সেই সংগ্রামের ইতিহাসেই এখন এখানে মেয়েরা লড়ে চলেছে…

দিল্লি সীমান্ত। রাজপথ দখল করে রয়েছে লাখো লাখো মানুষ। শাসকের ব্যারিকেড, কাঁটাতার, পেরেক, টিয়ার গ্যাস, জলকামান উপেক্ষা করে রাজধানীর দখল নিয়েছে কিষান কিষাণী, শ্রমিক মজুররা। ফ্যাসিস্ট রাজের নির্মিত মানচিত্র, শাসকের চাপিয়ে দেওয়া জাতীয়তাবাদের সংজ্ঞাকে চ্যালেঞ্জ ছুুড়ে দাপটের সঙ্গে বুঝিয়ে দিচ্ছে দেশ মানে কী, এই দেশ কারা তৈরি করেছে, কাদের স্বার্থ এ দেশে রক্ষা করা প্রয়োজন। গত একশ দিন ধরে কৃষক আন্দোলনের এই প্রতিস্পর্ধা শাসককে অনেকটাই ব্যাকফুটে ফেলেছে। প্রতিদিন শিক্ষা দিচ্ছে ঐক্যবদ্ধ সংগ্রামের। হিন্দুত্ববাদের নির্মিত রাম মন্দিরের স্বপ্নকে ছুড়ে ফেলে আমাদের আবারও মনে করিয়ে দিচ্ছে লড়াইটা রুটি, রুজির, সমস্ত মানুষের খাদ্য সুরক্ষিত করার। দাঙ্গাবাজদের চক্রান্তে জল ঢেলে মনে করিয়ে দিচ্ছে লড়াইটা হিন্দু-মুসলিম বা হিন্দু-শিখের নয়, লড়াইটা সাম্রাজ্যবাদী দালালের বিরুদ্ধে, মুনাফা-লোভী কর্পোরেটদের বিরুদ্ধে,  ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে৷ লড়াইটা শুধু তিনটি কৃষি আইনের বিরুদ্ধে নয়, লড়াইটা আদর্শেরও। সেই আদর্শের টানেই হাজার হাজার কিষাণী ট্রাক্টর চালিয়ে দিল্লি সীমান্তে হাজির। সুপ্রিম কোর্টের মেয়েদের ‘বাড়ি পাঠিয়ে দেওয়ার’ রায়ের অপমানে ক্রুদ্ধ তাঁরা বসে আছেন সিংঘু , টিকরি, গাজিপুরে। সাফ জানিয়ে দিচ্ছেন, তাঁরা এখানে কারও লেজুড় হয়ে আসেননি। এসেছেন সংগ্রামের সাথী হয়ে, এসেছেন নিজেদের হকের লড়াইয়ে। সেই হকের লড়াইয়ের কথাই বললেন হরিন্দর কৌর বিন্দু, কৃষক আন্দোলনের অন্যতম সংগঠক, বিকেইউ একতা উগ্রাহনের নেত্রী। ২৬শে জানুয়ারি, প্রজাতন্ত্র দিবসে যখন প্রধানমন্ত্রীর কুচকাওয়াজের শক্তি প্রদর্শনের বিপরীতে দাঁড়িয়ে রাজধানীর দখল নিয়েছিল দেশের মেহনতি কৃষক, সেই ঐতিহাসিক মুহূর্তের পরে পরেই নেওয়া সাক্ষাৎকারে হরিন্দর বললেন কৃষক আন্দোলোনের মেয়েদের কথা। ডাঙ্কেল প্রস্তাবের হাত ধরে নয়া উদারনীতিবাদের বিরুদ্ধে মেয়েদের সংগ্রামের কথা। বললেন মেয়েদের জমির অধিকারের কথা। কর্পোরেট জমি অধিগ্রহণের বিরুদ্ধে পাঞ্জাবের লড়াকু মেয়েদের কথা। বললেন আন্দোলনের নতুন সংস্কৃতির কথা। জানিয়ে দিলেন লড়াই সবে মাত্র শুরু হয়েছে। যতদিন না জমি বণ্টনের বৈষম্য ঘুচবে, যতদিন না রাষ্ট্রের থেকে ছিনিয়ে আনা যাবে মেয়ে চাষীদের জমির মালিকানা, ততদিন অবধি এই লড়াই জারি থাকবে। আন্তর্জাতিক শ্রমজীবী নারী দিবস মেয়েদের যে রুটি ও গোলাপের স্বপ্নের কথা বলে, সেই স্বপ্ন চোখেই লড়ে যাচ্ছেন হরিন্দরেরা। ঝিলমের সঙ্গে কথোপকথনে উঠে এল সেই সংগ্রামের ইতিহাসের কথা, মেয়েদের হকের কথা…

আপনার ব্যক্তিগত রাজনৈতিক জার্নির কথা দিয়েই যদি শুরু করেন…আপনি কী ভাবে এই আন্দোলনে এলেন…

আমার বাবা নওজওয়ান ভারত সভার কর্মী ছিলেন। মুজারা আন্দোলনের সময় আমাদের গ্রামের খুব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। অনেক লড়াই করে জমি ছিনিয়ে আনতে হয়েছিল। আমাদের ঠাকুরদাদের অনেক সংগ্রামের ফলে জমির হক পাওয়া। আমাদের পরিবারে তাই সেই সংগ্রামের ইতিহাস রয়েছে, সেই বিপ্লবের ভাবনা রয়েছে। ভগত সিং-এর আদর্শ রয়েছে। আমি ছোট থেকেই সেই বিপ্লবী পরিবেশে বড় হয়েছি। এই আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়েছি। যখন খালিস্তান আন্দোলন তুঙ্গে, আমার বাবা সাম্প্রদায়িকতা ও রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস বিরোধী ফ্রন্ট তৈরি করেছিলেন। আমার বাবা তার আহ্বায়ক ছিলেন। ঘরে ঘরে গিয়ে প্রচার করতেন যে এটা হিন্দু-শিখ সমস্যা নয়, আমাদের সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে লড়তে হবে। ওঁদের স্লোগান ছিল, ‘না হিন্দুস্তান, না খালিস্তান, রাজ করবে মজদুর কিষান’। ওই লড়াইয়েই আমার বাবা শহীদ হন। আমি তখন খুবই ছোট… এই ঘটনাটা আমাকে খুবই প্রভাবিত করেছিল… ভাবতাম এরকম কেন হল, উনি তো সবাইকে নিজেদের মধ্যে মারামারি না করে ঐক্যবদ্ধ হয়ে সংগ্রাম করার কথাই বলতেন। এটা তো সবার লড়াই। সেই থেকেই আমি তাঁর পথ অনুসরণ করি। তাঁর সংগ্রামের পথ বেছে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিই।

২০০২-এ আমি বিকেইউ একতা উগ্রাহনের সঙ্গে যুক্ত হই। যখন ডাঙ্কেল প্রস্তাবের ফলে সরকার থেকে আমাদের ফসল কেনার উপযোগী নয় বলে দিয়েছিল, তখন আমরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে মেয়েদের সংগঠিত করতে শুরু করি। আমরা বলি মেয়েদের হকের জন্য পুরুষদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়তে হবে। বাড়ি বাড়ি গিয়ে প্রচার করি যে যদি ফসলের ন্যায্য দাম চাও, তবে আমাদের সঙ্গে রেল লাইনে এসো। অনেক মেয়েরা এসে রেল অবরোধ করেছিলেন। সেই থেকেই আমি মেয়েদের সংগঠিত করার ভার নিই। যে ঋণের দায়ে কৃষকদের জমিচ্যুত হতে হয়, আত্মহত্যা করতে হয় তার বিরুদ্ধে প্রচার করেছি। কৃষক আত্মহত্যার ক্ষেত্রে সেই কৃষকের স্ত্রী বা তার পরিবারের কারও কাছে যাওয়ার সংগ্রাম চালিয়েছি। মেয়েদের জন্য ন্যায়ের কথা বলেছি। 

বেসরকারিকরণ করে কীভাবে আমাদের স্বাস্থ্যের, শিক্ষার অধিকার ছিনিয়ে নেওয়া হচ্ছে, তা নিয়ে বাড়ি-বাড়ি গিয়ে মেয়েদের সঙ্গে মিটিং করেছি। এই প্রচারের দরুন অনেক মেয়ে আমাদের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন। পাঞ্জাবে অনেক মেয়ে নেতৃত্ব স্থানে আছেন। তাঁরা পুলিশের লাঠি খেয়েছেন, গ্রেপ্তার হয়েছেন, জেলে গেছেন, অনেক ক্ষেত্রে ওঁদের বিরুদ্ধে খুনের কেসও দেওয়া হয়েছে, তবুও তাঁরা লড়াই ছাড়েননি।

২০১২ তে আমরা বিকেইউ একতা উগ্রাহনের নারী সংগঠন শুরু করি। তার জেলা কমিটি, গ্রাম কমিটি তৈরি করি। ৮ই মার্চ পালন করে, মিছিল, বিক্ষোভ করে, বিভিন্ন অনুষ্ঠানের মাধ্যমে মেয়েদের চেতনা জাগ্রত করার ভার নিই। তাদের বোঝাই, কী ভাবে পুরুষেরা, কী ভাবে এই সমাজ মেয়েদের নিচুতে রেখেছে। এই শৃঙ্খল ভাঙতে তাদের এই সমস্ত বাধা বিপত্তি পেরিয়ে রুখে দাঁড়াতে হবে নিজেদের অধিকারের জন্য।রাজনৈতিক চেতনাই পারে অধিকারের লড়াইকে তীব্র করতে। করোনা কাল আমাদের আরও চার দেওয়ালের মধ্যে ঠেলে দিয়েছিল। খুব কঠিন সময় গেছে। কিন্তু আমরা সেই সময়ও আওয়াজ তুলেছি। আমাদের গম বাঁচানোর দাবিতে  মিটিং মিছিল করেছি।

তারপর এই তিন কৃষি আইন এল। যখন আমরা আইনগুলো পড়লাম, তখন  বুঝলাম, এটা আমাদের জমি কেড়ে নেওয়ার, আমাদের মান্ডি বোর্ড কেড়ে নেওয়ার, আমাদের অত্যাবশ্যকীয় পণ্য কেড়ে নেওয়ার চক্রান্ত। আমরা মেয়েদের সঙ্গে আলোচনা করি। তাদের বোঝাই এই আইন কী ভাবে আমাদের জমির অধিকার কেড়ে নেবে, আমাদের বাচ্চাদের ভবিষ্যৎ অন্ধকার করে দেবে। জমিই যদি না থাকে, আমরা আর কৃষক থাকবো না। কী ভাবে খেত মজুররা, কী ভাবে দিন মজুররা শোষিত হবেন৷ মেয়েরা সেটা খুব ভালো ভাবেই বোঝেন। তাঁরা রাস্তায় নেমে অবস্থান করেছেন, প্রচার করেছেন… মেয়েরা, বাড়ির বৌয়েরা সবাই রাস্তায় নেমেছেন।

আমাদের সংগঠন বিকেইউ একতা উগ্রাহন মেয়েদের খুব সম্মান করে। আমরা মনে করি মেয়েরা আমাদের শক্তি। আমরা বিশ্বাস করি মেয়েদের সমানাধিকারে। আমরা মনে করি মেয়েরা আন্দোলনে না এলে জেতা যাবে না। মেয়েদের রাজনীতিতে থাকা দরকার। তাই আমরা মেয়েদের এই আন্দোলনে অগ্রণী ভূমিকায় রাখার সঙ্কল্প করি। সিদ্ধান্ত নিই আন্দোলনে মেয়েদের রান্নার কাজ দেওয়া হবে না। মেয়েরা কোনো সমস্যার কথা বললে এখানে তা শোনা হয়, সেটার সুরাহা করার সৎ চেষ্টা করা হয়। মেয়েরা কোথাও মিটিং, মিছিল করতে গেলে তাদের গাড়ি দেওয়া হয়। তাদের খেয়াল রাখা হয়। আরও মেয়েদের সঙ্গে পাঠানো হয়। পাঞ্জাবে যখনই টোল প্লাজা অবরোধ করা হয়, আম্বানি আদানির দোকানে পিকেটিং করা হয়, মেয়েরা প্রচুর সংখ্যায় অংশগ্রহণ করেন। আমরা ঘরে ঘরে গিয়ে মেয়েদের সংগঠিত করি। যখন দিল্লি যাওয়ার সিদ্ধান্ত হয়, তখন মেয়েরা ঢোল বাজিয়ে মিছিল করেছেন, ‘দিল্লি চলো’ স্লোগান তুলে প্রচার চালিয়েছেন। তাঁরা র‍েশন জোগাড় করেছিলেন। আমরা জানতাম, এটা একটা লম্বা লড়াই। এক দু-মাসে হবে না। অন্তত ছ’ মাস থাকতেই হবে। আমরা মানসিক ভাবে সেই মতই প্রস্তুত হয়ে এসেছি। আমরা জানতাম মোদি অত সহজে এই আইন বাতিল করবে না। প্রথাগতভাবে যে কাজগুলো ছেলেদের কাজ হিসেবে পরিচিত, সেই সমস্ত কিছুই মেয়েরা করেছে… ট্রলি, ট্র্যাক্টর চালিয়ে বিভিন্ন জায়গা থেকে চাল, ডাল, আটা, র‍েশন সামগ্রী জোগাড় করেছে। মানসিক ভাবে খুবই দৃঢ়তার পরিচয় দিয়েছে।

প্রথম যে দল দিল্লি আসি, তাতে দশ হাজার মেয়ে ছিল। সবাই জানে এই তিন সর্বনাশা আইন আমাদের থেকে আমাদের জমি, আমাদের মান্ডি বোর্ড, আমাদের ভবিষ্যৎ কেড়ে নেবে। যার সঙ্গেই এখানে কথা বলবেন দেখবেন মেয়েরা বলছে আমরা এখানে পাকা উনুন বানিয়ে নিয়েছি, যতক্ষণ না এই তিনটি আইন বাতিল হছে আমরা এখানেই বাসা বাঁধব। অনেকেই এসে জিজ্ঞাসা করেন, আপনারা কি আদৌ জানেন এই আইনগুলো কেন ক্ষতিকারক? মেয়েরা যে কেউ আপনাকে বলে দেবে আইনে কী কী আছে, কেন তারা এই আইনের বিরোধিতা করছে। দু বছরের বাচ্চা মেয়ে থেকে নব্বই বছরের বৃদ্ধা সবাই জানে এই আইন সম্বন্ধে। নিজেদের ঘর, বাড়ি, বাচ্চা ছেড়ে তিনশ-চারশ কিলোমিটার এসে পুরুষদের সঙ্গে বসে রাস্তা দখল করা বিরাট ব্যাপার। এর জন্য অনেক মানসিক সাহস লাগে, অনেক জেদ লাগে। শাহীনবাগেও আমরা দেখেছিলাম মেয়েরা ঘর থেকে বেরিয়ে রাস্তা দখল করে বসেছিল। কিন্তু বাড়ির কাছে হলে তাও এক রকম, কিন্তু নিজেদের ঘর সংসার ছেড়ে বাড়ি থেকে তিন-চারশ কিমি দূরে এসে বসে থাকা! মেয়েদের এই প্রত্যয়, এই জেদই সরকারকে ধাক্কা দিয়েছে। মোদি সরকার, বিভিন্ন মন্ত্রী থেকে শুরু করে কঙ্গনা রানাওয়াত আমাদের কত কী বলেছে… মেয়েদের ‘আনা হয়েছে’, তাদের ভাড়া করে আনা হয়েছে, ‘পুরুষরা মহিলাদের এনে বসিয়ে রেখেছে’… আমরা কেউ এখানে কারো লেজুড় হয়ে আসিনি। আমরা কমরেড হিসেবে এসেছি, নিজেদের হকের লড়াইয়ে এসেছি। সংগ্রাম করতে এসেছি। এমন কী সুপ্রিম কোর্টও বলে দিল মেয়েদের ‘বাড়ি পাঠিয়ে দেওয়া হোক’। যখন সর্বোচ্চ আদালতও মেয়েদের প্রতিবাদ করার অধিকারকে স্বীকৃতি দেয় না, তখন খুবই হতাশ লাগে।

কিন্তু আমরা তো কেউ এখানে ফেরত চলে যাব বলে আসিনি। আমরা কারও কথায় আসিনি, কারো কথায় ফিরবও না। আমরা কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়তে এসেছি। সংগ্রাম করতে এসেছি। তাই এতে মেয়েরা আরো বেশি বেশি করে জুড়তে লাগলো। সমাজে মেয়েদের কখনই কোথাও জায়গা করে দেওয়া হয়নি, আমরা চিরকাল আমাদের জায়গা ছিনিয়ে এসেছি, নিজেদের জায়গা করে নিয়েছি। এখানেও তাই করব। মেয়েরা চিরকালই সংগ্রামে থেকেছে। আমরা স্কুলে যাই, কাজে যাই, সমস্ত কিছু করি, তাও আমাদের ‘বেচারি’, ‘অবলা’, ‘নির্ভরশীল’ ভাবা হয়। মেয়েরা এই আন্দোলনে এসে নিজেদের জায়গা করে নিয়েছে, দেখিয়ে দিয়েছে মেয়েরা কিরকম অগ্রণী ভূমিকা নিতে পারে, কিভাবে লড়ে যেতে পারে।

 মেয়েরা কৃষি কাজের সঙ্গে যুক্ত হলেও রাষ্ট্র তাকে নারী কৃষকের স্বীকৃতি দেয়না। খুব অল্প সংখ্যক মেয়েরই জমির মালিকানা আছে…

হ্যাঁ। পুরুষদের জমির মালিকানা আছে। আমাদের বাবাদের নামে, বরের নামে, ভাইয়েদের নামে জমির কাগজ হয়। কিন্তু দেখতে গেলে না বাবা জমি দেয়, না ভাই, না বর… মেয়েরা ক্ষেতে কাজ করে, কিন্তু সেই জমিতে তার কোনো অধিকার নেই। কখনও রেজিস্ট্রির সময় তা মেয়েদের নামে করা হয় যাতে কম খরচ লাগে। কিন্তু আমাদের অধিকার থাকেনা। আমরা ক্ষেতে মজুরের কাজ করি। কিন্তু বেতন পাইনা। আমাদের শ্রমের কোন স্বীকৃতি নেই। রাষ্ট্রও আমাদের শ্রমের কোনো স্বীকৃতি দেয়না। মেয়েরা সাধারণত তুলোর ক্ষেতে, গম ক্ষেতে, শর্ষে ক্ষেতে কাজ করে… ভোর ৪টে থেকে রাত ১১টা অবধি আমরা কাজ করে যাই বিনা বেতনে। আমাদের অনেক অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে। দেখবেন যে মেয়েদের জমির মালিকানা আছে তাদের প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরেই জমি আছে… তাদের মেয়েদেরও, বাড়ির বউদের সবার জমি আছে। সমস্যাটা জমি বন্টনেরও। মন্ত্রীদের জমি আছে, সোনা আছে, নিজেদের ক্লাব আছে… কিন্তু কৃষকদের জমি নেই। প্রতি বছর দেনার দায় কত কৃষক তার জমি হারান। ঋণ শোধ করতে দেউলিয়া হয়ে যান। মেয়েদের তো জমির মালিকানাই নেই। পরিসংখ্যান অনুযায়ী যে ১২% মেয়েদের কাছে জমির মালিকানা আছে তারাও বেশিরভাগ ক্ষেত্রে মন্ত্রীদের বউ, মেয়ে হন… অথচ আমাদের মেয়েদের কোনো জমি নেই।

ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যাবে কৃষক আন্দোলনের সময় মেয়েদের কথা সামনে এলেও, মেয়েদের জমির মালিকানার প্রশ্ন বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই মূল দাবি থেকে বাদ পড়ে গেছে। এই আন্দোলনে এই বিষয়ে কোনো আলাপ আলোচনা হয়েছে?

আমাদের প্রাথমিক দাবি এই তিনটি আইন প্রত্যাহার করা। এটা আমাদের সবাই মিলে একসঙ্গে লড়তে হবে। কিন্তু আমাদের আরও দাবি, পাঞ্জাবের ল্যান্ড সিলিং অ্যাক্টের ১৭ একরের আইনটি লাগু করতে হবে, এবং উদ্বৃত্ত জমি শ্রমিক, কৃষক, মেয়েদের নামে পুনর্বন্টন করতে হবে। আমরা আমাদের ভাইয়েদের, আমাদের বরেদের সাথে লড়তে চাইনা মালিকানার জন্য। এটা আসলে সরকারেরই চাল, ওইটুকু ছুড়ে দেওয়া অধিকার নিয়ে যাতে আমরা নিজেদের মধ্যে মারামারি করি। লড়াইটা রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে। আমাদের জমির মালিকানা দেওয়া রাষ্ট্রের কর্তব্য। উদ্বৃত্ত জমি আমাদের নামে করতে হবে। আমাদের এখানে যে কৃষকদের জমি আছে, তাদের ৫-১০ একর জমি আছে। আর যাদের নেই তাদের কিছুই নেই। এই তিনটি আইনের বিরুদ্ধে, এই বিদ্যুৎ আইনের বিরুদ্ধে আমরা লড়ছি, লড়ব… কিন্তু এতেই এই আন্দোলন থেমে যাবে না। লড়াই তো সবে শুরু হল। আমরা আমাদের হকের জমির জন্যও লড়ব, পুরুষদের সঙ্গে নিয়েই লড়ব। কারণ লড়াইটা রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে। পুরুষরাও সেই লড়াইয়ের সাথী। আমাদের ওখানে পুরুষদের মধ্যে নেশার খুব চল ছিল, এই আন্দোলনে এসে সেটা বন্ধ হয়েছে। মেয়েরা থাকায় তারা তাদের ভাষাও নিয়ন্ত্রণ করে, গালাগাল দেন না। এগুলো খুব সামান্য ব্যাপার মনে হলেও আস্তে আস্তে অনেক বদল আনতে পারবে… ঘরের মধ্যেও অনেক বদল আসছে… পুরোনো অভ্যেস বদলাচ্ছে। নারী পুরুষের সম্পর্কে অনেক বেশি সমতা আসছে। এখানে ছেলেরা রান্না করে, মেয়েরা করে না। এটা ভালো। আন্দোলনের ফলে অনেক নতুন সংস্কৃতি তৈরি হচ্ছে। শুধু মেয়েরাই কেন খাবার বানাবে? এখানে ছেলেরা রান্না করছে, যুবকেরা করছে। ছেলেরা মেয়েদের পরিবেশন করছে। ওখানে গ্রামে মেয়েরা ক্ষেত সামলাচ্ছে। ‘পুরুষদের কাজ’ করছে। লিঙ্গ-ভূমিকা পাল্টাচ্ছে। ভালো সংস্কৃতি তৈরি হচ্ছে। এই ছেলেদের কাজ, মেয়েদের কাজ ভাগটাই আর নেই। কাজ তো কাজ, তার আবার ছেলে মেয়ে কী? এগুলো থিওরিতে ছিল, এখন প্র্যাক্টিসে আসছে। আন্দোলন শেখাচ্ছে…

রাষ্ট্রীয় নিপীড়নও তো বাড়ছে আপনাদের উপর… ইন্টারনেট কেটে দিয়েছে, ব্যারিকেড চারিদিকে… আপনাদের ‘খালিস্তানি’ দাগিয়ে দেওয়ার চেষ্টা চলছে…

এটা এখন সবার আন্দোলন হয়ে গেছে। এটা কৃষকদের আন্দোলন। ভারতের জনতার আন্দোলন। আগের অনেক আন্দোলন দ্বারা এই আন্দোলন সমৃদ্ধ হয়েছে। এটা কোনো হিন্দু বা মুসলমানের আন্দোলন নয়। ওরা আমাদের ‘খালিস্তানি’ বলছে, ‘নকশাল’ বলছে, ‘মাওবাদী’ বলছে… যে কোনো বিরুদ্ধ মত, যে কোনো আন্দোলন দমন করতে ওরা এটাই করে। এখানেও ২৬শে জানুয়ারি কে কী পতাকা উড়িয়েছিল সেই দিকে কথা ঘুরিয়ে দিতে চাইছে। ওরা মানুষকে ইউএপিএ দিচ্ছে, প্রতিবাদীদের জেলে ঢোকাচ্ছে। অত্যাচার চালাচ্ছে। আসলে এসবই বিজেপির চক্রান্ত কৃষক আন্দোলনকে কলুষিত করার। তারা চায় মানুষ সাম্প্রদায়িক বিভেদে জড়িয়ে থাকুক। ২৬শে জানুয়ারি আমাদের রুটে সমস্ত রাস্তা ব্যারিকেড করে শুধু লাল কেল্লার রাস্তা খোলা রেখেছিল। কৃষকদের উপর পুলিশ লাঠিচার্জ করেছিল… আসলে ২৬শের ঘটনাই পরিষ্কার করে দায় পুলিশ-প্রশাসন সবাই কীভাবে বিজেপির কথায় কাজ করছে। এতে আন্দোলন আরো জোরালো হলো। টিকায়েতকে টার্গেট করতে গেছিল, আন্দোলন আরো জোরদার হলো। টিকায়েতের ভাষণ শুনে হরিয়ানা, উত্তর প্রদেশের আরও মানুষ এসে জুড়লেন। সবারই এই আন্দোলনের সঙ্গে এক রকমের সম্পর্ক তৈরি হয়ে গেছে। মানুষ আমাদের কথা বুঝেছেন। ওরা আমাদের নামে কুৎসা রটিয়েছে, আরও আরও ব্যারিকেড তুলেছে… কিন্তু আমাদের আন্দোলন আরও তীব্র হয়েছে। ২৬শে জানুয়ারি আমরা যেখানেই গেছি মানুষ আমাদের খাবার দিয়েছেন, আমাদের ওপর ফুল ছুড়েছেন… এই সব খবর হলো না। খবর হলো শুধু লাল কেল্লার কথা। ওরা যতই দমনপীড়ন চালাক, মানুষ আমাদের সঙ্গে আছে। তারাই এসে আমাদের খাবার দিয়ে গেছে, বিদ্যুতের লাইন দিয়ে গেছে, জল জোগান দিয়েছে। এখানে টিকরিতে হরিয়ানার মানুষেরা আমাদের বিভিন্ন ভাবে সাহায্য করছেন, সংহতি জানিয়েছেন… দিল্লি থেকেও অনেকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন। হরিয়ানার মেয়েরা আমাদের জন্য মাছ রেঁধে পাঠিয়েছিলেন, মাখন পাঠিয়েছিলেন। তাঁরা রোজ এখানে আসেন। যে মেয়েরা এক সময় ঘোমটার তলায় থাকত, আজ তারাই ঘোমটা ছেড়ে দিয়েছে, বলছে, এটা আন্দোলনের সময়। তারা এসে ভাষণ দেয়, স্লোগান তোলে। ভীষণ ‘যোশ’ আছে। হরিয়ানা, কর্নাটক, পাঞ্জাব, উত্তর প্রদেশ, রাজস্থান থেকে মেয়েরা এসেছে। আমরা একসাথে আলোচনা করি, একে অপরকে উদ্বুদ্ধ করি।

টিকরিতে তো রাজবন্দীদের মুক্তির দাবিও উঠেছিল… বিভিন্ন আন্দোলন, সংগ্রাম একসঙ্গে জুড়ছে…

এটা তো কোনো গোষ্ঠীর লড়াই নয়। এটা সবার লড়াই। যারা ফসল ফলাচ্ছে তাদেরও সংগ্রাম, যারা কিনছে তাদেরও লড়াই। কৃষক যেমন তার ফসলের ন্যায্য দাম পাবে না, তেমনই যারা ক্রেতা তাদেরও অনেক চড়া দামে কিনতে হবে। এই লড়াইটা তাই সবার। এই আইন এলে আপনিও মরবেন, আমিও মরবো। এতে শুধু কর্পোরেটদের লাভ। বাকি সবাই ঋণে জর্জরিত হয়ে মরে যাব। এটা জাট বা শিখেদের আন্দোলন নয়। তারাও বলে এটা খালিস্তানের লড়াই নয়। আমরা সবার আগে কৃষক। কৃষকই যদি না থাকি তাহলে আর ধর্ম দিয়ে কী  হবে? অন্য সব পরের কথা। আগে আমরা কৃষক, আগে আমরা মানুষ।

বাংলার মানুষদের জন্য কিছু বলবেন…

আমরা বাংলার মেয়েদের খুব সম্মান করি। এটা আমাদের সবার লড়াই। আশা করব তারাই এই লড়াইয়ে আমাদের সাথী হবেন।

এখানে তো কৃষক আন্দোলনে মেয়েদের গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা ছিল। তেমনই পাঞ্জাবের কৃষক আন্দোলনের ইতিহাসে মেয়েদের কথা যদি বলেন…

যখন বাংলায় নন্দীগ্রাম আন্দোলন চলছিল, আমরা তার সমর্থন করেছিলাম। আপনাদের নন্দীগ্রামে জমি অধিগ্রহণ চলছিল, তেমনই তখন আমাদের পাঞ্জাবেও জমি অধিগ্রহণ চলছিল। আমরাও লড়ছিলাম। পিওনা পাওয়ার কম্পানির জন্য সরকার জমি অধিগ্রহণ করেছিল। আমরা তার বিরুদ্ধে লড়েছিলাম। বরনালে গ্রামে একটি পাওয়ার কম্পানিকে হাজার একর জমি দিয়েছিল সরকার। ট্রাইডেন্ট কম্পানির মালিকের জন্য জমি অধিগ্রহণের অর্ডার জারি করেছিল। আমরাও সিঙ্গুর-নন্দীগ্রামের আন্দোলন থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে জমি অধিগ্রহণ হতে দিইনি। পাঞ্জাবের মেয়েরা পুলিশি সন্ত্রাস রুখে দাঁড়িয়েছিল। মেয়েদের কারও মাথা ফেটে গেছিল, কারও ওপর ডাণ্ডা চালিয়েছিল, অনেক মেয়ের জেল হয়েছিল, বিভিন্ন কেস দিয়েছিল। এমনকি ঘোড়ায় চড়া পুলিশ মেয়েদের ছাতির উপর ঘোড়া চালিয়েছিল। কিন্তু আমরা আমাদের জমি ছাড়িনি। সরকারকে জমি নিতে দিইনি।জমি ফেরত দিতে বাধ্য করেছিলাম… ওখানে বাংলায় মেয়েরা লড়ছিল, এখানে পাঞ্জাবে… একই লড়াই, একই সাথে লড়ছিলাম। নন্দীগ্রামে মেয়েদের লড়াই আমাদের আন্দোলনকে আরও মজবুত করেছিল। আমরা সে বিষয়ে রোজ পড়ছিলাম। কতো লোক রাস্তায় নেমেছিল! সেই সংগ্রামের ইতিহাসের ধারাবাহিকতায়  এখন এখানে মেয়েরা লড়ে চলেছে…

শেয়ার করুন

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *