আলজিরিয়ার পর্দামুক্তি

ফ্রানৎস ফ্যানন সারা পৃথিবীতে সাম্রাজ্যবাদ, ঔপনিবেশিকতা, বর্ণবিদ্বেষ এবং আধিপত্যবাদ বিরোধী লড়াইয়ের আঙিনায় এক উজ্জ্বল নাম। ফ্যানন জন্মগ্রহণ করেন ফরাসী উপনিবেশ মার্টিনিক-এ, যা তাঁকে সাম্রাজ্যবাদী শক্তির বাস্তবতা সম্পর্কে প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার মুখোমুখি করে। শুধু দার্শনিক হিসাবেই নয়, বিভিন্ন গণ আন্দোলনের শরিক হয়েও ফ্যানন আজীবন লড়াই করেছেন সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে, জন্ম দিয়েছেন বিপ্লবী ভাবধারার। অনুপ্রাণিত করেছেন অসংখ্য প্রান্তিক জাতি-গোষ্ঠীর মানুষকে। ব্ল্যাক স্কিন, হোয়াইট মাস্ক (কালো চামড়া, সাদা মুখোশ), দ্য রেচেড অব দ্য আর্থ (পৃথিবীর কাঙাল মানুষেরা) ইত্যাদি লেখায় বারবার শ্বেতাঙ্গ আধিপত্যবাদকে আক্রমণ করেছেন ফ্যানন, সাথে সাথে নিপীড়িত মানুষের সংগ্রামের কথা বলেছেন। সাম্রাজ্যবাদ কীভাবে শুধুই দেশ বা বাসভূমির ওপরেই নয়, তাঁর সাথে মানুষের মননেও গভীর ছাপ ফেলে – সে বিষয়ে ফ্যাননের পর্যালোচনা ছিল চির সতর্ক। তাই বারবারই সাম্রাজ্যবাদের হাত কীভাবে দেশের কাঁটাতার পেরিয়ে মানুষের ভাষা, সত্তা, সংস্কৃতি, চিন্তা – সমস্তকিছুর ওপরেই নিয়ন্ত্রণের থাবা বসায়, সে কথা উঠে এসেছে ফ্যাননের লেখায়।

তিনি ছিলেন এমন একজন দার্শনিক যিনি নিজের জীবনে বৌদ্ধিক-রাজনৈতিক তত্ত্ব আর বিপ্লবী কর্মকান্ডের মেলবন্ধন ঘটাতে পেরেছিলেন; শুধুই বইয়ের পাতায় আবদ্ধ না থেকে তিনি তাঁর সংগ্রামী চেতনাকে কাজে লাগিয়েছিলেন বিভিন্ন গণআন্দোলনে প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণের মাধ্যমে। অপরদিকে, নিজের জীবনে ফরাসী উপনিবেশের কৃষ্ণাঙ্গ মানুষ হিসাবে সাম্রাজ্যবাদের যে রূপ তিনি দেখেছিলেন, ব্যক্তিগত স্তর পেরিয়ে সে সাম্রাজ্যবাদের ভয়াবহ রূপ তিনি দেখতে পেরেছিলেন সারা পৃথিবীর অসংখ্য অবদমিত জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে। তাই ফ্যানন আলজিরিয়ার ফরাসী আধিপত্যবিরোধী স্বাধীনতা সংগ্রামকে জোরালো সমর্থন জানান। তিনি আলজিরিয় লিবারেশন ফ্রন্টের সদস্যও ছিলেন। ফ্যাননকে মনে রেখে তাঁর একটি মৃত উপনিবেশিকতাবাদ (আ ডায়িং কলোনিয়ালিজম) গ্রন্থের “আলজিরিয়ার পর্দামুক্তি” (“আলজিরিয়া আনভেলড”) প্রবন্ধটির নির্বাচিত অংশ অনূদিত হল। পরবর্তীকালে এই লেখার প্রেক্ষিতে কিছু আলোচক অবশ্য এ কথা বলেছেন যে এই লেখায় আলজিরিয় মহিলাদের এজেন্সি বা স্বাধীন সত্তার প্রশ্নকে যথেষ্ট গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। তবুও, সাম্রাজ্যবাদ, আধিপত্যবাদ এবং উপনিবেশিকতাবাদ বিরোধী সংগ্রামের পর্যালোচনায় যেখানে সাধারণভাবে নারীপ্রশ্ন উহ্যই থেকে যায়, সেখানে আলজিরিয়ার নারী, তাদের প্রতি ঔপনিবেশিক দৃষ্টিভঙ্গি, নারী প্রতিরোধ ইত্যাদি ঘটনার সঙ্গে আলজিরিয়ার মুক্তির অঙ্গাঙ্গী সম্পর্ককে তুলে ধরে ফ্যাননের এই লেখা। জুলাই মাসে, তাঁর জন্মের বিপ্লবী উদযাপনে তাই এই দার্শনিককে ফিরে দেখা।

আলজিরিয়ার পর্দামুক্তি (নির্বাচিত অংশ)

ফ্রানৎস ফ্যানন

   একটা সমাজে মানুষ কীভাবে জামাকাপড় পরে, তাদের রীতিনীতি কোন ধরনের পোশাক বা গয়নাগাটির ব্যবহার অনুমোদন করে – এইসবই সেই সমাজের সবচেয়ে স্বতন্ত্র অভিনবত্বগুলোকে তুলে ধরে। স্বতন্ত্র মানে এক্ষেত্রে সবচেয়ে সহজে বোঝা যায় এরকম। কাপড়জামার সাধারণ ধরনের মধ্যে অবশ্যই খুঁটিনাটির পার্থক্য থাকে, আধুনিক সমাজে আমরা যে ধরনের উদ্ভাবনকে ফ্যাশান বলে অভিহিত করে থাকি। কিন্তু তার প্রভাবও মোটের উপর সমসত্ত্বভাবেই ছড়ায়, আর বাস্তবিকই সভ্যতা সংস্কৃতির বিশাল এলাকাকে পুরুষ আর মহিলাদের পোশাকের বিশেষ বিশেষ অভিনব ধরনের উপর ভিত্তি করে একত্রিত করে ফেলা সম্ভব।

   লিখিত বিবরণ হোক, বা ছবি বা সিনেমা – জামাকাপড়ের মাধ্যমেই যেকোনো সমাজের ধরনকে আমরা প্রথম চিনে উঠি। তাই এমন সব সভ্যতার অস্তিত্ব আমরা জানতে পারি যেখানে টাই পরার চল নেই, বা কটিবস্ত্রের চল আছে, বা কেউ যেখানে টুপি পরে না। কেউ কোন জাতীয় সংস্কৃতির অংশ, তাও সাধারণত তার পোশাকের ধরন দেখেই চেনা যায়। উদাহরণস্বরূপ বললে, আরব দুনিয়ায় মহিলারা যে ধরনের পর্দা ব্যবহার করেন তা পর্যটকদের চোখে এক নজরেই ধরা পড়ে। মুসলমানরা শুয়োরের মাংস খান না, বা রমজান মাসে যৌন সংসর্গ থেকে দূরে থাকেন – এই জাতীয় কথা কেউ দীর্ঘদিনেও না জেনে উঠে থাকতে পারেন। কিন্তু আরব মহিলারা পর্দা ব্যবহার করেন, এই ঘটনা এত নিয়মিত চোখের সামনে ঘটে চলে যে শুধু তা দিয়েই সাধারণত আরব সমাজকে আলাদা করে ফেলা যায়। 

   আরবি মাঘরেবে পর্দার ব্যবহার তিউনিশিয়া, আলজিরিয়া, মরক্কো আর লিবিয়ার জাতীয় পোশাকের ধারার অংশ। কোনো বিদেশী বা পর্যটকের কাছে এই পর্দা আলজিরিয়ার সমাজ আর আলজিরিয় নারী উভয়কেই আলাদা করে দেয়।1 আলজিরিয় পুরুষের ক্ষেত্রে কিন্তু এলাকাভিত্তিক পার্থক্য চোখে পড়ে – শহুরে এলাকায় ফেজ, গ্রামীণ এলাকায় পাগড়ি আর জেলাবার প্রাধান্য। পুরুষের পোশাক এক্ষেত্রে খানিকটা বেছে নেবার সুযোগ, আলাদা হবার সম্ভাবনা দেয়। কিন্তু উল্টোদিকে মেয়েদের সাদা পর্দা আলজিরিয় নারী সমাজকে নিয়ে ইতিমধ্যেই যে ধারণা, ক্রমাগত তাকেই আরো পোক্ত করে তোলে। আমরা এখানে এমন এক ইউনিফর্ম খুঁজে পাই যা কোনো অদলবদল, কোনো রকমফের মেনে নেয় না।2

   খুব স্পষ্টতই এই পর্দা বা “হেইক” আলজিরিয় ঔপনিবেশিক সমাজের সীমা নির্দেশ করে। বাচ্চা মেয়ের ক্ষেত্রে হয়তো দ্বিধা থেকে যেতে পারে, কিন্তু সেই মেয়ে যখন বয়ঃসন্ধিতে পৌঁছচ্ছে ততদিনে সমস্ত অনিশ্চয়তা মুছে যাচ্ছে। পর্দার সঙ্গে সঙ্গে সব কিছু নিয়মমাফিক হয়ে পড়ছে। বাইরের দর্শকের কাছে একজন আলজিরিয় মহিলা হয়ে উঠছেন “পর্দার আড়ালে লুকানো নারী”। 

   এই প্রবন্ধে আমরা দেখব যে আলজিরিয় পোশাকের এই পর্দার ধারাই কেমন করে এক বিশাল যুদ্ধের কেন্দ্র হয়ে ওঠে, একদিকে যাকে কেন্দ্র করে ঔপনিবেশিকরা তাদের বহুধা শক্তিশালী আক্রমণ শানায়, আবার যার বিরুদ্ধে পরাধীন জনগণ এক বিস্ময়কর জাড্যের নিদর্শন দেখায়। মোটের উপর ভাবলে, ঔপনিবেশিক সমাজ, তার বিশ্বাস, ক্ষমতা, দর্শন, সব নিয়ে পর্দার ধারণার প্রতি একপ্রকার সমসত্ত্ব গোছেরই প্রতিক্রিয়া জানিয়েছিল। এ নিয়ে চূড়ান্ত যুদ্ধ ১৯৫৪-র আগেই শুরু হয়ে যায়, আরো ভালো করে বললে ১৯৩০এর দশকের গোড়ার দিক থেকেই শুরু হয়। ফরাসি সরকারের আধিকারিকদের লক্ষ্য ছিল আলজিরিয়দের যা কিছু মৌলিক তা নষ্ট করতে হবে। তাঁদের উপর নির্দেশ ছিল যে যে ধরনের অস্তিত্ব কোনো জাতীয় বাস্তবতার জন্ম দিতে পারে, তাকেই ধ্বংস করে দিতে হবে। এমতাবস্থায় তাঁরা তাঁদের লক্ষ্য হিসাবে পর্দাকেই স্থির করেন, সেই সময়ে দাঁড়িয়ে যা আলজিরিয় মহিলাদের সামাজিক অবস্থার সূচক হিসাবেই চিহ্নিত ছিল। এই অবস্থান কোনো হঠকারী সিদ্ধান্ত ছিল না। সমাজতত্ত্ববিদ আর নৃতত্ত্ববিদদের গবেষণার উপর ভর করেই তথাকথিত “নেটিভ” বিষয়ের পারদর্শীরা আর আরব সংক্রান্ত অফিসের কর্ণধাররা তাঁদের কর্মনীতি স্থির করেন। প্রথমদিকে তাঁদের লক্ষ্য ছিল সহজ, “প্রথমে মহিলাদের আমাদের পক্ষে নিয়ে আসি, তাহলে বাকিরাও চলে আসবে।” 

   বিশেষজ্ঞরা বললেন, আলজিরিয়ার সমাজের পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থার ভিতরে রয়েছে এক মাতৃতান্ত্রিক নির্যাস। পশ্চিমীরা বহুবার আরব সমাজকে নিয়মানুগ বলে বর্ণনা করেছেন, আনুষ্ঠানিকতার গুরুত্ব যেখানে অপরিসীম। এই বিচারে একজন আলজিরিয় মহিলা, সমাজ আর তার রীতিনীতির পিছনে যে অজ্ঞাত শক্তি সেই দুইয়ের মধ্যেকার মধ্যস্থতাকারী হিসাবে এক মৌলিক গুরুত্ব খুঁজে পেলেন। রোজকার দৃশ্যমান পুরুষতন্ত্রের ভিতরে আরো গুরুত্বপূর্ণ এক মৌলিক মাতৃতন্ত্রের ধারার ধারণা প্রতিষ্ঠা পেল। আলজিরিয়ান সমাজে মা, ঠাকুমা, পিসিমা আর “বুড়ি”র ভূমিকা আবিষ্কৃত আর সংজ্ঞায়িত হল। 

   এর ফলে ঔপনিবেশিক শাসনব্যবস্থা খুব নির্দিষ্ট একটা রাজনৈতিক তত্ত্ব খাড়া করতে পারল, “আমরা যদি আলজিরিয় সমাজের কাঠামোকে, তার প্রতিরোধের ক্ষমতাকে ধ্বংস করতে চাই, তাহলে সবার আগে আলজিরিয় নারীকে জয় করতে হবে। তাদের পর্দার পিছনে গিয়ে আমাদের তাদের টেনে আনতে হবে, পুরুষরা তাদের যে বাড়ির ভিতরে লুকিয়ে রাখে সেখান থেকে বের করে আনতে হবে।” এবং সেই অনুযায়ী আলজিরিয় সমাজে নারীর অবস্থাই শাসনব্যবস্থার কাজকর্মের মূল প্রতিপাদ্য হিসাবে গৃহীত হল। প্রশাসন শপথ নিল যে এই লাঞ্ছিত, নিঃসঙ্গ, গৃহবন্দী নারীকে রক্ষা করতে হবে। তারা নারীর বিশাল সম্ভাবনার ক্ষেত্রকে বর্ণনা করল – যে নারীকে আলজিরিয় পুরুষ এক জড়, মূল্যহীন, এমনকি মনুষ্যত্বহীন বস্তুপিণ্ডে পরিণত করে রেখেছে। আলজিরিয়দের ব্যবহার তিরস্কৃত হল, তাদের সমাজ মধ্যযুগীয় বর্বর বলে বর্ণিত হল। সূক্ষ্ম বিজ্ঞানের সাহচর্যে মহিলাদের প্রতি আলজিরিয়দের “নিষ্ঠুর, রক্তচোষা” প্রবৃত্তির বিরুদ্ধে যুক্তি খাড়া করা হল। আলজিরিয়দের পারিবারিক জীবনকে কেন্দ্র করে শাসকশ্রেণী তৈরি করে ফেলল বিচার, মূল্যায়ণ, যুক্তি আর নানা উদাহরণের পাহাড়। লক্ষ্য তার একটাই, আলজিরিয়ার মানুষকে অপরাধবোধের গণ্ডিতে বেঁধে ফেলা। 

   আলজিরিয় মহিলাদের সঙ্গে সংহতি জানাতে, তাদের সাহায্যের জন্য অজস্র সংগঠন গড়ে উঠল। নানাভাবে ক্ষোভ দুঃখ ব্যক্ত হল – “আলজিরিয়রা মহিলাদের যে ভাগ্যে সঁপে দিচ্ছে, আমরা চাই তার জন্য তারা লজ্জা বোধ করুক।” এই গোটা সময়টাই ছিল চরম উত্তেজনার, আলজিরিয় সমাজে প্রবেশ করতে পারার জন্য নতুন নানা কায়দা প্রযুক্ত হচ্ছিল। দলে দলে সমাজকর্মী, মহিলা দাতব্য কাজ করতে আরব এলাকাগুলোতে হানা দিতে থাকলেন।

   এই উৎসাহের প্রথম শিকার হন দরিদ্র, ক্ষুধার্ত মহিলারা। প্রতি কিলো গমের গুঁড়ো ত্রাণের সঙ্গে তাঁদের পর্দাপ্রথার বিরুদ্ধে নানা জ্ঞান দেওয়া হতে থাকল। আর সঙ্গে নানা ব্যবহারিক উপদেশ। তাঁদের আলজেরিয়ার মহিলাদের অবস্থা পরিবর্তনে “কার্যকরী, কেন্দ্রীয় ভূমিকা” পালন করার জন্য আমন্ত্রণ জানানো হল। শতাব্দীপ্রাচীন নিপীড়নের চিহ্নের বিরুদ্ধে বলে ওঠবার জন্য জোর করা হল। যে বিশাল ভূমিকা পালনের জন্য তাঁদের আহ্বান জানানো হচ্ছে, তা তাঁদের কাছে বিস্তারিত ব্যাখ্যা করা হল। ঔপনিবেশিক কর্তৃপক্ষ এই সংগ্রামে বিপুল পরিমাণে অর্থ নিয়োগ করলেন। আলজিরিয় মহিলারাই আলজিরিয়ার সমাজের মূল সূত্র – এই ধারণা প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেলে পরে তাঁদের উপর নিয়ন্ত্রণ কায়েম করার জন্য সমস্তরকম চেষ্টা করা হতে থাকল। নিশ্চিত করা হল যাতে আলজিরিয়রা এ নিয়ে বিশেষ নড়াচড়া না করে – প্রাথমিকভাবে তারা শাসকের হাতে এই সংস্কৃতি ধ্বংসের চেষ্টার বিরোধিতা করবে, আত্তীকরণ আটকানোর চেষ্টা করবে, কিন্তু আলজিরিয় নারী ঘুরে গেলেই সেই চেষ্টা পাল্টে যাবে। ঔপনিবেশিক কর্মকাণ্ডে এইভাবে আলজিরিয় মহিলার হাতেই আলজিরিয় পুরুষকে জাগিয়ে তোলবার ঐতিহাসিক ভার ন্যস্ত করা হল। পশ্চিমী মূল্যবোধ দিয়ে নারীকে জয় করে, তাঁর সামাজিক অবস্থান থেকে তাঁকে ছিনিয়ে এনে মুক্ত করা এইভাবে হয়ে উঠল পুরুষের উপরে ক্ষমতা কায়েম করার মাধ্যম। আর একইসঙ্গে আলজিরিয় সংস্কৃতিকে ধ্বংস করার ব্যবহারিক, কার্যকরী উপায়। 

…..

   শাসক শক্তি তাদের মনোযোগের বেশিরভাগ আলজিরিয় মহিলাদের পর্দার ব্যবহারের উপর নিযুক্ত করেছিল, তার ফলে স্বাভাবিকভাবেই তাতে খানিক সাফল্যও আসে। কয়েকটি ক্ষেত্রে তাই এরকম উদাহরণ দেখা গেল যেখানে একজন মহিলাকে “বাঁচানো” গেল, আর প্রতীকীভাবে তাঁর পর্দা উন্মোচন করে দেওয়া হল। 

   এই পর্দাহীন উন্মুক্ত দেহের মহিলারা আলজিরিয়ার ইয়োরোপীয় সমাজে ছড়িয়ে পড়লেন। যেখানেই তাঁরা যেতেন, তাঁদের ঘিরে এক নতুন আবহ গড়ে উঠত। বিজয়োল্লাসে উচ্ছ্বসিত ইয়োরোপীয়রা অতি উৎসাহের ঘোরে এই প্রায়-ধর্মান্তকরণের মানসিক দিক নিয়ে আলোচনা করতেন। শুধু তাই না, যাঁরা এই “ধর্মান্তকরণ” সফলভাবে করতে পারতেন, ইয়োরোপীয় সমাজে তাঁদেরও খুব উঁচু নজরে দেখা হত, কর্তৃপক্ষের সুনজর থেকেও তাঁরা বঞ্চিত হতেন না। 

   প্রতিটা সাফল্যের পর কর্তৃপক্ষ আরো নিশ্চিত হতেন, যে আলজিরিয় নারীই আলজিরিয়ার সমাজে পশ্চিমী দুনিয়ার ঢোকার চাবিকাঠি হয়ে উঠবে। প্রতিটা পরিত্যক্ত পর্দা ঔপনিবেশিকদের সামনে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে দিত, আলজিরিয়ার প্রকৃত সত্ত্বা খণ্ড খণ্ড করে উদঘাটন করে দিত। প্রতিটা পর্দা ত্যাগের সঙ্গে শাসকশ্রেণীর আগ্রাসন, তাদের আশা, দশগুণ করে বেড়ে যেত। এক একজন নতুন বেপর্দা নারী, শাসকের কাছে এক নতুন আলজিরিয় সমাজের বার্তা পাঠাত যে – সমাজের রক্ষণশীলতার বাঁধগুলো ভেঙে পড়তে শুরু করেছে। 

   প্রতিটা পর্দা, চিরাচরিত হেইক থেকে উন্মুক্ত প্রতিটা শরীর, শাসকের অধৈর্য্য চাউনির সামনে উন্মীলিত প্রতিটা মুখ, প্রমাণ করে দিচ্ছিল যে আলজিরিয়া নিজেকে পরিত্যাগ করছে, ঔপনিবেশিক ধর্ষণ মেনে নিতে শুরু করেছে। প্রতিটা উন্মোচিত পর্দার মাধ্যমে আলজিরিয়া যেন মনিবের ইশকুল থেকে পাঠ নেবার ইচ্ছা, শাসকের নির্দেশে শাসকের উৎসাহে নিজের অভ্যেস পাল্টানোর ইচ্ছাকে প্রকাশ করে দিচ্ছিল। 

   আমরা ইতিমধ্যেই দেখিয়েছি ঔপনিবেশিক সমাজে শাসক কী আঙ্গিকে পর্দাকে দেখে। আর এও দেখেছি প্রতিষ্ঠান হিসাবে কীভাবে তারা ঔপনিবেশিক সমাজের থেকে আসা বাধাগুলোকে অতিক্রম করার চেষ্টা করেছিল। প্রাতিষ্ঠানিক স্তর থেকে ব্যক্তিস্তরে বিচার করতে গেলে, একজন ইয়োরোপীয় ব্যক্তি পর্দার প্রেক্ষিতে কী কী প্রতিক্রিয়া দেখাতে পারেন তা  নিয়ে খানিক আলোচনা করা চিত্তাকর্ষক হতে পারে। 

   যে ইয়োরোপীয়রা এই “ধর্মান্তকরণের” সঙ্গে সরাসরি যুক্ত নন, তাঁদের থেকে আমরা কী ধরনের প্রতিক্রিয়া পাই? 

   মূলত এক ধরনের ভাবালু, রোম্যান্টিক রোমাঞ্চ, যার মধ্যে একটা বড় অংশে যৌন আবেদনের প্রভাব রয়েছে। 

   অর্থাৎ, প্রাথমিক ভাবে ভাবলে, পর্দার আড়ালে সৌন্দর্য লুকিয়ে রয়েছে। এই ধরনের ভাবনার এক উল্লেখযোগ্য নমুনা হিসাবে আলজিরিয়া থেকে ফিরে আসা এক ইয়োরোপীয়র বয়ান পেশ করছি। পেশায় আইনজ্ঞ হবার সুবাদে তিনি কয়েকজন আলজিরিয় মহিলাকে পর্দা ছাড়া দেখবার সুযোগ পেয়েছিলেন। আলজিরিয় পুরুষ সম্পর্কে বলতে গিয়ে তিনি বলেছিলেন – এই লোকগুলো এমন অদ্ভুত সৌন্দর্য লুকিয়ে রাখবার দোষে দোষী। তাঁর সিদ্ধান্ত ছিল এই যে, যে জাতির ভাণ্ডারে এমন ধন, প্রকৃতির এমন সব নিখুঁত সৌন্দর্য লুকিয়ে রয়েছে – তাদের দায়িত্ব একে বাইরের দুনিয়ার কাছে প্রকাশ করা, দেখানো। তিনি এও জানিয়েছিলেন যে আর কোনো উপায় না থাকলে, আলজিরিয়দের সে কাজে বাধ্য করাও যেতে পারে। 

   একগাছি চুলের রেখা, কপালের একটুখানি, ট্রামে ট্রেনে দেখা “অপূর্ব সুন্দর” মুখের খানিকটা অংশ। আলজিরিয় নারী সব মহিলাদের মধ্যে রাণী – একজন ইয়োরোপীয়র এই অযৌক্তিক বিশ্বাসকে জিইয়ে রাখার, বাড়তে দেবার জন্য শুধু এইটুকুই যথেষ্ট হয়ে উঠতে পারে।

   এর বাইরেও একজন ইয়োরোপীয়ের মধ্যে একধরনের আগ্রাসন, আলজিরিয় নারীর প্রতি এক ধরনের হিংসাত্মক মনোভাব রয়েছে। আলজিরিয় মহিলাকে বেপর্দা করা মানে তাঁর সৌন্দর্যের প্রকাশ করানো, তাঁর গোপনীয়তা উন্মোচন, তাঁর বাধা চুরমার করে দেওয়া, নিজের অ্যাডভেঞ্চারের জন্য তাঁকে সুলভ করে তোলা। মুখ লোকানো মানে তার মধ্যে নিশ্চয় গোপন কিছু রয়েছে, এক লুকানো রহস্যময় দুনিয়ার আভাস। অদ্ভুতভাবে, ইয়োরোপীয় ব্যক্তিটির সঙ্গে আলজিরিয় নারীর সম্পর্ক এক অত্যন্ত জটিল স্তরে প্রতিভাত হচ্ছে। এই সম্পর্কের মধ্যে থেকে যাচ্ছে ইয়োরোপীয়র পক্ষ থেকে মহিলাটিকে নিজের ধরাছোঁয়ার মধ্যে, নিজের ভোগের সম্ভাবনার ক্ষেত্রে নিয়ে আসার ইচ্ছা। 

   যে মহিলা নিজে অন্যের দৃষ্টির অগোচরে থেকে অন্যকে দেখেন, তিনি ঔপনিবেশিকের আশঙ্কার কারণ হয়ে ওঠেন। তাঁর মধ্যে কোনো দেওয়া নেওয়ার ইচ্ছা নেই। তিনি নিজেকে ঔপনিবেশিকের হাতে সঁপে দিচ্ছেন না। একজন আলজিরিয় পুরুষ আলজিরিয় নারীকে কীভাবে দেখছেন তার মধ্যে খুব একটা অস্পষ্টতার সুযোগ নেই। তিনি সেই মহিলাকে দেখছেনই না। এমনকি তাঁর মধ্যে এমন প্রবৃত্তিও রয়েছে – সেই নারীসুলভ উপস্থিতিকে না বুঝতে পারার, তাঁকে পাত্তাই না দেবার। অর্থাৎ, সাক্ষাতের যৌন আবেদনকে সাধারণভাবে যেসব চিহ্ন দিয়ে আমরা চিনে থাকি – চাউনি, দেহের ভঙ্গি, পেশীর টান – পথেঘাটে একজন আলজিরিয়র মধ্যে তার কোনো লক্ষণই নেই। 

   একজন ইয়োরোপীয় আলজিরিয় মহিলার সামনে পৌঁছে ভাবছেন যে তিনি আরো দেখতে চান। তাঁর দেখার পরিধির সীমাবদ্ধতার সামনে দাঁড়িয়ে তিনি আগ্রাসী হয়ে ওঠেন। ক্ষিপ্র গতিতে তাঁর মধ্যে বিরক্তি, আগ্রাসন বাড়তে থাকে।

   উদাহরণস্বরূপ, ডাক্তারখানায় সকালবেলার শিফট শেষ হলে প্রায়শই ইয়োরোপীয় ডাক্তারদের দেখা যায় তাঁরা হতাশা ব্যক্ত করছেন। যে সব মহিলা তাঁদের সামনে পর্দা সরিয়েছেন, তাঁরা অতি সাধারণ – তার মধ্যে রহস্যের কিছু নেই। তাঁরা ভাবেন এদের লুকানোর এত কী রয়েছে!

   ইয়োরোপীয় মহিলারা এ বিষয়ে এত ঘোরপ্যাঁচের মধ্যে জান না। তাঁরা সোজাসুজিই বলেন, যা কিছু সুন্দর তা কেউ লুকায় না। বরং তাঁরা এই অদ্ভুত প্রথার মধ্যে খুঁত লুকানোর এক “নিতান্তই নারীসুলভ” উদ্দেশ্য খুঁজে পান। এখান থেকে তারা ইয়োরোপীয় আর আলজিরিয় মহিলাদের পদ্ধতির তুলনা করেন। ইয়োরোপীয় এজন মহিলার লক্ষ্য যা খুঁত রয়েছে তাকে ঠিক করা, সাজানো, বের করে আনা (সৌন্দর্যায়ন, চুলের রকমফের, ফ্যাশান ইত্যাদির মাধ্যমে)। অপরপক্ষে আলজিরিয় একজন মহিলার লক্ষ্য হল খুঁত পর্দা দিয়ে ঢাকা, লুকানো, পুরুষের সন্দেহকে বাড়তে দেওয়া। আবার অন্য স্তরে, এমন কথাও বলা হয় যে এ সবের মূল উদ্দেশ্য খদ্দেরকে বোকা বানানো, বরং রংচঙে কাগজে মুড়লেই “সামগ্রীর” প্রকৃতি, মূল্য কোনোটাই বদলায় না। 

   আমরা ইতিমধ্যেই দেখেছি, ব্যক্তির স্তরে ভাবলে আলজিরিয়ান সমাজকে ধ্বংস করার জন্য যে ঔপনিবেশিক পরিকল্পনা, আলজিরিয় মহিলা খুব দ্রুত তার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে ওঠেন। শাসকের এই যে নাছোড়বান্দা মনোভাব, তার লড়াইয়ের পদ্ধতি – এর ফলে অবশ্যম্ভাবী ভাবে শাসিতর মধ্যে প্রতিক্রিয়াশীল আচরণের স্ফুরণ ঘটে। শাসকের হিংসার মুখে দাঁড়িয়ে প্রতিরোধ হিসাবে শাসিত তার সংস্কৃতির একটা স্থবির দিককে কেন্দ্র করে নিজের নীতিগত অবস্থান স্থির করতে শুরু করেন। আলজিরিয় নারীকে বেপর্দা করতে ঔপনিবেশিকের এই উন্মত্ততা, যে কোনো মূল্যে পর্দার বিরুদ্ধে যুদ্ধে জেতবার যে ইচ্ছা – এর ফলে পর্দাকে কেন্দ্র করেই স্থানীয় মানুষের মধ্যে এক ভীষণ প্রতিরোধ গড়ে উঠেছিল। হেইক নিয়ে ঔপনিবেশিকরা অতিমাত্রায় আগ্রাসী হয়ে উঠেছিলেন। আর তার ফলেই আলজিরিয় সমাজের এই মৃত (অর্থাৎ এক্ষেত্রে পরিবর্তনহীন) রীতিতে নতুন প্রাণসঞ্চার ঘটেছিল। আমরা এখানে ঔপনিবেশিকতার একটা মনস্তাত্ত্বিক নিয়ম দেখতে পাই। ঔপনিবেশিকের ক্রিয়াকলাপ, তার পরিকল্পনার উপরেই নির্ভর করে প্রাথমিকভাবে কোন কোন বিষয়কে কেন্দ্র করে মানুষের প্রতিরোধ সংগঠিত হবে।

   সাদা চামড়ার মানুষই নিগ্রোর সৃষ্টি করে। কিন্তু তার উত্তরে নিগ্রোই নেগ্রিচিউড আন্দোলন3 সংগঠিত করে। পর্দার বিরুদ্ধে শাসকের আঘাতের প্রতিবাদে শাসিত পর্দাপ্রথার রীতিকেই পুনঃপ্রতিষ্ঠা করে উপনিবেশ-বিরোধিতা শুরু করে। একটা গোটা সংস্কৃতির মধ্যে যা ছিল অবিচ্ছিন্ন একটা উপাদান – তা হয়ে ওঠে যেন নিষিদ্ধ কোনো বস্তু। আলজিরিয়ান মহিলার সঙ্গে পর্দার সম্পর্ক অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িয়ে যায় বৈদেশিক অধিকার নিয়ে তাঁর প্রতিক্রিয়ার সঙ্গে। ঔপনিবেশিক শাসিতর সংস্কৃতির কয়েকটি উপাদান আলাদা করে টেনে বের করে আনে – আর শাসিত সেই উপাদানগুলিকে কেন্দ্র করে হিংস্রভাবে প্রতিক্রিয়া জানায়। শাসক এক একটা উপাদানকে পাল্টানোর জন্য যে মনোযোগ দেয়, সঠিক শিক্ষার জন্য যে পরিমাণ আবেগ, প্রার্থনা, আশঙ্কা দেখায় – তা উল্টে সংস্কৃতির এই বিশেষ উপাদানগুলোকে কেন্দ্র করেই প্রতিরোধ গড়ে তোলে। ঔপনিবেশিককে এই বিশেষ উপাদানটি পাল্টাতে না দেওয়ার মানে তাকে পশ্চাদাপসরণে বাধ্য করা। এইভাবে শুধু “টিকে থাকা” হয়ে ওঠে সংঘাতের, যুদ্ধের একটা পদ্ধতি।

   স্বাধীনতা সংগ্রাম শুরু হয়ে যাবার পর পর্দা নিয়ে আলজিরিয় মহিলা আর স্থানীয় সমাজের যে মনোভাব, তাতে বড় পরিবর্তন আসে। এইসমস্ত উদ্ভাবন কোনোদিন স্বাধীনতা সংগ্রামের সরাসরি অংশ ছিল না, ফলে তাদের একটা আলাদা গুরুত্ব রয়েছে। বিপ্লবের তত্ত্ব বা লড়াইয়ের নীতি কোনোদিন পর্দা নিয়ে মতামত বা আচরণের পরিবর্তনের কথা বলেনি। এখন যখন আলজিরিয়া স্বাধীন, তখনও আমরা নিশ্চিন্তেই বলতে পারি যে এই সংক্রান্ত প্রশ্ন উঠে আসবে না। কারণ বিপ্লব করতে গিয়ে মানুষ বুঝতে পেরেছে যে, যে আন্দোলন সমস্যাটা উত্থাপন করেছিল, তার মাধ্যমেই তার নিরসন হয়েছে।

   ১৯৫৫ অবধি শুধু পুরুষরাই এই লড়াইয়ের অংশীদার ছিলেন। যুদ্ধের বৈপ্লবিক প্রকৃতি, গোপনীয়তার প্রয়োজনীয়তার জন্য পুরুষ তার সঙ্গিনীকে কিছু বলতে পারতেন না। শত্রু যখন এই ধরনের যুদ্ধের ধরনেরসঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নিতে শুরু করল, তখন নতুন নতুন সমস্যার উদ্ভব ঘটতে থাকল। তার জন্য প্রয়োজন ছিল নতুন ধরনেরসমাধানের। আলজিরিয়ার বিপ্লবে মহিলাদের অন্তর্ভুক্ত করার সিদ্ধান্তে সহজে পৌঁছনো যায়নি। তার জন্য একভাবে ভাবতে গেলে, যুদ্ধ নিয়ে যে ধারণা সেটা পর্যন্ত আমূল পাল্টাতে হয়েছিল। ঔপনিবেশিকের হিংস্রতা, নিষ্ঠুরতা, আলজিরিয়ার এলাকার প্রতি তার প্রায় পাগলের মতো  আকর্ষণ – এই সবের সামনে দাঁড়িয়ে আন্দোলনের নেতারা কিছু কিছু ধরনেরযুদ্ধকে আর সম্ভাবনার বাইরে রাখতে পারেননি। সামগ্রিক যুদ্ধের প্রয়োজনীয়তা ক্রমশই বোঝা যাচ্ছিল। তবে মহিলাদের অন্তর্ভুক্ত করার সিদ্ধান্ত শুধুমাত্র গোটা দেশকে আন্দোলনে নিযুক্ত করার লক্ষ্য নিয়ে নেওয়া হয়নি। যুদ্ধের বৈপ্লবিক চরিত্রের সঙ্গে সাযুজ্য রেখেই মহিলাদের অন্তর্ভুক্ত করা জরুরী হয়ে পড়েছিল। সহজ কথায় বললে, মহিলাদেরও পুরুষদের সমপরিমাণ ত্যাগস্বীকার করার মানসিকতা দেখাতে হত। সুতরাং যে সব সংগ্রামীরা বেশ কয়েকবার জেল খেটে এসেছেন, তাদের উপর যে বিশ্বাস রাখা হয়েছিল, মহিলাদের উপরেও সেই সমপরিমাণ বিশ্বাস রাখার দরকার পড়েছিল। মহিলাদের এক অভূতপূর্ব দৃঢ়তা, নৈতিক চরিত্র দেখানোর প্রয়োজন পড়েছিল। তা নিয়ে দ্বিধার অভাব ছিল এরকম নয়। বিপ্লবের চাকা ইতিমধ্যেই এক বিশাল আকৃতি নিয়েছিল, একটা নির্দিষ্ট দক্ষতা অর্জন করতে পেরেছিল। এই গোটা ব্যবস্থাটাকে আরো জটিল করতে হত – অর্থাৎ তার দক্ষতার উপর প্রভাব না ফেলে তাকে আরো বিস্তৃত করে তুলতে হত। মহিলাদের এক্ষেত্রে পরিবর্ত হিসাবে ভাববার কোনো জায়গা ছিল না। বরং বিপ্লবের মধ্য থেকে উঠে আসা  নতুন নতুন কার্যকলাপের সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারবে, এমন উপাদান হিসাবেই মহিলাদের কল্পনা করার দরকার হয়ে পড়েছিল।

   জেবেলের পাহাড়ে মহিলারা গেরিলাদের বিরতির সময়ে ক্ষত নিরাময়ে বা টাইফয়েড সারাতে সাহায্য করতেন। কিন্তু একেবারে বিপ্লবের অনিবার্য উপাদান হিসাবে মহিলাদের অন্তর্ভুক্তি অবশ্যই একটা সম্পূর্ণ বৈপ্লবিক পদক্ষেপ ছিল। কোনো না কোনো ক্ষেত্রে বিপ্লব তাঁদের কার্যকলাপের উপর নির্ভর করছে – এহেন সিদ্ধান্ত নেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটা সিদ্ধান্ত ছিল।

   নানা কারণে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া কঠিন ছিল। আমরা দেখেছি যে সময়ে ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ বিশেষ ছিল না, সে সময়ে আলজিরিয়ান সমাজ, এবং বিশেষত মহিলাদের মধ্যে শাসকদের থেকে পালানোর একটা প্রবণতা দেখা গেছিল। মহিলাদের বেপর্দা করার কাজে শাসকের উৎসাহ, আলজিরিয়ার সংস্কৃতির ধ্বংসের কাজে তাঁদের সহযোগী হিসাবে ব্যবহার করার এই যে ইচ্ছা – তা শাসকের চিরাচরিত আচরণের ধরনকেই আরো শক্তিশালী করে তোলে। শাসকের ধ্বংসাত্মক কার্যকলাপের পরিপ্রেক্ষিতে প্রতিরোধের নীতি হিসাবে বিচার করলে এইসমস্ত আচরণ সব মিলিয়ে ফলপ্রসূ ছিল। কিন্তু খুব স্বাভাবিকভাবেই তার কিছু খারাপ দিক তৈরি হয়। এর ফলে মহিলারা, বিশেষ করে শহুরে মহিলারা, শান্তির, আশ্বাসের জায়গাটা হারালেন। বন্ধনে অভ্যস্ত হবার পর তাঁদের দেহে মুক্ত পৃথিবীর সামনে দাঁড়ানোর মতো স্বাভাবিক নমনীয়তা ছিল না। এই যে তাঁর খানিক নিঃসঙ্গ জীবন, সেখানে আসা যাওয়া সবই জানা, নিয়ন্ত্রিত – এই বাস্তবের সামনে দাঁড়িয়ে যেকোনো তাৎক্ষণিক বিপ্লবকে অনিশ্চিত ভাবা স্বাভাবিক ছিল। রাজনৈতিক নেতারা এই সমস্যা নিয়ে পুরোপুরিই ওয়াকিবহাল ছিলেন। তাঁদের দোটানা তাঁদের সচেতনতা আর দায়িত্ববোধেরই পরিচায়ক। নিজেদের সিদ্ধান্তকে সন্দেহের চোখে দেখবার যথেষ্ট কারণ তাঁদের ছিল। তাঁদের ভয় ছিল, এমন সিদ্ধান্ত বিপ্লবের অগ্রগতির ক্ষেত্রে বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।

   এই দ্বিধাদ্বন্দ্বের সঙ্গে আরো একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় যুক্ত হয়েছিল। ঔপনিবেশিকের নিষ্ঠুরতার কথা খুব ভালোভাবেই জানতেন বলে নেতারা মহিলাদের অন্তর্ভুক্ত করার ব্যাপারে দোটানায় ভুগেছিলেন। শাসকের অপরাধ করবার ক্ষমতা যে আসলে কতদূর, তা নিয়ে বিপ্লবের নেতাদের কোনো সন্দেহ ছিল না। তাঁরা সকলেই কেউ জেলে গেছিলেন, কেউ ফরাসি পুলিশের অধীন বা ক্যাম্পের থেকে বেঁচে ফেরা মানুষদের সঙ্গে দীর্ঘসময় কথা বলেছিলেন। আলজিরিয়ান মহিলারা গ্রেপ্তার হলে যে অত্যাচার করে তাঁদের খুন করা হবে – এ কথা তাঁরা সবাই জানতেন। নিজে একটা পথ বেছে নেওয়া, আর সেই পথের সম্ভাব্য ভবিষ্যত হিসাবে অত্যাচার, খুনের সম্ভাবনা মেনে নেওয়া হয়তো তুলনামূলকভাবে খুব কঠিন নয়।  কিন্তু মৃত্যু অবশ্যম্ভাবী জেনে বুঝে অন্য কারোর জন্য সেই ভবিষ্যতই বেছে দেওয়া  আরো কঠিন। কিন্তু বিপ্লবে মহিলারা অংশগ্রহণ করবেন কিনা সেই সিদ্ধান্তটা নেওয়া ক্রমশই দরকার হয়ে পড়ছিল, আভ্যন্তরীণ বিরোধিতাও বাড়ছিল। আর প্রতিটা সিদ্ধান্ত সেই একই দ্বিধা, সেই একই হতাশার জন্ম দিচ্ছিল।

   এই সিদ্ধান্তের বৈপ্লবিক চরিত্রের উপর আবারও গুরুত্ব আরোপ করা দরকার। শুরুর দিকে শুধু বিবাহিত মহিলাদের সঙ্গেই যোগাযোগ করা হয়েছিল। কিন্তু, খুব শীঘ্রই এই সমস্ত নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হয়। যেসব বিবাহিত মহিলার স্বামীরা বিপ্লবী জঙ্গি ছিলেন, প্রথমে তাঁদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়। তারপরে আসেন বিধবা এবং ডিভোর্সি মহিলারা। প্রাথমিকভাবে অবিবাহিত মহিলাদের আন্দোলনে শামিল করা হয়নি – বিশেষত এই জন্য যে, কুড়ি বা তেইশ বছরের একজন মহিলার তাঁদের পরিবারের বাইরে সময় কাটানোর সুযোগ হয়না। কিন্তু খুব দ্রুতই বিভিন্ন কারণে সমস্ত নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া জরুরী হয়ে পড়ে। মহিলাদের স্ত্রী বা মা হিসাবে দায়িত্ব, একজন মহিলা গ্রেপ্তার হওয়া বা মারা যাওয়ার ঘটনায় সম্ভাব্য ক্ষতিকে যথাসম্ভব কম করার চেষ্টা, এবং অবিবাহিত মহিলাদের স্বেচ্ছায় যোগদানের ক্রমবর্ধমান হার – এই সবই রাজনৈতিক নেতৃত্বকে বাধ্য করে মহিলাদের উপর বিশ্বাস রেখে আন্দোলনে তাঁদের অবাধে শামিল করতে। নিষেধাজ্ঞা তুলে আন্দোলনের সপক্ষে সমস্ত আলজিরিয় মহিলার সমর্থন দাবি করা হয়।

চিত্রঋণঃ রোয়াপ, জ্যাকবিন, দ্য ফামনামবুলিস্ট ম্যাগাজিন, ফ্যানন আনভেলড।

শেয়ার করুন

Leave a Comment

Your email address will not be published.