গল্প

রাজবন্দী

– শুনেছ ও দেশে কী হয়েছে?

– কোন দেশে?

– আরে ওই দেশে।

– ওহ আচ্ছা, ওই দেশে? তাই বল। কিন্তু ওখানে আবার কী হল?

– কেন তুমি শুনতে পাওনি?

– আরে বলবে তো কী হয়েছে? তখন থেকে গৌরচন্দ্রিকা করে চলেছ।

– ছেলেটিকে ধরে নিয়ে গেছে তো।

– কোন ছেলেটিকে? ওদেশে তো অনেক ছেলেকেই ধরে নিয়ে যায়।

– আরে ওই ছেলেটি।

– ও বুঝেছি। ওই ছেলেটি! ঠিক। তা এবারে কী হবে?

– কী আবার হবে? চাবুকের ঘা খাবে। সব নিয়ে গেছে। আজ অব্দি যা কাজ করেছিল সব। বলে ও নাকি দেশদ্রোহী। দেশের নাম খারাপ করছে…বুঝেছ তো?

শেয়ার করুন

পোষ্য

রত্নদীপের সরু সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে সুখময় পাল এক তীব্র আকর্ষণ বোধ করলেন তাঁর দেহের প্রতিটা অণুতে, পরমাণুতে। এই অপরূপ টান বোধ করা মাত্র সিঁড়ির দেওয়ালে পিঠ ঠেকে গেল তাঁর। কোনোক্রমে ঘাড় ঘুরিয়ে সিঁড়ির উপরের ধাপগুলোর দিকে তাকালেন। দেখলেন, খয়েরি প্যান্ট আর ঘিয়ে শার্ট পরে, সিঁড়ি বেয়ে উপরের দিকে উঠে যাচ্ছেন তরুন সাহা। তাঁর হাতের হলুদ প্লাস্টিকের কেজো ব্যাগও সাথে সাথে উঠে যাচ্ছে রত্নদীপের সিঁড়ি বেয়ে। বিবশ সুখময়ের শ্বাস প্রশ্বাস স্বাভাবিক হতে কিছু সময় নিল। ধীরে ধীরে পরাজিত সৈনিকের মতো সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামতে থাকলেন তিনি। প্রতি পদক্ষেপে মনে হল, তাঁর গা থেকে তিনি নিজেই ঝরে ঝরে পড়ছেন।

শেয়ার করুন

কলকাতায় ২০১৪

মাথার কেশরগুলি মাকড়শার জালের মতন। একটা নির্বিষ সাপ, আয়তনে একটা বড়রাস্তার মত। গায়ে চাকা-চাকা গাড়িমার্কা ছোপ। তাকে আস্তে আস্তে পেঁচিয়ে ধরছে। জড়িয়ে ধরছে বলা ঠিক।

শেয়ার করুন

বাস্তার-রিয়ালিজম বা জাদু বাস্তারবাদ

আমার, আপনার, অর্জুন শুক্লার, ডিজির, কেআরপি ক্যাম্পের এবং কথকের অস্বস্তি বাড়িয়ে দোদি আবার বেঁচে উঠবে। এটা সেই গল্পেরই ধরতাই।

শেয়ার করুন

পুণ্য

বৃষ্টি থামলে আষাঢ় মাসের ভাপ টের পাওয়া যায়। কাঁঠালের রোঁয়া আলগা হয়ে আসে ভিতর ভিতর, এই ভাপে। গতরের মাংস হাড্ডি ছাড়তে চায়। ফুলরানি চারদিকে নজর চালিয়ে, গায়ের কাপড় আলগা করে দেয়। দামড়া পাট ক্ষেত ছাড়া তার দিকে নজর দেওয়ার কেউ নেই এখানে। বেফিকর হয়ে পোতির মাথার পেঁয়াজের রস ঘষতে থাকে। এক টাকা সাইজের গোল চকচকা চামড়া খোঁচখোঁচ শুয়োরের লোমের মত চুলের ভিতর থেকে উঁকি দেয়। চামড়ায় জ্বালাপোড়া শুরু হলে মাথা ডান বাঁ করে ঝুমড়ি।

শেয়ার করুন

কাটারা যেভাবে দুনিয়ার শ্রেষ্ঠ নাগরিকে পরিণত হল

র‍্যাফ যখন আমাদের দৌড় করাচ্ছিল, তখন আমরা কুত্তার মতো দৌড়চ্ছিলাম বটে, তবে বিশ্বাস করুন, আমাদের মনে এতোটুকু রাগ-ঘৃণা জন্মায়নি। কাটাদের সবসময়ে মন পবিত্র রাখতে হয় – এই শিক্ষা আমরা ছোটবেলা থেকেই পেয়েছিলাম। ফলে দৌড়নোর সময় যাতে আমাদের মন কলুষিত না হয়ে পড়ে সেই কারণে আমরা ভালো ও মজার জিনিস কল্পনা করতে শুরু করে দিয়েছিলাম।

শেয়ার করুন

তিনু ও ড্রাগন কাকুর গল্প

দরজার ছিটকিনিতে হাত পৌঁছচ্ছে না। গোড়ালি উঁচু করে হাতের আঙুলগুলো দিয়ে কোনওমতে ছোঁয়া যাচ্ছে, কিন্তু ধরা যাচ্ছে না। পায়ের আঙুলের ওপর পুরো শরীরের বোঝা। নিঃশ্বাস চেপে আসছে। ভারসাম্য নড়বড় করছে। আঙুল ঘষে যাচ্ছে ছিটকিনির হাতলে। আর এক চিলতে পরিমাপে আটকে যাচ্ছে হাতের কবল থেকে। অনেকক্ষণের কসরতে হাঁফ ধরে গেল। মেঝেতে শুয়ে গড়িয়ে নিল। লাল মেঝেতে কালো শরীরটা একতাল মাটির মতো। ঘামে চ্যাটচ্যাটে চামড়া মোলায়েম মেঝেতে চেটে আছে। নড়লে চড়লে স্টিকারের মতো উঠে আসছে। তিনুর খালি গায়ে থাকতে ভালো লাগে না, লজ্জা করে। শরীরের মেদ লেগেছে। স্তনের চারপাশে মাখনের মতো চর্বির প্রলেপ। তিনু বুকের ওপর হাতের ছোট পাঞ্জাটা চেপে ধরে লজ্জা পায়। মা ঘুমোচ্ছে মশারির ভিতর। মা ঘুমোলে নাকের ভিতর থেকে একটা মিষ্টি শব্দ আসে। ছোট ছোট ঢেউয়ের মতো নিঃশ্বাস প্রশ্বাসের শব্দ। তিনু দরজার ছিটকিনি খুলতে বিশ্রান্ত হয়ে মশারির মধ্যে ঢোকে।

শেয়ার করুন

হারাম

“তোমারে তো খেলাধূলায়, পড়াশুনায় বাধা দেওয়া হয় নাই। তুমি কি আরও সতর্ক হয়ে আদবের সাথে এগুলান করতে পারতা না?”— আর্জিনা চুপ। “তুমি কি জানো মৌলানা বাড়ির মেয়েদের আদব সহি না হলে সে হারামের দায়ে সে বাড়ির নামাজীদেরও আল্লাহ শাস্তি দেন?”— আর্জিনা চুপ। “তুমি আর খেলবা না ফুটবল, কাল তো রবি, আমি সোমে তোমার স্কুলে গিয়ে বলে আসব”— আর্জিনা চুপ।

শেয়ার করুন

বিউটি এবং বিস্ট

মা বলত, জুতো দেখে মানুষকে চেনা যায়। মানুষটা অগোছালো না পরিপাটি, দুস্থ না রোগগ্রস্থ, অস্থির না সমাহিত, বুর্জোয়া না বামপন্থী, অথবা বুর্জোয়া এবং “বামপন্থী” কিনা- মানুষের দুটো পায়ের পাতায় তা লেখা থাকে বলে মা বিশ্বাস করত।

শেয়ার করুন

হারুর মৃত্যুদণ্ড

গ্রামের সবাই প্রায় বুঝতে পারছে হারুর পুরো মামলাটাই সাজানো ঘটনা। শুধু প্রমাণের অভাবেই বেচারার ফাঁসি হল। বাদীপক্ষের হয়ে দু’জন মানুষ, একটি ছাগল এবং মোষ হারুর বিরুদ্ধে সাক্ষী দিয়েছে মাত্র। জজ সাহেব চাইলেও হারুকে ক্ষমা করতে পারতেন না। হারুর উকিল অনেক তর্ক বিতর্ক করেও ওই প্রমাণের সত্যতা অস্বীকার করতে পারেননি এবং হারু নিজেও নির্দোষ হবার পাল্টা প্রমাণ দিতে পারেনি।

শেয়ার করুন

উইচহাণ্ট

চান্দ্রেয়ী দে ১ বাঁশঝাড়ের আড়াল থেকে অল্প অল্প ধোঁয়া বের হয়ে আসছে। পথ ঘুরে ঘুরে বেঞ্জামিন সেদিকে এগোতে থাকে। ছায়ায় বসে আছে কারা যেন। হাতে ঝুলছে জ্বলন্ত বিড়ি, চোখ সামনের দিকে। নদীর দিকে, পাহাড়ের দিকে, রোদে জলে সাঁতারু বাচ্চাদের দিকে। পিছন থেকে এক পা এক পা করে এগিয়ে আসে বেঞ্জামিন। কাঁহা সে আয়ে হো আপ? …

উইচহাণ্ট Read More »

শেয়ার করুন

ঝাঁঝ

নলিনীবালা কখনো সরাসরি কথা বলতে পারেননি স্বামীর মুখে। আর একবার যদি তুমি সরাসরি কথা বলার অভ্যাস হারাও, কারোর সাথেই আর বলতে পারবে না। জমাদার বা কলের মিস্তিরি-র সংগেও না। মানে পুরুষমানুষ হলেই তাকে কোনো কথা বলার আগে পাঁচবার ভাবতেন, মুখ যেন কে আটকে ধরত। মেয়েদের সঙ্গে অবশ্য কোনো সমস্যা নেই। কাজের মেয়ে, তস্য মেয়ে, তাদের মুখ খারাপ করেন নি, কিন্তু বিঁধিয়ে বিঁধিয়ে শুনিয়ে দিতে পারতেন বেশ। সে ভাবে ভেবে দেখলে পুরুষদের সব অন্যায় আবদার সহ্য করে নেওয়া আর মেয়েদের কারুকে কোনদিন ছেড়ে কথা বলেননি নলিনী। মেয়েদের পোশাক, মেয়েদের চলনবলনের উপর খবরদারি করে স্বামীসকাশে নিজের কথা না বলাটাকে উশুল করে নিতেন উনি।

শেয়ার করুন

সরণ

অর্ধেক ডিম খেতে খেতে সে মায়ের চিৎকার শোনে, কি নোংরা নোংরা কথা বলে মা! তাদের বাংলা স্যার বলেন, সুন্দর করে কথা বলাটা একটা শিল্প। প্রতিটা শব্দ ধীরে ধীরে উচ্চারণ করবে। ফ্যাক করে হাসি পায় আভার। স্যারের বাড়িতে সবাই সুন্দর করে কথা বলে! জলপাইগুড়ি থেকে আসেন স্যার। কবিতা লেখেন পত্রিকায়, নিজেই বলেছেন। যদি উনি জানতেন আভাদের বাড়িতে সবাই কেমন করে কথা কয়! মা কথায় কথায় শতেকখোয়ারি, জন্মের পাপ, বথুয়া বলে নিভাকে, তাকেও; মাকে একটুও সুন্দর লাগে না তার। বাবার অফিসের সাহেবের ছেলের বিয়েতে যখন তাদের বাড়ির সবাইকে নেমন্তন্ন করেছিল, জ্বর আসছে বলে যায়নি আভা। আসলে সে ওদের সাথে যেতে চায়নি। মা আর নিভা লাল লিপস্টিক মেখে, রজনীগন্ধা সেন্টের গন্ধ ছড়াতে ছড়াতে গেছিল। ওরা চলে যাওয়ার পর কুয়ার পাড়ে বসে গলায় আঙ্গুল ঢুকিয়ে বমি করে ছিল সে।

শেয়ার করুন

মহামারী

এই রাণীর রাজা না থাকলেও স্বামী ছিলেন বিলক্ষণ। তবে বারো বছরের সংক্ষিপ্ত স্বামীসঙ্গে ছয়টি জীবিত ও একটি মৃত সন্তানের গর্ভদানের পর তিনি গত হন, অতঃপর দীর্ঘ চল্লিশ বছরের বৈধব্য। ১০ বছর আগে ইস্তক একফালি জমির শাকসব্জী গাঁটরি বেঁধে কলকাতার বাজারে বেচে আসতেন। একদিন রাত্তিরে স্বপ্ন দেখে হাত-পা ছোঁড়াছুড়ি করতে গিয়ে বাম হাতটা কনুই থেকে ভাঙল। ডাক্তার বলেছিল অপারেশন করতে হবে। মঞ্জুরাণীর চোদ্দগুষ্টির কেউ কোনওদিন অপারেশন করায়নি। হঠাৎ এসে মঞ্জুরাণীর জন্য সে নিয়ম বদলাবে এমনটা কল্পনা করা ভুল। বাস্তবেও তেমনতর কিছু ঘটেনি। মঞ্জুরাণীর কনুই থেকে হাতটা তিনকোণা হয়ে বিপ্রতীপ কোণে বেঁকে ঝুলে থাকল।

শেয়ার করুন