নারী এবং অর্থনীতি

শার্লট পারকিন্স গিলম্যান-এর লেখা Women and Economics – A Study of the Economic Relation Between Men and Women as a Factor in Social Evolution প্রকাশিত হয় ১৮৯৮ সালে।

ভাবনা চিন্তার দিক থেকে সময়ের চেয়ে অনেক এগিয়ে থাকা শার্লট এই বইয়ে আলোচনা করেন কিভাবে মনুষ্যজাতিই একমাত্র প্রজাতি হয়ে ওঠে যাদের স্ত্রীলিঙ্গ বেঁচে থাকার জন্য সম্পূর্নভাবে পুরুষদের ওপর নির্ভরশীল। তার আত্মজীবনীমূলক ছোট গল্প দ্য ইয়েলো ওয়ালপেপার (১৯৮২) এবং নারীবাদী ইউটোপিয়ান উপন্যাস হারল্যান্ড (১৯৭৯) এর মতো বহুচর্চিত না হলেও উইমেন অ্যান্ড ইকোনমিক্স প্রায় একটি ম্যানিফেস্টোর আকার পায় এবং সাতটি ভাষায় অনুদিত হয়। বিয়ে, পরিবার, গার্হস্থ্য জীবন ইত্যদির নারীবাদী পুনর্মূল্যায়নের মাধ্যমে শার্লট মহিলাদের অর্থনৈতিক স্বাধীনতার ধারণাগুলি নিয়ে এই বইয়ে আলোচনা করেন। নারী ভাবনা এবং মাতৃত্ব নিয়ে সমাজে বহুপ্রচলিত রোম্যানটিকতার ক্রিটিক রেখে তিনি গার্হস্থ্য কর্ম এবং শিশুর প্রতি কেয়ারের ধারণাগুলিকে সোশ্যাল রেসপনসিবিলিটির জায়গা থেকে পুনর্সজ্ঞায়িত করেন।     

নারী প্রশ্ন, এথিক্স, শ্রম, মানবাধিকার, সামাজিক সংস্কার ইত্যাদি নানা বিষয় নিয়ে শার্লট তার জীবদ্দশায় ফিকশন এবং ননফিকশন দুই ফর্মের অনেক লেখালেখি করেন এবং আমেরিকা, জার্মানি, নেদারল্যান্ডস, ইংল্যান্ড, অস্ট্রিয়া এবং হাঙ্গারি-র বিভিন্ন জায়গায় বক্তৃতাও দেন। ১৯০৩ সালে, তার বক্তৃতামালা এবং উইমেন অ্যান্ড ইকোনমিক্স-এর ভাবনাগুলকে কেন্দ্র করে দ্য হোম: ইটস ওয়ার্ক অ্যান্ড ইনফ্লুয়েন্স বইটি তিনি লেখেন। নারীজাতি স্বগৃহে নিপীড়িত এবং তাদের মানসিক উন্নতির জন্য গৃহে নারীর অনুকূল পরিবেশ গড়ে তুলতে হবে, এই ছিল দ্য হোম-এর মূল প্রতিপাদ্য। 

তার সমাজতান্ত্রিক নারীবাদকে মনে রেখে শার্লট পারকিন্স গিলম্যানের জন্মমাসে আমরা উইমেন অ্যান্ড ইকোনমিক্স থেকে কিছু নির্বাচিত অংশ অনুবাদ করলাম।

বইয়ের প্রথম পরিচ্ছেদের কিছু নির্বাচিত অংশ

অর্থনৈতিক স্বাধীনতা, খুব বেশি হলে, একটি আপেক্ষিক শর্ত। সেই দিক থেকে দেখতে গেলে, বিস্তৃত অর্থে প্রত্যেক জীব একে অপরের ওপর অর্থনৈতিকভাবে নির্ভরশীল – পশুরা শাকসবজির ওপর এবং মানুষ, পশু এবং শাকসবজি এই দুইয়ের ওপর। এবার একটু ছোট পরিসরে দেখতে গেলে প্রতিটি সামাজিক জীবন অর্থনৈতিকভাবে পরস্পর নির্ভরশীল; সম্মিলিতভাবে মানুষ যা উৎপাদন করতে পারে আলাদা আলাদা ভাবে ততটা উৎপাদন করা তার পক্ষে সম্ভব না। কিন্তু, আর একটু খুঁটিয়ে ব্যাখ্যা করতে গেলে বোঝা যাবে, মানুষের স্বতন্ত্র অর্থনৈতিক স্বাধীনতার অর্থ হল ব্যক্তিমানুষ যা পায় তার বিনিময়ে সে অর্থ প্রদান করে, যা পায় তার জন্য কাজ করে, এবং অন্য মানুষ তাকে যতটা দিচ্ছে তার সমতুল্য সে ফেরত দেয়। আমি জুতোর জন্য মুচির ওপর নির্ভরশীল, কোটের জন্য দর্জির ওপর – কিন্তু আমি যদি মুচি এবং দর্জিকে তাদের প্রদত্ত জুতো এবং কোটের বিনিময়মূল্য হিসেবে আমার বাড়ি নির্মাণ করতে পারার শ্রম ফেরত দিই তাহলে আমি আমার ব্যক্তিগত স্বাধীনতা ধরে রাখতে পারছি। আমি তাদের কোন উৎপাদিত পণ্য নিলাম না এবং বিনিয়মে আমার উৎপাদিত পণ্যও দিলাম না। যতক্ষণ পর্যন্ত আমি যা পাচ্ছি তার বিনিময়ে সেটাই ফিরিয়ে দিচ্ছি, ততক্ষণ পর্যন্ত আমি অর্থনৈতিকভাবে স্বাধীন।

নারীও অর্থনৈতিক পণ্যদ্রব্য উপভোগ করে। বদলে সে কী ধরনের অর্থনৈতিক পণ্যদ্রব্য ফেরত দেয়? এই যে দাবী করা হয় যে বিবাহ একটি অংশীদারিত্বের সম্পর্ক, যেখানে বিবাহে আবদ্ধ দুই ব্যক্তি এমন সম্পদ উৎপাদন করে যা তারা পৃথকভাবে উৎপাদন করতে পারে না, তা কখনও কোন পরীক্ষার মধ্যে দিয়েই যায় না। একজন সুখী, এবং স্বাচ্ছন্দ্যে থাকা ব্যক্তি একাধিক অসুখী এবং অস্বস্তিকর জিনিস উৎপাদন করতে পারে, একথা পিতা বা ছেলের মতো স্বামীর ক্ষেত্রেও সত্য। সাধারণভাবে বলতে গেলে, একজন পুরুষের সুখী এবং শক্তসামর্থ্য থাকার শর্তগুলো তার থেকে নিয়ে নিলে তার শিল্প অসমর্থ হয়ে পড়তে পারে। কিন্তু যেসকল আত্মীয়রা তাকে খুশি রাখে, শুধু এই কারণে তারা পুরুষটির ব্যবসায়িক অংশীদার হতে পারে না এবং তার আয়ের ভাগের অধিকারীও হয় না।  

প্রদত্ত সুখের জন্য কৃতজ্ঞতাপূর্বক যা ফিরিয়ে দেওয়া হয় তা অংশীদারিত্ব বিনিময়ের পদ্ধতি নয়। একজন পুরুষ তার স্ত্রীর সঙ্গে যেরূপ স্বাচ্ছন্দ্য ভোগ করে তা যেমন ব্যবসায়িক অংশীদারিত্বের স্বরূপ নয় তেমনই সেটা নারীর শিল্প এবং সাফল্যও নয়। একজন মহিলা গৃহ রক্ষক তার নিজের কাজের জায়গা থেকে সফল এবং পরিশ্রমী হতে পারেন কিন্তু এর জন্য তিনি ব্যবসায়িক অংশীদার হবেন না। পুরুষ এবং তার স্ত্রী তাদের বাচ্চাদের প্রতি কর্তব্যের (যৌথ ভালোবাসা, দায়িত্ব এবং সেবা) বাধ্যবাধকতায় প্রকৃতভাবেই অংশীদার।

কিন্তু একজন পুরুষ – যে পেশায় নির্মাতা, বা ডাক্তার, বা আইনজীবী – যখন বিবাহ করেন তখন সন্তানের পিতামাতা হিসেবে অংশীদার হওয়া সত্ত্বেও তার স্ত্রীকে নিজের ব্যবসার অংশীদার করেন না যদি তার স্ত্রী নিজেও একজন নির্মাতা, চিকিৎসক বা আইনজীবী হন। এই ব্যবসায় প্রশিক্ষণ এবং অভিজ্ঞতা ছাড়া স্ত্রী বিবেচনার সঙ্গে পরামর্শও দিতে পারেন না। একজন সুরকার স্বামীকে ভালোবাসার মানে এই নয় যে স্ত্রী নিজেও একজন সুরকার হয়ে উঠবেন; এবং স্ত্রীর মৃত্যুতে মন ভেঙে গেলেও স্বামীর ব্যবসা কখনও ভেঙে পড়বে না যদি না স্ত্রীর মৃত্যুশোকে বিহ্বল হয়ে সে নিজে কর্মক্ষমতা হারায়। বিবাহের সম্পর্কে আবদ্ধ একজন পুরুষের মতো যতক্ষণ না স্ত্রী পুঁজি, অভিজ্ঞতা অথবা শ্রমের মাধ্যমে কোন অবদান রাখছে ততক্ষণ পর্যন্ত কোনভাবেই সে তার স্বামীর ব্যবসায়িক অংশীদার নয়। বেশিরভাগ পুরুষই কোন নারীর সঙ্গে (সে তার স্ত্রী হোক বা না হোক) ব্যবসায়িক অংশীদারিত্ব শুরু করার আগে গুরুত্ব সহকারে দ্বিধা বোধ করবেন।

স্ত্রী যদি সত্যিই ব্যবসায়িক অংশীদার না হয়, তাহলে সে তার স্বামীর কাছ থেকে কিভাবে খাবার, পোশাক এবং তার দেওয়া আশ্রয় উপার্জন করে থাকে? তাৎক্ষনিক জবাব হবে – বাড়িতে সেবা প্রদান করে। এই বিষয়ে এক অস্পষ্ট ধারণাকেই সার্বিক করে তোলা হয় যে নারী সরাসরি এবং উপরি যাই পাচ্ছে তা সে বাড়িতে সেবা প্রদান করেই অর্জন করছে। এমতাবস্থায় আমরা একটি ব্যবহারিক এবং সুনির্দিষ্ট অর্থনৈতিক ভিত্তিতে পৌঁছচ্ছি। যদিও মহিলারা সম্পদের উৎপাদনকারী নয় কিন্তু তারা প্রস্তুতির চূড়ান্ত প্রক্রিয়াগুলি এবং বিতরণের কাজগুলি করে যান। পারিবারিক অবস্থায় তাদের শ্রমের নিখাদ অর্থনৈতিক মূল্য রয়েছে।

কিছু শতাংশ মানুষ অন্য মানুষদের সেবা প্রদান করে যাবেন এবং যারা এই সেবা পাচ্ছেন তারা আরও বেশি উৎপাদন করে যেতে পারবেন, এহেন অবদান উপেক্ষা করা উচিৎ না। ঘরের মহিলাদের শ্রম আবশ্যিকভাবেই পুরুষদের অতিরিক্ত সম্পদ উৎপাদন করতে সক্ষম করে আর তাই মহিলারা সমাজের অর্থনৈতিক ফ্যাকটরগুলোর একটি হয়ে ওঠে। কিন্তু সেভাবে দেখতে গেলে ঘোড়ারাও তাই। ঘোড়ার শ্রমও পুরুষদের অতিরিক্ত সম্পদ উৎপাদন করতে সক্ষম করে। ঘোড়াও সমাজের অর্থনৈতিক কারণগুলির একটি। কিন্তু ঘোড়া নারীর মতোই অর্থনৈতিকভাবে স্বাধীন নয়। কোন পুরুষ একা যতটা প্রয়োজনীয় কাজ পরিবেশন করতে পারবেন তার চেয়ে যদি সে এবং তার ভ্যালে (valet) একসাথে আরও বেশি কাজ করতে পারে তাহলে সেই ভ্যালেও প্রয়োজনীয় পরিষেবাগুলি সম্পন্ন করছেন। কিন্তু, সেই ভ্যালে যদি পুরুষ মানুষটির সম্পত্তি হয়, তার হয়ে কাজ করবার জন্য বাধ্য থাকে এবং এর বিনিময়ে যদি তাকে কোন অর্থ প্রদান না করা হয় তাহলে সে অর্থনৈতিকভাবে স্বাধীন নয়।  

পারিবারিক পরিসরে একজন স্ত্রী যে শ্রম দেয় সেটা তাকে আপামর মহিলাদের কার্যকরী দায়িত্ব হিসাবে প্রদান করা হয়, তার কর্মসংস্থান হিসাবে না। এক দরিদ্র ব্যক্তির স্ত্রী, যে ছোট গৃহে কঠোর পরিশ্রম করে এবং পরিবারের সব কাজ করে, অথবা এক ধনী ব্যক্তির স্ত্রী, যে বিবেচনা এবং চারুতার মাধ্যমে একটা বড় গৃহ পরিচালনা করে এবং বাড়ির বিভিন্ন কাজের তদারকি করে, এরা উভয়েই তাদের কাজের জন্য ন্যায্য বেতন পাবার অধিকারী। 

এই যুক্তির ভিত্তিতে, গৃহকর্মের পরিষেবার জন্য প্রাপ্য উপার্জনের বাইরে (অর্থাৎ গৃহ পরিচারিকার কাজ করা, আয়ার কাজ করা, দর্জির কাজ করা, অথবা বাড়ির তত্ত্বাবধায়কের কাজ করা) স্ত্রীদের আর কোন রোজগার থাকবে না। এর ফলে ধনী ব্যক্তিদের স্ত্রীর ব্যয়ের অর্থ হ্রাস পাবে এবং দরিদ্র ব্যক্তির পক্ষে তার স্ত্রীকে “সহায়তা” করার ক্ষমতা একেবারে কমে যাবে। তবে সেই দরিদ্র মানুষটি যদি এই অবস্থার সম্মুখীন হয়ে তার স্ত্রীকে বাড়ির চাকর1 হিসেবে বেতন প্রদান করেন তাহলে এর পরে তারা দুজন মিলে তাদের বাচ্চাদের সহায়তার জন্য একত্রে তহবিল তৈরি করতে পারবেন। পুরুষটি এক্ষেত্রে একজন চাকর রাখলেন এবং তার স্ত্রী পরিবারকে আগলে রাখতে সাহায্য করলেন। কিন্তু এই প্রক্রিয়ায় পৃথিবীতে কোথাও “ধনী মহিলা” তৈরি হবে না। এমনকি সমাজের সর্বোচ্চ শ্রেণির ব্যক্তিগত পরিচারিকাও, তা তার যতই কার্যোপযোগিতা থাকুক না কেন, অগাধ টাকাকড়ি কোনদিনই করতে পারবে না। না সে হীরে কিনতে পারবে, না তার আস্তাবল থাকবে, এমনকি তার পক্ষে ঘোড়ার গাড়ি কেনাও সম্ভব হবে না।

তবে এই আলোচনার মূল বিষয়টি হল, নারীর গার্হস্থ্য শিল্পের অর্থনৈতিক মূল্য যাই হোক না কেন তারা তা পায় না। যে নারী সবচেয়ে বেশি কাজ করে সে সবথেকে কম টাকা পায় এবং যে নারীর টাকা বেশি সে কম কাজ করে। অর্থনৈতিক আদান-প্রদানে নারীদের শ্রমকে উপাদান হিসেবে ধরা হয় না। মহিলাদের কাজকে তাদের দায়িত্ব হিসাবে ধরা হয় এবং নারীর অর্থনৈতিক অবস্থানের সঙ্গে তাদের গৃহকর্মের কোনও সম্পর্ক নেই, যদি না এই সম্পর্ক একদম একে অপরের বিপ্রতীপে থাকে। এবং তাদের যদি শুধু উপার্জনের ভিত্তিতে (অর্থাৎ যতটুকু ঘরের কাজ করেছে, তার বেশি নয়) ন্যায্য বেতন দেওয়া হয় তাহলে গৃহকর্মে নিযুক্ত হওয়া সমস্ত মহিলা অর্থনৈতিক মর্যাদায় বাড়ির চাকরে পরিণত হবে। খুব কম মহিলা অথবা পুরুষ এই অবস্থার মুখোমুখি হতে চায়। মহিলারা যে গৃহশ্রমের মাধ্যমে তাদের জীবনধারণ করে সেই ধারণাকে তাৎক্ষণিকভাবে পরিত্যাগ করে আমাদের বলা হয় যে তারা মা হিসাবে তাদের জীবিকা অর্জন করছে। এটি এক অদ্ভুত অবস্থান। আমরা এটা নিয়ে প্রায়শই কথা বলে থাকি, এবং গভীর অনুভূতি নিয়েই সেই কথাগুলো বলা হয়, কিন্তু এর যথাযথ বিশ্লেষণ আলোচনার বাইরে থেকে যায়।   

যদি প্রশ্ন করা হয়, অর্থনৈতিক বিনিময়ের সময়ে সম্মিলিতভাবে সমগ্র জাতির জন্য অথবা তাদের স্বামীর প্রতি মহিলাদের প্রদত্ত পণ্য বা শ্রমের বিনিময়ে তারা নিজেরা কী ধরনের পণ্য এবং শ্রম ফেরত পেলেন, অথবা তাদের জামাকাপড়, জুতো, আসবাবপত্র, খাবার এবং আশ্রয়ের জন্য মহিলাদের কিরূপ অর্থ প্রদান করতে হয়, তখন আমাদের বলা হয় যে মাতৃত্বের দায়িত্ব এবং পরিষেবাগুলির মাধ্যমে নারী তার সহায়তা প্রাপ্তির অধিকার পায়।

তাই যদি হয়, মাতৃত্ব যদি নারীর পোশাক এবং খাদ্যের জন্য বিনিময়যোগ্য পণ্য হয়, তাহলে আমাদের অবশ্যই মাতৃত্বের চরিত্র অথবা পরিমেয় বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে বিনিময়মূল্যের চরিত্র এবং পরিমেয় বৈশিষ্ট্যের সম্পর্ক খুঁজতে হবে। এটা যদি সত্যি হয় তাহলে যে নারী মা নয় তার কোন অর্থনৈতিক মর্যাদা থাকবে না; এবং যে সকল নারী মা হয়েছেন, মাতৃত্বের বহর অনুযায়ী তাদের অর্থনৈতিক মর্যাদাও আপেক্ষিক হবে। এই যুক্তি অবশ্যই অদ্ভুত। সন্তানহীন স্ত্রী এবং অনেক সন্তানের মায়ের একই পরিমাণ অর্থ আছে; যে মায়ের অনেক সন্তান সেই বাচ্চারা আপাতভাবে মায়ের অর্থ গ্রাস করবে; এবং অদক্ষ মায়েরাও একই পরিমাণ সহায়তা পাবে। ফলে আপাতদৃষ্টিতে আমাদের চোখের সামনে মহিলাদের অর্থনৈতিক রক্ষণাবেক্ষণ তাদের মাতৃত্ব দ্বারা নির্ধারিত নয়। মাতৃত্বের সঙ্গে নারীর অর্থনৈতিক মর্যাদার কোন সম্পর্ক নেই। আদিম জাতিগুলোর মধ্যে এটা সত্য, পিতৃতান্ত্রিক সময়েও এই অবস্থানের কিছু সত্যতা আছে। 

নারীকে নিজের অর্থনৈতিক স্বাধীনতার ভিত তৈরি করার সুবিধেগুলো থেকে বের করে দেওয়া হয়েছে; দেখানো হয়েছে যে নারী, শ্রেণি হিসেবে, সম্পত্তি উৎপাদন এবং বিতরণ করতে পারে না; ব্যক্তি মহিলারা প্রাথমিকভাবে বাড়ির চাকর হিসেবে শ্রম দিয়ে থাকে, তাদের মাইনে দেওয়া হয় না, এবং টাকা দিলেও এহেন অর্থনৈতিক মর্যাদায় তারা তৃপ্ত হবে না; যতক্ষণ না একই পেশায় কাজ করছে, স্ত্রী তার স্বামীর ব্যবসায়িক অংশীদার এবং সম্পত্তির সহ-উৎপাদনকারী কোনটাই হয়ে উঠবে না; তারা মায়েদের মতো বেতন পায় না এবং মাতৃত্বের জন্য এই মাইনে পাওয়ার ব্যাপারটাও অবর্ণনীয় অধঃপতন – তাহলে, যারা অস্বীকার করে যে মহিলারা পুরুষদের সহায়তায় আছে তাদের হাতে আর কী পড়ে থাকে? এখানে এক মজাদার অবস্থান হল, মাতৃত্বের কার্যকলাপ নারীদের অর্থনৈতিক উৎপাদনের ক্ষেত্রে অযোগ্য করে রাখে এবং ফলস্বরূপ পুরুষের সহায়তা ন্যায্যতা পায়।  

ধরে নেওয়া হচ্ছে যে নারী অর্থনৈতিকভাবে স্বাধীন নয়, তাকে তার প্রজাতির পুরুষেরা প্রতিপালন করে। এটা অস্বীকার করে প্রথমেই যে নজির দেখনো হয় তা হল যে নারী বাড়ির গার্হস্থ্য কর্মকে কেন্দ্র করে যে শিল্প গড়ে উঠেছে তার মাধ্যমে নিজের ভারবহন করে। এরপর যখন দেখানো হল যে নারীর অর্থনৈতিক মর্যাদার সঙ্গে তার বাড়িতে দেওয়া শ্রমের কোন সম্পর্ক নেই; তখন বলা হল বাড়ির চাকর হিসেবে নয় বরং মা হিসেবে নারী তার জীবিকা নির্বাহ করে। এরপরে এও বোঝানো হল যে নারীর অর্থনৈতিক মর্যাদার গুণগত অথবা পরিমেয় বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে তার মাতৃত্বের কোন সম্পর্ক নেই; তখন সপক্ষে যুক্তি এল, মাতৃত্বের কারণে নারী অর্থনীতির উৎপাদনে সামিল হবার অযোগ্য আর তাই নারীর তার স্বামীর সহায়তায় থাকাই বাঞ্ছনীয়। এর থেকে বেশি এগোবার আগে এটা স্বীকার করতে হবে যে – নারী তার স্বামীর সহায়তাতে-ই বেঁচে থাকে। 

এই সমস্যার নৈতিকতা এবং প্রয়োজনীয়তার ভেতরে না গিয়েও আমরা একটা সর্বজনীন ভিত্তিতে পৌঁছতে পেরেছি – মনুষ্য প্রজাতির স্ত্রীলিঙ্গ তাদের পুরুষদের সহায়তায় বেঁচে থাকে। যেখানে অন্য প্রজাতির প্রাণীরা স্ত্রী-পুরুষ নির্বিশেষে তাদের জীবনধারণের জন্য ঘুরে বেড়ায়, চড়ে বেড়ায়, শিকার করে, হত্যা করে, আরোহণ করে, সাঁতার কাটে, খনন করে, দৌড়োয় এবং উড়ে বেরায়, সেখানে আমাদের প্রজাতিতে মহিলারা মনুষ্যজাতির জন্য নির্ধারিত কাজগুলো করে নিজেদের ভরণপোষণ করতে পারে না, বরং তাদের প্রতিপালনে পুরুষদের এগিয়ে আসতে হয়।   

এবার প্রয়োজনীয়তার অভিযোগগুলো নিয়ে ভাবা যাক। বলা হয়, মাতৃত্বের দায়িত্বগুলোর জন্য নারী নিজের ভরণপোষণের দায়িত্ব নিতে পারে না। যেখানে অন্য প্রজাতির স্ত্রীলিঙ্গ মাতৃত্বের কারণে নিজেদের এবং বাচ্চাদের জীবনধারণের জন্য কাজের ব্যাপারে অযোগ্য হয়ে পড়ে না কখনও, সেখানে মনে হচ্ছে যেন মনুষ্যজাতির মাতৃত্বের দায়িত্বের কারণে এক প্রাপ্তবয়স্ক নারীকে তার সমস্ত শক্তি শুধু বাচ্চার লালনপালনের জন্যই সরিয়ে রাখতে হচ্ছে। মাতৃত্বে জন্য নির্ধারিত এই শক্তি পরিমাণে এতটাই বেশি যে মায়ের নিজের জন্য সময় বের করার আর অবকাশ থাকে না।

এই অবস্থাই যদি হয়ে থাকে তাহলে নারীর পুরুষের প্রতি এই করুণাময় নির্ভরশীলতা এবং তার প্রতি পুরুষের সহায়তা যুক্তিযুক্ত। রাণি মৌমাছি যেমন, যে মাতৃত্বের জন্যেই তৈরি, কিন্তু সে শুধু পুরুষের নয় বরং তার সহকর্মীদের সহায়তা পায়, বয়স্ক পরিচারিকাদের (“old maids”) সহায়তা পায়, অপ্রসূতি কর্মী মৌমাছিদের সহায়তা পায়; যারা ধৈর্য ধরে এবং ভালোবাসা দিয়ে মৌচাকে তাদের ভাগের দায়িত্ব পালন করে। মনুষ্য প্রজাতির স্ত্রীলিঙ্গও তেমনই, মাতৃত্বের জন্যেই তৈরি একজন অসহায় নির্ভরশীল মানুষ যে অন্যান্য খাটুনি খাটতে অযোগ্য।    

মানুষের মাতৃত্বের কি তাহলে এই ধরন? মানুষ মা, তার মাতৃত্বের কারণে কি তার মস্তিষ্ক এবং শরীরের ওপর সমস্ত দখল হারিয়ে ফেলে? তার ক্ষমতা, দক্ষতা এবং অন্য কাজ করার আকাঙ্খাও হারিয়ে ফেলে? আমাদের সামনে কি এমন এক মনুষ্যজাতি দেখতে পাই যেখানে তার সমস্ত মহিলারা মাতৃত্বের কারণে বাকিদের থেকে আলদা থাকবে, সরে থাকবে, তাদেরকে পবিত্র জ্ঞান করতে হবে, তারা বিশেষভাবে বিকশিত এবং তাদের সমস্ত প্রাকৃতিক ক্ষমতা তারা সন্তান লালনে খরচা করে দেবেন? 

চিত্রঋণঃ উইকিমিডিয়া কমনস

শেয়ার করুন

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *