হারুর মৃত্যুদণ্ড

হারুর ফাঁসির দিন সবাই খুব কেঁদেছিল। তার মা খবরটা পাওয়ার পর এক ঘণ্টায় প্রায় বার চারেক অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিল। হারুর দুই ছেলে থেকে থেকে বুক চাপড়ে উঠেছে আর ছেলের বউয়েরা শাড়ির আঁচলে চোখের জল মুছেছে ঘন ঘন। সারা গ্রাম কেমন থমকে গেছিল হারুর ফাঁসির খবরে। সবাই যদিও জানত ওকে সেদিনই ঝোলানো হবে, কিন্তু ফাঁসির দিনটায় হারুর মৃত্যুর খবর সজোরে বিঁধেছিল গ্রামের প্রতিটি মানুষের বুকে। এই মামলা চলাকালীন এবং শাস্তি ঘোষণার পরে প্রায় বছর খানেক হাজতবাসের সময় হারুও জানত যে তার ফাঁসি হবেই। তাই প্রশ্ন ওঠে যে হারুর মৃত্যু কবে হয়েছিল? অপরাধ করার সময়ে? অপরাধ করার আগে? এই অপরাধের আগে অন্য কোন অপরাধ করার সময়ে? নাকি এমন কোনো সময়ে যখন তার কৃতকর্মকে অপরাধ বলেই মনে করা হয়নি তখন? আমরা সেই উত্তরই খুঁজছি।

গ্রামের সবাই প্রায় বুঝতে পারছে হারুর পুরো মামলাটাই সাজানো ঘটনা। শুধু প্রমাণের অভাবেই বেচারার ফাঁসি হল। বাদীপক্ষের হয়ে দু’জন মানুষ, একটি ছাগল এবং মোষ হারুর বিরুদ্ধে সাক্ষী দিয়েছে মাত্র। জজ সাহেব চাইলেও হারুকে ক্ষমা করতে পারতেন না। হারুর উকিল অনেক তর্ক বিতর্ক করেও ওই প্রমাণের সত্যতা অস্বীকার করতে পারেননি এবং হারু নিজেও নির্দোষ হবার পাল্টা প্রমাণ দিতে পারেনি। 

ওদিকে সবার মনে শুধু একটাই প্রশ্ন। কী করেছিল হারু? যেমন তেমন অপরাধে তো ফাঁসি হয় না! কোন দিন কারো সাতে-পাঁচে না থাকা হারু কী এমন দোষ করল যে এত বড় শাস্তি পেতে হল তাকে? তার মামলার প্রতিটি শুনানির দিন গ্রামের সব লোক উপস্থিত ছিল কোর্টে। বাদী-বিবাদী দু’পক্ষেরই তর্ক গ্রামের লোকেরা মন দিয়ে শুনেছে। জজসাহেব খুবই কড়া। অপর পক্ষের উকিল যখন তর্ক শেষ করে হারুর জন্য মৃত্যুদণ্ড দাবী করেছিল, পাশের বাড়ির ঝানু পোদ্দার হঠাৎ দাঁড়িয়ে উঠে বলেছিল এ সব হারুর বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ। আগাগোড়াই মিথ্যা দিয়ে বোনা এই মামলা। ঝানু পোদ্দারের সাহস দেখে হারুর বড় ছেলেও বুকে বল পায় খানিক। সেও উঠে দাঁড়িয়ে, বুকের কাছে দুই হাত জোর করে কাতর স্বরে বলেছিল – “হুজুর ধর্মাবতার, এই মামলার তো কিছুই বুঝতে পারছি না। সবই তো সাজানো ঘটনা। আপনিই বলুন এই মামলা ধোপে টেঁকে কী করে? ওদের যুক্তির তো কোন মাথামুণ্ডু থাকছে না। আমার বাবা তো ওদের চেনেই না। তাহলে এই প্রতিশোধের ব্যাপারটা এল কোথা থেকে? কিছু করুন হুজুর। এভাবে বলা নেই কওয়া নেই, ফাঁসির দাবি কেউ কী ভাবে করতে পারে? আমার বাবা নির্দোষ হুজুর, আমার বাবা নির্দোষ”। হারুর ছেলের আর্তনাদে, কোর্টে থাকা বাকি লোকগুলোও হই হই করে ওঠে। জজ সাহেব তক্ষুনি সবাইকে এক ধমক দিয়ে কড়া ভাবে বললেন, এভাবে কোর্টে হল্লা করলে লাভ তো কিছু হবেই না বরং উল্টে হারুর ফাঁসিই নিশ্চিত হবে। সবাই তক্ষুনি থেমে যায়, উকিল হারুর ছেলেকে বুঝিয়ে দেন যে তার বলার সময় না এলে কোর্টে আগ বাড়িয়ে কথা বলতে নেই, আর হারু চুপচাপ জানালার বাইরের গাছটির পাতা গুনতে থাকে।

সেদিন সন্ধেবেলায় প্রতিটা চায়ের ঠেক, প্রতিটি বাড়ির দাওয়া, পাড়ার মোড়ের প্রতিটি আড্ডায় সবার একই প্রশ্ন। হারু কী করেছে? কী এমন দোষ করল যে তার ফাঁসি চাওয়া হল? কথার পিঠে কথা ওঠে, শোনা যায় হারু বিয়ের রাতে বউ পিটিয়েছিল। কিন্তু সেও তো অনেক বছর আগের কথা। তখন হারুর বয়েস আঠার আর বউয়ের বারো। পাশের গ্রামের এক বড় ব্যবসায়ী পরিবারের মেয়ের সঙ্গে হারুর বিয়ে হয়। তার মা এই গ্রাম সেই গ্রাম দেখে, প্রায় খানাতল্লাশি করে মেয়ে খুঁজে এনেছিল হারুর জন্য। মেয়ের বাবাও বিয়েতে কোনো ত্রুটি রাখেননি। পঁচিশ ভরি গয়না, হারুর জন্য একটা মোটর সাইকেল, নগদ এক লাখ টাকা আর গরুর গাড়ি বোঝাই মিষ্টি, কাপড়, কাঁসার বাসন দিয়ে মেয়েকে শ্বশুরবাড়ি পাঠিয়েছিলেন। হারুর মা-ও এই গ্রামে খুব ঘটা করে ছেলের বিয়ের আয়োজন করেছিল। পাড়াশুদ্ধ সব লোক তাদের বাড়িতে তিনদিন ধরে দু’বেলা করে খেয়েছে। তো এই যে এত সাধের বিয়ে, সেখানে ফুলশয্যার রাতে কেন হারু বউ পেটাল? 

আসলে সমস্যা হারুর একার নয়। ও তো ছোটবেলা থেকেই একটু বদরাগী, কিন্তু বিয়ের রাতে বউ যে অমন করবে সেটাই বা হারু জানবে কী করে? গ্রামের বাকি ছেলেরা হারুকে বুঝিয়েছিল যে বাসর রাতে বেড়াল না মারলে হবে না। তাই হারুও বীরদর্পে ঘরে ঢুকেছিল তার জীবনের প্রথম নারী, তার কচি বউয়ের রসে সিক্ত হতে। হারুর বন্ধুরা বিয়ের আগে ওকে বেশ্যাপাড়ায় নিয়ে যাবার ইচ্ছা প্রকাশ করলে সে হেসে এড়িয়ে যায়। খুব কম বয়েসে বিয়ে হয়ে যায় বলে এ গ্রামের এটাই প্রথা। বিয়ের আগে এক রাত গ্রামের ছেলেরা বেশ্যাবাড়ি কাটিয়ে আসে। সেই অভিজ্ঞ মহিলারা তাদের শিখিয়ে দেন কিভাবে সদ্যযৌবনা অথবা কিশোরী বউয়ের শরীরে রসের পুটুলি খুঁজে বার করতে হয়। কিন্তু হারু ওদিকে পা মাড়ায়নি। এদিক ওদিক খবর নিয়ে সে বুঝেছিল যে এ তার বাঁ হাতের কাজ। বেশ্যাবাড়িতে অযথা পয়সা খরচা না করে বিয়ে করা বউকে দিয়েই সে তার যৌনজীবনের হাতেখড়ি করবে। একই সঙ্গে মনের অতলে সে এও বিশ্বাস করত যে নিজের বউ ছাড়া আর কোন মেয়ের শরীরে হারু কোনো দিন হাত দেবে না। তার অহং এবং পৌরুষ এত ঠুনকো নয় যে পতিত মেয়েজাতের কাছে তাকে শিখতে হবে কিভাবে নারীশরীর কাবু করতে হয়। 

ওদিকে জীবনে প্রথমবার আধকাঁচা লেবু নিংড়োতে গেলে যা হয়, হারুরও তাই হল। নিজের গায়ের জোর আন্দাজ করতে না পেরে সে লেবু এমন চেপাই চিপলো যে রসের স্বাদ পুরো তেতো হয়ে গেল। আর সঙ্গে সঙ্গে শুরু হল নতুন বউয়ের গগনভেদী কান্না। প্রথমে খানিক বেবাক বনে গিয়ে হারু বউকে থামাবার চেষ্টা করল। কিন্তু যার কচি চামড়ায় টান পড়েছে সে কি আর কোনো কথা শোনার মানুষ? তাই বউয়েরও কান্না আর থামে না। ওদিকে হারুরও আস্তে আস্তে মাথার পারদ চড়ছে। এমন হতচ্ছাড়া মেয়েছেলে তো হারু আগে দেখেনি। ওর কোন বন্ধুর বাসরেও এমন হয়েছে বলে সে শোনেনি। সবাই ফুলশয্যার পরের দিন সদর্পে জয়ের পতাকা উড়িয়েছে। ওর কাকার ছেলে তো বলেছিল প্রথম রাতেই তার বউ নাকি চুমু খেয়েছে। তাই কোনোভাবেই হারু বুঝে উঠতে পারে না সে এমন কী করেছে যে তার বউয়ের চোখের জল আর ধরে না। একবার তার মনে হল এই মেয়ে কি অন্য কাউকে ভালবাসে? কিন্তু তার তো এখন পুতুল খেলার বয়স, তাই নিজের বর ছাড়া অন্য কাউকে যে ভালোবাসা যায় তা তার মাথাতেই বা আসবে কী করে? শেষমেশ নিজের রাগ কাবু করতে না পেরে বউকে দু’চার চড় কষিয়ে, বিছানার মাথার কাছে রাখা বাপের কালো ছড়িটা দিল কচি বউয়ের পেছনে ঢুকিয়ে। প্রবল এক চিৎকার করে উঠে বউ জ্ঞান হারাল। পাশের ঘরেই বাবা মা শুয়ে ছিলেন। নতুন বউয়ের মরা চিৎকার শুনে তারা ছুটে এলেন। আর হারুরও হঠাৎ সম্বিত ফিরল যেন। 

এর দিন তিনেক পরে বউয়ের দাদা বোনকে বাড়ি নিয়ে যেতে আসে। সে পাগলী মেয়ে জেদ ধরেছে এখানে থাকবে না। ফুলশয্যার দু’রাত পরে হারু আবার চেষ্টা করেছিল বউয়ের সঙ্গে খাতির জমাতে। খানিক গল্প জমে ওঠায় সে হঠাৎ করে বউয়ের বুকে হাত রাখে আর তাতেই মেয়েটি আবার ভয়ে সিঁটিয়ে যায়। পরের দিন তার দাদা নিতে এলে বলে সে আর এবাড়িতে ফিরবে না। শাশুড়ির পায়ে পড়ে ক্ষমা চায় যাতে তাকে বাড়ি চলে যেতে দেওয়া হয়। দাদা সব বুঝে গোপনে বোনের শাশুড়িকে বলে গেল যে কিছুদিনের মধ্যেই বুঝিয়ে সুঝিয়ে বোনকে ফেরত দিয়ে যাবে। পাড়ার বড়রাও হারুকে বোঝাল যে নতুন বউ, বাড়ির জন্য মন কেমন করছিল বলে কেঁদেছে, তাই বলে কি তাকে লাঠির বাড়ি দিতে আছে? গুরুজনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হারু মন দিয়ে সব শুনল আর দিন কয়েকের মাথায় এক কাঁদি কলা নিয়ে শ্বশুরবাড়ি গেল বউ ফিরিয়ে আনবে বলে। 

কিন্তু এ তো অনেক আগের কথা। হারুর ফাঁসি হল কেন? তাছাড়া বউ পেটালে কারো ফাঁসিই বা হবে কেন? সোহাগের মার কোন মেয়েই না খেয়েছে? সবাই নিজের বউ, মা, বোনের সঙ্গে আলোচনা করল। গ্রামের মহিলারাও বলল যে স্বামীর হাতের দু’চার ঘা মোটেও প্রহার বলা চলে না। আদরে, সোহাগে মেয়ে মানুষের এমনিতেই একটু তেল চড়ে শরীরে, তাই মাঝে মাঝে তাকে শাসন করার প্রয়োজন হয়। শহরে তো এমন মেয়েছেলেও আছে যারা বাড়ির কাজ পর্যন্ত করতে চায় না। স্বামী বেঁচে থাকলেও পরপুরুষের সঙ্গে ফষ্টিনষ্টি করে ওই বেজাতগুলো। তাই বাড়ির বউয়ের যেন বাড়ির বাইরে মন না যায় সেকারণে যেমন কাপড়-গয়না কিনে দিতে হয় তেমনি মাঝে সাঝে বলপ্রয়োগ করে তাকে বুঝিয়ে দিতে হয় যে তার স্বামীই এ’জগতে একমাত্র পুরুষ। সে যেমন টোপা কুলের মত টসটসে নারীশরীরে কামের আগুন ধরিয়ে দিতে পারে ঠিক তেমনি প্রয়োজনে রস চিপে বার করতেও তার জুড়ি মেলা ভার।

কিন্তু হারুর বউ লক্ষ্মীমন্ত। সে যখন প্রথম জানতে পারে যে তার পেটে বাচ্চা এসেছে, তখন সে তার বাপের বাড়ি ছিল। হারুও কিছুদিনের জন্য গ্রামের বাইরে গিয়েছিল। গুদাম ঘরে আগুন লাগায় শহরে যাবার দরকার পড়েছিল ইনস্যুরেন্স কম্পানির সঙ্গে কথা বলতে। একে পুরুষ মানুষ তায় গুদামে আগুন, হারুর কি আর মাথার ঠিক থাকে? যে রাতে দুর্ঘটনাটি ঘটে হারু বাড়িতে ছিল না। পরের দিনই তার ফেরার কথা। বউ নিয়ে নিজের মামার বাড়ি গিয়েছিল মামাতো বোনের বিয়েতে। সেখানেও দেনা পাওনা নিয়ে ঝামেলা। বিয়ে প্রায় থেমে যাবার জোগাড়। হারুই মধ্যস্থতা করে, বর পক্ষের হাতে পায়ে ধরে, নিজে থেকে বিশ হাজার টাকা দিয়ে মামাতো বোনের বিয়ে দেয়। হারুর এত গরজ দেখে মামির চোখে জল, মামা আনন্দে আত্মহারা, আর হারুর নতুন বউ তো সব আত্মীয়ের চোখের মনি হয়ে উঠল। এহেন যুদ্ধ জয় করে কত্তা গিন্নী বাড়ি ফিরেই শোনে গুদামে আগুন লেগেছে আগের রাতে। হারুর মাথায় তো বাজ। কোনপ্রকার নাকে-চোখে-মুখে একটু খাবার গুঁজেই সে বাজারে যায় পরিস্থিতি বোঝার জন্য। সব সামলে ফিরতে ফিরতে রাত হয় প্রায় সাড়ে বারোটা। ওদিকে পথের ক্লান্তি, সারা দিনের কাজ আর স্বামীর এত বড় ক্ষতির মানসিক চাপ নিয়ে নতুন বউও প্রায় নেতিয়ে পড়েছে। তাও হারু বাড়ি ফিরতেই সে কয়লার উনুনে খাবার গরম করল, হারুর হাত পা ধোবার জন্য জল এনে দিল, পা মোছার জন্য নিজের আঁচল এগিয়ে দিল। রাতে খেয়ে যখন হারু শোবার ঘরে গেল, নতুন বউও পরম যত্নে এক খিলি পান সাজলো হারুর জন্য। বিছানায় ক্লান্ত শরীর এলিয়ে দিয়ে পান মুখে দিতেই চড়াত করে হারুর ব্রহ্মতালু জ্বলে যায়। 

নতুন বউ খুব ভালো জানে হারুর দাঁতের সমস্যা। খুব সূক্ষ্ম করে সুপুরি কেটে দিতে হয় তাকে। এর আগেও এরকম হয়েছে যে বউ বড় করে সুপুরি কেটে হারুর কাছে বকা খেয়েছে। কিন্তু সে সব তো সোহাগের সময়। আর আজকের ব্যাপার আলাদা। হারু নিজের মনে হাজার জিনিস ভাবতে থাকে। বাজারে এত টাকার ক্ষতি হল আর তাও কিনা ঘরের লোকের কোন রা নেই। কোথায় একটু দরদ করবে, মমতা ভরা হাতে দু’টি পান সেজে দেবে, পা টিপে দেবে, মাথায় পাখার বাতাস করে দেবে, তা নয়। মাগীর একটা সুপুরি কাটতেও আলসেমি? দিন দশেক মামার বাড়ি ঘুরিয়ে নিয়ে এল, বিয়েতে পরার জন্য নতুন হার গড়িয়ে দিল, শাড়ি কিনে দিল, তা মাগী সব ভুলে খেয়েছে? বাজারের খানকিগুলোও এর থেকে কৃতজ্ঞ হয়। পয়সা দিলে ওরা তো চুষেও দেয়। এ মাগীর বড় তেল জমেছে পাছায়। আজ এই ব্রত তো কাল মাসিক, পরশু কোমরে ব্যথা তো তরশু শাশুড়ির পায়ে তেল মালিশ। গাড় মারতে দেবে না, চুষে দেবে না। শালা বিয়ে করা বউ তার আবার এত বায়নাক্কা। মাথায় রক্ত উঠে যায় হারুর। বউয়ের কোমরে এক লাথি দিয়ে ফেলে দেয় বিছানার নিচে। আচমকা লাথি খেয়ে আর বিছানা থেকে পড়ে গিয়ে ব্যথায় ককিয়ে উঠতেই হারুর রাগ আরও চড়ে যায়। আজকের দিনে এমন আওয়াজ করে কান্নাকাটি করার মানে কী? এ মাগী কি বোঝে না যে গুদামে আগুন লাগলে ঘরের উনুন জ্বলার অবস্থাও থাকবে না আর? 

রাগে হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে হারু এক লাফে বিছানা থেকে নামে। নতুন বউয়ের সুতির শাড়ি হিড়হিড়য়ে খুলে দেয় সে। সব এমন তড়িৎ গতিতে ঘটতে থাকে যে বউ খানিক ভেবলে যায় যেন। অপমানে, দুঃখে আর কিছুটা হয়ত রাগেও সে দু’হাতে নিজের মুখ ঢাকে। কিন্তু হারুর সঙ্গে সে গায়ের জোরে পেরে উঠবে কেন? হারু নতুন বউয়ের চুলের মুঠি ধরে টেনে আনে নিজের পুরুষাঙ্গের কাছে আর তার ঠাটানো পৌরুষ বউয়ের মুখে বলপুর্বক ঢুকিয়ে দিয়ে চিৎকার করতে থাকে – “চোষ মাগী চোষ। এত কিসের দেমাক তোর? গুদে নিবি কিন্তু মুখে নিবি না? প্রথম রাতে পোঁদে শুকনো লাঠির গুঁতো ভুলে গেছিস? আজ শালা তুই দেখবি হারু কী জিনিস। তুই কি ভেবেছিস আমার গুদামে আগুন লেগেছে মানে আমার সব গেছে? তুই যা ইচ্ছে আমায় খাওয়াবি, যা ইচ্ছে তাই দিবি আর আমি সব সহ্য করে নেব? আজ তোর গুদের আগুন যদি আমি না নিভিয়েছি তো আমার নাম হারু বামুন নয়”। 

পরের দিন বউ আর বিছানা ছেড়ে উঠতে পারে নি। ব্যবসা আর বাজারের ক্ষতি, তার সঙ্গে ঘরে বিছানায় পড়ে থাকা বউ, এই দুই নিয়ে হারু হিমসিম খেয়ে যায়। দু’দিনের মাথায় সে পাড়াতুতো এক কাকার সঙ্গে বউকে বাপের বাড়ি পাঠিয়ে দেয় আর দিন দশেক পরে নিজেও শহরে চলে যায়। সমস্ত ঝামেলা মিটতে প্রায় মাস দেড়েক লাগে। ইনস্যুরেন্সের টাকা আসে, হারুর গুদামের মেরামতি হয় আর যখন সব থিতু হয়, হারুর বউয়ের কথা মনে পড়ে। এবার সে নিজে দাঁড়িয়ে গাছ থেকে দুটো ইয়া বড় কাঁঠাল কাটিয়ে বউকে আনতে শ্বশুরবাড়ি যায়। বলাই বাহুল্য যে গিয়েই সে জানতে পারে তার বউ সন্তানসম্ভবা। হারুর বিশ্বাস হয় যে মা লক্ষ্মী তার দিকে মুখ ফিরিয়েছেন। বউ নিয়ে বাড়ি ফিরেই সে স্যাঁকরার দোকানে গিয়ে একজোড়া বালা গড়িয়ে নিয়ে আসে। রাতে বউয়ের হাতে বালা পরিয়ে দিতে গিয়ে বলেছিল – “তুই আমার ঘরের লক্ষ্মী। এবারে আমার বংশে একটা বাতি দে। এক ফুটফুটে ছেলে দিস আমায়। আমি তোকে সোনায় মুড়ে রাখব”। হারুর কথা শুনে বউয়ের বুকের ভেতরটা ছ্যাঁত করে ওঠে।

কিন্তু এত কিছুর পরেও হারুর ফাঁসি হল কেন বোঝা গেল না। সে যে মানুষ মারল এটা কি সত্যি? কোন কিছুই তো মিলছে না। আর মানুষ মারার যে কারণ ওরা দিচ্ছে সেটাও কেমন বিশ্বাসযোগ্য মনে হচ্ছে না। ওর বউ তো কিছুদিন আগেই মারা গেল। এই তো সেবার বড় নাতির জন্মদিনেও বেঁচে ছিল বউটা। কত বয়েস হয়েছিল? 

গ্রামের পুরুষেরা যখন হারুর বউকে পোড়াতে নিয়ে যায়, বাড়িতে শাশুড়ি তখন কাঁদতে কাঁদতে বলেছিল যে মেয়েটির নাকি বছর চল্লিশেক বয়েস হয়েছিল। শাশুড়ি খুব ভালবাসত বউকে। নিজের মেয়ের মত আগলে রাখত আর বলত – “আমার হারুর শরীরে খুব রাগ জানিস তো? ও ছেলে রাগলে আর মানুষ থাকে না। কিন্তু তুই বুঝিয়ে শুনিয়ে নিলে ও ঠিক থাকবে কিন্তু। ওকে রাগাস না। তুই ওকে দু’টো ছেলে দিলি, আমায় দুই নাতি দিলি, তোর মত স্বামী সোহাগী আর ক’জন হয় বল? শুধু ওর রাগটাই একটু সামলে নিতে হয়”। বউও এতদিনে বুঝে গিয়েছে যে হারুর মাথা গরম। ওর সব ভালো, কিন্তু সামান্য কিছু নিয়েই এমন রেগে যায় যে ঠাট্টা করতে গেলেও ভাবতে হয়। বউ তাই বরের সঙ্গে বিশেষ মশকরাও করে না। 

ওদের বড় ছেলের যেদিন পৈতে হল হারু সেদিন সারা পাড়া খাইয়েছে। সারা বিকেল-রাত ধরে বাড়ি গমগম করেছে পাড়াপড়শি, আত্মীয়স্বজনে। রাতে দামি শাড়ি আর গায়ের গয়না খুলতে খুলতে বউ গুনগুন করে গান গাইছিল। তাই দেখে হারু ভীষণ মজা পেয়ে বলেছিল – “খুব যে গান গাইছিস। কেউ মনে ধরল নাকি? দেখিস বউ, তুই কিন্তু এক ছেলের মা। এই বয়েসে আমায় ছেড়ে পালাসনি যেন”। স্বামীর এহেন সোহাগের কথা শুনে বউ বলেছিল – “তা সেরকম কাউকে পেলে পালাতেই পারি। ছেলে হয়েছে বলে আমার কদর কমলো নাকি? আজ দুপুরেই তো তুমি আমায় লুকিয়ে লুকিয়ে দেখছিলে। অন্য লোকে দেখলেই বুঝি তোমার মনে পড়ে আমি মা হয়েছি?”। হারু কিন্তু এমন উত্তর আসা করে নি। এটা কি তার বউ, তার ছেলের মায়ের মুখের ভাষা? হারুর সঙ্গে পরের তুলনা তো করলই আবার বলে কিনা ওর শরীরে এখনও যৌবন? তাও হারু রাগ চেপে রাখল। খানিক শ্লেষের সঙ্গেই বললো – “তা তোর শরীরে কি এখনও সেই যৌবন আছে মনে করিস? কোলের ছেলে যে বুকের দুধ খায় সে বুকে কি আর পুরুষ মানুষ মুখ দেবে?”। নির্বোধ বউ হারুর কথায় মজা পেল। ভাবল বুঝি বর তার সঙ্গে খুনসুটি করছে। এমন মুখপুড়ি যে সম্ভাব্য বিপদের আঁচটুকুও পেল না। ফস করে বলে বসে, “আহা, তুমি বুঝি রাতে সোহাগ করার সময়ে ছেলের কথা ভাব? কতবার হয়েছে তোমার জ্বালায় ছেলেকে মাঝরাতে গরুর দুধ খাওয়াতে হয়েছে। দুধ ভরা বুক দেখে তোমার যদি কোলের ছেলের কথা মনে না পড়ে তো অন্য পুরুষের বয়েই গেছে”। কথাটা বুঝি শেষ করেও উঠতে পারল না বউ। হাতে থাকা, যৌতুকে আসা, কাঁসার দুধের বাটিটা হারু ছুঁড়ে মারল বউয়ের মাথায়। বাটির কানায় লেগে অমনি গলগল করে রক্ত বেরোতে থাকে বউয়ের ফাটা কপাল দিয়ে। তারপর শত হাত পা ধরেও সে রাতে ঘরে ঠাঁই পায়নি বউ। কোলের ছেলে দিদার কাছে শুয়ে সারারাত কেঁদেছে কিন্তু অর্ধবসনা বউ ঘরে ঢোকার অনুমতি পেল না। দুধের ছেলের কান্নায় আরও রেগে গিয়ে হারু চিৎকার করতে করতে বলল – “দেখ মাগী আমি কী করতে পারি। আমার জন্য তোর ছেলে মায়ের বুকের দুধ পায় না তো? আসবি না তুই আমার ঘরে। কালকেই যদি তোকে বাপের বাড়ি না পাঠিয়েছি তো আমার নাম হারু বামুন না। আমার ছেলে আজ থেকে তোর দুধ খাবে না। বাপের ছেলে হয়েছে, সে গরু ছাগলের দুধ খেয়েই বড় হবে। আমার ছেলে তোর মত বেশ্যা মাগীর দুধ খেলে কুষ্ঠ রোগে মরবে। আমি বেঁচে থাকতে তা হতে দেব না”। 

হারুর মা সারা রাত দু’চোখের পাতা এক করতে পারেননি। নিজে দেখেশুনে নিয়ে এসেছিল এই মেয়েকে। সুখে-দুঃখে সবসময় এই বউ তার পাশে ছিল পেটের মেয়ের মত। হারুর বাবা যেদিন মারা যায় সেদিন এই বউ এত কেঁদেছিল যেন ওর নিজের বাপ। নিজে না খেয়ে না দেয়ে এই সংসার ঠেলে বউ। কিন্তু একটু যদি সাবধানী হয় তাহলেই সব ঠিক হয়ে যায়। হারু খুবই ভালো ছেলে। বাপ মা কাউকে কোনো দিন অসম্মান করেনি, বউ ছেড়ে কোন দিন অন্য মহিলার মুখদর্শনও করেনি। শুধু এই রাগটাই ছেলের সমস্যা। সারা রাত বুড়ি ইষ্টনাম জপ করে আর নাতি আগলে কাটালেন। 

সকালে ঘুম থেকে উঠে হারুর রাগ গলে জল। বড় সোহাগে দরজা খুলে বউকে ঘরে নিয়ে এল সে। সারা রাত কাঠ হয়ে দাওয়ায় বসে ছিল বউ। কেঁদে কেঁদে চোখের জল শুকিয়ে গেছে, মুখ ফুলে গেছে, আর তা দেখে হারুর প্রাণটা হুহু করে ওঠে। পরম যত্নে বউকে খাটে শুইয়ে দিল হারু। তারপর তার মাথায় হাত বোলাতে বোলাতে বলল – “তুই তো জানিস আমার রাগ হয়ে যায়। কেন কাল আমায় খোঁচা দিয়ে ওসব বললি? তুই ছাড়া আমার আর কে আছে বল? আর তুই যদি পরপুরুষের নাম নিয়ে আমার পেছনে লাগিস আমার কি ভালো লাগবে?”। এই বলতে বলতে হারু বউয়ের ঠোঁটে ঠোঁট রাখে আর আলতো করে ডান হাতটা দিয়ে বউয়ের বুকটা চেপে ধরে। বউয়ের গা থেকে আগের রাতের আধখোলা বেনারসি শাড়ি হারু সযত্নে সরিয়ে রাখে। তারপর শায়া, ব্লাউজ খুলতে খুলতে অনেক প্রেমের কথা বলে। কিন্তু বউ বিছানায় মন্ত্রমুগ্ধের মত শুয়ে একান্ত চিত্তে কড়িকাঠের দিকে চেয়ে আছে। হারুর বাঁ হাত আস্তে আস্তে বউয়ের দু’পায়ের ফাকের গহ্বরে ঢুকে যায় কিন্তু বউয়ের কড়িকাঠ থেকে চোখ সরে না। হারু বুঝতে পারে আজ যাত্রা পথ তত মসৃণ নয় কিন্তু সে থামে না। কাঠে কাঠে ঘসা লাগার আওয়াজে সারা ঘর গমগম করে ওঠে। বউ কড়িকাঠ গুনতে থাকে। একসময় কাঠের আওয়াজ আর হারুর আওয়াজ এক হয়ে যায়, সে সজোরে বউয়ের বুক টিপে ধরে। আর সে মুহুর্তেই বাঁধ ভাঙ্গা স্রোতের মত, বাতাস লাগা নদীর ঢেউয়ের মত, বউয়ের বুক থেকে দুধ উপচে পরে। খাট ভেসে যায়, ঘর ভেসে যায়। সে জোয়ারের এমন টান যে দাওয়া ছাড়িয়ে সারা উঠোন ঢেকে যায় সাদা ঘন তরলে। কড়িকাঠ গুনতে গুনতে বউের মনে পড়ে তার বিয়ের দিনের কথা। এ বাড়িতে পা রাখতেই তার মাতৃতুল্য শাশুড়ি তাকে উনুনে উপচে পরা দুধ, কলশী ভর্তি জল আর বাসন ভর্তি খাবার দেখিয়ে বলেছিল – “এই নাও বউ, তোমার ভরা সংসার”।

হারুর বউ মরেছিল কালাজ্বরে। প্রচুর চেষ্টা করেও হারু তাকে বাঁচাতে পারেনি। বউ মারা যাবার পর সে এক বছর শোক করেছে, আমিষ খাওয়া ছেড়ে দিয়েছে। তারপর বউয়ের প্রথম বাৎসরিকে গঙ্গা স্নান সেরে হারু শোক শেষ করে। এরও ঠিক সাত মাস পরে হারুর বাড়িতে পুলিশ আসে। বাড়িতে কান্নার রোল পরে যায়। দুই ছেলে অনেক হাতে পায়ে ধরেও বাপের অ্যারেস্ট আটকাতে পারে নি। অবশেষে উকিলের মাধ্যমে জানা গেল হারু নাকি দু’বছর আগে পাশের গ্রাম থেকে তিন বিঘা জমি কিনেছিল বউয়ের নামে বাগানবাড়ি করবে বলে। সেই জমি এক চাষা খুব কম দামে বিক্রি করে হারুর কাছে। তার দুইকূলে কেউ নেই তাই সে জমি বিক্রি করে দূরদেশে ছোট ভাইয়ের কাছে চলে যাবে। যেটুকু টাকা পাবে তাই দিয়ে তার হেসেখেলে চলে যাবে। কিন্তু সমস্যা হয় চাষার দুই গরুকে নিয়ে। এই গরু দু’টি চাষার বড়ই প্রিয়। হাল চালালেও গরু দু’টিকে দেখে বোঝার জো নেই যে তারা খেটে খায়। হারুরও প্রথম দর্শনেই পছন্দ হয়ে গিয়েছিল ওই গরু দু’টি। বাড়িতে এসে বলতেই বউ রাজি হয়ে যায় গরু দু’টি রাখতে। বাগানবাড়িতে নিজেদের দু’টি গরু থাকলে দোষ কী? হারু লোক লাগিয়ে দেয় বাগানবাড়ি তৈরি করতে কিন্তু ওদিকে বউয়েরও শরীর খারাপ হল মাস তিনেকের মধ্যে। হারু ভুলেই গেল গরু দু’টির কথা। তারপর হারুর বউ মরল এবং মাস চারেকের মধ্যে হারু খবর পেল যে অন্য জমিতে ঘাস খাচ্ছিল বলে সেই জমির মালিক হারুর গরু দু’টিকে এমন লাঠির ঘা মেরেছে যে তারা তক্ষুনি প্রাণত্যাগ করেছে। 

এ খবর পেয়ে হারু আর মাথা ঠিক রাখতে পারেনি। ওই হারুর জীবনের শেষ রাগ। দিকবিদিকশূন্য হারু সেদিনই ছুটেছিল গরু দু’টিকে দেখবে বলে। কিন্তু দেখা মিলল শুধু তাদের লাশের। রাগে আগুন হারু নতুন দালানের একপাশে পরে থাকা নারকোল কাটার দাঁ নিয়ে ধেয়ে গেল সেই অন্য জমির মালিকের উদ্দেশ্যে। এই গ্রামে হারুকে তেমন কেউ চেনে না। তাই কারো সন্দেহ হল না। কেউ তাকে আটকাতেও এল না। হারু দেখল লোকটি তার জমির এক কোণে বসে রোদ পোয়াচ্ছে আর তার ছাগলগুলো চরে বেড়াচ্ছে। আশেপাশে আর কোন লোকজন নেই। রাগে অন্ধ হারু পেছন থেকে গিয়ে এক কোপে লোকটির গলা নামিয়ে দেয়।

অপর পক্ষের উকিল বলেছিল যে হারু তারপর নাকি ওই লোকটার লাশ তার জমিতে পুঁতে দেয়। হারুর উকিল তর্ক করার চেষ্টা করেছিল যে এটা প্রায় অসম্ভব কারণ হারু একা ছিল আর খটখটে রোদ্দুরে এরকম খুন করে পালিয়ে যাওয়া কোনোভাবেই সম্ভব নয়। কিন্তু সেই অন্য জমির মালিকের পরিবার বেশ ক্ষমতাশালী আর তাদের উকিলও বেশ জাঁদরেল। তারা প্রমাণ করল যে হারু শুধু লোকটিকে নয়, তার চারটি ছাগলও মেরেছে। তারা এও প্রমাণ করল যে হারু প্রায় একা হাতে মাইলখানেক মুণ্ডুহীন এই লাশ টানতে টানতে নিজের নতুন দালানের কাছে নিয়ে যায়। তারপর বাড়ির পেছনের দিকটায়, যেখানে হারু বউয়ের জন্য ফুলের বাগান করবে ভেবেছিল, সেখানে নিয়ে গিয়ে পুঁতে রেখে আসে। লোকটার মুণ্ডু কিন্তু এখনও পাওয়া যায়নি। জজ সাহেব বলেছিলেন যদি হারু তার দোষ স্বীকার করে নেয় এবং বলে যে সে লোকটির কাটা মুণ্ডুটি কোথায় রেখেছে তাহলে হারু মৃত্যুদণ্ড থেকে রেহাই পেতে পারে। 

কিন্তু হারুর এতদিনে রাগ পড়েছে। জজ সাহেবের কথায়, অপর পক্ষের উকিলের কথায়, এমনকি অন্য জমির মালিকের বাড়ির লোকেদের তার প্রতি দোষারোপেও হারুর আর রাগ হল না। জজ সাহেব হারুর ফাঁসির হুকুম দিলেন, তার ছেলেরা কেঁদে ভাসাল, তার মা মূর্ছা গেল। গ্রামের সবাই হতবাক। সবাই ভাবল যে হারু কোনো বড় এক ষড়যন্ত্রের শিকার হয়েছে। এ সমস্ত দোষারোপ মিথ্যে। কিন্তু হারু নিজেই এমন হাল ছেড়ে দিয়েছে যে কিছুই করা গেল না। সে যেন প্রায় স্বীকার করে নিয়েছে তার ভবিতব্য। আর তাই, যেদিন তার ফাঁসি হল, এই গ্রামে সবাই শুনল, বারবার মূর্ছা যাবার আর জ্ঞান হবার মধ্যে হারুর মা ডুকরে কাঁদছেন আর বলছেন – “আমার ছেলেটার সব ভালো ছিল, শুধু যদি রাগটা একটু কম হত। একটু যদি কম রাগত ছেলেটা”!

হারু জানত তার বাঁচার কোনো আশা নেই। তবে কি হারু সেইদিনই মারা গিয়েছিল যেদিন জজ সাহেব ফাঁসির হুকুম দিয়ে তাকে জেলে ফেরত পাঠালেন? নাকি তার পর থেকে প্রতিদিন নতুন করে তাকে মরতে হয়েছে সম্ভাব্য মৃত্যুর হাতছানিতে? ফাঁসির দিন তাহলে কে মরেছিল? হারু, নাকি হারু নামে কোনো এক শরীর? প্রাণ না থাকলে শরীরের অস্তিত্ব থাকে কি? আবার রক্ত-মাংসে গড়া এই শরীর, উপলব্ধির মাধ্যমে যে প্রাণকে জিইয়ে রাখে, সেই শরীর না থাকলে প্রাণেরই বা কী অস্তিত্ব? কেউ কিছুই বুঝতে পারে না। হারু যে ফাঁসিতে মরবে তা প্রায় এক বছর ধরে লোকেদের জানা। কিন্তু তাও, তার মৃত্যুতে আজ এই গ্রাম থমথমে। এই গ্রামে আজ অব্দি কারো ফাঁসি হয়নি। ছোট খাটো চুরি ডাকাতির জন্য জেল হাজত, জালিয়াতির জন্য মামলা, হাঁসমুরগি চুরি করে পঞ্চায়েতে ঝাড় খাওয়া এসব তো চলতেই থাকে। কিন্তু ফাঁসি কারো হয়নি। 

শেয়ার করুন

2 thoughts on “হারুর মৃত্যুদণ্ড”

  1. arundhati

    Brilliant story. Each sentence is constructed with so much care – and each sequence leading to the next – with such precision. Loved it.

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *