বাস্তার-রিয়ালিজম বা জাদু বাস্তারবাদ

দোদি মারা গেছে। অথবা, মারা যাচ্ছে। যেতেই পারে। কী নাকি বিষ ঢুকে গেছিল লৌ-তে। তাইই বা আশ্চর্য কী! ছোটলোকেদের অমন হয়। কোন বনেবাদাড়ে ঘোরে। ইঁদুর মাকড় খায়। ওদের অভ্যাস থাকে ওসব। ছোট থেকেই সয়ে যায়। কখনও বিষ বেশি ঢুকে গেলে দাস্ত হয়, চোখ উল্টে যায়। তখন কাঁধে ক’রে বা সাইকেলে চাপিয়ে সদরে ছোটে। কেউ বাঁচে। মরে যায় কেউ। আবার পয়দা হয়। এসব চলতেই থাকে ওদের। ধুস্‌, এসবে পাত্তা দিলে সূর্য উঠত না, চাঁদের কমা-বাড়া থেমে যেত। দোদি মরবেই। তো? মাঝে একবার হইচই হয়েছিল। ভগবৎ ফ্যাক্টরির থেকে দূষিত জল ছড়িয়ে পড়ায়। সে জলে এত বিষ যে লোক অসুস্থ হয়ে পড়ছিল। দু’টো বাচ্চা আর পাঁচটা ভৈঁস মরেছিল। একটা পোয়াতির পেট খসে গেছিল। শ’খানেক লোকের চামড়ায় দাগড়া দাগড়া ঘা হয়ে গেছিল। অমন কেলে চুকচুকে গায়ে ঘা-গুলো ফুলে উঠছিল বলে বেশ ফোটোজেনিক হয়েছিল, নামী কমার্শিয়াল ম্যাগাজিনের কভার পেজও! কিন্তু, মাত্র দু’মাসের মধ্যে এত রোগ ছড়াচ্ছে দেখে পঞ্চায়েতের লোক মিটিং করেছিল ভগবৎ ফ্যাক্টরির ম্যানেজারের সঙ্গে। কয়েকদিন পরে সাতটা গ্রামের লোক ফ্যাক্টরির গেটে বিক্ষোভ দেখাতে গেলে ‘দূষণ নেই’ লেখা একটা নোটিশ সেঁটে দিয়েছিল ম্যানেজারের লোক। নোটিশে সরকারি বাবুদের সই। তবে, দু’হপ্তার মধ্যে আরও তিনটে বাচ্চা, চারটে কুকুর আর দু’টো ভৈঁস মরে যেতে তেড়েফুঁড়ে উঠেছিল পেট-শুকোনো হাড়-জিরোনো গাঁইয়াগুলো। তারপর হঠাৎ একদিন ভরদুপুরে ভগবৎ ফ্যাক্টরিতে হামলা করেছিল বনপার্টির একটা স্কোয়াড। ওই ঘিয়ে-শার্ট ম্যানেজারের টাই পাকড়ে ক্ষমা চাইয়েছিল গ্রামবাসীদের সামনে। হুজ্জুত হয়েছিল খুব। ভগবৎ ফ্যাক্টরি থেকে বিষ ঢালা বন্ধ হয়েছিল ফ্যাক্টরির পেছনের বড় খালে। দূষণ কমানোর মেশিন চালিয়েছিল কিছুদিন। তারপর হঠাৎ ফ্যাক্টরি বন্ধ ক’রে দেয় ওরা। ওই দূষণ কমানোর মেশিনে নাকি অনেক খরচ, কোম্পানি চলবে না অত খরচ ক’রে। সরকারি লোকেরা বনপার্টির মুণ্ডপাত ক’রে কাগজে কত কিছু লেখাল (ওই কমার্শিয়াল ম্যাগাজিনও লিখল)। ফ্যাক্টরির বড় ম্যানেজারসাব টিভিতে বনপার্টিকে লুঠেরা তোলাবাজ টেররিস্ট বলল। কিন্তু সেই যে বনপার্টি ‘দূষণ বন্ধ না করলে ফ্যাক্টরি চলবে না’ বলে গেছিল, সেই কথাই রয়ে গেল। তারপর কয়েক বছর ওই খালের জল খেয়ে লোক বা ভৈঁস মরেনি।

সেই তিন বছর আগে এক ভোরে খালে কয়েকটা লাশ ভেসে এসেছিল। বনপার্টির ঊনিশ জনের লাশ। তখন কয়েকদিন ওই খালের জল ব্যবহার হয়নি। শোনা গেছিল বিষ খাইয়ে নাকি ওদের মেরে দিয়েছে কেআরপি, টিভিতে বলেছিল গুলি খেয়ে মরেছে ওরা। মনুয়া বলেছিল কীভাবে বনপার্টির খাবারে বিষ দিয়ে আধমরা ক’রে তারপর গুলি করা হয়েছিল। মনুয়া সেপাইদের খিদমত খেটে দেয়, এসব খবর জানে। জিমলগাত্তা ফরেস্টে…

ওঃ, কোন কথা থেকে কোথায় চলে যাচ্ছে… দোদি মরে গেছে নাকি লৌ-তে বিষ মিশে। রক্তবমি করেছে। সেটা নিয়ে ওই আদিবাসী মহল্লায় শোর উঠেছে একটা। কিন্তু, সেটা মোটেই ঘটনা নয়। বরং সেনা-হাসপাতালে হইচই চলছে। গিরিধারী প্রসাদ মারা যাচ্ছে। মুখ দিয়ে গ্যাঁজলা উঠছে। মাঝে মাঝে রক্ত গড়াচ্ছে কষ বেয়ে। গিরিধারী ডিউটি করতে করতে হঠাৎ রক্তবমি করল একবার। তারপরই নেতিয়ে পড়ল। অমন সা-জোয়ান মরদ গিরিধারীর শরীর নীল হয়ে যাচ্ছে। ডাক্তাররা ওষুধ ইঞ্জেকশন স্যালাইন দিয়েও কিছু করতে পারছে না। গিরিধারী কেআরপির অভিজ্ঞ ক্যাপ্টেন। মাঝারি র‍্যাঙ্ক কিন্তু সৎ, ডিউটিফুল। বাস্তারের জগদলপুরে চারবছর ধরে পড়ে আছে। ১১টা অপারেশনে অংশ নিয়েছে। রোজ ভোরে গায়ত্রী মন্ত্র না জপে জল খায় না। মদ খায় না। ‘রাষ্ট্র কি সেবা এবম্‌ নিষ্ঠা হমারে জীবন কে সর্বোচ্চ মূল্য হোঙ্গে’- একথা গিরিধারী মন্ত্রের মতো জপ করত। সেই যেবার বীজাপুরে অপারেশন ক’রে একটা গ্রাম উড়িয়ে দেওয়া হল, ওই যে তিন বছর আগে ইন্দ্রায়নী খালে দু-কুড়ি লাশ ভাসানো হল- গিরিধারী দু’টো অপারেশনেই গুরুত্বপূর্ণ ডিউটি পালন করেছিল। সেই গিরিধারী মরে যাচ্ছে। গ্রিন করিডোর দিয়ে ওকে আরও বড় আর্মি হসপিটালে নিয়ে যাওয়া হবে- দরকারে প্লেনও আসতে পারে, দিল্লি নিয়ে যাবে। কিন্তু, অতক্ষণ বাঁচবে তো? গিরিধারী না বাঁচলে বড় ক্ষতি হয়ে যাবে পুলিশের। আর, এই সময়ে জগদলপুরের বালছাল কয়েকটা লোক এসে কোথাকার কে দোদি সোরি, তার মারা যাওয়া নিয়ে শোর তুলছে। জগদলপুর ক্যাম্পের সামনে নাড়া লাগাচ্ছে কেআরপির বিরুদ্ধে। গোন্দিতে কিসব আনসান বকছে। “ব্লাডি প্যারাসাইটস”, দাঁতে দাঁত চেপে কথাটা বলল অর্জুন শুক্লা। অর্জুন ডিউটিতে ছিল না আজ, কিন্তু গিরিধারীর খবরটা পেয়েই জলদি চলে এসেছে আর্মি হাসপাতালে। ক্যাম্পে গ্রামবাসীরা ভিড় করছে নাকি, দু’চারটে নকশালও নিশ্চয় মিশে আছে ভিড়ে। “গিরিধারীর যদি কিছু হয়, শালাদের ছাড়ব না। গাঁড় মেরে দেব।”- আবারও দাঁত কিড়মিড় করল অর্জুন। কিন্তু, গিরিধারীকে বিষ দিল কে? নকশালদের গুলি না, আদিবাসীদের ফাঁদ না, কী এক তুচ্ছ বিষ থেকে গিরিধারী মরে যাবে?

#

গিরিধারীকে খেলাটা শিখিয়েছিল অর্জুনই। মজার খেলা, সেক্সিও! ওদের ক্যাম্পে এর’ম অনেক খেলা বানিয়ে নেওয়া হয়। কোথায় ঘর বাগিচা ছেড়ে জঙ্গুলে এলাকায় পড়ে আছে কতদিন। বৃষ্টি হোক বা বসন্তের কোকিল ডাকুক বা রোম্যান্টিক বিকেল- হয় কুম্বিং অপারেশন করো নকশালী জংলিগুলোকে মারতে নয়তো কাঁধে ভারী মেশিন নিয়ে টহল দাও গ্রামে গ্রামে। গিরিধারী তো মদও খেত না… কিন্তু এর’ম ম্যাদা মেরে গেলে আর যাই হোক সেনা হওয়া যায় না। খেলাগুলো তাই শেখা দরকার। এমনিই খেলার খেলা, টাইমপাস। অবশ্য ডিউটিও আছে এতে। নাকা চেকিং আর দেশভক্তি দু’টোই মিশে আছে এই খেলাটায়, সঙ্গে যদি খানিক রগড় থাকে তা’লে মন্দ কী? আর, এ যদি ভদ্রলোকের এরিয়া হত তাও একটা কথা ছিল। এই নকশালি এরিয়ায় তাও আবার জঙ্গলের ধারেকাছে আদিবাসী পাড়া- কে আটকাবে? সরকারের ঢালাও পারমিশন আছে- সব শালা নকশালিকে টিপে মারতে হবে, ছারপোকার মতো টিপে টিপে মারতে হবে, উকুনের মতো বেছে বেছে টিপে টিপে মারতে হবে। টেপাটিপির কথায় অর্জুনের আমোদ হয় এবার। আরও হাফ পেগ বেশি খেয়ে নেয়! নাকা চেকিংয়ের সময় আদিবাসী মাগীদের বুক টিপে দেখতে হবে- লিটমাস টেস্ট! “কী বলছ? ওরা কিছু বলবে না? এসব করা যায় নাকি?” অবাক হয়েছিল গিরিধারী। অর্জুন নল পরিষ্কার করতে করতে বলেছিল, “ওপরের অর্ডার আছে। এটা টেস্ট। কোনও বজ্জাতের বুক থেকে যদি দুধ না বেরোয়, সালি তা’লে নকশাল”! অর্জুনদের স্পেশ্যাল ট্রেনিংয়ে ওয়ার থিওরি, গেরিলা স্ট্র্যাটেজি শেখানো হয়, নকশালদের সাইকোলজি নকশালদের ক্যাম্প নিয়ে ভিডিও দেখানো হয়। গিরিধারীও জানত যে, নকশাল রাঁড়রা পোয়াতি হতে চায় না। পোয়াতি না হলে বুকে দুধ হবে না, বুক শক্ত হবে। “ট্রেনিং ক’রে ক’রে ওরা ম্যানচেস্টার হয়! দুধ বাচ্চা কিচ্ছু হয় না। দেখলেই আইডেন্টিফাই করা যায়!”, গিরিধারী আর অর্জুন দু’জনেই ট্রেনিংয়ে জেনেছিল এসব। ইন্দ্রকুমার ডানহাতের তর্জনী আর মধ্যমার মধ্যে বাঁ হাতের তর্জনী ঢুকিয়ে বলেছিল কেমন টাইট হয় কুড়ি থেকে বাইশের আদিবাসী মেয়ে। গিরিধারী এরপর থেকে ভোরে উঠে দু’মিনিট বেশি মন্ত্র পড়ত সাঁইবাবার ছবির সামনে। ডিউটিতে গিয়ে আদিবাসী মহিলাদের লাইন দিয়ে দাঁড় করাত। বুক টিপে দেখত। প্রথম প্রথম অস্বস্তি হত গিরিধারী গাছের আড়ালে নিয়ে গিয়ে টেস্ট করত। তারপর অভ্যেস… ইনস্যাস আর একে-র সামনে ট্যাঁ ফো করতে পারত না কেউ। বিজাপুর-জগরগুন্দা ক্যাম্পেও এইকাজ হত।

[শিক্ষিত শ্রদ্ধেয় পাঠক নিশ্চয় লেখককে খিস্তি মারছেন কিংবা লেখকের রুচিবোধ নিয়ে অশ্লীলতার মামলা ঠুকবেন ভাবছেন? “এসব হয় নাকি সভ্য দেশে?” বা, “দেশভক্ত কেআরপির নামে কুৎসা রটানো” ভেবে যাঁরা চটে উঠছেন, প্লিজ রেগে যাবেন না। এগুলো হয়েছে, এর’মই হয়। সিএনএন-১৮ মিডিয়ার সাংবাদিক তনুশ্রী পাণ্ডে বাস্তারের আদিবাসী মহিলাদের সাক্ষাৎকার নিয়েছিলেন। ২০১৫ থেকে ২০১৬ সালের মধ্যে বস্তারের মহিলাদের অভিজ্ঞতা রেকর্ড করেছিলেন, প্রকাশিত হতে কিছু হইচই হয়েছিল- “I was four months pregnant when I was raped. They (the security forces) did not care I was pregnant,” said a feeble voice, her face blurred by the channel. Another said, she had just delivered (eight hours before) and lactating. “They were not convinced and a cop squeezed my breasts to see if there was milk.” Another woman said “they groped me, sexually assaulted and beat me.” তনুশ্রীর এই রেকর্ডিং-লেখা ইত্যাদির আগে ও পরে এমন অনেকবার হয়েছে। হরবখত হতেই থাকে। যেহেতু গল্পের মধ্যে কিছুটা বিশ্বাসযোগ্যতা রাখতে হয়, তাই তথ্যসূত্র দিলুম। অবিশ্যি আমরা যারা মাংসভাতে আঁচিয়ে ভোট দিতে যাই বা অবরেশবরে পুরনো কমঃ-র সাথে মিছিল দেখতে গিয়ে ফিশ ফ্রাই খাই কিংবা হ্যাশট্যাগ দিয়ে খাপে খাপ পঞ্চুর বাপ ছন্দ মিলিয়ে মোমবাতির কবিতা লিখি, তাদের গণতন্ত্রে এসব ‘অবিশ্বাস্য’ বা অলীক সংলাপ। যাই হোক, সত্যি লেখা আমার কাজ নয়, গল্প লেখা কাজ- আসুন, আবার গল্পে ফিরি।]

গিরিধারী আর অর্জুন ওদের খেলাটায় আরও একটু রগড় জুড়ে নিয়েছিল। আদিবাসী মেয়েদের বুক টিপে ছাড়ত না শুধু, ওদের মাইতে ঠোঁট দিয়ে চুষে দেখত। বোঁটা চুষে কামড়ে টেনে দেখত দুধ আসে কিনা। একটু চকচকে কমবয়সী হলে কুড়ি মিনিট ধরে টিপবে চুষবে। আর, বয়েস বেশি হলে বা দেখতে বাজে হলে পাঁচ মিনিট- অর্জুন আর গিরিধারী মেপে নিত কতক্ষণ টেস্ট চলবে! ইন্দ্রকুমার বা রঘুপতি সঙ্গে থাকত। ওরাও খেলত, মেপে দিত। তবে, সব ক্যাম্পে কি আর একই রকম টেস্ট চলে? কোরসেগুড়া গ্রামের পাশের ক্যাম্পে চুত-টেস্ট করত পুলিশ আর সিক্যুরিটি ফোর্সের লোক। “চ্যল রান্ড, উতার”- তিন-চারজন একসাথে টেস্ট করত। বাড়ি ছেড়ে থাকা, মশার কামড়, মাইন খোঁজা, রাইটস অ্যাক্টিভিস্টের প্রশ্ন- সব রাগ আদিবাসীর বুকে আর যোনিতে আছড়ে পড়ত। যোনিতে আঙুল দিয়ে ল্যাওড়া ঢুকিয়ে টেস্ট হত টাইট কিনা। টাইট হলে বনপার্টির ক্যাডার প্রমাণ হত। “লেকিন ইস্‌সে ক্যায়সে পতা চ্যলেগা?” অধস্তনের অবাক প্রশ্নে দাঁত থেকে যোনিদেশের লোম সরাতে সরাতে অফিসার বলেছিল, “অ্যায়সে হি। অগর তুঝে আচ্ছা লাগা, তো বোল দেনা বো নকশালি নেহি হ্যায়”… এসব খেলা। এগুলো খেলা যায় বলেই এত রিস্ক নিয়ে জঙ্গলে মশার কামড় আর ল্যান্ডমাইন সামলেও পড়ে থাকা যায় অনেকদিন। কোনও কোনও ক্যাম্পে থানায় মাঝেমাঝে ভিডিও করা হত। ‘কমরান্ড কি চুত্‌-টেস্ট’ নাম দিয়ে ভিডিও-ফাইল সেভ করা থাকত ফোনে। ওন্দাগাঁও ক্যাম্পে একটা লোক্যাল মিডিয়া আর মানবাধিকার কমিশনের দু’জন হইচই করতে এসেছিল- ডিজির কাছে রিপোর্ট গেছিল। তারপর অবশ্য ম্যানেজ হয়ে গেছে। গীতা মাইনিং কোম্পানির মালিক টাকা দিয়েছিল, ডিজি আর এসএসপি কয়েকজন গ্রামবাসীকে ১৭২৫ টাকা বাঁটোয়ারা ক’রে দিয়েছিল সরপঞ্চের হাত দিয়ে। লোক্যাল মিডিয়ার এডিটরের নামে দু’টো কেস ঠুকে দেড়দিনের কড়কানি। ব্যাস! এসপির মোবাইলেও অবশ্য ‘কমরান্ড কি চুত্‌ টেস্ট’-এর কয়েকটা ফাইল ফরোয়ার্ড হয়েছিল। বনপার্টির লোকেরা লাল কাপড়ে হুমকি লিখে গেছিল এসএসপি আর সদ্রুর নামে। সদ্রু চুত-টেস্টের ভিডিও করত। কয়েকদিন পরের একটা অ্যামবুশে গিয়ে সদ্রু নিখোঁজ হয়ে গেছিল জঙ্গলে। ওর সাথেই ধরা পড়েছিল অগম গিরি, বনপার্টির হাতে। অগম গিরিকে দু’দিন পরে ছেড়ে দিয়েছিল বনপার্টির লোক, সদ্রুর খোঁজ পাওয়া যায়নি। হোম মিনিস্ট্রির ভাষণে সদ্রুকে বীর ঘোষণা ক’রে নকশালিদের নিকেশ করার কথা বলা হয়েছিল। আবার গল্পে গল্পে সত্যি এসে যাচ্ছে খুব, সাহিত্যের পক্ষে খুব একটা নান্দনিক হচ্ছে না। আর, এই গল্পটা বনপার্টি বা হোম মিনিস্ট্রি বা বীর সদ্রুকে নিয়ে নয়। গল্পটা দোদির মারা যাওয়া নিয়েও নয়। গিরিধারী প্রসাদের রক্তবমি ক’রে গ্যাঁজলা তুলে মারা যাওয়া নিয়ে।

#

দোদির বয়েস মাত্র সতেরো। জগদলপুরের পারপা গ্রামে থাকে। স্যরি, থাকত। কারণ দোদি মরে গেল একটু আগেই। দোদির বড় দাদাকে পাঁচ বছর আগে ইউএপিএ দিয়ে নিয়ে গেছিল পুলিশ। এখনও জেলে আছে। দোদির গ্রামে পাঁচ মাস আগে গেরুয়া পতাকা উড়িয়ে কিছু বন্দুকধারী এসেছিল। ‘নকশালিয়োঁ সে মুক্তি’ শিরোনামের হ্যান্ডবিল ছড়িয়ে গেছে। কিন্তু দোদির গ্রামে অনেকে পড়তেই পারেনি সেই হ্যান্ডবিল। তাই চেতাবনিও দিয়ে গেছে ওরা, নকশালিরা গ্রামে এলেই গ্রাম জ্বালিয়ে দেবে ওরা। কেআরপির একটা গাড়ি ওদের সঙ্গে সঙ্গে ঘুরেছে। দোদি এগুলো দেখেই বড় হয়েছে। দোদির দিদি পেদ্রাস গ্রামে থাকে, সুকমায়। দোদি দেখেছে দিদি মাঝেমাঝে একটা গলার চেন ভাড়া নেয়। ওটাকে নাকি মঙ্গলসূত্র বলে। পেদ্রাস গ্রাম থেকে বেরোতে যে পুলিশ ক্যাম্প সেখানে নাকা চলে। আর, দোদির দিদি জানত যে, ওই থালি মানে মঙ্গলসূত্র থাকলে পুলিশ ছেড়ে দেয়। মঙ্গলসূত্র না থাকলে ‘নকশালি টেস্ট’ দিতে হয়, বুক টিপে দুধ বের করতে হয়। সেটাও না পারলে ক্যাম্পে তুলে নিয়ে যায়। উর্দিওলারা বলে, “নকশালিরা বিয়ে করে না। কোনও নিশান রাখে না।” ওদের গ্রামে কাকেম পাখামু মঙ্গলসূত্র ভাড়া দিত। ধরাও পড়ে গেছিল একদিন। দশহাজার টাকা জমা দিয়ে ছাড়া পেয়েছিল। কিন্তু গল্পে বারবার এই সব অন্যকথা চলে আসছে। কথার বীজ থেকে কত যে কথা আরও তৈরি হয়। দোদির লৌ বিষিয়ে গেছিল। দোদির দিদি এখন বাপের বাড়ি। বাচ্চা বিয়োবে। দোদির মায়ের ৫১ বছর বয়েস, চোখে ছানি। দু’মাস আগে সদরে গেছিল চোখ দেখাতে। ক্যাম্পে নকশালি-টেস্ট দিয়ে ফিরে দু’দিন বুকে ব্যথা নিয়ে শুয়েছিল। ওর সাথে নাকি বনপার্টির কোন কম্যান্ডারের মুখের মিল পেয়েছিল সিক্যুরিটি-সাবরা। দোদি এসব জানে। দোদির তেরো বছর বয়েসে প্রথম বুক টিপেছিল পুলিশ। “ছোড় দে ইসকো, বাচ্চি হ্যায়”- “ভোসড়িকে, বাচ্চেভি ডেঞ্জার হ্যায় ইস পাকিস্তান মেঁ। বো ভি নকশালি রিক্রুট হ্যায়”- দোদি সেদিন বুঝেছিল পুনেম, সনি, তাতিরা কেন ক্যাম্পের সামনে দিয়ে ইস্কুলে যেতে পারে না। ১২ বছরের সনির তলপেটে এখনও ব্যথা চাগাড় দিয়ে ওঠে মাঝে মাঝেই। দোদির খুড়তুতো বোন বাসাগুড়া ক্যাম্পে তিনরাত আটকে ছিল- বাঁদিকের বুকের বোঁটা ছিঁড়ে গেছিল। আরেকটা বোঁটাও ছিঁড়ে যেত যদি দোদির কাকা কুড়ি হাজার টাকা জমা না করত।

(স্যরি মাননীয় পাঠক, চুত, বোঁটা, মাই, ভোসড় শব্দগুলো অশ্লীল খুব। গণতন্ত্রে বেমানান। গোন্দ আদিবাসীরা জঙ্গুলে, কান শুনতে ধান শোনে, উল্টো বোঝে রাম- গণতন্ত্র বোঝে না বলেই খামোকা নিন্দে করে। এসবই ভাবছেন তো? বটেই তো। তবে কিনা গণতন্ত্রের গল্পেও খানিক বাস্তব তো থেকেই যায়। বিশ্বাস করতেই হবে এমন নয়, আইন-কাছাড়ি কেউই ওসবে বিশ্বাস করে না। তার ওপর ওরা সাপের উল্কি নয়তো গোল-গোল উল্কি করে হাতে, অবোধ্য গোন্দি বলে- ওদের বিশ্বাস করা যায় নাকি? আর, পাঠক, আপনার বা আমার জীবনের থেকে এগুলো এতটাই আলাদা যে বাস্তার-রিয়ালিজম কিংবা জাদু-বাস্তারবাদ নামে নতুন তত্ত্ব তৈরি হয়ে যেতে পারে! ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বরে নিউজলন্ড্রি একটা খবর করে, সেখানে লেখা ছিল “the police “abducting” villagers — picking them up on the pretext of questioning and holding them until money is paid. They included Punem Kamla, 15, and her friend Punem Ramwati, 16, who alleged that they were held at Basaguda police station for two days last December till their parents paid ₹15,000 each for their release.” আসুন প্লিজ, আমরা গিরিধারীর মরার গল্পে ফিরি।)

কখনও কোনও ক্যাম্পে নকশাল হামলা হয়। খবর ছড়িয়ে পড়ে। সুকমায় হামলা হলে জগদলপুরে বুক-টেপা বন্ধ হয়। মিনপার রাস্তায় মাইন ফাটলে বীজাপুরে এই খেলা বন্ধ থাকে। দোদি বা ওর দিদি বা ওর খুড়তুতো বোন বা ওদের মা ওই মাঝের সময়টুকু কিছুটা নিশ্চিন্ত থাকে। ইস্কুল হাটবাজার আত্মীয়ের বাড়ি যাওয়া- নাকা চেকিং আর নকশালি টেস্টের নামে যোনিতে আঙুল ঢুকিয়ে দেখা বা বুক চুষে দুধ বের করা বন্ধ থাকে। কিন্তু নিশ্চিন্তি কি আর মুকেশ আম্বানির শেয়ারের দর, যে বাড়তেই থাকবে? নাকি সুখ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর টাক, যে চকচক করবেই অনন্তকাল? অতঃপর, আবার একদিন টিভিতে কাগজে আনন্দসংবাদ ঝলসে ওঠে, ‘বীজাপুরে ১৭ জন আদিবাসী নকশাল খতম’। সেমিনারের কফির কাপে মানবাধিকার বনাম রাষ্ট্রের কর্তব্য বিষয়ক দুধ-চিনি মেশানো আলোচনায় চাপা খুশি- ‘ইন্দ্রাবতী নদীতে ভাসছে আরও দু’ই মাওবাদীর লাশ, মোট গণনা ৪০’। ‘অল ইন্ডিয়া প্রগ্রেসিভ ফুডিজ অ্যাসোসিয়েশন’-এর সম্মেলনে পর্ক সালামি আর বিফ নেহারির তুলতুলে স্বাদের সঙ্গে সবচেয়ে বেশি তর্ক জমে- ‘আদিলাবাদের জঙ্গলে মাওবাদী কেন্দ্রীয় কমিটির দু’ই নেতার মৃত্যু’ এই ইস্যুতে নাগরিক মিছিল ১কিমি হাঁটবে নাকি সওয়া ১ কিমি!? কিন্তু, এইসব খবরে দোদি সোরি, পুনেম কামলা, কুম্ভিরা কুঁকড়ে যায়। আড়াই কিমি হেঁটে ইস্কুল যাওয়ার পথে বা সদরে যাওয়ার পথে আবার পুলিশ কেআরপি ক্যাম্পে নাকা হবে। বুক দিয়ে রক্ত পড়বে। আর, কপাল খারাপ থাকলে কয়েক হাজার টাকা চলে যাবে ওদের থানা থেকে ছুটকারা পেতে। দোদি, কুম্ভি মাত্র সতেরো বা পনেরো বছরেই জেনে গেছে গোন্দি বললেই নকশাল ছাপ্পা পড়ে। দুধ না বেরোলেই নকশাল রান্ড বলে টিটকিরি শুনতে হয়। বনপার্টি নাড়া লাগিয়ে জুলুস বের করলে হেলিকপ্টারের চক্কর বেড়ে যায়। বনপার্টি ওদের গ্রামে থেকে ইস্কুল চালায়, স্বাস্থ্যকেন্দ্র চালায়। বল্লারপুর কাগজকলে তিনগুণ মাইনে বেড়েছিল বনপার্টির ঝাণ্ডার জোরে। জনতানা সরকারের ব্যাপার-উদ্যোগ প্রকল্পে দু’টো নতুন কাজ শুরু হয়েছিল। তারপরই সেনা আর পুলিশ ব্রাশ ফায়ার করতে করতে অ্যান্টি-মাইন গাড়ি নিয়ে আম্বেলি গ্রাম আর ভায়রমগড়কে গুঁড়িয়ে দিয়েছিল। রানি বোড়িলি আশ্রম জ্বলে খাক হয়ে গেছিল রাতারাতি। স্কুলগুলো হঠাৎ পাল্টে গেছিল কেআরপি ক্যাম্পে। আবার দোদির বাপ-মা, দোদির গ্রামের সবাই পাকিস্তানি হয়ে গেছিল উর্দিধারীদের সংলাপে। সোনি, তাতি সোরি, পদ্মা চিনু, পুনেমরা পুলিশের চোখে কমরান্ড নকশালি… দোদি জানে। কুঁকড়ে যায় আরও। গল্পটা কিন্তু দোদিকে নিয়ে বা ওসব গ্রামফ্রাম জুড়ে বনপার্টির ইস্কুল চালানো নিয়ে নয়। গল্পটা গিরিধারীর হেগেমুতে বমি করতে করতে পোঁদ উল্টে মরে যাওয়া নিয়ে।

#

দোদি বুকে বিষ মাখিয়ে নিয়েছিল। টিরকা মালুর মেয়ে ইন্দ্রৌ জড়িবুটি জানে অনেক। ওরা গোল চিহ্ন আঁকে হাতে। কোন সাপের বিষে কোন ফলের বীজ মেশালে কতক্ষণে মৃত্যু- ইন্দ্রৌ সব জানে। সেই সালবা জুড়ুমের সময় টিরকা মালু গ্রাম ছেড়ে জমি ছেড়ে চলে যেতে চেয়েছিল। ইন্দ্রৌ জেদ করেছিল না যাওয়ার। টিঁকে গেছিল ওরা। জড়িবুটি দিত, রোগ সারাত, বিষের খবর জানত। দোদি জানত, ওর সতেরো বছর বয়েসের অভিজ্ঞতা দিয়েই জানত, আপাততঃ ওই অন্ধকার সময়। ক্যাম্পগুলো আবার জাঁকিয়ে বসেছে ইস্কুলবাড়িতে। গল্পের মতো ইস্কুলবাড়ি জুড়ে পুলিশের জাঙ্গিয়া ঝুলছে। “সব শালা পাকিস্তানী এখানে। চুত-টেস্ট ক’রে দেখ” বাক্যগুলো পুলিশ আর সেনার সংলাপে ঘুরছে। দোদি জানেনা আবার কবে চাকা ঘুরবে, আবার কবে জনতানা সরকারের সঙ্গে ওদের গ্রাম জুড়ে যাবে। দোদি জানে আপাততঃ বুক জুড়ে ব্যথা, তলপেটে অসহ্য অন্ধকার নেমে আসবে। দোদি জানত জগদলপুর ক্যাম্প ওকে পেরোতে হবে আজ। দোদির দিদির জন্যে ওষুধ আনতে হবে সদর থেকে। বাচ্চা বিয়োবে ওর দিদি। গিরিধারী আর রঘুপতি দোদির বুক টিপে দুধ বের করতে না পেরে মজা পাচ্ছিল। অবশ্য এখন আর জানার উপায় নেই গিরিধারী প্রসাদ দোদির মাই দাঁতে কামড়ে ধরেছিল নাকি দোদিই ওর বিষমাখানো বোঁটা গিরিধারীর মুখে দিয়েছিল। গিরিধারী আর দোদি দু’জনেই মৃত। আর, এতদূর একটা কাল্পনিক দূরত্বে বসে গল্প ফাঁদতে ফাঁদতে আমি তো পাঠককে মিথ্যে তথ্য দিয়ে বিভ্রান্ত করতে পারি না! সত্যি এটুকুই যে, দোদির ডান বুকের বোঁটা কামড়ে নিয়েছিল গিরিধারী। চুষছিল। দোদি চিৎকার করছিল আতঙ্কে। পাঁচ মিনিট পরে দোদি আর ভাসিনকে ছেড়ে দিয়েছিল ক্যাম্প থেকে। দোদি সদরে যেতে পারেনি। টলতে টলতে বাড়ি ফিরেছিল। ততক্ষণে গিরিধারীর দাঁতে-কামড়ানো-গর্ত দিয়ে চুঁইয়ে বিষ ঢুকে গেছে ওর লৌতে। দোদি জানত গিরিধারীও অবধারিত মরবে। মিনিট কুড়ি পরেই রক্তকাশি। তারপর বমি। তারপর দাস্ত। দোদির রক্তবমি হওয়ার সময় দোদি কেঁদে উঠেছিল। সতেরো বছরের দোদি মরতে চায়নি। দোদির সদরে যাওয়া বাকি আছে এখনও। আরও বড় সদরে যাওয়া বাকি আছে। দোদি এই জঙ্গল আর সদর ছেড়ে অনেকটা দূর চলে যাচ্ছে- গিরিধারী একটা থেকে দু’টো থেকে চারটে হয়ে ওর বুকে দাঁত দিতে আসছে। ক্যানসার সেলের মতো মিউটেট করে গিরিধারী। চারপাশে দেখতে থাকে দোদি। হ্যালুসিনেট করছিল। অসাড় হয়ে যেতে থাকে অঙ্গগুলো। দোদি তখন মরে যাচ্ছিল। 

গিরিধারী সেনা-হাসপাতালে হিক্কা তুলছিল তখন। শেষ অবস্থা। হেলিকপ্টার আসছিল দিল্লি নিয়ে গিয়ে চিকিৎসা করাবে। তার আগেই গিরিধারী, বীর গিরিধারী প্রসাদ, বহু অপারেশনে অভিজ্ঞ ক্যাপ্টেন গিরিধারী প্রসাদ মরে গেল।

#

তারপর,

রাষ্ট্র সব জানে। গিরিধারীর শরীরে পাওয়া বিষ আর দোদির শরীরের বিষে মিল কাকতালীয় না। দোদির বাঁহাতে সাপের উল্কি ছিল। ভিমাল-পেন বাঁচাতে পারেনি ওকে। কিন্তু, সাঁইবাবার কৃপায় গিরিধারীর খুনিকে ধরা গেল। গাছে গাছে লটকে দেওয়া হল- ‘পুতনা ফিরে এসেছে। পুতনা গিরিধারীকে মেরে ফেলেছে’। দোদির ভাই-বাবা-মা-কাকা-আড়াই বছরের ভাইঝি সবাইকে এনকাউন্টার করার নির্দেশ লটকে দেওয়া হয়েছে গাছে। দোদির মা আর দিদিকে ক্যাম্পে নিয়ে যায় অর্জুন শুক্ল। এসপি আসে। দোদির দিদি যাতে আরেকটা রাক্ষস পয়দা না করতে পারে সেজন্য ওর দিদির যোনিতে পাথর ঢোকানো হচ্ছে এখন। হতেই থাকে। এসব হতেই থাকে। দোদিরা গল্প হয়ে যায়। গল্পগুলো বাড়তে থাকে। মাননীয় পাঠক, সত্যিগুলোকে ছেঁটে না দিলে গল্প হয় না। খেয়াল ক’রে দেখুন দোদি তাতি পুনেম পদ্মা চিনুদের কোনও সংলাপ নেই। ছিল আদৌ? থাকলেও, খেলাগুলো চলবেই। রাষ্ট্রের নিরাপত্তার জন্যে গিরিধারী অর্জুন ইন্দ্রকুমারদের সংলাপ কিন্তু খুব জরুরি। থাকতেই হবে। জানতেই হবে। আর, কথক মোটেই বিবেক নয়। কথকও আপনারই মতো- সুরক্ষা চায় শান্তি চায় নিরপেক্ষতার স্বস্তি চায়। কথক পাথরগুলো বের করতে পারেনা, দোদির লৌ থেকে বিষ সারিয়ে দিতে পারেনা। আসুন, গল্পে ফেরা যাক। তবে, দোদি আবার বেঁচে উঠতেই পারে অন্য ক্যাম্পে। অন্য কোনও নাকা চেকিংয়ে, কোনও টেস্টের সময়। হয়তো পরের গল্পে। হয়তো আলগা বাস্তবে। আমার, আপনার, অর্জুন শুক্লার, ডিজির, কেআরপি ক্যাম্পের এবং কথকের অস্বস্তি বাড়িয়ে দোদি আবার বেঁচে উঠবে। এটা সেই গল্পেরই ধরতাই।

 

শেয়ার করুন

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *