্যকে একপ্রকার অক্ষমতা বলে ধরে নিয়ে অসহায় রোগীর দল ফিরে গেছে অতিভৌতিক পদ্ধতির কাছে। পুরুতমশাই পুঁথিপত্তর ঘেঁটে বলেছিল অস্থানে কুস্থানে লিঙ্গ প্রবিষ্ট হলে ছোট হয় শাস্ত্রে একথা লেখা আছে। অস্থানে কুস্থানে ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে ভটচায বলে, যোনীব্যতীত অন্য স্থান যেমন মুখগহ্বর, পায়ু, কর্ণ, নাসিকা, চক্ষু…। পুরুত মশায়ের সামনে উদগ্রীব শরণার্থীরা বিন্দুবিসর্গ বুঝতে পারছে না দেখে পালবাবু সহজ করে দেন, ‘গুদ ছাড়া অন্য কোনও ফুটোয়ে বাঁড়া ঢোকাবি না তোরা। মানে মুখে, পোদে, কানে, নাকে, চোখে…’। এই শুনে ক্যাবলা মদন অবাক হয়ে বলে, ‘এই বাঁড়া! চোখে কে বাঁড়া ঢোকায় ঠাকুর!’ ঠাকুর মশাই বিরক্ত হয়ে ধমক দেন, আহ্, অস্থানে কুস্থানে মানে অজাত কুজাত মেয়েছেলের গুদেও হতে পারে, নিজের জাত ছাড়া অন্যজাতের মাগী চুদে চুদে তোদের এই দশা’।

এলাকায় যে তিনটে অসবর্ণ বিবাহ হয়েছিল তাদের দিকে জনরোষ উপচে পড়ল। মানিক দাস কেরোসিন তেল বেচে পয়সা কামিয়েছে বিস্তর। পয়সা দিয়ে জাতে ওঠার মতলবে হারু দত্তর ছেলের সঙ্গে মেয়ের বিয়ে দিয়েছিল। এখন লোকজন বলাবলি করতে শুরু করেছে টাকা দিয়ে ছেলে কেনা যায়, জাত কেনা যায় না। হারুর ছেলে শিশ্নের স্বাস্থ্য রক্ষার্থে মানিকদাসের মেয়েকে বাপের বাড়ি পাঠানাোর ব্যবস্থা করা হল জনাদেশে। গোয়ালপাড়ার ঘোষেদের মেয়ের সঙ্গে বিয়ে হয়েছিল তিলি পাড়ার দিলুদার। এক্ষেত্রে বড়জাতের গহ্বরে ছোটজাতের শিশ্ন প্রবেশ ক্রিয়ায় তেমন বিপদ সম্ভাবনা নেই বলে কেউ কিছু বলেনি। সবচেয়ে সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে ক্যাপ্টেনদাদার। ক্যাপ্টেনদাদা সেনায় কাজ করত। বিয়ে করেছে নেপালী মেয়েকে। ভালবাসার বিয়ে। নেপালী মেয়ের জাতবর্ণ এই জায়গায় তুল্যমূল্য  বিচার করা দুষ্কর। ক্যাপ্টেনদাদারা যদিও খুব উঁচু জাতের নয়। তবু সাবধানের মার নেই। ক্যাপ্টেনদাদা অবোধ মানুষ নয়। সব শুনে ছেলেদের কথা দিল বিপদ কাটার আগে বউকে ছুঁয়ে পর্যন্ত দেখবে না। কিন্তু এখন বউকে অতদূর বাপের বাড়ি পাঠানো যাবে না। ছেলেরা ফিরে এল বটে কিন্তু ক্যাপ্টেনদাদার ভালবাসার বিয়ে, বউ ছাড়া এক মূহূর্ত চলে না। একটা উপায় করা গেল। কিন্তু এমন উপায় ক্যাপ্টেনদাদাকে বলবে কে? অমন নিপাট ভালমানুষ মাঝবয়সী ভদ্রলোকের কাছে এমন দাবী নিয়ে যাওয়া খুবই অস্বস্তিকর। কিন্তু রোগের দাপট দিন দিন বেড়েই চলেছে। প্রতিদিন লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে আক্রান্তের সংখ্যা। একবার ছোট হয়ে গেলে আর বাড়ার কোনও সম্ভাবনা নেই। শেষমেষ ক্যাপ্টেন দাদাকে প্রস্তাব পারা হল। ক্যাপ্টেন দাদা দুমিনিট নীরব থেকে গভীর আত্মত্যাগের দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, ‘বেশ রোজ সকালে আমি যাব, তোদের বাড়িতে আসতে হবে না।’ দেশের জন্য নিজের জীবনের অনেকটা আয়ু দান করেছে ক্যাপ্টেনদা, আজ দশের জন্য কিছুটা সম্মান দান করতে পিছপা হল না। রোজ সকালে রোগা লাল্টু সর্বাঙ্গ নাক, মুখ, চোখ কাপড়ে ঢেকে একটা টেপ ফিতে নিয়ে ক্লাব ঘরে বসতে শুরু করল। প্রথমটায় টেপ ফিতে পাওয়া যাচ্ছিল না। বলরাম তার ছেলের জ্যামিতি বাক্স থেকে প্লাস্টিকের স্কেল নিয়ে এল। যদিও প্লাস্টিকের স্কেলেই কাজ চলে যেত তবু ক্যাপ্টেদাদার মর্যাদার কথা মাথায় রেখে টেপফিতের বন্দোবস্ত করা হল। রোজ সকালে ক্যাপ্টেদাদা এসে বার্মুডাটা নামিয়ে দাঁড়ায়। লাল্টু ফিতে দিয়ে অঙ্গটির দৈর্ঘ্য পরিমাপ করে খাতায় টুকে রাখে। দৈনিক পরিমাপে ছোট হওয়ার কোন ইঙ্গিত দেখলেই খবর করতে বলা আছে।

মণিরুলের ঘটনার পর থেকে অস্থানে কুস্থানে প্রবেশ করার তত্ত্বটাও আর খাটছিল না। মুসলমানের জাত মুসলমান। তাছাড়া ওই বুড়োর যে এখন আর কোথাও প্রবেশের সামর্থ্য নেই সে ব্যাপারে আর কারও দ্বিমত নেই। অতএব গণহারে পর্যবেক্ষণ আর পরিমাপ ছাড়া গতি নেই। নিয়ম জারি হল চোদ্দ বছরের উর্দ্ধে সকল পুরুষকে নিয়ম করে ক্লাবঘরে গিয়ে প্রতিদিন সকালে মাপিয়ে আসতে হবে। একা লাল্টুর পক্ষে এই ব্যাপক মাপামাপি সম্ভব নয়। আরও দুজন ছেলেকে কাজে লাগাতে হল। এমন ঝুঁকির কাজ কেউ বিনা পয়সায় করতে রাজি হয় না। চাঁদা তুলে কিছু টাকাপয়সার ফান্ড বানানো হল। দুদিনের মধ্যেই এত সংখ্যা, নাম, তারিখ সব গুলিয়ে লন্ডভন্ড কান্ড। তিরিশ কিলোমিটার দূরের একটি ছেলেকে পাওয়া গেল। কোলে বসানো কম্প্যুটার নিয়ে সে হাজির হয় প্রতিদিন সকালে। কম্প্যুটারে ছক কেটে সবার নামের সঙ্গে, তারিখের সঙ্গে লিঙ্গের পরিমাপ টুকে রাখে কম্প্যুটারে। এই ব্যবস্থাপনার জন্য তহবিল থেকে ভাল অঙ্কের টাকা খসল। কিন্তু ছোকরার কাছে যেকোনও সময়ে যেকোনও তথ্য রেডি। নাম বলে দিলে কম্প্যুটারে এক বোতামের চাপে যাবতীয় দিনে যাবতীয় মাপ, মাপের তারতম্য ফুটে ওঠে স্ক্রিন-এ। ছোকরা মাঝে মাঝে নানা রঙের আঁকিবুকি রেখার চিত্রলেখে রোগের প্রাদুর্ভাব আর বিস্তার প্রসঙ্গে বিশ্লেষণ করে বুঝিয়ে দেয়। এইসব তথ্যাদি বিদেশের গবেষণাগারে পাঠিয়ে আরও নিগূঢ় ব্যাখ্যা পাওয়া যেতে পারে বলে সে জানিয়েছে। তবে সমস্যা হচ্ছে মানবদেহের পুংদণ্ডের পরিমাপ ধ্রুবক নয়। মূত্রচাপ, সকালে ঘুম ভাঙার সময়ে, যৌন উত্তেজনা ইত্যাদির সাপেক্ষে পরিবর্তনশীল চলরাশি। এহেন অবস্থায় সঠিক পরিমাপ করে সঠিক সিদ্ধান্তে পৌঁছতে অনেক সময়ে নানা ভুলভ্রান্তি ঘটছে। এতদসত্ত্বেও লালটুদের গোটা দলটা জান লড়িয়ে দিচ্ছে অবস্থার মোকাবিলা করতে। গোলঘাটার এই তৎপরতা দেখে কুতুবপুরের হত্তাকত্তারাও নড়েচড়ে বসেছে। কুতুবপুরের লোকেদের মধ্যে বদ্ধমূল ধারণা গোলঘাটার সুদেব কুতুবপুরের ছেলেদের সঙ্গে ফুটবল খেলতে এসে এপারে রোগ ছড়িয়েছে। অবশ্য গোলঘাটার অভিযোগ ঠিক উল্টোটা। সুদেব ওপারে খেলতে গিয়ে গোলঘাটায় রোগ নিয়ে ফিরেছে। এই দোষারোপ, অবিশ্বাস আর সন্দেহের আবহে দুদিকের দীর্ঘদিনের প্রতিদ্বন্দিতা আর বৈরীতা নতুন মাত্রা পেয়েছে। এপার-ওপারের যাতায়াতের তিনটি পথের দুটো কোদাল দিয়ে কুপিয়ে কেটে দেওয়া হয়েছে। একমাত্র যে পথাটা খোলা আছে তাতে দুতরফ থেকেই নাকাবন্দী চেকপোস্ট বসেছে। অত্যন্ত প্রয়োজন ব্যতিরেকে যাওয়া আসা বন্ধ। যাতায়াতের অনুমতির জন্য লিঙ্গ পরিমাপ এবং গত কয়েকদিনের পরিমাপের পরিসংখ্যান যাচাই করা আবশ্যিক। এসব কানুন বলবৎ করতে আরও টাকা চাই, আরও চাঁদা তোলা চাই। সব পরিবারে চাঁদার টাকা মজুত নেই। তাছাড়া আতঙ্ক আর নৈরাশ্যের এই মানসিক চাপে অনেকেই কাজে যেতে পারছে না। হাত পড়েছে ঝি-বউদের গয়নায়। সাদিকের বউ সাকিনা দুটো রুপোর মাকড়ি, ক্যাপ্টেনদাদার বউ চামেলী ভাবীর লক্ষ্মীর ভাঁড় সবেতেই টান পড়েছে। এর মধ্যে কুতুবপুর আর গোলাঘাটের মধ্যে পারষ্পরিক যড়যন্ত্রের নুতন তত্ত্ব উঠে আসছে। সেই নিয়ে গোলও বেঁধেছে বিস্তর। কুতুবপুরে মনসুর আলির সম্বন্ধিরা দুই সপ্তাহ আগে বাংলাদেশ থেকে ঘুরে গেছে। বৈদেশিক চক্রান্ত নিয়ে গোলাঘাটের মানুষজন সরব হয়েছে। অন্যদেশ থেকে এসে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হয়ে রোগ ছড়িয়ে যাচ্ছে, এনিয়ে বিস্তর ঝামেলা করেছে তারা। এরমধ্যে মধু চাটুজ্যের ছোট ছেলের সামাজিক ইন্টারনেট মাধ্যমে একটা পোস্ট নিয়ে অবস্থা আরও সংবেদনশীল হয়ে উঠেছিল। পোস্টে লেখা ছিল, ‘যাদের বাঁড়ার ছাল ছাড়ানো, তাদের এই রোগ বেশি হচ্ছে। তারাই বেশি ছড়াচ্ছে। আমাদের চামড়া আমাদের রোগ থেকে রক্ষা করে। যাদের বাঁড়ারা ছাল ছাড়ানো তাদের পিঠের ছাল ছাড়াও’। এই পোস্ট-এর পর অশান্তি এমন তুমুল হয়ে ওঠে যেন কেরোসিনে ভেজা বাড়ির ছাউনি। মুসলমান মহল্লা অপমানে প্রতিহিংসায় ফুঁসছিল। পুলিস এসে ডান্ডা দিয়ে ঠান্ডা করে সহাবস্থান বজায় রাখল।

মঞ্জুরাণী সর্দারের এই সামাজিক সংকটকালেও বিশেষ কোনও হেলদোল নেই। একদিন দুপুরবেলা পাড়াসুদ্ধ ছেলেপুলের দল এসে বাড়ির উঠোনে দাঁড়িয়ে গেল। বাড়িভর্তি ব্যাটাছেলে গিজগিজ করছে। সেদিন মঞ্জুরাণী বেজায় চটেছিলেন। দরজায় এসে দাঁড়িয়ে হাঁক পাড়লেন, ‘ও বউ! উঠোন ভত্তি এই ভর দুক্কুরবেলা এত ব্যাটাছেলে কেন রে?’ যেটুকু জানা গেল ভোলা আহমেদাবাদ থেকে রোগ আমদানি করেছে কি না সেটা নিয়ে একটা সংশয় তৈরি হয়েছে, তাই উত্তেজিত জনতা ফিতে-স্কেল নিয়ে মাপতে চলে এসেছে। যাইহোক ভোলা সে যাত্রায় উতরে গেছিল। শইবু এসে সলজ্জ বদনে জানিয়ে গেল মঞ্জুরাণীর চারটি ছেলের চারটি শিশ্ন অচ্যুত সুরক্ষিত রয়েছে। মঞ্জুরাণী স্বভাবসিদ্ধ ঔদাসীন্যে মুখে এক খিলি পান গুঁজে পাশ ফিরে শুলেন। মঞ্জুরাণীর ঘরে টিভি দেখতে আসে পাশের বাড়ির নমিতা আর সবিতা। একদিন দু’জনে এসে মাথা থাবড়াতে শুরু করল। দুইবেটির ভাতারকেই সেই রোগে ধরেছে। মঞ্জুরাণী মুখ বেঁকিয়ে বললেন, ‘মরণদশা! এই যাতো এখান থেকে, মেলা ফ্যাঁচ ফ্যাঁচ করিস না। এমন একখান ভাব করছিস যেন রোজ ওই লবেঞ্চুস মুখে নিয়ে চুষিস’। মঞ্জুরাণীর কথা শুনে খানিক লজ্জায় ওরা থতমত হয়ে চুপ করে। শুকনো চোখেই দুবার আঁচল ঘষে। কুটনী মঞ্জুলিকা সুন্দর বউকে কীভাবে খাবারে বিষ মিশিয়ে দিল সেই দৃশ্যে মন দেয়। রাতে ছোটবউ এসেছিল রুটি দিতে। মঞ্জুরাণীর কানে ফিসফিসিয়ে বলে গেল, ‘জানেন মা! মেজদার নাকি হয়েছে।’ মঞ্জুরাণী নিরুত্তাপ থেকে বললেন, ‘কী হয়েছে?’ ছোটবউ বেজায় বিরক্ত হয়ে বলল, ‘আহ! জানেন না? সেই রোগ নাকি ধরেছে। আপনার ছোটছেলে বলল। মেজদি আর মেজদা নাকি কাউকে বলছে না।’   

মঞ্জুরাণী গলার স্বরে তারতম্য না করে বলেন, ‘কী রোগ? কী হয়েছে?’ ছোটবউ বিরক্তি বাড়িয়ে বলে ‘ওই যে ছোট হয়ে যাওয়া রোগ।’ মঞ্জুরাণী বলেন, ‘কী ছোট হয়ে যাওয়া?’ ছোটবউ মুখে আঁচল চাপা দেয়। ভাসুরঠাকুরের শিশ্নের কথা মুখে আনা সম্ভব নয়।

লজ্জায় রাঙা হয়ে বলে ‘সে আমি মুখে আনতে পারব না মা’। মঞ্জুরাণী এবার ফচকে হেসে বললেন, ‘যেদিন মুখে আনতে পারবে সেদিন বোলো। এখন ঘরে যাও।’ কয়েকদিনের মধ্যেই চারভাইয়ের মধ্যে বাড়ি জুড়ে হুলুসস্থুলুস কান্ড বেঁধে গেল। পারস্পরিক সন্দেহ আর গোপনীয়তার অভিযোগে কোন্দল চরমে উঠল। কেউ কারও মুখ দেখাদেখি বন্ধ। জল তোলা, বাসন মাজা, কাপড় কাচা, সবকিছুই একে অপরের ছোঁয়াচ বাচিয়ে অতিরিক্ত সাবধানে করতে হচ্ছে। আনাজপাতি, বাসনকোসন, দাওয়ায় উঠোনে চুনের জল ছড়ানো হচ্ছে। তবু বাঁচবে কী? এভাবে বাঁচবে কী এনিয়ে সংশয় কাটছে না। পুকুরঘাটে জল তুলতে এসে একদিন ছোটবউ মেজবউ সামনাসামনি দেখা। ছোটবউ আঁৎকে উঠে পাশ কাটিয়ে চলে যাচ্ছিল। মেজবউ পথ আগলে দাঁড়াল।

-মিনু, সত্যি করে বল শিবুর হয়েছে? ও বলল শিবুর নাকি হয়েছে ক্লাবের ছেলেরা বলেছে।

মিনু তিরিক্ষি মেজাজে চেঁচিয়ে ওঠে

-মেজদাকে বোলো এসব গুজব রটিয়ে লাভ নেই। ওর কিছু হয়নি। বরং মেজদারই…

মেজবউ ওকে থামায়।

-দেখ মিনু। শিবুর একটু ছোট হলে কিছু আসে যায় না। এমনিতেই তো প্রায় হাঁটু অবধি লম্বা হয়ে যায়। 

ছোটবউ লজ্জায় গুটিয়ে যায়। মেজবউ বলে,

-ওমা ন্যাকামি করিস না মিনু। তুই জানিস না বিয়ের আগে আমার সঙ্গে শিবুর তিন বছরের…

ছোটবউ এবার রাগ আর লজ্জায় ফুঁসতে থাকে। মেজবউ খিলখিল করে হেসে উঠে বলে,

-ও মাগো মা! এখন তোর জিনিস তোরই। আমার আর ওই কেউটে সাপের কামড় চাইনে বাপু। কিন্তু তোর মেজদার হলে আর কিছুই বাকি থাকবে না। এমনিতেই… বলে আবার হেসে ওঠে।

ছোটবউও হাসে। মেজবউ কনুই দিয়ে গুঁতো মারে,

-বল না পোড়ামুখী, এখনও সেই সাপের মতো লকলকে আছে না ছোট হয়েছে?

ছোটবউ লজ্জায় আরও নেতিয়ে গিয়ে বলে,

-জানিনা। আমি দেখিনি।

-ন্যাকামো করিস না মিনু।

-মাক্কালি! ডাক্তার বলেছে এখন দুই মাস কিছু না করতে। 

-ও মাগো মা! বলিসনি কেন মাগী! কী শয়তান তোরা। ও ঠিক বলে। 

ছোটবউ লজ্জায় মিটিমিটি হাসে।

-ও বলতে বারণ করেছে। বলে এখন বলতে হবে না। এই অসুখের বাজারে।

-তাই বড়দি বলে মিনুকে দেখে মনে হয় পেট হয়েছে। আমি বলি নানা গায়ে গত্তি লেগেছে। দাঁড়া বড়দিকে ডাকি।

-তোমার পায়ে পড়ি মেজদি। ও জানতে পারলে বাড়ি মাথায় তুলবে। জান তো এদের ভাইদের জানোয়ারের রাগ।

-দূর হ! এখন সব রোগের ভয় ঘরে দোর দিয়েছে। পৃথিবী এধার থেকে ওধার হলেও কেউ বেরুবে না।

এরপর বাড়ি মাথায় করতে আর কারও জন্য অপেক্ষা করতে হল না। মেজবউ নিজেই দায়িত্ব  নিয়ে বড়বউ, সেজবউকে ঘর থেকে টেনে বের করে খুশির খবর দিয়ে কলতানে ভরিয়ে তুলল উঠোন। ঘরের বেটারা অবশ্য বেরোয়নি এত তীক্ষ্ণ মেয়েলি উচ্ছ্বাসধ্বনিতেও। সকলে মিলে জোকার দিতে শুরু করলে সেই উলুধ্বনিতে মঞ্জুরাণী বেরিয়ে এসে উঠোনে দাঁড়ান। মেজবউ অতিউৎসাহী হয়ে মঞ্জুরাণীর সামনে ছোটবউকে টেনে এনে বলে,

-মা, মিনুর দুমাস চলছে। কাউকে বলেনি এতদিন। 

মঞ্জুরাণী ঘোলাটে চোখে কিছুক্ষণ চেয়ে থাকেন ওদের দিকে। মানুষের বাচ্চাকাচ্চা বিয়োনো রেচনবর্জনের মতোই স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। এতে আর কোনও উত্তেজনা বোধ করেননা না তিনি। কিন্তু মেজবউয়ের আদিখ্যেতা দেখে একটু বিস্মিত হলেন বইকি। বাড়ির বাকি বউ দু’টি, দু’টো তিনটে করে বাচ্চা প্রসব করেছে গত ছয়-সাত বছর ধরে। বাকি ছিল এই দু’টি বউ। মেজবউয়ের বিয়ে হয়েছে পাঁচবছর হয়ে গেছে। লোকজন বাঁজা বলতে শুরু করার পক্ষে যথেষ্ট সময়। ছোটবউয়ের বিয়ের দু’বছরের মধ্যে পেট হয়েছে। এই সংবাদ মেজছেলের কানে গেলে তা যে মেজবউয়ের পক্ষে খুব একটা সুখকর হবে না, সেটা এই নির্বোধ দুর্ভাগিনী মহিলা যে কেন বুঝতে পারছে না সেটা মঞ্জুরাণীর বলিরেখার আনাচেকানাচে জিজ্ঞাসা চিহ্ন হয়ে আটকে থাকে। মেজবউ বলে চলেছে , ‘শিবুরও বাচ্চা হবে, ভাবা যায় বলুন মা!’ ছোটবউ শাশুড়ির সামনে এসে ঢিপ করে পেন্নাম ঠুকল। মঞ্জুরাণী মাথায় হাত বুলিয়ে চিবুক ছুঁয়ে চুম্বল করলেন নিজের হাতে। 

খবর এসেছে চক্কোত্তিদের বড়ছেলে আর ছোটছেলেকে এরোগে ধরেছে। চক্কোতিদের লিঙ্গ মিটারে মাপবে এমন বুকের পাটা কারও নেই। তারা সব বিলেত ফেরৎ পড়ালেখা করা মানুষ। এসব বিষয় তাচ্ছিল্যের সঙ্গে ফুৎকারে উড়িয়ে দেবে। অবৈজ্ঞানিক আজগুবি গেঁয়ো গল্প নিয়ে কেউ আসলে ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বিদেয় করবে। চক্কোতিদের বাড়িতে কাজের লোক, মালি, ড্রাইভার, জমাদার মিলিয়ে গোটা পনেরো লোক কাজ করে। তার মধ্যে দশজন পুরুষ। যদিও কাজ করতে গিয়ে চোখ নামিয়েই থাকতে হয়। ছোঁয়াছুঁইরও দরকার নেই। তবু যদি খবরটা সত্যি হয় তবে কেলেঙ্কারির শেষ থাকবে না। দশজনে বুকে অনেক দম নিয়ে বুড়ো চক্কোতিকে গিয়ে পায়ে পড়ল। ‘কদিন আমরা কাজে আসব না বড়কত্তা। মাইনে চাইনা। ছুটি দিন মাইবাপ!’ বুড়ো চক্কোত্তি এক ধমকে সবকটাকে দূর করল। সন্ধেবেলা বাড়ির ছোট বড় ঝি চাকরদের ডাকল বড় দালানের সামনে। গমগমে গলায় ঘোষণা করল, ‘আমাদের বাড়ির সব পুরুষমানুষ সুস্থ আছে। দরকার হলে প্রমাণ দিতে পারি। সবাইকে প্রমাণ দিতে পারি। সবাইকে অনুরোধ করা হচ্ছে গুজব না ছড়াতে, গুজবে কান না দিতে।’ বুড়ো চক্কোত্তির কথা শুনে সকলে লাজে অপরাধে মরমে মরে গেল। এই কথার পর আর প্রমাণ চাওয়ার স্পর্ধা কারও ছিল না। বুড়ো মালি নগেন অনেক হিম্মত জুটিয়ে কাঁপা কাঁপা গলায় বলল, ‘এখন শুনছি নাকি হাঁসের গু থেকে এ রোগ ছড়ায়। বাড়িতে কদিন হাঁসের ডিম খাবেন না।’

 হাঁসের গু-এর খবরটা আসার পর থেকে এলাকা সুদ্ধ হাঁসেদের জীবন পুড়ল। বাড়িতে পুকুরে যত হাঁস ছিল হয় লোকে কেটে খেল নয় পুড়িয়ে মারল, রাতে শিবু এল মঞ্জুরাণীর ঘরে। মনে হল নেশা করেছে, পা টলছে সামান্য। মঞ্জুরাণীকে দেখে ঈষৎ দূরত্ব বজায় রেখে বলল, ‘মা, হাঁসগুলো বাজারে বেচে দিয়েছি। রোগ ছড়ায় ওগুলো’। এই খবরটা আগেই পেয়েছিলেন মঞ্জুরাণী। তাই মৃদুস্বরে একটু ‘হুঁ’ বলে দাঁড়িয়ে রইলেন। শিবু ফিরে চলে যাচ্ছিল। মঞ্জুরাণী ডাকলেন, ‘হ্যাঁ রে শিবু ছোটবউ-র কি পেট হয়েছে?’। শিবুর মুখভঙ্গিমায় তৎক্ষণাৎ বিরক্তির বজ্রপাত ঘটল যেন। রেগে উঠে বলল, ‘ও মাগীর আর তর সয় না। তোমায় এসে বলেছে?’ মঞ্জুরাণী উত্তর দেন,

-না ও বলেনি, দেখে মনে হল। 

শিবু চুপ থেকে বলল,

-হুঁ, কিন্তু এখন কাউকে বোলো না মা। 

তারপর মায়ের কোল ঘেঁষে আবার বলে,

-আসলে আমাদের নার্সিংহোমে একটা সেটিং করেছি। এবার পেটের ছবি তুললে বোঝা যাবে ছেলে না মেয়ে। যদি মেয়ে হয় তাহলে আর রাখব না। তাই আর পাঁচ কান কোরো না, বুঝলে?

মঞ্জুরাণী চুপ থাকলেন। আরও বেশ কিছুক্ষণ চুপ থাকলেন। দীর্ঘ অস্বস্তিকর চুপ থাকার পর শুধু বললেন,

-এসব আবার জানা যায় নাকি?

শিবু উত্তেজিত হয়ে বলে,

-এখন বিজ্ঞানের যুগ মা, চিকিৎসার কত উন্নতি ধারণা করতে পারবে না।

মঞ্জুরাণী বিড়বিড় করেন,

-শুধু এই রোগটাই সারাতে পারল না!

মাঝরাত্তিরে ঘুম ভাঙে মঞ্জুরাণীর। শিবু বাচ্চাটা রাখবে না বলছিল। পেট থেকে বাচ্চা নষ্ট করার অনেক ঝামেলা। দুই পা ফাঁক করে চিৎ হয়ে শুতে হয়। যোনির ফুটোয়ে ডাক্তার এসে প্রথমে দস্তানা পরা হাতে আঙুল ঢোকায়। তারপর একটা নল। তারপর দুই নম্বর নল নাড়ি ভুঁড়ি ছিড়ে নেয় যেন। মঞ্জুরাণী তখন চক্কোত্তিদের ছোটছেলের কাঁথা ন্যাতা কাচতে যেত। বুড়ো চক্কোত্তির জন্যই হাসপাতালে গিয়ে এসব করাতে হয়েছিল একবার। সেসব কতকাল আগের কথা। মঞ্জুরাণী শীতের হাড় কাঁপা রাতে গুটিসুটি করে লেপ কাঁথা সরিয়ে ওঠেন। দরজা খুলে হাঁসের তক্তার দরজাটা খোলেন। খাঁচার ঘরে হাঁসের বিষ্ঠা ছড়িয়ে আছে সর্বত্র। মঞ্জুরাণী হাত দিয়ে কাঁচিয়ে ঘটির মধ্যে জমা করেন বিষ্ঠা। তারপর ঘটিতে জল দিয়ে ভালো করে মিশিয়ে নেন। হাঁসের গু-এর জলের ছড়া দেন উঠোন, ঘর-দোর কলের চারপাশে। তারপর হাতে ঘটি নিয়ে গু-এর জলের ছড়া দিতে দিতে আবছা ফ্যাকাশে আকাশের আলো আর গাঢ় কুয়াশায় মিশে যান ধীরে ধীরে। পাড়ার অলিগলি জল ছিটিয়ে চক্কোত্তি বাড়ির দিকে হেঁটে যান ভাঙা হাতটা দোলাতে দোলাতে।

শেয়ার করুন

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *