গরাদ স্মৃতি

বিপজ্জনক ডাইনি মেয়েরা… 

আমাদের কখনোই  অন্য বন্দীদের সাথে রাখেনি। আলাদা রাখতো। কারণ ওরা মনে করতো আমরা বিপজ্জনক। যাদের আরো বিপজ্জনক মনে করতো তাদের আলাদা সেলে রাখতো। মীনাক্ষী আর আমি যখন প্রেসিডেন্সি জেলে প্রথম আসি তখন আমাদের সেলে দিয়েছিল। কল্পনা আর জয়া মিত্রও ওখানে ছিল। কৃষ্ণাও এই জেলেই ছিল। 

একটা বোধহয় নিয়ম আছে যে জোড় নম্বরে কয়েদি রাখা যেত না, সম্ভবত সমকামী সম্পর্ক গড়ে উঠবে এই আশঙ্কায়। আমি জানিনা এটা কেউ ইয়ার্কি করে বলেছে না সত্যিই কিছু উপনিবেশিক নিয়ম থেকে গেছে। তো আমরা আসতে জয়াকে অন্য জেলে ট্রান্সফার করে দিয়েছিল। আমাদের সাথে সাধারণ বন্দীদের কোনো রকম কথোপকথন করতে দিত না।

তাও আমরা লুকিয়ে কথা বলতাম টুকটাক।  কখনো ওরা আমাদের সেলের পিছন দিকে আসতো, কখনো কোর্টে নিয়ে যাওয়ার সময়। আমাদের সেলের উপর থেকে উঠোনটা দেখা যেত। তাই আমরা সেখান থেকে সব দেখতে পেতাম। ওদের মনে হত আমরা অন্য বন্দীদের সাথে থাকলেই ওদের ব্রেন ওয়াশ করবো, বিপ্লবের কথা বলবো। আমাদের ব্যাপারে তাই অনেক কিছু রটিয়ে দিত। আমাদের ডাইনি বলতো। আমার এখনও মনে আছে একবার এক পায়রা মরে পড়েছিল, ওরা সেটা রটিয়েছিল যে আমরা মেরে খেয়েছি, যাতে ওদের ডাইনির গল্পটা আরো বিশ্বাসযোগ্য হয়। পরে যখন কিছুজন আমাদের সাথে কথা বলতে আসতো, আমাদের সাথে মিশলো তখন ওই ভয় কাটলো।

সবারই কৌতুহল ছিল আমরা কারা, আমাদের আলাদা কেন রাখা হয়েছে। তারপর তারা প্রায়েই ইশারা করে ডাকতো, লুকিয়ে এসে কথা বলতো, চিরকুট দিত। আমাদের সেলের সামনে একটা বারান্দা ছিল সেখানে কিছু খোপ ছিল, সেখান থেকে আমরা দেখতে পেতাম। যদিও আমাদের সুবিধে ছিল আমরা বাকিদের সমস্ত কার্যকলাপ দেখতে পেতাম, কে চুরি করছে, কে বেআইনি কিছু করছে, কে কাকে হেনস্থা করছে। দেখতাম, চেঁচিয়ে প্রতিবাদ করতাম, দরখাস্ত দিতাম। তাই প্রশাসনিক কারণে নকশাল বন্দীদের আলাদা রাখতে বাধ্য হলেও, ওরা আসলে আমাদের সেলে রাখতে চাইতো না। এতে ওদেরই অসুবিধে হতো। আমাদের কিছু করার সাহস পেত না। কিন্তু আমরা কারো সাথে কথা বললে তাদের টার্গেট করতো। তবুও অনেকেই আমাদের জন্য অনকে ঝুঁকি নিয়েছে। বিভিন্ন উপায় বের করতো কথা বলার, সাহায্য করার।

লাল নীল শাড়ি উড়ে যাচ্ছে! 

ওই সময় মুক্তিযুদ্ধের পরে পরেই বাংলাদেশ থেকে অনেকে এসেছিল। অনেক বাচ্চা ছিল যারা হারিয়ে গেছিল তাই জেলে রাখা হয়েছিল। ওরাই জেলের প্রাণশক্তি ছিল। আমাদের খুব ভালোবাসতো। আমাদের সেলের সামনে এসে খেলা করতো, বিভিন্ন ভাবে আমাদের বিনোদন জোগাতো। 

আমরা কিছু পুতুল বানিয়েছিলাম। কাপড় ইত্যাদি দিয়েই। সেই দেওয়ালের ফাঁক দিয়ে আমরা ওই পুতুলগুলোকে ঝুলিয়ে পুতুল নাচ করতাম। ওরা খুব মজা পেত। দিনরাত মাসি মাসি করতো। একবার এই করতে গিয়ে একটা পুতুল আমাদের হাত থেকে ফসকে নিচে পরে গেছিল। কি দুঃখ পেয়েছিল ওরা যে একটা পুতুল মরে গেল! ওদের কাছে এটা একটা অভিনব অভিজ্ঞতা ছিল। 

মর্জিনা বলে একটা মেয়ে ছিল। ওর বাবার সাথে এসেছিল। ওকে মেয়েদের ওয়ার্ডে রেখেছিল। ও সব বাচ্চাদের উপর হুজ্জতি করতো। একদিন আমাদের ডেকে বললো, ছুটি হয়ে গেছে এবার বাবা নিয়ে যাবে। আমরা জিজ্ঞেস করলাম, কবে বাড়ি যাবি। ও বলে, ‘মাসি আমাকে একটা ওই পুতুল দিবি, আমি তোকে তিনটে বিস্কুট দেব’। ওর এত পছন্দ ছিল ওই পুতুলগুলো। 

আরেক দিন আমাদের ডাকছে, ‘মাসি, মাসি তোদের শাড়ি আকাশে উড়ে গেল! দেখ আকাশে উড়ছে!’ আমরা অবাক হয়ে ভাবছি, সেল থেকে আবার আমাদের শাড়ি উড়ে কি করে যাবে। সব তো বন্ধ। কিন্তু সব বাচ্চাগুলো এসে খুব উত্তেজিত হয়ে চ্যাঁচাচ্ছিল লাল, নীল সব শাড়ি আকাশে উড়ে গেল, মাসিদের শাড়ি উড়ে গেল! আমরা তো সেল থেকে আকাশ দেখতে পাচ্ছিলাম না। বুঝতে পারছিলাম না কী হচ্ছে। অনেক পরে বুঝেছিলাম আকাশে রামধনু উঠেছে। ওরা কখনো রামধনু দেখেনি। ছোট থেকেই জেলেই থেকেছে তাই ওটাই ওরা ভেবেছে মাসিদের শাড়ি উড়ে গেছে! আবার একজন বলছিল, মন খারাপ করিস না মাসি, শাড়িটা চলে গেল, আমি বেরোলে তোকে লাল নীল শাড়ি এনে দেব!

আনোয়ার বলে একটি বাচ্চা ছিল। খুব স্মার্ট। নিখোঁজ হয়ে গেছিল। আমরা কথা বলে বলে একটু করে গল্পটা বোঝার চেষ্টা করছিলাম। ও ডুগডুগির কথা বলতো, মায়ের কথা বলতো। বলতো ও ওর মায়ের কাছে খাবার চেয়েছিল। ওর কী কী মনে পড়ছে জিজ্ঞেস করায় একটা বড় ঘরে টুপি পরে মাথা নিচু করার কথা বলেছিল। বুঝেছিলাম মসজিদের কথা বলছে। ওয়েলফেয়ার অফিসাররা একটু দশ মিনিট সময় ব্যয় করলেই এগুলো জানতে পারতো কিন্তু কেউ বাচ্চাগুলো কে সেই সময়টুকুও কেউ দিত না। 

জানলাম একদিন সে মায়ের কাছে খাবার চেয়েছিল, মা দেয়নি তাই সে বাড়ি থেকে বেরিয়ে ডুগডুগিওয়ালার পিছু পিছু চলে আসে আর তারপর পথ হারিয়ে ফেলে। আমরা অফিসারকে জানাই সমস্ত মসজিদে খোঁজ করতে। ওর বাড়ির লোকও নিশ্চয়ই জানে না। আমরাই কী জানতাম বাচ্চাদের জেলে রাখা হয়! একদিন দেখলাম আনোয়ার অন্য বাচ্চাদের ১, ২, ৩, ৪ শেখাচ্ছে। আমরা ১ থেকে ১০ লিখে বললাম এর মধ্যে কোনো সংখ্যা রাস্তায় দেখেছে বলে মনে পড়ছে কিনা। ও বললো ২৪ দেখেছে। 

পরে ২৪ নং বাস রুটের দিকের মসজিদগুলোয় খোঁজ করায় ওর বাড়ির হদিস পাওয়া গেছিল। আনোয়ার বাড়ি যেতে পেরেছিল। কিন্তু অনেকে পারেনি। অনেকেই পাচার হয়ে যেত। জেলের মধ্যেই পাচার চক্র ছিল। কর্তৃপক্ষের হাত ধরেই সব চলতো। এসব ঠেকে শেখা। 

টিকে থাকার লড়াই… 

এই ফৌজদারি আইন ব্যবস্থা কিভাবে মেয়েদের আত্মসাৎ করে নেয় তাও দেখেছিলাম। সেই সময়ে জেলে একটি মেয়েদের গ্যাং খুব রোয়াব জমাতো। কারও কোনো জিনিস ওপর পছন্দ হলে তার থেকে নিয়ে নিত। এই দলের পান্ডা ছিল শিখা। একবার একটি মেয়ে এসেছিল। সে খুবই ভীত সন্ত্রস্ত থাকত। চারিদিকে দেওয়াল, পাঁচিল দেখে আরো ভয় পেয়ে গেছিল। শিখারা ওর থেকেও যা মনে হয়েছিল নিয়ে নিচ্ছিল। মেয়েটি খুব ভয় একটা ন্যাকড়ার বান্ডিল আঁকড়ে ছিল। যাতে সেইটা কেউ কেড়ে না নেয়। পরে বুঝলাম ওই বান্ডিলে ওর ছোট বাচ্চা ছিল।  পরে আলাপ হলে জানি মেয়েটির বর কোনো একটা মার্ডার কেসে জড়িয়ে পড়েছিল। মেয়েটিও কিছু ভাবে ওই সূত্রেই গ্রেপ্তার হয়েছিল। মেয়েটি বলতো বর খালি হাতে আসতে চায়না বলে দেখা করতে আসতে পারেনা। 

পরে একদিন ওর বর নিজের রক্ত বেচে ওর জন্য শাড়ি, বাচ্চার জন্য কিছু জিনিস নিয়ে এসেছিল। ও সেই আমাদের ডেকে দেখালো। আমরাও খুব খুশি। মনে হয়েছিল, কী সুন্দর একটা প্রেমের গল্প। একদিন এসে বললো ওর বুকের দুধ নেই তাই বাচ্চাটাকে খাওয়াতে পারছেনা। কিন্তু আরেক সহবন্দী এগিয়ে এসে বলেছে আমার বাচ্চাকে যখন খাওয়াব, তোরটাকেও খাইয়ে দেব। এই রকম বন্ধুত্বের, সংহতির অনেক গল্প ছিল। পরে ও হঠাৎ আসা বন্ধ করে দিয়েছিল, অন্য বন্দীদের সাথে খাচ্ছিল না। একদিন দেখলাম অন্য এক বন্দীর সাথে খুব খারাপ আচরণ করলো, খুব বাজে কথা বললো। দেখলাম শিখার গ্যাং-এর সাথেই ঘুরছে। একদিন চোখে চোখ হতেই চোখ নামিয়ে নিল। দেখলাম ওর হাতে একটা দুধের বোতল। বুঝলাম পরিস্থিতি, এই নির্মম জেল ব্যবস্থা অনেককেই শুধু টিকে থাকার জন্য অনেক কিছু করতে বাধ্য করে।

আনোয়ারা বলে একজন ছিল। তখন খুব রাগ হতো। এখন ভাবলে বুঝি। আনোয়ারা বিভিন্ন লোকেদের দিয়ে কাউকে দিয়ে হাত টেপাতো, এটা আনাতো, ওটা আনাতো। বাচ্চাদের দিয়ে কাজ করাতো। পরে এক অফিসার, তিনিই একমাত্র আমাদের প্রতি সহানুভুতিশীল ছিলেন, তার থেকে জানি, আনোয়ারা লিলুয়াতে একটি হোমে থাকতো। সেখানে এক মেয়ের সাথে ওর সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। কিন্তু সেই মেয়েটি অন্য আরেক মেয়ের প্রেমে পড়ে। আনোয়ারার সেটা সহ্য হয়নি। এক রাতে রাগের বশে ওর সেই প্রেমিকাকে পিটিয়ে মেরে ফেলে আনোয়ারা। হোমের অন্য মেয়েরা ভয়ে ঘর থেকে বেরোয়নি। তারপর ও প্রাপ্তবয়স্ক হলে ওকে প্রেসিডেন্সি জেলে পাঠানো হয়। ওর গল্পটা শুনে যেমন খারাপ লেগেছিল, তেমনি ওর জেলের ভেতরের কার্যকলাপ ভুলে যাওয়াও সম্ভব ছিল না। এই ব্যবস্থাটাই হয়তো ওকে নিষ্ঠুর করে দিয়েছিল। একদিন হঠাৎ পুরো জেলে খবর চাউড় হলো আনোয়ারার জেল ইন্টারভিউয়ের ডাক পড়েছে। সবাই খুব উত্তেজিত, এত বছর বাদে কেউ আনোয়ারার সাথে দেখা করতে এসেছে। এবার হয়তো ও এই জায়গাটা ছেড়ে যেতে পারবে। ওয়ার্ডারদের অনেকের থেকে আমরা অনেক খবর পেতাম। শুনলাম আনওয়ারার বাবা এসেছে। ওর পরের ইন্টারভিউ আমার আর মীনাক্ষীর সাথেই পড়েছিল। ইন্টারভিউয়ের সময়ে জেলে সবাই খুব সেজেগুজে ভালো শাড়ি পরে যেতাম। আমরা ওর সাথে কথা বলার চেষ্টা করছিলাম। ও মোটেই পাত্তা দিত না আমাদের। খুব অপছন্দ করতো আমাদের। ইন্টারভিউতে তো আমরা সবাই একসাথেই একদিকে থাকতাম, যারা আসতো তারা গরাদের ওপারে থাকতো। প্রায় কেউই কারো কথা খুব বুঝতো না। ১০ মিনিটে যে যা পারতো পুরো সব আশ মিটিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করতো। আনোয়ারা আমাদের পাশেই দাঁড়িয়ে ছিল। আমরা দেখছিলাম ওর বাবা কাঁদছে, বারবার বলছে, ‘বেটি মাফ কর দো…’। আনোয়ারা একদম স্থির হয়ে গেছিল। কোনো কথা বলছিল না। কঠিন মুখ করে দাঁড়িয়ে ছিল। আমরা ফেরার পথে আবার ওর সাথে কথা বলার চেষ্টা করছিলাম। কিন্তু বুঝেছিলাম ও  আসলে চায়নি ওর জীবনের এই দিকটার কথা আমরা জানতে পারি। ও নিজের কাছেও তো অজানা ছিল। পরে ওয়ার্ডেনের থেকে জানি আনোয়ারা ওর বাবার সাথে ফিরে যেতে অস্বীকার করেছে। জেল এই ভাবেও কত লোককে পাশবিক করে দেয়। এখন মনে হয় ও, শিখা এই ব্যবস্থারই শিকার ছিল। ওরা এর বাইরে আর কোনো জীবনে যেতে পারে না। এই যে লোকে বলে জেল জীবন বদলে দেয়, সব বাজে কথা। এই ব্যবস্থাটা ভীষণ  নির্মম, ভীষণ নিষ্ঠুর। বিশেষ করে মেয়েদের জন্য। তবু সেখানেও অত নির্মমতার মাঝেও অনেক মানবিকতাও দেখেছি। 

ওই সময়ে জেলের অবস্থা খুবই খারাপ ছিল। উপচে পড়তো। আর পড়বে নাই বা কেন। শয়ে শয়ে মেয়েতে ভর্তি যাদের জন্য এই রাষ্ট্রে, এই সমাজে কোনো জায়গা নেই। যাদের কথা কেউ মনে রাখে না। সবাই পরিত্যাগ করেছে। আরেকটি মেয়ে ছিল। সামান্য চুরির কেস ছিল। জামিন হয়েই যেত। কিন্তু সেই জামিনের টাকাটুকুও ছিল না ওর। বলতো ওই টাকাই যদি থাকতো তাহলে চুরিটাই তো করতাম না। এরকম যে কত মেয়েরা ছিল। শুধু ঠিক করে আইন বুঝতো না, উকিল ছিল না, জামিনের টাকা ছিল না বলে আটক ছিল। 

 কারাগারের রাজনীতি, কারাবাসের রাজনীতি…

কোর্টের দিনগুলো এক রাশ আশা আনতো। সবার সাথে দেখা হতো। কমরেডদের সাথে দেখা হতো। আমি, মীনাক্ষী, পাখি সবাই একসাথে রাজনৈতিক খবর আদান প্রদান করতাম। চিরকুট চালাচালি হতো। একে অপরকে আশ্বাস দিতাম। তখন তো মনে হতো আর এক দু বছরের মধ্যেই বিপ্লব হয়ে যাবে। কত আশা ছিল।  বাবা মায়েরা আসতো। সবার পরিবারের লোকেরাও কিভাবে একটা নেটওয়ার্ক হয়ে গেছিল। সবাই একে অপরের সাথে যোগাযোগ রাখতো। ওরাও সবাই বন্ধু হয়ে গেছিল। আমাদের একবারই কোর্ট রুমে ঢুকিয়েছিল। পুরো দৃশ্যটা এত হাস্যকর ছিল। প্রচুর পুলিশ ছিল। মনে হচ্ছিল আমরা এই রাষ্ট্রের সব চেয়ে গুরুত্বপুর্ণ, সব চেয়ে বিপজ্জনক লোক। সব ২০-২২ বছরের ছেলে মেয়েরা। রাষ্ট্রদ্রোহী।  উকিলরা সব গম্ভীরভাবে আমাদের দেখছিল অথচ আমরা সত্যিই খুব নগণ্য ছিলাম। যে কেউ আমার নাম নিয়ে দাঁড়িয়ে পড়লেও ওরা বুঝতেও পারতো না। পুরোটাই খুব হাস্যকর ছিল। আমাদের আইন ব্যবস্থাটাই যে কত হাস্যকর সেটা বুঝেছিলাম। আমাদের কেস চলাকালীন এক জজ ঘুমিয়ে পড়েছিল। আর আমার মা ‘ওনাকে ওঠান, ওনাকে ওঠান’ করে যাচ্ছিল। মা তখন ভেবেছিল উনি উঠলেই বোধহয় হয়ে যাবে। পুরো সিস্টেমটাই যে কি প্রহসন, কি হাস্যকর! 

আমরা আসতে আসতে এই ব্যবস্থাতেই টিকে থাকতে শিখে গেছিলাম। ফাঁকি দেওয়ার ফাঁক ফোঁকর খুঁজে নিয়েছিলাম। লুকিয়ে চা বানাতাম। ওরা যে রুটি দিত সেটা খাওয়া যেত না। ওই দিয়ে আমরা জ্বালানির কাঠ বানাতাম। একটা ছোট জানলা দিয়ে রোদ আসতো। চার দিন পাঁচ দিন শুকিয়ে শুকিয়ে কাঠ বানাতাম। বিভিন্ন পুরোনো পত্রিকা দিয়ে জ্বালানি বানাতাম। জেলে থাকতে থাকতে আমরা সমস্ত ইঙ্গিত, সমস্ত সংকেত, সবার সমস্ত বডি ল্যাংগুয়েজ বুঝতে শিখে গেছিলাম। মেট্রনের তাড়াতাড়ি ঘরে ঢুকে যাওয়া, গেট খোলা বন্ধ হওয়া, গার্ডদের চাহনি, ওয়ার্ডেনদের ব্যবহার সমস্ত পড়তে পারতাম। এগুলো না বুঝলে টিকতে পারতাম না। একদিন চিরকুট হাতে মীনাক্ষী ধরা পরেছিল। আমরা কথা বলতে পারছিলাম না কিন্তু দুজনেই বুঝে গেছিলাম। মীনাক্ষীকে দেখেই বুঝেছিলাম। ফেরার সময় পুলিশ জেল কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তরের সময়ে আবার সার্চ হয়। সার্চের সময় বললাম জল চাইলাম, শরীর খারাপ ছিল বলে। আমরা জানতাম চিরকুট হাতে ধরা পরলেই ধোলাই হবে। এবং আমরা জানতাম এটা খুব গুরুত্বপুর্ণ চিঠি। ধরা পরলে খুব সমস্যা হবে। আমরা জল আসতেই চিরকুটুটা দুজনে গিলে ফেললাম। জেলে টিকে থাকা শিখে গেছিলাম বলেই এটা পেরেছিলাম। 

জেলের কিছুজন আবার খুব সহানুভুতিশীলও ছিল। বাড়ি থেকে লোক আসার খবর দিত। মাঝেমাঝে দেশলাই আনতে দিত। একবার আমরা মেট্রনকে শবক শেখাবার প্ল্যান করেছিলাম। আমরা প্রতিবাদ করেছিলাম, ওয়েলফেয়ার অফিসারকে দরখাস্ত দিয়েছিলাম, কিন্তু কিছুতেই কিছু হয়নি। তাই ঠিক করেছিলাম কিছু একটা করে বোঝাতে হবে বন্দীদেরও অধিকার আছে। ওরা যা খুশি করতে পারেনা আমাদের সাথে। কৃষ্ণারা অন্য ওয়ার্ডে ছিল। সেটাও পুরোটাই নকশাল ওয়ার্ড। চিরকুট, খাবার দেওয়ার নামে আমরা ওদের সাথে যোগাযোগ করে প্ল্যান করেছিলাম। যে আমাদের আর ওদের গেট খুললেই আমরা মেট্রনকে আক্রমণ করবো। একটা লাঠি জোগাড় করেছিলাম। সেল থেকে বেরিয়ে একটা দালান ছিল। সেল খুলে দিলে আমরা দালানে আসতে পারতাম। ওই একটা চিকের ওপরে একটা লাঠি ছিল, যার থেকে চিকটা ঝুলত। আমরা সবাই খুবই ছোট খাটো রোগা রোগা ছিলাম। দৌড়োনর সুবিধার জন্য টাইট করে হাঁটু অবধি শাড়ি পরেছিলাম। কয়েকটা হাত পাখা নিয়েছিলাম। আর কয়েকটা থালা। কেউ মারতে এলে আমরা থালা দিয়ে আটকাবো। মশালও তৈরি করেছিলাম। কিছু কিছু দিন ওরা ভালো মুডে থাকলে দেশলাই আনতে দিত, আবার কিছু দিন একটা লাল মলাটের বইও দিতে দিত না। বাড়ির লোকেরাও শিখে গেছিল। বইয়ের মলাট বদলে দিত। ‘দুনিয়া কাঁপানো দশ দিন’-এর কভার বদলে দিয়েছিল। ‘গ্রেপ্স অফ র‍্যাথ’ নিয়ে আপত্তি করেছিল, তখন বলেছিলাম ওটা আঙ্গুরের গল্প। আবার কোনো দিন সাই বাবার বই ছাড়া কিছু দিত না। আমরা সাই বাবার বই দিয়েই জ্বালানি বানাতাম। কভারগুলো সাজিয়ে রাখতাম আর পাতাগুলো দিয়ে জ্বালানি বানাতাম। একবার জেলার এসে আমাদের সাই বাবার বই দেখে খুব উৎসাহ পেয়ে বলেছিলেন আপনাদের আরো সাই বাবার বই পাঠাবো । আমরা অন্য দিকে মুখ ফিরিয়ে বসেছিলাম।  সেই বই দিয়েই আমাদের মশাল হয়েছিল। একটা ভাটি ছিল মেয়েদের কিচেনে। আমরা সেখানে মশাল জ্বেলে সিগনাল দিতেই সবাই দুটো সেল থেকে স্লোগান দিতে দিতে বেরিয়ে এল। গেরিলা পদ্ধতিতে পুরো। মেট্রন আর তার চেলাদের আঘাত করেই আমরা দৌড়ে পালিয়ে গেছিলাম। আমরা পালাবার প্ল্যানও করেই রেখেছিলাম। ওরাও পালটা আঘাত করবে বলে লাঠি নিয়ে এসেছিল। শিখারা সব আমাদের মারতে তেড়ে আসে। আমরা আমাদের কাছে বোম আছে, গুলি আছে বলে ভয় দেখাচ্ছিলাম। আমাদের কাছে কোথায় বোম, কোথায় বন্দুক! ছিল তো কটা হাত পাখা। তাই দিয়ে একটা মাছিও মারা যেত না! কিন্তু ওরা আমাদের এতটাই ভয় পেত। এতটাই বিপজ্জনক ভাবতো আমাদের! 

(চলবে)… 

চিত্র ঋণঃ তিহার জেলে বসে নাতাশা নারওয়ালের আঁকা।
শেয়ার করুন

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *