নন্দনকানন অ্যাপার্টমেন্ট কমপ্লেক্স

(১)

একটা বাজে স্বপ্ন দেখে ককিয়ে উঠে মালতীর ঘুমটা ভেঙে গেল। একটা বিশাল পাহাড়ের চুড়ো থেকে সে সোজা নীচে লাফ দিয়েছে। পড়ে যায়নি কেউ ঠেলে দেয়নি পা হড়কায়নি পিছলায়নি মচকে যায়নি – স্রেফ সোজা লাফ দিয়েছে। এক মুহূর্ত পালকের মতো ভাসতে ভাসতে পা কেঁপে উঠেছে, অভ্যাসে নড়ে শক্ত জমি খুঁজেছে। আর পায়নি যখন তখন আলুথালু খাবলাতে খাবলাতে পাহাড়ের গা বেয়ে ধাক্কা খেতে খেতে ঘষটাতে ঘষটাতে সোজা নেমে গেছে খাত বরাবর নীল জলের দিকে নীচে আরো নীচে অন্ধকারের দিকে…

মালতী কাত থেকে ঘুরে চিত হয়ে শুল। জোরে জোরে হাঁপ পড়ছে। গলার কাছটাও একটু ঘেমে গেছে কি? এখন কি দিন না রাত্তির? সে কি বিছানায় শুয়ে, না অন্য কোথাও? কয়েক মুহূর্তের জন্য মালতীর মাথাটা একদম ফাঁকা ফাঁকা ঠেকতে লাগল, কীরকম একটা আঁকুপাঁকু ভাব যেন পেটের ভিতর থেকে গলার নলী বেয়ে হিলহিলে সাপের মতো সোজা উঠে আসতে চাইছে।

দশ…নয়…আট…মনে মনে মালতী দশ থেকে পিছন পিছন এক অবধি গুনল। হ্যাঁ এবার একটু ধাতস্থ লাগছে। ওই তো জানলাটা, হ্যালোজেনের আলো সোজা এসে পড়েছে। কতবার বলেছে শ্যামা, পর্দাগুলো টেনে ঘুমোও দিদি, কিন্তু কে জানে কেন কোনোদিন মালতী মন থেকে সায় দিতে পারেনি। হ্যাঁ, মাথার কাছে ওই জানলাটা হচ্ছে পশ্চিমদিক। তাহলে সেখান থেকে বাঁদিকে হচ্ছে দক্ষিণ, ওইখানেই দরজাটার ধারে জলচৌকিটা রাখা। আর জলচৌকিটার পাশ দিয়ে পায়ে পায়ে এগোলেই সরু বারান্দার উপর একগুচ্ছ গু মাখা নোংরা কাপড়ের মধ্যে খাটের উপর ঘুমোচ্ছে বাপি।

এতসব হিসাব করতে পেরে মালতীর মনটা একটু শান্ত হল। একটু মন দিয়ে শুনলে ফ্যানের আওয়াজ পেরিয়ে বাপির হালকা নাক ডাকার আওয়াজও শুনতে পাচ্ছে মনে হল যেন। আজকে বুড়োটা নির্ঘাত ভালোই ঘুমোচ্ছে। এক একদিন যে কী হয় – এমন গোঁ গোঁ করে ওঠে যে কী মালতী কী কোনদিন শ্যামা থাকলে শ্যামা – সবাই মিলেও সামাল দিয়ে উঠতে পারে না। শ্যামা বলে চাঁদনি রাত্তিরে কাকাবাবুকে দানোয় পায়। অবশ্য শ্যামা সব ব্যাপারেই জিন প্রেত দত্যি দানো এসব খুঁজে পায়, কাজেই এখানেও যে পাবে তাতে আর অবাকের কী আছে? তবে বাপি যে শুক্লপক্ষের দিনগুলোতেই বেশি ঝামেলা করে সেটা অবশ্য সত্যি, মালতীও ব্যাপারটা খেয়াল করে দেখেছে।

আরে ধুর এসব কীসব ভাবছে। মনে মনে নিজেকে খানিক গালিই দেয় মালতী। শ্যামার সঙ্গে থেকে থেকে সে নিজেও ওরকম সবেতেই ভূত প্রেত দেখছে নাকি আজকাল? ইচ্ছে করে একটা বেশ জোরে শ্বাস নিল মালতী। ঘাড়ের তলায় বালিশে হাত দিয়ে দেখল। এখনও একটু একটু ভিজে রয়েছে। ডান ঊরুর কাছটাও একটু জ্বালাজ্বালা করছে। পায়ে আবার হল কী? সেদিন দরজার কোণায় একটুখানি ঠোক্কর খেয়েছিল বটে মালতী, তবে সেও তো পায়ের আঙুলে। 

সালোয়ারের দড়িটা আলগা করেই বাঁধা, সেটা ঠেলেঠুলে সরিয়ে হাত ঢুকিয়ে দিল মালতী। হাতটা খুব ঠাণ্ডা। ঊরুতে ঠেকতে আপনা থেকেই খানিক শিরশিরানি বয়ে গেল মালতীর গা বেয়ে। আর সঙ্গে সঙ্গে জ্বালা জ্বালা ভাবটাও  চিড়বিড় করে উঠল। এ আবার কী হল? কেটে গেছে নাকি কোনোভাবে? 

হ্যাঁ ঠিক তাই। ঊরুসন্ধি আর হাঁটুর ঠিক মাঝখানটায় লম্বালম্বি একটা সরু ফালি রেখা চমড়ার উপর পোকার খুরখুরে গর্তের মতো উঠে আছে। কিন্তু কাটলটা কখন? শুতে যাবার আগে এরকম একটা কাটা ছিল কি?

অন্যমনস্কভাবে মালতী নখ দিয়ে উঠে থাকা শুকনো চামড়াটা খুঁটতে শুরু করল। একটু জ্বালা জ্বালা করে উঠছে বটে থেকে থেকে, তা হোক। শুয়ে শুয়ে বেশ আরামই লাগছে। ফ্যানের হাওয়াটা গায়ে লাগছে বেশ মৃদু মৃদু। এই ভোরের দিকটা গরম থাকে না। আজকে মশাও একদম নেই। আপনাআপনিই মালতীর মনটা খানিক খুশি খুশি হয়ে উঠল, একটু আগের বিচ্ছিরি দুঃস্বপ্নটাও আর মাথায় খেলছে না। বেশ শান্ত একটা ভাব চারদিকে। কোথা দিয়ে জুঁইফুলের গন্ধও ভেসে আসছে কি?

মালতী পাশ ফিরে হাঁটু ভাঁজ করে শুল। যবে থেকে মনে পড়ে মালতীর, মা গরমকালের সন্ধেবেলাগুলোয় জুঁইফুল খোঁপায় বাঁধত। এমনিতে মায়ের শখ আহ্লাদ বিশেষ ছিল না, আর থাকবার সামর্থ্যই বা কই ছিল, কিন্তু ওই একটা শৌখিনতা ছিল – একটু ফুল ভালোবাসত। জমি যেটুকু যা ছিল, তাতে ফুলের গাছ লাগাত যত্ন করে। আর বাপি খেপে যেত – যত্তসব বাজে খরচ বলে গজগজ করত। মালতীরও রাগ হত। ইস্কুলের জামাটা ছোড়দির, জুতো বেশ কবার মুচির হাত ঘুরে এসেছে – সেগুলো ঠিক করবার মুরোদ নেই অথচ এদিকে নাকি ফুলের শখ, বাগানের শখ! অথচ কী অদ্ভুত, এতদিন পরে মা কে মনে পড়লে…

***

ক্রিং ক্রিং।

পাশ ফিরে শুয়ে ছাইপাশ ভাবতে ভাবতে কখন ঘুমিয়ে পড়েছিল মালতী। হাত বাড়িয়ে ঘুমচোখেই ফোনটা সাইলেন্ট করে দিল। ওপারে যেই হোক সে অবশ্য থামবার নয়। আবার ফোন করছে। মালতী আবার হাত বাড়িয়ে থামিয়ে দিল। তিনবারের বার বাজতে দেখে একটা বিরক্তিসূচক আওয়াজ করে আধশোয়া হয়ে উঠে বসল। এই কাকভোরে ফোন করেছে, কার ফোন কে জানে? অবশ্য কমপ্লেক্সের লোকগুলোর এসব জ্ঞান থাকলে তো হয়েই যেত। কেয়ারটেকারেরও যে সুবিধে অসুবিধে আছে সে আর কে দ্যাখে। একটা বাজে কথা মুখে আসতে গিয়েও গিলে নিল মালতী। কে জানে বাপি জেগে আছে কিনা। অবশ্য এখন আর বাপির শুনে বাজে কথা না ভালো বোঝবার বোধ কতদূর আছে কে জানে, তবু ওই, অভ্যেস।

বালিশের তলায় হাতড়ে চশমাটা পেল না মালতী। ঠিকাছে, কী আর আছে, কার নাম্বার না দেখেই ফোনটা ধরল, “হ্যালো”। উল্টোদিক থেকে কিছু হুড়মুড়িয়ে কথা। পুরোটা বোঝার না বোঝার আগেই মুখ থেকে বেরিয়ে এল, “কী হয়েছে?”

(২) 

কী যে হতে পারে তা অবশ্য ফোন ধরার আগেই মালতী খানিক আন্দাজ করতে পারছিল। এই গত ক মাস ধরে এই নন্দনকানন অ্যাপার্টমেন্ট কমপ্লেক্সে যাসব ভুতুড়ে ঘটনা শুরু হয়েছে, তারই লম্বা লিস্টিতে নতুন কোনো সংযোজন হবে নিশ্চয়। অবশ্য ভুতুড়ে কি ঠিক বলা যায়? ভুতুড়ে হোক না হোক, খানিক অদ্ভুত তো বটেই। একশো বছর দেড়শো বছরের পুরোনো বাড়ির দেওয়াল নোনা ধরে ফেটে গেলে, এখানে শ্যাওলা হলে ওখানে ছোটোখাটো গাছের চারা গজাতে শুরু করলে বলার কিছু থাকত না। কেন, মালতীদের বাড়িটা থাকতে থাকতেও তো শেষের দিকে তাইই দশা ছিল। দু দিন ছাড়া ইলেকট্রিকের জিনিসপাতি সব খারাপ হয়ে যেত। কিন্তু সে ওদের জলার মধ্যে কবেকার আদ্যিকালের বাড়ি , তার সঙ্গে কি এই হাল ফ্ল্যাটের তুলনা চলে? আর সেই জলাও তো আর নেই, মালতীদের আর ওদের গুষ্টির শরিকদের ভাগের জলাজমিগুলো বুজিয়ে তবেই না কমপ্লেক্সটা উঠেছে। তাহলে? হাল ফ্যাশানের ক বছরের মাত্র পুরোনো ফ্ল্যাট, সামনের গেটটা এখনও তার সোনালি চকচক করছে – সেখানে এরম সব অদ্ভুত অদ্ভুত পোড়ো বাড়ির সমস্যা কেন! দুদিন ছাড়া এই ফ্ল্যাট থেকে ওই ফ্ল্যাট থেকে ফোন আসে, ইলেকট্রিক কাজ করছে না। গেল হপ্তায় নববাবু ফোন করে খুব গালাগালি করলেন, নাকি উনি শখ করে দেওয়ালে কীসব টেফলন রঙ করিয়েছিলেন, তা তার মধ্যে থেকে এক চাকলা গোল করে খাবার ঘরের দেওয়ালের রং উঠে গেছে। এই সেদিনও মালতী বাটরাদের একতলার বন্ধ ফ্ল্যাটটার গা থেকে ছ ইঞ্চি লম্বা একটা অশ্বত্থ গাছের চারা শিকড়শুদ্ধু উপড়ে ফেলেছে। এতসবকে ভুতুড়ে বলবে না তো কীই বা বলবে?

আজকে ঠিক কী যোগ হয়েছে সেই লিস্টিতে, তা অবশ্য ফোনটায় পরিষ্কার করে ঠিক বোঝা গেল না। ফোন তুলতে না তুলতেই মিসেস ঘোষ এমন হাঁউমাঁউ করতে লাগল যে সব কথা বোঝাই দায়। ওনার বর, অবশ্য আবার বর বললে তো প্রেস্টিজে লাগে – ওনার হাজব্যাণ্ড যদুবাবু বাথরুমে পা পিছলে পড়ে মাথায় চোট পেয়েছে। এই অবধি বোঝা গেছে। কিন্তু তার জন্য অ্যাম্বুলেন্সে ফোন না করে কেয়ারটেকারকে ফোন করার কী মানে?

লিফটে করে উঠতে উঠতে এইসবই ভাবছিল মালতী। অবশ্য যদুবাবুটা যা শয়তান লোক, কে জানে জানলা দিয়ে কার দিকে টেরিয়ে দেখতে গিয়ে পা পিছলে পড়েছে। কোনোরকমে শাড়িটা জড়িয়ে এসেছে, না চা খাবার না সকালে হাগবার সময় হয়েছে। গত এক মাস ধরে এমনিই ঘাড়ে মাথায় যন্ত্রণার সমস্যা হচ্ছে – আজকে আগেভাগে ঘুম ভেঙে গেছে বলে কিনা কে জানে, মাথাটাও বেশ ভালোই দপদপ করছে।

ঘোষেদের ফ্ল্যাটটা ছ তলায়। মিসেস ঘোষ বোধহয় ল্যান্ডিংএই দাঁড়িয়েছিল। মালতীকে দেখেই হাঁউমাঁউ করে উঠল। অমন ভারী চেহারা, মোটা গলা বসা কাঁধ, অথচ গলার আওয়াজটা তার তুলনায় কেমন চাঁছাছোলা। যতবার শোনে মালতীর গায়ে কেমন একটা বিশ্রী রকমের শিরশিরানি হয়।

মিসেস ঘোষ হড়বড় করে নানা কথা বলে চলেছে। ভয়ে উত্তেজনায় গলাটা স্বাভাবিকের থেকে আরও চড়ে গেছে, একটার সঙ্গে আরেকটা কথা জড়িয়ে গিয়ে মালতী আদ্ধেক কথা বুঝতেই পারছে না। সকালের রোদ্দুরটা ল্যাণ্ডিংএর জানলা দিয়ে এসে সোজা চোখে পড়ছে। মাথাব্যাথাটা তাতে আরও খানিক বাড়ছে। এদিকে মহিলার কথা থামানোরও লক্ষণ নেই। শেষে খানিক বাধ্য হয়েই মালতী একটু ধমকের সুরে বলে উঠল, “আচ্ছা ঠিকাছে হয়েছে। থামুন এবার।” 

কেয়ারটেকার হলেও মালতীর কথা লোকজন শোনে, মালতীর রগচটা মেজাজ আর মুখরা স্বভাবের জন্য একটু বুঝেসুঝেও চলে। আড়ালে অবশ্য চুপিচুপি বলে বেড়ায়, সাধে কি আর শ্বশুরবাড়ি থেকে তাড়িয়ে দিয়েছিল? অমন মুখ যার…মালতী ঘুরিয়ে শুনতে পায়, শুনে একটু আধটু গায়েও যে লাগেনা তা নয়। কিন্তু কীই বা করা, লোকের মুখ থাকলে কথা তো আর আটকানো যাবে না।

যাইহোক এখন এসব ট্যারাব্যাঁকা চিন্তার সময় নয়। “অ্যাম্বুলেন্সে ফোন করেছেন?” মিসেস ঘোষ ঘাড় নেড়ে হ্যাঁ বলল, সাহস করে আর মুখ খুলে কথা বলল না। মহিলাকে খানিক আলতো করে ঠেলে সরিয়ে মালতী ঘরের ভিতরে ঢুকল।

বসবার ঘরেরই এক কোণায় একটা চওড়ামতো সোফায় যদুবাবু চোখ বন্ধ করে শুয়ে আছে। পাঁচতলার মীজানুর একটা কাপড় নিয়ে মাথার কাছে ধরে আছে, পায়ের কাছে আরো খান দুই চুপসানো কাপড়ের টুকরো জড়োসড়ো করে রাখা। যদুবাবুর বাচ্চা মেয়েটা খানিক দূরে বসে বসে ফোঁপাচ্ছে। মেঝে থেকে কেউ একটা তাড়াহুড়ো করে রক্তের দাগ  ন্যাতা দিয়ে মুছে দেবার চেষ্টা করেছে, তবে কোণার দিকে সাদা মার্বেলের উপর এখনও ছোপ ছোপ রক্তের ভাব বোঝা যাচ্ছে। 

ঘরের মধ্যে আরো জনা চার পাঁচ লোক। উপরের তলার ফ্ল্যাটের ওই কলেজের দিদিমণি, নবনীতা না কি নাম বেশ; পাশের ফ্ল্যাটের বোসবাবু আর বোসগিন্নি; আর একটা পাকামতো দেখতে লম্বা দাড়িওয়ালা লোক। পাকা লোকটাই প্রথম এগিয়ে এল, এসে খানিক শোনানোর মতো করে বলতে শুরু করল, “এত পয়সা দিয়ে ফ্ল্যাট বেচছেন, অথচ একটু মেনটেনেন্স করতে পারেন না! অ্যা ম্যান হ্যাজ -”

মালতী তার কথা শেষ করতে দিল না। “কেউ তার বাড়িতে শুকনো মেঝেতে আছাড় খেয়েছে, তাতে আমার কী করার আছে? আর আপনিই বা কে হে, আগ বাড়িয়ে মোড়লগিরি করতে এসেছেন?”

লোকটা বোধহয় ভাবতে পারেনি মালতী এরম করে মুখ ঝামটা দেবে। দাড়িওয়ালা লম্বাটে মুখটা কেমন ছোটমতো হয়ে গেল যেন মালতীর কথা শুনে। প্রথম ধাক্কাটা সামলে সে আরো কিছু জবাব দেবে তোড়জোড় করছে, নবনীতা এসে তার কাঁধে হাত ঠেকিয়ে নিরস্ত করল। তারপরে নিজেই নরম গলায় বলল, “কিন্তু শুকনো মেঝেতে তো পড়েনি দিদি। পড়েছে শ্যাওলায়। তাও বাথরুমে নয়, বাথরুমের ঠিক বাইরে। তুমি দেখে যাও।”

-“আপনি”

নবনীতার মুখটা বেশ গোলগোল সুন্দরমতো, সকালবেলাও লাল হয়ে গেল একটু। তবু তড়িঘড়ি সামলে নিয়ে বলল, “হ্যাঁ, সরি। আপনি আসুন, দেখে যান।”

(৩) 

ঘোষেদের বাড়ি থেকে বেরিয়েই মালতী ছোটন কন্ট্র্যাকটরকে ফোন লাগাল। ঘোষেদের ফ্ল্যাটে তো খুব তোষামোদ করে, এরম হয়, ওরম চিন্তা করবেন না বলে ভুজুং ভাজাং দিয়ে যদুবাবুকে অ্যাম্বুলেন্স অবধি তুলে দিয়ে বেরিয়ে এল – কিন্তু মানুষ তো আর ঘাসে মুখ দিয়ে চলে না। যা দেখল তাতে মালতীর চোখও সোজা কপালে ওঠবার জোগাড়।

সবুজ বিস্তৃত গালিচার মতো খোলা মাঠের মতো রান্নাঘর থেকে বাথরুমের সামনে অবধি পুরোটা শ্যাওলায় ঢাকা পড়ে গেছে। আবার শ্যাওলা মানে কলতলায় যেরকম পিচ্চি শ্যাওলা হয় সেরমও না, পুরোনো পাঁচিলের গায়ে আধ ইঞ্চি পুরু যেরম সবুজ শ্যাওলা থাকে, নখ দিয়ে ঘষলে চাপড়া চাপড়া উঠে আসে – ঠিক সেরকম। বাড়ির ভিতর, মার্বেলের মেঝের উপর আবার এরম হয় নাকি?

“ছোটন? বিকেলবেলা একবার আসিস তো। কথা বলবার আছে। ঘোষেদের ফ্ল্যাটে কী হয়েছে জানিস? কীরম মেটিরিয়াল দিয়েছিলি তুই – “

বাড়ি ফিরে মালতী বিছানায় গা এলিয়ে দিল। রান্নাঘর থেকে বাসনের টুংটাং আওয়াজ হচ্ছে। যাক অন্তত শ্যামা এসে গেছে। “শ্যামা এক কাপ কড়া করে আদা দিয়ে চা বানিয়ে দে তো।” উল্টোদিক থেকে কোনো সাড়া এল না। “শ্যামা? এই শ্যামা?” এবার সাড়া এল, “দিচ্চি বাবা দিচ্চি, অত চ্যাঁচ্যাচেঁচি করে করে মাতাটা খারাপ কোরো না তো।” 

মালতীর মুখে একটা হাসি খেলে গিয়েও মিলিয়ে গেল। এতরকম চিন্তা মাথায় ভিড় করে রয়েছে! আর ছোটনের সঙ্গে কথা বলেও তখন কোনো লাভ হল না। মালতী খানিক হম্বিতম্বি করল বটে, কিন্তু ছোটনই বা কি করবে? বাড়ি বানাতে ভুষি মাল গছিয়েও যদি বা থাকে, তা সে কোন কন্ট্র্যাকটর না গছায়? আর ভুষিমাল দিলেও বা, কীরকম মেটিরিয়াল দিলেই বা ক বছরের মধ্যে বাড়ির এরকম দশা দাঁড়ায়?

শ্যামা আদা চা টা বড় ভালো বানায়। চায়ের পেয়ালায় বড় কটা চুমুক লাগিয়ে মালতী স্বস্তির নিঃশ্বাস ছাড়ল। শ্যামা ওর পায়ের কাছে ঠায় দাঁড়িয়ে ছিল। মালতী কাপটা হাত থেকে নামিয়ে খাটের উপর রাখতেই জিজ্ঞেস করল, “এই কাকভোরে সাতসকালে বেরিয়েছিলে যে বড়ো। কী হয়েচিল টা কী গো দিদি?”

“তোকে কতবার বলেছি না, আমাকে ম্যাডাম বলে ডাকবি?”

মালতীর যদি মুখরা বলে সুনাম থাকে, শ্যামাও অবশ্য কম যায় না। “মরণ! তিন কাল এসে এক কালে ঠেকেছে, এই বয়সে ওসব ম্যাডাম ফ্যাডাম বলা শুরু করতে পারবোনা বলে দিচ্ছি। কী হয়েছে বলবে তো এমনিই বলো আর নইলে যাও, বলতে হবে নাকো।” 

শ্যামার বলার ঢঙে মালতীর হাসি পেয়ে গেল। শ্যামার বয়স এখনও বোধহয় পঁচিশও পেরোয়নি, অথচ সারাক্ষণ মুখে পাকা পাকা কথা। মালতী খাটের অন্য কোণাটা দেখিয়ে বলল, “আহা বোস না ওখানে। বলছি তো। সাত সকালে যদুবাবু পা পিছলে আছাড় খেয়ে পড়েছে বাথরুমের সামনে, বুঝলি? ঘোষগিন্নির তো মাথা খারাপ হবার জোগাড়। তা বুড়োকে হাসপাতাল পাঠানোর ব্যবস্থা করে তবে এলাম।” 

“কী ধাষ্টামো করতে গিয়ে পড়েছে আবার দেখো খনে! লোকটা একদম সুবিধের নয় জানো তো? এই তো সেদিন পুন্নিদিদির সঙ্গে খানিক গল্প করে ফিরছিলাম, ওই যদুবাবু বোধহয় বাজার করে না কী করে ফিরছিল। এমন হাঁ করে তাকিয়ে রইল যেন বাপের জন্মে মেয়েছেলে দেখেনি। ডানহাতে তো বাজারের ব্যাগ, আর বাঁ হাতটা নিয়ে -” শ্যামা আর কথাটা শেষ করল না।

“তা আর জানি না রে ভাই। তুই তো তুই, এই আমার আজ পঞ্চাশ বছর বয়স হয়ে গেল, আমাকেও ছাড়ান দেয় তোর মনে হয়?”

“ওর বউটারই বা কেমন বলিহারি মুরোদ বলো দিকিনি? নিজের বরকে সামলে রাখতে পারে না?”

মালতী কোনো জবাব দিল না। শ্যামা কী বুঝল কে জানে, তড়িঘড়ি বলে উঠল, “না না তোমার কথা বলছি না গো দিদি। তোমার তো অন্য ব্যাপার ছিল। হাতের পাঁচটা আঙুল কি আর সমান হয়? তোমায় ধরে মারত, খেতে দিত না। ঘোষগিন্নি আর তুমি কি এক হলে?”

হয়তো হল না এক। বা হয়তো হল। আরো খানিক গল্প করে শ্যামা বাসন ধুতে, বাপির হাগা পরিষ্কার করতে চলে যাবার পরেও কথা কটা, গোটা ব্যাপারটা মালতীর মন থেকে গেল না। অপমান তো কম সয়নি মালতী জীবনে। এই শরিকি ভাগ নিয়ে, এক কেয়ারটেকারের কাজটা পাওয়া নিয়েও কি কম মুখ সইতে হয়েছে? কম নেতাদের দরজায় হত্যে দিয়ে পড়ে থাকতে হয়েছে? তবু সব অপমানের সমুদ্রের মধ্যে হিমশৈলের মতো না থেকেও সেই শ্বশুরবাড়ির পরিচয়টাই উঁচু হয়ে জেগে উঠে থাকে কেন? এই যে ভগবানের কৃপায় এখন সে দশজনের মধ্যে একজন, পয়সা  খানিক আছে, লোকে তাকে মান্যি করে – এসব সত্ত্বেও সুযোগ পেলেই ফিসফিসে আড়ালে আবডালে আড্ডায় বরে খেদানো, বিয়ে ভাঙা – এইই তার পরিচয় হয়ে যায় কেন?

নানাকিছু ভাবতে ভাবতে মালতী খানিক অন্যমনস্কই হয়ে পরেছিল। হঠাৎ শ্যামার চিৎকারে সম্বিত ফিরল। 

“দিদি দিদি, তাড়াতাড়ি এসো, তাড়াতাড়ি এসো”

বাপির ঘর থেকে আওয়াজ আসছে। বাপির কি আবার কিছু হল? “কী হয়েছে?” চশমাটা পড়ে তড়িঘড়ি গিয়ে দেখল শ্যামা একটা ঝাঁটা নিয়ে আলমারির দিকে দেখাচ্ছে। “কী হয়েছে?” মালতী আবার জিজ্ঞেস করল। 

“ওই দ্যাকো দ্যাকো। আলমারির তলায় দ্যাখো। কী বিশাল গরগেঁল! কোদ্দিয়ে এসে আলমারির তলায় সেঁদিয়ে গেছে।”

“ওঃ গরগেঁল” মালতী একটা স্বস্তির নিশ্বাস ফেলল। “তুই এমন চেঁচানি ধরলি!” 

অনেকদিন এ চত্বরে গরগেঁল দেখেনি মালতী। অবশ্য আসবেই বা কোদ্দিয়ে। আর তো জলাও নেই, পুকুরও নেই সেরকম। এসে খাবেটা আর কী। ছোটবেলায় অবশ্য বাড়িতে গরগেঁল ঢুকে যাওয়া নিত্যদিনের ব্যাপার ছিল। জলার ঘাসের মধ্যে মাঝেমধ্যেই ওত পেতে তাদের দেখতে পেত মালতী। পুকুরে চান করতে গেলে মা বলত, দেখিস গরগেঁলে যেন না কামড়ায়। একবার ধরলে কিন্তু মেঘ না ডাকলে আর ছাড়ে না। মালতীর ভয়ডর চিরকালই কম, সে উত্তর দিত, ভালো তো কামড়াক না, আমি পুষব। মা এক হাত লম্বা জিভ কেটে বলত, “সব্বনেশে মেয়ের কথা শোনো। গঁরগেল কেউ পোষে! ও যে কলিযুগের মকর, সাক্ষাত মা গঙ্গার বাহন!” 

“মকর কেমন দেখতে হয় গো মা?”

মা থতমত হয়ে ভাবত। ইতিমধ্যেই ডাক এসে যেত পুকুরে যাবার – বুঁচি, ছোড়দি, বড়জেঠিমার মেয়ে তিতলির। ফ্যাকফ্যাক করে হাসতে হাসতে পুকুরে ছুটত মালতী। 

সে সব কবেকার কথা সব। বাবা জ্যাঠাদের তখনো মুখ দেখাদেখি ছিল, জ্যাঠতুতো খুড়তুতো ভাই বোনেদের সঙ্গে দিনরাত দেদার হুল্লোড় চলত। হাঁড়ি সবে সবে আলাদা হয়েছে বটে তবে মনের ভাগ তখনও হয়নি। এখন ফিরে দেখলে ঠিক সত্যি বলে আর বোধ হয় না – নিজের স্মৃতির উপরেই সন্দেহ হয় যেন খানিক, এমন কি আদতেই ছিল? নাকি গোটাটাই বেবাক একটা স্বপ্নের মতো? 

মালতী একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। “ওটাকে ছেড়ে দে শ্যামা। দরজাটা খুলে রাখ, আপনি বেরিয়ে যাবে।”

“কী বলছ দিদি! গরগেঁলে শোনোনি, একবার কামড়ালে মেঘ না ডাকলে আর ছাড়ে না! কেন আমাদের পিছনের পাড়ার কামরুলকেই তো কামড়েছিল। কাকাবাবুকে কামড়ে দেয় যদি?”

“তোর যত বাজে কথা। গরগেঁল কাউকে কামড়ায় না। যা তুই এখান থেকে। আমি দেখছি।”

শ্যামা খানিক গাঁইগুঁই করে ঝাঁটা বাগিয়ে আলমারির দিকে শেষ একটা শ্যেন দৃষ্টি  দিয়ে বেরিয়ে গেল। যার দিকে পড়ল দৃষ্টি, সেই গরগেঁল তখন আলমারির তলা থেকে মাথা বের করে এদিক ওদিক উদভ্রান্তের মতো দেখছে। ভয় পেয়েছে নিশ্চয়। মালতী বাপির খাটের একটা কোণা করে চাদর সরিয়ে সাবধানে বসল। গরগেঁলটা আওয়াজে কিনা কে জানে, মুখ তুলে মালতীর দিকে তাকিয়ে রইল। মালতীর হঠাৎ ভীষণ মায়া হল।

“কী হল? ভয় পেয়েছ? বেরোতে পারছ না?” এ আবার কী করছে সে? গরগেঁল কি পোষা কুকুর নাকি, যে এরম ভাবে আদর করে ডাক দিলে সাড়া দেবে? গরগেঁলটা একেবারে স্থির হয়ে একদৃষ্টে মালতীর দিকে তাকিয়ে আছে। মালতীর সাহস আরো খানিক বেড়ে গেল। সে এবার খাট থেকে নেমে একটু ঝুঁকে গরগেঁলটাকে দেখতে লাগল। 

কী অদ্ভুত সুন্দর মসৃণ একটা সবজেটে রং গায়ে। দুটো কালো বোবা চোখ দিয়ে নিষ্পলকে তাকিয়ে আছে মালতীর দিকে। যেন অস্ফুট কিছু বলতে চাইছে, অথচ সাহস করে বলে উঠতে পারছে না। মালতীর ইচ্ছা হল হাত বাড়িয়ে ওর গায়ে হাত বুলিয়ে দেয়। আস্তে আস্তে ডানহাতটা তুলে হাঁটু ভাঁজ করে আধ বসা অবস্থাতেই মালতী গরগেঁলটার দিকে হাত এগিয়ে দিল…

(৪)

“আপনি হাত বাড়িয়ে কীসের গায়ে হাত বোলাতে যাচ্ছিলেন?”

“আজ্ঞে গরগেঁল স্যার। দিদি গরগেঁলের গায়ে হাত বোলাতে যাচ্ছিল। কেমন বোকা বোকা কাজ বলুন। আর অমনি, ঘ্যাঁক করে দিয়েছে পায়ের গুলিতে কামড়ে। শাড়ির উপর দিয়ে কামড় স্যার, তাতেই এমন দাঁত বসে গেল -”

ডাক্তারবাবু এক হাত তুলে শ্যামাকে থামিয়ে দিল। তারপর পাশের শাকরেদের দিকে ইশারা করল। “গর- হোয়াট?”

শাকরেদ চটপট ফোন দেখে ফিসফিস করে বলল, “লিজার্ড, স্যার। মনিটর লিজার্ড বলে। বাচ্চা কুমিরের মতো।”

“ব্যথা আছে?” ডাক্তার এবার মালতীর দিকে ঘুরেই জিজ্ঞেস করল।

মালতী শুয়ে শুয়েই ঘাড় নাড়ল। “পা টা যেন জ্বলে যাচ্ছে মনে হচ্ছে ডাক্তারবাবু। সবকটা দাঁত সব আলাদা আলাদা এখনও টের পাচ্ছি মনে হচ্ছে।”

ডাক্তারবাবু শুনেও শুনল বলে মনে হল না। কাগজ বের করে খসখস করে লিখতে শুরু করল। নতুন ডাক্তার এ এলাকায় পসার খুলেছে আগে শুনেছিল বটে মালতী, আগে দেখেনি কখনও। ভারী সুন্দর চেহারা ডাক্তারবাবুর, ছাঁচে ঢালা ব্রোঞ্জের মূর্তির মতো দেখতে। কতই বা বয়স হবে? ত্রিশ বত্রিশ? সোনালি ফ্রেমের চশমা মিলিয়ে কেমনতরো রাজকুমার রাজকুমার চেহারা। 

“ইঞ্জেকশন নিতে হবে। আর একটা পেনকিলার দিয়ে যাচ্ছি। ব্যথা বাড়লে খাবেন। নাম বলুন।” লেখা থামিয়ে ডাক্তার চশমার ফাঁক দিয়ে মালতীর দিকে তাকাল। মালতীর মনে হল পেটের ভেতরটা কেমন না চাইতেই আপনা থেকে একটা মোচড় দিয়ে উঠল। যাহ এরম আবার হয় নাকি, এই বুড়ো বয়সে এসে? মালতী একটু থেমে তারপরে আস্তে আস্তে বলল “মিতালী দাস”। মালতী শুয়ে শুয়েই টের পেল শ্যামার চোখগুলো ছোট ছোট হয়ে গেছে, তার দিকে ঘুরঘুর করে দেখছে।

শাকরেদ সমেত ডাক্তার ওষুধ ইঞ্জেকশন বুঝিয়ে চলে যাবার পর শ্যামা খানিক রসা গলায় জিজ্ঞেস করল, “মিতালী?”

মালতী ভালো করে চাদরটা মুড়ি দিয়ে পাশ ফিরে শুল। পেনকিলারটা খেয়ে খানিক জড়ানো জড়ানো লাগছে। ব্যথাটাও কমেছে খানিক।

*** 

একটা পাকা রাস্তার উপর দাঁড়িয়ে আছে মালতী। সবে বৃষ্টি হয়ে গেছে। পাশ দিয়ে অঝোরে ঝোরার জল বয়ে যাচ্ছে। আর একটু উঁচুনীচুও মাটি যেন, পাহাড় পাহাড় ভাব গোটা ব্যাপারটায়। কোন জায়গা এটা? চারপাশটা সবুজ, ভীষণ সবুজ, সদ্য বর্ষা শুরু হলে চারপাশটা যেমন ঘন সবুজ ধোয়া পাতায়, সদ্য গজিয়ে ওঠা আগাছায় ভরে ওঠে, ঠিক সেরকম। সামনে খানিকটা উঠেই রাস্তাটা একেবারে বেঁকে গেছে। আর রাস্তার ওই ওপরে দূরে দাঁড়িয়ে কে হাসছে, ওটা মা না? ঠিক তাই তো, পাড় টেনে পড়া লাল সাদা শাড়ি, হাত নেড়ে ডাকছে মালতীকে। কতদিন মাকে দেখেনি মালতী। কতদিন? কতদিন হবে? এখন হাত নেড়ে ডাকলেই কি মালতীকে যেতে হবে? আর যদি না যায়? অভিমানে মুখ ফিরিয়ে নিল মালতী।

কিন্তু মা এখনও হাতছানি দিয়ে ডাকছে। না তাকিয়েও মালতী ঠিক বুঝতে পারছে। আর বেশিক্ষণ সে ডাক না শুনে না তাকিয়ে মালতী পারল না। ধীরে ধীরে এগিয়ে গেল। রাস্তার বাঁকটা উঠে যেখানটা হারিয়ে গেছিল, সেখানটা পাহাড়ের একদম ধারে। মা একেবারে ধারে খাদ বরাবর এসে দাঁড়িয়েছে। খানিক হাওয়া দিচ্ছে, মায়ের রোগাপাতলা শরীরটা কেঁপে কেঁপে উঠছে। 

মালতীর হাসি পেয়ে গেল। মায়ের যা রোগাপ্যাংলা চেহারা ছিল, বাপি বলত তোর মা তো হাওয়াতেই উড়ে যাবে। একবার তো নাকি মায়ের ছোটোবেলায় এমন হয়েওছিল – এমন ঝড় উঠেছিল মা বাড়ি আসতে পারছিল না, মাঝরাস্তায় হাওয়ার তোড়ে আটকে গেছিল, নারকেল গাছের গুঁড়ি জড়িয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। মা অত পাতলা, তার নিজের এরকম ভারিক্কি চেহারার ধাত হল কীকরে কে জানে? মা হাতছানি দিয়ে কী দেখাচ্ছে? পাহাড়টা খানিকটা খাড়া সোজা নেমে গেছে। আর নীচে, অনেকটা নীচে, পাখির ডানার আড়াল থেকে যেমন দেখা যায়, চিলের তীক্ষ্ণ নজর থেকে যেমন দেখা যায় ওটাই তেমন ওদের সেই নন্দনপুরের জলাটা না? কিন্তু অনেকদিন আগের, এইসব ফ্ল্যাট ট্যাট শুরুর অনেক আগের- জলা যখন বর্ষার জলে ঘন সবুজ হয়ে নলখাগড়ার লম্বা লম্বা ঝোপে ভরে থাকত সেরকম।

মা এখনও একদম ধারে দাঁড়িয়ে আছে। হাতছানি দিয়ে নীচের দিকে দেখাচ্ছে। কেন দেখাচ্ছে? মালতী পায়ে পায়ে একেবারে ধারে পোঁঁছে গেল। কী খাড়া বাবা, একেবারে সোজা নেমে গেছে টানা কোনো ধাপ নেই ভাগ নেই একবার পড়লে একদম সোজা নীচে… 

*** 

“দিদি ও দিদি”

মালতীর ঘুমটা হঠাৎ ভেঙে গেল। এখনও পুরো সম্বিত ফেরেনি, কেমন একটু জড়ানো লাগছে সবকিছু। সে কি মাকে নিয়ে স্বপ্ন দেখছিল? অনেকদিন তো দেখেনি এরকম। ঠিক কী দেখছিলই বা?

“ও দিদি” শ্যামা আবার অধৈর্য্য হয়ে বলল, “বাইরে একখানা যা কাণ্ড হয়েছে।” 

“কী হয়েছে রে?”

শ্যামা খুব হাত পা নেড়ে বলল, “এ সব ঘোর কলি বাবা। বাপের জন্মে এমন কাণ্ড দেখিনি। তুমি আসো, না আসলে আমি বলে বলে বোঝাতে পারব না।” 

মালতীর পায়ের গুলিতে এখনও একটু ব্যথা ব্যথা করছে। ছোটন আসবে বলেছিল, কই সেও এল না তো? আর এখন আবার তার মধ্যে নতুন করে হলটা কী? মালতী শাড়িটা সামলে নিয়ে উঠল। আর এত ঝামেলা ভালো লাগে! 

শ্যামা দরজাটা দিতে দিতে বলল, “এইখানটায় নয়কো কিন্তু, চৌবাচ্চা অবধি যেতে হবে দিদি বলে দিচ্চি এখনই”

এক কমপ্লেক্সটার মধ্যিখানে একখানা ছোটো সুইমিং পুল রয়েছে। সেইটাকেই শ্যামা চৌবাচ্চা চৌবাচ্চা করে বলে, অনেক বলেও মালতী তার মুখ দিয়ে সুইমিং পুল বের করাতে পারেনি। মালতী একটা মৃদু দীর্ঘশ্বাস ফেলল। 

“কী হয়েছেটা কী বল দেখি শ্যামা, কিচ্ছু বুঝতে পারছি না।”

“পাখি গো পাখি”

“পাখি?”

“ও আমি বলে বোঝাতে পারব না। তুমি নিজেচোখেই দেখো।”

সি ব্লকের বাড়িটা পেরিয়ে সুইমিং পুলটার থেকে খানিক দূরে একটা ছোটোখাটো জটলা চোখে পড়ল মালতীর। জনা দশ বারোজনের জটলা, তার মধ্যে ছোট মেয়েটার হাত ধরে মীজানুর, বোসগিন্নি, কোলে বাচ্চা নিয়ে মিসেস সরকারকে দূর থেকে চিনতে পারল মালতী। আর ওরা সবাই দল বেঁধে যেখানটায় দাঁড়িয়ে রয়েছে, সেখান থেকে একটু এগিয়ে…

নন্দনকানন কমপ্লেক্সের হোর্ডিংগুলো এখন বেশিরভাগই নেই বা ছিঁড়ে গেছে। এই সুইমিংপুলখানার পাশে বোধহয় তার শেষখানা রাখা আছে। এক হাঁটুর বয়সি পিচ্চি বাচ্চা নিয়ে বাবা মা, পিছনে সুন্দর নান্দনিক কমপ্লেক্সের ছবি – গাছ গাছালি, সুইমিং পুল, আর বড়ো বড়ো হরফে লেখা, আমার স্বপ্নের বাড়ি, আমাদের স্বপ্নের বাংলা। তা সুইমিং পুল থেকে সেই হোর্ডিংয়ের মাথা অবধি থিকথিক করছে পাখি। কেউ বসে রয়েছে, কেউ ডানা ঝাড়ছে, নানারকম আওয়াজ করছে। আবার যে সে পাখিও নয়। হাঁস, বহুদূর থেকে পাহাড় ডিঙিয়ে বন পেরিয়ে উড়ে আসা শীতের পরিয়ায়ী হাঁস।

পাতিহাঁসের মত ঘিয়ে ঘিয়ে দেখতে ছোট সরাল, থ্যাবড়া ঠোঁটওয়ালা খুঁতিহাঁস, কালচে রঙের সাদা পেট বামনে হাঁস। ছেলেবেলায় এরম কত হাঁস আসত, জলায় বসে থাকত। লুকিয়ে লুকিয়ে বুঁচি আর মালতী মিলে ঢিল ছুঁড়ত, আর তিতলি কান্নাকাটি জুড়ে দিত কেন দিদিরা অমন সুন্দর সুন্দর পাখিদের দিকে তাক করে ঢিল ছুঁড়ছে। ছেলেগুলো অবশ্য ছিল আরো ওঁচা। বড় জ্যাঠামণির ছেলে মানিক কোদ্দিয়ে একবার তার একটা বড়লোক বন্ধুকে ধরে আনল, তার হাতে এয়ারগান। নাকি এয়ারগান দিয়ে মেরে হাঁসের মাংস খাবে তারা। অবশ্য হাতের যা তাক, হাঁস তো হাঁস, শেষে আরেকটু হলে মানিকের পায়ে গুলি লাগতে যাচ্ছিল যখন, তখন অবশেষে ক্ষান্ত দিল তারা। সে নিয়ে কী হাসির রোল বাড়িতে। মানিক এক হপ্তা পাড়ার বন্ধুদের মুখ দেখাতে পারেনি।

সেসব তো কবেকার আগেকার কথা। সে পাখি আসে না তো অনেকদিন। এই বাড়ি হল তো হালে, তার আগেও, জলায় মাটি পড়া শুরু হল যবে, তবে থেকেই তো শীতের পাখি আসেনি তো আর। তবে, এই এতদিন পরে, এত্তসব পাখি এল কোথা থেকে, তাও আবার এরম গরমকালে জৈষ্ঠ্য মাসে?

বোসগিন্নি এতক্ষণে মালতীকে দেখতে পেয়ে এগিয়ে এসেছে। “মালতী, কিছু একটা করো। এ কী ভুতুড়ে কাণ্ড হচ্ছে বলোতো! এখানে যখন তোমার দাদা বাড়িখানা কিনল, তখনই আমার ভাই বলেছিল, কী দিদি শহর ছেড়ে অজ পাড়াগাঁতে যাচ্ছ! তোমার দাদা শুনলে তো!”

মালতীর মাথা ঝিমঝিম করছিল। বিশাল চেহারা নিয়ে বোসগিন্নি এমন থপথপ করে কথা বলছে, না চাইতেও একটা কোলব্যাঙের ছবি মাথার মধ্যে চলে এল। কিন্তু না, ব্যাপার গুরুতর। জটলার বাকি কজনও মালতীকে দেখতে পেয়ে ইতিমধ্যে তাকে ঘিরে ধরেছে। দু একজন কিছু বা বলছে, বাকিরা মুখে কিছু না বললেও খানিক ভয় খানিক উৎসাহ নিয়ে মালতীর দিকেই তাকিয়ে রয়েছে। যেন সেই সব ঝামেলা এক্ষুণি মিটিয়ে দেবে। মালতীর মাথা গরম হয়ে গেল। সবাই এরকম করে তার দিকে ড্যাবড্যাব করে চেয়ে রয়েছে কেন? কী আশা করছে লোকগুলো? সে কি মন্ত্র পড়ে ঝাড়ফুঁক করে পাখি ভাগিয়ে দেবে, সব ঠিক করে দেবে?

মালতীর ভীষণ রাগ হতে লাগল। পায়ের জ্বালাটা আবার বাড়ছে। দাঁত বসিয়ে চলে গেলেও কিছু একটা ভিতরে কি লেগে টেগে রয়েছে নাকি? নইলে এরম কেন মনে হচ্ছে? লোকগুলো এখনও কথা বলে যাচ্ছে, এখনও তার দিকে তাকিয়ে রয়েছে। কেউ কি বুঝতে পারছে না মালতীর কষ্ট হচ্ছে, রাগ হচ্ছে, আর থাকতে পারছে না সে?

হঠাৎ মালতীর কাঁধে কেউ একটা হাত রাখলো। “দিদি আমার মনে হয় চন্দনবাবুকে একটা ফোন করা উচিত। আর বন দপ্তরকেও। কী বলেন? আমি করব?” নবনীতা। সবে বোধহয় কলেজ থেকে ফিরেছে। কাঁধে ঝোলা ব্যাগ একটা, পরণের কামিজটা ঘামে খানিক লেপ্টে আছে। কপালের ঘাম হাতা দিয়ে একবার মুছে নিয়ে মালতীর দিকে তাকাল।

অনেকদিন মালতীর গায়ে কেউ হাত রেখে কথা বলেনি। মালতীর হঠাৎ খুব কান্না পেতে লাগল। তাড়াতাড়ি করে একটু কাঁধ থেকে হাতটা সরিয়ে নিজেকে সামলে নিয়ে খানিক কড়া গলায় বলল, “থাক, অনেক করেছ। আমি যা করার করছি।”

(৫)

“অনেক তো বলে কয়ে এই ধ্যাড়ধ্যাড়ে গোবিন্দপুরে টেনে এনেছিলেন। সামনেই নাকি গঙ্গা, এই নাকি রুফটপ গার্ডেন হবে, টেনিস খেলার মাঠ হবে, বজরায় করে নদী ঘোরানোর ব্যবস্থা করবেন। তা সে তো নাহয় নাই হল, আপনার ফ্ল্যাটে গরগেঁল ঘুরছে, মানস সরোবর থেকে পাখি উড়ে আসছে, শেয়াল আসছে। আরে কিছু তো করুন, চন্দনবাবু!”

মালতী চন্দনের পিছনে একটা চেয়ার টেনে বসেছিল। এই ক্লাবঘরটার এমন একটা অদ্ভূত ড্যাবড্যাবে আলো, মালতীর মাথা ব্যাথাটা আবার বাড়ছিল। চোখ পিটপিট করতে করতে তারমধ্যেই দেখল, সামনে দাঁড়িয়ে চন্দন দরদর করে ঘামছে। একটা ঘামের ফোঁটা তার কানের উপর থেকে গড়াতে গড়াতে লতি অবধি এসে ঝুলতে লাগল। 

চন্দন পকেট থেকে সেন্ট মাখানো রুমালটা বের করে কপাল বরাবর একবার ঘষে নিল। ঘামের ফোঁটাটাও ঝুলতে ঝুলতে তার মাথা ঝাঁকানোয় টপাত করে মাটিতে গিয়ে উড়ে পড়ল। একটা জোরে শ্বাস ফেলে খানিক দম টেনে তারপরে চন্দন বলল , “ঠিকাছে, আমি বাবাকে বলছি। বাড়িটার উপর নিশ্চই কারুর নজর লেগেছে। ফার্স্ট ক্লাস ফেংশুই করে একটা ব্যবস্থা -”

বোসবাবু হাঁটু চাপড়ে বলে উঠল, “আরে ধুত্তোর আপনার ফেংশুই। ওসব চীনা মালে আমাদের কোনো বিশ্বাস নেই। আমি বলি কী -“

বোসবাবু কী বলেন তা শোনার অপেক্ষা না করেই মিসেস সরকারের বাচ্চাটা হঠাৎ ভ্যাঁ করে জোরসে কেঁদে উঠল। বাচ্চাটার গলার জোরও বলিহারি বটে। বোসবাবুর ওই চড়া গলা, শুনলে পরে মনে হয় যেন মাইকের উপর কেউ দু নম্বর একটা ভাঙা মাইক বসিয়ে দিয়েছে, তার গলাকে পর্যন্ত চাপা দিয়ে দিচ্ছে। মালতীর হাসি পেয়ে গেল। 

মিসেস সরকার কীসব বিড়বিড় করতে করতে থাবড়াতে থাবড়াতে বাচ্চাটাকে তড়িঘড়ি বাইরে নিয়ে চলে গেল। মালতীর নিজেরও মাথা ব্যাথাটা বাড়ছিল। পায়ের গুলিতে জ্বালাটা এখন অতটা নেই, কিন্তু এর মধ্যে থেকে থাইটায় আবার কোদ্দিয়ে লম্বা সরু ফালি করে জ্বালা শুরু হয়েছে। এই গত কদিন ধরে তার হচ্ছেটা কী?

মালতী একটু অজুহাত দিয়ে বলল, “আমার মাথাটা খুব ব্যাথা করছে চন্দন। একটা বড়ি নিয়ে আসছি।”

চন্দন খানিকটা কাঁচুমাচু মুখে একবার মালতীর দিকে তাকিয়ে তারপরে আবার কপাল থেকে রুমাল বের করে ঘাম মুছতে লাগল। রুমালের সেন্টের গন্ধটা সত্যিই খুব মিষ্টি। সুযোগ পেলে একবার জিজ্ঞেস করে নেবে নাহয় মালতী কোন কোম্পানির সেন্ট। কিন্তু এখন আর এখানে সত্যিই থাকা যাচ্ছে না। বেরোতে বেরোতে শুনতে পেল বোসবাবু তখনও বলে চলেছে, “-আমি কলকাতায় আমার মেয়ের কাছে চলে যাব। এখানে ভূতের কারবার শেষ হলে তারপরে আবার -“

*** 

ক্লাবঘরটা চৌবাচ্চাটার একদম পিছন ঘেঁষেই। বাইরে একটুখানি ছড়ানো খিলান, একপাশ থেকে চৌবাচ্চার দিকটা দেখা যায়, আর অন্য পাশ দিয়ে কমপ্লেক্সের পিছনের পাঁচিলটা। ওইখানে পাঁচিলের একটুখানি অংশ এখনও মালতীদের পুরোনো বাড়ি থেকে পড়ে রয়েছে। মালতী অন্যমনস্ক হয়ে খানিকক্ষণ সেদিকে তাকিয়ে রইল। একটা বেশ মৃদু হাওয়া দিচ্ছে, তাতে মাঝেমধ্যে চৌবাচ্চার ধার থেকে হাঁসের ডানা ঝাড়ার আওয়াজ ভেসে আসছে। 

মিসেস সরকার খিলানের এক কোণে অন্ধকার মতো বরাবর দাঁড়িয়ে ছেলেকে দুধ খাওয়াচ্ছিল। মালতীর সঙ্গে চোখাচুখি হতে একটা পাতলা হাসি দিল। কী নাম ছিল বেশ আসলে ওনার – অদ্ভূত কী একটা নাম, বিউটি না বাবলি না ওরম কী একটা।

মালতীর খানিক অস্বস্তি হতে লাগল। মিসেস সরকারের শাড়িটা খানিক সরে গেছে, আলো আবছায়ায় মালতী ওর স্তনের আকারটা পরিষ্কার বুঝতে পারছে। মেয়েটার কি কোনো লজ্জাশরম নেই? মালতী মাথাটা একবার জোর করে সরিয়ে নিল।

হঠাৎ চৌবাচ্চার দিক দিয়ে একটা জোরসে হাঁসের আওয়াজ ভেসে এল। তারপরে অনেকগুলো ডানা ঝটাপটির শব্দ, আরো অনেকগুলো প্যাঁক প্যাঁক করে আওয়াজ। “কী যে শুরু হয়েছে”, মালতী আস্তে আস্তে খিলান থেকে সিঁড়ি বরাবর রাস্তায় নামতে নামতে বলল। এখনো একটু খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলতে হচ্ছে মালতীকে, ডাক্তার অবশ্য বলেছে দু তিনদিনের মধ্যেই কমে যাবে আবার।

বিউটি না বাবলি না যাই হোক, এতক্ষণে শাড়িটা আবার ঠিকঠাক করে নিয়েছে, খিলানের ধার অবধি এসে মালতীর দিকে তাকিয়ে মিষ্টি করে একটা হাসি দিল। “আর বলেন কি। ওর বাবা বলছে কদিনের মধ্যেই আমাদের নিয়ে চলে যাবে।”

ল্যাম্পপোস্টের থেকে হলদে আলো খিলানের ছায়া পেরিয়ে মিসেস সরকারের মুখে পড়েছে। সুন্দর চেহারা, মুখটাও মিষ্টিমতো। দুপাটি দাঁত বের করে হাসছে যখন, মালতীর মনে হল তাঁর দাঁতগুলো কেমন ছুঁচালো মত, সামনের শ্বদাঁতগুলো একটু বেশিই যেন লম্বা।

মালতী আর কথা বাড়াল না। বড্ড ক্লান্ত লাগছে। একটু ঘরে গিয়ে গড়িয়ে নিতে হবে। কাল আবার শ্যামা আসবে না বলেছে, বাড়ির কাজও কম না। শ্যামা অবশ্য বলেছে ওর নাকি কোন পিসতুতো দিদি বাড়ি আসবে। কে জানে সত্যিই আসবে কিনা, হয়তো সত্যিই। লোককে বিশ্বাস করা মালতী বহুদিন ছেড়ে দিয়েছে। 

সে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে পা টানতে টানতে বাড়ির দিকে পা বাড়াল।।

(৬)

“একুশ”

“বাইশ”

মালতী চট করে একবার হাতের তাসগুলোর দিকে দেখে নিল। চিঁড়ের গোলাম, চোদ্দ, আর দশ। একবার তাসের থেকে মুখ তুলে চোখ বুলিয়ে চারদিকটা দেখে নিয়ে আবার হাতের দিকে নজর ফেরাল। 

“তেইশ” 

মালতীর উল্টোদিকে বোসগিন্নির গলার মধ্যে দিয়ে কীরকম একটা আঁক করে আওয়াজ বেরিয়ে আসল। মিসেস পাঁজা এক হাতে ডাবল পাওয়ার চশমার মধ্যে দিয়ে তাসগুলো দেখছিলেন, আর অন্য হাতে হুইলচেয়ারের উপর টকাটক করে তুড়ি মারছিলেন। তিনি ডান ভুরুটা একবার নাচিয়ে তুলে নামিয়ে বললেন, “ডাবল”

“রিডাবল”

“মালতী করছটা কী? এই নিয়ে টানা পাঁচ নম্বর দান হারব নাকি!” বোসগিন্নি চেয়ার দুলিয়ে বলে উঠল। মালতী কিছু বলল না। পাখার হাওয়া পেরিয়ে পাশের বসবার ঘর থেকে রেডিওয় গান ভেসে আসছে, “এই রাত তোমার আমার…”। মিসেস পাঁজা আবার আঙুল দিয়ে চেয়ারের কাঠে বেতালে তুড়ি মারা শুরু করলেন। 

অন্যপাশে মিসেস সরকার বাকি তাসগুলো বাটা শুরু করল।

“বন্দনা, ফ্যানটা একটু বন্ধ করে দেবে? ইটস আ বিট চিলি” মিসেস পাঁজা তাস থেকে চোখ না সরিয়েই বলল। বোসগিন্নি একবার টুক করে মিসেস পাঁজার দিকে তাকিয়ে দেখে উঠে ফ্যানটা বন্ধ করে দিয়ে এসে বসল। সাধারণভাবে এই জাতীয় টুকিটাকি ফরমায়েশির কাজগুলো মালতীর ভাগেই পড়ে। আজকে রিডাবল দেওয়ার সুবাদে হোক বা যাই হোক দায়িত্ব খানিক ঘাড় থেকে সরেছে। মালতী একবার তাস থেকে চোখ তুলে চকিতে বাকি তিনজনের মুখটা জরিপ করে নিল।

ফ্যানটা থামায় গানটা আরেকটু ভালো করে ভেসে আসছে। মিসেস পাঁজা চেয়ারে টকাটক থামিয়ে সামনের বাটি থেকে একটা কুড়কুড়ে তুলে নিয়ে দাঁতে চেপে কামড় দিলেন। “জৈষ্ঠ্য মাসে ফ্যান চালাতে হচ্ছে না। স্ট্রেঞ্জ, ওয়োন্ট ইউ সে? ডলি আজ সকালে ফোন করেছিল। বলছিল গ্লোবাল ওয়ার্মিংয়ে নাকি ওয়েদার প্যাটার্ন সব পাল্টে যাচ্ছে। এইসব তারই এফেক্ট।”

ডলি মিসেস পাঁজার ছেলে, আমেরিকার কোথায় একটা থাকে যেন। মালতী কী বলবে ভেবে পেল না। কথা কোনদিকে যাচ্ছে তা তো পরিষ্কার। এই আড্ডায় মালতী আসছে প্রায় চার পাঁচমাস হল। সাধারণভাবে এই আসরে তাকে খুব একটা কিছু জিজ্ঞেস করা হয় না, সেও আগ বাড়িয়ে খুব কথা বলে না, একটু সামলেসুমলেই থাকে। 

বোসগিন্নি চোখ বাগিয়ে কীসব ইশারা করছে, বোধহয় কোন তাস খেলতে হবে সেই নিয়ে। মালতী খুব একটা পাত্তা দিল না। বোসগিন্নি আর থাকতে না পেরে বলে ফেলল, “আমার কত্তা বলেছে, একটা ভালো পুরুত ডেকে এনে যজ্ঞ করতে হবে। চন্দনবাবু বলেছে সব খরচখরচা ওনাদের।”

মিসেস সরকার এক পাশ থেকে যোগ করল, “আজকে তো ফরেস্ট ডিপার্টমেন্ট থেকে লোক এসেছিল। দুটো চারটে গুলি করল, তারপরে খানিক লাঠি নিয়ে কটা পাখি হুশহুশ করে তাড়িয়ে, কয়েকটাকে খাঁচায় ভরে চলে গেল। বলল আবার কাল আসবে নাকি।”

খানিকক্ষণ সব চুপচাপ।

“এই আবার জিতলাম” মিসেস পাঁজা টেক্কা ফেলে তাসগুলো বোসগিন্নির দিকে ঠেলে দিলেন। “ডলি বলছিল ওদের ভার্জিনিয়াতে নাকি অনেক হান্টিং অ্যাসোসিয়েশন আছে। এরকম কাণ্ড হলে ফর ফ্রি এসে শ্যুট করে দিয়ে যাবে।” একটু থেমে মালতীর দিকে ঘুরে বললেন, “মালতী, আমার হট ওয়াটার ব্যাগটা একটু এনে দেবে? বেডরুমে রয়েছে।”

মালতী ঘাড়ের একটা হালকা ঝাঁকুনি দিয়ে চেয়ার ঠেলে উঠল। এই বাড়িটায় এলেই তার কীরকম একটা অদ্ভূত লাগে। সেই ছোটবেলায় ছোড়দি, বুঁচি আর বাড়ির আর সব ছোটদের নিয়ে বড়জ্যাঠা, বড়জেঠি জাদুঘর গেছিল। সেইখানে মমির ঘরটা দেখে খুব অদ্ভূত লেগেছিল মালতীর – মরা মানুষের জন্য কেমন সব পরপর সাজানো, কবে সে ফিরে আসবে তার অপেক্ষা করে থরে থরে ঘটি, বাটি, থালা, ডাঁই করে খাবার নাকি রাখা থাকত। মিসেস পাঁজার ঘরদোর দেখলেও খানিকটা সেরম মনে হয়। ডলি আমেরিকা থাকে বোধহয় অন্তত দশ বারো বছর। বাড়ি ফেরে বছরে একবার, এ বাড়িতেও সে কোনোদিন পাকাপাকি থাকেনি, অথচ ঘর, আলমারি, দেরাজ সবই ডলির জিনিসে ভর্তি। তার ছবি, তার ইশকুলের মেডেল, তার আইয়াইটির নাটকের কাপ, তার ছোটবেলার খেলনা…

ওপাশে রান্নাঘর থেকে টুংটাং আওয়াজ ভেসে আসছে, পুন্নিদিদি বোধহয় মিসেস পাঁজার  রাত্তিরের খাবারের ব্যবস্থা  করছে। মালতী শোবার ঘরের দরজা ঠেলে ঢুকল।

হাতড়াতে হাতড়াতে আলোটা জ্বেলেই মালতী আঁক করে প্রায় চেঁচিয়ে উঠল। লম্বাটে ঘরটার অর্ধেকটাই প্রায় বিছানা দিয়ে জোড়া। আর বিছানার পিছনের জানলাটার ঠিক বাইরে বসে মালতীর দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে রয়েছে একটা শেয়াল। শেয়ালটার মুখে একটা মরা কিছু ঝুলছে। ডানচোখের উপর এত্তবড় একটা কাটা কালো দাগ। সে একদৃষ্টে ঘাড় কাত করে মালতীর দিকেই ঠায় তাকিয়ে রয়েছে। 

“মালতী, ইজ এভরিথিং অলরাইট?” ওঘর থেকে মিসেস পাঁজার গলা ভেসে এল। 

মালতী কিছু বলল না। শেয়ালটা পলক না ফেলে এক নজরে তার দিকে তাকিয়ে রয়েছে, অন্ধকারের মধ্যে কেমন মায়াবী সবজেটে আভা যেন শেয়ালটার চোখে। মালতী চোখ ফেরাতে পারছে না। “মালতী?” মিসেস পাঁজা আবার জিজ্ঞেস করলেন। 

মালতী সম্বিত ফিরে পেল। “হ্যাঁ দিদি।” আস্তে আস্তে মালতী খাট বরাবর সরতে লাগল। শেয়ালটা মাথা ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে সোজা মালতীর চোখে চোখ রেখে তার হাঁটার গতি অনুসরণ করছে। খাটটার বাঁপাশে কোণে একটা ছোট ড্রেসিং টেবিল, তার উপরেই সেঁক দেবার বোতলটা রাখা। মালতী সাবধানে এক হাত বাড়িয়ে বোতলটা ধরে তুলল।

শেয়ালটা একবার ঘাড় ঝাঁকিয়ে মুখ ঘুরিয়ে জানলা থেকে এক লাফে নেমে গেল। আর সেইসঙ্গে হঠাৎ মালতীর মাথা শরীর সব কেমন যেন একসঙ্গে দুলে উঠল, টাল সামলাতে না পেরে মালতী ড্রেসিং টেবিলের কোণাটা ধরে মাটিতে ধপ করে বেকায়দায় বসে পড়ল। একী, উপরের ফ্যানটাও দুলছে কেন? ঘরের কোণের ল্যাম্পশেডটাও কাঁপছে তো। এসব কী হচ্ছে মালতীর সঙ্গে? সে ঠিকাছে তো? হাত থেকে বোতলটা পড়ে খাটের অর্ধেক তলায় চলে গেছে। মালতী খাটের কোণাটা ধরে সামলেসুমলে ওঠার চেষ্টা করছে, এমন সময় রেডিওর আওয়াজ পেরিয়ে পাশের ঘর থেকে মিসেস সরকারের উত্তেজিত গলা ভেসে আসল, “ভূমিকম্প! ভূমিকম্প!”

*** 

ভূমিকম্পটার জোর অবশ্য বিশেষ ছিল না। বোসগিন্নি তো কাঁপা থামতে না থামতেই কিছু না বলে সোজা ছুট দিয়ে বাইরে বেরিয়ে গেছিল। মিসেস সরকার, পুন্নিদিদি আর মালতী মিলে ধরাধরি করে মিসেস পাঁজাকে যতক্ষণে বের করল, ততক্ষণে অবশ্য আর কাঁপুনির রেশমাত্র অবশিষ্ট নেই। এপাশ ওপাশের ফ্ল্যাট থেকে অনেক লোকই বেরিয়ে এসেছে, খানিক ঘাবড়ে এদিক ওদিক দেখছে। খানিক দূরে চৌবাচ্চার ধারে অবশিষ্ট হাঁসগুলো তারস্বরে আওয়াজ করে চলেছে। বাইরে বেশ একটা ঠান্ডা ভাব, খানিক কুয়াশাও সেঁটে বসেছে। 

“জৈষ্ঠ্যমাসে কুয়াশা! ভূমিকম্প!” হুইলচেয়ারটার এক হাতলে হেলান দিয়ে মিসেস পাঁজা স্বগতোক্তি করলেন। “পৃথিবীটার হচ্ছেটা কী!”

“এইসব আমাদের পাপের ফল দিদি”, বোসগিন্নি বোধহয় কাছাকাছিই ছিল। মিসেস পাঁজার গলা শুনে খানিক উসখুস করতে করতে এগিয়ে এসে বলল। মালতী একবার তেরচা দৃষ্টিতে বোসগিন্নির দিকে তাকাল।

মিসেস সরকার খানিক উতলা হয়ে এদিক ওদিক তাকাচ্ছিল। “আমি একবার গিয়ে দেখে আসি আরিয়ান আর উনি ঠিকাছেন কিনা। কী যে কাণ্ড বলুন তো দিদি।”

“হ্যাঁ যাও। তোমার কর্তা আবার যা” মিসেস পাঁজা এক হাতে দু আঙুলে একটা টুসকি মারার ভঙ্গি করলেন। “আর শোনো, বিউটি -“

মিসেস সরকার চলেই যাচ্ছিল, ডাক শুনে আবার ঘুরে দাঁড়ালো। মিসেস পাঁজা বোসগিন্নির দিকে একবার চোখ ঘুরিয়ে তারপরে আবার দুটো আঙুল তুলে বললেন, “থ্যাঙ্ক ইউ, ইয়ং লেডি।”

এই ছোটাছুটিতে পায়ে একটু চাপ পড়েছে, মালতীর পায়ের গুলিটা আবার দপদপ করে জ্বালা করছিল। আর সঙ্গে ডান পায়ের কড়ে আঙুলেও একটা নতুন করে চিনচিনে ভাব শুরু হয়েছে। মালতী একটু ঝুঁকে তাকিয়ে দেখল, কড়ে আঙুলটার গাঁটের ওখানটা কীরকম লাল হয়ে ফুলে গেছে। তাড়াহুড়োতে কোথাও একটা ধাক্কা লেগেছে নিশ্চয়। 

“আমিও যাই দিদি। বাপি ঠিকাছে কিনা একবার দেখে আসি।” মালতী হালকা খোঁড়াতে খোঁড়াতে পা বাড়াল। লোকজন ইতিমধ্যেই আবার ঘরে ঢুকে যেতে শুরু করেছে। কুয়াশাটাও ভালোই সেঁটে বসেছে। ঠাণ্ডা ঠিক নয়, তাও মালতীর একটু শীত শীত করতে লাগল।

(৭) 

পরেরদিন সকালে খবর এল যে কালকের ভূমিকম্পে দু চারটে ফ্ল্যাটবাড়ি খানিক বসে গেছে। স্যান্যালরা সকালবেলা উঠে দেখেছে জানলার পাশের অর্কারিয়া গাছটার পাতা নীচে কার্নিশে ঠেকনা দেবার জায়গায় সোজা জানলা দিয়ে ঢুকে বিছানায় সুড়সুড়ি দিচ্ছে। পুন্নিদিদি একতলার সিঁড়ি জল দিয়ে ধুতে গিয়ে দেখেছে, জল বাইরে বেরোনো জায়গায় সোজা ভিতরে গড়িয়ে যাচ্ছে। পিছনদিকে মালতীর বাবা জ্যাঠার আমলের যে পাঁচিলটা ছিল, সেটাও টাল না সামলাতে পেরে ভেঙে পড়েছিল। মালতী যতক্ষণে গিয়ে দেখল, ততক্ষণে অবশ্য আশেপাশের ছেলেপিলেরা ক্রিকেট খেলবার জন্য পাঁচিলের অর্ধেক ইঁট নিয়ে ইতিমধ্যেই হাপিশ হয়ে গেছে।  

বোসবাবু সকালে উঠেই গাড়ি চাপিয়ে তার কুলগুরুকে উত্তরপাড়া থেকে সোজা নিয়ে এসেছিল। তিনি সব দেখে বললেন বাস্তুভিটেতে শনির নজর লেগেছে। কদিন এখানে না থাকাই ভালো। আর নিতান্তই থাকতেই যদি হয়, সেইজন্যে একছড়া মন্ত্রপূতঃ গাঁদার মালা দিয়ে নির্দেশ দিয়ে গেলেন সবকটা দক্ষিণমুখো ফ্ল্যাটে একখানা করে ফুল রেখে দিতে । আসছে রবিবার তিনি যজ্ঞ করে এই বাস্তুশাপ দূর করে দেবেন।

সেই মালার ফুল বাড়ি বাড়ি দিয়ে আসতে গিয়ে মালতীর পায়ের ব্যাথাটা আরও টনটন করে বেড়ে উঠল। আঙুলের ফোলাটাও কমছে না, থাইতে কাটাটাও ঘষা লেগে জ্বালাজ্বালা করছে। শেষে বিকেলের দিকে যখন মাথাটা আবার দপদপাতে শুরু করল, তখন মালতী আর নিতে পারল না। দরজা বন্ধ করে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে শুরু করল।

ভূমিকম্প হয়েছে বলে আসবে না আসবে না করেও শ্যামা বিকেল করে এসেছিল। চা দিতে দিতে সে অবশ্যি মালতীর ফোলা চোখ লক্ষ্য করেনি এই রক্ষে। বরং কালকের ভূমিকম্প নিয়েই তার উৎসাহ বেশি। “আমি তো টেরই পাইনি গো। ওই ধনার মা দরজা খটখটিয়ে বলল যখন, তখন বুঝলুম। আমি বলি হাই সব্বনাশ, এ কী কাণ্ড বলোতো। ওই সেইদিনই মহাভারত শুনছিলুম, ভীম যখন দুর্যোধনকে এইসান মেরেছিল গদা দিয়ে তখন নাকি আকাশ থেকে উল্কা পড়ছিল, আর ভূমিকম্প হচ্ছিল। আর কলিযুগে তো -“

হঠাৎ পাশের ঘরে বাপি ভীষণ জোরে গোঁ গোঁ করে উঠল। কলিযুগে যে আসলে কী হচ্ছে সেসব শোনবার মেজাজ মালতীর এমনিই ছিল না। “দাঁড়া তোর কাকাবাবুকে একবার দেখে আসি। তুই বোস” বলে মালতী তড়িঘড়ি উঠে গেল। 

এই বিকেল সন্ধের সময়টা বাপি এমনিই ঘুমোয় একটু বেশি। তার উপর গত কাল হঠাৎ করে ঠাণ্ডা পড়ায় বাপির হালকা একটু সর্দিও লেগে গেছে, রাত্তির থেকেই ঘড়ঘড় করে মাঝেমধ্যে কাশছে। এখন অবশ্য ঠিক কাশি নয়, জড়ানো গলায় কীসব বলে চলেছে, আর বিছানায় শুয়েই থেকে থেকে ছটফট করছে। মালতী আলোটা জ্বালিয়ে বাপির মাথার কাছে গিয়ে বসল। একটা হাত আলতো করে ধরল। বাপি বিড়বিড় করে কথা বলছে, মালতীর মনে হল তার মধ্যে মায়ের নামটা দু একবার শুনতে পেল।

“বাপি ও বাপি” মালতী আলতো গলায় জিজ্ঞেস করল। মালতীর হাতের ছোঁয়ায় বাপি একটু শান্ত হয়েছে মনে হল। খাটের মাথা বরাবর অনেকগুলো সুড়সুড়ি পিঁপড়ে সারি দিয়ে বাইছিল। মালতী টুসকি মেরে তাদের বিছানা থেকে ঝেড়ে দিল, কটাকে আঙুল দিয়ে পিষে মারল। 

এমনিতে বাপির সঙ্গে মালতীর সম্পর্ক খুব ভালো এরম কিছু অবশ্যি নয়। নেহাত নিজের বাপ, ফেলে তো দেওয়া যায় না, চাও আর না চাও দেখতে হবেই। লোকে বলে মালতীর মেজাজ নাকি একদম বাপের থেকে পাওয়া। শেষবার এই শরিকি ঝামেলায় বুঁচি আর বুঁচির বর যখন এসেছিল তখন এই কথা কটাই শেষে মুখের উপর বলে বুঁচি চলে গেছিল। মালতীর খুব কষ্ট হয়েছিল। বুঁচি শুধু মেজজ্যাঠার মেয়েই নয়, মালতীর সবচাইতে প্রাণের বন্ধু ছিল। ইশকুলে এক ক্লাসে পড়ত। কত ঢিল ছুঁড়ে জামরুল পাড়া, কত রান্নাবাটি খেলা, সারাদিন পুকুরে দাপাদাপি – কতকিছু একসঙ্গে করেছে তারা। স্ট্রোকের আগে বাপির কেমন রগচটা মেজাজ ছিল, কথায় কথায় মালতীর কতটা গায়ে হাত তুলত, তাও বুঁচি জানে। এমনকি শ্বশুরবাড়ি থেকে বেরিয়েও বাড়ি আসবার আগে মালতী প্রথমে বুঁচির কাছে গেছিল। তাই সেই বুঁচি যখন বলেছিল, তুই তোর বাপের মতোই, শয়তানের পেটে কি আর মানুষের বাচ্চা হয় – তখন খুব কষ্ট হয়েছিল মালতীর। অন্যায় মনে হয়েছিল। মালতীর এরম মেজাজ কি আর এমনি এমনি? অমন মেজাজ না হয়ে উপায় ছিল? শ্বশুরবাড়ি থেকে বেরোনোর পর মায়ের মতো মিষ্টি মিষ্টি করে চললে কি চাকরিটা হত, না জমির ভাগ পেত? জ্ঞাতিরা তো বাড়ি বিক্রির টাকার ভাগ নিয়ে লেঙ্গি মারতে দুবার ভাবেনি! বাপির সঙ্গে নাহয় ঝগড়া, মালতীর কথা একবারও ভেবেছিল কি?

এমনিতে মালতী চিরকালই ছিল মায়ের ন্যাওটা। বাপি চিরকালই খানিক দূরের দূরের। আর মা মরে যাওয়ার পরে তো আরও। কিন্তু তাও আজকে বাপির বসে যাওয়া গাল, খোঁচা খোঁচা দাড়ি মুখটা দেখতে দেখতে মালতীর খুব কষ্ট হল। মায়া লাগল। চোখ ফেটে জল বেরিয়ে আসতে চাইল। আজকে তার এত কান্না পাচ্ছে কেন যে বারবার কে জানে?

মালতী বাপির হাতটা নিজের হাতে নিল। হাত বরাবর সরু সরু শিরা সবুজ হয়ে উঠে আছে। মালতী একটা আঙুল দিয়ে উঠে থাকা শিরাগুলো বরাবর হাত বোলাতে লাগল। ছোটবেলায় মালতীকে পাশে নিয়ে শুয়ে মা যখন ভাবত সে ঘুমিয়ে পড়েছে, তখন চোখ পিটপিট করতে করতে মাকে বারকয়েক এইভাবে বাপির হাত বরাবর হাত বুলাতে দেখেছিল মালতী। ব্যাস ওইই। ওর বাইরে বা ওর বেশি কিছু বাবা মায়ের মধ্যে কোনোদিন দেখেনি মালতী, অন্তত মনে তো পড়ে না।

বাপির হাতটা উলতে দেখলো মালতী। নখগুলো বেশ বড় হয়েছে, কালচে হয়ে গেছে। শ্যামাকে বলতে হবে কালকে কেটে দিতে। কিন্তু হাতগুলো, হাতের আঙুলগুলো ভালো করে দেখতে গিয়ে মালতী অস্ফুটে একটা ঢোক গিলে ফেলল।  বাপির নখের তলায় কালো কালো ময়লা ভেবেছিল যেটা, সেটা আসলে সবুজ, শ্যাওলার মতো। বাপির নখের গায়ের চামড়া থেকেই গজিয়েছে। মালতী একটু আঙুল দিয়ে খোঁটার চেষ্টা করল। “শ্যামা, এই শ্যামা।” 

“যাই দিদি”

মালতী এতক্ষণ লক্ষ্য করেনি, কিন্তু বাইরেও যেন বেশ লোকজনের গলার আওয়াজ শোনা যাচ্ছে। একটা কেউ বেশ হেঁড়ে গলায় চেঁচাচ্ছে। মালতী শ্যাওলা খুঁটতে খুঁটতে খানিক অন্যমনস্ক হয়ে পড়েছিল। এমন সময়ে হঠাৎ পাশে বাপিও কেমন আঁক আঁক করে তারস্বরে চেঁচাতে শুরু করল। চেঁচাতে চেঁচাতে আছাড়িপিছাড়ি করে উঠে বসে কলতলার দরজাটার দিকে দেখিয়ে অবোধ্য জড়ানো কথায় কীসব বলতে শুরু করল।

“কী হয়েছে? কী হয়েছে?” বলতে বলতে মালতী বাপির আঙুল অনুসরণ করে দেখল, কলতলার দরজাটা আলতো ফাঁক করে রাখা, আর সেই বরাবর উঁকি দিচ্ছে একটা শেয়াল। তার কপালে ডান চোখের উপরে একটা কালো কাটা দাগ।

“দিদি, সব্বনাশ হয়ে গেছে” শ্যামা ঝড়ের বেগে ঘরে ঢুকতে ঢুকতে বলল, “এই রামধন বলল, বিউটিদিদির বাচ্চাকে নাকি শেয়ালে তুলে নিয়ে গেছে। চৌবাচ্চার ধারে বেঞ্চির উপর বাচ্চা রেখে বিউটিদিদি একটু দূরে দাঁড়িয়েছিল, আর তখনই নাকি কোথা থেকে হুশ করে একটা শেয়াল এসে বাচ্চাটাকে সোজা হিড়হিড় করে টানতে টানতে নিয়ে গেছে।”

শেষ কথাগুলো বলতে বলতে শ্যামা প্রায় কেঁদে ফেলেছিল। মালতী একবার তার মুখের দিকে, একবার দরজার দিকে তাকাতে তাকাতে ফট করে উঠে দাঁড়ালো। দরজাটার পিছনে শেয়ালটাকে আর দেখা যাচ্ছে না। বাপির ঘরে বিছানার পাশেই পেরেক থেকে সারাক্ষণ একটা টর্চ ঝোলে, সেখানা তুলে নিয়ে শ্যামাকে বলল, “তুই কাকাবাবুকে দ্যাখ, আমি এক্ষুণি আসছি।”

“কোথায় যাচ্ছ দিদি?” মালতী কলতলার দরজাটা ফাঁক করে খোঁড়াতে খোঁড়াতে বাইরে বেরোচ্ছিল। একবার পিছনে তাকিয়ে কোনো উত্তর দিল না। 

কলতলার দরজাটা দিয়ে বেরোলে কমপ্লেক্সের এপাশের বাড়িগুলোর পিছন দিয়ে একটা পায়ে চলা সরু রাস্তা আছে। বেশিরভাগটাই ঝোপঝাড় জঙ্গলে ঢাকা। কুয়াশাটা সন্ধের মধ্যে বেশ ভালোই গাঢ় হয়ে এসেছে।  টর্চ ফেললে  সামনে কম সাদা ধোঁয়া বেশি দেখা যাচ্ছে। তার মধ্যে দিয়েই মালতী দেখল ওপাশে একটা ম্যালেরিয়া পাতার ঝোপে খানিক আড়াল করে শেয়ালটা দাঁড়িয়ে আছে। মালতীকে দেখেই আবার মাথা ঘুরিয়ে খানিক ছুট দিল। চারপাশে কেউ নেই। মালতী টর্চের আলো ফেলে হাতড়ে হাতড়ে যথাসম্ভব তাড়াতাড়ি এগোতে লাগল।

শেয়ালটার অবশ্য বিশেষ তাড়া আছে বলে মনে হচ্ছিল না। সে যেন খেলা করছে মালতীর সঙ্গে। সে খানিকটা করে এগোয়, আর পিছন ফিরে ফিরে মালতীর দিকে তাকিয়ে দেখে। আবার মালতী খানিক ধরে ফেললে মাথা ঘুরিয়ে আবার ছুট দেয়। মালতী পাঁচিল ধরে ধরে জঙ্গুলে লতা ডিঙ্গিয়ে, গাছের ঝুলতে থাকা ডাল, মাকড়সার জাল সরিয়ে এগোতে লাগল। 

সোজা এগোতে এগোতে ভাঙা পাঁচিলের কাছে যতক্ষণে এসে পৌঁছাল, ততক্ষণে অবশ্য আর শেয়ালটাকে দেখতে পেল না। এইদিকটা বেশ অন্ধকার অন্ধকার। পাঁচিলটা পেরিয়ে এক দু টুকরো প্লট এখনও জলা জলা মতো, এক আধবার মাটি ফেললেও গোটাটায় বাড়ি ওঠেনি। তারপরেই ওপাশের নতুনপাড়া শুরু। মালতীর ছোটবেলায় অবশ্য পাঁচিলটার ওপাশে গোটা যতদূর চোখ যায় ততদূর জলা ছিল। গরমকালে শুকিয়ে আসত, আর বর্ষা পড়লেই যত সাপ ব্যাঙের উৎপাত। ভরা বর্ষায় এমন উপচে জল উঠে আসত, উঠোনে বাটি নিয়ে মাছও ধরেছে কতবার বুঁচি, ছোড়দি আর মালতী। পাঁচিলের ডানপাশটাতেও ওদের বাড়িটার পরে একটুখানি জমি ছিল, আর বাকিটা গোটাটাই কচুরিপানা আর নালিঘাসে ভরা। 

মালতী এদিক ওদিক তাকাতে লাগল। একদম সামনে থ্রি সি। এটারই একতলাতে বাটরাদের ফ্ল্যাটটা, যেখান থেকে এই কদিন আগেই এত্তবড় অশ্বত্থের চারাটা উপড়ে ফেলেছিল মালতী। তা সে বাটরারা নেই সত্যি, কিন্তু তা বলে গোটা বাড়িটার একটা তলাতেও আলো জ্বলছে না কেন? এদিক ওদিক তাকাতে তাকাতে আস্তে আস্তে মালতী ফ্ল্যাটটার দিকে এগিয়ে গেল।

ফ্ল্যাটবাড়ির দরজাটা একেবারে হাট করে খোলা। টর্চের আলো ফেলে এদিক ওদিক দেখতে দেখতে মালতী ঢুকে পড়ল। আলোর স্যুইচটা টিপে দেখল আলো জ্বলছে না। হঠাৎ তারস্বরে ঝিঁঝিঁর শব্দ শুরু হয়েছে। কোথা থেকে আওয়াজটা আসছে মালতী কান পেতে বুঝতে পারল না ঠিক। বাইরে থেকেই নিশ্চয়। সিঁড়িতে আলো ফেলে যতদূর উপরে চোখ যায় শেয়ালটাকে দেখতে পেল না বটে, তবু মালতীর মনের মধ্যে কী যেন মনে হল এখান দিয়েই উঠতে হবে।

একটা চাপা ভয়ে উত্তেজনায় মালতীর পায়ের ব্যাথাটাও প্রায় ভুলে গেছিল। এই পায়ের সমস্যা নিয়ে সিঁড়ি দিয়ে ওঠা অবশ্য অত সোজা না। তাও মালতী সাবধানে আলো ফেলে ফেলে উঠতে লাগল। চারপাশে একটা তলা থেকেও কোনো আওয়াজ আসছে না। পাওয়ার কাট যদি বা হয়, লোকের গলার আওয়াজ তো অন্তত শুনতে পাওয়ার কথা। কিন্তু নিজের বুকের ঢিপঢিপ, পায়ের আওয়াজ আর ঝিঁঝিঁর ডাক ছাড়া আর কিছুই বিশেষ আনে আসছিল না। বাইরের কারুর হাঁকডাকও আর আসছে না।

মালতী পায়ে পায়ে একেবারে ছাদ অবধি উঠে গেল। ছাদের দরজাটারও একটা পাল্লা খোলা। ভারী কুয়াশা ফাঁকা পাল্লা দিয়ে পাক খেয়ে ভিতরে ঢুকে আসছে। ছাদের দরজা দিয়ে বেরিয়েও চট করে এদিক ওদিক মালতী খুব একটা কিছু দেখতে পেল না। 

এই থ্রি সি টা গোটা কমপ্লেক্সের সবগুলো বাড়ির মধ্যে প্রথম তৈরি হয়েছিল। মালতীর উঁচুতে খুব ভয়। তাও থ্রি সি টা যেদিন প্রথম ছাদ ঢালাই হয়েছিল, ন্যাড়া ছাদ তখনও, মনে আছে ছাদ অবধি উঠে চারপাশটা দেখতে দেখতে শিউরে উঠেছিল। নীচে দাঁড়িয়ে যা তখনও বুঝে উঠতে পারেনি, আশি ফুট উপর থেকে তা দিব্যি স্পষ্ট দেখতে পেয়েছিল। নন্দনপুরের বিস্তীর্ণ জলাটা মাটি ফেলে সমান হয়ে গেছে, ইতিউতি ইঁট বালির স্তূপ। কোথাও কোথাও পিলার উঠে গেছে, একটা আধটা তলা ইতিমধ্যেই তৈরি। দূরে দুটো লোক অবশিষ্ট জলা থেকে কচুরিপানার ঝোপ উপড়াচ্ছে। আর একটা লোক কাটা গুঁড়িগুলো থেকে ডালপালা ছাঁটছে। এরম হয়, হয়তো হতেই হবে, তা মালতী জানে, তখনও জানত। কিন্তু তাও কি আর মন মানতে চায়? চারপাশে উপড়ানো কচুরিপানার স্তূপ, আঁশফল আর জামরুল গাছটার স্তূপ স্তূপ করে রাখা কাঠের টুকরোর সারি দেখতে দেখতে কান্না পেয়ে গেছিল। মনে হয়েছিল ওই প্রতিটা উপড়ানো কচুরিপানার সঙ্গে, গাছের এক একটা ডালের সঙ্গে তার ছেলেবেলাগুলো যেন এক এক করে উপড়ে আসছে। ইশকুলে পড়তে মালতী উত্তরের পাহাড়ে একটা আন্দোলনের কথা শুনেছিল। মেয়েরা জঙ্গলের গাছ কাটতে দেবে না বলে গাছ জড়িয়ে দাঁড়িয়ে পড়েছিল নাকি। সেরকম মালতীরও মনে হয়েছিল, যদি সে সাধের আঁশফল গাছটাকে জড়িয়ে অন্তত দাঁড়িয়ে পড়তে পারত। কিন্তু গাছগুলো যদি বা বাঁচত, এই বিশাল জলা, এই পাঁক ঘেঁটে পোকা খুঁজতে থাকা কাদাখোঁচা এদের কী হত? কে বাঁচাত এদের? 

আর এই জলাটা বাঁচানো যেত যদি, যদি বাড়িসমেত জমি সমেত গোটা জলাটা বিকিয়ে না দেওয়া হত, তাহলে মালতীর মাও বাঁচত কি? বা তাদের ভাইবোনেদের সম্পর্ক? হয়তো বাঁচত। বা হয়তো না, কে জানে। এই জগতে কীসে যে কী বাঁচে, আর ভগবান কোন যুক্তিতে কার জন্যে যে চলেন, কাকে যে বাঁচান আর কাকে যে মারেন, তা মালতীর মতো সামান্য মানুষের বোঝার কি সাধ্যি? তবু মনে কি আর হয় না? তার সামান্য কেয়ারটেকারের জীবন বিশাল মহাজগতের তুচ্ছাতিতুচ্ছ খণ্ড হোক, সেও কি সেই বিশাল জালের অংশ নয়? মালতীর ইচ্ছা, মনের বাসনা, শখ আহ্লাদ চাওয়া পাওয়ার কি সেখানে কোনো মূল্যই নেই?

কুয়াশাটা একটু পাতলা হয়ে এসেছিল। হঠাৎ চকিতে একটা আওয়াজ শুনে মালতী ঘুরে তাকাল। পিছনে জলের ট্যাংকির কাছটায় সেই কাটা চোখ শিয়ালটা দাঁড়িয়ে, এক মনে তার দিকে তাকিয়ে রয়েছে। কিন্তু সে একা নয়, তার পাশে মাটিতে জড়ো হয়ে বসে আরেকখানা শিয়াল, তার সামনে ইয়া গুঁড়ি গুঁড়ি তিন চারটে বাচ্চা, অনেকটা কুকুরছানার মতো দেখতে। মা শিয়ালটা কী একটা ছিঁড়েখুঁড়ে খাচ্ছে, টর্চের আলোয় তার লম্বা শ্বদাঁতদুটো আলগা বেরিয়ে আছে মনে হচ্ছে, মুখটা রক্ত রক্ত লেগে রয়েছে। মালতী আলো ফেলতে সে এক মুহূর্ত তার দিকে স্থির চোখে তাকিয়ে রইল, তারপরে আবার মুখ নামিয়ে খাওয়ায় মন দিল। 

মালতীর বমি পাচ্ছিল। শেয়ালটা যেটা খুঁটে খাচ্ছে সেটা হুট করে দেখে খানিক মানুষ মানুষ মনে হল, হয়তো একটা বাচ্চার মতো। দ্বিতীয় একবার মুখ ফিরিয়ে দেখতে আর সাহস হল না। মাথার দপদপানিটা হঠাৎ করে আবার দুগুণ জোরে ফিরে এসেছে, এবার ছিঁড়েখুঁড়ে যাবে মনে হচ্ছে। হাত পায়ের জ্বালাগুলোও গত আধ ঘন্টার উত্তেজনায় ভুলে ছিল, সেগুলোও হঠাৎ আবার করে পুরোদমে ফেরত এসেছে। চোখ খুলে থাকা কঠিন বোধ হচ্ছে। চোখে কাটা শেয়ালটা আবার সিঁড়ির কাছে পৌঁছে গেছে। একবার লেজ উঠিয়ে মাথা ঘুরিয়ে মালতীর দিকে তাকিয়ে, আবার তরতর করে সিঁড়ি দিয়ে নামতে শুরু করে দিয়েছে। 

মালতী মেয়ে শিয়ালটার দিকে আরেকবার তাকিয়ে দেখবার ইচ্ছে দমিয়ে, জোর করে সামনের দিকে নজর ফেলে আবার টর্চ ফেলে সিঁড়ি ধরে নামার চেষ্টা করতে লাগল। মাথাটা খালি খালি লাগছে। পায়ের গুলিটায় এমন যন্ত্রণা করছে, এক একটা করে পা ফেলাই দায় বলে মনে হচ্ছে। ঝিঁঝিঁর ডাকটা এতক্ষণ কমে গেছিল, এখন আবার বাড়তে শুরু করেছে। 

নামতে নামতে দোতলা অবধি যতক্ষণে পৌঁছাল, ততক্ষণে অবশ্য মালতী বুঝতে পারল, ঝিঁঝিঁর ডাকটা আসলে কোথা দিয়ে আসছে। বাইরে থেকে বা অন্য কোথাও থেকে না, সেটা আসছে বাটরাদের একতলার বন্ধ ফ্ল্যাটটা থেকে। শেয়ালটা ফ্ল্যাটের দরজা অবধি পৌঁছে একবার গা ঘষে নিয়ে খানিক দূরে সরে দাঁড়াল। মালতী খানিক হোঁচট খেতে খেতে ফ্ল্যাটের দরজাটা অবধি পৌঁছে গেল। ফ্ল্যাটটার দরজাটা আলতো করে ভেজানো। তবে বন্ধ না। একটা মৃদু জুঁইফুলের সুবাস আলতো করে দরজার ওপাশ থেকে ভেসে আসছে। দরজাটা ঠেলে খুলতে গিয়েই হালকা সুবাস বেড়ে মালতীর নাকে ভক করে পচা পাঁক আর জুঁইফুলের এক দমকা মেশানো গন্ধ ভেসে এসে প্রায় শ্বাস রোধ করে দিল। ঝিঁঝিঁর শব্দে এখন আর কান পাতা যাচ্ছে না। ঘরের ভিতর পা পড়তেই পচ করে একটা আওয়াজ। টর্চের আলোয় মালতী তাকিয়ে দেখল মেঝেভর্তি একদলা কাদা, তার মধ্যে স্যান্ডেল সুদ্ধু মালতীর পা আধ ইঞ্চি মতন ডুবে গেছে।

মালতী আর চোখ খুলে রাখতে পারছে না। পা টা অসম্ভব জ্বালা করছে। থাই ফুঁড়ে মনে হচ্ছে কী একটা যেন বেরিয়ে আসছে। মালতীর হাতে যেন আর জোর বাকি নেই একটুকুও, দরজাটা ধরে কোনোরকমে দাঁড়াতে গিয়ে হাত থেকে তার টর্চটা কাদার মধ্যে পড়ে নিভে গেল। 

অন্ধকারের মধ্যে চোখে আর কিছুই দেখতে পাচ্ছে না বটে, আরেকটু এগিয়ে চারপাশে হাতড়ে একটা দেওয়ালও পেল না, কিন্তু গন্ধটা যেন মালতীকে সোজা টেনে নিয়ে যাচ্ছে। এগোতে এগোতে মালতী গন্ধগুলোর মধ্যে আরো পরতে পরতে নানা ভাগ খুঁজে পাচ্ছে যেন। একটার তলায় আর একটা। 

মায়ের খোঁপার জুঁইফুল। বর্ষাশেষের পচা পাঁক। জৈষ্ঠ্যের দুপুরে গাছে ছাওয়া পুকুর। গল্প বলতে বলতে ছোড়দির বগলের ঘাম। শীতের রাত্তিরে মায়ের শরীরের ওম। আলমারি থেকে বের করে সদ্য ভাঁজ খোলা পরিষ্কার ফুলফুল চাদর। শোবার ঘরটার ড্যাম্প। 

মালতী নিজের গালে একবার হাত দিয়ে দেখল গালদুটো ভিজে, সে আপনমনেই কখন কাঁদতে শুরু করেছে।

(৮) 

মিসেস সরকারের ছেলেকে খোঁজার চক্করে মালতী যে বাড়ি ফেরেনি সেটা সেইদিন রাত্তিরে কেউ বুঝে উঠতে পারেনি। পরেরদিন সকালে শ্যামা এসে চেঁচামেচি করায় কমপ্লেক্সের লোকজনের সবার খেয়াল হল যে শুধু আরিয়ান না, তার সঙ্গে সঙ্গে মালতীকেও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। বাসিন্দারা অনেকেই কেউ মাঝরাত্তিরেই, কেউ ভোরবেলা উঠে তল্পিতল্পা গুটিয়ে নন্দনকানন অ্যাপার্টমেন্ট কমপ্লেক্স ছেড়ে চলে গেছিল। পুলিশ এসে পড়লে পরে সাহস করে বাকি যারা যারা ছিল, তারা মিলেই এদিক ওদিক দুজনের খোঁজেই বেরোল। এ তল্লাটে দু চারটে পুকুর যা ছিল সেখানে জাল পড়ল, শেয়াল ধরার জন্য বনদপ্তরও এসে পোঁছালো। 

প্রায় সবকটা ফ্ল্যাটবাড়িই রাতের মধ্যে আরো খানিক মাটিতে বসে গেছিল। অর্কারিয়া গাছ স্যান্যালদের খাটের জায়গায় পাখায় সুড়সুড়ি দিতে শুরু করল। মিসেস পাঁজার ফ্ল্যাটের ঢোকার রাস্তাটা নেমে গিয়ে এমন অবস্থা দাঁড়াল যে কুঁজো হয়ে ঘাড় নীচু না করে ভিতরে ঢোকবার উপায় রইল না। মন্ত্রপূতঃ গাঁদাফুলে কাজ হয়নি শুনে বোসবাবুর কুলগুরু সকাল থেকে ফোন ধরা বন্ধ করে দিলেন। পাকচক্রে থ্রি সির বাসিন্দারা কেউই আগেরদিন বাড়ি ছিল না। চারপাশ খুঁজে অন্যান্য বাড়িটাড়িগুলো দেখবার পর থ্রি সি টা দেখতে তাই একটু দেরিই হয়ে গেছিল।

গেটের সিকিউরিটি রামধনের মুখে বাটরাদের বন্ধ ফ্ল্যাট থেকে জুঁইফুলের গন্ধ আসছে এইটা শোনার পর অবশ্য নবনীতা, শ্যামা আর দুজন পুলিশ সমেত জনা সাত আটজন সদলবলে থ্রি সির বাড়িটা দেখতে গেল। বাটরাদের দরজাটা কোনো এক কারণে তালা দেওয়া ছিল না, তাও খুলতে বেশ বেগই পেতে হল। খানিক ধাক্কাধাক্কিতে খুলে অবশ্য কারণটা পরিষ্কারই বোঝা গেল। গোটা ফ্ল্যাটটা মেঝে, দেওয়াল, ছাদ বরাবর বাইতে থাকা লতায়, ম্যালেরিয়া পাতার ঝোপে ভরে গেছে। সেই লতার জাল ডালপালা বাড়াতে বাড়াতে দরজার কব্জা পর্যন্ত জ্যাম করে রেখে দিয়েছে। কাটারি দিয়ে লতা কেটে, কাদা প্যাচপ্যাচে মেঝে ডিঙিয়ে ভিতরে গিয়ে অবশ্য এক অদ্ভূত দৃশ্য চোখে পড়ল। 

ঘুলঘুলির ফাঁক দিয়ে অল্প আলো এসে পড়ছিল, তাইতে দেখা গেল খাবার ঘরটার অজস্র লতা, নলখাগড়ার ঝোপের মধ্যে দেওয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে বসে রয়েছে মালতী। মালতী বলে চিনতে যদিও তাকে বিস্তর বেগ পেতে হয়। তার গায়ের রঙ নানা জায়গায় কালচেটে হয়ে গেছে। শাড়ি ফুঁড়ে তার থাই থেকে, পায়ের কড়ে আঙুল থেকে, বাঁ পায়ের গুলি থেকে, হাতের ডিম থেকে, কনুই থেকে, নানা জায়গা থেকে চামড়া ফুঁড়ে ছোটো খাটো নানা চারাগাছ গজিয়েছে। মালতীর গায়ের শিরা সবজেটে উঁচু হয়ে গাছগুলোর শিকড়ের সঙ্গে মিশে গেছে। তার কপালের ডানদিকটা খানিক সবজেটে বাদামি রঙ ধারণ করেছে, আর সেখানে ফুলে ওঠা শিরাগুলো থেকে একটা ছোটখাটো জুঁইগাছ উঠতে শুরু করেছে, তার ডালভর্তি থোকা থোকা সাদা ফুল। 

মালতীর হাতদুটো দুপাশে ছড়ানো, চোখদুটো অর্ধোন্মীলিত, তার মুখে মৃদু একটা হাসি। সে যেন ভারী মজার কোনো একটা স্বপ্ন দেখছে।  

শেয়ার করুন

Leave a Comment

Your email address will not be published.