পুঁজিবাদ, পিতৃতন্ত্র এবং মেয়েদের কাজ, প্রথম কিস্তি

প্রিয় বন্ধু 

কেমন আছিস? অনেকদিন ধরেই ভাবছি তোকে কিছু লিখব কিন্তু দৈনন্দিনতার বোঝা টানতে টানতে কেমন মরচে ধরে যায় মাথায়, আঙুলে…নতুন কিছু ভাবা বা লেখা হয় না। আজ সন্ধ্যেবেলা এক পরিচিত মানুষের সাথে জোর বিতর্ক হল। তার বক্তব্য শিল্পায়ন পরবর্তী যুগে মহিলাদের গৃহবন্দী হয়ে থাকতে হয়নি, রান্না এবং বাচ্চা মানুষ করার বাইরে তাদের কাজের সংস্থান হয়েছে, অতএব এতে পিতৃতন্ত্রের ভীত নড়ে গেছে। আমি মোটেই এই বক্তব্যের সাথে একমত নই। আমার মনে হয়ে শিল্পায়নের হাত ধরে আসা পুঁজিবাদ, পিতৃতন্ত্রকে চ্যালেঞ্জ তো করেইনি বরং তার সাথে হাত মিলিয়ে মহিলাদের শোষণ করেছে। এইসব বিতর্কের পর মনে হল, শিল্পায়ন আর মহিলাদের কাজের ইতিহাসটা লিখেই ফেলি। এই ইতিহাস অনেকটা বড়, কিছুটা জটিল…উপরন্তু দেশ, সমাজ ও সাম্রাজ্যবাদের প্রকার স্থান, কাল হিসেবেও ভিন্ন। অবশ্যই ভারতে শিল্পায়নের বিকাশ এবং মহিলাদের কাজের ইতিহাস ইংল্যান্ড বা ফ্রান্স এর ইতিহাস থেকে আলাদা। তবে আজকের চিঠিতে চল আমরা ইংল্যান্ড এবং ফ্রান্স এর গল্পটা দিয়ে শুরু করি।

১৯৭০ এর দশকে বিভিন্ন নারীবাদী ইতিহাসবিদ এবং লেখিকারা ইওরোপিয়ান শিল্পায়নের সময়ে মহিলাদের কাজ এবং পুঁজিবাদ ও পিতৃতন্ত্রের সম্পর্ক নিয়ে একের পর এক অসাধারণ প্রবন্ধ লিখেছেন। কিছু বই যা না পড়লেই নয় তা হল শিলা রোবোথাম এর হিডেন ফ্রম হিস্ট্রি (১৯৭৩), লুইসে টিলি এবং জোয়ান স্কট এর ওমেন ওয়ার্ক এন্ড ফ্যামিলি (১৯৭৮) আর হেইডি হার্টম্যান এর দা আনহ্যাপি ম্যারেজ বেটুইন মার্ক্সিজম এন্ড ফেমিনিজম (১৯৭৯)। বইগুলো পড়লে বোঝা যায়, পুঁজিবাদ সমাজের অভ্যন্তরীণ পিতৃতন্ত্রের সাহায্যে কেমনভাবে মহিলাদের শ্রমের অবমাননা এবং শোষণ করেছে এবং পিতৃতন্ত্রের হাত আরো শক্ত করেছে। অষ্টাদশ এবং উনবিংশ শতাব্দীতে, শিল্পায়নের প্রথম পর্যায়ে, ইংল্যান্ড এবং ফ্রান্স-এ, মহিলারা বড় সংখ্যায় ফ্যাক্টরির কাজে নিযুক্ত হন। এটাকে অবশ্য  মহিলাদের ‘চয়েস’ বা পারিবারিক শাসন থেকে মুক্তির সূচনা হিসেবে দেখা সমস্যাজনক। বরং, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এটা ছিল পারিবারিক সিদ্ধান্তেরই  অন্তর্ভুক্ত। বাজারীকরণের ফলে পরিবারগুলির যখন নগদ আমদানির প্রয়োজন, তখন অবিবাহিত কন্যারা ফ্যাক্টরিতে কাজ করে পারিবারিক প্রয়োজন মেটাতো। অনেকক্ষেত্রে, এই মহিলারা আজীবন অবিবাহিত থেকে পিতার বা ভাইয়ের পরিবারের অর্থপ্রয়োজন পূর্ণ করতো। অপরদিকে, বিবাহিত মহিলারা তাদের গার্হস্থ্য কাজ এবং সন্তান পালনের ফাঁকে ফাঁকে পরিবারের প্রয়োজন অনুযায়ী পার্ট টাইম কাজে যুক্ত হতো, যার মধ্যে অন্যতম ছিল ‘পেইড ডোমেস্টিক ওয়ার্ক’ অর্থাৎ মজুরির বিনিময়ে গৃহ পরিচারিকার কাজ। সেই সময়ে ইনফ্যান্ট মর্টালিটি (শিশুর মৃত্যুর হার) এবং ফার্টিলিটি (প্রজননের হার) দুটোই খুব বেশি ছিল। মাতৃত্ব ও সন্তান পালনের সংজ্ঞাও ছিল অন্যরকম। আজকের দিনের মতো সন্তানের লালন পালনের জন্য অতটা সময় ব্যয় করার প্রচলন ছিল না। বরং পরিবার মনে করত বাড়ির কাজ সামলে বাড়ির বৌ-টির বাইরে কিছু রোজগার করা বেশি জরুরি। এই পুরো প্রক্রিয়ায় অবিবাহিত কন্যা এবং পুত্রবধূ দুজনেই পারিবারিক সিদ্ধান্তের দ্বারাই নিয়ন্ত্রিত হতো, তাদের নিজেদের মতামতের খুব একটা মূল্য ছিল না। এই মূল্যহীনতার প্রতিফলন ছিল শ্রমের বাজারেও। অনেক ফ্যাক্টরি মালিকেরা মহিলা শ্রমিক পছন্দ করতেন কারণ পুরুষদের তুলনায় তাদের কম মাইনে দিতে হতো। উপরন্তু, মহিলা শ্রমিকরা মুখ বুজে কাজ করত, ঝামেলা ছিল কম। যে মেয়েরা পিতৃতন্ত্রের যাঁতাকলে ছোট থেকেই নিজেদের নিকৃষ্ট এবং মূল্যহীন ভাবতে শিখেছে, সেই মেয়েরা যে শ্রমবাজারেও নিজেদের নিকৃষ্ট মনে করবে, এ আর আশ্চর্য কিসের! তাই একদিকে, পিতৃতন্ত্র পুঁজিবাদকে হৃষ্ট করে তোলে এবং অপরদিকে, পুঁজিবাদী শ্রমবাজারের বৈষম্য পিতৃতন্ত্রকে আরো বলিষ্ঠ করে তোলে।  পিতৃতন্ত্র আর পুঁজিবাদের এই পারস্পরিক সম্পর্ক নিয়ে আরো বিস্তারে বলব একটু পরে। তার আগে উনবিংশ শতাব্দীর মাঝের থেকে বিংশ শতাব্দীর শুরু অবধি পরিস্থিতি কেমন ভাবে বদলায় তার কথা বলি।

শিল্পায়নের এই দ্বিতীয় পর্যায়ে হেভি ইন্ডাস্ট্রি বৃদ্ধি পায় এবং প্রযুক্তির উন্নতি ঘটার সঙ্গে সঙ্গে শ্রমবাজারে মেয়েদের মূল্য কমে যায়। ভাবা হয় যে মহিলারা মেশিন চালাতে পারবে না, তাদের দক্ষতার অভাব। তাই ক্রমশ মহিলা শ্রমিকদের ছাঁটাই করে পুরুষ শ্রমিকদের চাকরি দেওয়া হয়। এর পেছনে অবশ্য শুধু মালিকপক্ষের হাত নয়, পুরুষ শ্রমিক অধ্যুষিত এবং পরিচালিত ইউনিয়নেরও ভূমিকা ছিল। যতই মহিলাদের নিকৃষ্ট, অদক্ষ ভাবা হোক না কেন, ধীরে ধীরে বহু মহিলা শ্রমিকের মধ্যে এক চেতনার উন্মোচন ঘটছিল। মহিলাদের এই বাড়বাড়ন্ত পুরুষদের সহ্য হয় না, বিশেষ করে তারা ভয় পায় যে এইবার বোধহয়  যুগ যুগ ধরে বিনা পারিশ্রমিকে তাদের এবং তাদের পরিবারের যে সেবা মহিলারা করে এসেছে, সেইটা বদলে যেতে পারে। পুরুষ শ্রমিক পরিচালিত ইউনিয়নগুলোর অনেকেই দাবি করে মহিলাদের ফ্যাক্টরিতে কাজের ফলে তাদের বাড়ির দেখাশোনা ঠিক মতো হচ্ছে না, শিশুদের তত্ত্বাবধান, বয়স্কদের সেবা সঠিক ভাবে হচ্ছে না, অতএব মহিলা শ্রমিকদের জায়গায় পুরুষদের নিয়োগ করা হোক। একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, এই সময়ে, ইউরোপে ধীরে ধীরে প্রজননের হার কমছিল, শিশুর মৃত্যুর হারও কমছিল, এবং মাতৃত্বের সংজ্ঞাও বদলাচ্ছিলো। সমাজ এবং পরিবার নির্ধারণ করে যে, সন্তানের লালন পালনে মহিলাদের সময় এবং মনোযোগ বাড়ানো দরকার। তাই ফ্যাক্টরির কাজ নয়, রোজগার এর প্রয়োজন থাকলে, মেয়েরা বাড়িতে বসে কিছু কাজ করবে বা পার্ট টাইম কিছু কাজ করবে। পিতৃতান্ত্রিক সমাজের এই নিদান পুঁজিবাদ মাথা পেতে স্বীকার করে।

কেন পুঁজিবাদ এই ব্যবস্থায় সম্মত হল? পুঁজিবাদের তো মুনাফা নিয়ে কারবার। পুরুষ মহিলার শ্রম বিভাজনে তার কী লাভ? পরিবারের মধ্যে লিঙ্গভিত্তিক শ্রমবিভাজন এবং মহিলাদের শ্রমের অবমূল্যায়ন পিতৃতান্ত্রিক সমাজের ভীত। আগেই বলেছি, কেমনভাবে মহিলাদের এই অবস্থান পুঁজিবাদকে হৃষ্ট করে কম মজুরির আজ্ঞাবহ এক শ্রমিক গোষ্ঠী তৈরি করে। মহিলাদের বিনা পারিশ্রমিকে এই  শ্রমের ফলে (যেমন রান্না বান্না, ঘর পরিষ্কার করা, বাচ্চাদের দেখাশোনা করা) শ্রমিকরা অনেক কম মাইনেতে জীবনধারণ করতে সক্ষম হয়। তা যদি না হতো, এই সমস্ত কাজের জন্যে যদি শ্রমিকদের খরচ করতে হতো, তবে এতো অল্প মাইনেতে তাদের সংসার চলতো না।  অতএব মাইনে বাড়াতে হতো এবং তাতে পুঁজিবাদীদের মুনাফা যেত কমে। এতে পুঁজিবাদের ক্ষতি। অতএব লিঙ্গভিত্তিক শ্রমবিভাজন এবং মহিলাদের দ্বারা বিনামূল্যে গার্হস্থ, লালন পালন ও সেবার কাজ চালিয়ে যাওয়া পুঁজিবাদের পক্ষে অত্যন্ত জরুরি বিষয়। পিতৃতন্ত্রের সাথে পুঁজিবাদের আঁতাত তাই অবশ্যম্ভাবী। 

বিংশ শতাব্দীতে, দুটি বিশ্বযুদ্ধ পার করার পর, মহিলাদের ফুল টাইম কাজে ফিরে আসা থেকে আটকানো যায়নি। যে মহিলারা যুদ্ধের মুখে দাঁড়িয়ে পরিবারের এবং দেশের অর্থনীতিকে সামলিয়েছে,দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে, যুদ্ধক্ষেত্রের নানা নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিস উৎপাদন করেছে, অনেকসময় ফ্রন্টলাইনে দাঁড়িয়ে নার্সের কাজ করেছে, সেই মহিলাদের আর গৃহবন্দী করার ক্ষমতা ছিল না যুদ্ধপরবর্তী সমাজের। তাছাড়া বহু ক্ষেত্রে,পুরুষদের যুদ্ধে প্রাণ যাওয়ার ফলে, মহিলারা রোজগার না করলে সংসার চালানো যেত না। এর ফলে বহু মহিলারা অফিসে কাছারি, ফ্যাক্টরি তে যোগদান করে। কিন্তু তা সত্ত্বেও পিতৃতন্ত্র এবং পুঁজিবাদের আঁতাত অপরিবর্তিত থাকে। বরং মহিলাদের শ্রমের বোঝা বাড়তেই থাকে…পারিশ্রমিকের বিনিময়ে কাজের সাথে যুক্ত হলেও, বিনামূল্যে গার্হস্থ্য কাজের দায়িত্ব সম্পূর্ণ তাদের ওপরেই বর্তায়। উপরন্তু দেখা যায়, শ্রমের বাজারে নারী পুরুষের বৈষম্য বেড়েই চলেছে – সবথেকে নিকৃষ্ট মানের কাজে সবথেকে কম বেতনে মহিলা শ্রমিকদের নিয়োগ করা হচ্ছে। এতে পিতৃতন্ত্র এবং পুঁজিবাদ দুইই সন্তুষ্ট।

আজ এই পর্যন্ত। কিছু কথা লিখলাম, অনেক কথাই বাকি। নারী আন্দোলন কেমন ভাবে এই পুঁজিবাদ আর পিতৃতন্ত্রের আঁতাত কে চ্যালেঞ্জ জানায়? ভারতবর্ষে শিল্পায়ন ও পুঁজিবাদ কী প্রভাব ফেলে মহিলাদের কাজের ওপর? বিশ্বায়নের যুগে মহিলাদের শ্রমের বাজারে ঠিক কী অবস্থান? গার্হস্থ্য কাজের জন্যে পারিশ্রমিক নাকি শ্রমের বন্টন, কোনটা করলে পিতৃতন্ত্র কে সঠিক জবাব দেওয়া যাবে? এই সব প্রসঙ্গে আরেকদিন আলোচনা করবো…কেমন? আজকের লেখাটা পড়ে যা মনে হয় লিখে পাঠাস। অপেক্ষায় থাকবো।

ভালো থাকিস বন্ধু। কথা হবে শিগগিরই।

নীলাঞ্জনা 



শেয়ার করুন

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *