পুঁজিবাদের বিশ্লেষণ, বিপ্লবের সংজ্ঞা: দলিত, নারী ও ক্ষেত মজুর

নারীবাদী ও দলিত আন্দোলন কর্মী গেইল ওমভেড-এর “Analysing Capitalism, Defining Revolution: Dalits, Women and Peasants” প্রবন্ধের অনুবাদ। মূল লেখাটি ১৯৮৮ সালে  Economics & Political Weekly পত্রিকায় প্রকাশিত হয়।

কিছু বুনিয়াদি বিষয় নিয়ে আলোচনা করার সময় হয়েছে। কৃষক আন্দোলন নিয়ে “ইকনমিক এণ্ড পলিটিক্যাল উইকলি” আর “ফ্রন্টিয়ার” পত্রিকায় অনেক লম্বা তর্ক-বিতর্ক চলেছে। আমি আর চেতনা গালাও সেই তর্কের অংশ ছিলাম। আমরা এই আলোচনাটা শুরু করেছিলাম কিছু কমরেড আর বন্ধুদের একটা হাতে লেখা পাণ্ডুলিপি পাঠিয়ে। পরে সেই পাণ্ডুলিপিটা সংক্ষিপ্ত আকারে ফ্রন্টিয়ার-এ প্রকাশিত হয়। সেই লেখাটায় আমরা কৃষক সমাজের শ্রেণী সংগঠন, এবং তার মাধ্যমে শেৎকরী সংগঠন আর “নব্য কৃষক আন্দোলন”-এর অন্যান্য সংগঠনদের শ্রেণীচরিত্র নিয়ে সীমিত পরিসরে আলোচনা করেছিলাম। কিন্তু অবশ্যম্ভাবী ভাবেই অন্যান্য নানা প্রাসঙ্গিক বিষয় তার পর থেকে উঠে এসেছে। কে বালগোপাল (১০ই সেপ্টেম্বর, ইকনমিক এণ্ড পলিটিক্যাল উইকলি) তাঁর লেখায় গোটা তর্কটাকেই আন্দোলনের বৈপ্লবিক পরিসর, আর বিভিন্ন সামাজিক বৈপ্লবিক শক্তির চরিত্রকে কেন্দ্র করে উত্থাপন করেছেন। 

ব্যাপারটা নিঃসন্দেহে ভালো, তবে তার জন্য কয়েকটা সাধারণ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের পর্যালোচনা প্রয়োজন। প্রথমত, আমি মনে করিয়ে দিতে চাই যে আমরা নানা ঘরানার বামপন্থীদের কাছে শেৎকরী সংগঠন-কে নিয়ে (এবং তার আগে কৃষক সমাজের শ্রেণী সংগঠনের প্রকৃতি নিয়ে) নানা প্রশ্নের উত্তর দিয়েছি – উল্টোটা নয়। তার কারণটাও পরিষ্কার -একটা গণ সংগঠন বা আন্দোলনের কাছ থেকে আমাদের যা প্রত্যাশা, মার্ক্সবাদী বুদ্ধিজীবী আর কম্যুনিস্ট কর্মীদের থেকে প্রত্যাশা তার চেয়ে আলাদা। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে অনেকে এই ধারণাটাকেও প্রশ্নের মুখে ফেলেন। এক নারীবাদী বন্ধুর কথায়, “বামপন্থীরা এই করেনি বা ওই করেনি বলে তোমরা এত হতাশ হও কেন? বামপন্থীরা আন্দোলনকে নেতৃত্ব দেবে, এই আশা করোই বা কেন?” কিন্তু আমরা তাও আশা করি, কারণ বামপন্থীরাই চিরকাল এক ঐক্যবদ্ধ দূরদৃষ্টি দেখিয়েছেন, আর বাস্তব পরিস্থিতির বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে সামগ্রিক বৈপ্লবিক আন্দোলন গড়ে তোলার চেষ্টা করেছেন। এই সময়ে দাঁড়িয়ে মূল প্রশ্নটা এই যে, এই প্রত্যাশা আজকেও যথাযথ কিনা।

দ্বিতীয়ত, কৃষক আন্দোলনের প্রকৃতি নিয়ে এই যে তর্ক, তা সাম্প্রতিক নানা আন্দোলনকে কেন্দ্র করে বাম পরিসরে বর্ণ, লিঙ্গ, পরিবেশ নিয়ে যা সব তর্ক উঠে এসেছে, তারই অংশ। আমি গোড়া থেকেই এই জাতীয় তর্কের অংশ ছিলাম। কৃষকদের নিয়ে যে সাম্প্রতিকতম বিতর্কগুলো, সেই প্রসঙ্গে কোনো কোনো পরিসরে এরকম কথা উঠেছে, “এইবারে গেইল বড় বেশি বাড়াবাড়ি করছে।” আসলে, বাস্তব পরিস্থিতিই আমাদের বাড়াবাড়ি করতে বাধ্য করছে, এবং ভবিষ্যতে আরো বেশি করে করবে। তবে তা সত্ত্বেও এই বিষয়গুলো নিয়ে সারা ভারত জুড়েই খানিকটা হলেও মতানৈক্য রয়েছে। অধিকাংশ কমরেডের কাছেই এই বিতর্কগুলোর বেশিরভাগেরই এখন মীমাংসা হয় গেছে -অন্তত এই অর্থে যে তারা মনে করছেন কম্যুনিস্টদের জাতিপ্রথা, পিতৃতন্ত্র ইত্যাদি বিষয়গুলো নিয়ে গভীরভাবে ভাবা প্রয়োজন। আমার জ্ঞাতসারে, ভারতের তরুণ কর্মীদের একটা বড়ো অংশের জন্যেও একথা দলমত নির্বিশেষে সত্যি। কিছু কম্যুনিস্ট পরিচালিত দল সত্যিই সেই অনুসারে সিদ্ধান্ত নিচ্ছে। আমরা যদি দিল্লিতে আইপিএফের শেষ কনফারেন্সের কথা ভাবি – তাঁরা সেখানে “ব্রাহ্মণ্যবাদ”-এর বিরুদ্ধে লড়াই করার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন, জাতীয় বিকল্প তৈরির ক্ষেত্রে “নব্য সামাজিক আন্দোলন”-গুলোকে গুরুত্বপূর্ণ শক্তি হিসাবে চিহ্নিত করেছেন। তা সত্ত্বেও, অধিকাংশ দলের নেতারা এবং অগ্রগণ্য মার্ক্সবাদী বুদ্ধিজীবীদের বেশিরভাগ অংশ, এই জাতীয় বিষয়ে তাঁদের অধিকাংশ কর্মীরা সমাজের যে স্তর থেকে আসেন, তার চেয়ে বেশি প্রাচীনপন্থী ধারণা পোষণ করেন। 

তাহলে মূল কথাটা কী দাঁড়ালো? বালগোপাল একটা হিন্দি গানের লাইন বলেছেন, “ক্ষেতও নয়, জমিও নয়, বরং সারা দুনিয়া!” কিন্তু দলিতদের কাছে যে গোটা দুনিয়া পাবার অর্থ জাতিপ্রথার বিরুদ্ধে সরাসরি লড়াই, বা মহিলাদের কাছে তার অর্থ পুরুষ-নারীর মধ্যে নতুন ধরনের সম্পর্ক স্থাপন, পিতৃতন্ত্রের নানা রূপের বিরুদ্ধে লড়াই -তাঁর গোটা যুক্তিপূর্ণ আবেগতাড়িত বিশ্লেষণের কোথাও এই কথাগুলো বালগোপাল এমনকি আকারে ইঙ্গিতেও বলেননি। তাঁর গোটা লেখাতে কোথাও এমন কথা বলা নেই যে গ্রামের গরীব মানুষের সমস্যা শুধু জল, জমি আর কাজ নয়। তার সঙ্গেই রয়েছে জাতপাত, অস্পৃশ্যতা, পুরুষতন্ত্র। তিনি লিখছেন যে মাঝারি কৃষকের কাছে মূল সমস্যা জিনিসপত্রের দাম নয়, বরং অনাবৃষ্টি আর জলের অভাব। অথচ বলছেন না যে এই সমস্যা গ্রামের গরীব মানুষদেরও সমস্যা, আর এই সমস্যাগুলো নিয়ে ভাবার মানে পরিবেশ সংক্রান্ত নানা বিষয় গভীরভাবে পর্যালোচনা করা। বালগোপালের কাছে, “কৃষি বিপ্লবের সার” বর্ণনা করতে গিয়ে দলিত আর মহিলাদের সমস্যার কথা বলার দরকার নেই, কারণ তাঁর কাছে এই সমস্যাগুলো কম গুরুত্বপূর্ণ, অপ্রধান। হয় সমস্যাগুলো আপনাআপনি মিটে যাবে, আর যদি নিতান্তই না যায়, তাহলে খানিক অতিরিক্ত “শ্রেণীসংগ্রাম” করলেই তার সুরাহা হয়ে যাবে। বালগোপাল লিখছেন যে তাঁর বিবেচনায় বিপ্লব শুধু পুঁজির বিরুদ্ধে নয়; কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তাঁর বিশ্লেষণ, সম্পত্তি এবং তার বন্টন, আর অর্থনৈতিক সম্পদ ব্যবহারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। তাঁর বিচারে, এই অর্থনৈতিক সম্পদ এক অবিভক্ত গ্রামীণ গরীব সম্প্রদায় নিজেদের হাতে তুলে নেবে, তারপরে সেই মানুষগুলো আর তাঁদের নেতৃত্বের মধ্যেকার সম্পর্কে কোনো অতিরিক্ত সমস্যা, কোনো জটিলতা থাকবে না। লেখার ধরন এমন যেন দলিত আন্দোলন, নারী আন্দোলন, পরিবেশ আন্দোলন – এগুলো কিছুই হয়নি; রাশিয়া আর চীনের বিপ্লব হয়নি, গত সাতচল্লিশ বছরের কোনো ঘটনাই আসলে ঘটেনি। 

তাহলে এই সব মিলিয়ে কী দাঁড়াল? আমরা আবার সেই বাঁধা ছকে ফেরত চলে এলাম। তাও এমন এক সময়ে দাঁড়িয়ে, যখন এইসব নতুন সামাজিক আন্দোলনের গণচরিত্র, নতুন নতুন সক্রিয় কর্মী তুলে আনার ক্ষমতা তাদেরকে এক নতুন শক্তি হিসাবে তুলে ধরছে। কম্যুনিস্টরা তাঁদের যত না প্রশ্নের মুখে দাঁড় করাতে পারছেন, তাঁরা বামপন্থী কম্যুনিস্টদের তার থেকে বেশি প্রশ্নের সামনে দাঁড় করিয়ে দিচ্ছেন। 

অন্ধ্রে, যেখানে তেলেঙ্গানা বিদ্রোহ হয়েছিল, কম্যুনিস্টরা যেখানে পঞ্চাশের দশকে সবথেকে শক্তিশালী বিরোধী শক্তি হিসাবে উঠে এসেছিল, সেখানে মার্ক্সবাদের জনপ্রিয়তা এরকম তলানিতে ঠেকল কেন? দলিত আন্দোলন বাদে সেখানে আর বলার মত কোনো গণ আন্দোলন পড়ে নেই কেন? রাষ্ট্রের দমনের পূর্ব কোনো ইতিহাসে তো এরকম ঘটনা ঘটেনি। সেখানে চাষীদের মধ্যের একটা বড় অংশ, যাঁদেরকে প্রভাবশালী রেড্ডি বর্ণের বলা হত, তাঁরা এখন নিজেদের “কাপু” বলে আন্দোলন করছেন কেন? বামপন্থীদের কি জাতপাত বিষয়ক প্রশ্নগুলোকে নিয়ে আরো গভীরভাবে ভাববার সময় আসেনি? 

আর ভাবা মানে এখানে শুধুই এই সমস্ত বিষয়গুলোর নাম বলা নয়, বা দলিত আর আদিবাসীদের সবথেকে শোষিত অংশের মধ্যে কাজ করা নয়। নকশালরা চিরকালই বলেছেন যে তাঁদের অবস্থান দলিত, আর গ্রামের গরীব মানুষজনের মধ্যে, আর সেইজন্য দলিতদের মনে চিরকালই তাঁদের জন্য খানিক জায়গা থাকবে। কিন্তু তা সত্ত্বেও দলিতদের এরকম ভাববার যথেষ্ট কারণ আছে যে সব ধারার কম্যুনিস্ট আন্দোলন মিলে তাঁদের জন্য যা করেছে, একা আম্বেদকরের আন্দোলনই করেছে তার থেকে বেশি। এই বিষয়ে হয়তো আরো খানিকটা নির্দিষ্ট ভাবে বলা প্রয়োজন। আম্বেদকরের স্বাধীন শ্রমিক দল (Independent Labour Party) স্বাধীনতার পূর্বে মহারাষ্ট্রে কোংকনে খোতি ব্যবস্থার বিরুদ্ধে মাহার আর কুনবি চাষীদের একত্রিত করে জমির অধিকার সংক্রান্ত বৃহত্তম আন্দোলন সংগঠিত করে। ১৯২০-র দশকে আম্বেদকরের ‘মাহার ওয়াতন’-এর বিরুদ্ধে আন্দোলন (মহারাষ্ট্রের বিশেষ ধরনের “ভেঠবেগার” ব্যবস্থার বিরুদ্ধে, বিভিন্ন জায়গায় ভেঠবেগার যে নানা ধরনের জাতপাত ভিত্তিক রূপ নেয়, তাও যথেষ্ট বিশ্লেষিত হয়নি) এই ধরনের দাসত্ব থেকে দলিতদের মুক্তির বিষয়ে কিষাণ সভার যে কোনো আন্দোলনের থেকে বেশি সফল হয়। জঙ্গল আর পতিত জমির অধিকার নিয়ে দলিতদের আন্দোলনও স্বাধীনভাবে শুরু হয়নি, হয়েছিল আম্বেদকরের দলের নেতৃত্বেই, সেই ১৯২০-র দশক থেকেই। প্রজাতন্ত্রী দলের নেতৃত্বে ১৯৫৬ আর ১৯৬৫-এর জমি সত্যাগ্রহ, স্বাধীনতা পরবর্তী ও ১৯৬৮ পূর্ববর্তী সময়ের সবচেয়ে বড় আন্দোলন ছিল। এই সব তথ্যর কোনোটাই কিষাণ সভার স্বীকৃত ইতিহাসে বলা হয় না, মার্ক্সবাদী বৌদ্ধিক চিন্তার পরিসরেও স্থান পায় না। তবুও এ কথাগুলো বাস্তব সত্য। আম্বেদকরের লেখার তাত্ত্বিক আর ঐতিহাসিক দিক থেকে নানা সমস্যা থাকা সত্ত্বেও তাঁর রাজনৈতিক পরিকল্পনা কম্যুনিস্টদের তুলনায় কোনো অংশে কম সার্থক বা কম সঙ্গতিপূর্ণ নয়, একথা ভাববারও যথেষ্ট কারণ রয়েছে। দলিতরা সঙ্গতভাবেই দাবি করতে পারেন যে কম্যুনিস্টরা খালি মজুরি, সামাজিক ন্যায়ের আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া নিয়ে গর্ব না করে, শুধু কম্যুনিস্ট নেতৃত্বাধীন তত্ত্ব আর আন্দোলনকে নিয়ে চর্চা না করে, এইসমস্ত দলিত আন্দোলনের ধারাকেও যথাযথ স্বীকৃতি দিক। তবেই ‘তাদের’ আন্দোলন ‘আমাদের’ হয়ে উঠবে। বা অন্যভাবে বলতে গেলে, কম্যুনিস্টরা যেদিন আম্বেদকরকে “পেটি বুর্জোয়া গণতন্ত্রী বিপ্লবী”-র বাইরে ভাবতে পারবেন, সেদিনই দলিত আন্দোলন বাম ধারাকে ব্রাহ্মণ্যবাদী কম্যুনিজমের থেকে বেশি কিছু হিসাবে দেখতে পারবে। 

নারী আন্দোলনের থেকে উঠে আসা প্রশ্ন 

আর নারী আন্দোলন থেকে উঠে আসা প্রশ্নের ব্যাপারেই বা কী বলা যায়? মহিলারা কোনো না কোনো উপায়ে জোর করে বিষয়গুলো উত্থাপন না করলে কি বামপন্থীরা ব্যাপারগুলোকে কখনো যথাযথ গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করেছেন? হায়দ্রাবাদের কোনো মহিলা যদি আজকের দিনে দাঁড়িয়ে তেলেঙ্গানা আন্দোলনের মহিলা আন্দোলনকারীদের কী হয়েছিল সেই প্রশ্ন তোলেন, তাহলে বালগোপালের সব বন্ধুবান্ধবরা কি তাঁকে “বুর্জোয়া ফেমিনিস্ট” বলে দাগিয়ে দেবেন না? চাঁদওয়াড়ে শেৎকরী সংগঠন-এর মহিলাদের মধ্যে অর্জিত অভিজ্ঞতার উপর ভিত্তি করে আমি আর চেতনা, কৃষক আন্দোলন নিয়ে নতুনভাবে ভাবতে শুরু করি। সেই প্রেক্ষিতে বিভিন্ন মার্ক্সবাদীরা অভিযোগ করেন যে আমাদের “নারীবাদ” আমাদের দৃষ্টিভঙ্গিকে প্রভাবিত করছে এবং আমরা সেটা করতে দিচ্ছি। কিন্তু কোনো আন্দোলন বা বিপ্লব তার সবচেয়ে গরীব আর নিপীড়িত সংখ্যায় অর্ধেক মানুষকে কী দিচ্ছে, সেই প্রেক্ষিত থেকে বিচার করার জন্য তো ক্ষমা চাওয়ার কিছু নেই। 

আবার কিছু তথ্য বিচার করে দেখা যাক। গবেষণা বলছে মহিলা কৃষি শ্রমিকরা গৃহস্থালির খরচে পুরুষদের থেকে সামান্য পরিমাণে বেশি টাকা দেন, অথচ তাঁরা উপার্জন করেন পুরুষদের অর্ধেক। তাও এই হিসাবের মধ্যে মহিলাদের গৃহশ্রম বা সন্তানের দায়িত্ব পালনের কথা নেই (সারদামণি আর মেঞ্চেরের “Women in Rice Production in Kerala, Bengal and Tamil Nadu” দেখুন)। অবশ্য পুরুষরা তাঁদের উপার্জনের একটা বড় অংশ চা, সিগারেট, মদ, মাংসের পিছনে খরচ করেন; আর মহিলারা সেখানে বোধহয় চুলের তেলের সামান্য খরচ বাদ দিয়ে গোটা উপার্জনই সংসারে দেন – এ কথা জানবার জন্য গবেষণার প্রয়োজন হয় না। ভূমিহীন কৃষি শ্রমিকদেরও কোনো না কোনো ধরনের বাড়ি থাকে, আর সবচেয়ে ভাঙাচোরা কুঁড়েঘরটিও থাকে পুরুষের অধিকারে, নারীর নয়। (একমাত্র ব্যতিক্রম হয়তো উপজাতি এলাকাগুলো, যেখানে মহিলারা ক্ষেত্রবিশেষে নিজেদের বাড়ি বানান। তবে সেখানে মহিলাদের দাবিয়ে রাখার জন্য অন্য উপায় খুঁজে পাওয়া যায়, যেমন ডাইনি সন্দেহে বিচার)। আর পুরুষরা তাঁদের স্ত্রী-দের বের করে দিয়ে সম্পত্তির ক্ষমতা জাহির করতে মোটেও পিছুপা হন না। মারাঠিতে একে বলে “ফেলে দেওয়া”, আর ভারতবর্ষে এরকম “ফেলে দেওয়া”, ডিভোর্সী, পরিত্যক্ত মহিলার সংখ্যা ক্রমশই উত্তরোত্তর বাড়ছে। একথা জাতপাত ধর্ম নির্বিশেষে কৃষি শ্রমিক থেকে শুরু করে সমাজের সব শ্রেণীর জন্যে সত্যি। তাঁদের অবস্থা প্রমাণ করে যে পুরুষতন্ত্রে পরিবারের কাছে নারী হচ্ছে সম্পত্তিহীন, গৃহহীন। কোনো বিচারেই কি এই বিষয়গুলোকে গৌণ, বা “বুর্জোয়া ফেমিনিস্ট” বলে দাগিয়ে দেওয়া যায়? আমরা কি দ্বিতীয় একটা চীনের বিপ্লব হলে তবে বুঝতে পারব যে সমবেত ব্যবস্থাতেও পিতৃতান্ত্রিক পরিবারের গঠন টিকে থাকার অর্থ পুত্রসন্তানের প্রতি পক্ষপাতিত্ব আর কন্যাসন্তান হত্যার প্রবণতাও টিকে থাকা? 

বালগোপাল প্রান্তিক মানুষের কথা বলতে গিয়ে লিখছেন, “যে বিষয়ে পুঁজির উৎসাহ নেই, পুঁজির বিরোধীদেরও তাতে উৎসাহ নেই – এ এক অদ্ভুত ধাঁধা।” অথচ মজুরিহীন শ্রমের ধারণা বা জীবিকার জন্য ব্যয়িত শ্রমের সঙ্গে পুঁজির বৃদ্ধির যে সম্পর্ক, সে বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে তো নারী আন্দোলন, কম্যুনিস্ট আন্দোলন নয় (উদাহরণস্বরূপ মারিয়া মিসের Patriarchy and Accumulation on a World Scale দেখুন)। নারীবাদীরা কখনও এরকম মনে করেননি যে “মানুষ হয়ে উঠতে গেলে পুঁজির দ্বারা আত্তীকৃত হতে হবে।”  কিন্তু বালগোপালের কাছে নারী আন্দোলন পুঁজি আর রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে আন্দোলন নয়, নারীবাদী তত্ত্ব বা লেখাপত্র বৈপ্লবিক কর্মকান্ডের জন্য প্রয়োজনীয় নয়। এই বিষয়ে বামপন্থীদের মধ্যে যথেষ্ট ঐকমত্য রয়েছে। তাতে আখেরে ক্ষতি বামপন্থীদেরই। নারীবাদীদের জন্য অবশ্য তাঁদের সমস্ত অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব, নানান ধারা, সীমাবদ্ধতা এবং আন্দোলনে শহুরে মধ্যবিত্ত উচ্চবর্ণ “বুর্জোয়া ফেমিনিস্ট”-দের প্রাধান্য মেনে নিয়েও (যদিও তা বামপন্থী বা শ্রমিক আন্দোলনে শহুরে মধ্যবিত্ত উচ্চবর্ণের প্রাধান্যর থেকে বেশি কিছু না) তত্ত্ব আর সংগঠনকে আরো বাড়িয়ে তোলার কাজ এখনও বাকি। 

মাঝারি মাপের কৃষকদের কথায় ফেরত আসা যাক। বালগোপাল প্রশ্ন করছেন, তাঁরাও “সারা দুনিয়া”-য় তাদের ভাগ চান কিনা। এই প্রশ্নের উত্তর অবশ্যই এই যে, সমস্ত আন্দোলনের গরিষ্ঠ সংখ্যক মানুষের মতো তাঁরাও প্রথমে নিজেদের ভাগটা চান। মজুরির মতো ন্যায্য মূল্যের দাবিও একটা তাৎক্ষণিক অর্থনৈতিক দাবি। আমাদের সন্দেহ যে বালগোপালের সংজ্ঞা অনুযায়ী “গ্রামীণ গরীব” মানুষের গরিষ্ঠ অংশও তাৎক্ষণিক অর্থনৈতিক দাবি মেটাতে আর বেঁচে থাকার স্বার্থেই আন্দোলনে যোগ দেন। আসল প্রশ্নটা দাঁড়ায় যে আন্দোলনের নেতৃত্ব কীভাবে এইসমস্ত বিষয়কে “সারা দুনিয়া”-র জন্য লড়াইয়ের সঙ্গে যুক্ত করেন। আমাদের অনেকেরই মূল সংশয় অবশ্য অন্য জায়গায় – কারখানাভিত্তিক শ্রমিক প্রোলেতারিয়েতই বিপ্লবে অগ্রণী ভূমিকা পালন করবে, এই ধারণাটা নিয়েই। প্রাথমিক দৃষ্টিতে অন্তত মনে হয় যে মূলত উচ্চ ও মধ্য বর্ণের পুরুষ – এই শ্রেণীর বিপ্লব-বিরোধী কিছু স্বার্থ রয়েছে: চাকরির স্বার্থে ধ্বংসাত্মক, সেকেলে উৎপাদন ব্যবস্থা টিকিয়ে রাখা (প্রতিরক্ষা বিষয়ক কারখানা, পারমাণবিক শিল্প, রাসায়নিক শিল্পের একটা বড় অংশ); তাঁদের উত্তরসূরি হিসাবে তাঁদের উচ্চ আর মধ্য বর্ণের পুত্রসন্তানদের চাকরি সুনিশ্চিত করা। সাম্প্রতিক সময়ে আন্দোলনে তাঁদের অংশগ্রহণের প্রবণতা দেখে মনে হয় তাঁদের মূল লক্ষ্য নিজেদের ভাগ বাড়িয়ে নেওয়া। এর মানে কিন্তু এই নয় যে আমরা এই শ্রেণীর মানুষদের অবিপ্লবী বা প্রতিবিপ্লবী বলছি। বরং বলতে চাইছি যে তাঁদেরকে বিপ্লবের অগ্রণী ভ্যানগার্ড হিসাবে কল্পনা করা উত্তরোত্তর কঠিন হয়ে পড়ছে। এই সমস্যা তবে শুধু আমাদের নয়, বালগোপালেরও। তিনি তাঁর বিপ্লবের সংজ্ঞায় এই বিষয়ে নীরব থেকেছেন। আর যদি বালগোপালের মাপকাঠি অনুযায়ী “এমন বিরোধ” সম্পর্কে ভাবি “যা সিস্টেমের কাছে আপোষযোগ্য নয়”, তাহলে সংগঠিত ক্ষেত্রের শ্রমিকদের ক্ষেত্রে এরকম কোনো বিরোধ নেই। নকশাল আন্দোলন সম্পর্কে সমালোচনা করা হয় যে তাঁরা সংগঠিত কারখানার শ্রমিকদের বাদ দিয়ে গ্রামের গরীব মানুষদের মধ্যে বৈপ্লবিক আন্দোলন গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন, যদিও তাঁদের কর্মসূচির ভিত্তিতে এরকম কোনো চিত্র উঠে আসে না। তবু বালগোপাল গ্রামের গরীব মানুষ আর পুঁজির কথা বলতে গিয়ে বারবার এই প্রসঙ্গ তুলেছেন। 

বালগোপালের বিশ্বাস অনুযায়ী কারখানার প্রোলেতারিয়েত কি বৈপ্লবিক? ন্যায্য মূল্যের জন্য সংগ্রামকে যদি আলাদা গুরুত্ব দিয়ে না দেখা হয়, তাহলে বেশি মজুরির জন্য সংগ্রামকে কি দেখা উচিত? যদি তাই হয়, তাহলে কেন? মজুরির জন্য সংগ্রাম যদি পুঁজির দখল মুক্ত করতে সাহায্য করে, তাহলে অন্যান্য অর্থনৈতিক সংগ্রাম তা করে না কেন? কয়েক একর জমি পেলে কীভাবে তা পুঁজির দখলমুক্তিতে সাহায্য করতে পারে? বালগোপাল নিশ্চয়ই বলবেন, যে সংগ্রামের লক্ষ্য রাষ্ট্র-ক্ষমতা ধ্বংস একমাত্র সেই সংগ্রামকে আলাদা গুরুত্ব দিয়ে দেখা যায়। কিন্তু এই সমস্ত তাৎক্ষণিক লড়াই বা রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধরত কিছু গেরিলার বীরত্ব কীভাবে আমাদের সেই লক্ষ্যে পৌঁছে দিতে পারে, এই প্রশ্নের কোনো সন্তোষজনক উত্তর নেই। 

কৃষকদের প্রসঙ্গে যদি আসি – বালগোপাল শুধু প্রান্তিক, শুখা জমির কৃষকদের শোষিত হিসাবে দেখছেন। তাঁর কাছে বাজারের সঙ্গে যুক্ত, সার/ কীটনাশক/ বিদ্যুৎ ইত্যাদির উপর নির্ভরশীল কৃষকদের সঙ্গে পুঁজির কোনো বিরোধ নেই। এর দুটো অর্থ হতে পারে। হয় বালগোপাল এখানে দ্বিচারিতা করছেন – যে আধুনিক কারখানার শ্রমিক শোষিত হতে পারেন, কিন্তু আধুনিক কৃষি ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত কৃষক পারেন না। আর নয়তো বেশিরভাগ সনাতনপন্থী মার্ক্সবাদীদের মতো বালগোপালের কাছে শোষণ শুধু সম্পত্তির মালিকানার মাধ্যমেই হতে পারে, আর পুঁজিবাদী শোষণের মানে শুধুই মজুরি-শ্রমের শোষণ। এইখানেই হয়তো মূল পার্থক্য হয়ে দাঁড়াচ্ছে। আমাদের কাছে পুঁজি আর শ্রমের বিরোধ মানে শুধু পুঁজি আর মজুরি-শ্রমের বিরোধ নয়। একেবারে গোড়া থেকেই পুঁজি সঞ্চিত হয়েছে মজুরি-শ্রম, ক্ষুদ্র কুটির সামগ্রীর জন্য শ্রম, আর জীবিকার জন্য ব্যয়িত শ্রমকে শোষণের মাধ্যমে। আর এই কাজে জাতভিত্তিক আর লিঙ্গভিত্তিক শোষণ আর নিপীড়নের যেসব ধারা ইতিমধ্যেই উপস্থিত ছিল, পুঁজি তাদের ধ্বংস করার জায়গায় পরিবর্তিত পরিমার্জিত করে ব্যবহার করেছে। 

কৃষক, নারী, দলিতরা “পুঁজির দ্বারা প্রান্তিকীকৃত” নয়, বরং তাঁদের ঘাম, রক্ত, কান্না পুঁজির বিকাশের জন্য অপরিহার্য ভূমিকা পালন করেছে। তাঁদের প্রান্তিকীকরণ হয়েছে বামপন্থীদের হাতেই। এইসব মানুষগুলোর শোষণ  চিরাচরিত সামন্ততান্ত্রিক বা পুঁজিবাদী শোষণের কাঠামোর মধ্যে পড়েনি বলে বামপন্থীরা তাঁদের নিয়ে মাথা ঘামাননি । আজকের কৃষক আন্দোলনের উত্থান অন্তত অংশতভাবে তারই ফল। আর দলিত বা মহিলাদের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে এ কথাও বলা যায় যে তাঁদের শোষণ-নিপীড়নকে বামপন্থী তত্ত্ব আর চর্চার আঙিনায় ঢোকাতে হলে হয় তাঁদেরকে নিজেদের আন্দোলনের জোরেই তা করতে হবে, আর নয়তো তাঁদেরকেই নতুনভাবে বাম ধারাকে গড়ে তুলতে হবে। 

শেয়ার করুন

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *