একঘণ্টার ভাবনায় প্রতিমা যেভাবে বাঁচতে চাইছিল

বাপির কাটা মাথা ভেসে ওঠে। ‘সিলি হাওয়া ছুঁ গ্যয়ি, সিলা বদন ছিল্‌ গ্যয়া’ গানটা ভেসে আসছে। বাবুদা রেডিও শোনে এখনও। ক্ষয়া ক্ষয়া রেডিওর গায়ে আশি দশক থেকে ধুলো জমেছে। সুরেলা আওয়াজও তাই ধুলোমাখা ধূসর হয়ে আসে। ভাঙা ভাঙা। এসব সারাবে না কেউ আর। ‘বেচে দাও বাবুদা, ভাল ফোন কেনো একটা’- এই অনুরোধের আসরে পাত্তা না দিয়েই বাবুদা চা পাতা ফোটায়। বাবুদার দোকানে উঠে যাওয়া গেঞ্জিকলের সুতো লেগে থাকে। ভেঙে যাওয়া ভেপার ল্যাম্পের ফিকে আলো ছড়িয়ে থাকে। বাবুদার দোকানে এখনও তৃণমূল বা বিজেপির পতাকা লাগানোর ধক দেখায়নি কেউ। অথচ পাঁচটা দশের চা খেতে খেতে শ্যামল, বলাই, অমররা বাবুদার দোকানের পতাকা পাল্টে দেওয়ার আলোচনা করছে অনেক বছর ধরেই। প্রত্যেক পাড়াতেই একটা-দু’টো এমন দোকান থেকে যায়। রেডিওর নব্‌ ঘোরে, পছন্দের স্টেশন। সন্ধ্যের মুখে ‘সিলি হাওয়া’ ছুঁয়ে যায়। শরীরে আনচান করে ফ্রিকোয়েন্সি মিলে গেলে। প্রতিমা বাপির মাথাটা দুলতে দেখে। সারা শরীরে কোত্থাও কোনও আঘাতের দাগ নেই। ক্ষত নেই। শ্মশানে যখন বাপির বডিটা বাঁশের চ্যাঁচাড়িতে শোয়ানো হল, টুপ ক’রে মাথাটা আলাদা হয়ে গেল। “ইশ, সেলাই করেনিকো ভাল ক’রে”, “পোসমটেমের ডোমগুলো শালা পয়সা নেয়, কাজ করে না”। প্রতিমা কাঁদতে কাঁদতেও আঁতকে উঠেছিল মাথা পড়ে যাওয়া দেখে। হঠাৎ ‘মা’ বলে প্রতিমাকে আঁকড়ে ধরেছিল মিন্টু। মিন্টুরও ওই আতঙ্ক থেকে যাবে সারাজীবন, প্রতিমা জানে। মিন্টু এখনও শুয়ে। গাঢ় ঘুম, লালা পড়েছিল কষ বেয়ে, শুকিয়ে গেছে। মুখে আঙুল। পাঁচটা সতেরো। বাবুদার দোকান থেকে চা আনবে’টাকার চা- বাবা মা আর প্রতিমা। অবশ্য প্রতিমা আরও একবার চা খাবে মাসিমার বাড়িতে। পরে সেনজ্যেঠুর বাড়িতে সন্ধ্যের রুটি তরকারি। ওঃ, আজ সেনজ্যেঠুর নাতজামাই আসবে। লুচি আর সাদা আলুর তরকারি। মিন্টুর জন্যে যদি চারটে লুচি দেয়… ওদের মন ভাল। ভাল কিছু রান্না হলে মিন্টুর জন্যে একটু দিয়ে দেয়। নাঃ, পাঁচটা কুড়ি। ‘তেরে ব্যাগ্যায়র দিন না জ্ব্যলে… তেরে ব্যাগ্যায়র শব্‌ না বুঝে’ লতার গলা লস্করপাড়ার বিকেলকে সন্ধ্যে ক’রে দিল। গলা। বাপির কাটা গলা আবার ভেসে উঠতেই খাট থেকে নেমে আলো জ্বালালো প্রতিমা। বাপির এত প্রিয় গান ছিল এটা! প্রতিমাকে গাইতে বলত খালি…

 

#

-নমস্কার বন্ধুরা। আপনারা ব্যাক টু ব্যাক শুনলেন লতাজি আর আশাজির গাওয়া দু’টো রোম্যান্টিক গান। আমরা কথা বলছিলাম ঊইমেনস্‌ ডে নিয়ে। আর ঠিক একমাস পরেই ঊইমেনস্‌ ডে। কীভাবে সেলিব্রেট করার প্ল্যান আপনার? জানান আমাদেরফোন করুন ৮৬১৭২৩

-এই নাও, প্রতিমা। গ্লাসে ঢেলে দিয়েছি। ক্কী হল? আজ কাজে যাবেনা?

সেনজ্যেঠুর মেয়ে পরশুদিন ফোনে বলছিল- ‘ওয়ার্কিং ঊইমেনস্‌ ডেতে ছুটি না, না। শুধু ঊইমেনস্‌ বলবি না। ওরা ওয়ার্কিং শব্দটা বাদ দিতে চায়’… প্রতিমা তখন আটা মাখছিল। ন’টা রুটি হবে। জ্যেঠু তিনটে। জ্যেঠি আর দিদিমণি দু’টো ক’রে। প্রতিমা দু’টো রুটি বাড়িতে আনে। সেদিন ফ্রিজ থেকে চকোলেট আর একটা বোতল বের করতে এসেছিল দিদিমণি। ফোন কানে দিয়ে। তখনই ওই কথাগুলো কানে আসে প্রতিমার। প্রতিমাও তো ওয়ার্কিং। বাপি রেলে গলা দেবার পরে সেনজ্যেঠু আর জ্যেঠি দুঃখ করেছিল। ‘ইশ, স্যুইসাইড করল?! এভাবে পথে বসিয়ে দিয়ে গেল… অবশ্য তুমি ওয়ার্কিং ওম্যান, সামলে নেবে… তবু’। সকালে দু’টো বাড়ি। একটায় রান্না। আরেকটায় বাসনমাজা আর ঘর মোছা। সন্ধ্যেয় দু’টো। দু’টোই রান্নার। দুপুরে দেড় ঘণ্টা লেবু-লঙ্কা বাঁধার কাজ। আচ্ছা, ওই ঊইমেনস্‌ ডেতে ছুটি পাবে? বোসবাড়িতে একদিন না গেলেই মাইনে কাটে। লেবু-লঙ্কার কাজে পয়সা দেয় না দিনের দিন ডেলিভারি না দিলে। প্রতিমার টাকার দরকার…

-না, বাবুদা। আজ মিন্টুও খাবে অল্প। বাবুদার কথায় খেই ফেরে প্রতিমার। ধুস, ওয়ার্কিং হচ্ছে দিদিমণি, কত বড় চাকরি করে। সেনজ্যেঠি চাকরি করত, ইস্কুলে। প্রতিমা লজ্জা পেল। ও তো কাজ করে। ওর আবার ছুটি কী? গেল হপ্তার বিষ্যুদবারে মিউনিসিপ্যাল অফিসে সারাদিন চলে গেছিল। সন্ধ্যেয় খুব গা ম্যাজম্যাজ… না, ম্যাজম্যাজ না, ব্যথাই করছিল। সেনজ্যেঠিও মুখ ফুলিয়েছিল একটু। দিদিমণি অফিস থেকে ফিরে টিফিন পায়নি সময়ে। এই হপ্তায় আর কামাই চলবে না

-কর্পোরেশন অফিসের কাজটা হল? অমর কিছু বলল?

-না, বাবুদা। জানিনা এখনও। যাই আমি। মা চা পায়নি, মাথা ধরবে আবার…

প্রতিমা আঙ্গুলে আঁচল জড়িয়ে গ্লাসটা ধরে। ঠিক তেইশ পা হাঁটলেই ঘর। দশ পা হাঁটতেই আড়চোখে দেখে বাবুল ঠিক তাকিয়ে আছে। ওর বুকের দিকে। আঁচল দিয়ে গ্লাসটা ধরার সময় একটু সরে গেছিল। ক্লাবঘরের সামনে টুল পেতে বসে। বাপির রুটেই অটো চালায়। তবে, নিজের অটো। ভাড়ার নয়। বাপির সঙ্গে দোস্তি দেখাত খুব। বাপিকে সাট্টার ঠেকে বাবুলই প্রথম নিয়ে গেছিল।

-এত নেশা তোমার? লজ্জা করে না? ধার ক’রে জুয়ো খেলছ?

-ধার করেছি বলেই তো খেলছি। ধারের টাকা ফেরত দিতে হবে।

-সাট্টা খেলে বড়লোক হবে? লটারি খেলে গাদা টাকা উড়িয়েও সাধ মেটেনি?

-চুপ। তোর টাকা পেলেই তো হল? বাড়তি কথা বলবি না

-ওই সাট্টাতেই মরবি তুই। ছেলের পড়ার টাকা বাকি। দু’হপ্তা মাছ আসেনি। গলা তুলিস তুই?

প্রতিমা আর বাপির ঝগড়া মেটাতে পাশের ঘর থেকে বদা আর বদার বৌ এসেছিল। ওদের উঠোন ঘিরে আটটা ঘর। বাপিদের দু’টো। বদাদের একটা। পাগলীদের একটা। ওরা সবাই ভাড়া থাকে। বাপিদের মাসে সাড়ে সাতশো। তিনটে ঘর মিলিদের। একটা ঘরে আবর্জনা ডাঁই হয়ে থাকে। বিছে বেরোয় বর্ষায়। এত কম ভাড়া ছেড়ে যেতে পারে না। বুড়ো শ্বশুর শাশুড়ি। নইলে কবেই… বাবুলের চোখ গেলে দিতে ইচ্ছে হলেও উপায় নেই। অমরদার সঙ্গে বাবুলের গেলাস পাল্টাপাল্টি হয়। প্রতিমা একবার কর্পোরেশনের কাজটা পাক। শ্বশুর শাশুড়ি মরুক। তারপর ঠিক চলে যাবে। মাসে চার দেওয়ার কথা, সকালে চারঘণ্টার কাজ। ঝাঁট দেওয়ার। ওটা বলেক’য়ে সাড়ে চার করাতে পারলে সকালের রান্নার কাজটা ছেড়ে দেবে। সন্ধ্যেয় আরেকটা হাল্কা রান্নার কাজ ধরে নেবে। সাড়ে চার আর আড়াই আর দেড়… কর গুণে দশ হাজারে পোঁছানোর চেষ্টা করছে প্রতিমা।  

-আমি আজ যাব না পড়তে।

-কেন? শরীল খারাপ তো না। দশ হাজারের গুনতি ঘেঁটে যাওয়াতেই প্রতিমা বিরক্ত। আমি সোরাগলির মুখ অবধি ছেড়ে দেব। একা ফিরবি আজ, আমার দেরি হবে।

-টাকা চেয়েছে দিদি। তোমাকে দেখা করতে বলেছিল আজ।

মিণ্টুর অভিমানে অপমানের ভাগ অনেকখানি। প্রতিমা জানে মিণ্টু হপ্তাদু’য়েক কেন পড়তে যাওয়ায় বায়নাক্কা জুড়ছে। মিষ্টি মেয়েটা ভালই। সাতশো টাকায় পড়িয়ে দেয় চারদিন টাকা নিয়ে তাগাদা দেয়নি আগে কখনও। অবশ্য বাপি ঠিক মাস ফুরোনোর দু-তিনদিনের মধ্যে টাকা দিয়ে দিত। ছেলের পড়ায় খামতি না থাকে যেন… মিষ্টির বাবার বড় চিকিৎসা চলছে এখন। কী একটা অপারেশন হয়েছে পেটে। অনেক খরচ। তাই বোধহয় তাগাদা দিয়েছে। মাসের প্রথম হপ্তা চলছে। মাত্র একটা বাড়ির মাইনে পেয়েছে প্রতিমা। মিষ্টির সঙ্গে আজ দেখা ক’রে কী বলবে? ফ্ল্যাটবাড়ির টাকাটা পেয়ে গেলে, পরশু না’হয় যাবে।

-পাঁচটা পঁইতিরিশ বেজে গেল। ছটার মধ্যে… যাব পরশু। দিদিমণিকে বলিস।

প্রতিমার আর সময় নেই মিণ্টুর অনিচ্ছে শোনার। বসাকবাড়ির বুড়োটা খ্যাচখ্যাচ করে। পুন্নিমা এই কাজটা দেখে দিয়েছিল। আটটার মধ্যে খেয়ে শুয়ে পড়ে ওরা। মাসিমা কিছু বলেনা। ক’টা রুটি হবে বলে বা ভাত গরম করতে বলে সিরিয়ালে ডুবে যায়। প্রতিমা রোজ চা বিস্কুট খেতে খেতে কিছুটা দেখে। ‘ফিরে আসছি’ দেখার পর তাড়া দেয় বুড়োটা। ফিরে আসার পরে কী হল, জানা হয়না প্রতিমার। মাসিমার ঘরের দরজা খুলে গেলে ঝ্যানঝ্যান আওয়াজ ভেসে আসে, দু-একটা ডায়লগ। হরলিস্ক কমপ্যানের বাচ্চাদের আর মায়েদের হাসি। আবার দরজা বন্ধ হয়ে যায়। প্রতিমা দরজা ভেজিয়ে কাপড় পাল্টাচ্ছে। ‘জিত্‌নে ভি ত্যার ক্যরতে গ্যয়ে… ইয়ে ফ্যাস্‌লে’ প্রতিমার কিছুতেই মাঝের শব্দটা মনে পড়ছে না। এই গানটা কেন যে আসছে এখন… ‘ত্যার ক্যরতে গ্যয়ে’ তারপর কিছুতেই… বাপির কাটা মাথায় ধার জমে আছে অনেক। ঝরে পড়ছে। প্রতিমা চোখ বন্ধ ক’রে ধার ঝরে পড়তে দেখে। পান্তুর দোকানে, অমরদার কাছে, সেনজ্যেঠুর কাছে। সেনজ্যেঠু মাসে মাসে পাঁচশ ক’রে কেটে নেয় মাইনে থেকে। নন্দীকাকা ফেরত চায়নি এখনও। ঘাটকাজের আগের দিন এসেছিল- বাপি কত যত্ন করে নিয়ে যেত। হাত ধরে ধরে সিঁড়ি দিয়ে ওঠানামা করাত, বলল। সান্ত্বনা দিল। সেই বাপিই এভাবে হঠাৎ

-প্রতিমা, বাপির একটা ছবি ওই দোকানে বাঁধাতে দিয়েছিলাম। ফেরার সময় তুমি… আর, আলপনার এই ওষুধটা… আমি কোথাও মানে… পেলাম না… মানে

প্রতিমা শ্বশুরের থেকে টাকাটা নেয়। ঘাড় নাড়ে। কিন্তু আজ পারবে না। সকালে দেখা যাবে

#

-এই, বাপি মানে ইয়ে অঞ্জন ভোটের আগে বিজেপি করছিল না? পান্তু বলছিল, বিজেপির হয়ে নাকি ইউনিয়নে ঝগড়া করেছিল ভোটের আগে একদিন?

-ন্না, না। সে হয়তো এমনি… ওর তো মাথা গরম ছিল, জানেন তো। ও কিন্তু বরাবরই আপনাদের পার্টি করত। ২০১৪ সালের ভোটে…

-বরাবর না। তোমার শ্বশুর তো সিপিএম করত। আমার সাথেই বসত এলসি অফিসে। অঞ্জনও তখন… যাক্‌ গে, শুনলাম সকালের সুইপারের কাজটা তোমার দরকার। ঠিক আছে, দেখছি আমি। খবর দেব ‘খন

প্রতিমা জানে ঘেঁটুদা ঘাগু লোক। এখন ঘোরাবে ওকে। আসলে, বাপি মরিয়া হয়ে উঠেছিল। টাকার দরকার। অটো বন্ধ। সকালে সবজি নিয়ে বসছিল। ভোরে শিয়ালদা থেকে সবজি কিনে আনত। লস্কর গলির মুখে সাজিয়ে বসত একটা তেরপল পেতে। বিক্রি কই? ওদের এই হা-ঘরে পাড়ায় কে কিনবে? সকলেরই কাজ চুল হয়ে গেছে। কেউ সস্তার স্যানিটাইজার মাস্ক বেচছে। কেউ সবজি। কেউ কিচ্ছু না। প্রতিমা নতুন ফ্ল্যাটবাড়িতে রান্নার কাজটা নিয়েছিল। গেলবছর শ্রাবণের সোমবারে বাবার মাথায় জল ঢেলে দু’টো প্রার্থনা করেছিল। বাপির অটো যেন আগের মতোই রাস্তায় নামে আর, ওর একটা কাজ জুটুক। দ্বিতীয়টা পেয়েছিল শ্রাবণের শেষে। ওটাই প্রথম। তার আগে বাপির রোজগারেই… অবশ্য বাবা এখনও হপ্তায় চারদিন কারখানায় যায়। সুটকেস তৈরির কারখানা। হপ্তার শেষে টাকা। মা রক্তের রুগী। খালি খালি ফ্যাকাশে মেরে যায়। পা ভাঙল কলতলায় পড়ে। তখন অনেকগুলো টাকা বেরিয়ে গেছে। কিন্তু এই করোনার সময় থেকেই বড্ড চাপ যাচ্ছিল। ‘বাবাও আর যেতে পারবে না কাজে। আমার অটো বন্ধ। ব্যাঙ্কে টাকা… তুমি যদি…’ বাপির নিঃশ্বাস থেকে বাংলার গন্ধ নিতে নিতে প্রতিমা বুঝেছিল কাজ নিতেই হবে এবার। তারপর দেড় বছরে আরও তিনটে। বাপিকে গেল বছর নভেম্বরে ডেলিভারির কাজের কথা বলেছিল জগাদা। শর্ত একটাই- সিপিএমের মিটিনের আগে অটো ক’রে ঘুরে ঘুরে চোঙা ফুঁকতে হবে। ওদের রুটের অটো-ইউনিয়ন তখন টাল্লি খাব খাব করছে। বাপি রাজি হয়েছিল। ব্যাঙ্কে ব্যাঙ্কে জলের জার পৌঁছে দেওয়ার কাজ। সকাল সাড়ে দশটার মধ্যে। মাসে ছ’হাজার পাবে। জগাদার কমিশন বাদ দিয়ে ছ’হাজার। প্রতিমা বাপির সঙ্গে অটোয় যাচ্ছিল একদিন। বাপের বাড়ি। মুকুলদা উঠেছিল। বাপির চেনা। কথা হচ্ছিল।

-‘তুমি কি এখনও বিজেপি করছ?’ মুকুলদা ঠাট্টা ছুঁড়ে দিয়েছিল, ‘নাকি আবার তৃণমূলে?’

-ইউনিয়ন বিজেপিতে পাল্টি মারছিল, দাদা। আমি আর…

-ছিঃ, ছিঃ। বিজেপি? অবশ্য তৃণমূল বিজেপির তফাৎ নেই কোনও।

-নেই? কি জানি। নেই বোধহয়। কার সাথে যে কার তফাৎ… ছাড়ুন

-তুমি ভুলে গেলে, হোয়াট আওয়ার পার্টি হ্যাজ ডান ফর দ্য অটো ইউনিয়নস? তোমাদের জন্যে কত হেল্প করেছি। তোমাদের মণিদাকে সেবার অতগুলো টাকা দিয়ে হেল্প করল লোকাল কমিটি। 

-জানি, ভুলিনি। ভোট দিতাম তো। বাবার কারখানার জমিটা বেচে দিলেন আপনারা। বকেয়া হাপিস। প্যান্টালুন্স হল। তাও কিন্তু আপনাদেরই ভোট দিয়েছি। রুটের ইউনিয়ন ২০১০ অবধি সিপিএম ছিল।

-সেসব কথা কবে তামাদি হয়ে গেছে। এই শিল্প,  আইটি সব তো আমরাই… তারপরও তোমরা যে কী ক’রে এমন করো

-আমাদের ইউনিয়নের কথা মানতে হয়। এলাকার হুব্বাদের মানতে হয়তারা ঝাণ্ডা বদলে নিলে… অত বাছাবাছির সুযোগ পাইনি দাদা।

-বাঃ, বাঃ! আদর্শের কোনও দাম নেই? তুমি, বাবু, অমর সবাই তো সিপিএম ছিলে। বুথে বসেছ না ২০১৪ সালেও?

-হ্যাঁ। ভাল খাবারও পেয়েছি। বিরিয়ানি।

-তবে? এঃ, আজ শুধু ক’টা টাকার জন্যে…

-না, মুকুলদা, টিকে থাকার জন্যে। এসব নিয়ে আমার আফসোস নেই তো। আর, পোফেসনের জন্যে…

-অ্যাঃ! ওই একই হল। প্রফেশনের জন্যে… বিজেপি দাঙ্গা করে, তুমি জানো? মুসলমানদের মারে…

-আমার এলাকায় কিছু হয়নি ওসব। পাশেই রাজাবাজার। তাতে কী? কোথায় কী হয়েছে জেনে…

-শোনো, ধর্ম না, আগে ভাত। এত ধর্ম পুজো এসব বেড়ে গেছে চারদিকে

-মুকুলদা, আপনি শিবমন্দির কমিটির চেয়ারম্যান ছিলেন তো। কত সাজাতেন মন্দির, পুজো হত… ঘটা। ২০১২ থেকে ঘেঁটু দখল নিল কমিটির। ঘেঁটুও তো আগে সিপিএমেই…

-আহা্‌, বাজে তুলনা দিও না বাপি। সাংস্কৃতিক ব্যাপার ওটা। শিবমন্দির আমাদের পাড়ার ঐতিহ্য। তুমি তোমার রক্তটাকে ভুলে বিজেপির হয়ে…

-কেন মুকুলদা, সেদিন যে পড়লাম বিকাশ ভচ্চাজ অর্জুন সিংয়ের হয়ে কেস লড়ছে, সেটাও তো…

-সেটা তো ওর পেশা, আহ! কী তুলনা করছ এসব? কত শিক্ষিত লোক! ওর লেখাগুলো ফেসবুকে পড়লে গায়ে কাঁটা দেয় আর, অর্জুন সিং বিজেপি, কিন্তু ক্লায়েন্ট তো। কত টাকা দেয় জানো? আর, তৃণমূলের বিরুদ্ধে লড়াই…

-সেই তো পেটের জন্যেই মুকুলদা…

-আহা, প্রফেশন আর পার্টি গুলিয়ে ফেলো না। ওর ব্যক্তিজীবনে কত বড় উকিল, সেটা পেশা। সেটাকে তো সম্মান করতেই হবে। কিন্তু, পার্টির জন্যে…

-তৃণমূলের মিটিনে যাইনি বলে রুটে পুলিশের সঙ্গে ঝামেলার পরে কোনও হেল্প পাইনি। ভোটের আগে বিজেপির মেন রোডের মিটিনে না গেলে ইউনিয়ন আমায় টাটাত, মুকুলদা। অটোয় ক’রে মাইক করতে বেরিয়েছে দু’দিন। ভাড়ার অটো চালাই। ফাস লকডাউনের পরে হপ্তায় তিনদিন অটো পেতাম। বাকি তিনদিন কাজল। চার নম্বর দিনটা আমি পেতাম না যদি… পোফেসন, মুকুলদা? বাপ্পাদা, তমাল, নন্দী এরা এখন কোন পার্টি করে? প্রমোটারি শুরু করার সময়ে তো আপনাদের পাটিতেই ছিল। কে বাঁচতে চায় না বলুন তো?

-‘বাঁচার জন্যে এ-দল ও-দল? দলবদলু?’ মুকুলদা এত পাতলা ঠাট্টায় শব্দটা ছুঁড়ে দিয়েছিল, প্রতিমার কানে এখনও বাজে। ‘একটা ইয়ে আছে তো…’

-না, দাদা। কোনও ইয়ে নেই। ইউনিয়ন পালটি খেলে, কমিটি পালটি খেলে আমাদেরও রোজগারের ধান্দায়… আপনারা আবার ফিরবেন যখন, ওরাও ঘুরে যাবে। আমিও আবার…

প্রতিমা দু’দিন পরে বোনের সাধ থেকে ফিরে ওই শব্দটা খুঁচিয়ে তুলেছিল। অটোতেও সেদিন ইশারায় বাপিকে থামতে বলেছিল। কিন্তু মুকুলদার সঙ্গে কথাগুলো এমন জায়গায় যাচ্ছিল… ইশ, ভাবলে লজ্জা করে প্রতিমার। ভাগ্যিস অটোতে আর প্যাসেঞ্জার ছিল না। মুকুলদা অমন শিক্ষিত মানুষ। তার মুখে মুখে তক্কো করা মানায়? বাপির সাথে মিণ্টুর ইস্কুলের মাইনে দেওয়া নিয়ে ঝগড়া হচ্ছিল তখন। বাপি ওর দেরিতে মাইনে পাওয়া নিয়ে চোটপাট করতেই প্রতিমা হিসহিসে স্বরে দলবদলু শব্দটা ছুঁড়ে দিয়েছিল বাপির দিকে। ‘দলবদলু হয়ে ক’টা টাকার মুরোদ করেছ?’ বাপি থমকে গেছিল। তারপর তেড়িয়া হয়ে ‘বেশ করেছি। সব পাটি শালা এক। আমাদের চুষে নেয়’ বলে সামলেছিল। জগাদা ঝুলিয়ে দিয়েছিল ডেলিভারির কাজটা। নিজেও সটকে গেছিল। ছেলেকে ধরেক’রে ঢুকিয়ে দিয়েছে হাসপাতালের বাজার সাপ্লাইয়ের কাজে। বাপি খবরটা জেনেছিল ল্যাংড়া মগার থেকে। প্রতিমার তখনও ধিকধিকে রাগ। ‘বাবুদা তো পালটি মারেনি। এই তেষট্টি বছর বয়েসেও…’ বাবু’দা এখনও মিছিলে যায়। বাপির বাবার সঙ্গে পার্টি করত সেই কোন যুগ আগে থেকে। এ পাড়ায় তখন কংগ্রেসী মস্তানদের হুজ্জুত। বিশ্বনাথ খুন হয়ে গেল ওদের বোমায়। বাবুকে সেসময় নকশালরা বাঁচিয়েছিল। পাল্টা মেরে কংগ্রেসীদের খপ্পর থেকে বের ক’রে খালপাড়ের বস্তিতে রেখে দিয়েছিল। ’১৬-র ভোটের সময় গণ্ডগোলের ভয়ে বাপি বাবাকে বেরোতে দেয়নি। এমনিতেই হাটের অসুখ। প্রতিমাও ভয় পেয়েছিল, ‘ছাড়ো। এবার আর যেতে হবে না। ঘেঁটুরা বাড়াবাড়ি করছে বুথে’। অনেকবছর পরে কইমাছ এসেছিল বাড়িতে। দুপুরে শাগ্‌চচ্চড়ি, টকের ডাল আর কইমাছ খেতে খেতে তেইশতম বার কথাগুলো ফের শুনিয়েছিল বাপির বাবা। বাবুদা বুক বাজিয়ে ভোট দিয়ে এসেছিল। বিকেলে চায়ের দোকানে অমর, পান্তু, ফ্যান্সি বাবুরা ঠারেঠোরে তড়পেছিল। বাবু’দা চুপচাপ চা দিয়ে যাচ্ছিল খদ্দেরদের। ‘বাবু’দার কী আছে? বউ থাকে না ওর সঙ্গে। ছেলে লাথ মেরে দিয়েছে। ওর চিন্তা আছে সংসারের?’ প্রতিমা তর্ক ক’রে গেছিল অনেকক্ষণ। মিণ্টুর ইস্কুলের মাইনে। তেলের প্যাকেট ১৮০। অটোর গ্যাসের দাম হুহু ক’রে… প্রতিমা ফ্ল্যাটের বৌদির থেকে মাস শেষের আগেই টাকা চেয়েছিল। সকালে বাসন মাজা আর ঘর মোছার কাজ করে। টাকাটা দরকার।

সোরাগলির ভেতর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে প্রতিমা বাপির কাটা মাথার রঙ খোঁজে। কালীপুজোতে প্রতিমা মানত করেছিল। সোনার টিপ। বিমলা জুয়েলার্সে খোঁজ নিয়েছিল, সাড়ে চারশো টাকা। জাগ্রত ঠাকুর ওদের। কথা শোনে। বাপির নিজের অটো হোক, মিণ্টুর ফিটের অসুখ সেরে যাক, এই ভাড়ার ঘর ছেড়ে স্যাঁতা কলতলার ঝাম ছেড়ে অন্য পাড়ায় যেতে পারে যেন… কালী ঠাকুরের হাতে কি বাপির কাটা মাথা দুলছে? নেশা হয়েছিল খুব। ‘বাপিদা হেব্বি নাচছে। পুরো টাল! দেখবে চলো’ বদার বৌয়ের ঠোঁট মুচড়ে হাসা দেখে প্রতিমা ছুটে গেছিল। চ্যাঁচামেচি ক’রে টানতে টানতে বাপিকে ঘরে এনেছিল। বাবুল তাকাচ্ছিল। অমররা হাসছিল। নায়েবগলির আলো কেটে গেছে দু’দিন হল। পাঁচটা পঞ্চান্ন। ইশ্‌ ঠাকুরকে যদি সেদিন ওই সাট্টার নেশা ছাড়ানোর মানত করত…

#

‘অত হাসিখুশি ছেলেটা, ইশ্‌’

‘কার মনে যে কী দুষ্ক, ঠাওর করা যায়না গো’

‘বৌয়ের সাথে বাওয়াল হয়্যেছিল? কই, সকালে তো বলল না কিছু!’

‘ধারবাকি হয়ে গেসল অনেক… না, না… ওই তো কাজ বন্ধ ছিল কদ্দিন… বেচারি বৌটাকে খেটে মরতে হবে’

মিণ্টুকে সেদিন মিষ্টির কাছে পড়তে না পাঠালে ভাল হত? বাপিকে অতগুলো টাকা জমা দিতে ব্যাঙ্কে না পাঠালে? কিন্তু… লেবু-লঙ্কা সুতোয় বাঁধার কাজ সেরে প্রতিমার চোখ লেগে গেছিল। খুব বেশি নয়, কিন্তু দিনে কুড়ি টাকা মতো। রাতে বাড়ি ফিরে যদি আরও ঘণ্টা দুয়েক কাজটা করা যায়… তবে, বাপির ওই জল পৌঁছে দেওয়ার কাজটা লেগে গেলে এটা করতে হবে না। মিণ্টু নতুন ক্লাসে উঠেছে। ইস্কুলের মাইনে, বই কেনা। প্রতিমা দু’টো বাড়ির মাইনে পেয়েছে গতকাল। বাবা দেড় হাজার ফেরত দিয়ে গেছে। মায়ের ওষুধবিষুধের জন্যে নিয়েছিল, পুরোটা লাগেনি। বেলাবেলি ফিরে শিখর-জর্দা চিবোচ্ছিল বাপি। আধশোয়া হয়ে। মোবাইলে ‘নিলি নদী কে পারে/ গিলা সা চাঁদ খিল গ্যয়া’।

-তুমি যাদের থেকে ধার নিয়েছ, সব হিসেব রাখো তো?

-সব মনে আছে। লিখে রাখি।

-লাল্টুকাকাদের ধারটা এ’মাসে শোধ দাও না। বাজারে বলছিল আমাকে সেদিন, তিনমাস হলো, বাপিকে বলো এবার…

-দেব। সবারটা দিয়ে দেব এবার। দাঁড়াও না, জল ডেলিভারির কাজটা লাগুক।

-এই তো ছ’হাজার হাতে আছে। মিষ্টি টাকা পাবে কিন্তু। আর, পাখিদির বরের থেকে যে…

-আমি ব্যাঙ্কে জমা ক’রে আসছি চার হাজার। এসে খাব। এই, লালীটা ডাকছে কেন গো অত?

প্রতিমার চোখ লেগে গেছিল। মিণ্টু পড়তে বেরিয়ে গেছে। মিনু আর ন’জ্যেঠি দরজার কড়া নেড়ে ঢুকে পড়েছিল ঘরে। প্রতিমা তখন মিণ্টুকে অনেক বড় ক’রে ফেলেছে। মোগলবাগানের নতুন বাড়িতে নিজেদের কলঘর। শাওয়ার লাগানো। বাপি অটো কিনেছে। ওকে খবরটা দেবে বলে ডাকছে। ‘সিলি হাওয়া ছুঁ গ্যয়ি সিলা বদল ছিল গ্যয়া’র শিস দিতে দিতে বাপি দরজা ধাক্কাচ্ছে। কিন্তু দরজা নেই। বাপি কই?… ‘প্রতিমা, শিগ্‌গির ওঠো’। ‘প্রতিমা, বাপি কোথায় যাচ্ছে বলেছিল?’… লালী ডুকরে উঠেছিল। কেন কে জানে। একটানা বিষণ্ণ ডাক। পাক্কা দেড়দিন খায়নি কিচ্ছু। ওরা বোধহয় সব বোঝে। খুব কাছের লোক চলে যাবার দুঃখ

বাপি ব্যাঙ্কে যায়নি। পকেটে পাসবুক ছিল। ওই চারহাজার টাকা নিয়ে সাট্টার ঠেকে গেছিল। রেললাইনের পাশে। সবটাই খুইয়েছিল। প্রতিমা এগুলো পরে জেনেছিল। বাবুল অমর পান্তু সবাই এ ওর কানে তুলেছিল। প্রতিমা জেনেছিল বাপি রেলে গলা দিয়েছে। বাড়ি থেকে দু’মিনিট হেঁটে রেললাইন। ড্রাইভার অনেকবার হর্ন দিয়েছিল। বাপি সরেনি। বাপির শরীর অক্ষত। শুধু মাথাটা কেটে ছিটকে পড়েছিল। প্রতিমার ভাতঘুমে দেখা স্বপ্ন ওর বাস্তব থেকে কেটে গেছিল। বাপির মাথার মত।

#

তেইশ দিন হয়ে গেল। বাপির ছোট ডায়রিটা খুলেছিল প্রতিমা। পান্তুর দেড়, অমরদার তিন, খোকার তিন। নন্দীকাকারা বাপিকে ডাকত এদিক-ওদিক যাওয়ার হলে বা ডাক্তারের কাছে গেলে। বাপি অটো নিয়ে যেত। ঘণ্টায় ১২০ ক’রে। সে হয়তো মাসে এক-দু’বার। নন্দীকাকার থেকে এগারো নিয়েছিল মায়ের অপারেশনের সময়। তিন শোধ হয়েছে, আট বাকি। আলমারির পেছনের দেয়াল দিয়ে জল পড়ছে গেলবছর থেকে। টালি পাল্টাতে হবে বর্ষাশুরুর আগে। কলতলাটা পুরো উদোম। মল্লিকবাড়ি ভেঙে লম্বা ফ্ল্যাট হয়েছে, তিনতলা চারতলার জানলা বারান্দা দিয়ে সব দেখা যায়। একটা ঢাকার ব্যবস্থা করার জন্যে কথা হয়েছে। কিন্তু এতগুলো টাকা প্রতিমা কীভাবে দেবে এখন? মিলিরা কথা শুনিয়েছে পরশু। তেলের দাম ১৯০, আলু ২০টাকা কেজি, চিনি ৪৪, নুনও ২২ হয়ে গেল। ডিম সাড়ে ছ’টাকা। মিন্টুর ইস্কুল খুললে নতুন জামা-প্যান্ট লাগবে। সেই দু’বছর আগেরটা ছোট হয়ে গেছে, বাড়িতে পরে নেয়।

-সেই ছ’টা পনেরো বাজিয়ে দিলে তো? চা না পেলে আমার মাথা ধরে জানো। নিজে তো দিব্যি দোকান থেকে চা খেয়ে এসছ।

-বসিয়ে দিচ্ছি এখনই। ওই একটু চোখ লেগে গেছিল বিকেলে। আজ কি ঘুগনি করব? তা’লে পেশারে বসিয়ে দিই মটর।

-ব্বাবাঃ, দুপুরে ঘুমোনোর টাইম পাও কী ক’রে? আমাদের তো এত কাজ, চিন্তাভাবনা… ঘুম হয়ইনা দুপুরে…

মিন্টুকে আগলে রাখতে হবে এখন। পুন্নিমার ছোটছেলেটা কেমন বখে গেল। দেখতে দেখতে। চোখের সামনে। অরুদা বছর সাতেক আগে মরল। পুন্নিমার ছোট ছেলেটার তখন চার বছর। কাজে বেরিয়ে যেত। অত সময় পেত না দেখার। বড়টাও লায়েক হয়ে গেছে তদ্দিনে। ইস্কুল কাট দিচ্ছে। এখন তো ক্যাটারিং দলের সাথে যায়। নাইনের পরে পড়লই না আর। ইশ্‌, মিন্টু যদি ইস্কুল না যায়? না, না। মিষ্টির মাইনেটা পরশুই দিয়ে দেবে। আচ্ছা, মিন্টু পড়তে ঢুকল তো? পুন্নিমার ছোটছেলে কত ছোট থেকে কাঁচাটাকা পেয়েছে হাতে। পাঁচ দশ টাকা দিয়ে আসত পুন্নিমা, উড়ের দোকান থেকে জলখাবার খেতে। কবে থেকে রাস্তাঘাটে খিস্তি দেয়। এদিক ওদিক পালায়। মিন্টুও যদি ওর’ম করে? দুবলা ছেলে। কেউ মারধোর করলে বাঁচবে না গো। সবে তেইশ দিন, এখনও কাঁদে রাতে। ‘মারা গেলে কি মাথা খুলে যায়?’ সেদিনই জিজ্ঞেস করছিল। না না। এই বস্তি ছেড়ে একটা ভাল কোথাও ঘর নিতে হবে। প্রতিমা মটর সেদ্ধ করতে দিয়েছে। প্রেশার কুকারে সিটি পড়ছে

 

শিরশিরে হাওয়া এখনও। নাকি বসন্তের? কালকে একবার সময় ক’রে ঘেঁটুদার অফিসে যাবে। রাস্তা ঝাঁট দেবার কাজটা যদি লেগে যায়। ঠিক পারবে। মোগলবাগানের ভাড়া বাড়িটা… লালীকেও নিয়ে যাবে। বড্ড ভালবাসত বাপিকে। তবে, যাবেই। বসন্ত বলেই কি ঝগড়া-বাড়িতে কেউ গান চালিয়েছে? সন্ধ্যের হাওয়ায় প্রেশার কুকারের সিটির তীক্ষ্ণ আওয়াজের ফাঁক গলে গলে ছড়িয়ে পড়ছে ‘তুমসে মিলি জো জিন্দ্‌গি, হমনে আভি বোয়ি নাহিঁ, তেরে সিবা কোই না থা…’

শেয়ার করুন

Leave a Comment

Your email address will not be published.