বাংলাদেশের গার্মেন্ট শ্রম সংগঠনের অর্থনৈতিক ও লৈঙ্গিক ইতিহাস এবং রাজনীতি

গার্মেন্ট শিল্পকে বাংলাদেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি বলা যায়। দেশের মোট রপ্তানি আয়ের ৮৩ শতাংশই আসে গার্মেন্ট শিল্প থেকে। বাংলাদেশী নারীদের কর্মসংস্থানের সবচেয়ে বড় সেক্টরও এই গার্মেন্ট শিল্প। প্রায় চল্লিশ লক্ষ শ্রমিক এই শিল্পের সাথে জড়িত এবং এই শ্রমিকদের শতকরা ৮০ শতাংশই নারী। এদেশের গার্মেন্ট শ্রম সংগঠনের ইতিহাস বেশ জটিল। এই ইতিহাসের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে দশকের পর দশকের সামরিক শাসন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী যুক্তরাষ্ট্র-সোভিয়েত ইউনিয়নের স্নায়ুযুদ্ধ এবং সেই যুদ্ধে পাকিস্তান ও বাংলাদেশ সরকারের অংশগ্রহণ, উদার বাণিজ্যনীতির প্রবর্তন আর বিদেশী দাতা সংস্থা সমর্থিত এনজিওদের আধিপত্য। এই ইতিহাস এবং ইতিহাসে নারী গার্মেন্ট শ্রম সংগঠকদে অভিজ্ঞতা একটু গভীরে গিয়ে বুঝতে হলে আমাদের তাই তাকাতে হবে বাংলাদেশের জন্মেরও আগের সময়ের দিকে। এই এলাকার শ্রম আন্দোলন ঐতিহাসিকভাবে যুক্ত ছিল উপনিবেশবিরোধী আন্দোলনের সাথে। বাংলাদেশের “দেশ’ হয়ে ওঠারও অনেক আগে থেকে ব্রিটিশ এবং পাকিস্তানবিরোধী আন্দোলনের সাথে যুক্ত বামপন্থী রাজনৈতিক দলগুলো এখানকার শ্রম আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়ে এসেছে। ট্রেড ইউনিয়ন তাঁদের রাজনৈতিক সংগঠনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল। ট্রেড ইউনিয়নগুলোর মাধ্যমে তারা বড় সংখ্যার শ্রমিকদের তাঁদের রাজনৈতিক আন্দোলনের অংশ করে নিতে পারতেন এবং প্রয়োজনমত এই শ্রমিকদের সমর্থনও তাঁদের অনেক কাজে লাগতো। বলা বাহুল্য, তখনকার ট্রেড ইউনিয়নগুলোতে নারী সংগঠকদের অংশগ্রহণ প্রায় ছিল না বললেই চলে।

ব্রিটিশ শাসন থেকে ভারতীয় উপমহাদেশের স্বাধীনতার পরে পাকিস্তান রাষ্ট্রটি আমেরিকা-রাশিয়ার স্নায়ুযুদ্ধের একটি গুটিতে পরিণত হয়। পাকিস্তান রাষ্ট্রের সমর্থন ছিল আমেরিকার প্রতি। কিন্তু পাকিস্তানের বামপন্থী-কমিউনিস্ট জোট সমর্থন করছিলো সোভিয়েত ইউনিয়নকে। পাকিস্তানের সূচনালগ্ন থেকেই পাকিস্তান সরকারের সাথে বামপন্থী শ্রম আন্দোলনের নেতাদের সম্পর্ক ভালো ছিলো না। স্নায়ুযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে আমেরিকার এএফএল–সিআইও ট্রেড ইউনিয়নকে আমেরিকার নয়া উপনিবেশবাদ, প্রচারের একটি মাধ্যম হিসেবে বেছে নেয়। তারা কমিউনিজমকে দাবিয়ে রাখার উপায় হিসেবে তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে তাদের মত করে মুক্ত বাজার শ্রম আন্দোলনের মতবাদ প্রচার করতে থাকে। একই সময়ে পাকিস্তানের সামরিক শাসকও, বামপন্থী ও কমিউনিস্ট ব্লককে দমন করার জন্য বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করতে থাকে। ১৯৫৪ সালে কমিউনিস্ট পার্টিকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। এর ফলে কমিউনিস্ট পার্টির নেতারা আন্ডারগ্রাউন্ডে চলে যেতে বাধ্য হন। এরপর থেকে এএফএল-সিআইও এবং ইন্টারন্যাশনাল ফেডারেশান অফ ফ্রি ট্রেড ইউনিয়ন (আইসিএফটিইউ) পূর্ব পাকিস্তানে (এখনকার বাংলাদেশে) প্রভাবশালী হতে শুরু করে। পূর্ব পাকিস্তান লেবার ফেডারেশান আইসিএফটিইউ-এর সাথে কাজ করা আরম্ভ করে।

বাংলাদেশের স্বাধীনতার পরে আওয়ামী লীগ সরকার নতুন দেশটিতে সমাজতান্ত্রিক মতবাদ প্রতিষ্ঠা করার উদ্দেশ্যে বিভিন্ন উদ্যোগ নেয়। সরকার দেশের প্রায় ৯০ শতাংশ শিল্পকে সরকারীকরণ করে। শুরুর দিকে আওয়ামী সরকার সমাজতান্ত্রিক অর্থনৈতিক ও শ্রমনীতি চালু করার চেষ্টা করলেও কিছুদিনের মধ্যেই দলটি দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতির কারণে তার জনপ্রিয়তা হারাতে থাকে। সরকার সবগুলো ট্রেড ইউনিয়নকে একটি সংগঠনের অংশে পরিণত করে। এর ফলে সরকারের বাইরে থেকে স্বাধীন শ্রম সংগঠনের সুযোগ সংকুচিত হয়ে পড়ে। ১৯৭৫ সালে সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটে। সরকার পতনের পরে জেনারেল জিয়াউর রহমান নতুন প্রেসিডেন্ট হিসেবে ক্ষমতা গ্রহণ করেন এবং সবগুলো ট্রেড ইউনিয়নকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেন। ১৯৭৭ সালে তিনি এই নিষেধাজ্ঞা তুলে নেন এবং ট্রেড ইউনিয়নদের জন্য একটি রেজিস্ট্রেশানের পদ্ধতি চালু করেন। এই রেজিস্ট্রেশন শুধু রাজনৈতিক দলের শ্রমবিষয়ক শাখাগুলোকে রেজিস্ট্রার করার অনুমতি দেয়। সে সময়ে চীনের সমর্থক কিছু বামপন্থী সংগঠনের নেতা, জিয়াউর রহমানের সরকারের সাথে একাত্মতা প্রকাশ করে। জিয়াউর রহমান বাংলাদেশে বেসরকারীকরণ ও বিদেশী বিনিয়োগের অন্যতম প্রবক্তা ছিলেন। জিয়াউর রহমানের হত্যাকান্ডের পরে ১৯৮২ সাল থেকে দেশের রাষ্ট্রক্ষমতা চলে যায় আরেক সামরিক শাসক হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের কাছে। এরশাদ, জিয়াউর রহমানের বেসরকারীকরণের উদ্যোগকে আরো সম্প্রসারিত করেন। তার হাত ধরেই বাংলাদেশে আসে বিশ্বব্যাংক ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল সমর্থিত স্ট্রাকচারাল অ্যাডজাস্টমেন্ট পলিসি এবং বিদেশী বিনিয়োগের জন্য দেশের দ্বার উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়। বাংলাদেশের নারীশ্রমিকের সস্তা শ্রম প্রথম বিশ্বের বড় বড় কর্পোরেশনকে আকর্ষণ করে। ফলে সত্তর দশকের শেষ এবং আশির দশকের শুরু থেকে বাংলাদেশে গার্মেন্ট শিল্প তার যাত্রা শুরু করে।

এসময়ে কিছু বামপন্থী দল, এরশাদ সরকারের বিরুদ্ধে সামরিক শাসন বিরোধী আন্দোলন শুরু করার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু এরশাদ সরকার শক্ত হাতে সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলনকে দমন করে। এসময়ে চীনের সমর্থক বাংলাদেশ ওয়ার্কার্স পার্টির ট্রেড ইউনিয়নটি ছিল একমাত্র ট্রেড ইউনিয়ন যারা গার্মেন্ট শ্রমিকদের সংগঠিত করতো। কিন্তু গার্মেন্ট শ্রমিকদের অধিকার আদায়ের চেয়ে ওয়ার্কার্স পার্টি তাদের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিল করার জন্য কীভাবে এই শ্রমিকদের ব্যবহার করা যায় সে ব্যাপারেই বেশি আগ্রহী ছিল। এর ফলে বাংলাদেশের মূলধারার শ্রম আন্দোলনে গার্মেন্ট শ্রমিকরা আশির দশকে তেমন একটা গুরুত্ব পায়নি।

১৯৯০ সালে গণঅভ্যুত্থান এবং শিক্ষার্থী আন্দোলনের মাধ্যমে এরশান সরকারের পতন ঘটে। তারপর থেকে আওয়ামী লীগ এবং বিএনপি পালাক্রমে দেশ শাসন করে এসেছে। দুটো দলই নিজেদের গণতন্ত্রের অকুন্ঠ সমর্থক হিসেবে দাবী করে এবং তাদের কেউই সামনাসামনি সামরিক শাসনকে সমর্থন করেনা। কিন্তু তাদের অর্থনৈতিক নীতি তাদের পূর্বসূরী সামরিক শাসকদের তুলনায় এমন কিছু ভিন্ন ছিল না। কোন দলই দেশের শ্রম আন্দোলনকে শক্তিশালী করে তোলার জন্য শক্ত কোন উদ্যোগ নেয়নি। দুইদলেরই প্রায় এক তৃতীয়াংশের বেশি সসদ সদস্য, গার্মেন্ট ব্যবসার সাথে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িত। তাই গার্মেন্ট শ্রমিকদের অধিকার আদায়ের ব্যাপারে তাদের কারোরই ঐতিহাসিকভাবে তেমন আগ্রহ ছিল না। 

আওয়ামী লীগ-বিএনপির শ্রম সংগঠনগুলো ছাড়া কিছু ছোট বামপন্থী সংগঠন গার্মেন্ট শ্রমিকদের সংগঠিত করে এসেছে। তাদের বেশিরভাগই বিদেশী ফান্ড গ্রহণ করে না। তারা শুধু তাদের বিশ্বস্ত রাজনৈতিক সমর্থকদের সহায়তায় সংগঠনের কাজ চালায়। এর ফলে এইসব সংগঠনের বড় ব্যাপ্তিতে এবং আন্তর্জাতিক পরিসরে কাজ করার ক্ষমতা সীমিত। এই সংগঠনগুলোর মধ্যে রাজনৈতিক মতাদর্শেরও ভিন্নতা আছে। যেমন এদের কেউ স্ট্যালিনিস্ট, কেউ মাওইস্ট, আবার কেউ অন্যান্য বামপন্থী দার্শনিকের মতধারা সমর্থন করে। এইধরনের সংগঠনগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ গার্মেন্ট শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্র এবং গার্মেন্ট শ্রমিক ঐক্য ফোরাম অনেকদিন ধরে মাঠ পর্যায়ে শ্রমিকদের সাথে কাজ করে এসেছে (রহমান ও ল্যাংফোর্ড ২০১২; সিদ্দীকি ২০১৭)।

একবিংশ শতকের বাংলাদেশে এই বামপন্থী শ্রম সংগঠনগুলো বেশ কয়েকটি বড় বড় গার্মেন্ট শ্রমিক আন্দোলন সংগঠিত করেছে। ২০০৬, ২০১০ এবং ২০১৪ সালে তাদের নেতৃত্বে বড় বড় কিছু আন্দোলন ঘটে। ২০০৬ সালে চার হাজার কারখানার শ্রমিকেরা ন্যূনতম মজুরি আন্দোলনে অংশ নেয় এবং আইন শৃংখলা বাহিনীর সাথে তাদের সংঘর্ষ হয়। ২০১০ সালে শ্রমিকেরা আবার মজুরি বৃদ্ধির দাবীতে আন্দোলন করে। ২০১৪ সালে এগারোটি বামপন্থী শ্রম সংগঠনের নেতৃত্বে ষোল’শ শ্রমিক তিন মাসের বকেয়া বেতনের প্রতিশ্রুতি আদায় না হওয়া পর্যন্ত অনশন ধর্মঘটে অংশ নেয় এবং কারখানা দখল করে। 

ট্রেড ইউনিয়ন ছাড়াও বাংলাদেশে অনেক রাজনৈতিকভাবে যুক্ত এবং রাজনৈতিক যোগাযোগবিহীন ফেডারেশান এবং এনজিও, গার্মেন্ট শ্রমিকদের সংগঠন করে। শ্রমিকের স্বার্থবিরোধী শ্রম আইন এবং সরকারের শ্রমিকবিরোধী আচরণের প্রেক্ষিতে ট্রেড ইউনিয়নের পাশাপাশি এসব ফেডারেশান এবং এনজিওর ভুমিকা উল্লেখযোগ্য। উদাহরণস্বরূপ, বাংলাদেশের শ্রম আইন অনুযায়ী ইউনিয়নের রেজিস্ট্রেশানের জন্য একটি কারখানার ন্যূনতম ৩০ শতাংশ শ্রমিককে ইউনিয়নের সদস্য হতে হয়। যারা সদস্য হিসেবে রেজিস্ট্রেশান করে, তাদের নাম কারখানার মালিকদের কাছে চলে যায়। এর ফলে অনেক সময়ে এই সদস্যরা মালিকপক্ষের প্রতিহিংসার শিকার হয়। এছাড়া বাংলাদেশের এক্সপোর্ট প্রসেসিং জোনগুলোতে ট্রেড ইউনিয়নগুলো নিষিদ্ধ। তাই যেসব পরিস্থিতিতে ইউনিয়নের পক্ষে শক্ত ভূমিকা রাখা সম্ভব হয়না, সেসব পরিস্থিতিতে ফেডারেশান এবং এনজিওগুলো শ্রমিকের অধিকার আদায়ের ব্যাপারে পরিপূরক ভূমিকা রাখতে পারে।  

বাংলাদেশের বৈদেশিক অনুদান রেগুলেশান আইন অনুযায়ী কোন সংগঠন বিদেশী অনুদান গ্রহণ করতে চাইলে তাদেরকে এনজিও হিসেবে রেজিস্ট্রেশান করতে হয়। এই কারণে অনেক ফেডারেশান অনুদান গ্রহণ করার উদ্দেশ্যে তাদের নিজস্ব এনজিও চালু করেছে। যেমন – নাজমা আক্তার আওয়াজ ফাউন্ডেশান নামের একটি শ্রম এনজিও চালান। তিনি সম্মিলিত গার্মেন্ট শ্রমিক ফেডারেশানেরও চেয়ার। যেসব শ্রমিক তার এনজিওর কাছে সহায়তার জন্য যায়, তাদেরকে তিনি ফেডারেশানের সদস্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করেন। কল্পনা আক্তার, বাংলাদেশ সেন্টার ফর ওয়ার্কার সলিডারিটি নামের একটি লেবার এনজিওর এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর। তার সহসংগঠক বাবুল আক্তার হলেন বাংলাদেশ গার্মেন্টস ও ইন্ড্রাস্ট্রিয়াল ওয়ার্কারস ফেডারেশানের চেয়ার। কল্পনা আক্তারের এনজিও এবং বাবুল আক্তারের ফেডারেশন হাতে হাত মিলিয়ে কাজ করে। এই কারণে বাংলাদেশের গার্মেন্ট শ্রমিক সংগঠনগুলোর মধ্যেকার সীমানা টানা মুশকিল। ইউনিয়ন, ফেডারেশন এবং এনজিওগুলো অনেক সময়ে একই নেতাদের মাধ্যমে পরিচালিত হয় এবং তারা একে অপরের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রক্ষা করে শ্রমিকদের সংগঠিত করে।

তবে বাংলাদেশে লেবার এনজিওগুলোর প্রভাবশালী হয়ে ওঠার রাজনীতি ততটা মসৃণ নয়। এনজিওগুলোর উত্থানের পেছনে কাজ করেছে বিদেশী দাতাসংস্থা এবং বাংলাদেশের এনজিওয়াইজেশানের জটিল অর্থনৈতিক রাজনীতি। এবং এই রাজনীতির মাধ্যমেই বাংলাদেশের অনেক গুরুত্বপূর্ণ নারী শ্রমিক নেতাদের উত্থান ঘটেছে। বিস্তারিত আলোচনা থাকবে পরের পর্বে।

শেয়ার করুন

Leave a Comment

Your email address will not be published.