সম্পাদকীয়, মার্চ ২০২১

কল্পনা মাইতি। দশ বছরেরও বেশি সময় ধরে কল্পনা কারাবন্দী। ২০১০ সালে মাওবাদী কার্যকলাপের সঙ্গে যোগাযোগের অভিযোগে গ্রেফতার হন কল্পনা, তখন তাঁর বয়স ৩৫। কল্পনা ছিলেন সিপিআই (মাওবাদী) পার্টির রাজ্য কমিটির সদস্য। তাঁর বিরুদ্ধে দাখিল হওয়া অন্যান্য অনেকগুলি মামলার প্রতিটিতে জামিন পেলেও একটি মামলা এখনও বিচারাধীন। এই সম্পাদকীয় যখন লেখা হচ্ছে আলিপুর মহিলা জেলে অনশন করছেন কল্পনা। বিচারের দাবিতে, ন্যূনতম চিকিৎসা পরিষেবার দাবিতে, কল্পনার মতই পশ্চিমবঙ্গের জেলে বন্দী ঠাকুরমণি মুর্মু। ঝাড়গ্রাম জেলার প্রত্যন্ত গ্রামের আদিবাসী পরিবারের মেয়ে ঠাকুরমণি, অল্প বয়সেই বিপ্লবী রাজনীতিতে আসেন। লালগড় অভ্যুত্থানে মেয়েদের সংগঠিত করায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল ঠাকুরমণির। ২০১৬ সালে সেই সমাজ বদলের লড়াইয়ে অংশ নেওয়ার অপরাধেই গ্রেফতার হন ঠাকুরমণি। জেলের মধ্যেও চলে হাজারও নির্যাতন, লাঞ্ছনা। একই ধরনের নির্যাতনের স্বীকার সুদূর মহারাষ্ট্র থেকে গ্রেফতার হয়ে আসা পারোবাঈ প্যাটেলের, হিরনদি মংগলসিঙ গাওড়। কল্পনা, ঠাকুরমণি, পারোবাঈ, হিরনদিরা সেই সব মেয়ে যাদের নিয়ে গল্প, কবিতা, গান হয় না। আমরা আজও রাজবন্দীদের মুক্তির দাবীতে ‘ভগত সিং এর ভাই, ক্ষুদিরামের ভাই’-দেরই স্মরণ করি। কল্পনারা সেই রাজবন্দীর চিত্রকল্পনায় ঠাঁই পান না। ঠাঁই পান না মূলধারার নারীবাদী ইতিহাসেও।  এমনকি রাষ্ট্রও খুব সহজেই প্রশ্ন করতে পারে  আন্দোলনে মেয়েদের কেন ‘রাখা হয়েছে’। নিদান দিতে পারে তাদের বাড়ি ‘পাঠিয়ে দেওয়ার’। যেমন তেলেঙ্গানা আন্দোলনের মেয়েদের স্মৃতিচারণায় উঠে আসে যুদ্ধশেষে পার্টির মেয়েদের রান্নাঘরে ফিরে যেতে বলার প্রতারণার কথা। উঠে আসে তেভাগার লতিকা, অহল্যা, বাতাসি, রাসমণিদের মনে না রাখার কথা। নকশালবাড়ির প্রথম শহীদ ধনেশ্বরী দেবী, সোনমতি সিংহ, ফুলমতি সিংহ, সুরুবালা বর্মণ, নয়নেস্বারি মল্লিক, সমসারি সাইবনি, সীমাস্বারি মল্লিকদের নামও তো শুধু মাত্র একটি শহীদ বেদীর ফলক হয়েই রয়ে গেছে।

তবুও বারংবার রাষ্ট্রের টেনে দেওয়া ‘লক্ষ্মণ রেখা’ পেরিয়ে মেয়েরা লড়ে গেছেন। মেয়েদের নিপীড়নের চিত্র ভেদ করে বারংবার তুলে ধরেছেন সংগ্রামী প্রতিরোধের রাজনীতি। রাষ্ট্রের, সমাজের বেঁধে দেওয়া ‘ভালো মেয়ে’র সংজ্ঞাকে ভেঙ্গেচুরে ছিনিয়ে নিয়েছেন নিজেদের অধিকার। আর সেই লড়াই স্মরণ করলেই আমরা শুনতে পাব সাঁওতাল বিদ্রোহে ফুলো মুর্মু, ঝানো মুর্মুর হকের জমি ছিনিয়ে নেওয়ার জঙ্গি লড়াইয়ের আখ্যান। ইতিহাসের পাতায় দেখতে পাব, সাবিত্রীবাঈের উচ্চ বর্ণের চোখ রাঙানিকে উপেক্ষা করে মেয়েদের পড়াশুনার অধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াই, রোকেয়ার ধর্ম-জেনানার গণ্ডি ভেদ করে গর্জে ওঠা কলম,  প্রীতিলতার সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে জান কবুল সংগ্রাম।

মণিপুরে সেনা বাহিনীর রাইফেলের সামনে ‘মাইরা পাইবিদের’ নগ্ন মিছিলে, উত্তরাখন্ডে সরকারি অনুমোদনে জঙ্গল সাফ করার উদ্যত কোদালের সামনে গাছ আঁকড়ে ধরার অদম্য জেদে, খাদ্য সু্রক্ষার দাবীতে গণআন্দোলনে, বিড়ি শ্রমিক বা গারমেন্ট কারখানার মেয়েদের আপসহীন সংগ্রামে, নিয়মগিরিতে কুনা সিকাকাদের গর্জে ওঠায়,  উত্তরপ্রদেশে ৪০,০০০ মাতৃত্বকালীন মৃত্যুর বিরুদ্ধে শোক মিছিলে,  নর্মদায় ড্যাম তৈরি করে মানুষকে বেদখল করার চক্রান্তের বিরুদ্ধে গণপ্রতিরোধে নির্মিত হয় এক অন্য ইতিহাস। মেয়েদের লড়াইয়ের ইতিহাস। ঐতিহাসিককাল ধরে মেয়েরা লড়াই করে এসেছেন সাম্যবাদের পক্ষে, হকের দাবীতে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটা উপযুক্ত পৃথিবী রেখে যাওয়ার লক্ষ্যে ।

কখনও বা আবার মেয়েদের দৈনন্দিন জীবনের সংগ্রাম, ক্ষোভ, দুঃখ, হাসি কান্না, প্রেমের কথা ফুটে উঠেছে কাগজ কলমে, গল্প, কবিতা, গানে। উঠে এসেছে সেই সব দ্রোহের ভাষ্য যা হয়ত বা আন্দোলনের পরিসরে স্থান পায়না। রাষ্ট্র স্বীকৃত বিষমকামী পিতৃতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলিকে চ্যালেঞ্জ করার স্পর্ধায় ছোটবেলা থেকে রাষ্ট্র ও সমাজের নির্ধারিত লিঙ্গ পরিচয় এবং সমাজ স্বীকৃত লিঙ্গায়িত অভিব্যক্তির বেড়াজাল টপকে ফুটে উঠেছে বিভিন্নতার উদযাপন। ।

তাই আজ যখন হিন্দুত্ববাদ নতুন করে অর্থনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক আগ্রাসন এনে নারীবাদী রাজনীতির বহু সংগ্রামের মাধ্যমে ছিনিয়ে আনা অধিকারকে নস্যাৎ করে, আমাদের খাদ্যাভ্যাস, যাপন, যৌনতা সমস্ত কিছুকেই নিয়ন্ত্রণ করতে চায়, যখন পুঁজির স্বার্থে নারী শ্রমিকদের মাতৃত্বকালীন ছুটি, কাজের নিশ্চয়তা খর্ব করে; যখন মহামান্য আদালতের একের পর এক রায় নারীবিদ্বেষে সিলমোহর দেয়, যখন আদালত হুকুম করে যে রাজার দরবারে শুধু ‘স্বামী-স্ত্রীর’ আদলে একরকমের পরিবারই স্বীকৃতি পাবে, তখন এই অবাধ্য, এই বেখাপ্পা প্রান্তিকায়িত মানুষেরাই তাদের যাপন, তাদের জীবন, তাদের দ্রোহের আগুনে সেই খোপগুলোকে পুড়িয়ে ছারখার করে দেন।

তাই পৃথিবী জুড়ে দক্ষিণপন্থা মাথা চাড়া দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই আরও জঙ্গি হয়েছে নারীবাদী প্রতিরোধের রাজনীতি। আমেরিকায় কৃশাঙ্গী মেয়েদের হকের লড়াই, পোল্যান্ডে গর্ভপাতের অধিকারের দাবিতে মেয়েদের রাস্তা দখল, চিলিতে নয়া উদারনীতিবাদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ, ধর্ষক রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে গর্জে ওঠা নারীবাদী সংগীত, পাকিস্তানে বামপন্থী মেয়েদের মিছিল, বাংলাদেশে ধর্ষণের বিরুদ্ধে মেয়েদের স্লোগান, প্যালেস্টাইন, কাশ্মীরে দখলের বিরুদ্ধে মেয়েদের আজাদীর কবিতা আমাদের সমকালের নারীবাদী প্রতিরোধেরই দলিল।

১৯১৭ সালে পেত্রোগ্রাদে শ্রমজীবী নারী দিবসের মিছিল

১৯১২ সালে আমেরিকার মাসাচুসেটস শহরে মিল শ্রমিকেরা সম বেতন, কাজের নির্দিষ্ট সময়সীমা এবং কাজের মর্যাদার দাবীতে হরতাল করেছিল। তাদের অন্যতম স্লোগান ছিল ‘ব্রেড অ্যান্ড রোজেস’। ১৯১৭ সালে ৮ই মার্চ, রাশিয়ায় পেট্রোগ্রার্ডে হাজারে হাজারে মেয়েরা পথে নেমেছিল সেই রুটি ও গোলাপের স্বপ্ন নিয়েই। শ্রমজীবী মেয়েদের রুটি রুজির লড়াইয়ের সঙ্গেই জুড়েছিল মর্যাদার লড়াই। আজ আরেক ৮ মার্চ। ফ্যাসিস্ট রাজ যখন মেয়েদের রুটি রুজির লড়াইকে আরও আরও বিপন্নতার দিকে ঠেলে দিচ্ছে, মেয়েদের শরীরকে যুদ্ধক্ষেত্র বানিয়ে দেগে দিতে চাইছে ধর্মের, দখলের, সাম্রাজ্য বিস্তারের রাজনীতি, যখন মেয়েদের ‘রক্ষার’ নামে অস্বীকার করছে তাদের রাজনৈতিক সত্তা, যেখানে মেয়েদের নাগরিকত্বও নির্ধারিত হয় তার পৈতৃক কিংবা বৈবাহিক সম্পর্কের ভিত্তিতে, যেখানে বেতন বাড়ানোর কথা বললে, জমির অধিকার চাইলে, সামরিক বাহিনীর নির্যাতন রুখে দাঁড়ালে সবক হিসেবে ধর্ষিত হতে হয়, সেখানে কাঁটাতারের বেড়া পেরিয়ে, প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে তৈরি হয়েছে নারীবাদী সংহতির রাজনীতি, বন্ধুত্বের রাজনীতি। আমরা মনে রাখি যে নারীর কোন দেশ নেই। এই আপ্তবাক্যই আমাদের পরিবারের বাইরে গিয়ে, রাষ্ট্রের নজরদারীর উর্ধে উঠে এবং সামাজিক প্রতিবন্ধকতা কাটিয়ে একই সঙ্গে স্থান-কাল প্রাসঙ্গিক এবং আন্তর্জাতিক এক বন্ধুত্বের ভিত নির্মাণ করে।

প্রতিটা লড়াকু মেয়েদের গল্পই বহন করে তার আগের প্রজন্মের মেয়েদের সংগ্রামের ইতিহাস। ঠিক যেমন শাহীনবাগে মেয়েদের লড়াইয়ের ঢেউ আছড়ে পড়েছে বর্তমান চলমান কৃষক আন্দোলনে। হরিন্দর, সুখবিন্দরদের দিল্লি সীমান্তের আপোষহীন সংগ্রাম বহন করছে তেভাগা, মুজারা, তেলেঙ্গানা, নকশালবাড়ির মেয়েদের লড়াইয়ের ইতিহাস। ভান্বারি দেবীর লড়াই, তারানা বারক-এর আখ্যানের অনুপ্রেরণায় বলিষ্ঠ হয় ‘মিটু আন্দোলন’। চিরাচরিত পিতৃতান্ত্রিক কাঠামোয় লালিত যৌন হেনস্থার বিরুদ্ধে  দেশে দেশে গর্জে ওঠেন মেয়েরা।

এই সংহতির, এই বহু-প্রাজন্মিক লড়াইয়ের মাধ্যমে গড়ে ওঠা আত্মীয়তার, বন্ধুত্বের রাজনীতিই ব্রাহ্মণ্যবাদী পিতৃতন্ত্রের নির্মিত রক্তের সম্পর্কের ন্যায্যতা এবং ব্যক্তিগত মালিকানার ভিত্তিতে জাহির করা পরিবারতন্ত্রকে উৎখাত করার দম রাখে। এই যুগে যুগে, দিকে দিকে ছড়িয়ে থাকা অপ্রসন্না, বিমুখী, প্রতিকূলাদের অবাধ্য কথনই ‘বামা’ নিয়ে আসতে চায় আমাদের ইতিহাস চর্চায়, আমাদের কথোপকথনে, আমাদের দ্রোহের উচ্চারণে, আমাদের রুটি ও গোলাপের স্বপ্নে…

শেয়ার করুন

2 thoughts on “সম্পাদকীয়, মার্চ ২০২১”

  1. Anandarup Ghosh

    এই প্রসঙ্গে শ্যামলী খাস্তগীরের কথাও মনে পড়ছে।

  2. শংকর কুশারী

    অভিনন্দনযোগ্য একটা কাজ । দেশ বিদেশের বিভিন্ন প্রতিবাদী নারী এবং আন্দোলনগুলি (যার মধ্যে অনেকগুলিই উল্লেখিত) সম্পর্কে জানিয়ে ছোট ছোট প্রবন্ধ পরবর্তী সংখ্যাগুলিতে থাকতে পারে । বহু নারী প্রতিবাদীদেরই আমরা ভুলে গেছি এ কথা ঠিক তবে তেভাগা আন্দোলনের ক্ষেত্রে সম্ভবতঃ তাঁদের কয়েকজনকে মনে রেখেছি কবিতা গানের মধ্য দিয়ে ।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *