কমিউনিস্ট যোদ্ধা বেলা (প্রথম কিস্তি)

আলোচনার বৃত্তের বাইরে থাকা এক কমিউনিস্ট নারী যোদ্ধা – সময়ের মধ্য দিয়ে সময়কে অতিক্রম করে যাওয়া বেলা… 

উত্তাল চল্লিশ দেশব্যাপী ফ্যাসিবাদ সাম্রাজ্যবাদ সামন্তবাদ পিতৃতান্ত্রিকতা বিরোধি গণ অভ্যুত্থান – সাম্রাজ্যবাদের সাথে গাঁটছড়া বেঁধে জোতদার জমিদার মহাজন দেশীয় দালাল পুঁজিপতিদের ষড়যন্ত্রে লাগাম ছাড়া লুট, আকাল দুর্ভিক্ষ, দেশভাগ “স্বাধীনতা”, ধর্মের নামে মানুষে মানুষে জীবন ধ্বংসকারী আঘাত, সামাজিক একতায় ফাটল ধরানোর অপচেষ্টা – এই আক্রমণের বিরুদ্ধে শ্রমিক শ্রেনির নেতৃত্বে খেটে খাওয়া মানুষ, নারী ভুমিহীন গরীব কৃষকের চলমান সশস্ত্র কৃষক যুদ্ধ – বেলা শুধু প্রত্যক্ষ করেননি, নিজের সবটুকু দিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছেন। ভূমিহীন গরীব কৃষক মেয়েদের দারিদ্র, বঞ্চনা থেকে মুক্তির জন্য জড়ো করার প্রচেষ্টায় গড়ে তুলেছেন মহিলা সমিতি 

আইএ পাশের পর গ্রামে ফিরে এসে প্রাথমিক স্কুলের শিক্ষিকার কাজের সাথে সাথে কমিউনিস্ট পার্টির তত্ত্বাবধানে গ্রাম সেবিকার কাজে যুক্ত হন কোলকাতার বিদ্যাসাগর কলেজে বিএ পড়তে এসে সদস্য হলেন কমিউনিস্ট পার্টির ছাত্র সংগঠন ছাত্র ফেডারেশনের ইংরাজি দৈনিক অমৃতবাজারের শ্রমিকদের ধর্মঘটের সমর্থনে কর্মচারীদের সাথে পিকেটিং-এ যোগ দেন। সেখানেই পুলিশের সাথে সংঘর্ষে বেলা গ্রেপ্তার হন পরে কমিউনিস্ট সদস্য হিসেবে মহিলা আত্মরক্ষা সমিতির লড়াইয়ে সামিল হন 

সাম্রাজ্যবাদী সেনাবাহিনী মেয়েদের অপহরণ করছে, মেয়েদের উপর যৌন নির্যাতন চালাচ্ছে, যৌন পল্লীতে মেয়েদের সংখ্যা দ্বিগুণ বেড়েছে একচেটিয়া বৃহৎ সাম্রাজ্যবাদী মহাজনী পুঁজি জোতদার জমিদার আর দেশীয় দালাল পুঁজিপতিদের সাথে গাঁটছড়া বেঁধে অপরিসীম লুঠ চালাচ্ছে মজুতদারী কালোবাজারীর করাল গ্রাসে বাংলা এই দুর্ভিক্ষে বাংলার মানুষ, মূলত কৃষক, মারা যান বহু সংখ্যায় দুর্ভিক্ষ অনাহার মহামারীর মতো ছড়িয়ে পড়ে। এরকম কঠিন সময় মোকাবিলার জন্য ৪২-এর গোড়ায় বাণী মিত্রকে সভানেত্রী করে রেণু চক্রবর্তী, মণিকুন্তলা সেনের নেতৃত্বে গড়ে উঠল মহিলা আত্মরক্ষা সমিতি কোলকাতায় ইলা, বেলার মতো মেয়েরা যেমন সমিতির সাথে কাজে নেমেছিলেন, সুদূর উত্তর বঙ্গের লীলা, কল্যাণীর মতো মেয়েরাও কাজে যোগ দিয়েছিলেন ছোটখাটো তাঁত চালানো, মুষ্টি ভিক্ষা তোলা, সদস্য সংগ্রহ করা, যুদ্ধবিরোধী দাঙ্গা বিরোধী প্রচার সংগঠিত করা, পাঠচক্র চালানো, দুর্ভিক্ষগ্রস্ত জনসমষ্টির জন্য ত্রাণের ব্যবস্থা করা ওই সময়ে ৪৩-এ কোলকাতায় ভয়ংকর মূল্যবৃদ্ধির বিরুদ্ধে ৫০০০ মেয়েকে নিয়ে সমিতি বেঙ্গল আইন সভার উদ্দেশ্যে পদযাত্রা করে এই আন্দোলনের কারণে সাথে সাথে কয়েক লরি বোঝাই চাল এনে দেওয়ার ব্যবস্থা করতে বাধ্য হয় সরকার ৪২-৪৩ এ মহিলা আত্মরক্ষা সমিতির সদস্য ছিল ৪৩ হাজার সমিতি যেমন ফ্যাসিবাদী যুদ্ধের বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তোলার কাজ করেছে তেমনই সাম্রাজ্যবাদের কবল থেকে দেশকে মুক্ত করার কাজের সাথে সাথে সামন্ত শোষণ মুক্তির জন্য সশস্ত্র কৃষক যুদ্ধে কাঁধে কাঁধ দিয়ে দাঁড়িয়েছে ধর্মীয় সংঘাতের সাম্রাজ্যবাদী ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে সুদৃঢ় ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন এগিয়ে নিয়ে গিয়েছে 

পরবর্তীকালে, পরিবারের আর্থিক সংকট, বাবার চিকিৎসার প্রয়োজন,  ১৭০ টাকা বেতনে বেলাকে চাকরি করতে হয় ক্যালকাটা টেলিফোনসে রাত ডিউটি দিয়ে কলেজ সংগঠনের কাজ সমান তালে চলে বাবার নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও মায়ের সহযোগিতায় খুলনায় অনুষ্ঠিত প্রাদেশিক কৃষক সভার সম্মেলনে অংশ নেন তিনি কমিউনিস্ট যোদ্ধা হিসেবে পার্টির একজন হয়ে ওঠেন ২০২৩ এ ৩০শে সেপ্টেম্বর বেলার একশো বছর হবে ২৯শে সেপ্টেম্বর ২০১৭ বেলার নশ্বর শরীরটা তাঁর ইচ্ছায় চিকিৎসা বিজ্ঞানের জন্য পিজি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের হাতে তুলে দেওয়া হয় 

মেয়েরা এগিয়ে থাকে

আগস্ট বেবেল বলেছিলেন, “মানবজাতির মধ্যে নারীরাই সর্ব প্রথম দাসত্ব শৃঙ্খল পরেছে, নারীর দাসত্ব শুরু হয়েছে ইতিহাসে দাসপ্রথারও আগে” “নারী নরকের দ্বার”, “নারী … রাস্তা”, “নারী পুরুষকে চঞ্চল করে” – সামাজিক স্তরে ধর্মের এই নারী বিদ্বেষ নারীকে পিছনে ঠেলে দেয়, দাসত্বের জীবনে বাধ্য করে নারীর প্রতি হিংসা চিরস্থায়ী করে মানবী পত্রিকার এক সাক্ষাৎকারে বেলা বলেছেন – “তেলেঙ্গানা তেভাগা আন্দোলনে মেয়েরা অগ্রণী ছিলেন লেনিন বলেছিলেন – ‘মেয়েরা দুভাবে অত্যাচারিত হয় সামাজিক ভাবে ও রাজনৈতিক ভাবে অর্থনৈতিক ভাবেও মেয়েরা শোষিত হয় সেই জন্য তারা বিপ্লবী হয় পুরুষের থেকে অনেক বেশি এখনকার মেয়েরাও অগ্রণী, সেই তেভাগার মতো ঝাঁটা-লাঠি-বঁটি-দা-কাস্তে নিয়ে লড়াই করেছে আমার মনে হয় তফাৎ হচ্ছে তখনকার মেয়েরা রাজনৈতিক চেতনা সম্পন্ন হয়ে সশস্ত্র বিপ্লবের মাধ্যমে, ক্ষমতা দখলের লড়াই করেছে এখন মেয়েদের স্বতস্ফুর্ত আন্দোলনকে আমাদের গুছিয়ে সংগঠিত রূপ দিতে হবে” বেলা সব সময়ে বলতেন, “এই কারণে মেয়েরা শোষণ মুক্তির লড়াইয়ে, স্বাধীনতা লড়াইয়ে সমাজ বিপ্লবের গুরুত্বপূর্ণ বাঁকে সব সময়ে এগিয়ে থেকেছে, এগিয়ে থাকে”

মেয়েরা ব্রাত্য হয়ে যায়  

ফরাসী বিপ্লবে অগণিত সাধারণ গরীব খেটে খাওয়া, রুটি জোগাড় করতে না পারা মেয়েরাই অগ্রণী ভুমিকা নিয়েছে, রাজাকে ভার্সাই থেকে ধরে আনতে গিয়েছে বিপ্লবের শুরুতে ১৯৮৯-এ দান্তে ও কামিল দেমুল্যা যখন প্যারি বাসীকে আহ্বান জানান রাজাকে ধরে আনার জন্য সেই ডাকে সাড়া দিয়ে বাজারে কর্মরত ও শহরতলির গরীব মেয়েরা এসে নগরপালের কাছে অস্ত্র দাবি করেন গরীব বস্তি থেকে মেয়েরাই সব চেয়ে বেশি এসেছিলেন মেয়েদের সেই ভুখা মিছিল ভার্সাইয়ে যাওয়ার পথে স্লোগান তুলেছে, “রুটিওয়ালা আর তার ছোট্ট রুটিওয়ালাকে আমরা প্যারিতে ধরে নিয়ে যেতে এসেছি” ফরাসি বিপ্লবে বিশেষত খেটে খাওয়া মেয়েরা এবং কৃষকরা ঐতিহাসিক ভূমিকা রাখলেও মেয়েদের, কৃষকদের রাজনৈতিক অধিকারের স্বীকৃতি দেওয়া হলোনা, ভোটাধিকার মিলল না বরঞ্চ ১৭৯৫ থেকে পাঁচজনের বেশি মেয়েদের প্রকাশ্য জায়গায় জড়ো হওয়া আইন করে নিষিদ্ধ করে দেওয়া হলো আসলে শাসকরা মেয়েদের, কৃষকের, শ্রমজীবী মানুষের শক্তিকে বিপ্লবে প্রত্যক্ষ করেছে তাই তারা ভয় পায় তাই হয়তো সমস্ত রকম রাজনৈতিক জমায়েত বিশেষত মেয়েদের অংশগ্রহণ নিষিদ্ধ করে দেওয়ার নিদান দেন বিপ্লবের পালনীয় উৎসবগুলোতে বিশেষ ভাবে সংরক্ষিত স্থানে দর্শকের ভূমিকা দেওয়া হয় তাতে অবশ্য মেয়েদের খুব কিছু যায় আসেনি তাই ১৮৭১-এ প্যারি কমিউনের অন্যতম নেত্রী লুইসি মিশেল নিশ্চিত মৃত্যুর সামনে দাঁড়িয়ে কমিউনের আদর্শ থেকে একচুলও বিচ্যুত না হয়ে লিখলেন, “মেয়েদের মুক্তি ও স্বাচ্ছন্দ্য আসতে পারে একমাত্র বিপ্লবের মধ্য দিয়ে সমাতন ধারণা মূল্যবোধকে দু পায়ে মাড়িয়ে বুদ্ধিমতী মেয়েকে একদিন না একদিন বিপ্লবে সামিল হতে হবে” এভাবে লড়াইয়ে সামনের সারিতে থাকলেও বৃত্তের বাইরে ঠেলে দেওয়া নীরবতার আড়ালে বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া প্রশ্ন করার জন্য ব্রাত্য করে দেওয়ার অসংখ্য নজির ইতিহাস থেকে বর্তমানেও হাজির

উত্তাল চল্লিশে সশস্ত্র কৃষক যুদ্ধে তেভাগার লড়াই যখন উচ্চতর রূপ নিচ্ছে তদানিন্তন কমিউনিস্ট পার্টি তখন সশস্ত্র কৃষক যুদ্ধ তুলে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় বিশেষ করে যেখানে উত্তরবঙ্গ দক্ষিণ বঙ্গ হাওড়া হুগলী ভূমিহীন কৃষকের (বিশেষত মেয়েরা) কাঁধে কাঁধ দিয়ে সশস্ত্র কৃষক যুদ্ধ এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছিল, মুক্তাঞ্চল গড়ে উঠছিল, যেখানে সামন্ত শোষণের ভিত ধসে পড়ছিল, তখন পার্টির নির্দেশে নারী যোদ্ধাদের ঘরে ফিরে যেতে হয় সমস্যার কথা জানতে চাওয়ায় ব্রাত্য হন অনেকে 

পোস্টকার্ডে লেখা আমন্ত্রণ  পত্র – তারিখ ৮.১১.৯৬ পত্র প্রেরক জয়কেশ মুখার্জী তখন সিপিআই(এম)-এর প্রাক্তন বিধায়ক হাওড়া জেলার তেভাগা আন্দোলনের অন্যতম নেতা ছিলেন তিনি লিখছেন – “বেলা তোমাকে পদ্মা বলেই লিখলুম ডোমজুড়ে যারা তোমায় পদ্মা বলে জানতো তাই পদ্মা বলেই লিখলুম তেভাগা আন্দোলনের ৫০ বছর পূর্তি উৎসব পালন করা হচ্ছে তুমি ডোমজুড় এলাকায় তেভাগা আন্দোলনের একজন শরিক ছিলে তাই তোমাকে অনেকের মনে পড়ছে আমি গণশক্তিতে ‘কেউ ভালো, কেউ ভালো না’ বলে একটা লিখেছি তাতে ২৭ অক্টোবরের যে লেখাটা আছে তোমার নামে কিছু লেখা হয়েছে দেখলে তোমার সব মনে পড়বে” তেভাগার ৫০ বছর পুর্ত উৎসবে সশস্ত্র কৃষক যুদ্ধের কমিউনিস্ট যোদ্ধা বেলাকে দর্শক হিসেবে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে আসলে বেলারা ব্রাত্যই হয়ে যায় 

আমরা দেখেছি সিঙ্গুর, নন্দীগ্রাম, লালগড়ে যে মেয়েরা গুলি খেয়েছে, সমস্ত ঝুঁকি নিয়ে লড়াইয়ের সামনের সারিতে দাঁড়িয়ে শহীদের মৃত্যুবরণ করে সাম্রাজ্যবাদী একচেটিয়া বৃহৎ মহাজনীর আক্রমণ রুখে দিয়েছে – তাঁরা সিঙ্গুর, নন্দীগ্রাম দিবসেও ব্রাত্য থেকে গেছে গ্রামের সেইসব মেয়েদের বিরুদ্ধে সিবিআই মামলা রুজু করেছে এই অভিযোগে যে মূলত মেয়েরাই নন্দীগ্রামে ১৪ই মার্চের সংঘর্ষের জন্য দায়ী নন্দীগ্রামে ধর্ষকরা গ্রামে সসম্মানে ফিরে এসেছে আর রাধারানী আড়ির মতো মেয়েদের প্রতারক বলে দেগে দেওয়া হয়েছে ন্যায় বিচার পাওয়ার কথা আর উঠবে কিভাবে! লালগড়ের লড়াকু মেয়েদের মর্যাদা দেওয়া দূরে থাক তাঁদের ধর্ষণের অভিযোগে কর্ণপাত না করে আধা সামরিক বাহিনীকে আক্রমণ করেছে এই অজুহাতে জেল খাটানো হয়েছে, অত্যাচার করা হয়েছে এ ভাবেই সমাজ বিপ্লবে আগুয়ান মেয়েরা ব্রাত্য হয়েছে আলোচনার বৃত্তের বাইরে ঠেলে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে

 

বেলার ছোট্ট চিরকুট—

২০০২ সাল। পশ্চিম মেদিনীপুর, বাঁকুড়া,  পুরুলিয়া, কলকাতা সহ বিভিন্ন জেল রাজবৈতিক বন্দীতে উপচে পড়ছে, যাঁদের অধিকাংশই জনজাতি, দপ্লিত, মুসলিম,  যাঁরা মূলত গরীব, ভূমিহীন কৃষক নারী-পুরুষ। এই পর্যায়ে কলকাতার বিভিন্ন বুদ্ধিজীবী ছাত্রছাত্রী সংগঠন, গণতান্ত্রিক সংগঠন, নারী সংগঠনের যৌথ উদ্যোগে তৈরি হল বন্দিমুক্তি কমিটি। গণ স্বাক্ষরের জন্য লেখা হল আবেদন পত্র। বেলার ঘরের পাশে থাকেন রানি, দারিদ্র‍্যের সঙ্গে যুঝতে যুঝতেও যিনি মেয়েদের লড়াইয়ে সামনের সারিতে থেকেছেন। আশির দশকে মথুরা ধর্ষণের বিচারের ক্ষেত্রে সুপ্রিম কোর্টের মেয়েদের অধিকার হরণকারী অমর্যাদাকর বিদ্বেষপূর্ণ রায়ের বিরুদ্ধে দেশব্যাপী আন্দোলনের শরিক হয়ে প্রাথমিক ভাবে দক্ষিণ কলকাতার মেয়েদের লড়াইয়ের পথে হাঁটা শুরু হয়েছিল। রানি আজ উপস্থিত না থাকলেও সেই লড়াইয়ে ছিল প্রথম সারিতে। রানি বন্দীমুক্তির আবেদনপত্রটি নিয়ে গেলেন বেলার কাছে স্বাক্ষর করানোর জন্য। এই পরিপ্রেক্ষিতে বেলার পাঠানো ছোট্ট চিরকুট। লিখেছিলেন — ‘তুমি যেটা পাঠিয়েছ সেটা মনে হয় “বন্দীমুক্তি কমিটির” আহ্বান’, এতেতো কোনো কিছু প্রতিষ্ঠানের নাম লেখা নেই। যাই হোক, এটাতে তো আমি আগেই সই করেছি। একটি মেয়ে আর একটি ছেলে এসে সই করিয়ে নিয়ে গেছে। তাই এটাতে আর সই করলাম না৷ তোমাদের সব খবরই পাচ্ছি৷ ৫/৭ দিনের মধ্যে চোখ অপারেশন হবে। এমনিতে ভালোই আছি। স্নেহ-ভালোবাসা জেনো। — মাসিমা (বেলা)।’ কিছুদিন পর দেখা হতে রাজনৈতিক বন্দীমুক্তি আন্দোলন কীভাবে চলছে তার খোঁজ-খবর জানলেন। তারপর ইতিহাসের পাতাটা মেলে ধরলেন 

—  

 

‘৪৮-৪৯ সালে তেভাগার সশস্ত্র কৃষক যুদ্ধের দ্বিতীয় পর্যায় উচ্চ মাত্রায় উন্নীত হল। কমিউনিস্ট পার্টিকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করার পর জেল উপচে পড়ল রাজনৈতিক বন্দীতে। রাজনৈতিক বন্দীমুক্তির দাবিতে কলকাতায় মেয়েদের এক বিরাট মিছিল সংঘটিত হল ১৯৪৯ সালের ২৭ শে এপ্রিল৷ সেদিন ভারত সভা হলেও মহিলা আত্মরক্ষা সমিতির সভায় সিদ্ধান্ত হয় যে মেয়েরা ১৪৪ ধারা ভাঙার জন্য রাস্তায় নামবে। মহিলা আত্মরক্ষা সমিতিও নিষিদ্ধ হয়। ঐ সভা থেকে বেরিয়ে আমরা মিছিলে যোগ দিই। বিশাল মিছিল চলছে কলকাতার রাজপথ জুড়ে। সেদিন ‘স্বাধীন’ ভারতের সদ্যোজাত রাষ্ট্রের পুলিশ আক্রমণ করল মিছিল। মেয়েদের হত্যা করল। মেয়েরা গুলি খেয়ে রাস্তায় একে একে পড়ে গেলেন৷ শহিদ হলেন গীতা, লতিকা, প্রতিভা, অমিয়া, যমুনা। কলকাতার রাজপথ মেয়েদের রক্তে লাল হয়ে গেল।’ বলতে বলতে আবেগে, ব্যথায় জ্বলে উঠছিল বেলার চোখ, যেন প্রত্যক্ষ করছেন সেই দৃপ্ত মিছিল। স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে বলীয়ান মেয়েদের এই মিছিলেন দৃপ্ত ভঙ্গী দেখে বিপ্লবী কবি সরোজ দত্ত রাস্তায় দাঁড়িয়েই লিখলেন চার লাইনের গাথা —

    ‘মরা গাঙে গর্জে ওঠে বাণ

    পূর্ণিমার গরল টলমল

    গরবিনী নাগিনী আমার

     রাজপথে ফণা তুলে চল্।’

আজও পশ্চিমবঙ্গ সহ ভারতবর্ষের বিভিন্ন জেল অসংখ্য রাজবন্দীতে উপচে পড়ছে। সেদিন যে মেয়েরা নিজেদের জীবনের বিনিময়ে রাজবন্দীদের মুক্তি ছিনিয়ে এনেছিলেন, আজ তাদের উত্তরসূরীদের উপর দায় বর্তায় কল্পনা, হিরণডি, পারো, শোভা, যমুনা, ঠাকুরমণি, সোমা, সুধাদের মতো বছরের পর বছর বিনা বিচারে আটক রাজনৈতিক বন্দীদের মুক্ত করার আন্দোলনকে সেই উচ্চতায় পৌঁছে দেওয়ার, যাতে ফ্যাসিস্ট দালাল রাষ্ট্র রাজনৈতিক বন্দীদের মুক্তি দিতে বাধ্য হয়। 

চলবে…

শেয়ার করুন

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *