‘মেয়েদের কবিতা’ বনাম ‘কবিতা’

আজও, চাঁদে কিংবা মঙ্গলে যখন মানুষ পাড়ি দিচ্ছে বা দেওয়ার কথা ভাবছে, সেই সময়কালেও কেউ কেউ ভাবেন ‘কবিতা’ লেখা মেয়েদের কাজ নয়। আসলে এই উচ্চারণ, এই চেতনা, কোনও ব্যক্তি-মানসের নয়। এর পিছনে আছে ধারাবাহিক দমনের রাজনীতি,যার শিকড় খুব গভীর। এই রাজনীতি একই সঙ্গে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক চেতনার অংশ হয়ে উঠেছে। আসলে যে কোনও ধারণাই ব্যক্তিমানুষ তার সমাজের, তার পরিপার্শ্বের সাপেক্ষে গড়ে তোলে। হঠাৎ আকাশ থেকে কোনও ধারণা, কোনও চেতনাই একদিন টুপ করে মাথায় পড়ে না। এই যে খবরে বড় করে লেখা হয়—এই প্রথম কোনও মহিলা এরকম বোয়িং বিমান চালালেন বা এই প্রথম কোনও মহিলা সাহিত্যিক (ধরা যাক) ‘আবোলতাবোল’ পুরস্কার পেলেন; তখন সেখানে যেন মরমে মরমে এক অগোচর বার্তা কাজ করে—এই প্রথম কোনও মহিলা এই কাজের বা এই সম্মাননার জন্য উপযুক্ত হলেন।

হাজার হাজার বছরের অপ্রেশনের ইতিহাস যেহেতু প্রতিটি খবরে বলা বা প্রতিটি কথায় বলা সম্ভব নয়, বাক্যগুলো, খবরগুলো, তথ্যগুলো তাই মেয়েদের প্রতি আরও একটু চোখ কুঁচকে তাকায়। সেও যে সবকিছুর সমান অংশীদার, ভুলে যাই। ভুলে যাই, সে আগে মানুষ, তারপর নারী। কিংবা যখন মাধ্যমিকের মতো কোনও পরীক্ষার রেজাল্ট বেরবার পর সংবাদের শিরোনাম হয়—মেয়েরাও পিছিয়ে নেই মেধার জয়জয়কারে,  পড়ে মনে হয়, যেন পিছিয়ে থাকাই দস্তুর, তবুও কীভাবে যেন তারা ঢুকে পড়েছে! এরকম সংবাদ শিরোনাম সত্যিই বড় অশ্লীল লাগে। যেমন অশ্লীল লাগে—মেধার জয়জয়কারে পিছিয়ে নেই গ্রামের স্কুলগুলোও। হয়তো খোঁজ নিলে দেখা যাবে এই সংবাদ-শিরোনামটি যিনি বসাচ্ছেন, তিনি গ্রামেরই, কিন্তু ক্ষমতার ভাষা তাঁকে ওভাবে ভাবতে, বলতে শিখিয়েছে। অথবা কোনও বাজারি সমীকরণ। কিংবা, তিনি যদি শহরের মানুষ হন, তিনি জানেন না, কলকাতা আর সুন্দরবন খুব বেশি আলাদা ছিল না কয়েকশ’ বছর আগেও। যেভাবে এপ জাতীয় বানর থেকে হোমো সেপিয়েন্সের উত্তরণ জানে না বলেই কিছু মানুষ নেতাদের বলে দেওয়া ধর্ম-জাতপাত-শ্রেণি ভিত্তিক বিভাজনগুলো মানে। ভোট হাসে। নেতা কূল পায়।  

যাইহোক, যে কথা হচ্ছিল, মেয়েদের কবিতা লেখা উচিত কিনা? কেউ কেউ মনে করেন, উচিত নয়। কেননা, মেয়েরা নাকি ‘সুস্থিতির বাহিকা’। কে স্থির করল মেয়েরা জন্মের পর থেকে ‘সুস্থিতির বাহিকা’? এ তো এক ধরনের সংস্কার। ট্যাবু। অবশ্যই পুরুষতান্ত্রিক সমাজের। যে ধারণা থেকে কিছুকাল আগের মানুষজন ভাবত মেয়েদের জোরে হাসতে নেই, কথা বলতে নেই। লম্বা চুলে বেণী দোলানো আর মাথা নত করে আজ্ঞাবাহী হওয়া ছাড়া আর গত্যন্তর নেই মেয়েদের। কিন্তু এহল বাহ্য। আমাদের মনে পড়তে পারে অনেককাল আগের সেই সমাজের কথা। যখন অনেক সমাজ ছিল মাতৃতান্ত্রিক। যখন নারী তার সর্বোচ্চ স্বাধীনতা ভোগ করেছে। মানুষ হিসেবেই ভোগ করেছে। আলাদা করে মানুষের অধিকারের জন্য তাকে লড়তে হয়নি। ক্ষমতার বা সমাজের কেন্দ্র থেকে তখনও ছিটকে যায়নি সে। সবচেয়ে বড় কথা নারী তখন উৎপাদন ব্যবস্থার সঙ্গে অঙ্গাঙ্গি ভাবে যুক্ত ছিল। ফলে কোথাও তার হীনম্মন্যতা বা কমজোরিত্বের প্রশ্নই ছিল না। তাহলে কবে থেকে সে ক্ষমতার কেন্দ্র থেকে একটু একটু পিছিয়ে পড়ল? যখন থেকে উৎপাদন ব্যবস্থার সঙ্গে তার সম্পর্ক ছিন্ন হল। পশুকে যখন ধীরে ধীরে পোষ মানানো সম্ভব হল এবং তাকে চাষের কাজে নিযুক্ত করা গেল, তখন থেকেই নারীর শ্রম আর উৎপাদনের কাজে অপরিহার্য রইল না। আস্তে আস্তে সমাজ  হতে থাকল পুরুষকেন্দ্রিক। ক্ষমতার কেন্দ্র থেকেও নারীরা আস্তে আস্তে পিছিয়ে পড়তে থাকল। আগেকার মাতৃতান্ত্রিক সমাজে এমনকি ছেলেরাই থাকতে আসত মেয়েদের বাড়িতে। শ্রমের বিনিময়ে। প্রয়োজনে মেয়েটির মা-কাকিমা তাকে ঘর থেকে বের করে দিতে পারত। যেটা পরে বা এখনও অব্দি পুরুষতান্ত্রিক সমাজ হওয়ার কারণে উলটে গিয়ে উলোটপুরাণ হয়েছে। তবে এই একতরফা সমাজের কোনওটাই কাম্য ছিল না। তার বদলে আধুনিককালে আমরা একটা ‘মানবতান্ত্রিক সমাজ’-এর স্বপ্ন দেখতেই পারতাম। ফলত যাঁরা বলেন অনেক তো পুরুষের চোখরাঙানি দেখলাম, এবার নারীর যুগ– এই মতকেও সমর্থন জানাতে পারি না। কেননা কোনও কিছুর প্রতিকার চাইলে একেবারে উৎস মূলে গিয়ে দেখাই ভালো। কেউ কেউ কি দেখেন নি? অবশ্যই দেখেছিলেন, কিন্তু আমরা কেন জানি না তাঁদের কাজ ও কথাকে তেমন সামনে আনিনি। খুব প্রকট হয়ে সেই তালিকায় আছেন সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর, স্বয়ং বিদ্যাসাগর। 

যাইহোক, উপরে প্রাচীনকালের মাতৃতান্ত্রিক সমাজের যে ছবিটার কথা বললাম তা কোন ‘সুস্থিতির বাহক’, আমার অন্তত জানা নেই। প্রাচীনকালের এই সমাজব্যবস্থার ছবিতে আমি অন্তত কোনও নরম-মিষ্টভাষী-আজ্ঞাবাহী নারী চরিত্রের ছবি খুঁজে পাইনা। আসলে সমাজ পুরুষতান্ত্রিক হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মেয়েদের বৌদ্ধিক জগতকে খুব সুচতুরভাবে হেয় করার চেষ্টা করা হয়েছে। এমনকি মুছে ফেলার চেষ্টা হয়েছে। বৌদ্ধিক জগত অর্থাৎ– চিন্তা-চেতনার জগত, সৃষ্টিশীল জগত। বেদে, ঋগ্বেদের সময়ে বেশ কিছু নারীকবির শ্লোক ঠাঁই পেলেও পরবর্তী কালে সেই নারীদের ‘মনুসংহিতা’র অনুশাসনে বেঁধে ফেলা হয়। আমাদের মনে পড়তে পারে, গার্গী-যাজ্ঞবল্ক্য’র সেই বিখ্যাত ডিসকোর্স; গার্গী বুঝতে পারছেন বেদে নতুন করে সংযুক্ত হওয়া ‘ব্রহ্মপ্রতিপাদক’ অংশ আসলে লোভী ব্রাহ্মণদের ভেট আদায়ের কৌশল ছাড়া কিছুই নয়; গার্গী তাই যাজ্ঞবল্ক্য’কে একের পর এক ‘ব্রহ্ম’ বিষয়ে প্রশ্ন করছেন, তবু কিছুতেই সেইসব প্রশ্নের উত্তর গার্গীকে সন্তুষ্ট করতে পারছে না, ফলে গার্গী আরও প্রশ্ন করছেন; তখন যাজ্ঞবল্ক্য রেগে গিয়ে সরাসরি নিদান হাঁকছেন—আর একটাও প্রশ্ন নয় গার্গী, আর একটাও প্রশ্ন করলে তোমার মাথা থেকে ধড় বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে। কিংবা, চর্যাপদের সময়কাল। আনুমানিক খ্রিষ্টীয় অষ্টম থেকে দশম ও দ্বাদশ শতাব্দীর কথা। সেখানেও সিদ্ধাচার্যদের পাশাপাশি মেয়েরাও কবিতা লিখছেন। কাহ্ন, লুইদের পাশে মেয়ে কবি কনখলা, মেখলা, মণিভদ্রা। তাঁদেরও সমাজ হেয় করেছে। কাহ্ন, লুইদের পাশাপাশি আজও তাঁদের পড়া হয় না। এই কথাগুলোর মধ্য দিয়ে আমি আসলে বোঝাতে চাইছি, কবিতা লেখা মেয়েদের হাল আমলের কাজ নয়। প্রাচীনকালেও মেয়েরা লিখত। পরবর্তীতে অনুশাসন যত তীব্র হয়েছে, উৎপাদন ব্যবস্থা বা অর্থনৈতিক ভিত্তি থেকে যত দূরে সরে গেছে, তাদের বৌদ্ধিক জায়গাটা ততই অবহেলিত হতে থেকেছে।   

আসলে ওই ‘সুস্থিতির বাহক’-এর মধ্যে আরও একটি প্রধান যে ইঙ্গিত রয়ে যাচ্ছে তা হল– সংসার সামলানো, তাকে পরিপাটি করে রাখা। এবং অবশ্যই তার জন্য ‘নারী’কে ‘বিশৃঙ্খল’ হলে চলবে না, শৃঙ্খলিত থাকতে হবে। মোট কথা একটি বেড়ি পরে কাটাতে হবে জীবনটা। তাই মহাপুরুষদেরও রাজনৈতিক সমীকরণ টানতে হয়– সংসার সুখের হয় রমণীর গুণে। অনুভবের ক্ষমতা থাকলে বোঝা যায় এই সমীকরণের পিছনে বাস্তবতার থেকেও ঢের বেশি কাজ করে ভয়ের সতর্কতা, সতর্কতার ভয়। কাজ করে নিজের কাঁধ থেকে এক পলকে অনেকখানি দায়িত্ব খসিয়ে ফেলে চারহাতপায়ে মুক্ত হবার আকাঙ্ক্ষা। যে আকাঙ্ক্ষা নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সকল মানুষের। অনুভূতিপ্রবণ পুরুষ এটা বোঝে। তাই অনেকদিন থেকে অনেক পুরুষ ‘নারী’র স্বাধীনতার জন্য লড়েছেন। কেননা তিনি বোঝেন নারী-পুরুষের যৌথ সম্পর্কে কোনও আধিপত্যকামিতার স্থান নেই। নারী-পুরুষের সম্পর্কের রসায়ন কখনওই একতরফা হতে পারে না। হ’লে গোটাটাই মাটি হয়ে যায়। তাই সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুরের মতো আধুনিক চেতনাসম্পন্ন মানুষ পরিবারের বিরুদ্ধে গিয়ে লড়েন। নিজের স্ত্রীকে পড়াশোনা ও বাইরের লোকসমাজের মধ্যে বারবার টেনে নিয়ে আসতে চান। একা স্ত্রী’কে বিদেশে পাঠান। কেননা পড়াশোনা ও বাইরের সমাজের সংস্পর্শে না এলে সেই মন যথার্থ বিকশিত হয় না, এই ছিল তাঁর স্থির বিশ্বাস। আসলে নারী-পুরুষের সম্মিলিত সহযোগী অবস্থান ছাড়া কোনও সম্পর্কোর ভিত্তি সুগঠিত হতে পারে না এবং যেখানে দায়িত্বও সমপরিমাণে বর্তায় বইকি। বুঝেছিলেন তিনি। তাই এই দ্রোহ

আর কবিতা এমন একটা ফর্ম, যে সময়ের বিরুদ্ধে, অবস্থানের বিরুদ্ধে, সমস্ত দ্রোহ শুষে নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। এই নশ্বর জীবনে নিজের মতো করে, নিজের আনন্দে কাটিয়ে দেওয়ার মতো ক্ষমতা অর্জন করাও তো এক নিরবধি দ্রোহ। কবিতা তো বটেই, যে কোনও শিল্প-ই এই ক্ষমতা-অর্জনের মাধ্যম ও অর্জিত আধারও বটে। জার্মান কবি ও চিন্তক গ্যেটে একটা কথা বলেছিলেন– আমরা নিজেরা কোনও পরিণাম নয়, কিন্তু আমাদের মধ্য দিয়ে অর্জিত হচ্ছে এক মহত্তর পরিণাম। আমার মনে হয় যেকোনও শিল্পই সেই পরিণাম অর্জনের মাধ্যম ও খোঁজ। 

তবে একটু আগে যে ‘বেড়ি’র কথা বলছিলাম তা কি কেবল নারীর হাত-পায়ে? মোটেই না। এই বাস্তবের মাটিতে সেই বেড়ির শিকার মানুষমাত্রেই। নারী-পুরুষ হিসেবে সেই বেড়ির ততটুকু পার্থক্য যতটুকু ব্যক্তির সঙ্গে ব্যক্তির। কেবল ‘নারী’র শারীরিক গঠনের কারণে সেই বেড়ি হয়ত আরও কিছু ভিন্ন মাত্রার। যেহেতু এখনকার সমাজে তাকে পুরুষদের পরিবারে এসে থাকতে হয়, তাই সে বেড়ি কিছু ক্ষেত্রে মাত্রাতিরিক্ত, সন্দেহ নেই। কিন্তু বর্তমান সমাজ-পরিস্থিতি সেই বেড়িও অনেক পরিমাণে হালকা করছে। স্বাধীনচেতা নারী হাঁসফাঁস করতে করতে সেই বাঁধন নিজের শক্তিতে কিছু-পরিমাণ আলগা করেছে। মনের সংস্কার থেকে সে আস্তে আস্তে বেরিয়ে এসে তার হাতে-পায়ের বাঁধনচিহ্নগুলোও একটু একটু করে সরিয়ে ফেলছে। বাকি যেটুকু রয়ে গেছে তার একটা বড় কারণ তার ‘নিজস্ব এক ঘর’-এর অভাব। ভার্জিনিয়া উলফ তাঁর ‘আ রুম অফ ওয়ান’স ওন’-এ সে বিষয়ে বিস্তারিত লিখেছেন। যা আসলে ভার্জিনিয়া’র সময়ের কথা। এই সময়েরও।   

এবার আসি কবিতার কথায়। জন্মের পর বস্তু ও ব্যক্তি পৃথিবীর সংস্পর্শে এসে প্রতিটি ব্যক্তিমানুষ কিছু কিছু সংঘর্ষ ও রক্তক্ষরণের মুখোমুখি হন। সংবেদন, অনুভূতিপ্রবণতা ইত্যাদির প্রেক্ষিতে সেই রক্তক্ষরণ ও সংঘর্ষের মাপ ও মাত্রা ভিন্ন ভিন্ন। আর এই সংঘর্ষে যিনি যত তীব্র সেই মৌল চাপ অনুভব করেন তাঁর প্রকাশ আকাঙ্ক্ষা তত প্রকট। ঘরানা অনুযায়ী সেই প্রকাশ ও ভঙ্গি আলাদা আলাদা। এই ভিন্নতায় নারী-পুরুষের লিঙ্গগত পরিচয় ততটুকুই গুরুত্ব বহন করে যতটুকু তার ভিন্নতর যৌনাচারের কারণে ও তৎসহ দৃষ্টিভঙ্গিগত ফারাকে। আবার এই দৃষ্টিভঙ্গিগত ফারাক ব্যক্তি থেকে ব্যক্তিতেও পাল্টায়। এখানে উৎকৃষ্ট-অপকৃষ্টের প্রসঙ্গই অবান্তর। বরং এই দৃষ্টিভঙ্গিগত ভিন্নতা শিল্পে কবিতায় সামগ্রিকভাবে এক উৎকর্ষের খোঁজেই ব্যাপৃত থাকে। কবিতায় বোহেমিয়ানা ব্যক্তির মন-মানসিকতা ও কর্ষণ-স্বভাব সাপেক্ষ। নারী-পুরুষ ভেদের নয়। এই বোহেমিয়ানার চোরাস্রোত নারীপুরুষ নির্বিশেষে চামড়ার নিচে, রক্তে বহন করে। কারও বা তা চামড়ার উপরেও ফুটে ওঠে। তফাৎ এটুকুই। তফাৎটা নারীপুরুষঘটিত নয়। গহন অরণ্যপথে হাঁটতে হাঁটতে তার বুনো-কষা গন্ধে আদিমতার ভিতর হারাতে হারাতে একটি ব্যক্তি যে যে কবিতা, কবিতা-প্রণোদনাকে খুঁজে পেল তাতে তার লিঙ্গগত পরিচয় ততটা কাজে লাগল না, যতটা লাগল তার মানব-ইন্দ্রিয়জনিত অনুভূতি ও সংবেদন। লিঙ্গচিহ্ন-বহনকারী ভিন্নতার কারণে কবিতার চরিত্র পাল্টায়। কিন্তু গুণ কমে-বাড়ে না। কবিতার গুণ বা তার ফকিরি করা, তার কেটে বসে যাওয়া ধার বা তাপ, জলপট্টি, কাঁধে হাত রাখা বা খাদের দিকে ঠেলে দেওয়া, ব্যক্তি-মনকে একটা ‘কেমন’-এর দিকে নিয়ে যাওয়া এ সবকিছুই নির্ভর করে ব্যক্তিকবির মৌল-চাপ, সংবেদন ও তৃষ্ণার্ত হতে পারার ক্ষমতার উপর

কিন্তু এত কথা সত্ত্বেও একটা কথা ভেবে দেখবার। আলাদা করে ‘মেয়েদের লেখালিখি’ বলে দাগিয়ে দিয়ে কখনও কখনও তাকে খাটো করবার প্রবণতা কেন আজও? উপরের সমস্ত যুক্তির বাইরে গিয়ে কোনও কি ভিত্তি থেকে যাচ্ছে সেই নাক কোঁচকানো মনোভাবে? সবটাই কি পুরুষতান্ত্রিক রাজনীতির একতরফা শিকার এই ‘মেয়েদের কবিতা’? সন্দেহ নেই পুরুষতান্ত্রিক সংস্কার ও ট্যাবু সেই ভিত্তির দুহাত জুড়ে থাকলেও, দ্বিতীয় একটি কারণের একটা ক্ষীণ হলেও দায়ভার থেকে যাচ্ছে। কী সেই কারণ? যার নাম করে এহেন অপবাদ বা স্নবারি চলে আসছে? সেই কারণেই মেয়েদের একাংশ আজও পুরুষতান্ত্রিক সংস্কার বয়ে বেড়ায়। এখনও গল্প-উপন্যাসে সে বাজারজাত কারণে হোক বা সংস্কারজনিত কারণে; অনেক পুরুষই যেমন মেয়েদের নিয়ে লিখতে গিয়ে লম্বা চুল, ভ্রমর কালো আঁখি, পদ্মপাতা মুখের বাইরে বেরিয়ে তার অনুভবের সূক্ষ্মতা, আবেগের বাড়াবাড়ি বা শীতলতা, তার বুদ্ধিদীপ্ত কথা, আলাপ-আলোচনাকে খুব একটা গুরুত্ব দিয়ে উঠতে পারেননি; তেমনি কোনও কোনও মহিলা-লেখকের লেখায় বৌদ্ধিক দিকটি একপ্রকার কুয়াশাচ্ছন্ন বা অন্ধকারেই থাকে। তাঁদের কারও কারও লেখায়ও হাতেপায়ের চুড়ি-গহনার রিনরিন শব্দ-ঢেউ যে এখনও পাওয়া যায় না এমন নয়। মায় ‘কাদের কুলের বউ গো তুমি’র লাজবতী  আভাও সেখানে পরিস্ফুট! তবে ছেলেদের লেখালিখিতে কি তাদের নতুন গলা-ভাঙার স্বর লেগে থাকে না? তাদের কারও কারও কবিতায়? অবশ্যই থাকে। তাহলে মেয়েদের ক্ষেত্রেই এত প্রকট কেন সেই অপবাদ? কারণ হয়তো তাঁরা আজও সংখ্যালঘু বলে। চোখে পড়েন বেশি। কিংবা অধিকাংশ সম্পাদক ‘পুরুষ’ বলে এবং কোনও কোনও সম্পাদক যারপরনাই মোহমুগ্ধ বলে বাছবিচারের সময় বা অবকাশ কোনওটাই পান না। ফলে উপরের পাতলা সরটুকুর দোষ কেবল দেখা যায়। তার জ্বাল ও আঁচের অভাবটুকু কেবলই চোখ এড়িয়ে থাকে। আমার বন্ধুমহলে যতটুকু শুনেছি বা পরিচিত অনুভূতিপ্রবণ মানুষেরা এই কাঁচাত্বকেই ‘মেয়েদের লেখালিখি’ বলে থাকেন, ধারণা। অর্থাৎ মেয়েদের দ্বারা লিখিত কবিতা মানেই ‘মেয়েদের কবিতা’ নয়। তবে কোনও কোনও মেয়ের দ্বারা লিখিত কবিতা ‘মেয়েদের কবিতা’ বলে চিহ্নিত করেন তাঁরা। তবে ‘মেয়েদের লেখা’—এই শব্দবন্ধ যেমন সর্বত্র অপমান বা হেয় করার অর্থে ব্যবহৃত হয় না, তেমনই ‘মেয়েদের কবিতা’ শব্দবন্ধের ব্যবহারও সব জায়গায় সমান নয়। 

তবে আমার ব্যক্তিগত মত– এই ‘মেয়েদের কবিতা’ বা মেয়েলি ছাঁচে রিনিরিনে গলার কেরামতিসহ কবিতা পুরুষ বা ছেলেরাও লিখে থাকেন। আলাদা করে মেয়েদের কবিতা বা মেয়েদের লেখালিখির এই চিহ্নিতকরণ, সত্যিই কোনও মানে আনে না। আমার কাছে। রসিকজন বুঝবেন। এই আশা। আশালতাটি বৃথা কিনা, বৃথা কিনা এই বাক্যব্যয় আপনি বলুন, হে আগামীর পাঠক।

শেয়ার করুন

1 thought on “‘মেয়েদের কবিতা’ বনাম ‘কবিতা’”

Leave a Comment

Your email address will not be published.