ভীমা কোরেগাঁও বা এলগার পরিষদ মামলায় কী হচ্ছে?

গ্রেপ্তারের ক্রোনোলজি ও রাজবন্দীরা

আগস্ট ২৩, ২০২১। ন্যাশনাল ইনভেস্টিগেটিং এজেন্সি (এনআইএ)-র বিশেষ আদালতে জাস্টিস কোঠালিকার-সমক্ষে  ভীমা কোরেগাঁও তথা এলগার পরিষদ মামলায় চার্জশীট আনে এনআইএ। রাজদ্রোহের মামলা। ১৬ জন অভিযুক্ত এই মুহুর্তে জেলে। তাঁদের মধ্যে একজন এই চার্জগুলি আসার আগে বন্দীদশায় মারা গিয়েছেন রাষ্ট্রের হাতে খুন হয়েছেন। 

অ্যারেস্টগুলি হয় দফায় দফায়। প্রথমে, জুন ২০১৮। গ্রেফতার হলেন মানবাধিকার কর্মী ও প্রকাশক সুধীর ধাওয়ালে, আইনজীবী সুরেন্দ্র গ্যাডলিং, ছাত্র-গবেষক মহেশ রাউত, অধ্যাপিকা সোমা সেন, মানবাধিকার-কর্মী গবেষক রোনা উইলসন – এই পাঁচজন। রোনা উইলসন ছাড়া এঁরা বাকি সকলেই নাগপুর অঞ্চলের আবাসিক, নাগপুরের বিভিন্ন নাগরিক অধিকার, দলিত-আদিবাসী অধিকার, রাজবন্দী অধিকার, ভীমা কোরাগাঁও জেলায় লয়েড কোম্পানির লৌহাকর মাইনিং-এর দাপটে নাগাড়ে উচ্ছেদ ও অরণ্যনাশ – ইত্যাদির বিরুদ্ধে সরব ছিলেন। রোনা নয়া দিল্লির বাসিন্দা, বন্দীমুক্তি আন্দোলনের সক্রিয় কর্মী। 

দ্বিতীয় দফায় অ্যারেস্টগুলি হয় আগস্ট ২০১৮-তে। এবারেও স্ব-স্ব আবাস থেকেই গ্রেফতার হন কার্টুনিস্ট, সাহিত্যিক ও রাজনৈতিক কর্মী অরুণ ফেরে’রা, ট্রেড ইউনিয়ন ও নাগরিক অধিকার কর্মী ভার্নন গনসালভেস, আইনজীবী সুধা ভরদ্বাজ এবং কবি ও প্রবীণ মানবাধিকার কর্মী ভারাভারা রাও – এই চারজন। প্রথম দুইজনের কাজকর্ম ও মূল আবাস মহারাষ্ট্রেই। তৃতীয়জনার অক্লান্ত কর্মভূম ছত্তিসগড়। চতুর্থজনার – অন্ধ্র-তেলাঙ্গানা জুড়ে। মানে, এইবারে বৃত্ত বড় হচ্ছে একটু একটু করে। 

বৃত্ত বৃহত্তর হবে ক্রমে। ১৫ই নভেম্বর, ২০১৮। প্রাথমিক চার্জশীট জমা করলো পুনে-পুলিশ। ২০১৯ আসতে না আসতেই ফেব্রুয়ারিতে এই ২১শে দেশে ঐ পুনে-পুলিশ-ই পুনরায় জমা করে সাপ্লিমেন্টারি চার্জশীট। এন-আই-এ ২০২০-র জানুয়ারি থেকে তদন্তভার গ্রহণ করে। ১৪ই এপ্রিল ২০২০ গ্রেফতার হন দলিত গবেষক আনন্দ তেলতুম্বড়ে এবং জার্নালিস্ট তথা মানবাধিকার কর্মী গৌতম নওলাখ্যা। তারপর সেই বছরেরই অক্টোবর মাসের ৮ তারিখ, আজকে যবে এই লেখা প্রকাশ হচ্ছে তার থেকে ঠিক ১ বছর ১৬দিন আগে, গ্রেফতার হন ঝাড়খণ্ডের বরিষ্ঠ আদিবাসী কর্মী ও ধর্মযাচক ফাদার স্ট্যান স্বামী। 

গ্রেফতারের সময় তাঁর বয়স ছিলো ৮৩ বছর ৫ মাস ১২ দিন। গ্রেফতার হওয়ার ৯ মাস ৩ দিনের মাথায় কারাবাসে যখন মৃত্যু হলো তাঁর তখন তাঁর বয়স ছিল ৮৪ বছর ২ মাস ৯ দিন। কারাবাসে স্বাস্থ্য খারাপ হতে থাকে তাঁর। এই বিষয়ে তাঁর পরিবার পরিজনের পক্ষ থেকে জজ-ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে লিখিত প্রার্থনাও করা হয়েছিল যে বয়সের কারণে তাঁর গেলাশ থেকে ঢোঁক গিলে জল খেতে অসুবিধে হচ্ছে, তাই যেন তাঁকে জল খাওয়ার জন্য একটা সিপার দেওয়া হয়। এই দাবী নামঞ্জুর করেন সেই জজ-ম্যাজিস্ট্রেট। 

ইতিমধ্যে, ২৮শে অগাস্ট ২০১৮ হায়দ্রাবাদে স্বগৃহ থেকে গ্রেফতার হওয়ার সময়ে ভারাভারা রাওয়ের বয়স ছিল ৭৮ বছরের থেকে ঠিক ৬৬ দিন কম। ২০২০ সালের জুন মাসে সেই তালোজা জেলে থাকাকালীনই তাঁরও স্বাস্থ্যের অবনতি ঘটে। কোভিড ধরে পড়ে তাঁর। জেলের চিকিৎসা তাঁর কেমন চলছে, সেই বিষয়ে একটি ছবি ছড়িয়ে পড়ে। এরপর বাধ্য হয়ে এনএইচআরসি তথা জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের হস্তক্ষেপ দাবী রাখা হয়। অবশেষে, ফেব্রুয়ারি মাসের ২১ তারিখ বম্বে হাই কোর্টের ডিভিশন বেঞ্চ ৬ মাসের মেডিকাল জামিন ধার্য্য করে ভারাভারা রাও-এর। 

আজকে যে দিন আমি এই লেখা লিখছি, এই দিনটার তারিখ ১৬-০৯-২০২১। এখনো ভারাভারা রাও-এর জামিনের মেয়াদ বাড়ানো হয়নি। তাঁর বয়স ৮২ পেরিয়েছে। আজ নিয়ে এক সপ্তাহ হলো তাঁর পক্ষ থেকে সেই মেডিকাল জামিনের এক্সটেনশন চাওয়া হয়েছে। এই লেখা যদি মনোনীত হয় তবে প্রকাশ হবে ২২ অক্টোবর ২০২১ বা তার আশেপাশে। সেই সময় নাগাদ-ই তাঁর প্রাথমিক সেই মেডিকাল জামিনের মেয়াদ ফুরাবে। আমরা দেখতে থাকবো যা হতে থাকবে।        

ফিরে আসি গ্রেফতারের টাইমলাইনে। ২০২০-র অক্টোবর মাসে স্ট্যান স্বামী অ্যারেস্ট হওয়ার আগেই দিল্লি থেকেই অ্যারেস্ট করা হয় অধ্যাপক হানিবাবু তারায়িল’কে – ২০২০-র-ই জুলাই মাসে। 

তারপর, ২০২০-র সেপ্টেম্বর মাসের একদম গোড়ার দিকেই এন-আই-এ-র তত্ত্বাবধানে গ্রেফতার হলেন কবীর কলা মঞ্চের তিন দলিত গণসঙ্গীতকার – জ্যোতি জগতপ, সাগর তাত্যারাম গোর্খে, এবং রমেশ মুরলিধর গাইচোর। ওয়াকিবহালমাত্রে জানবেন, ঐ গানের দলের দুই পথিক শীতল সাথে ও সচিন মালির গ্রেফতারের কথা, ওই মঞ্চের গানের আসরে লাগাতার ঘটে আসা আখিল ভারতীয় বিদ্যার্থী পরিষদের হামলার কথা, কেউ হয়তো এর আগে শীতল সাথের গানও শুনেছেন ‘জয়-ভীম-কমরেড’ তথ্যচিত্রে। 

কবীর কলা মঞ্চের সচিন মালি, শীতল সাথে, সাগর গোর্খে এবং রমেশ গাইচোরের নাম এর আগেও নকশাল মামলায় জড়ানোর চেষ্টা হয়েছে। ২০১৩ থেকে ২০১৭ একপ্রস্থ জেল খাটেন তাঁরা। ২০১৭ সালে বাকিদের সাথে সাগর গোর্খে এবং রমেশ গাইচোর-ও সুপ্রীম কোর্ট থেকে সেই আগের মামলায় জামিনপ্রাপ্ত হন। তার ৩ বছর যেতে না যেতেই চলমান এই ভীমা কোরেগাঁও এলগার পরিষদ মামলায় আবার গ্রেফতার হলেন শেষোক্ত দুইজন। সঙ্গে হলেন জ্যোতি জগতপ।  

সব মিলিয়ে এই হল ষোলজনের হিসেব। তাঁদের কোনো ট্রায়াল এখনো শুরু হয়নি। একজন কারাবস্থায় বার্ধ্যক্য ও অসুস্থতাজনিত কারণে এবং মৌলিক কিছু জীবিত থাকার উপকরণ তাঁর থেকে রাষ্ট্রবলে দূরে সরিয়ে রাখার কারণে, মৃত।                 

মহারাষ্ট্রর আঞ্চলিক রাজনীতি কত মাত্রায় হিন্দুত্ববাদ পুষ্ট তা যাচাই করা এই লেখার উদ্দেশ্য নয়। শুধু তথ্য ও ক্রনোলজির খাতিরে জানিয়ে রাখা ভালো, যে, ডিসেম্বর ৩১, ২০১৭ থেকে জানুয়ারি ২, ২০১৮-এ ভীমা কোরেগাঁও দিবসের দলিত-আদিবাসীদের শান্তিপূর্ণ র‍্যালির উপর হিংস্র ভাবে ঝাঁপিয়ে পড়েন আঞ্চলিক দুই রাজনৈতিক মদতপুষ্ট হিন্দুবীর ও তাঁদের গেরুয়াবাহিনী – মিলিন্দ একবোটে এবং শাম্ভাজি ভিড়ে। একবোটে কিছুদিনের জন্য নামমাত্র গ্রেফতার হন। অল্পদিনের মধ্যেই জামিনে মুক্ত হন তিনি। ভিড়ে’র গ্রেফতার-ও হয়নি। 

যাদের শাস্তি হয় না

মিলিন্দ একবোটে মারাঠী উগ্রবাদী হিন্দুত্ববাদী সংগঠন শাম্ভাজি মহারাজ প্রতিষ্ঠানের সভাপতি। আরএসএস ঘনিষ্ট কার্যকর্তা শাম্ভাজি ভিড়ে ‘শিব প্রতিষ্ঠান’-এর প্রতিষ্ঠাতা। ওয়াকিবহালমাত্রে জানেন, মহারাষ্ট্র হিন্দুত্ববাদী সন্ত্রাসের আঁতুড়ঘর। যাঁরা জানেন না বা সত্যিই তেমন কিনা তা পরখ করে দেখতে চান, তাহলে ২০০৬ ও ২০০৮-এর জোড়া বিস্ফোরণ এবং সেই বিস্ফোরণের তদন্তের সাথে সাথে উঠে আসে নামগুলি – প্রজ্ঞা সিং ঠাকুর, স্বামী অসীমানন্দ, কর্ণেল শ্রীকান্ত প্রসাদ পুরোহিত, মেজর রমেশ উপাধ্যায়, অভিনব ভারত সংগঠন ও সেই ধরনের সংগঠনে কারা কাদের ও কোন উদ্দেশ্যে আগ্নেয়াস্ত্র চালনা ও বিস্ফোরক নিক্ষেপের তালিম দিয়েছিলো বা দিয়ে চলেছে, তা নিয়ে একটু ঘেঁটেঘুঁটে দেখুন, স্পষ্টতর হবে বিষয়টি। এঁদের সকলেই আজ জামিনপ্রাপ্ত হিন্দুত্ববাদী আশীর্ব্বাদে ক্ষমতাপুষ্ট মানুষ বা প্রতিষ্ঠান। মাথা উঁচু করে মানব সমাজে ঘুরে বেড়ান। ভারত সাগর তীরের সে’সকল মহামানবদের নিয়ে এই লেখা নয়। 

আনীত ধারাগুলি

ভীমা কোরেগাঁও এলগার পরিষদ রাজবন্দী মামলায় এনআইএ আনীত চার্জগুলি অনুরূপ – 

  • ভারতীয় দণ্ডবিধি সংহিতা বা আইপিসির ধারা ১৫৩-এ (গোষ্ঠীর মধ্যে শত্রুতার প্রচার), ৫০৫ (১) (বি) (জনসাধারণের জন্য উদ্বেগ বা শঙ্কা সৃষ্টি করার উদ্দেশ্যে), ধারা ১১৭ (জনসাধারণের দ্বারা বা অন্যূন ১০জন ব্যক্তির দ্বারা অপরাধের প্ররোচনা সংঘটন) এবং অন্যান্য  

এছাড়াও তাঁদের বিরুদ্ধে এনআইএ কর্তৃক আনা হয় আনল্যফ্যুল অ্যাকটিভিটিস প্রীভেনশন অ্যাক্ট, ১৯৬৭ (ইউএপিএ) আইনের নিম্নলিখিত ধারা অনুসারে অপরাধের অভিযোগ – 

  • ধারা ১৩ (বেআইনি কার্যকলাপ), ১৬ (সন্ত্রাসবাদী কার্যকলাপ), ১৮ (সন্ত্রাসবাদী কার্যকলাপের ষড়যন্ত্র), ১৮-বি (সন্ত্রাসবাদী কার্যকলাপের জন্য লোকজনকে নিয়োগ করা), ২০ (সন্ত্রাসবাদী সংগঠনের সদস্য হওয়া) এবং ধারা ৩৯ (সন্ত্রাসবাদী সংগঠনকে সমর্থন করার অপরাধ) 

ওয়াকিবহালমাত্রে জানবেন যে অতি-সাম্প্রতিক কালেই ইউএপিএ আইনের একটা সংশোধনী বা অ্যামেন্ডমেন্ট হয়েছে। সেই অ্যামেন্ডমেন্ট অনুসারে, যতদিন না এনআইএ-র তদন্ত যথাযথ ভাবে সম্পন্ন হচ্ছে, ততদিনে এই আইনের আওতায় অভিযুক্ত ও গ্রেফতার হওয়া কাউকেই জামিন দেওয়া হবে না। 

অভিযোগের ভিত্তিগুলি 

বেশ কিছুদিন ধরেই এনআইএ বিভিন্ন আদালতের সমীপে ও পদ্ধতিগত ভাবে পেশ করা বয়ানে ও সেই নিয়ে গোদি-মিডিয়ার ঢ্যাঁড়া পিটছিল এই মর্মে যে, অভিযুক্তগণ নাকি নরেন্দ্র মোদিকে মারবার ষড়যন্ত্র করেছিল। যদিও, ২৩শে অগস্ট ২০২১ – যে তারিখ দিয়ে এই লেখা শুরু, সেই তারিখে যখন এনআইএ এই ষড়যন্ত্রের ভিত্তিতে চার্জশীট পেশ করল, এনআইএ আদালতে পীঠাসীন মাননীয় ন্যায়মূর্তি শ্রীকোঠালিকরের সামনে, সেখানে নরেন্দ্র মোদির নাম নেই। সেই জায়গায় নাম না করে বলা আছে যে সরকারের কোনো এক গুরুত্বপূর্ণ পদাধিকারের খুনের চক্রান্ত।

কাকে এমন খুন করার চক্রান্তের আরোপ, সেই শূন্যস্থান পূরণ করতে এনআইএ-র তদন্তকারীগণ বোধহয় আর খুব বেশী দিন নেবেন না। বা নিতেও পারেন। বা, তেমন কারুর নাম কখনোই নাও পেশ হতে পারে। এই স্পেক্যুলেশনের পথে আর এগিয়ে লাভ কী? 

এনআইএ শেষোক্ত তারিখে যে চার্জের বয়ান পেশ করেছেন স্বীয় আদালতের ন্যায়বাহাদূর সমীপে, তাতে আছে আরো কিছু বিবরণ। তথ্যনিষ্ঠতার খাতিরে সেই সকল বিবরণ নীচে অনুবাদে পেশ করা হলো – 

 অভিযুক্তগণ , এমন ধরনের বেআইনি কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করেন, প্ররোচনা দেনএবং সক্রিয় যোগদান করেন যা ভারতের ঐক্য, অখণ্ডতা, নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বকে বিপন্ন করে। তাঁদের উদ্দেশ্য ছিলো মহারাষ্ট্রের এবং ভারতের এক অংশের মানুষের মধ্যে সন্ত্রাস হানা (ইংরেজি মূল বয়ানে – ‘স্ট্রাইক টেরর’)। বিস্ফোরক ব্যবহারের উদ্দেশ্যে তাঁরা সরবরাহ করেন রসদ, তার, পেরেক, নাইট্রেট পাউডার, ইত্যাদি। একই সাথে, চীনা কিউএলজেড ৮৭ মডেলের অটোমেটিক গ্রেনেড লঞ্চার, রুশ, জিএম ৯৪ গ্রেনেড লঞ্চার, এবং ৪,০০,০০০ রাউন্ড এম-৪ তাঁদের কাছে ছিল এবং তাঁরা সেগুলি সরবরাহ করেছেন। এই সকল অস্ত্রের ব্যবহারে এক বা একাধিক মানুষের মৃত্যু হতে পারে। আহত হতে পারেন এক বা একাধিক মানুষ। বিষয়সম্পত্তিরও যারপরনাই ধ্বংসপ্রাপ্তি সংঘটিত হতে পারে। এই সবের উদ্দেশ্যে ছিল এক ‘পাব্লিক ফাংশনরি’-র মৃত্যু ঘটানো

৪ লক্ষ শেল গ্রেনেডে লঞ্চ করে কোনো ‘পাব্লিক ফাংশনরি’-কে খুন করা কতোটা বিশ্বাসযোগ্য, যেখানে অভিযুক্তদের একাধিকজন আইআইটি কানপুর, আইআইএম আমেদাবাদ ইত্যাদির একদা ছাত্র ছিলেন বা নাগপুর অথবা দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ে কিছু পড়াচ্ছিলেন, অথবা ওকালতি করছিলেন, অথবা বাঁধছিলেন-গাইছিলেন গণসঙ্গীত-গণনাট্য, অথবা লিখছিলেন মানুষের ব্যথা, কষ্ট ও প্রতিবাদ-প্রতিরোধের কবিতা, অথবা লিখছিলেন বই, আঁকছিলেন ছবি, করছিলেন উচ্চশিক্ষাগত গবেষণা – এই নিয়ে আলোচনা যা করবেন, তা স্পেক্যুলেশন স্তরেই আটকে থাকবে। গাঁজাখুরি বুঝতে কি আদৌ উচ্চ কিছু হতে হয়? চার্জশীটে প্রত্যেকেরই বিরুদ্ধে একটা কমন চার্জ – ‘জনতার সরকার’ গড়তে চায় এমন সন্ত্রাসী সংগঠনের সাথে যোগসাজশ। 

আমরা দেখে নিই এই বিষয়ে গত ২৩শে অগস্ট ২০২১-এর চার্জসমূহের সাথে সাথে যে ক’টি সংগঠনের নাম এঁকে দিয়েছে এনআইএ, সেই নামগুলি। নিম্নলিখিত সংগঠনগুলিকে চিহ্নিত করা হয়েছে ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টি (মাওবাদী) নামের ইউএপিএ আইনের প্রথম তফশীলে চিহ্নিত কোনো এক আন্ডারগ্রাউন্ড সন্ত্রাসবাদী দলের ‘ফ্রন্ট অর্গ্যানাইসেশন’ হিসেবে –

অনুরাধা ঘান্দি মেমোরিয়াল কমিটি, কবীর কলা মঞ্চ, পার্সিকিউটেড প্রিসনারস সলিডারিটি কমিটি, কমিটি ফর রিলিস অফ পলিটিকাল প্রিসনারস, কমিটি ফর প্রোটেকশন অফ ডেমোক্রেটিক রাইটস, পীপলস ইউনিয়ন অফ ডেমোক্রেটিক রাইটস, কো-অর্ডিনেশন অফ ডেমোক্র্যাটিক রাইটস অর্গ্যানাইসেশন, ডেমোক্রেটিক স্টুডেন্টস ইউনিয়ন, বিস্থাপন বিরোধী জন বিকাশ আন্দোলন এবং রেভল্যুশানারি রাইটারস অ্যাসোসিয়েশন। 

ওয়াকিবহালমাত্রে জানেন, এই সকল গোষ্ঠী ভারতের বিভিন্ন স্থানের সুশীল সমাজের সদস্যগণের চালনায় গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষার কাজ চালিয়ে যায়। কেউ করেন উচ্ছেদের বিরোধ তো কেউ বলেন আদিবাসী দলিত মানুষের অধিকারের কথা। বিভিন্ন আদালতে গণতান্ত্রিক ও সংবিধান-মুখী ন্যায়বিচারের দাবীতে রিট পিটিশন বা জনস্বার্থ মামলা দায়ের করেন তাঁরা মানুষের মানবাধিকারের স্বার্থে।  

মানবাধিকার-মুখী বিভিন্ন কাজ, সাম্যবাদের আদর্শে অথবা কৌমসমতা তথা সোশ্যাল জাস্টিসের আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে নিরলস কর্মসাধক অনেকেই এই সকল সংগঠনের সাথে নিজেদের নিঃস্বার্থ ভাবে যুক্ত রাখেন মানবিক অধিকারের নিরিখে। তাঁদের নাম এই দেশে খবরে ছাপে না, যতক্ষণ না নকশাল অভিযোগে গ্রেফতার হন তাঁরা, যেমন হলেন এই ১৬-জন। গ্রেফতারের আগে মূলধারার কজনাই বা শুনেছিলেন তাঁদের নাম বা কীর্তির কথা? এনআইএ-র বয়ান আদালত যদি ন্যায্য হিসেবে ধার্য্য করে, তাহলে রাষ্ট্রের তরফ থেকে এমন একটা পক্ষ অবলম্বন স্পষ্ট হয়ে উঠবে – যে, গণতান্ত্রিক অধিকারের কথা বলা আজ রাষ্ট্রের চোখে সন্ত্রাসবাদ। 

এর পরের কিস্তিতে আমরা দেখে নেবো এই তদন্ত চলাকালীন জামিন ও অন্যান্য বিষয়ে মামলা মোকদ্দমা যা হয়েছে সেই সবের আদেশসমূহে এই বিষয়ে ভারতীয় বিচারব্যবস্থার বর্তমান অবস্থা ও অবস্থান কীভাবে ব্যক্ত হয়েছে।

(চলবে)

শেয়ার করুন

1 thought on “ভীমা কোরেগাঁও বা এলগার পরিষদ মামলায় কী হচ্ছে?”

  1. CHANDA SONALI

    Pragya Singh Thakur, Sreekanth Prasad Purohit, Swamy Asimananda , Major Ramesh Upadhyay …and so many names behind the explosion, this should be known for each conscious Indian individual, how Stan was poorly treated inside the custody, despite his tremendous ill health, should be known. Anuradha Kandhi Memorial, Kabir Kala Mancha ,Persecuted Prisoners Solidarity Committee tried whole heartedly through their art, paintings, songs, people’s liberation songs and poems and with so many otherc perspectives. They also were in front of the fascists’ gunpoint…
    Each conscious citizen should read this much needed article what actually happened and what’s going to be..
    KUDOS to the writer for this hard hitting article!
    My best wishes, More to come, wish more we may read to know the filthy tricks and games of the Fascists…

    SONALI

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *