আয়নাদেশের কিস্‌সা

কুকুর ও মানুষ

ওকে দেখে বয়স বোঝা যায় না। একদল যদি বলে সে মোটে একটা বাচ্চা, তো অমনি আরেকদল সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠবে, মোটেই না, অমন কুঁচকোনো চামড়া, তোবড়ানো গাল আর জিরজিরে হাড় কি বাচ্চাদের হয় নাকি? উত্তর আসবে, তাহলে অমন ছোট্টখাট্টো চেহারা হয় কী করে? কী করে আবার, বয়েস হতে থাকলে মানুষ আবার ছোট হয়ে যায়, কুঁচকে কিসমিস হয়ে যায়, জানা নেই নাকি? ব্যাস, শুরু হয়ে যাবে ঝগড়া! সত্যি, এত বোকা-বোকা জিনিস নিয়ে যে-লোকে ঝগড়া করে, কী বলব!

এ তো গেল বয়স। অনেকে আবার বুঝে উঠতেই পারে না, সে কি মেয়ে, নাকি ছেলে? কাঁথাকানি জোব্বার মতো জড়িয়ে থাকে, ন্যাড়ামতো কদমফুল মাথা, আর কেউ ওকে কোনওদিন কথা বলতেও শোনেনি। কোনওরকম শব্দই কেউ ওকে কখনও করতে শোনেনি। 

সারাবছর ওকে দেখাও যায় না। কোনও কোনও শীতকালে, যখন চারদিকে খুব ধুলো আর সন্ধের দিকে চাপ-চাপ কুয়াশা আর ধোঁয়ায় চোখ জ্বালা করে, ওকে দেখতে পেতেও পারো। একটা পোঁটলা কাঁধে, তাতে কী-না-কী জমিয়ে রেখেছে, কাগজ-ন্যাকড়া-ছেঁড়াফাটা বই-ভাঙা কাঁচ আরো কত কী। মাঝেমাঝে ওর পোঁটলাটা ওর চেয়ে বড় দেখায়। পোঁটলাটা নিয়ে বসে থাকতে দেখবে ওকে পগারের ধারে, কিংবা কালভার্টতলা পেরিয়ে, যেদিকে মাঠ শুরু হচ্ছে সেদিকে। যে-রাস্তাটা চৌমাথা থেকে সোজা বাজার পেরিয়ে মাঠের দিকে গেছে, সেটা বেয়ে উঠে আসতে দেখবে ওকে কখনও কখনও। একটা পোঁটলা কাঁধে, জিরজিরে দোমড়ানো আবছামতো মানুষ, যে কোত্থেকে আসে, কোথায় যায়, কেউ কি জানে ঠিক? 

কিন্তু একটা কথা নিয়ে কারো কোনও সংশয় নেই। ওকে যখনই দেখা যায়, ওর সঙ্গে থাকে একটা কুকুর। 

দিশি কুকুর। খয়েরির মধ্যে সাদা ছোপ-ছোপ, চিকন দেহ। লেজটা কাশফুলের মত। যতক্ষণ দেখা যায়, সাথের মানুষটার সঙ্গছাড়া হয় না। প্রায়ই দেখা যাবে, পথের ধারে একচিলতে কোণে ব’সে সে আর তার মানুষ, একে অপরের গায়ে গা লাগিয়ে। সাথীর মতোই সেও চুপচাপ, কাউকে দেখে একটু ভুক বা ভাক কখনই তাকে কেউ করতে দেখেছে ব’লে মনে পড়ে না। তোবড়ানো এক এনামেলের সানকিতে ভাতের সাথে রুটি, চাউমিন কিংবা বনরুটি, সিঙাড়া কিংবা ঘুগনি বা কোনও দোকানের বেঁচে-যাওয়া চিলিচিকেনের ঝোল একসাথে মণ্ড বানিয়ে খেতে দেখবে দুজনকে। মানুষ নিজে খায়, কুকুরও নিজে খায়, আবার নিজে খেতে খেতে মানুষ কখনও একদলা মণ্ড তুলে দেয় কুকুরের মুখে, কুকুর সেসব কোঁৎ ক’রে গিলে নিয়ে গাল আর হাত চেটে দেয় মানুষের। বৃষ্টিতে এক প্লাস্টিকের চাদর মুড়ি দিয়ে বসে থাকতে দেখেছে দুজনকে, এমন লোকের সংখ্যা কম নয়। 

অথচ কেউ যদি পিছু নিত ওদের, যখন ওরা হঠাৎই উধাও হয়ে যায় মাঝেমাঝে, তাহলে জানা যেত আরেক গল্প। অনেক পথ পাড়ি দিয়ে, দিনের রাতের ভোরের বিকেলের অনেক অনেক পথ, ওরা পৌঁছে যায় সেই পাহাড়ের তলায়, যেখানে রয়েছে আয়নাদেশে যাওয়ার রাস্তা। 

আয়নাদেশের কথা

লোকে যখন জন্মায়, বেঁচে থাকে-খায়দায়, এই মাটি-পাথর-জল-হাওয়ার দুনিয়ার পাশাপাশি আরেক দুনিয়াতেও তাদের ঘুরতে দেখবে আজকাল। একইসাথে তারা দুই দুনিয়ায় বাঁচে, দুই দেশেতে একইসাথে দিন কাটায়। সেই দেশের নাম আয়নাদেশ। আমাদের এই দুনিয়ার ওপরে সেই আয়নাদেশের ঠাঁই। 

আয়নাদেশের মধ্যে অনেকগুলো ভাগ। একদম নিচে, যেখানটা জুড়ে থাকে আমাদের এই দুনিয়ার সাথে, সেখানটা অনেকটা মাটির নিচের খনিগর্ভের মতো। আমাদের এই দুনিয়ায় যারা জন্মাল, তাদের সব খবরাখবর নিরন্তর জমা হয়ে চলেছে সেই খনিগর্ভে। তেলের কূপের মতো ভলভলিয়ে উঠছে নামধাম, ছবি, কে কোথায় কার সাথে ঘুরতে গেল, কে কী খেলো কবে। কে কী কিনতে চায়, কার কী কী শখ আহ্লাদ, সব হিসেব লেখা থাকছে সেখানে, আর সেসব পাঁজা পাঁজা হিসেব একসাথে স্তরে স্তরে আকরিকের মতো জমা হয়ে থাকছে। তারপর সেসব খবর খুঁড়ে খুঁড়ে তুলছে আরো মানুষ, আর খুঁড়ে তোলা খবর জমিয়ে আয়নাদেশে তৈরি হয়ে যাচ্ছে আমাদেরই মতো দেখতে, আমাদেরই নামধারী একেকটা আয়নাশরীর। তারা চলে-ফিরে বেড়ায়, কথা কয়, আয়নাদেশের চকচকে ঝকঝকে পথেঘাটে মাঠেপ্রান্তরে তারা সারাদিন গজল্লা করে। 

যদিও আয়নাদেশে নাকি যে-কেউ চাইলেই যেতে পারে, কিন্তু আসলে সেখানে যাওয়াটা অত সহজ নয়। এমনিতে সকলের সব খবরাখবরই শুধু পৌঁছয় সেখানে, সশরীরে সেখানে ঢোকা যায় না। খুব কম লোকেই জানে সে পথ। আয়নাদেশের খবরখনিরও পেছনে, একদম তলায় আছে বিরাট বিরাট কলকবজা আর যন্ত্রপাতি। সেসবের সঙ্গে কথা কওয়ার ভাষা জানে শুধু কিছু হাতে-গোনা মানুষ। শুধুই মানুষ, আর কোনও পশুপাখি জীবজন্তু পোকামাকড় সেই ভাষা জানে না। আয়নাদেশে গাছপালা ভরা, চমৎকার সব ঘন জঙ্গল, কুয়াশাঘেরা পাহাড় আর নদীর কাকচক্ষু জল টলটল করে, কিন্তু তুমি সেসব ধরতে যাও, গাছের তলায় গিয়ে ছায়ায় বসতে চাও, দেখবে গাছের মত দেখতে আসলে ওগুলো সব জ্যান্ত জ্যান্ত ছবি! আর সেসব জ্যান্ত ছবি তৈরি করতে, সচল রাখতে, হাজার হাজার লোক দিনরাত খাটছে — খনি থেকে খবর খুঁড়ে তুলছে, কলকবজা চালাচ্ছে, আজগুবি ভাষায় আর সংখ্যায় লেখা পাতার পর পাতা মন্ত্র আউড়ে চলেছে যন্ত্রপাতির কানের কাছে! 

আয়নাদেশে ধুলো নেই ধোঁয়া নেই, ওখানে নিশ্বাস নিতে অক্সিজেন লাগে না, কারণ মানুষের রক্তমাংসের শরীরই নেই ওখানে। কিন্তু মন আছে। মন আছে, তাই রাগ-হিংসে-ভয়-ঘৃণাও আছে। আয়নাদেশের মানুষের মনের অর্ধেকটা যদি ওখানে, তো অর্ধেকটা এখানে। আর সেসব মনের চাবিকাঠি নেড়ে চলেছে একদল লোক, যারা জানে কীভাবে মানুষের মনের লোভ-রাগ-ঘৃণার আগুন উশকে দিতে হয়…

আয়নাদেশের পথে

পাহাড় বেয়ে চলেছে আমাদের আধাচেনা সেই কুকুর, আর তার পিছু পিছু চলেছে তার মানুষ। সেই-যে, যার বয়স বোঝা যায় না, ছেলে-না-মেয়ে বোঝা যায় না, এমনকি মাঝে মাঝে এতটাই ঝাপসা হয়ে যায় যে বোঝা যায় না আদৌ আসল মানুষ কিনা। আর কুকুর? সে চলেছে কান খাড়া করে, বরফের মধ্যে তার মানুষকে পথ দেখিয়ে নিয়ে। ওদের পেছনে বরফের উপরে ছোট ছোট গর্ত সারি দিয়ে চলে গেছে বহুদূর — ওদের পায়ের ছাপ। 

চলতে চলতে ওরা দেখেছে, বরফে জমাট বেঁধে পড়ে আছে কত ছেঁড়াভুঁড়া চপ্পল, আধখাওয়া রুটি, চটের বস্তা ছিঁড়ে ভেতরের প্লাস্টিক-মলাটের বইখাতা বেরিয়ে রয়েছে। আর মাঝেসাঝে পড়ে আছে কত মানুষের জমাটবাঁধা শরীর — বরফের ঠান্ডায় সেসব রয়েছে টানটান, দেখে মনে হয় বরফে শুয়ে তারা ঠান্ডা পোয়াচ্ছে। তাদেরকে পেরিয়ে আমাদের সেই কুকুর আর সেই মানুষ চলেছে। 

চলতে চলতে একসময় তারা পৌঁছে যায় বিশাল এক পাঁচিলের সামনে। পাহাড়ের মাথায় সে পাঁচিল, আর পাহাড়ের অন্য ঢালে আশ্চর্য বাঁধানো রাস্তা, হুশ হুশ করে উঠে আসছে রোপওয়ে, আর সেসবে চড়ে এসে নামছে নাকউঁচু ভুরুকপালে চকচকে জামাকাপড়ের লোকজন। আমাদের চেনা কুকুর আর মানুষকে তারা কেউ দেখতে পায় না অবশ্য। পাঁচিলের গায়ে ছোট্ট এক ফোকর, সেখানে যেতেই কুকুর আর মানুষের পথ আটকায় সুট-টাই পরা এক ফটকদার। সেই বিরাট পাঁচিলের ছোট্ট ফাটলটার সামনে সে দাঁড়িয়ে আছে। কেউ তাকে পেরিয়ে ঢুকতে পারবে না ভেতরে। তারপর আমাদের চেনা কুকুর ও মানুষের সঙ্গে ফটকদারের যে কথাবার্তা হয়, তা এরকম: 

ফটকদার: তোমরা এখানে কেন এসেছ? জানো না এখানে সশরীরে ঢোকা যায় না?

কুকুর ও মানুষ নীরব।

ফটকদার: এ হল আয়নাদেশের পথ। তোমরা কি আয়নার ভাষা জান? যন্ত্রের ভাষা জান?

কুকুর ও মানুষ নীরব।

ফটকদার: তোমাদের কাছে কি এখানে ঢোকার চাবিকাঠি আছে?

কুকুর ও মানুষ নীরব।

ফটকদার: ও, মাপ করবেন, ভুল হয়ে গেছে। (কুকুরকে) আপনি নিশ্চয়ই স্বয়ং ধর্মরাজ? আর, ইনি নিশ্চয়ই জ্যেষ্ঠ্যপাণ্ডব যুধিষ্ঠির? 

কুকুর ও মানুষ নীরব।

ফটকদার: ধর্মরাজ, দয়া ক’রে স্বমূর্তি ধরুন। আপনি স্বমূর্তি না ধরলে আমি জ্যেষ্ঠ্যপাণ্ডবকে প্রবেশের অনুমতি দিতে পারি না!

কুকুর ও মানুষ নীরব।

ফটকদার: ও, বুঝতে পেরেছি! আপনি আমায় পরীক্ষা করছেন ধর্মরাজ! ভেবেছেন আপনাকে চিনতে পারব না! কিন্তু আমি কি অতই কাঁচা? 

কুকুর ও মানুষ নীরব।

ফটকদার: এই আয়নাদেশে আপনারা প্রবেশ করবেন সশরীরে, আর সেই প্রবেশের সঙ্গে জুড়ে থাকবে আমার নাম! সে আমার পরম সৌভাগ্য! আমি তো ভাইরাল হয়ে যাব! দিকে দিকে ছড়িয়ে পোড়বে আমার নাম! দাঁড়ান, এইবেলা একটা সেলফি তুলে রাখি! 

কুকুর ও মানুষ নীরব।

সেলফি তোলার জন্য উপযুক্ত রূপটান দিয়ে, জাবদা মোবাইল ফোন বাগিয়ে ফটকদার ওদের দিকে ফিরে দ্যাখে কী, কেউ কোত্থাও নেই! চারিদিক খাঁ-খাঁ। কুকুর আর মানুষ বরফ ভেঙে ভেঙে ফিরে যাচ্ছে অন্য এক দিকে। আর তারা যে-পথ দিয়ে এসেছিল, সেখানে তাদের পায়ের চাপে তৈরি হওয়ার সার-সার গর্তগুলো পড়ে রয়েছে শুধু। একটু পরে ওদের আর দেখা যায় না। 

শেয়ার করুন

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *