চতুর্থ তোরণ

সহজের কাছাকাছি কিছু হৃদয় ঘুমোয়,

তারা জানে প্রতিটি দূরত্বে সূর্য আঁকা থাকে, 

আর সময় ফিরে যায়, সময় এগিয়ে আসে,

কিছুটা স্রোতের মত, সমস্ত অনন্তময়।

পঞ্চম নেমে এলে যে সুতীব্র আলো এসে ভাসিয়ে নিয়ে যায়, তাকে অধিষ্ঠান করি, আর দেখ কিভাবে ছন্দ খুলে যায়-

যেটুকু চলে আগে ও পিছে বিষণ্ণ ধৈবতে

মুহ্যমান মানুষীভ্রমে একাহারী মায়ামৃগ,

কে যেন তাকে ফিরে ফিরে ডাকে মন্দ্র সপ্তকে

সুআদিম বিস্ফোরণ জাগে তন্ত্রীতে অনাহত। 

তোমাকে বলছি, যদি প্রথমেই চমক খুঁজে থাক, তাহলে তুমি কবিতার কেউ নও। যদি ঘটনার ঘনঘটা ঘিরে ঘিরে তোমার সমস্ত খুলে দিতে চাও, তাহলে তুমি কবিতার কেউ নও। যদি তুমি একা একটি সুরে দাঁড়িয়ে না অনুভব করতে পার যে আসলে এ পৃথিবীতে সমস্ত দৃশ্যই অবিরল তরঙ্গস্রোত তাহলে তুমি কবিতার কেউ নও। তুমি শুধু নিজেকে দেখাতে চাও। প্রতিটি গান্ধার আয়না, তার প্রতিটি অবয়ব সত্য। সহজ এখানে বালিকার মত লুকোচুরি খেলে। শুধু নিজেকে দেখালে, তাকে কখনো পাবে না। বার বার তার মায়াটুকু নকল করে যাবে আর আপনিই বুঝে যাবে, যে তুমি এখনও কবিতার কেউ নও। 

এটুকু পর্যন্ত কিছু বিয়োগ ঘটানো গেল। এবার আসি তোমার কথায়; সমাজসংস্কারক, গরীব-দরদী, গদিয়ান ভুয়ো বিপ্লবী পুরুষ তোমার দিকে। দুবেলা দুমুঠোর স্থানে পলান্নে প্রতিপালিত তুমি এই যে ঘুরে ঘুরে ছিদ্র খুঁজে বেড়াও, কান পেতে শোন, এই তো সবে দুই সপ্তক পেরিয়ে ট্রিলিং শুরু হয়েছে। আর এদিকে ঘষিৎ চলছে মুদারায়। এমতাবস্থায় গল্প শুরু হোক?-

এখানে এখনো গ্রামে গ্রামে মেঠো প্রদীপ জ্বলে সন্ধ্যায়,

যদিও রায়ডাক ডুবে যাবে আর কিছুদিন পরেই। এক দুঃখ বুকে নিয়ে আর কত দুঃখের আশঙ্কায় মানুষ ভুলে গেছে পরবের দিন, ভুলে গেছে কে কোথায় কবে কাকে কিভাবে ডেকেছিল, হাতে হাত রেখে বলেছিল দেখা হবে তো আবার? বর্ডার পেরিয়ে ওদিকে যারা রয়ে গেছে এপাশের মানুষের তারা সব নদীর দু’তীরে এখন সামান্য নৌকা বাইচের স্বপ্ন দেখে আর ভাড়েয়া গ্রামের কতিপয় রাভা ভাই-বোন গান ধরে মাছ মারতে যাবার। আর তোমার শহরে যামিনী অকুলান খিস্তি-খেউড়ে, লোভে ও ঘৃণায়। শোন, এই লেগাটোয় শোন, কোন অব্যক্ত যন্ত্রণায় এক গ্রামীণ সমকামী নারী রোজ ডুবে যায়, লুকিয়ে পড়ে আড়ালে শুধু নিজেকে খুন করবে না বলে, যেহেতু সে শুনেছে সপ্তক থেকে সপ্তকে সহজের অনায়াস যাতায়াত তার শৈশবের নদীতে নদীতে। 

কায় দিবে তোক আনি রে তোর 

নিপুছানি জোনাক,

তোর আগদুবাড়িত পানি,

ভোলেক তিপুরানি ফিরাক্। 

সারিন্দা গানের সময় এখন। এই সময়ের সারিন্দা গানের। কলম তুলে দরোজা খুলে দিয়েছি, এবার দেখ কিভাবে ভাষা বদলে যায়, কিভাবে সময়ে ফিরে যায়, ফিরে আসে। তুমি আধার খুঁজছ জানি, এক জায়গায় দাঁড়িয়ে মাপতে চাইছ সরলরৈখিক কোন উপায়ে পুরো বিষয়টাকে। কিন্তু এখানে কোন ভালবাসা নেই যে তোমার জন্যে, কোন ছাড় নেই তোমার! এখানে তুমি বন্দী দুটো চোখ, যার দেখে যাওয়া ছাড়া আর কোন কাজ নেই। ফলে দেখ, চারটি দোতারার ডাং পড়বে, বুঝে নিও ধরতাই। ওদিকে অখমিয়া সোয়ালীরা তোমায় দেখে দুয়ো দেবে আমার সাথে দাঁড়িয়ে, হাজং ও বোরো ভাষায় উত্তরোত্তর টিপ্পনী দিয়ে যাবে, তোমার লজ্জা করবে খুব, পালাতে চাইবে জানি, তাও দেখ। 

ঘোড়দৌড় পরবর্তী অধ্যায়ে লাল লাল ইঁটের ইমারত ও তোমাদের সমস্ত বুজরুকি পেরিয়ে এই দেখ নতুন ইতিহাস লেখা হচ্ছে। এতদিন পেছনে একটা ব্যাগ ঝুলিয়ে তিপুরানি কুঁড়েঘর থেকে সমস্ত প্রত্ন হজম করে ফিরে গিয়ে তারপর ব্যাখ্যা দিয়েছ, আমাদেরই শুনিয়ে গেছ আমাদের ইতিহাস। সেখানে আমাদের কোন বক্তব্যই নেই! খুব ইচ্ছে করছে তোমাকে ক’টি ইমোজি দেখাতে, দেখাই? কি ভাবছ কোন ফর্ম নেই? জীবনের আছে হে? 

*ফিরাক্ এখানে নাম নয়  separation অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। অহেতুক ভ্রান্তি এড়াতে এটুকু টিকা রইল। 

মেচকোকা গ্রামের চল্লিশোর্ধ্ব সরুবালার ভঙর উঠেছে। তিনি হাসছেন, কখনও কাঁদছেন। ওঝা এসেছেন যথারীতি এবং ঝাড়ফুঁক চলছে, যদিও সেরে ওঠা না ওঠার সময়সীমা আল্লাই জানেন। এহেন অবস্থায় পাশের দুতিনটে গ্রাম এসে ভিড় জমিয়েছে আর মুরুব্বি গোছের কিছু মাঝবয়েসী পুরুষ থেকে থেকে হেঁকে চলেছেন, ‘মহিলারা একটু সরে যান! মহিলারা একটু সরে যান’! যেন পুরুষেরা নেই ভিড়ে! এই ভয়ংকর অরাজকতাকে পাশ কাটিয়ে আমি বেরিয়ে পড়ি সাইকেল নিয়ে, পুকুরপারে এসে বসি। কানে বাজে দুএন্দে দুএন্দে…

তাল কেটে যায় হঠাৎই বিষহরার মুখাবাঁশিতে। ওপাড়ায় ভাদ্রমাসে শুরু হবে বিষহরা তারই তোড়জোড়। সাজগোজ করে মহিলাবেশে পুরুষ বেহুলা বিড়ি নিভিয়ে মহলায় ঢুকে যান বাড়ির অন্দরে, পেছনে চাঁদ সদাগর, ল্যাঙা, সনকারা। অহো সে কি দৃশ্য! সপ্তডিঙা মেঘ আকাশে আর চাঁদ ডুবে  যাচ্ছে। ঝমঝম করে বাজছে খোল-কর্তাল। পুকুরপার জুড়ে ঘন হয়ে আসছে। দুএন্দে দুএন্দে…

ঠিক এসময়েই ভানুপাগলী এসে আমার কাছে বিড়ি চেয়ে বসে। ভানুপাগলী ওপাড়ার ন্যাবা পাগলীর মেয়ে। পাগল বলে ওকে ওর মায়ের নামে ডাকা হয়, পাগল না হলে হয়তো ওকে বাবার নামে ডাকতো লোকে। ন্যাবাপাগলী ভানুপাগলীকে জন্ম দিয়েই মারা গেছে, শোনা যায় সে নাকি খুব মেয়েদের কোলঘেঁষা ছিল আর নিজের বরকে দেখলেই গোটা বাড়িময় পালিয়ে বেড়াত। কবিরাজি শিকড় বাকড় খাওয়ানো হয়েছিল ন্যাবাকে, তারপরেই সে পোয়াতী হয়। ভানু তার মায়ের মতই ঈষৎ গোলমেলে মাথায়। গাছে গাছে জল দেয় আর এর তার কাছে বিড়ি চেয়ে বেড়ায়। ভানু কেন জানিনা চিরকালই আমায় পছন্দ করত খুব। আমি মেয়ে হয়ে ছেলেদের মত হাফপ্যান্ট আর টিশার্ট পড়ে সাইকেল নিয়ে ঘুরে বেড়াতাম বলে লোকে দূরছাই করত। শুধু ভানু আসত মাঝে মাঝে গল্পগাছা করতে, আমার বিড়িতে হাতেখড়িও ওরই দৌলতে। এখন আমি বিড়ি কিনে ওকে খাওয়াই। তো এহেন ভানু আমার সাথে ট ভাষায় কথা বলত, শিখেছিল রিকশওয়ালাদের কাছে, এক রিকশওয়ালার সাথে প্রেম ও করেছিল কিছুদিন। একথা শুধু আমি জানি।

ভানু- বিপিটড়ি দেটপ। 

আমি- নেটপ। এপেকপটাই আটপছে৷ 

দূর থেকে হরিবোল ধ্বনি ভেসে আসে। কে যেন মারা গেছে। ভানু চমকে উঠে নমস্কার করে, আমাকেও তাই করতে বলে ইশারায়। আমি হাসি শুধু।ওকে পাশে বসতে বলি। ভানু বিড়ি ধরায়, টানতে থাকে ফুঁক ফুঁক। কিছুটা সময় এভাবে যায়। তারপর-

ভানু- অপটনেপক লোপোটক দেটখপছে। 

আমি- জাটপনি। কিপিটন্তু কেপটউ স্বীপিটিকার কটরপবে নাপট। তুপিটই বিপিটড়ি খাটপ।

মুই ঘাটার ভিতি চাং

ঘাটা সলসলা উদাং

বাউদিয়া মোর কলম

ধরি ছনুয়াতে সোন্দাং। 

অতঃপর শূন্যতা দেখি শুধু। দূর থেকে আরপেজিও ভেসে আসে কানে। ফিরে ফিরে বাজে, ভেতরে ভেতরে পাক খায় সারেঙ্গী। সাতে সাতে, সাথে সাথে। 

অথচ ব্যবহার করিনি কখনো সারেঙ্গী আমি। অনেক টাকার ব্যাপার কোন সারেঙ্গীবাদককে স্টুডিওতে নিয়ে আসা। এসব তাই মনে মনে থাকে৷ নকল কিছু উদযাপন দেখি, দেখি পরিচিত শহুরে মানুষের লোভ।  ক্ষতি তো করিনি কারু কিছু, শুধু গান রেখে যেতে চেয়েছি,অনেক অনেক, যতটা পৃথিবীকে দিতে পারি। অথচ নারীরা শুধু গানের জন্যে বলিপ্রদত্ত প্রতিটি যুগে, গান সৃষ্টি তো তাদের বারণ। গান গাও কিন্তু সৃষ্টি একা করবে কি করে পুরুষ ছাড়া! পাশে রাখো দাদা বা ভাই, পিতা বা প্রেমিক কাউকে তবে তো তুমি স্বীকৃতি পাবে স্রষ্টার! তুমি বলবে হয় তো, তবুও তো কেউ কেউ করে ফেলে। উদাহরণ আছে! কিসের উদাহরণ? ওই যে দেখ দূরে পুকুরের ওপারে সরকার বাড়ির মাম্পি হেঁটে  যাচ্ছে। কন্যাশ্রী পেয়েছে তারপরই স্কুল শেষ। এবার কিছুদিন পর ওর বিয়ে হয়ে যাবে। ওর বান্ধবী ওকে সাইকেলে করে শুধু বিকেলবেলায় ঘোরাতে নিয়ে যায় ফুচকা খেতে, এটুকুই ওর স্বাধীনতা। ভাল ভাওয়াইয়া গাইত, ভবিষ্যতে গাইবে কিনা কে জানে! আমার সাথে ওরা কথা বলেনা, ওদের বাড়ির বারণ। হাসে মুখ লুকিয়ে আমি যখন সামনে দিয়ে চলে যাই, বুঝি, আমাকে ভাবে উন্মাদ। শুধু পড়াশোনা জানি, বড় শহরে থেকেছি বলে পাগলী বলে না হয়তো। ওরা ভাবে দূর থেকে আমায় দেখে আহা, একা মেয়ে কত কষ্ট! আমিও অনুরূপ ভাবি, ভাবি ওদের কত কষ্ট! অথচ কেউ কারুর সাথে কথা বলিনা। কোলকাতায় মেয়েদের মিছিল বেরোয়। এখানে তাদের নিয়ে সান্ধ্যকালীন আলোচনা বসে। হাসাহাসি হয়। সংগতি, সংগতি চাই বুঝলে সে জিও মার্টে গিয়ে কেনাকাটা করাই হোক, বা স্টুডিওতে গিয়ে ট্র‍্যাক বানানো হোক বা একটি মেয়ের সামান্য কটা দিন একটু স্বাধীনভাবে বেঁচে থাকা, লটকা খেয়ে রথ দেখে বন্ধুদের সাথে সাইকেল নিয়ে গ্রামের পর গ্রাম চষে বেড়ানোর। এই দেখ আবার প্রবল ইমোজি ব্যবহার করতে ইচ্ছে করছে!

হরিবোল ধ্বনি মিলিয়ে যায়। মেঘ করে এসেছে বড়।ভানুপাগলী একা ফিরে যায় পুকুরপার থেকে। সরুবালা ওঝার হাত থেকে ঝাঁটা কেড়ে নিয়ে ন্যাবাপাগলীর মত গোটা বাড়িময় দৌড়তে শুরু করে আর ঝড় শুরু হওয়ার আগে সাউন্ডস্কেপে জুড়ে দিই একটা লো রাম্বল… 

(চলবে)

শেয়ার করুন

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *