বুলেট চলুক, পেলেট চলুক, আমরা লড়ে যাবো

লেখাটি আদি ম্যাগাজিনে নাওয়ালের একটি গদ্য থেকে অনুদিত। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ছাত্রী, নাওয়াল একজন স্বাধীন গবেষক, লেখক, চিত্রগ্রাহক। ৫ই আগস্ট পরবর্তীতে প্রায়েই কাশ্মীরি মেয়েদের অধিকারকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে ভারতের কাশ্মীর দখলকে মান্যতা দিতে। নাওয়ালের লেখাটি রাষ্ট্রের এই নির্মিত আখ্যানকে খারিজ করে। তুলে আনে কাশ্মীরি মেয়েদের কথা। তাদের দৈনন্দিন নিপীড়নের কথা, তাদের দৈনন্দিন প্রতিরোধের কথা। তাদের আজাদির স্বপ্নের কথা, তাদের আত্মনির্ধারণের আকাঙ্ক্ষার কথা। তাদের রাজনৈতিক স্বকীয়তার কথা। পিতৃতন্ত্র এবং ভারত রাষ্ট্রের দখলরাজের বিরুদ্ধে একই সঙ্গে অবস্থান নেওয়ার কথা। মূল লেখাটি এখানে পড়তে পারবেন এখানে

“এর চেয়ে কম কিছু পেয়ে আমরা পিছু হটব না। আমরা স্বাধীনতা চাই, বহু বছর ধরে চেয়ে আসছি, আর যতদিন না পাই ততদিন আমরা লড়ব।”

এই কথাগুলো আমার শ্রীনগরের অঞ্চর এলাকার একটি অল্পবয়সী মেয়ের থেকে শোনা। অঞ্চর শ্রীনগরের একটি শহরতলি, যেখানকার বাসিন্দারা (৩৭০ ধারা বিলোপের পর) কাশ্মীরে ভারত সরকারের নামানো অবরোধ চলাকালীন ইঁট, টিনের শিট, কাঠের গুঁড়ি দিয়ে ব্যারিকেড তৈরি করেছিল ভারতীয় সেনাবাহিনীকে আটকাতে। যখন কাশ্মীরের অধিকাংশ জায়গা পাঁচ লক্ষেরও বেশী ভারতীয় সেনার বন্দুকের মুখে নিস্তব্ধ, তখন অঞ্চরের মত ঘটনা বিরল।

অঞ্চরের এই প্রতিরোধের পুরোভাগে রয়েছেন অঞ্চরের নারীরা, যাঁদের স্বাধীনতার লড়াইয়ে অংশগ্রহণের ইতিহাস দীর্ঘ, কিন্তু অচর্চিত।

“আমরা আমাদের কাশ্মীরকে স্বাধীন চাই। আর কিচ্ছু না। আমরা ভারত থেকে বিচ্ছিন্ন হতে চাই। আমাদের ওপর এই অবরোধ যদি এক বছরও চলে তাও আমরা লড়ে যাব।” জনাব সাহেব মাজারের বাইরে এক আন্দোলনকারী বলছিলেন।

কাশ্মীরের প্রতিরোধের ইতিহাসে নারীদের ভূমিকা যে চর্চার দাবি রাখে সে চর্চা হয়নি; পুরুষদের অংশগ্রহণই মূলত চর্চিত হয়েছে যেখানে নারীদের ধরে নেওয়া হয়েছে মূলত দর্শকের ভূমিকায়, বা দখলদারির ক্ষেত্র হিসেবে। সেখানে নারীদের রাজনৈতিক সত্তাকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়নি। কিন্তু নতুন গবেষণালব্ধ তথ্য বলছে, কাশ্মীরি নারীরা যে শুধু বর্তমান সংকটেই রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় হয়েছেন তা নয়, তাঁরা বহু আগে থেকেই ময়দানে ছিলেন।

অঞ্চরের আশপাশের এলাকা রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের এক গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস বহন করে, ১৯৪৭-এর আগে ডোগরা শাসকদের বেগার নীতির বিরুদ্ধে আন্দোলন থেকে শুরু করে জম্মু কাশ্মীর লিবারেশন ফ্রন্টের উৎস পর্যন্ত। “আমরা এই লড়াইতে পুরুষদের পাশে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে আছি,” বহু বছরের অনুভূতিকে উচ্চারণ করলেন এলাকার এক পঞ্চাশ বছরের নারী।

বাস্তবিকই, সেপ্টেম্বর ২০১৯-এ যখন আমি অঞ্চরে গিয়ে দেখি নারীদের পথে নামতে, আমার চোখে সেটা নতুন কিছু ছিল না; সেটাকে কাশ্মীরি নারীদের রাজনীতির জমিতে নিজেদের প্রাপ্য জায়গা বুঝে নেওয়া হিসেবেই দেখেছিলাম আমি। সেপ্টেম্বর ১৩ তারিখে আমি সেই মাজারে যাই যেখান থেকে প্রতিবাদ মিছিল শুরু হয়েছিল। একটার সময় মাজার ভরে যায় শুক্রবারের নামাজ পড়তে আসা মেয়েতে। প্রার্থনা চলাকালীন কারও চোখ শুকনো ছিল না। তারপর, মাজার সংলগ্ন পার্কে জমায়েত হয়ে শুরু হয় স্লোগান, “জিস কাশ্মীর খুন সে সিঁচা, ও কাশ্মীর হামারা হ্যায়।”

“গো ইন্ডিয়া গো ব্যাক!”

কাশ্মীরে নারীদের প্রতিরোধ নানা চেহারায় দেখা যায়; কখনও তা রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে ব্যাকুল প্রতিক্রিয়া, কখনও তা মাপা কৌশল, পীড়িত নারীদের সংগঠন থেকে জাত।

১৯৩১ সালে আব্দুল কাদির খান, অত্যাচারী রাজশাসনের বিরুদ্ধে কাশ্মীরিদের রুখে দাঁড়াতে উদ্বুদ্ধ করার জন্য একটি বক্তৃতা দিয়ে ডোগরা শাসকদের হাতে গ্রেপ্তার হন (আব্দুল কাদিরের ওটিই প্রথম ও শেষ রাজনৈতিক ক্রিয়াকলাপ)। তারপর বহু গ্রেপ্তার ও হত্যা চলে। সেই সময়ে নারীরা প্রতিবাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিলেন। নিজেদের সন্তানদের সাথে তাঁরা প্রতিবাদে অংশ নেন। বহু নারী রাজার সেনার গুলিতে মারা যান। বহু নারী ও পুরুষের মৃতদেহ ঝিলাম নদীর জলে ফেলে দেওয়া হয়।

এই লড়াইয়ের অন্যতম মুখ হলেন ফজলি।  ১৯৩১ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর শ্রীনগরের মাইসুমা বাজার দিয়ে যাওয়া নারীদের মিছিলে মিলিটারির প্রকাশ্যে গুলি চালাতে তিনি নিহত হন। তৎকালীন এক জনপ্রিয় নেতা শেখ আবদুল্লাকে গ্রেপ্তার করে ভারতীয় সরকার  তাঁর জায়গায় এক ক্রীড়নককে সরকারকে বসানোর পর, যখন সেনা কোনও শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদে হস্তক্ষেপ করত বা রাজনৈতিক কর্মীদের ধরতে আসত, মাইসুমার মেয়েরা ঘরে কেরোসিন বোমা বানিয়ে ভারতীয় সেনাদের দিকে ছুঁড়তেন।

১৯৭৩ সালের নভেম্বর মাসে কাশ্মীর প্রশাসন যখন শ্রীনগরের গভর্নমেন্ট কলেজ অফ উইমেন-এর নাম বদলে কাশ্মীরি হিন্দু জহরলাল নেহেরুর নামে নেহেরু মেমোরিয়াল কলেজ রাখল, কলেজের ছাত্রছাত্রীরা প্রতিবাদে ফেটে পড়ে। ভারত কীভাবে নিজের সাংস্কৃতিক আধিপত্য তৈরি করে সে ব্যাপারে এই রাজনীতি-সচেতন ছাত্রছাত্রীরা ছিল সম্যক ওয়াকিবহাল। দুজন নারী, শরিফা কুরেশি ও নাসীমা রাফাই প্রতিবাদের নেতৃত্ব দেন ও এই নাম বদল রুখতে সফল হন।

জাহান আরা, যিনি ১৯৬০এর দশকের গভর্নমেন্ট কলেজ অফ উইমেন-এর এক সক্রিয় প্রতিবাদী ছিলেন, আমাকে বলেন, “[কাশ্মীরি] নারীদের ক্ষমতায়ন চিরকালই হয়েছিল। আমার তৃপ্ত লাগে যখন আমি মেয়েদের রাস্তায় দেখি।” নারীদের ভূমিকাকে নথিবদ্ধ করার যে উদ্যোগ তাঁর সময়ে অনুপস্থিত ছিল এখন সেই উদ্যোগগুলি নেওয়া হচ্ছে দেখে জাহান আপ্লুত।

পূর্বজ নারীদের লড়াইয়ের প্রতিধ্বনিতেই অঞ্চরের একজন প্রতিবাদী বললেন, “আমরা আমাদের সন্তানদের সাথে এগোব। যদি মরি, একসাথে মরব।”

“এমন জীবন বাঁচার কী অর্থ, বিনা স্বাধীনতায়?”

ভারতীয় সেনারা যাতে ঢুকে লোকজনের ওপর অত্যাচার না করতে পারে সে জন্য অঞ্চরের নারীরা পাথর, টিনের পাত, কাঠের লগ এনে ব্যারিকেড করেছেন । সেপ্টেম্বর ১৩ তারিখে ভারতীয় সেনারা ব্যারিকেডের বাইরে থেকে পেলেট ছুঁড়ে চারজনকে আহত করে, যাদের মধ্যে আছে একটি ১২ বছরের ছেলে।

এটা উল্লেখ করা গুরুত্বপূর্ণ যে এই প্রতিবাদ ছিল আদ্যন্ত শান্তিপূর্ণ। বেশীরভাগ সময়েই ভারত রাষ্ট্র কাশ্মীরিদের ওপর নির্বিচার জোর ব্যবহার করার সপক্ষে ‘হিংসাত্মক প্রতিবাদ’-এর অজুহাত দেয়। কিন্তু অঞ্চরে যা দেখা গেল, প্রতিবাদের পন্থা নিরপেক্ষে ভারত সরকার হিংস্র পথেই প্রত্যুত্তর দিল। আর, ‘হিংসা’ শব্দটারও মাত্রা চেনা দরকার। কাশ্মীরে রাস্তায় প্রতিবাদে ভারতীয় সেনার দিকে পাথর ছোঁড়া হয়, যে ভারতীয় সেনার রয়েছে বন্দুক, পেলেট গান, পা থেকে মাথা পর্যন্ত ঢাকা বর্ম; ক্ষমতার অসাম্য অত্যন্তই উগ্র এখানে।

ওই পেলেট ছোঁড়ার ঘটনাটাও ঘটে  প্রতিবাদ শেষ হয়ে যাবার পর যখন লোকজন এলাকার মসজিদের বাগানে বিশ্রাম নিচ্ছিল। পাঁচজন আহত হয়, যার মধ্যে একটি ১৩ বছরের ছেলে রয়েছে। “আমি রেগে গেছিলাম,” জিনাত নামের এক প্রতিবাদী বললেন। “আমি কয়েকটা পাথর, মাটি থেকে তুলে ব্যারিকেডের দিকে ছুটে গেছিলাম সেনাদের দিকে ছুঁড়ব বলে। তখন আমায় একজন বলল যে আমার ভাইকে সেনারা তুলে নিয়ে গেছে। আমার শরীর দুর্বল লাগতে শুরু করল আর হাত থেকে পাথর পড়ে গেল।”

আমি যখন জিনাতকে জিজ্ঞেস করলাম তাঁর অংশগ্রহণ নিয়ে, তিনি বললেন, “যখন আমি রাস্তায় থাকি, একটা ঘোরের মধ্যে থাকি, খোলাখুলি লড়াই করি। আমার মাথায় কেবল থাকে কাশ্মীরিরা দশকের পর দশক ধরে কী অত্যাচারের মধ্যে দিয়ে গেছে, আর সেটাই আমার যন্ত্রণাকে আগুন জোগায়। সেনারা আমাদের সাথে কী করবে সে আর আমার মাথায় থাকে না।”

“পেলেট আসুক, বুলেট আসুক, আমরা এগিয়ে যাবই।”

২০১৯ সালের সেপ্টেম্বরের ১৪ তারিখ অঞ্চরের রাবিয়া বলে একটি মেয়ে ওষুধ কিনতে বেরিয়েছিল, তখন সেনারা তাকে তুলে নিয়ে যায়। রাবিয়ার সাথে ছিল জিনাত ও এলাকার আরেকটি মেয়ে। হঠাৎ তাদের পুলিশ ঘিরে ধরে। তারা অঞ্চরের মেয়ে, যে এলাকা প্রতিবাদের অন্যতম কেন্দ্রস্থল। তাদের হেনস্থা করার জন্য সেটাই পুলিশের পক্ষে যথেষ্ট কারণ । ভয় না পেয়ে রাবিয়া বলে, “আমি তোমাদের ভয় পাই না।” একজন পুলিশ জিনাতের কব্জিতে ব্যাটন দিয়ে মারে, আরেকজন তার পায়ে মারে। জিনাত তখন পুলিশদের মধ্যে থেকে ছুটে বেরিয়ে বাড়ির দিকে দৌড়ায়। দুর্ভাগ্যবশত রাবিয়া অত জোরে দৌড়তে পারে নি; তাকে ১২ ঘণ্টা ধরে কোনও মহিলা পুলিশ ছাড়াই আটক করে রাখা হয়।

রাবিয়ার সাথে আমার পরে দেখা হয় তার বাড়িতে, একদল নারী তাকে ঘিরে রেখেছে। সে বলে, পুলিশ হেফাজতে সে পুলিশদের অনুরোধ করে তার ছোট দুধের ছেলেটিকে এনে দিতে যাতে সে ছেলেটিকে দুধ খাওয়াতে পারে। স্টেশন হাউসের অফিসার তাকে বলে, “বাচ্চাটা মরলে তো এই থানাতেই লাশ নিয়ে আসবে।”  যা করেছে তা নিয়ে সাহসী রাবিয়ার কোনও আফসোস নেই। সে আমাকে বলে, “ওরা আমাকে যতবার চায় গ্রেপ্তার করুক, ছেড়ে দিক, আবার গ্রেপ্তার করুক, আমি তবুও এই পরাধীনতার প্রতিবাদ করব যা কাশ্মীরের প্রজন্মের পর প্রজন্মকে ছারখার করছে। আমি চাই আমার সন্তানরা এক স্বাধীন কাশ্মীর দেখুক।”

রাবিয়ার মত নারীরা সেইসব আইকনিক নারীদের অংশ, যাঁরা প্রতিরোধ করতে গিয়ে মিলিটারির আক্রমণের সামনে পড়েছেন। এঁদের অন্যতম উদাহরণ নূর গুজরি। বহুবার গ্রেপ্তার হন তিনি। গবেষক শাজিয়া মালিকের ভাষায়, ১৯৪০-এর দশকে “মিলিটারি ও পুলিশকে তাঁর কটু কথায় ও ঝামেলায় ফেলে অতিষ্ঠ করে তুলেছিলেন,” নূর গুজরি। আরেকজন স্থানীয় নেত্রী,”প্রতিবাদের মা” বলে পরিচিত রাজা বেগম ভারতীয় সেনার অত্যাচারের বিরুদ্ধে ১৯৫০-এর দশক থেকে ১৯৯০-এর দশক অবধি বহু মিছিলের নেতৃত্ব দেন। একবার তাঁর গ্রেপ্তার হবার পর থানার বাইরে হাজারে হাজারে মানুষ জমায়েত হয় তাঁর মুক্তির দাবিতে।

তাঁরও পরে, পারভিনা আহানগার, কাশ্মীরে বর্তমানে অন্যতম প্রধান মানবাধিকার কর্মী। ভারতীয় সেনার গায়েব করে দেওয়া প্রায় ৮০০০ কাশ্মীরি পুরুষের খোঁজে লড়াই চালাচ্ছেন পারভিনা। ‘অ্যাসোসিয়েশন অফ পেরেন্টস অফ ডিস্যাপিয়ারড পারসন্স (এপিডিপি)’ বলে একটি সংগঠনের তিনি অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা। ১৯৯৪ সালে, তাঁর ১৭ বছরের ছেলেকে ভারতীয় সেনা তুলে নিয়ে যাবার পর তাঁর ছেলে নিখোঁজ হয়ে যায়। তখনই তিনি এই সংগঠন গড়ে তোলেন। প্রতি মাসের ১০ তারিখে এপিডিপি শ্রীনগরে নিখোঁজ হয়ে যাওয়া সন্তান, স্বামী ও পিতার ফিরে আসার দাবীতে ও লৌহকঠিন ভারতীয় নিয়ন্ত্রণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ কর্মসূচিতে সামিল হয়।

অঞ্জুম জামারুদ হাবিব আরেকজন খ্যাতনামা সমাজকর্মী ও নারীদের রাজনৈতিক সংগঠন তেহরিক-ই-খওয়াতেঁ-র প্রতিষ্ঠাতা সদস্য। হাবিব সারা কাশ্মীর থেকে নারীদের জড়ো করেছেন দখলদার ভারত রাষ্ট্রের মিথ্যা প্রচারের বিরোধিতা করার উদ্দেশ্যে। যেসব পরিবারের পুরুষরা ভারতীয় বাহিনী তুলে নিয়ে যাওয়ার পর নিখোঁজ হয়ে গেছে সেসব পরিবারের সাথে যোগাযোগ করে তাদের কাহিনী নথিবদ্ধ করত এই সংগঠন। ২০০৩ সালে, “সন্ত্রাসবাদী সংগঠনগুলিকে অর্থসাহায্য করার” অভিযোগে হাবিবকে গ্রেপ্তার করে ভারত সরকার। সর্বৈব মিথ্যা অভিযোগ, কিন্তু হাবিবকে ৫ বছর তিহার জেলে বন্দী থাকতে হয়।

হাবিবের সংগ্রহের নথিগুলিও আর নেই। “আমার একটা ফাইল ছিল যাতে সংবাদপত্রের অংশ রাখা ছিল, কিন্তু আমি যখন গ্রেপ্তার হই, তখন ওরা আমার অফিস তছনছ করে, সব কাগজপত্র নষ্ট করে দেয়।” তিনি বলেন।

হাবিব ভারতীয় জেলে বন্দী কাশ্মীরিদের পরিবারগুলিকে কিছু অর্থসাহায্য করে থাকেন। তিনি ‘অ্যাসোসিয়েশন অফ ফ্যামিলিজ অফ কাশ্মীরি প্রিজনারস’ বলে একটি সংগঠন খোলার চেষ্টা করেছিলেন, যাতে বন্দীদের স্বার্থে সংগঠিতভাবে আইনি ব্যবস্থা কিছু করা যায়। তিনি বলেন, “এই পরাধীনতার বিরুদ্ধে লড়াই করা আমাদের যৌথ দায়িত্ব, যার একটা বিশাল অংশ কাশ্মীরি নারীরা। আমাদের ক্ষমতা ও শক্তি দুইই আছে প্রচলিত ভাষ্যকে বদলানো ও অবস্থা পরিবর্তন করার।”

আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার অর্জান করার ও ভারত থেকে স্বাধীন হওয়ার অন্যান্য সব নিরস্ত্র প্রচেষ্টা ব্যর্থ হবার পর, ১৯৯০ থেকেই কাশ্মীরিরা সশস্ত্র সংগঠনে যোগ দিতে শুরু করে। শিগগিরই, মিলিটারিকে অসীম ক্ষমতা দিয়ে  এলাকাকে নিয়ন্ত্রণে আনার উদ্দেশ্যে ভারত  ‘আর্মড ফোর্সেস স্পেশাল পাওয়ারস অ্যাক্ট’ আইন লাগু করে । সেনার হিংস্রতা বৃদ্ধি আর নিহত কাশ্মীরি সাধারণ মানুষ ও সংগ্রামীদের সংখ্যা বাড়তে থাকার সাথে সাথে আরও বেশি সংখ্যক কাশ্মীরির সশস্ত্র সংগ্রামে যোগ দেয়, এবং হিংসা ও রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের এক বৃত্ত তৈরি হয়। এই সময়ে বহু নারী ‘ওভারগ্রাউন্ড কর্মী’র ভূমিকা নেন। তাঁরা সশস্ত্র সংগ্রামীদের লুকিয়ে থাকার জায়গাগুলির দেখভাল করতেন, অস্ত্রশস্ত্র আনা-নেওয়ার কাজ করতেন এবং সম্ভাব্য সরকারী চরদের সম্পর্কে খবরাখবর এনে দিতেন। তাঁরা যখন সেনার হাতে ধরা পড়তেন তাঁদের ওপর কোনও দয়ামায়া দেখানো হত না।  বীভৎসভাবে মারধর করা হত, ধর্ষণ করা হত কখনও বা খুনই করা হত।

“দ্বন্দ্ব নারীদের ক্ষমতায়িত করতে পারে আবার ক্ষমতাচ্যুতও করতে পারে, কারণ নারীদের কাজকর্মে অংশগ্রহণ করতে দিয়েও মতাদর্শের ভাগীদার নাই করা যেতে পারে,” গবেষক হালে আফশারের পর্যবেক্ষণ।

সংঘর্ষের এলাকায় যুদ্ধক্ষেত্র আর গার্হস্থ্য জীবনের মধ্যে ফারাক করার ফলে নারীদের অংশগ্রহণ চোখের আড়ালে চলে যায়। কিন্তু কাশ্মীরে এই ফারাক ক্রমশই মিলিয়ে যাচ্ছে। রাষ্ট্রীয় হিংসা রাস্তা থেকে ঘরে ঢুকে পড়ায় সংঘর্ষের ক্ষেত্রও আরও কাছে চলে এসেছে।

কাশ্মীরি নারীরা ভারতীয় সরকারের স্বেচ্ছাচার আর মিলিটারির অনুপ্রবেশের অত্যাচার বহুদিন ধরে দেখেছেন। তাঁরা তাঁদের ছেলেদের আর ভাইদের সংঘর্ষে মরতে দেখেছেন; বোনদের খুন হতে দেখেছেন দখলদারদের হাতে; শিকার হতে দেখেছেন দখলদারদের যৌনহিংসার। এই অত্যাচারের স্মৃতি তাঁদের নানা প্রতিরোধের পথে ঠেলে দিয়েছে, তা প্রতিক্রিয়াজাত মিছিল হোক, কাঠামোগত আন্দোলন হোক, বা হোক দায় ও ন্যায়ের জন্য দীর্ঘমেয়াদী রাজনৈতিক লড়াইয়ের পথ।

স্বাধীনতার খোঁজে, এবং নির্যাতন ও জমে থাকা রাগের তাড়নায় তাঁরা যোগ দিয়েছেন সমস্ত রকম লড়াইয়ের ময়দানে।

ছবি- দানিশ সিদ্দিকি, রয়টার্স।

শেয়ার করুন

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *