গদ্য

কমিউনিস্ট যোদ্ধা বেলা (প্রথম কিস্তি)

‘৪৮-৪৯ সালে তেভাগার সশস্ত্র কৃষক যুদ্ধের দ্বিতীয় পর্যায় উচ্চ মাত্রায় উন্নীত হল। কমিউনিস্ট পার্টিকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করার পর জেল উপচে পড়ল রাজনৈতিক বন্দীতে। রাজনৈতিক বন্দীমুক্তির দাবিতে কলকাতায় মেয়েদের এক বিরাট মিছিল সংঘটিত হল ১৯৪৯ সালের ২৭ শে এপ্রিল৷ সেদিন ভারত সভা হলেও মহিলা আত্মরক্ষা সমিতির সভায় সিদ্ধান্ত হয় যে মেয়েরা ১৪৪ ধারা ভাঙার জন্য রাস্তায় নামবে। মহিলা আত্মরক্ষা সমিতিও নিষিদ্ধ হয়। ঐ সভা থেকে বেরিয়ে আমরা মিছিলে যোগ দিই। বিশাল মিছিল চলছে কলকাতার রাজপথ জুড়ে। সেদিন ‘স্বাধীন’ ভারতের সদ্যোজাত রাষ্ট্রের পুলিশ আক্রমণ করল মিছিল। মেয়েদের হত্যা করল। মেয়েরা গুলি খেয়ে রাস্তায় একে একে পড়ে গেলেন৷ শহিদ হলেন গীতা, লতিকা, প্রতিভা, অমিয়া, যমুনা। কলকাতার রাজপথ মেয়েদের রক্তে লাল হয়ে গেল।’ বলতে বলতে আবেগে, ব্যথায় জ্বলে উঠছিল বেলার চোখ, যেন প্রত্যক্ষ করছেন সেই দৃপ্ত মিছিল।

শেয়ার করুন

রক্তচোষা

না, কেউ আসেনি। কী করে মৃত্যু হলো ক্ষীরোদার, এ প্রশ্ন তুলে জেল কর্তৃপক্ষকে কেউ বিব্রত করেনি। কত পাগলই তো পাগল বাড়িতে বন্দী। দু’চারদিন বাদে-বাদে একজন করে মারাও যাচ্ছে। তাদের মধ্যে কেউ বেওয়ারিশ! আত্মীয়-স্বজন নেই, থাকলেও তাদের সঙ্গে পাগলের সম্পর্ক ছেদ হয়েছে বহু আগেই। যাদের ওয়ারিশ আছে– মৃত্যুর খবর পেলে তাদের কেউ-কেউ আসে, কেউ বা আসেও না। যারা আসে, সামর্থ্য থাকলে মৃতদেহের সৎকার করে। কিন্তু কেউ কোনো প্রশ্ন করেনা। কী করে তার পাগল আত্মীয়ের অকালমৃত্যু ঘটল, এ প্রশ্ন তুলে জেল-কর্তৃপক্ষকে বিব্রত করার ঘটনা খুব কম ক্ষেত্রেই ঘটে। হয়তো যেদিন পাগল বলে তার আত্মজনকে জেলে দিয়ে গেছে কেউ, সেদিনই তাকে মৃত বলে ধরে নিয়েছে সে। তাই এই মৃত্যু আর নতুন করে তাদের মন স্পর্শ করেছে বলে টের পাওয়া যায় নি।

শেয়ার করুন

গরাদ স্মৃতি

আরেক দিন আমাদের ডাকছে, ‘মাসি, মাসি তোদের শাড়ি আকাশে উড়ে গেল! দেখ আকাশে উড়ছে!’ আমরা অবাক হয়ে ভাবছি, সেল থেকে আবার আমাদের শাড়ি উড়ে কি করে যাবে। সব তো বন্ধ। কিন্তু সব বাচ্চাগুলো এসে খুব উত্তেজিত হয়ে চ্যাঁচাচ্ছিল লাল, নীল সব শাড়ি আকাশে উড়ে গেল, মাসিদের শাড়ি উড়ে গেল! আমরা তো সেল থেকে আকাশ দেখতে পাচ্ছিলাম না। বুঝতে পারছিলাম না কী হচ্ছে। অনেক পরে বুঝেছিলাম আকাশে রামধনু উঠেছে। ওরা কখনো রামধনু দেখেনি। ছোট থেকেই জেলেই থেকেছে তাই ওটাই ওরা ভেবেছে মাসিদের শাড়ি উড়ে গেছে! আবার একজন বলছিল, মন খারাপ করিস না মাসি, শাড়িটা চলে গেল, আমি বেরোলে তোকে লাল নীল শাড়ি এনে দেব!

শেয়ার করুন

মেহেন্দোর সাথে সাক্ষাতে – ‘উরগেনের ঘোড়া’ উপন্যাসের পাঠক প্রতিক্রিয়া

স্নায়ুর ভিতর দিয়ে ছুটে বেড়াচ্ছে একটা সাদা ঘোড়া৷ ঘোড়ার খুরে খুরে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে উঁচু পাহাড়চূড়াকে সর্পিণীর মতো পেঁচিয়ে উঠতে থাকা একটি গল্প৷ প্রত্যেকটি শিরা উপশিরা দিয়ে ঝড় তুলে ছুটে চলা সাদা ঘোড়া রহস্যের জাল বুনছে৷ ফেনা তুলে দেওয়া ঘোলাটে রক্তের স্রোতে একটা মাথার আদল ফুটে উঠছে। ঘোড়সওয়ারির মাথার সাদা ফেস্টুন মাঝে মাঝেই বদলে যাচ্ছে ছোট্টো একটা লাল তারা আঁকা জলপাই টুপিতে।

শেয়ার করুন

বধূ না মাওবাদী

সকাল ১১টা নাগাদ মেদিনীপুর জেল গেটে সম্পদ এসেছে দেখা করার জন্য নাম লেখাতে। টেবিলের ওপার থেকে প্রশ্ন এলো, ‘বধু না মাওবাদী’। সম্পদ চকিতে বুঝতে পেরে বলে ‘মাওবাদী’। ‘২ টোয় আসবেন’ শুনে সম্পদ মুচকি হেসে চলে যায়।

২০১০ সালে দেড় মাসের মতো ছিলাম মেদিনীপুর জেলে। ধরেছিল শালবনীর রামেশ্বরপুর থেকে। অভিযোগ ছিল একটি ডিজিটাল ক্যামেরা, একটি ভয়েস রেকর্ডার, ক’টা পেন, একটি নোটবই আর ৫,০০০ টাকা দিয়ে রাষ্ট্রদ্রোহ, দেশের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ইত্যাদি ষড়যন্ত্র করা। ধরার আগে বুঝতে পারিনি সাংবাদিক ও লেখক বন্ধুদের সাথে যৌথ- বাহিনীর দখলে জঙ্গলমহলের অবস্থা দেখতে যাওয়াটাও অপরাধ। সাংবাদিকদের ছেড়ে দিয়ে আমাদের বিরুদ্ধে এফ-আই-আর হলো। অবশেষে ঠাঁই হল মেদিনীপুর জেলে। লালগড় আন্দোলনে শয়ে শয়ে জঙ্গলমহলের মানুষকে জেলযাত্রা করিয়েছিল সেই সময়ের বাম সরকার। আজ যদিও সরকার বাম থেকে তৃণমূল হয়েছে কিন্তু সেই সময়কার পঞ্চাশেরও বেশি আন্দোলনকারী আজ দশ বছর পরেও বাংলার বিভিন্ন জেলে বন্দী।

শেয়ার করুন

উঠোন (তিন)

এদিকে রাবেয়া মেয়ের বড় হওয়ার সাথে সাথে আরো চিরচিরে বিরক্ত হয়ে ওঠে, তার শরীর ভারী হয়, চোখ ঝাপসা, আর ঘোলাটে দ্বিধা ভরা মনে কালো বুড়িকে আসমানতারা করার জিদ চেপে যায়। বড় বাজারে হোমিওপ্যাথি, কবিরাজী, আর অ্যালোপ্যাথি সব জায়গা থেকে আসে চামড়ার রং বদলের ওষুধ। কিশোরী মেয়েকে জোর করে খাওয়াতে মাখাতে থাকে মা এই পরিবারে, সমাজে গ্রহণযোগ্য করে তোলার চেষ্টায়।

শেয়ার করুন

শর্মিষ্ঠার স্মৃতিতে কয়েকটি কথা

আজ যখন এই লেখা লিখছি তখন শর্মিষ্ঠার প্রয়াণের একমাস পূর্ণ হয়েছে। যে অস্বাভাবিক শূন্যতা এবং নিরাপত্তাহীনতা জুন মাসের ১৩ তারিখে আমাদের কাঁধে আচমকা চেপে বসেছিল তাতে আমরা এখনও ডুবে রয়েছি এক শ্বাসরোধকারী মগ্নতায়। এখনও পর্যন্ত বুঝে উঠতে পারিনি কীভাবে কী সামাল দেব! কীভাবে দেব? কার ভরসায় আমরা লড়ে যাব? শর্মিষ্ঠা আমাদের অনেকটা জায়গা জুড়ে ছিল। 

শেয়ার করুন

“খাঁচায় পুরে দিলেও তো পাখি গাইতে পারে”- ফাদার স্ট্যান স্বামী এসজে

এই যে আমরা ১৬জন সহঅভিযুক্ত বিভিন্ন জেলে বন্দী, বা হয়তো একই জেলের ভিন্ন বৃত্তে আটকা, একে অপরের সাথে দেখা হয়তো বা সম্ভব নয়, তবুও আমরা একসাথে গান গাই। তবুও আমরা সমবেত গান গেয়ে যাব। খাঁচায় পুরে দিলেও তো পাখি গাইতে পারে।

শেয়ার করুন

উঠোন – দুই

স্মৃতিতে ফিরে দেখি আমাদের উঠোনগুলো কংক্রিট হওয়ার আগে পর্যন্ত বৃষ্টি নামানোর মন্ত্র জানতো। প্রতি চৈত্র বৈশাখ মাসে একদঙ্গল কুঁচোকাঁচা মানুষ উঠোনের মাঝে কাদা মাটি খুঁড়ে জল বাঁধিয়ে “আল্লা মেঘ দে পানি দে ছায়া দে রে তুই” এর মন্ত্র সমবেত সুরে গেয়ে বৃষ্টি নামাতো। আর বাড়ির গৃহিণী তাদের জন্য চাল, ডাল, তেল দিত পরম যত্নে। সেই সব শুকনো উঠোনে বৃষ্টি নামতো, ফসলের স্বপ্ন নিয়ে।

শেয়ার করুন

পুঁজিবাদ, পিতৃতন্ত্র এবং মেয়েদের কাজ – দ্বিতীয় কিস্তি

নারীবাদী আন্দোলন একটি ক্রমবিবর্তমান ধারা। নারীর শ্রমের প্রসঙ্গের সাথে জুড়ে রয়েছে শুধু পিতৃতন্ত্র বা পুঁজিবাদের ইতিহাস নয়,জাতপাত, বর্ণ, ধর্ম, যৌনতা, প্রতিবন্ধকতা এবং বিভিন্ন লিঙ্গ পরিচয়ের ইতিহাস। শোষণের এবং অবমাননার এই বিভিন্ন অক্ষগুলি একসাথে বিশ্লেষণ না করলে, আমাদের মর্যাদা আর সমতার লড়াই অপূর্ণ বা সীমিতই রয়ে যাবে। সবসময়ে সব আন্দোলন যে এক ছত্রছায়ায় এসে দাঁড়াবে.তা নাও হতে পারে। কিন্তু আমাদের হাত বাড়িয়ে দিতে হবে, কথা বলতে হবে একে অপরের সাথে। আমরা যে যেমনই কাজ করি না কেন – পারিশ্রমিকে বা বিনা পারিশ্রমিকে, সংগঠিত ক্ষেত্রে বা অসংগঠিত ক্ষেত্রে, ঘরে কিংবা বাইরে, শ্রমের মর্যাদার লড়াই আমাদের জীবন নির্বাহের লড়াই, জীবন চেতনার লড়াই।

শেয়ার করুন

বহুমনরথ এবং অতিমারী: দুঃসহ সময়ের দুঃসাধ্য গল্প

‘পলিয়্যামরির’ একটা জুতসই বাংলা কী হতে পারে সেটা ভাবতে ভাবতে মির্জা গালিবের ‘হাজারো খোয়াইশে য়্যাইসি কি হার খোয়াইশ পে দম নিকলে’ শুনছিলাম। বহু বাসনার এই বন্দনাই আমার মনে ‘বহুমনরথ’ শব্দটা গেঁথে দিল। সেই থেকে এটাই আমি ব্যবহার করি। আরও অন্য শব্দ থাকতে পারে বাংলায় – যেমন বহুকামী বা বহুপ্রেমী – আবার নতুন শব্দ কেউ বানাতেও পারেন। নানারকম শব্দ দিয়েই তো আমরা আমাদের জীবনের অভিজ্ঞতাগুলো বোঝার চেষ্টা করি। এখনকার মত বহুমনরথ শব্দটাই আমার পছন্দ তাই সেটাই ব্যবহার করছি।

শেয়ার করুন

ট্রেন কাহন

এ বছর ৫ই মে, রাজ্য সরকার সর্বসাধারণের জন্য ট্রেন চলাচল বন্ধ করল। আগের বছর, ২০২০ তে, ২১শে মার্চ থেকে শুরু করে এবছরের প্রায় জানুয়ারী অবধি এ রাজ্যে লোকাল ট্রেন বন্ধ ছিল। কিছু ব্যাতিক্রম ছাড়া। দূর পাল্লার ট্রেনও বন্ধ ছিল বহুদিন। এবং সর্বত্র সুন্দর ভাবে বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছিল যে করোনা (কোভিড ১৯) মোকাবিলা করার জন্য গণপরিবহন বন্ধ রাখা একটি অত্যন্ত জরুরি পদক্ষেপ।

শেয়ার করুন

‘মোয়ানা’-য় ইকোফেমিনিজমের বার্তা: পরিবেশ দিবসে ফিরে দেখা

প্রশান্ত মহাসাগরের বুকে এক নিরিবিলি দ্বীপ। সে দ্বীপের মাওরি প্রধানের আছে এক পুচকে মেয়ে। সমুদ্র তাকে হাতছানি দেয়। কিন্তু কে জানে কেন, বাবা আর মায়ের সমুদ্রে বড় ভয়। ভয়ই যখন, তখন মেয়ের নাম মোয়ানা রাখা কেন বাপু? মোয়ানা নামের মানেই যে সমুদ্দুর। সমুদ্রের কাছে যাওয়া মানা ছোট্ট মোয়ানার। সেই কোন ছোটবেলায় সমুদ্র এক জেল্লাদার সবজে পাথর এনে ফেলেছিল তার পায়ের কাছে। পাথরটা হাতে তুলেছে সবে, অমনি বাবা এসে হাজির। কোলে করে নিয়ে চলল কুঁড়ের দিকে, আর পাথর গেল হাত ফস্কে পড়ে। জলরাশি আবার ভাসিয়ে নিয়ে গেল তাকে।

শেয়ার করুন

স্টোনওয়াল বিদ্রোহ : পাথুরে দেওয়ালের রঙধনু ইতিহাস

“তোমরা কিছু করছ না কেন? কিছু তো একটা করো?!” কথিত আছে জনতার উদ্দেশে এই কথা চিৎকার করে বলে উঠেছিলেন একজন হাতকড়া বাঁধা মানুষ, পুলিশ যার মাথায় এইমাত্র আঘাত করেছে। ১৯৬৯ -এর ২৮শে জুন, নিউ ইয়র্ক শহরের ‘স্টোনওয়াল ইন’-এর সেই রাত পরবর্তী সময়ের দুনিয়ার রামধনু রঙে অন্য মাত্রা যোগ করবে। মানবজাত তদ্দিনে জেনে গেছে যে লঘু হলেই পিষ্ট হতে হয়, সংখ্যাগুরুর বেইনসাফি জো-হুজুর বলে সহ্য করে যেতে হয়। সে তুমি ধর্মপালনে হও নয়তো রাজনৈতিক চিন্তায় অথবা যৌনতার যাপনে, সংখ্যালঘু মানেই রাষ্ট্র, সমাজ থেকে শুরু করে পরিবার বা পাশের বাড়ির কাকু, এক কেলাসের পল্টু বা এক গেলাসের মান্তু … যে কেউ তোমার কান মুলে-চুল টেনে দিতে পারে, টিটকিরি দিতে দিতে জিন্দা জ্বালিয়ে দিতে পারে বা পারে অনায়াসে বুকে বুলেট গুঁজে দিতে।

শেয়ার করুন

উঠোন

অনেক বছর আগে সত্তর দশকের দিকে এক গেরস্থ ঘরের কিশোরী ভাতের ফ্যান ঝরাতে গিয়ে প্রতিদিন ভুল করতো, অনেকটা করে ভাত ফ্যানের মধ্যে অজান্তে পরে যেত। কিছু মাস আগেই তার আশি উত্তীর্ণ মায়ের কাছে শোনা সে গল্প, তার বৃদ্ধা মা বলতো, ‘ইচ্ছে করেই বুড়িকে ফ্যান গালাতে দিতাম, যাতে ফ্যানে কিছুটা ভাত থাকে’। বুড়িরও এখন ষাট বছর, তার বয়ানে সে বলে ‘পড়শী মানুষরা অনেকেই ফ্যানটুকু খাওয়ার জন্যই উঠোনে বসে থাকতো তাদের শুধু ফ্যান দিতে কষ্ট হতো। ইচ্ছা করেই ফ্যানের মধ্যে ভাত ফেলতাম প্রতিদিন, মা ভাবতো আমার হাত নড়বড়ে’।

শেয়ার করুন

‘চল হকের জমি ছিনাই লিবি চল…’

অথচ এই মেয়েরাই বেঁচে থেকেছেন একে অপরের স্মৃতি আঁকড়ে, নিজের কথা বলতে গিয়ে বলেছেন অন্য মহিলা কমরেডদের কথা, যৌথ যাপনের কথা, সমষ্টিগত লড়াইয়ের কথা। সেই গল্পকথায় বারবার উঠে এসেছে কৃষি কাজের কথা, সেই গল্পে বারবার উঠে এসেছে গৃহশ্রমের কথা, সেই গল্পে বারবার উঠে এসেছে জমির সাথে তাদের সম্পর্কের কথা, তাদের রাজনৈতিক শ্রমের কথা। তাই বিনা দোষে জেল খেটে আন্দোলনে যোগ দেওয়ার গল্প বলতে বলতে অবলীলায় লীলা কিষান বলে ওঠেন, “আল বাঁধতে পারে, রুপ্নি করতে পারে, বিছান ফেলতে পারে, খালি লাঙ্গলটা ধরতি পারবো না?” কিংবা পার্টির মিটিং-এ যাওয়ার কথা বলতে বলতেই সাবিত্রী রাও-এর বয়ানে উঠে আসে গৃহ শ্রমের কথা, লিঙ্গভূমিকার কথা, মাতৃত্বের শ্রমের কথাও

শেয়ার করুন

মাধবীলতা কমপ্লেক্স ও নকশাল আন্দোলনের লিঙ্গ রাজনীতি

আমি নকশালবাড়ি দেখিনি। আমি বলা যেতে পারে জরুরি অবস্থার সন্তান। কাজেই, আমার সাথে নকশালবাড়ির সম্পর্ক ঐতিহাসিকতার সম্পর্ক। যে ঐতিহাসিকতা আবার এক ধরনের জ্যান্ত ঐতিহাসিকতা। প্রতি পদে আমাদের প্রাত্যহিক জীবনে ছাপ ফেলতে ফেলতে যায়। তো, আমার গল্পে বড়ো হয়ে জুড়ে থাকবে নয় দশকের দেখা বাস্তবতা। যে বাস্তবতার মধ্যে আবার গভীরভাবে ছাপ ফেলেছিলো পূর্ববর্তী দশকগুলোর বাস্তবতাও।

শেয়ার করুন

পুঁজিবাদ, পিতৃতন্ত্র এবং মেয়েদের কাজ, প্রথম কিস্তি

অনেকদিন ধরেই ভাবছি তোকে কিছু লিখব কিন্তু দৈনন্দিনতার বোঝা টানতে টানতে কেমন মরচে ধরে যায় মাথায়, আঙুলে…নতুন কিছু ভাবা বা লেখা হয় না। আজ সন্ধ্যেবেলা এক পরিচিত মানুষের সাথে জোর বিতর্ক হল। তার বক্তব্য শিল্পায়ন পরবর্তী যুগে মহিলাদের গৃহবন্দী হয়ে থাকতে হয়নি, রান্না এবং বাচ্চা মানুষ করার বাইরে তাদের কাজের সংস্থান হয়েছে, অতএব এতে পিতৃতন্ত্রের ভীত নড়ে গেছে। আমি মোটেই এই বক্তব্যের সাথে একমত নই। আমার মনে হয়ে শিল্পায়নের হাত ধরে আসা পুঁজিবাদ, পিতৃতন্ত্রকে চ্যালেঞ্জ তো করেইনি বরং তার সাথে হাত মিলিয়ে মহিলাদের শোষণ করেছে। এইসব বিতর্কের পর মনে হল, শিল্পায়ন আর মহিলাদের কাজের ইতিহাসটা লিখেই ফেলি। এই ইতিহাস অনেকটা বড়, কিছুটা জটিল…উপরন্তু দেশ, সমাজ ও সাম্রাজ্যবাদের প্রকার স্থান, কাল হিসেবেও ভিন্ন। অবশ্যই ভারতে শিল্পায়নের বিকাশ এবং মহিলাদের কাজের ইতিহাস ইংল্যান্ড বা ফ্রান্স এর ইতিহাস থেকে আলাদা। তবে আজকের চিঠিতে চল আমরা ইংল্যান্ড এবং ফ্রান্স এর গল্পটা দিয়ে শুরু করি।

শেয়ার করুন

অসুখ সারায় যারা

‘নার্সেস উইক’ চলছে। প্রতি বছরই এই ৬ই মে এই সপ্তাহ শুরু হয়। চলে ১২ই মে ফ্লোরেন্স নাইটিংগেলের জন্মদিন পর্যন্ত। চিকিৎসা ক্ষেত্রে সমস্ত সেবিকাদের গুরুত্বকে মনে রাখার জন্য এই উদযাপন। কিন্তু এই বছর বা আগের বছর, এই বছরগুলি বিশেষ কোভিড পরিস্থিতির কারণে যে প্রবল পরিশ্রম তাঁদের করতে হচ্ছে, তাতে বরং গোটা বছরটাকে নার্সেস ইয়ার বলা ভালো।

শেয়ার করুন

যৌনতার আখ্যান ও একটি পারফর্মেন্স

শেষ বছরটা বদলে দিয়েছে অনেক কিছু। ঘর আর বাইরের জায়গার অদলবদল ঘটেছে, ঘরকে নতুনভাবে আবিষ্কার করা গেছে, বোঝাপড়া বদলেছে। পরিবর্তন হয়েছে ঘরের মধ্যেকার কাজ বন্টনের হিসেবেও। বাড়ির বাইরে অভ্যস্ত পুরুষ এই সময়ে গৃহস্থ খুঁটিনাটি করছেন, তা প্রচার পাচ্ছে, কারণ সে কাজ তাঁদের করার কথা ছিল না সাধারণত। সবই সময়ের দাবি। এই ঘরের মধ্যে সারাক্ষণ জাপটে থাকতে থাকতে দুজন মানুষের মধ্যেকার ফাঁকা জায়গার অভাব ঘটেছে। সেখানে তো আর ‘সোশ্যাল ডিস্টেন্সিং’ নেই। ফাঁকা বাড়ির একটুকরো চিলেকোঠার অবসর হারিয়ে গেছে অনেকের থেকে। যে সকল মানুষজনের বাড়ির কাজে সময় কাটে, বাড়ির বাকিরা বেরিয়ে যাওয়ার পরের যে একার রাজত্ব তা আর নেই। সেখানে ঘর-বাইরের ফারাক মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে।

শেয়ার করুন

মুর্শিদাবাদের নারী শ্রমিকদের জীবন ও যন্ত্রণা

কিন্তু এদের মুখের হাসি অমলিন। নিজেদের দলের প্রোগ্রাম নিয়ে খুব উৎসাহ। অভিযোগ, টাকা একসঙ্গে পায় না। সারাবছর পায় না। অন্যদিকে মাঠের কাজ মাত্র পনেরো থেকে কুড়ি দিন। লকডাউনে সে আশাও ছেড়েছে। ধান কাটার সময় মাত্র দশ দিন কাজ পাওয়ার আশা। সে টাকাও স্বামীরা মদের জন্য চুরি করে নেয়। বছরে ৩৬৫ দিন চলে কি করে? মেরিলা, রেখা – এদের একটিই ইচ্ছা, পশুপালনের জন্য ব্যবস্থা করে দিলে সংসার বাঁচে। জীবন বাঁচে। হাঁস-মুরগি, ছাগল থাকলে অভাবের দিনে বিক্রি করে চলবে ঘর। সেদিকেই মুখিয়ে আছে এখন।

শেয়ার করুন

মহাবীর নারওয়াল: নাতাশার বাবা, আমাদের সবার কমরেড

মহাবীর কাকার মৃত্যু সংবাদ আমাদের বজ্রপাতের মতো আঘাত করেছে। কমরেড মহাবীরের স্মৃতিচারণা করে আমরা এই শোক মেনে নিতে চাইছি, আমাদের একা হয়ে যাওয়ার বিরুদ্ধে লড়াই করতে চাইছি আমরা। নাতাশার কারাবাস তাঁদের দুজনের মধ্যে যে অপরিসীম দূরত্ব তৈরি করেছিল, তাঁর মৃত্যুর সময়েও সেই দূরত্ব কমানো গেল না। নাতাশা আর মহাবীরের যন্ত্রণা, তাঁদের লড়াইয়ের অদম্য ইচ্ছা আমাদের শক্তি যোগায়।

শেয়ার করুন

কিছু কথা

বিয়ের পর আমার ভালোমানুষ শ্বশুরমশাই বলেছিলেন নিজের পদবী আর সার্টিফিকেট-টিকেট শ্বশুরবাড়ির হিসেবে করবার জন্য উনিই ব্যবস্থা করবেন। আমার ননদের বিয়ের পরও উনিই মেয়ের কাগজপত্র স্বামীর নাম-ঠিকানায় করে দিয়েছেন। আমি খুব নিরীহ মুখে জানিয়েছিলাম যে তার দরকার নেই। আমার পদবী-ঠিকানা-গার্জিয়ানশিপ সব মায়ের নামে আছে। ওটাতেই আমি স্বচ্ছন্দ।

শেয়ার করুন

তোমার গল্প বলতেই হবে- অনুরাধা গান্ধীকে লেখা ভার্নন গঞ্জালভেস-এর চিঠি

আমি অবশ্য এই অভিজ্ঞতাকে সবসময়ই খুব দূর থেকে বিক্ষিপ্তভাবেই ‘জানতে’ পারব। যেমন আমি জানি, আমাদের পুরুষদের মন কত সহজেই তোমার কাজকে আমাদের সর্বোত্তম পুরুষ কমরেডদের কাজের মাপকাঠিতে তুলনা করে নিক্তিতে মেপে নিতে চাইবে, অঙ্ক কষে নেবে মনে মনে। এও জানি, একজন পুরুষ সাথীর যে কথাকে সুচিন্তিত পরামর্শ মনে করা হয়, একজন মহিলা কমরেডের সেই একই কথাকে রাগারাগি বকাবকি হিসেবে ধরে নেওয়াটাই রীতি। পুরুষের ক্রোধকে যেখানে মনে করা হয় গৌরবের, মেয়েদের রাগ সেখানে শুধুই নাকিকান্না, পুরুষের চোখের জল মহান আর মহিলার ক্ষেত্রে তা শুধুই কাজ বাগিয়ে নেওয়ার অছিলা। জানি, বিপ্লবী মননে কিভাবে উচ্চাকাঙ্ক্ষী পৌরুষ তার আধিপত্য বিস্তার করে, আর সেই পিতৃতান্ত্রিক ধাঁচার ভিতরে মহিলা কমরেডদের জোর করে পুরে ফেলার চেষ্টার বিরুদ্ধে তোমাদের মেয়েদের কী নিরন্তর এক লড়াই চালিয়ে যেতে হয়।

শেয়ার করুন

ডায়রির পাতায় ও মনের গহীনে আমার মা শেলী মুর্মু

পাঁচ মিনিটের ব্যবধানে প্রিয়জনের ‘আছে’ থেকে ‘নেই’ হয়ে যাওয়ার আকস্মিক ধাক্কা থেকে বেরিয়ে মা’কে আবার ছুঁতে পারার বাসনা নিয়েই ডায়রি হাতড়ানো। এ এক অন্য মা। যে দাপুটে মা’কে নিজের শর্তে বেঁচে থাকতে দেখেছি, গভীর, গোপন একান্ত আপন সেই মায়ের জীবনের অশেষ আক্ষেপ মন ভারী করে বই কি।

শেয়ার করুন

ঘুরতে ঘুরতে একলা

যাই কারণ সাধারণত মেয়েদের একা ঘুরতে যাওয়া সমাজের কাছে খুবই গর্হিত কাজ, তাই বাড়ীর লোকেদের অনুমতি একেবারেই পাওয়া যায় না। “লোকে কী বলবে?” “কিছু যদি হয়ে যায়?” “বিয়ের পর বরের সাথে যাস।” “ঘুরতে না গেলে কী এমন আহামরি হবে?” ইত্যাদি বিভিন্ন টিপ্পনী প্রায় সব ঘরেই। তাই যাই। পুরুষই পারে মেয়েদের নিরাপত্তার দায়িত্ব নিতে এই চিন্তাধারা থেকেই জন্ম নেয় ঘুরতে যাওয়ায় এত বিধিনিষেধের। নিজের শারীরিক নিরাপত্তার দায়িত্ব নিজের কাঁধে নিয়ে, সামাজিক প্রতিকূলতা কে তোয়াক্কা না করে নারী ভ্রমণকারীর সংখ্যা বাড়ছে, আমি তার ভাগীদার হতে চাই, তাই যাই। একা ঘুরতে যাওয়ার মধ্যে যে খানিকটা ভয় আর একাকীত্ব মিশে থাকে, ট্রিপ শেষ হলে যে মানুষের প্রতি ভালোবাসা, স্বাধীনচেতনা এবং আত্মবিশ্বাস চারগুণ বেড়ে যায়, তাই যাই।

নিজেকে ভালোবাসতে ভালো লাগে।

আর ভালোবাসা না থাকলে মেয়ে খাবে কী?

শেয়ার করুন

আর কী বা দিতে পারি?

এই যে তুমি দ্রুত ছুটছ, দিশার বয়সের দিকে, সফুরার বয়সের দিকে, অথচ আমি তোমার বাসযোগ্য করে যেতে পারছি না পৃথিবীকে, গ্লানি হয় তার জন্য৷ আগলাতে পারলে বেশ হত। অন্যথায় বর্ম-টুকু দিয়ে যাই। বড় হয়ে যদি একই স্বৈরাচার, একই অসাম্য দেখো, তাহলে জেনো, মা-মাসিরা লুকিয়ে পড়েনি, পিছু হটেনি। হয়ত পারেনি, কিন্তু চেষ্টা তারা করেছিল। প্রতিরোধ এক যাত্রা। সে যাত্রার শরিক হোয়ো তুমিও। মিছিল-শেষে মিছিলের জনতার মুখের আলো দেখেছ? প্রতিরোধ এক উৎসবও। তাতে সামিল হোয়ো।

প্রতিরোধই একমাত্র বর্ম। তা ছাড়া আর কী বা দিতে পারি?

শেয়ার করুন

​মানুষীর হাত

মেয়ে ফেরে। নিজের চোখের তারায় প্রাণ ঢালে, অচেনা, বিপুলা এই জগতের প্রতিটি প্রাণকণায় লিখে দেয় তার নাম। পিছনে পড়ে থাকে ‘চরিত্র’ নামের একটি বাজপড়া গাছ, যে বহুদিন ধরে মৃত বলে ঘোষিত।

শেয়ার করুন