অসুখ সারায় যারা

‘নার্সেস উইক’ চলছে। প্রতি বছরই এই ৬ই মে এই সপ্তাহ শুরু হয়। চলে ১২ই মে ফ্লোরেন্স নাইটিংগেলের জন্মদিন পর্যন্ত। চিকিৎসা ক্ষেত্রে  সমস্ত সেবিকাদের গুরুত্বকে মনে রাখার জন্য এই উদযাপন। কিন্তু এই বছর বা আগের বছর, এই বছরগুলি বিশেষ কোভিড পরিস্থিতির কারণে যে প্রবল পরিশ্রম তাঁদের করতে হচ্ছে, তাতে বরং গোটা বছরটাকে নার্সেস ইয়ার বলা ভালো।

ডাঃ শেঠি বলছেন একজন করোনা রুগী যখন  রোগ সারিয়ে বাইরে আসে, তখন তার পিছনে একজন নার্সের অবদান অবিসংবাদিত। কফিনের মতো ঐ পোষাক, তিনখানা মাস্ক- এসবের মধ্যেই তাদের কাটে ঘণ্টার পর ঘণ্টা। প্রখর দুখানা গ্রীষ্ম তাদের এভাবেই কাটল । ছুটি নেই। আনন্দ নেই। প্রিয়জনদের সাহচর্য নেই। আছে চাপ আর চাপ। ব্যাঙ্ককর্মীরা অসুস্থ হয়ে পড়লে তাদের অনুরোধে ব্যাঙ্কের সময় কমিয়ে চাপ কমানো হল। তা হোক। রেলকর্মীরা অসুস্থ বলে ট্রেন কমে গেল। তাও খুব স্বাভাবিক । 

কিন্তু করোনা এত বাড়ছে, আর সামনের সারির যোদ্ধারা কি আক্রান্ত নয় ? সেফ হোম বাড়ছে। হসপিটাল বাড়ছে। বেড বাড়ছে। চাপটা সামলাচ্ছে কে? পড়ে থাকা, ধুঁকতে থাকা স্বাস্থ্যকর্মীরা, আর কে ? স্বাস্থ্যকর্মী তো রাতারাতি বাড়ছে না! 

চাপ কতটা? সাধারণ সময়ের দশগুনের বেশি নয়? দশভুজা হেরে যাবে বেশ কয়েকটা গোল খেয়ে। কিন্তু ওদের কাজের মর্যাদা যে ওরা পায়না কখনও, তা দেখতে পাচ্ছে কজন? 

বাচ্চার করোনা, মা ডিউটি করছে। বরের করোনা, স্ত্রী ডিউটি করছে। কর্তৃপক্ষই বলছেন, একদিনের সর্দি-জ্বর তেমন কঠিন না হলে আর টেস্ট করিয়ে লাভ কী? গড়ে তো সবারই করোনা। নির্বাচন কমিশন আবার আরেক কাঠি। সুন্দর করে করোনার মাটি তৈরী করে, বীজ বুনেও শান্তি পায়নি। সারা বছর অসম্ভব পরিশ্রমে ক্লান্ত নার্সদের তারা ভোটের ডিউটিও দিল। হাসপাতালের রুগীর জীবনের চেয়েও যেন ভোট বড়। এ’কাজে আর কোনো রাজকর্মচারী ওদের চোখে পড়েনি। অথচ অনেক সরকারি দপ্তর আধা চলছে বা প্রায় বন্ধ।

এখন ট্রেন বন্ধ। শুধু রেলের কর্মচারীদের জন্য ট্রেন চলবে। বেশ, খুব ভালো। এই সুযোগে শুধু স্বাস্থ্যকর্মীদের জন্য অমনি করে হসপিটাল খুললে কেমন হত? রেলকর্মীরা কিন্তু কিছুতেই স্বাস্থ্যকর্মীদের ট্রেনে উঠতে দেবে না। বাপরে! ওরা সব করোনার ডিপো। মহৎ এবং প্রচণ্ড জ্ঞানী মন্ত্রী, আমলা বা প্রধানদের কেউ মনে করায় না, যারা লড়বে সামনে, তাদের জন্যেও পিছনে কাউকে লড়তে হবে। তারা যাতায়াত করবে কীভাবে? অতএব ট্রেন বন্ধ ওদের জন্যে। যে বাড়িওয়ালা বহুবার সাহায্য পেয়েছে ওদের বাড়িভাড়া দিয়ে, সে এবার তেড়ে আসছে ওদের তাড়ানোর জন্যে।

অদ্ভুত  নির্মম আর নির্বোধ সময় বইছে ওদের জন্যে। প্রতিদিন মৃত্যু দেখছে৷ মৃত্যুবীজের সঙ্গে মরণপণ লড়াই করতে করতে পথ খুঁজে খুঁজে বাড়ি ফিরছে, বাড়ি ফিরে ভয়ে থাকছে, রোগ যেন না ছড়িয়ে যায় প্রিয় মানুষগুলোর মধ্যে। পরের দিন আবার সমাজ ও রাষ্ট্রের অপদার্থতার দায় নিয়ে মুখ ঢাকছে দমবন্ধ কফিন পোষাকে আর রুগীর নাকে অক্সিজেন দেখলে তারও ইচ্ছে করছে একটান নিতে। সম্ভব নয় তা। একটু অক্সিজেন, একটু প্রাণের জন্যে ছটফট করতে করতে প্রাণ দেওয়ার ব্রতে তারা তো বেতনভূক মাত্র।

আমি প্রাক্তন নার্স। বর্তমানে অন্য একটি সরকারি চাকরি জুটিয়েছি। নার্সজীবনের বন্ধুত্বগুলো রয়ে গেছে অমলিন। এখনও তাদের সাথে আছি নানা হোয়াটস্যাপ গ্রুপে। সেরকম একটি গ্রুপের কথোপকথন তুলে দিই।  নামগুলি অবশ্য পরিবর্তিত হল।

বহুদিন পর গ্রুপটা সক্রিয় হল। একজন একটা ফরোয়ার্ডেড ভিডিও পাঠিয়েছে। তাতে একজন বিখ্যাত ডাক্তার কথা বলছেন।

বলছেন, ‘এ দেশে রাজনীতি ছাড়া কিছু হবে না। রাজনীতির জন্যে মানুষ মারা কল শুধু। আমাদের বাবা মায়েরা বোকা ছিলেন, আমরাও বোকা ছিলাম। তাই ডাক্তারি পড়েছি। এখন এ ভয়ংকর সময়ে এই স্বার্থপর নেতা আর বোকা জনগণকে নিয়ে মরছি। অক্সিজেন নেই। বেড নেই। অথচ পরিষেবা দাও। নেতারা জমায়েত করে করে রোগটা ছড়ালো, ভোটে জেতার জন্যে একে অপরকে দোষারোপ করতে করতে নির্লজ্জ হল। আর আমরা সামনের সারিতে দাঁড়িয়ে সব ঠুঁটো জগন্নাথ।’

ডাক্তারের গলার হতাশা ছড়িয়ে যাচ্ছে মনে। 

বলছেন, ‘কিছুই তো রেডি রাখলো না এ ভাইরাসের সেকেন্ড ওয়েভ আসবে জেনেও। এবার অন্তত শ্মশানের সংখ্যাটা বাড়াও। তাড়াতাড়ি যেন গিয়ে ঢুকতে পারি।’

সত্যি, শ্মশানের বড় আকাল পড়েছে । ধর্মমত নির্বিশেষে গণচিতা, গণকবর এসব করেও সামাল দেওয়া যাচ্ছে না ।

এই ভিডিওর সূত্র ধরেই কথা শুরু ।

– কেমন আছিস সবাই? আমার মনটা খারাপ । একজন দিদি, আমাদের সঙ্গে ডিউটি করত, খুব কাছের ছিল, চলে গেল করোনায়  । 

মুন লিখেছে। আমরা ওকে মুন বলি। ওর হাসপাতালে জলাতঙ্ক, হাম, ধনুষ্টঙ্কারের মতো ছোঁয়াচে রুগী থাকত বলে ওর জন্য আমাদের চিন্তা হত। এ অজানা ভাইরাস মহামারীর স্রোত নিয়ে যখন প্রথম এল, সেই প্রথম ধাক্কাটা ওর হাসপাতালেই লেগেছিল। অন্য সংক্রামক রোগগুলোর কথা তারপরের এক বছরে পৃথিবী থেকে  যেন মুছে গেছে একদম। অন্য রোগগুলোও কেমন জাত হারিয়েছে যেন।

উত্তর দিল ফাগু।

– মাঝে মাঝে মনে হচ্ছে, মনের জোর না হারিয়ে ফেলি।

দেখলাম টাইপিং দেখাচ্ছে। মৌ লিখল, 

– নাইট করে এসে মনে হচ্ছে করোনা আমায় ডাকছে।

মৌ যেমন গায় তেমন নাচে, নাটকও করে দুর্দান্ত । আমার এ গ্রুপে উত্তর দিতে লজ্জা করে। ওদের মনোবল ভাঙছে, তবু আমৃত্যু ওরা টিকে আছে। ওদের লড়াই এর ময়দানে দেখতে দেখতে আমি ক্রমশ যেন খুব ছোট হয়ে যাচ্ছি। 

মৌ লিখল, 

-বাড়িতেও মুখে মাস্ক পরছি,ছেলে কিছুতেই পরতে দেবে না।

মৌ-এর ছেলেটা বড্ড ছোট । সে বোঝে না, মায়ের মুখ না দেখানোর বাধ্যবাধকতা। যদি ছেলে সংক্রামিত হয়, এই ভয় পায় মা। 

একই হাসপাতালের সু লিখল – কোথায় ডিউটি করছিস?

মৌ ডিউটি করছে ইমারজেন্সিতে। সেখানে রুগী পাঁচ ছ ঘণ্টা থাকার পর, সে হয় বেডে যাচ্ছে নয় বাড়ি। এর মধ্যে সারা দিনে পাঁচ ছজন করোনা রুগী থাকছেই। 

কথা এগিয়ে চলে। নতুন নতুন করোনা বিভাগ খোলা হচ্ছে … 

-ধুর, হাত ধোয়ার জায়গাই নেই। নামেই করোনা ওয়ার্ড। 

হঠাৎ সু-এর মতো শিষ্ট মেয়ে গাল পাড়তে শুরু করে। যোগ দেয় অন্যরা। রাগ করুক ওরা। রাগ জল করুক। কী অসম্ভব পরিশ্রম করছে। উপরওয়ালার অত্যাচার, নেতাদের নির্লজ্জ ক্ষমতার ব্যবহার, জনগণের মূর্খামি সব দায় ওরা নীলকণ্ঠ হয়ে বয়ে যাচ্ছে। অসহ্য যন্ত্রণায় তদের অমৃত দেওয়ার দায় নেয়নি কেউ। যে ভাইরাস সারা পৃথিবীকে কাবু করে দিল, নিজের ঘরে না এলে জনগণ ভাবতেই পারছে না যে সে আসতে পারে।

ভোট চলল দেশে। কে কত লোক দেখাতে পারে, মিছিলে চলল তার প্রতিযোগিতাও। রোগ সতর্কীকরণে মানুষের মধ্যে ছয় ফিটের যে ব্যবধানের কথা ধুত্তোরে উড়িয়ে এমনকি মুখের মাস্কটুকুও না পরে এরা মানুষের মরণের পথ বানাচ্ছে। আরও কয়েক বন্ধু যোগ দেয় আলোচনায়। ভাইরাসে সংক্রমণের প্রথম ঢেউয়ে এক মহান বড় নেতা সপরিবারে ভর্তি হয়েছিল সরকারি হাসপাতালের কেবিনে। তারপর প্রাণ অতিষ্ঠ করে মেরেছে সবার । ডাক্তার, নার্স বা অন্য কোনো স্বাস্থ্যকর্মী মেয়ে তার ঘরে ঢুকতে সাহস পেত না, বিরক্তি আর ঘেন্না করত ভয়ের চেয়ে বেশি। একখানা ব্যাগ নিয়ে ভর্তি হয়ে বারোখানা ব্যাগ নিয়ে ছুটি নিলেন তিনি। ফুলে মালায় তাঁকে বিদায় জানাল উমেদাররা। তারপর হাসপাতালের ওয়ার্ডের ছোট ছোট কিন্তু দামি সরকারি সম্পত্তির হিসেব মেলাতে ওরা শেষ।

সেকথা উঠতেই আর একবার দাঁত কিড়মিড় করে ওঠে ওদের। ‘থুঃ!’ শুনতে শুনতে আমারও যেন মাথা গরম হয়ে যেন জ্বলতে থাকে। ওরা মৃত্যুমিছিলে সামনের সারিতে দাঁড়িয়ে। অথচ ওরা দুর্নীতিপরায়ণদের মারবার ইচ্ছা প্রকাশ করতে থাকে। ওরা মজা পাচ্ছে তাতে।

কাটুক, কাটুক, ওদের মন খারাপের মেঘ কাটুক। কেবল অসুস্থতা আর মৃত্যুর খবরের মধ্যে এতদিন পর আজ ওরা মজা করতে পারছে যদি, করুক। 

সবিই আবার বেসুর এনে বলে- ইচ্ছে করে চাকরিটা ছেড়ে দিই ?  কিন্তু…

এখনও কোভিডমুক্তি ঘটেনি ওর পরিবারের। ওর গলায় আনন্দ নেই। ঐ ডাক্তারের থেকেও হতাশা।

কল্পি  লেখে – জানিস ডিউটিতে মনে হয় ঘামে ডুবে গেছি প্লাসটিক পোষাকটার মধ্যে। দম বন্ধ লাগে। আর বাঁচব না মনে হয়। এক এক সময় মনে হয়, পেশেন্টের নাক থেকে অক্সিজেন নিয়ে নিজের নাকে গুঁজি।

মৌ যেন প্রতিজ্ঞা করেছে কাউকে হতাশ হতে দেবে না। কারও মন খারাপ হতে দেবে না। ওর জ্বর, তবু ও ডিউটি যাবে। টেস্ট করাতে ওর বিশ্বাস নেই। নিজের হাসপাতালের যা অবস্থা, তাতে ওখানে ভর্তি হওয়ার কোনো সাধ ওর নেই। যা হবার হবে। ও ঘরেই থাকবে। তাতে যতক্ষণ পারে ডিউটি চালাবে। ও চটপট উত্তর টাইপ করে।

– তাই করিস কল্পি, একবার পেশেন্টকে দিবি, একবার নিজে নিবি। যা অভাব অক্সিজেনের, সেই ভালো।

এ ভয়ংকর চিত্রটাতে অসম্ভবতা আছে। তাই হঠাৎ একটা হাসির বান ডাকে। হাসির আর ভালোবাসার চিহ্নে থাকে থাকে ভরে উঠতে থাকে আমাদের বন্ধুত্বের দেওয়াল।

 

ইচ্ছে করে ভেঙে না যাক ঝিলিক মেরে ওঠা আড্ডার এই হাসিটুকু সবার। কঠিন বাস্তব তো বদলাবার নয়। অসম্ভব কল্পনায় হাসুক ওরা ।

চেনা শত্রু থেকে ওরা অদৃশ্য শত্রুতে বয়ে যায়। অনিবার্য মৃত্যু নানাপথে এসে ওদের মন ভাঙে। চিতা দেখতে দেখতে মৃত্যুর সামনে সব এগিয়ে যায় বুক চিতিয়ে। প্রতিদিনে প্রতিরাতে। বুকের ভিতরটা তিরতির করে।

শেয়ার করুন

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *