খরগোশ, ইঁদুর আর ব্যাঙের ছাতার জাদুকর

কে ছিলেন বিট্রিক্স পটার? 

মৌমাছি এবং অন্যান্য পোকামাকড়, ১৮৯৫
‘ফ্লাই এগারিক’ ছত্রাক, ১৮৯০

ব্রিটিশ শিশু সাহিত্যিক এবং চিত্রকর হেলেন বিট্রিক্স পটার কেনসিংটন, লন্ডন-এ একটি সমৃদ্ধ পরিবারে বেড়ে ওঠেন। তিনি ছোটবেলা থেকেই প্রাকৃতিক দুনিয়ার রূপে মুগ্ধ ছিলেন। তাঁর ছোট ভাই বার্ট্রামের সাথে তিনি নার্সারিতে বিভিন্ন পশুদের রেখেছিলেন – বিভিন্ন সময়ে তাঁরা খরগোশ, ইঁদুর, টিকটিকি, বাদুড়, ব্যাঙ এমন কি সাপও সেখানে রাখতেন। তাঁদের পোষা প্রাণীর আচরণ লক্ষ্য করে বাড়িতে তৈরি স্কেচবুকে তাদের অনেক স্কেচ করতেন। বার্ট্রামকে বোর্ডিং স্কুলে পাঠানোর সময়, বিট্রিক্সকে বাড়িতেই রাখা হয় যেখানে তিনি গৃহশিক্ষকের কাছেই শিক্ষা লাভ করেন। তাঁর ভাই এবং তাঁর বয়সের অন্যান্য বাচ্চাদের থেকে বিচ্ছিন্ন থাকার কারণে তিনি প্রাকৃতিক জগতেই সান্ত্বনা এবং অনুপ্রেরণা খুঁজে পেয়েছিলেন। গ্রীষ্মের ছুটিতে বিট্রিক্স এবং বার্ট্রাম-এর তিন মাসের জন্য দেখা হতো, এবং তাঁরা দুজনে ইংল্যান্ডের গ্রামাঞ্চলে – বিশেষ করে লেক ডিস্ট্রিক্টে ভ্রমণের সময় সেখানকার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য এবং পশুপাখিদের থেকে অনুপ্রেরণা নিয়ে স্কেচ প্র্যাক্টিসে করতেন। পরবর্তীকালে ছোটবেলার স্মৃতি দিয়ে বিট্রিক্স নানান গল্প লিখেছিলেন যাতে প্রাণীজগত এবং ইংরেজ গ্রামাঞ্চল উভয়ের প্রতিই তাঁর অফুরন্ত ভালবাসার পরিচয় মেলে। 

হুঙ্কা মুঙ্কা আর তার ছানা, ১৯০৪
সিন্ডেরেলা, ১৮৯০

তাঁর কিশোর বয়সে, পটার লন্ডনের আর্ট গ্যালারির নিয়মিত দর্শক ছিলেন, বিশেষ করে লন্ডনের রয়্যাল অ্যাকাডেমিতে গ্রীষ্ম এবং শীতকালীন প্রদর্শনী নিয়মিত উপভোগ করতেন। বিট্রিক্স প্রথাগতভাবে শিল্প শিক্ষা পাননি, বরং বিভিন্ন শিল্পীর কাজ অধ্যয়নের মাধ্যমেই তাঁর শিল্পী সত্তার বিকাশ ঘটে। পরবর্তীকালে বিট্রিক্স এও বলেন যে যদি তিনি প্রাতিষ্ঠানিকভাবে শিক্ষিত হতেন তবে “তাঁর নিজস্ব মৌলিকতা মুছে যেত।” ১৪ বছর বয়েস থেকে বিট্রিক্স তাঁর ডায়েরিতে নানান ভাবনাচিন্তা, মজার মজার কল্পনা লিখে রাখতেন। সেগুলি লেখার জন্য ব্যবহার করতেন রহস্যময় ভাষার এক ‘সিক্রেট কোড’। তিনি ছোটবেলায় রূপকথার বই পড়তে খুব ভালোবাসতেন আর সেখান থেকে তার মনে সৃষ্টি হতো হরেকরকমের কাল্পনিক চরিত্র যেগুলোকে তিনি তাঁর আঁকায় রূপ দিতেন। তাঁর কিছু প্রিয় গল্পের চিত্রাঙ্কণের মধ্য দিয়েই চিত্র-শিল্পী হিসেবে বিট্রিক্সের যাত্রা শুরু। তিনি অ্যালিস ইন ওয়ান্ডারল্যান্ড এবং সিন্ডেরেলা-র নিজস্ব সংস্করণগুলি চিত্রিত করেছিলেন। অথচ এইসমস্ত আঁকাতেও পশুপাখিদের দুনিয়ার সাথে বিট্রিক্সের আত্মিক সম্পর্ক স্পষ্ট। তাঁর আঁকা রূপকথার এই দুনিয়ায় সিন্ডেরেলার জুড়িগাড়ি বয়ে নিয়ে যাচ্ছে খরগোশেরা! অল্প বয়সে বিট্রিক্স তাঁর প্রাক্তন গভর্নেস অ্যানি মুরের বাচ্চাদের জন্যও নানান রসিকতা ভরা ছবি আর গল্প চিঠিতে লিখে পাঠাতেন। 

সচিত্র চিঠি, ২৫শে সেপ্টেম্বর ১৯০১
বেঞ্জামিন বানি, ১৯০৪

যখন অ্যানির সন্তান নোয়েল ১৮৯৩ সালে স্কারলেট ফিভারে আক্রান্ত হয় তখন বিট্রিক্স তাকে একটি চিঠি পাঠান, যেখানে ‘পিটার’ নামে এক দুষ্টু খরগোশের অভিযানের গল্প লেখেন। পরবর্তীতে বিট্রিক্স এই গল্পটিকেই ছবি-সহ একটি বইয়ে পরিণত করেন যার নাম দেন দ্য টেল অফ পিটার র‍্যাবিট। এর আগে প্রকাশিত বেঞ্জামিন বানির গল্প থেকেও পিটার র‍্যাবিটের চরিত্রায়ণ করেন তিনি। কালো-সাদা চিত্র সহ তাঁর এই বইটি যখন ছয়জন প্রকাশক প্রত্যাখ্যান করে, তখন তিনি এটি নিজেই ব্যক্তিগতভাবে ছাপানোর সিদ্ধান্ত নেন। পিটার খরগোশের চরিত্রটি তৈরী করা নিয়ে বিট্রিক্স জানিয়েছেন যে, সেটি তাঁর অতিপ্রিয়, আদরের এক খরগোশ-এর স্মৃতির উদ্দ্যেশে তৈরি, যে মারা যায়। বিট্রিক্স চেয়েছিলেন এই বইটি বাচ্চাদের সুবিধের জন্য আকারে ছোট, এবং নামমাত্র মূল্যের হোক। তিনি প্রতিটি পৃষ্ঠাতেই একটি কালো-সাদা ছবি সহ লেখা রাখেন, যাতে সব থেকে ছোট বাচ্চাটিরও দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারেন। ১৯০১ সালে প্রকাশের সাথে সাথেই বইটির ২৫০ কপি বিক্রি হয়ে যায়, এবং ১৯০২ সালের ফেব্রুয়ারিতে আরও ২০০ কপি ছাপাতে হয়। বিট্রিক্সের বইয়ের সাফল্যে ‘ফ্রেডরিক ওয়ার্ন অ্যান্ড কোম্পানি’ নামে প্রকাশনা দ্য টেল অফ পিটার র‍্যাবিট-এর একটি রঙিন স্বচিত্র বাণিজ্যিক সংস্করণ প্রকাশ করে। মাত্র এক বছরের মধ্যে সেই বইয়ের ৫০,০০০ কপি বিক্রি হয়, এবং সেই সময় থেকে আজ অব্দি এই বইটির প্রকাশনা কখনো বন্ধ হয়নি। 

দ্য টেল অফ পিটার র‍্যাবিট, ১৯০২

বিট্রিক্স পটারের ছবি

বিট্রিক্স পটারের জলরং আর চিত্রায়ণগুলির প্রধান আকর্ষণ হলো তার নিপুণ রেখার ব্যবহার। সূক্ষ্ম এবং পরিপাটি, অথচ কোমল আন্তরিকতায় ভরা তাঁর প্রত্যেকটি ছবি অনন্য নিজস্বতায় খুদে সব পাঠকদের তো বটেই এমনকি বড়দের মনও জয় করে নেয়। তাঁর জার্নালে তিনি লিখেছিলেন: “আমি আবিষ্কার করতে পারি না: আমি কেবল অনুলিপি করি”। তাঁর ছবির আবেদন কিছুটা কল্পনা কিছুটা বাস্তবের মিশ্রণে তৈরি। চারপাশের অতিসাধারণ জিনিসকেও কল্পনার রূপ এবং তুলির দক্ষতা দিয়ে বিট্রিক্স সৃষ্টি করতেন অসাধারণ কিছু দৃশ্য এবং আনন্দের অনুভূতি। তার আঁকার ধরণ লক্ষ্য করলে বোঝা যায় যে তিনি শুধুই দেখতেন না, উপলব্ধিও করতেন। স্বচ্ছ জল রঙের রেখার টানে টানে গানের সুর, সাদা পাতার শূন্যস্থান এর পাশাপাশি কিছু কালো কালির টান, কিছু রঙিন নকশা – এই সমস্ত দিয়ে গড়া তাঁর প্রতিটি ছবি।

লিটল পিগ রবিনসনের স্কেচ, ১৯৩০
লিটল পিগ রবিনসনের স্কেচ, ১৯৩০

বিট্রিক্স তাঁর দেখা গ্রামাঞ্চলের অনন্য সৌন্দর্য, তাঁর প্রাণবন্ত উপকূল শহর, ছোট্ট শান্ত কুঁড়ে, সুদূর মাঠের মেটে ছোপ তাঁর তুলির দক্ষতা এবং রঙের সাহসী ব্যবহারের মাধ্যমে জীবন্ত করে তুলতেন। পশ্চিম দেশের প্রাকৃতিক রঙের বাহার তুলে ধরতে কেবল চমৎকার জলরঙের ছবির সিরিজেই নয়, তাঁর লেখা বিবরণেও রঙের ব্যবহার করেছেন – গাঢ় নীল সমুদ্র, হলুদ ক্যাটকিনস, সবুজ মাঠ, লাল জমি, কমলা বাষ্প ইত্যাদি। বইয়ের চিত্রের জন্য পটভূমি স্কেচ করার সময় তিনি প্রায়ই গল্পের প্রাণী-চরিত্রের পরিপ্রেক্ষিত থেকে স্কেচ করার চেষ্টা করতেন, যেন চরিত্রগুলির চোখ দিয়েই পাঠক গল্পের স্রোতে এগিয়ে চলেছে। 

দ্য টেল অব বেঞ্জামিন বানি-র স্কেচ, ১৯০৪
দ্য টেল অব বেঞ্জামিন বানি-র স্কেচ, ১৯০৪

সারা জীবন বিট্রিক্স তাঁর দৈনন্দিন ঘটনা থেকে জাগতিক চিত্র তৈরি করেছেন। তাঁর সৃজনশীলতা আর কল্পনার মাধ্যমে প্রকৃতিকে নিজের আঁকার খাতায় নিখুঁত রূপে তুলে ধরেছেন। তাঁর কাজের পদ্ধতিতে একপ্রকার শিশুসুলভ মনের পরিচয় পাই, যে শিশুমন পৃথিবীকে দুচোখ ভরে দেখতে জানে, শিখতে জানে। প্রকৃতিই তাঁর প্রধান শিক্ষিকা, আর বিট্রিক্স যেন সেই পাঠের একনিষ্ঠ ছাত্রী। তৎকালীন সমাজের মেয়েদের যেখানে কোনোরকম সামাজিক প্রতিষ্ঠা পাওয়া প্রায় অসম্ভব ছিল, সেখানে বিট্রিক্স তাঁর অধ্যবসায় এবং শিল্পচর্চার দক্ষতার মাধ্যমে নিজেকে এক জ্বলজ্বলে অনুপ্রেরণায় পরিণত করতে পেরেছিলেন। 

বিট্রিক্স পটার, স্নেহা বিশ্বাস

[চিত্রঋণঃ ভিক্টোরিয়া অ্যান্ড অ্যালবার্ট মিউজিয়াম, প্রোজেক্ট গুটেনবার্গ, মর্গ্যান লাইব্রেরি]

শেয়ার করুন

Leave a Comment

Your email address will not be published.