দশটি ভাই চম্পা আর একটি পারুল বোন- আসামের ভাষা আন্দোলন

একটা বারো-তেরো বছরের মেয়ে গল্প শুনছে তার বাবার মুখে। সালটা ২০০২। শুনছে ১৯৬১ সালের ভয়াবহ দিনগুলোর বর্ণনা। বাংলা ভাষাকে রাজ্য ভাষা কারার দাবিতে আন্দোলনরত মানুষদের উপর আসাম সরকারের চূড়ান্ত নির্যাতনের ধারাভাষ্য। ১৯৬১’র ১৯শে মে ১১ জন সত্যাগ্রহী নাগরিককে আসামের মুখ্যমন্ত্রীর গোপন নির্দেশে শিলচর রেল স্টেশনে গুলি করে নির্মম ভাবে হত্যা করার কথা। সরকারের প্রত্যক্ষ মদতে আসাম পুলিশের বর্বর হত্যাযজ্ঞের পরিকল্পনার বিবরণ। 

সেদিন বাংলা ভাষাকে কন্ঠে জড়িয়ে শহিদ হয়েছিলেন – কমলা ভট্টাচার্য, চন্ডীচরণ সূত্রধর, হিতেশ বিশ্বাস, শচীন্দ্র পাল, কুমুদরঞ্জন দাস, সুনীল সরকার, বীরেন্দ্র সূত্রধর, তরণী দেবনাথ, সত্যেন্দ্র দেব, কানাইলাল নিয়োগী, সুকোমল পুরকায়স্থরা… আহত আরও অজস্র মানুষ। নির্মম প্রশাসন ভাষার জন্য মানুষকে মেরেছিল। কেউ এগিয়ে আসেনি। সেই দিন আসাম রাজ্যেই (তৎকালীন আসামের রাজধানী শিলং-এ) উপস্থিত ছিলেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহেরু। একটা টুঁ শব্দও তিনি করেননি। পরে দিল্লি ফিরে গিয়ে নাম কে ওয়াস্তে যে কমিশন বানিয়েছিলেন তার রিপোর্ট এখনও সঠিকভাবে সামনে আসেনি। স্বাধীন ভারতের বুকে এই গণহত্যার বিচার আজ অবধি হয়নি।

সেই রক্তাক্ত ইতিহাসের ধারা চলেছে ১৯৭২ এবং ৮৬’তেও। আবারও ভাষার জন্য রক্ত ঝরেছে। সেই বিচারও হয়নি। হয়তো কেউ জানেনও না ৭২’এর ১৪ আগস্ট রক্তাক্ত অবস্থায় জাতীয় সড়কে লুটিয়ে পড়া যুবক বিজন চক্রবর্তীর নাম! কী করেছিল আসাম সরকার? অসমীয়া ভাষাকে জোর করে চাপিয়ে দিতে চেয়েছিল বাঙালিদের মুখে। শিখতেই হবে অসমিয়া ভাষা, শিক্ষা দেওয়া হবে কেবলমাত্র অসমিয়া ভাষায়। প্রতিবাদ করলে হত্যা! বাবা শেষ করেন, ‘আসামে বাঙালি হওয়ার জন্য এতটাই অত্যাচার সইতে হয়েছে… আজও হচ্ছে।’ বারো-তেরোর মেয়েটার শিরদাঁড়া দিয়ে তখন ভয়ের স্রোত নেমে যায়।

এর অনেক বছর পর ২০১৮ সালের কথা। আর্মি পোষাক পরা হাতে অত্যাধুনিক অস্ত্রসহ চার-পাঁচজন লোক একটা ভ্যান থেকে নেমে আসে। গ্রামের মানুষরা সারাদিনের কাজ শেষে নিজেদের মধ্যে কথাবার্তা বলছিলেন। অস্ত্র ঠেকিয়ে পরপর পাঁচজনকে তুলে নিয়ে যায় তারা লোহিতের তীরে। লাইন ধরে দাঁড় করিয়ে রাইফেলে ঝাঁঝরা করে দেওয়া হয় পাঁচজনের বুক। কী অপরাধে সেটা জানা যায় না। কোনও সাক্ষী-সাবুদ থাকে না। কোনও প্রমাণ থাকে না। তারপর সন্ধ্যার অন্ধকারেই গা-ঢাকা দেয় হত্যাকারীরা। অথচ যেখানে এই হত্যালীলা চালানো হচ্ছে তার মাত্র ৩০০ মিটার দূরেই পুলিশ চৌকি। খুনীদের পালিয়ে যেতে দেওয়া হয়। তারপর ধীরে-সুস্থে মঞ্চে আসেন পুলিশের উচ্চপদস্থ কর্তাগণ। জানানো হয় মৃত পাঁচজনই বাংলায় কথা বলত। বছর উনত্রিশের মেয়েটির পুরোনো ভয় লাগাটা আরেকবার ফেরত আসে।

না, কোনও পলিটিক্যাল থ্রিলার সিনেমার গল্প শোনাতে বসিনি। শোনাতে চাইছি অসমের বাঙালিদের ঠাণ্ডা মাথায় খুন করার প্লটের কথা। নিখুঁত প্ল্যান করে বিদেশী সাজানোর ষড়যন্ত্রের কথা। বোঝাতে চাইছি অসমে বাঙালি হয়ে জন্মানোর খেসারত এভাবেই দিতে হয়। এভাবেই দিতে হয়েছে। শুধু অতীতের সাথে তার স্ট্রাকচারের কিছুটা পরিবর্তন হয়েছে মাত্র। বাকি সব একই রকম। নতুন স্ট্রাকচারে এনআরসি-কে সামনে রেখে চলছে বাঙালি নিধন। চলছে ভাষার নিরিখে বিদেশি খোঁজার পালা। বাংলায় কথা বললেই বিদেশি বা আরো স্পষ্ট করে বললে বাংলাদেশী। বৃহত্তর অসমিয়া জনসংখ্যার রাজ্যে বাঙালির জায়গা নাই। অতীতের জহরলাল নেহেরু সরকার থেকে আরো এক কদম বেড়ে বাঙালিকে ‘উইপোকা’-র তকমায় ভূষিত করেছে বর্তমান সরকার। দেশে উইপোকারা থাকলে দেশ ঝাঁঝরা হয়ে যাবে। তাই তাদের ঠিকানা ‘ডিটেনশন ক্যাম্প’। কোটি কোটি টাকা ঢেলে আসামে তৈরী হয়েছে এশিয়ার বৃহত্তম ডিটেনশন ক্যাম্প। উইপোকাদের ধরে ধরে সেখানে আটকে রাখা হবে। 

উগ্র জাতীয়তাবাদী অসমিয়াদের চলমান ভাষিক আগ্রাসন আর হিংসার মাঝেই ২০২০ সালের মার্চ মাসে অসম বিধানসভায় একটি আইন পাশ হয়, ‘অসমিয়া ভাষা শিক্ষা আইন ২০২০’। তারপরই মাধ্যমিক শিক্ষাপর্ষদ থেকে জারি হয় এক নির্দেশনামা। অন-অসমিয়া (পড়ুন বাঙালি) যে সব ছাত্রছাত্রীরা প্রথম ভাষা (এমআইএল) হিসেবে নিজের মাতৃভাষা রাখবে সে ক্ষেত্রে তাদের ১০০ নম্বরের ঐচ্ছিক অসমিয়া বিষয়টি রাখতেই হবে। এই ঐচ্ছিক অসমিয়া সাবজেক্টটিতে নম্বর কম পেলেও অসুবিধা নেই। প্রমোশন হবে পরের ক্লাসে। কিন্তু ৪৫ শতাংশের বেশি পেলে একটি বিশেষ শংসাপত্র দেওয়া হবে। মোট প্রাপ্ত নম্বরের সাথে যুক্তও হবে এই বিষয়ে প্রাপ্ত নম্বর। আসাম চুক্তির ছয় নং ধারা বাস্তবায়নের উদ্দেশ্যে আরো বহু নিয়মনীতির মতো এটাও লাগু করা হয়েছে। মোদ্দা কথা এই যে বাঙালি হলে সন্দেহভাজন নাগরিক হিসাবে ডিটেনশন ক্যাম্পে যাও, আর যদিবা দৈবাৎ নিজেকে প্রমাণ করতে পারো তাহলে অসমিয়া ভাষাকে গ্রহণ করে আসামের সাথে একাত্ম হয়ে যাও, এরকম মন্তব্য খোদ অসমিয়া জাতীয়তাবাদী নেতা মন্ত্রী আমলা সহ অসমিয়া একাংশ মিডিয়া হাউজেরও। ঠিক যেন ১৯৬১ সালের পুনরাবৃত্তি। যে মুখের জবান রক্ষায় ষোড়সী বালিকা কমলা ‘জান দেবো তবু জবান দেবো না’ স্লোগানে লুটিয়ে পড়েছিলো শিলচর রেলস্টেশন চত্বরে তাঁর দশজন ভাইয়ের মতোই। মায়ের ভাষা রক্ষার জন্যে শহীদ হওয়া বিশ্বের প্রথম নারী শহীদ।  

বর্তমান আসামের ভাষিক আগ্রাসন, দমনপীড়নের মূল রূপটিকে বুঝতে হলে এবং তার বিরুদ্ধে সংঘবদ্ধ হতে গেলে বরাক উপত্যকার ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসের কাছে বারবার ফিরে যেতে হবে। পর্যালোচনা করতে হবে। বিশেষত নবপ্রজন্মকে। যাদের মাথায় বিজেপি এবং সংঘ পরিবার বাঙালি’র নতুন সংজ্ঞায়নের বিষ ইতিমধ্যেই ঢুকিয়ে ফেলেছে বেশ পাকাপোক্তভাবে। যাদেরকে এনআরসি আসলে মুসলমানদের দেশ থেকে বিতাড়ন প্রক্রিয়া বুঝিয়ে আসামের বাঙালিকে দেশহীন করার ষড়যন্ত্রে অসমীয়া জাতীয়তাবাদীদের হাত শক্ত করছে বিজেপি এবং সংঘ পরিবার। যে কারণে হিমন্ত বিশ্ব শর্মা মুখ্যমন্ত্রীত্ব নেওয়ার পরদিনই সাংবাদিক সম্মেলনে বলতে পারেন ‘২০% শতাংশ সীমান্ত অঞ্চলে আবার এন আর সি’র রিভেরিফিকেশন হবে’ এবং তা শুনে এখনও গর্জে উঠতে পারেনি বরাক উপত্যকার নাগরিক সমাজ। কেননা ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস ভুলিয়ে বিজেপি বরাকের বাঙালিকে সাম্প্রদায়িক বিভাজনে ভাগ করতে ইতিমধ্যেই সফল। নাগরিকত্ব (সংশোধনী) আইন আসার পরও ডিটেনশন ক্যাম্পে এতজন বাঙালির মৃত্যু এবং আটককে কেন্দ্র করেও কোনো বৃহত্তর আন্দোলন তাই গড়ে উঠতে দেখা যায় না। এমনতর অবস্থায় নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার প্রশ্নে আমাদের আসামের ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসকে নতুন করে চর্চার কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে আসা দরকার। এবং অতীতের ভাষিক দমনপীড়নের সাথে আজকের সময়ের ভাষিক এবং সাম্প্রদায়িক দমনপীড়নের পর্যালোচনা করাটাও জরুরি। 

বরাক উপত্যকার ভাষা আন্দোলনের প্রেক্ষাপট :

প্রাচীনকাল থেকেই আসাম নামক এই ক্ষুদ্র ভূখন্ড নানা ধর্ম, ভাষা, সংস্কৃতির মানবগোষ্ঠীর সমন্বয়ে গঠিত। আসামের রাজনৈতিক সীমানা বারবার বদল হয়েছে, ফলত জনসংখ্যা এবং জনবিন্যাসও বারবার পাল্টেছে। মোগলদের আগমনও ঘটেছে এ রাজ্যে। ১৭৬৫ খ্রীষ্টাব্দে মোগলদের অধীন থেকে ইংরেজদের অধীনে আসে করিমগঞ্জ, ধুবড়ি, গোয়ালপাড়া, বঙ্গাইগাও, কোকরাঝাড় এবং চিরাং জেলার কিছু অংশ এবং করিমগঞ্জ জেলাকে বাদ দিয়ে বাদবাকি সব অঞ্চল ইংরেজরা অবিভক্ত বাংলার রংপুর জেলার সাথে একত্রিত করে। ১৮২৬ সালে আহোম রাজা এবং ইংরেজদের মধ্যে ইয়ান্ডাবু চুক্তি হয় এবং করিমগঞ্জ বাদ দিয়ে উপরিক্ত সব অঞ্চল নয়া গোয়ালপাড়া জেলা হিসেবে উপনিবেশিক আসামে অন্তর্ভুক্ত হয়। ১৮৬৭ সালে নয়া গোয়ালপাড়া জেলাকে কোচবিহারের সাথে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। ১৫৬২ সাল অব্দি কাছাড় এবং হাইলাকান্দি জেলা ত্রিপুরা রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিল। এর পরে ১৭৬৫ পর্যন্ত এই দুই জেলাই কোচ রাজ্যের অংশ এবং তারপর ১৮৩২ সাল পর্যন্ত কাছাড়ি রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিল। ১৮৭৪ সালে সিলেট, কাছাড়, গোয়ালপাড়া- তিনটি বাংলাভাষী জেলাকে ঢাকা ডিভিশন থেকে কেটে এনে আসামের সঙ্গে সংযুক্ত করা হল। এবং এর ফলেই আসামে বাংলাভাষীরা সংখ্যাগরিষ্ঠ হয়ে উঠল। এবং মুসলমান সংখ্যাও উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পেয়ে ২৮.৮ শতাংশে উঠে এল। 

ইংরেজরা আসামে চা নিয়ে এল। এবারে চা-বাগানগুলোতে কাজ করার জন্যে প্রচুর শ্রমিকও চাই। তাই ভারতের অন্যান্য রাজ্য থেকে আগমন ঘটল আদিবাসী শ্রমিকদের। আবার আসামের জমিতে শস্য ফলানোর জন্য তৎকালীন পূর্ববাংলা থেকে আগমন ঘটল ভূমিহীন মুসলমান কৃষকদের। ১৯০৫ থেকে ১৯১২-এই সময়সীমার মধ্যে বাংলাভাষী মানুষদের আসামে অবাধে যাওয়া আসার ফলে স্বাধীনতার সময়ে আসাম রাজ্য দেখা গেল বাংলাভাষীরাই সংখ্যাগরিষ্ঠ। আবার ১৯৪৭ সালে ভারতবর্ষকে ভেঙে ভারত ও পাকিস্তান নামে দুটি আলাদা রাষ্ট্র গঠন করার সময়ে শ্রীহট্টের অঙ্গচ্ছেদ ঘটিয়ে মুসলিম অধ্যুষিত সিলেট জেলাকে পাকিস্তানের সঙ্গে জুড়ে দেওয়া হয়। তখন প্রায় তিন লক্ষ চা-বাগান শ্রমিক — যাদের অধিকাংশই হিন্দু — আসামে আশ্রয় নেয়। অনেক অবস্থাপন্ন হিন্দু পরিবার সিলেট ছেড়ে আসামে উদ্বাস্তু হয়। করিমগঞ্জ জেলা তৎকালীন সিলেটের অংশ থাকার দরুন এই জেলাও পাকিস্তানে চলে যেত, কিন্তু গণভোট এবং মানচিত্রের উপর র‍্যাডক্লিফ লাইনের কাটাছেঁড়ায় তিনটে থানা নিয়ে করিমগঞ্জও আসামের সাথে সংযুক্ত হয়ে যায়। 

বাংলাভাষীদের এই সংখ্যাগরিষ্ঠতা অসমিয়া জনজাতির কাছে অশনি সংকেত হিসেবে দেখা দিল। অসমিয়া নেতাদের ছল, বল আর চাপের কাছে নতি স্বীকার করে ব্রহ্মপুত্র উপত্যকার চর অঞ্চলের পূর্ববঙ্গীয় মূলের অভিবাসী মুসলমানেরা সরকারিভাবে অসমিয়াকে মাতৃভাষা হিসেবে স্বীকার করতে বাধ্য হলেন। এবং এরই ফলে ১৯৭১ সালের লোকগণনাতে অসমিয়া জনসংখ্যা বেড়ে দাঁড়ালো ৬০.৪৯ শতাংশে। এবং অভিবাসী মুসলমানদের নতুন পরিচয় হয়ে উঠল ‘নব্য অসমিয়া’। অসমিয়া জাতীয়তাবাদীদের স্বার্থসিদ্ধির জন্য পরবর্তীকালে যাঁদেরকে আবার ‘মিঞা’, ‘গেদা’, ‘সন্দেহযুক্ত বাংলাদেশী’ হিসেবে দেগে দেওয়া হয়। 

এত সবের পরও উগ্র অসমিয়া জাতীয়তাবাদীদের দমনপীড়ন থেমে থাকলো না। ১৮৭৪ থেকে ১৯৪৭, এই এতগুলো বছর আসামে যে বাঙালিরাই সংখ্যাগরিষ্ঠ ছিল এবং এই রাজ্যটা কোনকালেই যে একভাষী ছিল না, এই ঐতিহাসিক তথ্যগুলোই এককথায় নাকচ করে দেয় তারা। অসমিয়া জাতীয়তাবাদ চূড়ান্ত রূপ ধারণ করে। বাঙালি মাত্রেই বিদেশী এবং বহিরাগত চিহ্নিত করার প্রয়াস শুরু হয়। আসামের প্রতি বাঙালিদের আনুগত্য নিয়ে সংশয়, সন্দেহ ও প্রশ্ন উত্থাপিত হতে থাকে। অসমিয়া ভাষা ও সংস্কৃতির বিকাশের ক্ষেত্রে বাঙালির ভাষা ও সংস্কৃতিকে অন্তরায় হিসেবে গণ্য করা শুরু হয়। ‘আসাম শুধু অসমিয়াদের জন্য’ এই সংকীর্ণ উগ্র জাতীয়তাবাদকে উস্কে দিয়ে বাঙালিদের অধিকার হরণের নিরন্তর প্রচেষ্টা চলতে থাকে। বাঙালি অধ্যুষিত এলাকাগুলিকে সুপরিকল্পিতভাবে অসমিয়াকরণের প্রয়াস শুরু হয়। বাংলা মাধ্যমের স্কুলগুলোতে শিক্ষার মাধ্যম অসমিয়া ভাষা করার নির্দেশ দেওয়া হয় এবং শাসানো হয়, অন্যথায় অনুদান বন্ধ করে দেওয়া হবে। ১৯৪৭ থেকে ১৯৫১-এই চারবছরের মধ্যে আসামের ২৫০টি বাংলা মাধ্যমের স্কুলের মধ্যে ২৪৭টিই বন্ধ হয়ে যায়। 

অসমীয়া ভাষাকে সরকারি ভাষা হিসেবে মেনে নিতে আসামের বাঙালিদের কোন আপত্তি ছিল না, কিন্তু অসমিয়া জনসংখ্যার পাশাপাশি যেহেতু সমগ্র বরাক উপত্যকায় বাঙালি জনসংখ্যাও বিশাল সংখ্যক, তাই তারা চাইছিল বাংলা ভাষাকেও যেন সরকারি ভাষার স্বীকৃতি দেওয়া হয়। নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার্থেই বরাকের বাঙালিরা বাংলা ভাষা প্রতিষ্ঠার জন্যে গণতান্ত্রিক আন্দোলন শুরু করে। 

১৯৬০ সালের ২১শে এবং ২২শে এপ্রিল। আসাম প্রদেশ কংগ্রেস প্রস্তাব গ্রহণ করে ‘অসমিয়াকে রাজ্য ভাষা করতেই হবে।’ অসমের মুখ্যমন্ত্রী তখন বিমলাপ্রসাদ চালিহা। মাসদুয়েকের মধ্যেই ঘোষিত হয় অসমিয়াকে রাজ্যভাষা করার জন্যে সরকার অতি শীঘ্রই একটি বিল আনছে। উগ্র অসমিয়া জাতীয়তাবাদীদের তান্ডব দ্বিগুণ হয় এই ঘোষণায় এবং ব্রহ্মপুত্র উপত্যকায় সাম্প্রদায়িক আন্দোলন শুরু হয়। 

২ জুলাই ১৯৬০, বরাক উপত্যকার শিলচরে ডাকা হয় ‘নিখিল আসাম বাংলা ও অন্যান্য অনসমিয়া ভাষা সম্মেলন।’ সেই সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন লুসাই-খাসিয়া-গারো-মণিপুরি, বাঙালি প্রতিনিধিরা। কেন্দ্রের কাছে আবেদন জানানো হয় ভাষার প্রশ্নে হস্তক্ষেপ করতে। ওদিকে ব্রহ্মপুত্র উপত্যকায় শুরু হয় হত্যালীলা। দাঙ্গা বিধ্বস্ত এলাকা ছেড়ে ভাষিক সংখ্যালঘুরা পশ্চিমবঙ্গ, উত্তরবঙ্গ ও কাছাড়ে পালান। তৎকালীন আসামের মুখ্যমন্ত্রী চালিহার চরিত্রের একটি বিশেষ গুণ ছিল, রাজ্যে কোন সংকটকালীন পরিস্থিতি তৈরী হলেই তিনি অসুস্থ হয়ে পড়তেন। এবারেও তাই হল, তিনি অসুস্থতার বাহানায় বিছানা নিলেন, আর অন্যদিকে পুলিশ এবং দাঙ্গাবাজরা এক হয়ে ভাষিক সংখ্যালঘুদের উপর আক্রমণ চালালো। বর্বরতায় সব মাত্রা ছাড়িয়ে গেল সেই আক্রমণ। 

১৫ই আগষ্ট ১৯৬০। অসমিয়া উগ্রজাতীয়তাবাদীদের বর্বরতার প্রতিবাদে পশ্চিমবঙ্গ শোক দিবস পালন করল। সমস্ত সরকারি এবং বেসরকারি অনুষ্ঠান স্থগিত রাখা হল। লোকসভা অধিবেশনে পশ্চিমবঙ্গের প্রতিনিধিরা আসামের বাঙালি নিধন নিয়ে তুমুল হৈ হট্টগোল শুরু করলে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী নেহেরু, গোবিন্দবল্লভ পন্থকে শান্তি দূত হিসেবে আসামে পাঠালেন, কিন্তু গোবিন্দবল্লভ পন্থের শান্তি ফর্মুলাই এককথায় নাকচ করে দিল ব্রহ্মপুত্র উপত্যকা। 

বরাকের প্রতিনিধিরা এবারে ছুটলেন কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে, দিল্লি। কিন্তু কেন্দ্রীয় সরকার নির্বিকার। ১০ই অক্টোবর ১৯৬০, ভাষা বিল পাশ হয়ে গেল আসাম বিধানসভায়। নতুন আইনে সমগ্র আসামে সরকারী ভাষা হলো অসমিয়া। তীব্র প্রতিবাদে সোচ্চার হয়ে উঠলো সমগ্র বরাক উপত্যকা। স্লোগান উঠলো ‘রাজ্য ভাষা বিল আমরা মানি না, মানব না। বাংলাকে অন্যতম সরকারী ভাষা করতে হবে।’

১৫ই জানুয়ারি ১৯৬১, শীলভদ্র যাজীকে সভাপতি করে করিমগঞ্জে সম্মেলন ডাকা হলো। শিলচর সম্মেলনের প্রস্তাব ঘোষণা করা হলো। সমগ্র বরাক উপত্যকা জুড়ে তখন একটাই ধ্বনি, একটাই স্লোগান – ‘জান দেব তবু জবান দেব না।’

৫ই ফেব্রুয়ারি ১৯৬১, করিমগঞ্জের রমণীমোহন ইনস্টিটিউটে জনসম্মেলন ডাকা হলো। সম্মেলনের একটাই দাবি ‘বাংলাকে আসামের অন্যতম রাজ্য ভাষা রূপে মানতে হবে।’ আসাম সরকারের কাছে চিঠি পাঠিয়ে ১৩ এপ্রিলের মধ্যে শেষ জবাব দিতে বলা হল। মেয়াদ উত্তীর্ণ হওয়ার পরও চিঠির জবাব এল না। বরাকের বাঙালিরা বৃহত্তর আন্দোলনের প্রস্তুতি শুরু করল। ঘরে ঘরে সংগ্রাম পরিষদের স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী তৈরি হতে লাগল। এক নতুন মন্ত্রে দীক্ষিত হতে লাগল বরাকের নারী-পুরুষ-শিশু।

১৮ই মে ১৯৬১, ছাত্রছাত্রীদের ডাকে করিমগঞ্জ শহরে মাতৃভাষার দাবিতে শোভাযাত্রা বের হয়। বেলা বাড়তে বাড়তে সেই শোভাযাত্রা গণঅভ্যুত্থানে রূপ নেয়। শাসকগোষ্ঠীর রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে সর্বস্তরের মানুষ যোগ দেন মাতৃভাষার ডাকে সেই শোভাযাত্রায়। শাসকগোষ্ঠী নিজেদের শক্তি দেখাতে সমগ্র করিমগঞ্জ জেলা সৈন্য দিয়ে ঘিরে ফেলে। জারি হয় ১৪৪ ধারা। রাস্তায় রাস্তায় মিলিটারির টহলদারি। করিমগঞ্জের সংগ্রাম পরিষদের দুই নেতা রথীন্দ্রনাথ সেন ও নলিনীকান্ত দাস সহ ছাত্রনেতা নিশীথরঞ্জন দাসকে গ্রেফতর করে শিলচর নিয়ে যাওয়া হয়। এই গ্রেফতারিতে সমস্ত বরাক বিক্ষোভে ফেটে পড়লো। 

১৯শে মে ১৯৬১, ভোর চারটে থেকে বিকেল চারটে পর্যন্ত হরতালের ডাক দেয় কাছাড় জেলা সংগ্রাম পরিষদ। যেভাবে হোক ট্রেনের চাকা চলতে দেয়া হবে না। বিমানঘাঁটিতে বিমানের পাখা ঘুরবে না। অফিসের তালা খুলবে না। ভোর হতেই শত শত আন্দোলনকারী বসে পড়ল রেল লাইনের ওপর। বিমানঘাঁটিতে রানওয়ের ওপর শুয়ে পড়ল আন্দোলনকারীরা। সারি সারি আন্দোলনকারী দাঁড়াল অফিসের গেটের সামনে। শিলচর, করিমগঞ্জ, হাইলাকান্দি, পাথারকান্দি, বদরপুর সব ক’টি জায়গায় শান্তিপূর্ণ উপায়ে হরতাল শুরু হল। 

করিমগঞ্জ রেল-স্টেশন ১৯ শে মে, ১৯৬১। ভোরের ট্রেন আটকাতে আন্দোলনকারীরা রেল লাইন আগলে বসে পড়ে। কয়েকজন রেল লাইনের ওপর উপুড় হয়ে শুয়েও পড়ে। হঠাৎ পুলিশ ওদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে উদ্যত লাঠি হাতে। অমানুষিকভাবে পেটাতে শুরু করলো। কিন্তু আন্দোলনকারীদের রেল লাইন থেকে সরাতে পারল না। স্লোগানে স্লোগানে মুখর হয়ে উঠলো চারদিক – ‘মাতৃভাষা জিন্দাবাদ।’ ‘জান দেব, তবু জবান দেব না।’

এবারে পুলিশ বাহিনী ঝাঁপিয়ে পড়লো হরতালে অংশ নেওয়া নারী আন্দোলনকারীদের উপর। মাথায় রাইফেলের বাট দিয়ে একের পর এক আঘাত শুরু করল। কয়েকজন জ্ঞান হারিয়ে রেল লাইনেই লুটিয়ে পড়ল। বাকিরা রেল লাইন আঁকড়ে পড়ে রইল। রাষ্ট্রীয় কুকুররা এরপর তাদের শাড়ি টেনে টেনে খুলতে লাগলো। সঙ্গে বুটের আঘাত, রাইফেলের বাটের আঘাত, টেনে হিচড়ে রেল লাইন থেকে দূরে ছুড়ে ফেলা সব-ই চলল। 

সরকার, তার তাঁবেদার প্রশাসন সমস্ত দিন চেষ্টা করল ট্রেনের চাকা চালাতে আর প্রতিবারই আন্দোলনকারীদের মনোবলের কাছে হেরে গিয়ে পৈশাচিক অত্যাচার চালিয়ে গেল। আহত আন্দোলনকারীদের সংখ্যা এতই বেশি ছিল যে করিমগঞ্জ অসামরিক হাসপাতালে আর কোন জায়গা ফাঁকা ছিল না। করিডোর, বারান্দা উপচে পড়েছিল আহতদের ভিড়ে। কয়েকশ আন্দোলনকারীকে এরেস্ট করে পুলিশ। শেষে জেলেও জায়গা নেই। অনেক আন্দোলনকারীদের এরেস্ট করে গাড়ি করে নিয়ে দূরে ছেড়ে আসা হয়, সংগ্রাম পরিষদের গাড়ি পেছন পেছন ছুটে গিয়ে আবার আন্দোলনকারীদের নিয়ে আসার ব্যবস্থা করে। এক বিরল ঐতিহাসিক গণআন্দোলন। 

কমলা ভট্টাচার্য

শিলচর রেলস্টেশন, ১৯শে মে, ১৯৬১। অসংখ্য নারী-পুরুষ আন্দোলনকারীর সাথে পিকেটিং-এ যোগ দিয়েছিল ১৬ বছরের কিশোরী কমলা ভট্টাচার্য্য। মাত্র আগেরদিন সে ম্যাট্রিক পরীক্ষা দিয়েছে। মা’কে বুঝিয়ে রাজি করে, মেজদিদির রাখা শাড়িটা পরে সাথে ছোট বোন মঙ্গলা, ছোট ভাই বকুল ও বড়দির ছেলে বাপ্পাকে নিয়ে পিকেটিং-এ সকাল সকালই হাজির হয়েছিল সে। দুপুরের দিকে একবার মা দুশ্চিন্তা করতে করতে নিজেই গিয়ে উপস্থিত হন রেল স্টেশনে। মাকে দেখতে পেয়েই ছুটে আসে কমলা। মায়ের সমস্ত দুশ্চিন্তা দূর করে মাকে বুঝিয়েসুজিয়ে বাড়ি পাঠিয়ে দেয়। দুপুর দুটো। আন্দোলনের নেতৃস্থানীয়রা কিছুটা নিশ্চিন্ত। মারাত্মক অঘটন কিছু আর ঘটবে না। হরতাল সফল।  

বেলা ২:৩৫। বিনা প্ররোচণায় রাষ্ট্রের পুলিশ ও মিলিটারি অবস্থানকারী আন্দোলনকারীদের নির্মমভাবে লাঠি ও বন্দুকের বাঁট দিয়ে পেটাতে থাকে। এলোপাথাড়ি লাঠিচার্জে অবস্থানকারী সবাই ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়। কমলার ছোটবোন মঙ্গলা পুলিশের লাঠির আঘাতে মাটিতে পড়ে যায় এবং সাহায্যের জন্য কমলার উদ্দেশে চিৎকার করতে থাকে। কমলা তাকে তোলার জন্যে যখন ছুটে যাচ্ছে, ঠিক তখনই একটা বুলেট তাঁর চোখ ভেদ করে মাথায় গিয়ে লাগে। অন্যান্য আহত ও গুলিবিদ্ধ অবস্থানকারীদের সাথে কমলাকেও হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে সেখানেই তাঁর মৃত্যু হয়। নিজের মাতৃভাষার স্বীকৃতি আদায়ে প্রাণ দেয় বিশ্বের প্রথম একটি বালিকা ভাষাশহিদ। মঙ্গলাকে সংজ্ঞাহীন অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এক মাস বাদে তার জ্ঞান ফিরলেও বাকি জীবনটা সে শারীরিক ও মানসিকভাবে পঙ্গু হয়ে কাটায়।

রক্তে লাল হয়ে উঠেছিল সেদিন শিলচর প্ল্যাটফর্ম, রেল লাইন। মরতে মরতেও তাদের মুখ থেকে একটাই স্লোগান ধ্বনিত হয়েছিল – ‘মাতৃভাষা জিন্দাবাদ।’ বাংলা ভাষার স্বীকৃতির দাবিতে কমলা সহ এগারজন ভাষা সৈনিক শহিদ হন এবং আহত হন অর্ধশতাধিক। প্রশাসন ১৪৪ ধারা জারি করে। শোকে স্তব্ধ ও হতবাক হয়ে ওঠে সমগ্র বরাক উপত্যকা। ২০মে শোকার্ত আন্দোলনকারীরা ১৪৪ ধারা উপেক্ষা করে গিয়ে ১১ জন শহিদের লাশ নিয়ে বৃহত্তর শোকমিছিল বের করে। শেষ পর্যন্ত আসাম সরকার দাবি মেনে নিতে বাধ্য হয়। বাংলাকেও আসামের সরকারি ভাষা হিসেবে ঘোষণা করা হয়। কিন্তু লড়াই এখানেই থেমে থাকেনি। আবারও ১৯৭২ সালের ১৭ আগস্ট বাংলা ভাষা রক্ষার জন্য শহিদ হন করিমগঞ্জের বিজন চক্রবর্তী (বাচ্চু)। 

১৪ই এবং ১৫ ই ফেব্রুয়ারী ১৯৮৩, দরং জেলার চাউলখোয়ায় চাপরির দশটি গ্রামে অসমিয়া উগ্র জাতীয়তাবাদীদের বর্বর আক্রমণে পাঁচ শতাধিক মুসলমান এবং ভাষিক সংখ্যালঘু মানুষ নিহত এবং হাজারের অধিক মানুষ আহত হন৷ আক্রমণের কারণ, এরা প্রত্যেকেই বাংলাভাষী। 

১৮ই ফেব্রুয়ারী ১৯৮৩, নগাও জেলার নেলীতে উগ্র অসমীয়া জাতীয়তাবাদীদের আক্রমণে তিন হাজার মুসলমান এবং ভাষিক সংখ্যালঘু মানুষের মৃত্যু হয়৷ বর্বরতার সেই ইতিহাস নাৎসি বাহিনীকেও লজ্জায় ফেলে দেয়। একই দিনে কামরূপ জেলার গোরেশ্বর অঞ্চল, দরং জেলার খৈরাবারী, রামপুর ইত্যাদি অঞ্চলে বহু লোক আক্রান্ত হয়েছিলেন৷

১৯, ২০, ২১ ফেব্ৰুয়ারী ১৯৮৩, ধেমাজী জেলার চাপরি, মাজরবারী, রামনগর, কাকোবারী, টঙালী-নলবারী, চিমেন চাপরি ইত্যাদি অঞ্চলে মিসিং জনগোষ্ঠীর একাংশ, এবং অসম আন্দোলনের সমর্থক বাহিনীর লোকেরা ‘বিদেশী খেদাও’-এর নামে সেখানকার বাঙলাভাষি মানুষের উপর আক্রমণ চালায়৷ একইভাবে ধেমাজী’র বিষুপুর, শান্তিপুর ইত্যাদি অঞ্চলেও বাংলাভাষী লোকের ওপর আক্রমণ চলে৷ ফেব্রুয়ারি মাসেই লক্ষিমপুর জেলার বাধকরা অঞ্চলে প্রায় ৫০ জন মানুষকে হত্যা করা হয়, জ্বালিয়ে দেওয়া হয় বেশ কয়েকটি গ্রাম৷ 

ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি আবার শুরু হয় ২০১০ সালের ২১ জুলাই থেকে। ডি ভোটার, এনআরসি ইস্যুতে ২০১৯-এর শুরু অব্দি একাধিক বাঙালি হিন্দু এবং মুসলমান বেছে নিয়েছেন আত্মহননের পথ। কিন্তু যে সময়ে ধর্ম বর্ণের ঊর্ধ্বে উঠে উগ্র অসমিয়া জাতীয়তাবাদী চক্রান্তের বিরুদ্ধে বৃহত্তর বাঙালি জাতিসত্ত্বা, বাঙালি ঐক্যের প্রয়োজন, ঠিক সে সময়েই  আসামে খন্ডিত জাতিসত্ত্বা হয়ে বাঙালি ধুঁকে ধুঁকে বেঁচে আছে। হিন্দু বাঙালিকে ভাবানো হচ্ছে মুসলমান বাঙালির জন্যেই আজ তার এই দুর্দশা আর মুসলিম বাঙালি হিন্দু বাঙালিকে ভরসার যোগ্যই মনে করছে না। দুই দলেরই এই শত্রুতা অসমিয়া জাতীয়তাবাদী এবং সংঘপরিবারের রাজনীতিকে আরো শক্তিশালী করে তুলছে। এবং তাতে বলির শিকার হচ্ছে সেই বাঙালিরাই। 

আসামে ভাষিক সংখ্যালঘুদের সম্মানের সাথে বেঁচে থাকার অধিকার ৫০-৬০ এর দশক থেকে এখন অব্দি এমনভাবে খর্ব করা হয়েছে যে, বর্তমানে তার এক ভয়ানক পরিণতি ভোগ করছে ভাষিক সংখ্যালঘুরা, আরো স্পষ্ট করে বললে বাঙালিরা। এহেন পরিস্থিতিতে ১৯শে মে-কে শুধু একদিন উদযাপনের উৎসব হিসাবে সীমাবদ্ধ না রেখে, শুধুমাত্র একদিনের জন্যে বাঙালি না সেজে, আমাদের প্রয়োজন উনিশের চেতনাকে নিজেদের সত্তার মধ্যে অনুভব করে আগামীর বৃহত্তর লড়াইয়ের জন্যে প্রস্তুত হওয়া। প্রজন্মকে এই চেতনায় উদ্বুদ্ধ করা এবং নিজেদের মুখের ভাষাকে, অস্তিত্বকে সুরক্ষিত করার স্বার্থে সংগঠিত হওয়া। 

‘৫২ সালের একুশই তো পথ দেখিয়েছিল উনিশকে… এবারে উনিশ আমাদের পথ দেখিয়ে নিয়ে যাক সুনিশ্চিত ভবিষৎ এর দিকে…

‘সে-আলো টলে না মৃত্যুর কালো ঝড়ে

তর্জনি তুলে জেগে থাকে ঘরে ঘরে,

দুলিয়ে গলায় তাজা বুলেটের মালা

পার হয়ে শত শ্মশান ও কারবালা

হাজার মুখের মিছিল দিয়েছে পাড়ি

উনিশে মে আর একুশে ফেব্রুয়ারি।’ 

শেয়ার করুন

2 thoughts on “দশটি ভাই চম্পা আর একটি পারুল বোন- আসামের ভাষা আন্দোলন”

  1. কৃষ্ণেন্দু রায়

    আসাম ভাষা আইনের উদ্দেশ্য যে অসমিয়াকরণ তাতে সন্দেহ নেই।কিন্তু পাস হয়ে যাওয়া আইনটা আরেকটু চর্চার অবকাশ আছে,আইনটি র বিরুদ্ধে লড়তে গেলে তার অধ্যয়ন টা জরুরি।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *