#মিটু এবং দিল্লী আদালতের রায়

২০১৮ সালে যখন #মিটু আন্দোলন তুঙ্গে তখন সাংবাদিক প্রিয়া রামানি প্রাক্তন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী এম. জে আকবরের বিরুদ্ধে যৌন হেনস্থার অভিযোগ আনেন। প্রিয়ার বয়ান সামনে আসার পরেই আকবরের আরও অনেক প্রাক্তন সহকর্মী তার বিরুদ্ধে সরব হন। প্রত্যুত্তরে প্রাক্তন মন্ত্রী প্রিয়া রামানির বিরুদ্ধে ফৌজদারি মানহানির মামলা করেন এবং আদালতকে জানান যে এইসব মিথ্যা অভিযোগের ফলে তার যে নক্ষত্রসম সামাজিক খ্যাতি, তা ক্ষুণ্ণ হচ্ছে। গত ১৭ই ফেব্রুয়ারি ২০২১, এই মামলার রায় ঘোষণার দিন, দিল্লীর এক আদালত প্রিয়া রামানিকে নিঃশর্তভাবে সমস্ত অভিযোগ থেকে মুক্তি দেন। আদালতের রায়ের পর দ্য হিন্দু-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে প্রিয়া জানান, “এই মামলা শুধু আমার ব্যাপারে সীমাবদ্ধ নয়। মহিলারা কর্মক্ষেত্রে কী কী সমস্যার সম্মুখীন হন সেই নিরিখেই এই মামলা ছিল। নিজের সত্য আদালতে বৈধতা পেলে আনন্দ হয় বৈকি। এটা আমার একার জয় না, যারাই #মিটু আন্দোলনের সময়ে মুখ খুলেছিলেন এই জয় তাদের সবার” (দ্য হিন্দু, ফেব্রুয়ারি ১৭, ২০২১)।

প্রথম যখন #মিটু আন্দোলন শুরু হয় তখন অনেক নারীবাদীরাও সন্দেহপ্রবণ হয়ে পড়েছিলেন। এমনকি একদা ‘ডিউ প্রসেসের’ সমালোচনা করা নারীবাদীরাও স্থির থাকতে পারছিলেন না এবং বকলমে প্রায় ‘ডিউ প্রসেসের’ পক্ষেই যুক্তি সাজাচ্ছিলেন যেন। আজ আমি যখন এই প্রবন্ধটি লিখছি তখন পদ্মা দিয়ে অনেক জল গড়িয়ে গেছে। অন্তত #মিটু সংক্রান্ত একটি মামলার শুনানিতে এই আন্দোলন যে দেশের এক আদালতে বৈধতা পেল সেটা দেখতে পাচ্ছি। #মিটু-র পক্ষে দাঁড়িয়ে আমরা যারা সেই সময়ে আইনি প্রক্রিয়ার সমস্যাগুলো তুলে ধরছিলাম সেটাই যখন ‘ডিউ প্রসেসের’ মাধ্যমে স্বীকৃতি পাচ্ছে তখন আমাদের গোড়ার দিকের তর্কগুলি থেকে দু’ধাপ অন্তত এগোবার সময় হয়েছে বলে মনে করি।

#মিটু এবং প্রকাশ্যে অভিযোগ জানানোর অধিকার

এই আন্দোলনের শুরুর সময় থেকেই যে কথাগুলো ঘুরে ফিরে আসছিল তা হল নৈতিকতার প্রশ্ন। প্রশ্ন উঠছিল এভাবে সামাজিক মাধ্যমে কাউকে অভিযুক্ত করার পেছনে কোন কায়েমী স্বার্থ থেকে যাচ্ছে কিনা সেটা বুঝতে হবে। আজ, প্রায় চার বছর পরেও সেই এক উদ্বেগ থেকেই যাচ্ছে। ‘কেন বলতে হচ্ছে’ প্রশ্নের থেকে এখনও বেশি ভাবাচ্ছে ‘এখানে কেন বলছে’ সেই প্রশ্ন। এই প্রশ্ন উদ্ভূত সংশয় থেকে প্রায় ভয় দেখানোর মত করেই বলা হচ্ছে যে এই পদ্ধতিতে ভবিষ্যতের পুরুষ-সাথীদেরও দূরে সরিয়ে দেওয়া হতে পারে। অর্থাৎ অবদমিত মানুষের বয়ানে, তার ওপর ঘটে যাওয়া অন্যায়ের আখ্যান শুনে যেন কোনও সহৃদয় ব্যক্তি আপামর নারীবাদীদের ওপর চটে না যান সেই দায়িত্ব অভিযোগকারিণী এবং তাকে সংহতি জানানো মানুষদের নিতে হবে। ওদিকে কিছু মানুষ বন্ধুত্বের অছিলায়, সমর্থনের সুরে বলতে চান অপরাধের ওজন বুঝে অভিযোগ করা ভালো। খুবই যুক্তি দিয়ে তারা বলেন সকলের অপরাধের ধরন এক নয়, পদ্ধতি এক নয় এবং যদি সত্যিই যৌনহিংসার মাত্রা মাপার কোনও স্কেল থেকে থাকে তাহলে সব অপরাধের ধরনও এক নয়। যেখানে আইনের চোখেও সব অপরাধের শাস্তি এক নয়, সেখানে প্রাথমিক শাস্তিস্বরূপ একই পদ্ধতিতে সকলের নাম নিয়ে তাদের একই কাঠগড়ায় দাঁড় করানো অনৈতিক।

দিল্লীর যে আদালত প্রিয়াকে নির্দোষ মুক্তি দেয় তার বক্তব্য ছিল “নিজেদের পছন্দ মত যে কোনও প্ল্যাটফর্মে, এমনকি ঘটনার কয়েক দশক পরেও মহিলাদের অভিযোগ জানাবার অধিকার আছে” (দ্য হিন্দু, ফেব্রুয়ারি ১৭, ২০২১)। অভিযোগ জানাবার ক্ষেত্রে অভিযুক্তর সম্মানরক্ষা করা যে মূল কাজ নয় তা স্বীকৃতি পায় আদালতের এই বয়ানে। কখন বলছেন এবং কোন সামাজিক মাধ্যমে বলছেন সেটা মাথায় রাখার দায়িত্ব থেকেও আইনিভাবে মুক্তি দেওয়া হল ভবিষ্যতের অভিযোগকারিণীদের। কিন্তু যে কোনও ‘সভ্য’ সমাজে রাষ্ট্রপ্রদত্ত ‘অধিকারের’ যদি সমবন্টনের ব্যবস্থা থেকে থাকে তাহলে এই রায়ই আসার কথা ছিল। এবং এখানেই দুঃখ হয় যে তাৎক্ষনিক তৎপরতায় শুরুর দিকে বিভিন্ন নারীবাদী মানুষেরা, এবং আপাত বন্ধুরা সেটা বুঝতে পারছিলেন না। যে কোনও মানুষের নিজের অবদমনের ইতিহাস নির্দ্বিধায় বলতে সাহায্য করার যে দায়িত্ব তাদের ছিল সেই জায়গা থেকে এই রায়ের অনিবার্যতা অনুমান করতে না পারা আমার কাছে অন্তত একধরনের ব্যর্থতা।

ন্যাচারাল জাস্টিস অথবা ডিউ প্রসেসের একটা বড় সুবিধে হল প্রাতিষ্ঠানিক এবং কাঠামোগত সাহায্য পাওয়া। যদি না কেউ রাজনৈতিক ভাবে নৈরাজ্য এবং অস্থিতিশীলতা রাষ্ট্রের অন্তিম লক্ষ্য হিসেবে ভেবে থাকেন, আইন এবং বিচার ব্যবস্থার বাইরে হিংসাকে প্রশমিত করবার আর কোনও রাস্তা খোলা থাকে না। কিন্তু সমস্যা হল আইন এবং এথিক্স সবসময় একে অপরের পরিপূরক নয়। উলটে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দেখা যায় যে আইন রাষ্ট্রের প্রাধান্যকামী মরাল এথিক্স দ্বারা চালিত হতে থাকে। যে কারণে বৈবাহিক ধর্ষণের মত ঘটনাগুলো এখনও আইনের চোখে অপরাধের পর্যায়ে পড়ে না। আর তাই #মিটু আর কিছু না হলেও অন্তত একটি দিক সামনে নিয়ে এসেছিল, আর সেটা হল আইনি প্রক্রিয়ার সীমাবদ্ধতা এবং জটিলতা। প্রিয়া রামানির পক্ষে আদালতের বয়ানকে যদি আমরা এই প্রেক্ষিতে পাঠ করি তাহলে বুঝব যে আদালতও মানছেন ন্যাচারাল জাস্টিস অথবা ডিউ প্রসেস দেশ, কাল, ক্ষেত্র বিশেষে সর্বজনীন হতে পারে না। এখানে মনে হতেই পারে যে আমি হয়ত বলছি আদালত স্বীকার করছে যে এদেশে আইনিব্যবস্থা দুর্বল এবং ভঙ্গুর, কিন্তু এই সরলীকৃত তর্ক থেকে আমি দূরে থাকছি। আমি মনে করছি এই রায় ঐতিহাসিক কারণ আদালত মনে করিয়ে দিচ্ছেন কোথাও যেন আমরা হঠাৎ করে ‘ডিউ প্রসেস’-কে ‘ব্যক্তিগত’-র সঙ্গে গুলিয়ে ফেলছিলাম; যে ব্যক্তিগতর দোহাই দিয়ে এতদিন মহিলাদের নির্যাতিত হবার কথা পাঁচকান করতে বারণ করা হত। যেন ভাবছিলাম আদালতে গেলে তবেই অভিযোগ মান্যতা পাবে এবং একইসঙ্গে অভিযুক্তদের মানবাধিকার এবং সম্মান রক্ষা হবে; যেন আদালতের বাইরে করা সমস্ত অভিযোগ অসাংবিধানিক এবং বেআইনি।

#মিটু এবং অভিযুক্তর সম্মান

তাই এই মামলার শুনানি আমাদের কাছে আরেকটা জিনিসও পরিষ্কার করে দিচ্ছে যে অভিযুক্তের সম্মানরক্ষার দায়িত্ব অভিযোগকারিণীর নয়। এম. জে. আকবরের দাম্ভিক আত্মসম্মানবোধের কথা উল্লেখ করে দিল্লীর আদালত জানিয়েছে, “সমাজে কিছু মানুষ যতই সম্মানিত হোক না কেন, তাদের ব্যক্তিগত জীবনে তারা নারীদের বিরুদ্ধে কঠোর নিষ্ঠুরতার নিদর্শন রাখতে পারেন” (দ্য প্রিন্ট, ফেব্রুয়ারি ১৮, ২০২১)। এখানে উল্লেখ্য যে আদালত কিন্তু বলছেন না যে অভিযুক্তর মানবাধিকার অথবা আত্মসম্মানবোধ থাকবে না। আদালত সেটা বলতে পারেও না। কিন্তু শুধুই ‘সম্মানীয়’ ব্যক্তি বলে তার অন্যায়ের প্রতিবাদ করা যাবে না এধরনের ক্ষমতাকেন্দ্রিক জাস্টিসের ধারণা যে দেশের সংবিধান এবং গণতন্ত্র বিরোধী সেটুকুই মনে করিয়ে দিলেন মাত্র, কারণ ব্যক্তিগত সম্পর্ককে প্রাধান্য দিতে গিয়ে আমরা এই সাধারণ কথাটুকু ভুলতে বসেছিলাম।

আমরা কখনও মাথায় রাখিনা যে সংহতি প্রদর্শন রাজনীতির বাইরে নয়। কেউ যখন প্রকাশ্যে নিজের ওপর ঘটে যাওয়া হিংসা এবং হেনস্থার আখ্যান সবার সামনে তুলে ধরছে, তখন সে সংহতির দাবী রাখে। অপরদিকে, যখন কেউ অভিযুক্ত হচ্ছে সেও আশ্রয় খুঁজবে নিঃসন্দেহে। এই দুই অবস্থান, সংহতি এবং সহায়তা, কোনভাবেই অরাজনৈতিক হতে পারে না। যারা নিঃশর্ত সংহতি জানানোয় বিশ্বাসী তাদের সমস্যা চারগুণ বেড়ে যায় যখন খবর আসে যে অভিযুক্ত তাদেরই কাছের মানুষ। এই টানাপোড়েন থেকে বেরোবার কোনও সহজ রাস্তা নেই। এই জটিলতাকে মাথায় না রাখলে সমস্যা বাড়ে বৈ কমে না। সমস্যা তখনই দেখা দিচ্ছে যখন কিছু মানুষ এই জটিলতা অতি সহজেই পেরিয়ে যেতে পারছেন। যেখানে অভিযুক্তর পাশে দাঁড়ানোর মানে হওয়া উচিত ছিল তাকে তার দোষ স্বীকার করতে এবং তার প্রাপ্য সমালোচনাকে মেনে নিতে সাহায্য করা সেখানে এই মানুষেরা অভিযুক্ত মানুষটির সঙ্গে সংহতি দেখিয়ে অভিযোগকারিণীর প্রতি বিদ্বেষমূলক মন্তব্য ছড়াতে থাকে।

কিছু উদাহরণ দিয়ে এবারের মত শেষ করতে চাই। #মিটু শুরু হবার সময়ে থেকেই কলকাতার সাংস্কৃতিক এবং রাজনৈতিক মহলের অনেকেই যৌনহিংসার অভিযোগে অভিযুক্ত হচ্ছিলেন এবং বর্তমানেও হচ্ছেন। দেশের যা অবস্থা সেক্ষেত্রে যতদিন তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগগুলি প্রকাশ্যে আসেনি ততদিন শোনা যেত যে এদের মধ্যে অনেকেই নাকি ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে সরব এবং সেই যুক্তিতে নারীবাদীদের বন্ধু। এদের বিরুদ্ধে যখন অভিযোগ আসে, দেখা গেল, তাদের কাছের কমরেডরা অভিযোগকারিণীর চরিত্রহননেই ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। একের পর এক ওপরচালাকি এবং বিদ্রূপের ভাষায় দংশন করে যেতে থাকলেন। একই দিকে বলতে থাকলেন #মিটু মানে খাপ বসানো এবং অপরদিকে প্রকাশ্যে চালালেন ‘টক্সিসিটি’-কে যুক্তিগ্রাহ্য করে তোলার চেষ্টা। ধ্রুপদী ‘টক্সিক’ চরিত্রদের মত তারা নিজের স্বার্থে নারীবাদ ‘বুঝিয়ে’ দেবারও চেষ্টা করছেন কখনও। এর মধ্যে সবচেয়ে জঘন্য এবং ধিক্কারজনক যে বিষয় সেটা হল এম. জে. আকবরের মতই এই আপাত র‍্যাডিকালরাও অভিযোগকারিণীর বিরুদ্ধেই মামলা করার হুমকি দিতে থাকছিলেন।

আইন দিয়ে সব আটকানো যায় না। ঠিক যেমন আইন থাকলেও যৌন হিংসা/হেনস্থা বন্ধ থাকে না অথবা জাস্টিস পাওয়া যায় না, তেমনি অভিযোগ করার অধিকারের স্বপক্ষে রায় থাকলেও ‘স্বজাতির’ সম্মান রক্ষা করতে কিছু মানুষ আদালতের হুমকি দেবেই। তাদের থামাতে না পারলেও ‘খোলা হাঁটে হাড়ি ভেঙেছ কেন, কাছারিতে যাও’ বললে অন্তত এই রায় তুলে ধরা যাবে। প্রিয়া রামানি ঠিকই বলেছেন, তার জয় আমাদের সবার জয়।

চলবে…

সূত্রপঞ্জী

i. https://www.thehindu.com/news/national/my-victory-belongs-to-everyone-who-spoke-up-during-the-metoo-movement-says-priya-ramani/article33861727.ece

ii. https://www.thehindu.com/news/cities/Delhi/metoo-delhi-court-quashes-mj-akbars-defamation-case-against-priya-ramani/article33860324.ece

iii. https://theprint.in/judiciary/right-to-reputation-vs-womans-right-to-dignity-what-court-said-in-akbar-ramani-verdict/607125/

শেয়ার করুন

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *