​আন্তর্জাতিক শ্রমজীবী নারীদিবস

হইহই করে আর একটা ৮ মার্চ চলে এলো। আজ নারী দিবস। আজ আন্তর্জাতিক শ্রমজীবী নারী দিবস।

এইটুকু পড়ে ভাবছেন, কী এমন নতুন কথা বললাম! 

আসুন না, এই ফাঁকে খানিক ইতিহাসের পাতা থেকে ঘুরে আসি, আমি জানি আপনারা সবটাই জানেন, তাও এক ঝলক ফিরেই দেখা যাক, কী বলুন, ক্ষতি তো নেই! 

সালটা ১৯০৮। সেই সময় আমেরিকার বস্ত্রশিল্পের মোট শ্রমশক্তির ৭০% ছিলেন মহিলারা। তাদের মধ্যে বেশিরভাগই ছিলেন মূলত ইমিগ্রেন্ট শ্রমিক। বাড়ির সমস্ত কাজ সামলে সপ্তাহে ৭৫ ঘণ্টা অবধি কাজ করতে হত তাঁদের। কিন্তু পেতেন না শ্রমের যথাযথ মূল্য। না, পুরুষ বস্ত্র শ্রমিকদের অবস্থাও খুব ভালো ছিলো না। কিন্তু মেয়েদের অবস্থা ছিলো তার থেকেও অনেক বেশি শোচনীয়। পেট চালাতে অত্যন্ত অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে ঘণ্টার পর ঘণ্টা তাঁরা বাধ্য হতেন কাজ করে যেতে। ছোট ছোট ভুল অথবা ভুল না হলেও মালিকের মর্জি-মাফিক যখন তখন কেটে নেওয়া হত মাইনে, দিতে হত ফাইন। ক্ষোভ জমা হতে থাকে। সঙ্ঘবদ্ধ  হতে শুরু করেন মহিলা শ্রমিকরা।

ওই বছর ৮ মার্চ, পনের হাজারেরও বেশি মহিলা শ্রমিক নিউ ইয়র্কের লোয়ার ইস্ট সাইড থেকে ইউনিয়ন স্কোয়ার অবধি মিছিল করে আসেন। ভোটদানের অধিকার, মাইনে বৃদ্ধি, এবং শ্রমকাল হ্রাসের দাবিতে তাঁদের এই মিছিল কাঁপিয়ে দেয় গোটা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে। মেয়েদের সেই ঐতিহাসিক  মিছিলকে সম্মান জানিয়ে আমেরিকার সোশ্যালিস্ট পার্টি ২৮ ফেব্রুয়ারিকে জাতীয় নারী দিবস হিসাবে ঘোষণা করে। 

সেই  মিছিল থেকে উদ্বুদ্ধ হয়ে, ১৯০৯ এর ২২ নভেম্বর, ক্লারা লেমলিক নামের এক পরিযায়ী মহিলা ইহুদী শ্রমিক ডাক দেন জেনেরাল স্ট্রাইকের। তাঁকে সমর্থন করতে এগিয়ে আসে ইন্টারন্যাশনাল লেডিস গারমেন্ট ওয়ার্কার্স ইউনিয়ন এবং ন্যাশনাল উইমেন্স’ ট্রেড ইউনিয়ন লিগ অফ আমেরিকা।

২৪ নভেম্বর, কারখানা ছেড়ে রাস্তায় নেমে আসেন অন্তত কুড়ি হাজার মহিলা শ্রমিক। পরের দিন সংখ্যাটা আরও বাড়ে। বাড়ে সংগঠিত আন্দোলনের তীব্রতা। যোগ দেন পুরুষ শ্রমিকরাও। এই সর্বাত্মকভাবে সফল ধর্মঘট চলে ১৯১০ সালের ফেব্রুয়ারি অবধি। বেতন বৃদ্ধি, ওয়ার্কিং আওয়ার্সের হ্রাস এবং সব শ্রমিকদের প্রতি সম আচরণের দাবিতে রাজি হতে বাধ্য হয় মালিকপক্ষ। এই ঘটনার আঁচ ছড়িয়ে পড়ে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে। বিশেষত, ইউরোপের বিভিন্ন দেশে মহিলারা একত্রিত হয়ে রাজনৈতিক-সামাজিক সম অধিকারের দাবিতে আন্দোলন শুরু করেন। 

১৯১০-এ কোপেনহেগেনে  সোশ্যালিস্ট ইন্টারন্যাশনালে একটি নির্দিষ্ট দিনকে আন্তজার্তিক শ্রমজীবী নারী দিবস হিসাবে ঘোষণার প্রস্তাব দেন ক্লারা জেটকিন, জার্মান সোশ্যালিস্ট লুই জিয়েতসের প্রস্তাবনার সমর্থনে। সর্বসম্মতিক্রমে সেই প্রস্তাব গৃহীত হয়। যদিও সেই সমাবেশে নির্দিষ্ট কোনও দিন ঠিক করা হয়নি।

১৯১১ সালে ১৯ মার্চ প্রথম আন্তর্জাতিক শ্রমজীবী নারী দিবস উদযাপিত হয়। জার্মানি, সুইৎজারল্যান্ড, ডেনমার্ক, অস্ট্রিয়ায় পথে নেমে এই দিনটি পালন করেন লক্ষাধিক মেয়েরা। এর ঠিক এক সপ্তাহের মধ্যে নিউ ইয়র্কের ট্রায়াঙ্গেল শার্টওয়েস্ট ফ্যাক্টরি ফায়ারে পুড়ে মারা যান ১৪৬ জন মহিলা শ্রমিক। কর্মক্ষেত্রে সুরক্ষার প্রশ্নটি নতুন করে উসকে দেয় এই ঘটনা। এই ১৪৬ জনের অকাল মৃত্যুর ইন্ডাস্ট্রিয়ল ওয়ার্কিং কন্ডিশনে ব্যাপক পরিবর্তন আসে, তাঁদের স্মৃতিতে আন্তর্জাতিক নারী দিবসে শ্রমজীবী নারীদের অধিকারের কথা আরও জোরদার হয়ে উঠে আসে। 

১৯১৩-র ফেব্রুয়ারি মাসের শেষ রবিবার প্রথমবার রাশিয়ার মেয়েরা আন্তজার্তিক শ্রমজীবী নারী দিবস প্রত্যক্ষ করেন। ১৯১৪ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে, রাশিয়ার রাস্তায় যুদ্ধবিরোধী এবং বিশ্বশান্তির পক্ষে মিছিলের ডাক দেন সে দেশের মেয়েরা। যার আঁচ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে অন্যান্য দেশেও। ৮ মার্চ ইউরোপের বিভিন্ন দেশে বিশ্বশান্তির পক্ষে মিছিল করেন মেয়েরা। 

১৯১৭ সালে যুদ্ধের ব্যাকড্রপে ফেব্রুয়ারির শেষ রবিবার (পশ্চিমি বা জর্জিয়ান ক্যালেন্ডার অনুযায়ী ৮ মার্চ)  “রুটি এবং শান্তি” -র দাবিতে ফের পথে নামেন রাশিয়ার মেয়েরা। এর চারদিন পর পতন হয় জারের। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার স্বীকৃতি দেয় সে দেশের মেয়েদের ভোটদানের অধিকারকে। 

১৯৭৫ সালটি ইউনাইটেড নেশন আন্তর্জাতিক নারী বছর হিসাবে ঘোষণা করে, ওই বছরেই ৮ মার্চকে আন্তর্জাতিক নারী দিবস হিসাবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। হ্যাঁ, ছাঁটাই হয় “শ্রমজীবী” অংশটি। যদিও ইতিহাসের পাতা থেকে মুছে ফেলা যায় না তাকে।

এ তো গেলো অতি সংক্ষিপ্ত ইতিহাস। আশা করি বোঝা গেছে বা মনে পড়েছে যে এই দিনটা আমাদের কেউ ভিক্ষায় দেয়নি, এ’দিন আমাদের মেয়েদের অর্জিত।

এখন কেমন আছে গোটা বিশ্বের মেয়েরা? 

কিছু দিন আগে একটা মিম সোশ্যাল মিডিয়ায় খুব ঘুরছিলো। মিমটির আপ্তবাক্য, সব মেয়েরাই আদতে শ্রমজীবী, শুধু পারিশ্রমিক পান কেউ কেউ।

এক্কেবারে খাঁটি কথা। ২০০৯ সালেই ইউনিসেফ জানিয়ে দিয়েছে এ পৃথিবীর মোট কাজের ৬৬% করেন মেয়েরা, ৫০% খাদ্য উৎপাদন করেন (রান্না নয়, সেটা ব্যতিরেকেই) কিন্তু তাঁদের ভাগ্যে জোটে মোট উপার্জনের মোটে ১০%। পৃথিবীর মোট সম্পদের মাত্র ১% মালিকানা রয়েছে তাঁদের হাতে। এখানেই শেষ নয়, মোট কাজ মেয়েরা বেশি করলেও যে কোনও গ্লোবাল ফিনান্স ক্রাইসিসের সময় ছাঁটাইয়ের প্রশ্নে মেয়েরা এখনও বৃহত্তম শিকার। যদিও ওয়ার্ল্ড ইকনমিক ফোরাম জানাচ্ছে কর্মক্ষেত্রে মহিলারা পুরুষদের থেকে অন্তত ১০% বেশি প্রোডাক্টিভ। অক্সফাম-এর রিপোর্ট বলছে গোটা বিশ্বে বিনি পয়সায় যে শ্রমের যোগান মেয়েরা দেন, তাকে যদি হিসেব করে অর্থের মাপকাঠিতে আনা যায়, তাহলে তার মোট মূল্য গিয়ে দাঁড়ায় বছরে ১০ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার (৭০, ১৪, ৫৩, ০০, ০০, ০০, ০০০ টাকা) , যা অ্যাপেল নামক সংস্থাটির বার্ষিক মোট টার্ন ওভারের ৪৩ গুণ! দাঁড়ান, দাঁড়ান, আরও আছে! গত বছরের ২৫ নভেম্বর ইউনাইটেড নেশনের অফিস অন ড্রাগস অ্যান্ড ক্রাইমের একটি রিপোর্ট সামনে আসে। সেই রিপোর্ট বলছে বিশ্বে প্রতিদিন গড়ে ১৩৭ জন মহিলা খুন হয়ে যান বাড়ির লোকের হাতেই! বাড়িই বিশ্বব্যাপী মেয়েদের জন্য সব থেকে অসুরক্ষিত স্থান! এছাড়া প্রাত্যহিক অপমান, লাঞ্ছনা, গার্হস্থ্য হিংসা, যৌন নির্যাতন, ধর্ষণ… এসবের সত্যি হিসেবটা মেলা বেশ, বেশ কঠিন! এখনও সমকাজে সমবেতন মেলে না মেয়েদের! মেলে না বহু ন্যায্য সামাজিক অধিকার। বহুদেশ এখনও বহন করে লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্যের আইন। অন্যায় অপ্রেসন আর বিপুল ডিসক্রিমিনেশনের পাথরের চাঁই ঠেলে আজও এগোতে হয় আমাদের। মেয়েদের।  আমাদের দেশে জেন্ডার পে গ্যাপ ২৪.৮১%। মনে আছে আরব বসন্তের কথা? মুবারকের উচ্ছেদের লড়াইয়ে মেয়েদের সেই ঐতিহাসিক যোগদান? কিন্তু তারপর কী হল? নতুন সরকার এলো। আর রাষ্ট্র চালানোর কাজে মেয়েদের সুচারুভাবে আরও একটু বাদ দেওয়া হলো! গোটা পৃথিবীতে বিভিন্ন দেশে প্রতিনিধিমূলক সরকারে মেয়েদের যোগদান ২০%-এর কম। ওয়ার্ল্ড ইকনমিক ফোরামের ২০১৮ সালের রিপোর্টটা যদি একবার পড়েন বুঝতে পারবেন পরিস্থিতি আসলে এখনও কতটা খারাপ! 

যে লড়াই শুরু করেছিলেন আমাদের পূর্বজরা, অধিকার রক্ষার সেই লড়াই আজও এতগুলো বছর পেরিয়ে একই রকম প্রাসঙ্গিক। প্রত্যেক বছর ফিরে ফিরে আসে ৮ মার্চ আর মনে করিয়ে দিয়ে যায় আন্তর্জাতিক শ্রমজীবী নারী দিবসের কথা। হ্যাঁ, শ্রমজীবীই। হোমমেকাররাও একই ভাবে শ্রমজীবীই, যে শ্রমের মূল্য বা মর্যাদা কোনওটাই পান না তাঁরা। বহু লড়াই করে যে অধিকার অর্জিত হয়েছিলো , ৮ মার্চ মনে করায় সে অধিকার পালনের কথা, মনে করায় যেখানে দমন থাকে সেখানে জোট বেঁধে সঙ্ঘবদ্ধ লড়াইয়ের শেষে শুধুই দিন বদল দাঁড়িয়ে থাকে। এই দিন আমাদের অস্তিত্বকে উদযাপনের দিন, পূর্বজদের লড়াইয়ের স্বর্ণালী  উপখ্যানে রচিত এই দিন ফিরে ফিরে আসে আর বুঝিয়ে দিয়ে যায়, হ্যাঁ, আমরাও পারি! এদিন আনন্দের। লড়াইটা বাকি, কিন্তু এর শেষে শুধুই সুদিন, মনে করায় ৮ মার্চ, প্রতি বছর নতুন করে। এই দিন চিরন্তন। 

গয়নার ছাড়ে নয়, লড়াইয়ের স্বাক্ষরে নির্মিত। রাজনৈতিক, সামাজিক সর্বক্ষেত্রে সমানাধিকারের কথা বলে যায় এই দিন। সার্বিকভাবে মানব সভ্যতার উত্তরণের ইতিহাসের এক অমর আলেখ্য বহন করে এই দিন, এই দিনের ব্যাপ্তি অনন্ত, এর স্পন্দন দেশ কালের সীমা ছাড়িয়ে বিস্তৃত।   

তাই, আরও একবার,

বেঁচে থাক আন্তর্জাতিক শ্রমজীবী নারী দিবস, হীরের গয়না, নেল পলিশ, শাড়ির দামে ডিসকাউন্ট, ফেয়ার অ্যান্ড লভলির বিজ্ঞাপনের মিথ্যে পুঁজিবাদী ঘেরাটোপ ভেঙে এগিয়ে চলুক স্বমহিমায়। ততদিন, যতদিন না সবক্ষেত্রে সাম্যবাদের জয়ধ্বজা উড়ছে, বুঝে নেওয়া হচ্ছে অধিকারের সব হিসেব নিকেশটা। ইক্যুউটির হাত ধরে এ পৃথিবীর বুকে নেমে আসুক ইক্যুয়ালিটি।

আর, তারপর? তারপরও বেঁচে থাকুক, মনে থাকুক… এগিয়ে থাকার ইতিহাস ভুলে গেলে যে সভ্যতা থমকে যায়!

দীর্ঘজীবী হোক আন্তর্জাতিক শ্রমজীবী নারী দিবস।

ইনকিলাব জিন্দাবাদ।

লাল সেলাম।

২০১৮ সালে এই আন্তর্জাতিক শ্রমজীবী নারীদিবসের দিন রায়া দেবনাথ এই  প্রবন্ধটি লেখেন।

শেয়ার করুন

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *