পুণ্য

বৃষ্টি থামলে আষাঢ় মাসের ভাপ টের পাওয়া যায়। কাঁঠালের রোঁয়া আলগা হয়ে আসে ভিতর ভিতর, এই ভাপে। গতরের মাংস হাড্ডি ছাড়তে চায়। ফুলরানি চারদিকে নজর চালিয়ে, গায়ের কাপড় আলগা করে দেয়। দামড়া পাট ক্ষেত ছাড়া তার দিকে নজর দেওয়ার কেউ নেই এখানে। বেফিকর হয়ে পোতির মাথার পেঁয়াজের রস ঘষতে থাকে। এক টাকা সাইজের গোল চকচকা চামড়া খোঁচখোঁচ শুয়োরের লোমের মত চুলের ভিতর থেকে উঁকি দেয়। চামড়ায় জ্বালাপোড়া শুরু হলে মাথা ডান বাঁ করে ঝুমড়ি।

“উঃ! জ্বালা করে তো!”

“জ্বালা করলেই চুল উঠবে”

“পিয়্যাজের গন্ধ বাইর হইলে পুচকারা আমারে নিবে না খেলায়”

“মশারির ভিত্রে ঘুমাও রাইতে?” 

“হ”

“মশারির ভিত্রে না ঘুমাইলে, ত্যালাচোরা চাইট্যা মাথার চুল সব খায়ে ফে্লবে। নাইলে টাকলা হয়ে থাকবা, খেলায় অমনিও নিবে না তোমারে, ঠিকাসে ?বুঝছ?”

“হ, ঠিকাসে”

“অহন বই নিয়া বসো গা ,যাও।”

পোতির পিঠে একটা ছোটো ঠেলা দিয়ে উঠে পড়ে ফুলরানি। সাঁঝ পড়ার আগেই ছাগল আনতে যেতে হবে। বিশ্বাসদের বাগানের উঁচা দিকটায় জল ওঠে না। সারাদিন ওখানেই বাঁধা থাকলে নিশ্চিন্ত থাকা যায়। চারটার মধ্যে দুইটা কালু বিশ্বাসের মা পুষ্যি দিয়েছে। বাকী দুইটা ফুলরানির নিজের। তার মধ্যে যেটা ভরতি, মোটা পেট নিয়ে এগোয় আস্তে  ধীরে। এটাকে চোখে চোখে রাখতে হয়। এই সময়ে নজর না পড়ে খারাপ কিছুর। ফুলরা  শনি দেওতাকে বলে রেখেছে, তার ছাগলটা বাচ্চা বিয়ালে, বাতাসার লুট দিয়ে দিবে। বিশ্বাসদের বাড়িতে প্রতি শনিবার পাঁচালি পড়ে পূজা করে ওদের বড় ব্যাটা। ভারি স্যাতানো গন্ধ নাকের ভিতর দিয়ে হাত ধরাধরি করে ঢোকে। প্রতিটা গন্ধ আলাদা করতে পারে ফুলরানি। পাকাপচা কাঁঠালের বাসনা,পাটের গুমসানো গন্ধ, খাটা পায়খানা উপচানো গুয়ের বদবু। আধলা আলোয় ফুলরানির হাতের ছপটি বাতাস কেটে এগোয়। হুররর হট হট বলে রাস্তায় রাখে ছাগলি চারটাকে। নাম দেওয়া হয় নাই এগুলার। বছর চল্লিশ আগে মুংলি আর তার আটটা বাচ্ছাকে গাঁ ঘরে বিলিয়ে আসা ইস্তক ফুলরা নিজের বাচ্চাদের ছাড়া আর কারো নাম দেয় নাই। কানকির কথা, মুংলির কথা, যখন সে পরেশের মা হয় নাই, গুধুনি দোসাদের বিয়ে করা বউ হয়  নাই, খেত খলিয়ানে হুজ্জুতির রুখা দিন গুলার কথা জিভে কাতারির গুড়ের মত সেঁটে থাকে।

হোলির আগে আগে দাদি তাকে চৌধুরীদের বাড়ি নিয়ে যেত কাজের সময়ে। টিনের ধারিতে কালো ঝ্যালঝ্যালা গু যতটা পারা যায় এক লপ্তে ভরে নিতে চাইত দাদি। তাও পাঁচ ছয় বার গুয়ের গর্তে নামতে হত সবটা সাফা করতে। বেলচা দিয়ে গু কেটে ঝুড়ি ভরার কায়দা দেখতো ফুলরা, কাপড়ে নাক ঢেকে। দাদি হাত চালানোর সময়ে নাক ঢাকতেও ভুলে যেত। ফুলরানি বুটের ছাতু আর কাতারির গুড়ের ছোট পোটলি নিয়ে বসে থাকত নিম গাছের তলায়। ঢোঁক গিলে এখন বোঝার চেষ্টা করে, কোথাও কি টের পাওয়া যায় দানাদার মিষ্টি! তখনও কি পেত! টুকড়ি, বেলচা সরিয়ে রেখে দাদি রুটিতে হাত লাগাতো। ফুলরা্র গা ঘিনাতো দাদির হাতের ছেঁড়া রুটি চিবাতে। গুড় মাখিয়ে রুটি চিবাতে চিবাতে বুড়ি যেন স্বর্গে পৌঁছে যায়। বেলচায় ওপর বসা মাছি গুড়ের ওপর ভিনভিনায়। আঙুল চাটে দাদি। নখের কোণে লেগে থাকা গুড় টুকু চুষে খেতে চায়।     

“ঘিন লাগে না তোর?”

কাপড়ে হাত মুছে, তেতরি পোতির দিকে ফেরে । 

“ঘিন লাগবে কেন? কত পুণ্যের কাম জানিস না?”

“অন্য মানুষের গু, হাত দিয়ে সাফা করা পুণ্যের কাম, কৌন কহিছো?”

“হাদ্দেখ, ছোড়ির কথা শুনো” তেতরি অবাক হতেও ভুলে যায়। নয় বছর বয়সে পোতি তার সেয়ানি হয়ে গেছে এত!  

“গান্ধীবাবার বাত শুনন নাহিল হো! হামরা নাহি করহল পে, কউন করিবে ই কাম? তুরহালি মাঈ বচপন মে তুহার গুমুত সাফা নাহি করল হো? উ কি ঘিন পাইলহো?”   

রাগ করতে গিয়েও হাসি আসে ফুলরার, “ তাহলে তু আর চৌধরাইন এক হইলি?” 

এমন আনোখা কথা কে কবে শুনেছে! ঝাড়ফুঁক করতে হবে নাকি! তেতরি ধমক লাগায় “দিমাগ চল গেয়ো লেড়কি! আচ্ছা সে কাম শিখ। পুরখো কা কাম, বড়া পুণ্য কাম, গান্ধীবাবা কাহিছো”। 

“ইত্তা পুণ্যাহি কি কাম তো ফির চৌধরাইন মজদুরি আঙনামে ফেকি দ্যাহেল কাহে দাদী? হাম্মার কুড়হানে পে শরম আহিল হো” 

পোতির চুলের ঝুঁটি নাড়িয়ে দেয় তেতরি, “শরম লাগল হো! হাম্মার বাদ তুয়ারিকো পুরা গাঁ কা কাম সামভালনা পরে হো” 

“পুন্যাহি কা কাম নাহি করলবে হাম্মি”। ফুলরা পিচ করে থুকে।

“মাইগ্যে , থুঃ”

 

বছরের অন্যান্য সময়ের থেকে এই সময় কুয়ার জল ওপরে উঠে আসে। বালতির রশি ঝপ করে ফেলার সঙ্গে সঙ্গে মনে পড়ে গুধুনির। জলের উপর গুবুস করে ভোঁতা আওয়াজ অসোয়াস্তিতে ফেলে। সে চায় হাসাপাতাল থেকে ফেরার পর চুপচাপ নিজেকে নিরমা দিয়ে ধুয়ে ফেলতে। হাত পায়ের হাজাগুলো নিরমার জল লেগে চিড়বিড় করে। আজকে তার কলিজার চিড়বিড়ানি বেশি। গাঁজার ধুনকিতেও যাচ্ছে না কষ্ট। পোতির সাথে দুটা আহ্লাদের কথা বলে যে মনটা  অন্যদিকে সরাবে তাও হবে না। গদাই মাস্টার পড়াতে এসেছে। এখন ঝুমড়ির কাছে ধারে গেলেই মুখ করবে ফুলরা। উনানে ফুঁ দিয়ে পাকঘর ধোঁয়া ধোঁয়া করে ফেলছে সে। ভিজা কাঠে উনান ধরানো চুপেচাপে হয় না। বুকের খাঁচায় বাতাস ভরে গাল ফুলিয়ে লম্বা ফুঁক দেয়। চোখে জল যত আসে, উনানে আগুন ঝিকায় কম। ছঞ্ছার নীচে উবু হয়ে বসে থাকা গুধুনির ঝুলে পড়া মুখ দেখে আঁচ করতে চায় ফুলরানি। জিনিসটা এনেছে তো বুড়া? কালকের নেওতার কথা ভেবে খুশি হয় আরেকবার। বিশ্বাসদের মাঝলা মেয়েটা সাত মাসের পোয়াতি। কাল সাধ দেবে ওকে। সেখানে যে সাতজন এয়ো লাগবে তার মধ্যে একজন ফুলরানি। কালুর মা নিজে এসে নেওতা দিয়েছে। জিজ্ঞেস করে ফেলে সোয়ামিকে, 

“মিললো জিনিসটা? কত নিল?” 

“ঢাইশো”

গুধুনি জামার পকেট থেকে বের করে কাগজের পুটলি।

হাতের তেলোয় নিয়ে জিনিস্টা ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখে ফুলরানী। ঠোঁটের কোণে ভাঁজ ফেলে।

“খুব ছোটো হইচে না?”

বউয়ের বড়লোকি ড্যাবা ড্যাবা চোখে দেখে গুধুনি। বিশ্বাসদের মেয়ের সাধে রূপার সিন্দুরের ডিব্বা দিবে তার বউ। বাঙ্গাল বেটিদের সাথে তার আশনাইএর জেরে মাসভর মাংস খাওয়া বন্ধ থাকবে। মাগি জানে না! থুথুটা ক্যোঁৎ করে গলার ভিতরে চালান করতে চেয়েও বাইরে ফেলে সে। বকরিগুলা পোকায় খাওয়া গম চিবায়। র‍্যাশনের গমের এই সদ্গতি করে ফুলরানি। গুধুনি আর কিছু বলে না মাগিকে। সকালে চারটা রুটি গড়ে দিতে ওর জানে কুলায় না। পান্তা  ঠুসে হাসপাতাল যায় রোজ। প্রথম কয়েক ঘণ্টা ঝিমানিই কাটে না। নার্স মাগীদের কথা কানের এপার ওপার হয়ে যায়। রক্ত পুঁজের ব্যান্দেজ, ফেলে দেওয়া সিরিঞ্জ আরও আরও সওব ঢাই হলে, এক ফাঁকে হাসপাতাল লাগোয়া নদীতেই ঢেলে দেয় সব। আড়াই পাক ঘুরে বিশ কদম দূরের ময়লায় বাক্সে জমা করতেও আলসি লাগে। বর্ষায় করলার জলে ঘূর্ণী ওঠে। থার্মোকোলের বাস্ক তোড়ে ভাগে হুই! ধরা পড়ার পর গালও কম খায়নি গুধুনি। পাকাচুলদাড়ি চড়চাপড় খাওয়ার থেকে বাঁচায়। কিন্তু সে কী অজুহাত দিবে! তার বউ মাগী বাঙ্গাল বেটিদের দেখাদেখি বিহানবেলা পান্তা খায়, তাকেও খাওয়ায়। পান্তা খেলে তার নিদ আসে। দেহ ভার হয়। কামে যুৎ পায় না। ঢঙী মাগির রঙ্গ তো কম না! শাড়ির প্যাঁচও দেয় ওদের মতন। চুলায় আগুন ধরেছে। চুলার হা মুখে লাকড়িগুলাকে গুঁজে দেয় ফুলরানি ভালো করে।

“নেওতা তোর একার?” গলা সরু করে গুধুনি। 

“না তো কী ! মেয়েছেলেদের ব্যাপার” ঠোঁটের উপরের ঘাম হাতের উলটা পিঠে মোছে ফুলরাণী।

“নমুদের বাড়িতে খাতির দেখি খুব তোর” গলার গয়ের সাফ করায় মন দেয় গুধুনি। 

ফুলরানীর নথনিতে আগুনের এ্কটা রোঁয়া এসে বসতে চায়। মাথা ঝাঁকাতে রোঁয়া নিবে গিয়ে পল্কা ছাই হয়ে বাতাসে ভাসে। গুধুনির নোকরি খতম হতে আর তিন মাস বাকি। এই চিন্তাটায় সোয়াস্তি লাগে ফুলরানীর। হাসপাতালের রুগিদের কফ থুতু গুমুত সাফা করতে কি যে আরাম পায় বুড়াটা, এতটা বয়সেও বোঝে না সে। কানকি ছেড়ে যখন এই দেশে এল, গুধুনি কিছু ধানি জমি কিনতে পারত। এই জায়গার কত জলা ভরতি করে নমুরা ধান রুয়ে দিল। তার বুড়াটা শুধু লাঙ্গল বলদের চক্করে পড়তে চাইল না। বাপ দাদার পেশা সে ছাড়বে কেন! গান্ধীবাবার বুলি মাথায় ঘুরছে বুড়ার না কি আলস ধরেছিল নতুন কাজে গতর খাটানোর, ভগওয়ান জানে!  এই সব গান্ধী ,তাদের বাল বাচ্চা, কংগ্রেস, সিপিএম বেশি বোঝে না ফুলরানি। পঞ্চায়েত ভোটে তার নাম উঠেছে। ঝুমড়ির ইস্কুলের হেডমাস্টার পঞ্চায়েত ভোটে দাঁড়ায়   গেল। সে বলেছিল কাস্তা হাথৌরিতে ছাপ দিতে। তার মত গরিবের নাকি অনেক ভালো হবে। পড়া লিখা হবে পোতির। জাতের খোটা দিবে না কেউ। ফুলরানি ভালো করে ছাপ দিল। কালি লাগলো নখে। হাত ধুতেই ইচ্ছা করছিল না তার। ভোটের আগে যে এত ছেলেছোকড়া বাড়ি এসে  খুড়ি খুড়ি করলো, তার দাওয়ায় বসে কী কী বললো, বেশিটাই তো বুঝলো না সে। কিন্তু বুকের ভিতর কেমন ধরফরাচ্ছিল, কিছু একটা বদলাচ্ছে, টের পাচ্ছিল। তার মাথার মধ্যে তো শুয়োরের গু ভরা  নাই। পোতির জন্য সে মাষ্টার রেখেছে। প্রাইমারী ইস্কুলে ভর্তি হয়েছে তার পোতি মিনতি দোসাদ। গুধুনির বাপচোদ্দ পুরুষে কেউ ইস্কুলের মুখ দেখেছে! মানুষের গুমুত নাড়াঘাঁটা করা ছাড়া আর কিছু ভাবতে পারে বুরবক বুড়া! হাউস মিটায়ে গালি দেয় ফুলরানি। মনে মনে। দুইটা পয়সা খরচা হইচে বলে বুড়ার মুখটা করেছে পচা কাঁঠালের মত! বিশ্বাসদের বাড়িতে তার যে মান বাড়বে, সেই কথা বুড়ার চিড়িয়ার দিমাগে ঘুসলে তো! 

“খেয়াল খুশি মত খরচা করিস, আর তিনমাস নোকরি ,তারপর কাঁচা পয়সা পাবি কই?”

গজরগজর করে গুধুনি, কিন্তু নিচু আওয়াজে। কিন্তু যতটা আওয়াজ নিচু করা দরকার ছিল, ততটার ধৈর্য ছিল না । 

“জানে হাওয়া লাগবে আমার ঐ সুইপারির নোকরি খতম হলে। ঝুমড়িটাকে কেউ সুইপারের নাতনি বলে চিড়হাবে না”

ফুলরানির গরম গলার সামনে চুপসে থাকে গুধুনি।  

 

বিশ্বাসদের বাড়ির ভিটা এলাকায় সবচেয়ে উঁচু জমিতে। পাঁচদিনের নাছোড়বান্দা  বৃষ্টিতেও  জল ওঠে না। উত্তরদিকের পাগার উপচালেও বার উঠানের দিকে গোড়ালি ডোবা জল হয়। ভিতর উঠানে তাও না। গোবরের লেপা যেমনকে  তেমনই থাকে। বর্ষায় বাড়ির মেয়েমানুষদের সকাল সকাল  বারউঠান পার হয়ে পাগারের পাশের খাটা পায়খানায়  যেতে আসতে হুজ্জুতি পোয়াতে হয়। ব্যাটাছেলেদের সেই সমস্যা নাই। তারা লুঙ্গি হাঁটুর উপরে তুলেই ঐ জমা জল টুকু পার করে। বার বার ভেবেও তাই পাগারের পাশে মাটি ফেলে জায়গাটা আর উচু করা হয় না। প্রতি বর্ষাতেই সামনের বর্ষার অপেক্ষা চলে। গত দুইদিন বৃষ্টি হয় নাই। উঠান খটখটাই দেখা যায়। উঠানের এক পাশে কাটা কলাপাতা ধোয়া পাকলা চলছে আজকে। বেলা দুইটা পার হয়ে যায়, প্রমীলাকে সাধ দেওয়া হয় নাই তখনো। ধাউস পেট নিয়ে খিদেতে নেতিয়ে আছে মেয়েটা। কলাপাতায় পাঁচ শাক ,তরকারী, কালবাউসের গাদার উপর একটা মাছি ঘুরে ফিরে বসার চেষ্টায় হাল ছাড়ছে না। কালুর বউ পাখা দিয়ে হারামজাদা মাছিটাকে তাড়াচ্ছে এক হাতে, অন্য হাতে ননদের কপালের ঘাম মুছিয়ে দিচ্ছে নিজের শড়ির আঁচলে। খাওয়ার থালে মুখ থুবড়ায় না পড়ে মেয়েটা। এত বেলা হল, পাঁচজন এয়ো জড়ো হয় না!  ফুলরানিকে দেখে নিশ্বাস ফেলে কালুর মা।   

“আইসো ! এত দেরি কল্লা কিলিগ্যা?”

“নাতনিটাও পিছ নিল যে”

“ভালা করসো অরেও আনছ , পুচকাগো লগে খেলো গা যাও।”

ঝুমড়ির দিকে তাকিয়ে হাসে কালুর মা। কুনুই ধরে টানে ফুলরানিকে, দেরি হয়ে যাচ্ছে। কালুর মার হাতে সিঁদুরের কৌটা গুঁজে দেওয়ার চেষ্টা করলে, প্রথমে তার ঠোঁটে লেগে থাকা হাসি চওড়া হয়। সে  প্রমীলাকে বলে, “দেখ খুড়ি কী নিয়া আসচে, কী কান্ড” প্রমীলা তার মায়ের দিকে চায়, তারপর ফুলরানিরর চোখে চোখ পড়ে  গেলে বলে ওঠে, “খুড়ি, ক্যান এই সব আবার“ তার গলার সুর নরম হয়ে আসে আনন্দে কী খিদেয় বোঝা যায় না। পাঁচ এয়ো তাকে ছুঁয়ে থাকলে, সে প্রথম গরাস মুখে তোলে। কালবাউসের প্রতিটি কাঁটা চুষে খেয়ে থালার কোনের আলুর টুকরোয় গিথে রাখে। এ সব কিছুই ফুলরানির চোখে সুন্দর ঠেকে। বাড়ির পোলাপানদের দৌড়াদৌড়ি হুড়ুদ্দূড়ে খাবলা খাবলা চুল ওঠা মাথার ঝুমড়িকে সে এক বার দেখে নেয়। মনের ভিতরে যে শীতল বাতাসটা দিচ্ছে, সে বোঝে এইটা সোয়াস্তি। পাটের মাথাগুলাও একের কাঁধে আরেক কেলিয়ে পড়ছে। গায়ে গা লাগিয়ে সেঁটে দাঁড়িয়ে আছে। সবই মাথায় মাথায় সমান! পাতায় পাতায়ও সমানই মনে হয়! সমস্ত হাওয়া আটকে একটাই সবুজ দেওয়াল খাড়া হয়ে নজর আটকাচ্ছে দূরের। সব কাছাকাছি জিনিসে চোখ ফেলতে হয় তাই। খাওয়াদাওয়া মিটলে ভিতর উঠানে মাদুর পাতা হয় জামগাছের তলায়। কালুর মা বসে কাঁথা সেলাইয়ের জন্য ন্যাতা হয়ে যাওয়া শাড়ি একের উপর আরেক বিছায়। ফেঁসে যাওয়া শাড়ির পার দুই হাঁটুর মধ্যে জড়িয়ে সুতা খুলতে থাকে। সূঁচে সুতা পরিয়ে দিয়ে ফুলরানি বলে

“এই কাহিনিডা কন দিদি, সেই বেহুলার লুহার বাসরের কাহিনিডা” 

হপরচপর করে চিবায়ে পান গালের একদিকে পাঠায়ে কালুর মা মুখ খোলে কোনোমতে

“আইজও মনসার কাহিনি শুনবা, ফুল?’’

“হ, হেইডা এমন সুন্দর কইরে কন আফনে, বারে বারে শুনবার ইচ্ছা করে” ফুলরানি গলা ডগমগায়।

কালুর বউ ফিনিক দিয়ে হাসে, “আফনে তো খুড়ি এক্কেরে মমিসিংগা টান ধরছেন খুড়ি! ঠিক আমাগো লাহান!”  

খুশি হতে গিয়েও ফুলরানি বোকার মত অস্বস্তি পায়। আঁচল গুছায় নেয় ভালো করে। হাসে। 

“হেই মনসার কাহন তো অনেক হুনসি, অহন আপনাগো দ্যাশের গল্প কন খুড়ি” কালুর বউ বলে।

“দ্যাশের গল্প আর কী, একই সব, যেমন সব ফ্যালায়ে আসিসিলা তুমরা, হে রহমই, আলদা কিসু না, আলদা আর কী…” ঠোঁটের উপরের ঘাম সাবধানে মোছে ফুলরানী। তার হাতে ফুলের উল্কিটা বেরিয়ে আসতে চাইলে সে ভালো করে  শাখা পলা সাজায় তার ওপর। 

কাঁথার ফোঁড় তুলতে তুলতে দেশের গল্প বলে কালুর মা। বৃষ্টিবাদলা থামলে কেমন চান্দ উঠসিল সেই রাতে। পলায় আসার সময়ে ক্ষেতপাথালি কোন দিক দিয়ে হাঁটা দিসিল তারা কয়ডা প্রাণী, কিছুই ঠাহর পায় নাই ভোর হওনের আগে। 

ঘুমসানো গরমে জামগাছের পাতায় একটুখানিক ঝিরঝিরায় যেন। চোখে ঝিম লেগে আসে ফুলরানির। কালুর মার গলায় নিশ্চিন্তির সুর ভর করে এমন, যেন সে তার  নিজের না, কোনও আন মানুষের কথা বলে চলে। 

একটা আওয়াজের ঝটকায় নড়ে বসে সবাই। আওয়াজটা প্রমীলার গলার। আসছে বারউঠানের দিক থেকে। কী সর্বনাশ হল বোঝার জন্য একসাথে সকলেই উঠে পড়ে। পাগারের দিকটায় প্রমীলাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। শাড়ি হাঁটুর উপরে তুলে গোটানো, এতগুলা মানুষ দেখেও হাঁটুর নীচে নামায় না। বিরবিরানি কান্না পষ্ট হলে বোঝা যায়, খাওয়ার পর যখন সবাই জামগাছতলে গা এলায়ে বসে ছিল, ওর পায়খানার বেগ আসে। কাউকে ডাকাডাকি না করে একাই সে আসে কাজ সারতে। কাজ সেরে বাইরে বেরোতে গিয়েই ঘটে সর্বনাশটা। টুবটুবা ভরা খাটাপায়খানার গর্তে তার মটর মালা টুপ করে ডুবে যায়। এখন উপরে মলের আস্তর ছাড়া কিছুই নজরে আসে না। নীচে কোন কোণে তার মটরমালা ঠাহর পায় না। মালার আশা ছাড়া অসম্ভব। কালুর মা এদিক ওদিক নজর ঘোরায়, এক খান বাঁশ টাঁস যদি পাওয়া যায়! প্রমীলাও এক পা এক পা করে এগিয়ে একদম গর্তের ধারে গিয়ে বসে। পারলে সে হাত ডোবায়! কালুর বউ ননদের মন বুঝে ফট করে বলে ফেলে, “খুড়ি, আফনে কিছু একটা উপায় করেন” । 

ফুলরানি নিজেও পেয়ারা পারার কোটা খুঁজছিল। কালুর বউ-এর কথা প্রথমে সে কিছুই ধরতে পারে না।   

কালুর মা যখন বলে, “ফুল, তোমারেই কিছু করতে হবে। একবার  বিসরায়ে দেহো”

ফুলরানিকে বোবায় ধরে। সে একবার কালুর মার দিকে একবার প্রমীলার দিকে নজর ঘোরায়। তাকে বলছে এরা? তাকেই তো ! ফুলরানি দোসাদ এখানে আর কে? 

কালুর মা বলে, “পুরান শাড়ি এক খান আইন্যা দাও খুড়িরে বউমা, এই নতুন শাড়ি পইড়া  ক্যামনে নামব ফুল অই গত্তে, গোয়াল ঘরের পিছন থিক্যা বেলচা ,টুকড়ি আনো দেহি।”

ফুলরানির কাঁধে হাত রাখে কালুর মা। 

চারজন এয়োর আট খান চোখ ফুলরানির উপর আটকায়।

 

ফুলরানি তাদের দিকে ফিরে হাসে, “হাম্মার দাদি ক্যাহেলছো, ই বড়া পুণ্যাহি কা কাম গান্ধীবাবা কহেলছো!”  

 

পাটক্ষেতের দিক থেকে হাওয়ার ঝাপট আসে। পাটের মাথা গুলান নুয়ে নুয়ে পড়ে। তার উপর দিয়ে মেঘ কালো ধুমসা শুয়োরের মত গোঁকগোঁক করে। বৃষ্টি নামবে। ঝুমড়ি বোধ হয় বাড়ি ফিরে গেছে। ঝুমড়ি এই পুণ্যের কাজ যেন দেখে না ফেলে। 

ফুলরানি বেলচা হাতে নেয়। পা নামায় গুয়ের গর্তে।

 

“ মাইগ্যে, থুঃ”

 

                                   

 

 

 

 

শেয়ার করুন

2 thoughts on “পুণ্য”

  1. Abhishek Jha

    খুবই ভালো একটা দলিত টেক্সট। গান্ধীকে ক্রমাগত প্রশ্ন করে যাওয়া দলিত বিদ্যার অন্যতম অভিমুখ হওয়া দরকার। এই টেক্সট’টি সেটা এত সুন্দর ভাবে করেছে যে কুর্নিশযোগ্য।

  2. সম্বিত বসু

    নিপূণ তথা শক্ত হাতে রূঢ় বাস্তব আর একান্ত সাধের বর্ণ-বেদনাময় পরিবেষনে গুহ্য-বাসে অভিলাষে মিলেমিশে একাকার গু সাফাইয়ের পূণ্যি। গল্পের শেষে যখন ফুলরাণি গান্ধীনামে উল্লঙ্ঘনের মোকাবেলা করে পাঁকে নামে, তখন যেন ‘তার সাথে কি এমন হওয়ার কথা?’ মনে না হয়ে মনে হয়, ‘এ মা! কি বোকা সে! তার সাথে তো এমনই হওয়ার কথা!” ‘এই কি সত্য?’ থেকে ‘এই তো সত্যে’-র এই অন্তিমি ঘা, এই গল্পকে এক ভয়ঙ্কর রকম জৈবিক মাত্রায় নিয়ে যায়। লেখিকাকে আমার আন্তরিক অভিনন্দন!

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *