ছুটি-রুটির গল্প (শেষ পর্ব)

কানাপুকুরের দক্ষিণ পাড়ে বিশাল একটা অশ্বত্থগাছ। ঠিক বিশাল হয়তো নয়, কিন্তু গাছটা বেঢপ রকমের ঢ্যাঙা। আশেপাশের আর সব গাছগুলো থেকে আলাদা করে হঠাৎ চোখে পড়ে। পাতাগুলো ক্ষয়া ক্ষয়া সাদাটে ধরনের – এমনিই অমন না চাঁদের আলো পড়ে মনে হচ্ছে কে জানে। দিনের বেলাতেও এই গাছটার কাছে বড় একটা কিছু যায় না। মাকড়সার জাল গাছটার ডালগুলোকে ছোঁয়নি, কোনো পাখি বাসা করেনি, এমনকি মাটিতে পাকানো ঘাসলতাগুলোও যেন খানিক দূর অবধি এসেই শেষ হয়ে গেছে। তা বলে কি গাছটা মরা? না তা একেবারেই নয়। এমনকি আজকেও চাঁদনি রাত্তিরে তার পাতার উপর আলো পড়ে যখন পিছলে যাচ্ছে মনে হচ্ছে, তখন মগডালের কাছে পাতার আড়ালে দুটো খুদে খুদে হলদেটে চোখ জেগে উঠল। হলদেটে চোখদুটো একবার সরু চোখা চোখা হয়ে খানিক দূরে গোলাপবাগানের পাঁচিলের দিকে দেখে নিল, তারপর আবার গাছের আড়ালে হারিয়ে গেল। 

কয়েক মুহূর্ত সব চুপচাপ। তারপর পাতার ভিতর দিয়ে নীচের দিকে আরো খানিক সরসর শব্দ। চুপচাপ রাত্রি কাঁপিয়ে হঠাৎ দমকা হাওয়া ওঠে, পাতার মধ্যে হাওয়ার সুর ওঠে – খসখস খসখস। ভালো করে কান পাতলে হাওয়ার খসখসের মধ্যে থেকে একটা মিহি তেলতেলে গলার আওয়াজও শোনা যায় যেন। মন দিয়ে খানিক কষ্ট করে শুনলে কথাগুলো বোঝাও যায়, কেউ যেন কাকে একটা ডাকছে। “এই চসু, চসু”

গাছের তলায় অন্ধকার ছুঁয়ে একটা ছায়া গুটলি পাকিয়ে শুয়েছিল। নাম শুনে ছায়াটা একটা কান খাড়া করল মাত্র, কোনো আওয়াজ করল না।

“চসু, চসুভাই, ভারী একখানা অদ্ভূত জিনিস দেখলাম। দেখলাম কিনা বিড়ালের পিঠে চেপে একটা খুদে মানুষ আসছে। এদিকেই। কতদিন মানুষের মাংস খাইনি বলতো? হুজুরকে ডাকিনা চল?”

চসুর দু নম্বর কান খাড়া হয়ে ওঠে। একটুখানি চাঁদের আলো পাতার ফাঁক দিয়ে তার কানের উপর এসে পড়ে, হঠাৎ দেখলে একঢালা গলা রূপোর মতো মনে হয়। 

“মানুষ?” চসুর গলার স্বরটা কেমন ফ্যাঁসফ্যাঁসে, শুকনো ডালের মধ্যে দিয়ে উত্তুরে হাওয়া বইলে যেমন শোনাবে খানিকটা সেই রকম। ভালো করে কান পেতে না শুনলে এমনিই বনের কত শব্দের মধ্যে হারিয়ে যাবে যেন।

“মানুষই তো।” হলদে চোখ নামতে নামতে একেবারে নীচের ডালের ফাঁক দিয়ে উঁকি দেয়। “ওই দেখলাম কিনা গোলাপবাগানের পাঁচিল পেরোচ্ছে, মতিদিঘির দিকে যাচ্ছে। কতদিন বাদে মানুষ। হুজুর কী খুশি হবে বল তো? হুজুরকে একবার ডাকি না?”

চসু এতক্ষণে কান ছেড়ে ল্যাজ দোলাতে শুরু করেছে। এবার একেবারে ছায়া বেয়ে খাড়া হয়ে গা ঝাড়া দিয়ে উঠল। “আজকে? হুজুরকে?”

চসুর যত কম কথা বলার অভ্যেস, তার হলদে চোখ শাকরেদের তত বেশি। হলদে চোখের চোখ দুটো গাছের ডালে একবার পিটপিট করল। তারপরে নিজের ভুল বুঝতে পেরে বলে উঠল, “ও হো হো, আজ তো পূর্ণিমা! আজ তো হুজুর বেরোবেন না। দেখেছিস তো, আমারই কি ভুল! বয়স কী আর কম হল, খালি ভুলে যাই সব। ভাগ্যিস বললি, নইলে হুজুরের কাঁচা ঘুমটা ভাঙাতে গেলে উনি আমার মুণ্ডুটা নির্ঘাত চিবিয়ে ছাড়তেন।” খানিকক্ষণ থেমে হলদে চোখ খানিক করুণ স্বরে জিজ্ঞেস করল, “তাইলে? কী করবি? এত ভালো শিকারখানা ফসকে যেতে দিতেও কেমন একটা লাগে কিনা।”

চসু এতক্ষণে পুরোটাই খাড়া হয়ে উঠেছে। গাঢ় অন্ধকার ছেড়ে গাছতলা ছেড়ে খানিক বেরিয়ে এল সে আস্তে আস্তে। চাঁদের আলো তার মুখের উপর সোজা পড়েছে। সরু মুখখানায় সামনের শ্বদাঁতদুটো চকচক করে উঠল। “ছাড়ার কথা আসছে কেন?” 

***

ছুটির ভারী মজা লাগছিল। প্রথমটায় খানিক ভয়ে ভয়েই গোলাপসুন্দরীর পিঠে উঠেছিল ছুটি। গোলাপসুন্দরী যখন জানলা ছাড়িয়ে কার্নিশে উঠল, তখন না চাইতেও ছুটির বুক দুরুদুরু করতে শুরু করেছিল, চোখ কটকট করতে শুরু করেছিল, এক্কেবারে খিমচে ধরেছিল সে গোলাপসুন্দরীর ঘাড়ের কাছের লোমগুলো। কিন্তু একবার খানিক অভ্যেস হয়ে গেলে ভয় কাটিয়ে বরং বেশ মজাই পেতে শুরু করল ছুটি।

সেই ছোটবেলায় একবার পুরীতে গিয়ে উটের পিঠে চড়েছিল। কেমন উঁচুনীচু হয়ে চলে, একদম ভালো লাগেনি ছুটির। ভয়ে চোখ বন্ধ করে নামা অবধি আর খোলেনি। গোলাপসুন্দরী মোটেও সেরকম নয়। কোথায় কখন পা পড়ছে মাটিতে প্রায় বুঝতেই পারে না ছুটি। খানিক পরে বুক দুরুদুরু থামলে সাহস করে এমনকি চোখও খুলে ফেলল ছুটি। আসলে আমাদের ছোট ছুটিও তো এখন অনেক বড় হয়ে গেছে, আর আগের মতো ভয় করলে কি তার চলে?

চোখ খুলে ছুটির ভারী আমোদ লাগল। গোদা চারপাশটা যেন কেমন মজার মজার। চারপাশটা সত্যিই কি বিশাল, তার কত কিছুই যেন ছুটি আগে ভালো করে লক্ষ্যই করেনি! এই যে বাড়ির কার্নিশ থেকে জাল নেমেছে, তার থেকে জুলুজুলু চোখে মাকড়সা ঝুলে রয়েছে, বা বুবানদের পাঁচিলের ধার ঘেঁষে কাগজেলতার ঝাড়ের মধ্যে টুনটুনি পাখির বাসায় ডিম রয়েছে – এসব কি সে আগে দেখেছে? 

গোলাপবাগান এমনিই পাড়ার লোকের কাছে বেশ বনজঙ্গল বনজঙ্গল বলে মনে হয়, আর এই খুদে অবস্থায় তো ছুটির কছে তো তা একেবারে সাক্ষাত অভয়ারণ্য বোধ হতে লাগল। এরমভাবে অল্পক্ষণ না অনেকক্ষণ কাটল কে জানে – হঠাৎ করে গোলাপসুন্দরী থেমে গেল, আর রুটি সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠল, “এসে গেছি আমরা।”

কোথায় এসে গেছে তারা? ছুটি তো সহজে মোট্টে বুঝতে পারে না। এরকম বিশাল বিশাল মানুষসমান ঘাস, তার মধ্যে দিয়ে তো কিছুই দেখা যাচ্ছে না। উপরে তাকালে বিশাল বিশাল গাছের ফাঁক দিয়ে মিটিমিটি তারা, পূর্ণিমার চাঁদ দেখা যাচ্ছে বটে – কিন্তু তা থেকে জায়গা বুঝতে পারবে এরকম দড়ও তো ছুটি নয়! 

পস্কো বলেছে গরমের ছুটি শেষ হলে ছুটিকে তারা চিনিয়ে দেবে, আর কীকরে তারা দেখে জায়গা বুঝতে হয় তাও শিখিয়ে দেবে। কী জিগাচ্ছো, পস্কোটা আবার কে? পস্কো হল গিয়ে ছুটির ইস্কুলের বন্ধু। পস্কোর বাবা জাহাজের মাল্লার কাজ করে। বছরে একবারটি মাত্র বাড়ি আসে, আর তাইতেই নাকি গতবার এসে পস্কোকে একটা সোনালি ফিতেওয়ালা রুশদেশী কম্পাস দিয়ে গেছে আর পস্কোকে শিখিয়ে দিয়ে গেছে কীকরে তারা দেখে দিক ঠিক করতে হয় আর জায়গা চিনতে হয়।

তা যাই হোক, এরকম ভাবতে ভাবতে ছুটি বোধহয় খানিক আনমনাই হয়ে পড়েছিল। হঠাৎ কোমরের কাছে কুটুস করে একটা চিমটি খেয়ে ছুটির হুঁশ ফিরল। তাকিয়ে দেখে, সামনে দাঁড়িয়ে রুটি চোখ পিটপিট করছে আর দুষ্টু দুষ্টু একটা হাসি দিচ্ছে। 

ভারী রাগ হয়ে গেল ছুটির। নাহয় ছুটি একটু আপনভোলাই, ক্লাসের পড়া শুনতে শুনতে মাঝেমধ্যে ইডেন গার্ডেন্সে ব্যাট নিয়ে ছয় মারতে বসে, বা খেতে বসে গালে ভাত পোঁটলা করে গভীর সমুদ্রে গুপ্তধনের খোঁজে ডুব দিয়ে ফেলে – তা বলে এরকম কাঠপিঁপড়ের মতো করে চিমটি কাটতে হবে?

রোদ্দুরদিদি রাগ হলে কঠিন কঠিন বাংলায় ছুটির সঙ্গে কথা বলে – এই তো সেদিন ছুটি দিদির ইশকুলের ভূগোলখাতার উপর তেঁতুলের আচার ফেলে দিয়েছে বলে ফোনে ছুটিকে অলম্বুষ, কর্ণকুহর আরো কীসব কঠিন কঠিন কথা বলল। ছুটিও সবে ভাবছে ওরকমই বেশ কঠিন বাংলায় রুটিকে বকবে চিমটি কাটার জন্য, এমন সময় রুটি ঠোঁটে আঙুল দিয়ে ফিসফিস করে উঠল, “এই একটু চুপ কর। কীসের যেন আওয়াজ শুনছি”

চুপ? তা চুপ করল নাহয় ছুটি? কিন্তু কোথায় কী? কাঠপরীরা কি এসে গেছে? তারাও কি মতদিঘির কাছে? কই দেখতে পাচ্ছে না তো! শুধু হাওয়ায় লম্বা ঘাসের সরসর শব্দ, পাতার আওয়াজ, কয়েকটা ঝিঁঝিঁর ডাক। অবশ্য এখন যা বাঁটকুল দশা ছুটির, গোলাপসুন্দরীর পিঠে না চড়লে কিছু দেখতে পাওয়া মুশকিল।

“কী হয়েছে রে?” আর থাকতে না পেরে জিজ্ঞেসই করে ফেলল ছুটি।

***

জ্যোৎস্না রাতেও চাঁদের আলো সবজায়গায় পৌঁছায় না। মোটা গাছের গুঁড়ির পিছনে, জংলা ঝোপের আড়ালে, নরম কাদার উপর লম্বা ঘাসের জঙ্গল যেখানে – এমন সব জায়গায় ফিনফিনে রাত্তিরেও অন্ধকারের পোকারা আস্তানা গাড়ে। হাওয়ার বেগ বাড়ে, মনে হয় গাছের ছায়াগুলোও নড়েচড়ে চলে যেন। ছায়ার মধ্যে কতরকম আকার দেখতে পাওয়া যায়, একবার দেখা দিয়েই আবার তারা হুশ করে মিলিয়ে যায় যেন।

মতিদিঘির থেকে খানিক দূরে আমাদের ছুটি যখন সবে এসে পোঁছেছে, গোলাপসুন্দরীর পিঠ থেকে নেমে গা হাত পা থেকে ধুলো ঝাড়ছে – ঠিক এমনই সময় রাত্তিরের ছায়া বেয়ে বেয়ে গোল গোল চক্কর কেটে দু আগন্তুক ছুটি রুটির দিকে এগোতে থাকে। তাদের পায়ে আওয়াজ হয় না, পাকা শিকারীর মতো আস্তে আস্তে হাওয়ার উল্টোদিক থেকে তারা এগোতে থাকে। 

“চসু, এই চসু, আজকে কতদিন বাদে মানুষের মাংস খাব বল তো? আহাহা, শুনেছি কিনা মানুষের বাচ্চাদের দারুণ তুলতুলে আর নরম মাংস হয়। সত্যি রে ভাই চসু, তুই খেয়ে দেখেছিস?” হলদে চোখ আর এতক্ষণ চুপ না থাকতে পেরে জিজ্ঞেস করে ফেলে। চসু গাছের নীচু ডালের ফাঁক দিয়ে কুতকুতে চোখে দূরে ছুটি রুটির দিকে দেখছিল। সে কটমট করে একবার হলদে চোখের দিকে তাকাল, অমনি হলদে চোখও চিমসে আপনা থেকেই চুপ করে গেল।

শিকারের অভ্যেসে কটমট করে তাকাল বটে চসু, তবে তার ঠোঁটেও কি আপনা থেকেই একটা হাসি ঝিলিক দিয়ে উঠল না? সামনের শিকারগুলো যেন বড্ড সহজ, বড্ড বোকা। খড়মড় করে ধস্তাতে ধস্তাতে চলছে, গাছের মড়া ডালে শুকনো পাতায় মটমট আওয়াজ করছে। একবার তাড়া করে ধরে দাঁতগুলো বসিয়ে দিতে কী আরামই যে লাগবে! ভেবে উত্তেজনায় চসুর গায়ে আপনা থেকেই একটা ঢেউ খেলে গেল।

না না, এখনই ভেসে গেলে চলবে না। চসু একটা থাবা বাড়িয়ে নির্দেশ দেয়। দুজনে খুব সাবধানে এগোতে থাকে।

*** 

ছুটির উত্তেজনায় কান কটকট করছিল। এই প্রথমবার জীবনে সে পরী দেখবে। তাও আবার যে সে পরী নয়, একেবারে খোদ কাঠপরী! ছুটি যখন ছোট ছিল, তখন তালতলা বইমেলা থেকে মা ছুটিকে নানা রকমের পরীদের নিয়ে একটা ভারী সুন্দর রঙিন বই কিনে দিয়েছিল। কতরকমের পরীর কথা ছিল তাতে! ঘাসপরীরা নাকি পাহাড়ের ঢালে বেঁটে বেঁটে ঘাসের মধ্যে হলুদ বেগুনী নাম না জানা যেসব ফুল হয়, তাদের মধ্যে ঘর করে থাকে। জলপরীরা থাকে পুকুর নদীর ধারে, আর পাতার উপর ফোঁটা ফোঁটা শিশিরের জল জমিয়ে সেই জল নিয়ে কেলি করে। আর কাঠপরী? তারা নাকি থাকে গাছের গায়ে ক্ষুদে ক্ষুদে গর্ত করে একসঙ্গে, আর বৃষ্টি পড়লেই আনন্দে নাচতে থাকে, আর নাচে বলেই নাকি প্রথম বৃষ্টির পর অমন মিঠে সোঁদা গন্ধ ওঠে। সত্যিই কি তাই? আজকেই নাহয় কাঠপরীদের ছুটি জিজ্ঞেস করে নেবে! 

এরপর খেতে এসে সূর্যাস্তদাদা যখন হালকা গোঁফের রেখাটা পাকাতে পাকাতে ডিমভাজার মতো মুখ করে বলবে সায়েন্স বলে ওসব পরী ফরী হয় না, তখন মুরুব্বির মতো মুখ করে ছুটি কী উত্তরখানাই না দেবে! ভাবলেই ছুটির বেজায় মজা লাগছিল আর খিলখিল করে হাসি পাচ্ছিল। 

লম্বা ঘাস পেরিয়ে ছুটি রুটি আর গোলাপসুন্দরী ততক্ষণে মতিঝিলের একেবারে ধারে এসে পড়েছে। এতক্ষণে ছুটিও চারপয়াশটা চিনতে পেরে গেছে। ওইত্তো সেই পাকুড়গাছটা, যেইখানে রুটির সঙ্গে ছুটির প্রথম দেখা হয়েছিল! আর ওই আঁশফলগাছটার মিষ্টি মিষ্টি আঁশফল খেয়ে পেট ভরিয়ে ছুটি রাত্তিরে আর বিরিয়ানি খেতে পারেনি। 

“অ রুটি, কাঠপরীরা কোথায়? আমার যে আর তর সইছে না।”

রুটি আগুপিছু এদিক ওদিক দেখছিল। সে মেকি একটা ধমক দিয়ে বলল, “অত তাড়াহুড়োর কী আছে বাপু! একটু সবুর কর না! এ মেয়ে খালি অধৈর্য্য হয়!”

ছুটি যুৎসই একটা জবাব দিতে যাবে, তার আগেই রুটি ছুটির হাত চেপে হঠাৎ তাড়াতাড়ি করে আবার বলে উঠল, “এই চুপ চুপ!”

কী হল ব্যাপারটা? হঠাৎ চারপাশটা এত চুপ হয়ে গেছে কেন? ঝিঁঝির ডাক সব থেমে গেছে, বুনো ফুলের ভারী গন্ধ হঠাৎ বাড়তে শুরু করেছে যেন, চাঁদের আলো গুটিয়ে খানিক দূরে সরে গেছে মনে হচ্ছে কেন? ছুটির কেমন একটা গা ছমছম করতে শুরু করল। রুটির দিকে তাকিয়ে দেখল হঠাৎ রুটি ব্যাগ হাতড়ে কী একটা বের করার চেষ্টা করছে আর এদিক ওদিক দেখছে। উল্টোদিকে একটা রাগী ম্যাঁও শুনে ফিরে দেখল গোলাপসুন্দরীও হঠাৎ পিঠ উল্টে লোম খাড়া করে সাবধানে ইতিউতি দেখতে শুরু করেছে। 

হঠাৎ চুপচাপ ভেদ করে ঠিক ওদের পিছনে একটা জঙ্গলমতো জায়গা থেকে ফ্যাঁসসসস করে একটা আওয়াজ ভেসে এল। আর তার উত্তরে আরো একটা হাড় হিম করা বিশ্রী ডাক। ছুটির গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠল। রুটি আর গোলাপসুন্দরীও আওয়াজ শুনে ঘুরে তাকিয়েছে। দুজনকেই ভারী চিন্তিত দেখাচ্ছে। ব্যাপারটা হচ্ছেটা কী?

*** 

রুটি গোলাপসুন্দরী যতক্ষণে এদিক ওদিক দেখতে শুরু করেছে, একটা মাদার গাছের আড়ালে অন্ধকারের মধ্যে ততক্ষণে চারপাটি দাঁত থেকে নোলা ঝরতে শুরু করে দিয়েছে, চারজোড়া থাবার আড়ালে লুকানো ধারালো নখ বেরিয়ে এসেছে। সারাক্ষণ ফটর ফটর করা হলদে চোখও এমনকি আর কথা বলছে না। বছরের পর বছরের অভ্যেসে চসু হলদে চোখ দুজনেই তৈরি, কীভাবে কোনদিক দিয়ে কে বেরোবে শিকারের উপর ঝাঁপিয়ে পড়বে সেই হিসাবও দুজনের মাথায় মাথায় এক্কেবারে পরিষ্কার। ধৈর্য্য ধৈর্য্য…আর একটু ধৈর্য্য ধরলেই।

চসু একটা থাবা তোলে। হলদে চোখ আরও একটু ঝুঁকে তৈরি হয়ে নেয়। মুহূর্তের মধ্যে শিকারকে ছিনিয়ে নিতে হবে। তারপরে এই অন্ধকারের মধ্যে কে আর তাদের ধরবে? ওই বেড়াল আর ওই কাঠবেড়ালি?

“ফ্যাঁসসসস” হঠাৎ ঠিক তাদের পিছনে একটা রাগী আওয়াজে দুজনে চমকে ওঠে। এ কি! তাদের পিছনেও দুজোড়া ছায়া কোথা দিয়ে এল! এ কেমন চোরের উপর বাটপাড়ি! এরাও কি শিকার ধরতে এসেছে? ছায়াগুলোর মধ্যে আবার একটা দুপেয়ে, একটা চারপেয়ে। চারপেয়েটাই ফ্যাঁস করে আওয়াজ করে উঠেছে।

হলদে চোখ ঘাড় ঘুরিয়ে দাঁত বের করে লোম ফুলিয়ে একটা হাড় কাঁপানো শব্দ করে উঠল। কিন্তু একি, চারপেয়েটা আকারে আরো বড় হচ্ছে যেন! দুগুণ, চারগুণ, ছগুণ…

হঠাৎ আড়চোখে তাকিয়ে হলদে চোখ দেখে চসু লেজ গুটিয়ে পিছতে শুরু করেছে। প্রথমে এক পা, দু পা, তারপরে সোজা উল্টোদিকে ফিরে দৌড় লাগাল যখন, তখন হলদে চোখেরও আর সাহসে কুলাল না। “ওরে চসু রে, আমাকে ফেলে চলে গেলি নাকি” বলতে বলতে সেও পাঁই পাঁই লেজ গুটিয়ে তার পিছনে ছুট লাগাল। 

*** 

গোলাপসুন্দরীর পিঠের লোম আরও খাড়া হয়ে উঠেছে। সামনে ঝোপঝাড়ের মধ্যে কেমন নড়াচড়ার আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছে। ছুটির একটু ভয় ভয় করতে লাগল। হঠাৎ মায়ের জন্য মন কেমন করতে লাগল, গলাটা ব্যাথা ব্যাথা করতে লাগল। তবু ছুটি যথাসম্ভব সাহস জোগাড় করে চেঁচিয়ে বলে উঠল, “এই কে ওখানে? যাঃ যাঃ! হুশ হুশ!” 

সামনের ঝোপঝাড় ভেঙে দুটো অতিকায় চেহারার কেউ বেরিয়ে আসছে কি? কারা ওরা? এই বিশাল বনের ছুটি তো কিছুই চেনে না! রুটির কথায় নাচতে নাচতে এসে কি ছুটি ভুল করল? ছুটি যদি আজ আর বাড়ি না ফিরতে পারে, তাহলে কি বাবা মা কাঁদবে? আচ্ছা বড়োরা কি কাঁদে? ছুটির ইশকুলের বন্ধুরাই বা কী ভাববে – পস্কো, মুনিরা, বুলবুল? পাখি আন্টি যে বলেছিল গরমের ছুটির পর শিখিয়ে দেবে প্রজ্ঞাপারমিতা মানে কি, সেটাও কি তাহলে বাদ থেকে যাবে? 

এইসব আকাশপাতাল যখন ভাবছে ছুটি, আর ভাবছে আজকে আর বাড়ি ফেরা হল না, এমন সময় গোলাপসুন্দরী গরগর থেকে পিঠ নামিয়ে বেশ মিষ্টি করে ম্যাঁও করা শুরু করল। আর রুটি বলে উঠল, “আরে গড়াইদিদিমা!” 

সত্যিই তো! ছুটির তুলনায় অমন বিশাল চেহারা বলে ছুটি প্রথম দেখায় অন্ধকারের মধ্যে বুঝতেই পারেনি! ঝোপের ভিতর থেকে বিশাল চেহারা নিয়ে হাসতে হাসতে বেরিয়ে এসেছে গড়াইদিদিমা, আর তার পাশে পাশে দাদাঠাকুর। ঝিঁঝিঁর ডাক আবার শুরু হয়ে গেছে, গাছের পাতাগুলো আবার আলো পড়ে রূপোর মতো চকচক করছে। দিদিমা একটা পান মুখে দিয়ে মিটিমিটি একটা হাসি দিয়ে বলল, “এই দেখতে এলুম তোরা কী করিস। দাঁড়া” 

বলে দিদিমাও শাড়ির কোঁচড় থেকে একটা রামধনু রঙের গুলি মুখে পুরে দিল। আর অমনি দিদিমাও বেশ হুশহুশ করে চোখের নিমেষে খুদে হতে হতে ছুটি রুটির থেকে মাত্র ইঞ্চিখানেক বড় হয়ে থেমে গেল। 

ছুটি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, “কই দিদিমা, ছোট হবার জন্য তোমাকে মাটিতে গড়াতে হল না তো?”

গড়াই দিদিমা তো আকাশ থেকে পড়ল, “ও মা দ্যাকো কান্ড! মাটিতে গড়াতে কেন হবে?” 

এমন সময়েই ছুটির চোখ পড়ল রুটির দিকে। দুহাতে মুখ চেপে শয়তান রুটিটা প্রাণপণে হাসি আটকানোর চেষ্টা করে যাচ্ছে। কীরকম বদমাইশ দ্যাখো! রগড় করার জন্য কেমন ছুটিকে দিয়ে মাটিতে গড়গড়িয়ে নিল তখন? 

বেশ রাগী রাগী একটা কিছু বলবে ভাবছে ছুটি, এমন সময় হঠাৎ দিদিমা বলে উঠল, “আরে দ্যাক দ্যাক! দিঘির দিকে তাকিয়ে দ্যাক!”

ঠিক প্রথমটায় ছুটি বুঝতে পারেনি হচ্ছেটা কী! মনে হল একঝাঁক রূপালি ফড়িং যেন আকাশ থেকে সোজা মতিদিঘির উপর নেমে এসেছে। তারপরেই বুঝল ছুটি – ওরাই তো কাঠপরী! কী সুন্দর দেখতে তাদের! কারুর গায়ের রঙ মাছের আঁশের মতো নীলচে, কারুর দুধের সরের মতো সাদা, কারুর আবার গাঢ় বাদামি। আর পাখারও কতরকম বাহার তাদের। কারুর পাখা প্রজাপতির ডানার মতো, কারুর আবার স্বচ্ছ ফিনফিনে – চাঁদের আলোয়ে ঝকমক করছে, কারুর রামধনুরঙা, কারুরটা দেখলে আবার মনে হয় অজস্র মণিমুক্তো বসানো যেন। খিলখিলিয়ে হাসতে হাসতে নেমে তারা দিঘির শাপলা ফুলগুলোকে ঘিরে ধরল। 

পরীদের মধ্যে  সোনালি ডানা আর মাথায় খুদে খুদে সাদা ফুলের মুকুট বসানো যার, সেই বোধহয় পরীদের রাণী। সবার মধ্যে দিয়ে উড়ে গিয়ে একদম মাঝখানে একটা ফুলের একেবারে কানায় গিয়ে দাঁড়াল। তারপরে নানা অঙ্গভঙ্গি করতে লাগল। আর অমনি তার দেখাদেখি বাকি পরীরা মিলে নানা কায়দা কসরৎ দেখিয়ে নাচ শুরু করল। মাঝের পরী হাত তোলে তো বাকিরা সবাই খানিক উপরে উড়ে যায়, তারা হাত নামালেই আবার ঘুরে ফিরে হাওয়ায় নানা আঁকিবুঁকি কাটে, কখনও হাত ধরাধরি করে খেলা করতে থাকে। 

আর কী অদ্ভূত! পরীদের নাচের সঙ্গে সঙ্গে গোটা চারপাশটাও তাল দিতে থাকে যেন। পরীদের রাণী হাত এদিক থেকে ওদিক করলে ঝিঁঝির ডাক কমে বাড়ে, উপরে তুললে হঠাৎ খসখস পাতার মধ্যে দিয়ে মিঠে হাওয়া বয়ে যায়, পরীরা নাচতে নাচতে দিঘির জলকে ছুঁতে গেলে জলেও ছোট ছোট ঢেউ উঠে পরীদের ছুঁয়ে খেলা করতে শুরু করে যেন। 

পরীদের দেখতে দেখতে ছুটি খিলখিলিয়ে হেসে ওঠে। হাসি থামাতেই পারে না! এত সুন্দর কিছুও যে সত্যিই হয়? আহা পস্কো যদি দেখতে পারত, আর রোদ্দুরদিদি আর সূর্যাস্তদাদা!

গোলাপসুন্দরী আর দাদাঠাকুর ছুটির দু পাশে দিঘির ধার ঘেঁষে বসে থাকে, পরীদের নাচের তালে তালে তারাও মাথা দোলাতে থাকে। 

“দিদিমা” রুটি জিজ্ঞেস করে। “ওই ঝোপের আড়ালে কী ছিল গো?” 

দিদিমা আরেকটা পান মুখে দেয়। “ও কিচুনা। একটা শিয়াল আর একটা ভামবেড়াল। দেঠোকে দেকেই সোজা পিটটান দিয়েচে। ও নিয়ে তুই ভাবিসনে রুটু।”

দিদিমা মুখে যাই বলুক, ভাবনার ছিল আসলে অনেক কিছুই। বহু বহুবছর পরে বনের মধ্যেকার অন্ধকারের প্রাণীরা কীসের যেন একটা সুযোগ দেখতে পেয়েছে। ঘুমের মধ্যেকারও যে গভীরতর ঘুম, সেখান থেকে গভীর আঁধার সবে জাগতে শুরু করেছে। দিদিমারও কি তা নিয়ে আসলে চিন্তা ছিল না? ছিল তো বটেই। তবে তা অন্যদিনের বলার গল্প।

ছুটি অবশ্য তখনও এতকিছুর কিছুই জানত না। অন্ধকারের ভিতর অন্ধকার, বা গোলাপবাগানের ভিতরের পুরোনো গোলাপবাগান – এসব কথা আমাদের ছোট্ট ছুটি জানবেই বা কেমন করে? ছুটি খিলখিল করে হাসছে, আপনমনে নাচছে, গোলাপসুন্দরী আর দাদাঠাকুরের সঙ্গে একসঙ্গে পরীদের তালে তাল মিলিয়ে – এ খুশিই কি কম খুশি? এ আনন্দই কি কম আনন্দ বা?

ছুটিকে ওরকমভাবে রেখেই আমরা আজকে তাই গল্পে ইতি টানব। আর পরেরদিন আবার গল্পে না ফেরা অবধি,

আমার কথাটি ফুরোল। 

নটে গাছটি মুড়োল।।

ছুটি-রুটি (প্রথম পর্ব) পড়তে ক্লিক করুন। 

ছুটি-রুটি (দ্বিতীয় পর্ব) পড়তে ক্লিক করুন। 

শেয়ার করুন

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *