ছুটি-রুটি (পর্ব ৪)

পর্ব ৪

“ছুটি, খাবার বাইরে রেখেছি। খিদে পেলে খেয়ে নিও।”

রাগ করলে ছুটির মা ছুটিকে তুমি বলে ডাকে। ছুটির তাতে কান্না পায় খুব, গলার কাছটা কেমন দলা হয়ে আসে, নাকের পাতাটা তিরতির করে কাঁপতে থাকে, গালটা লালমতো হয়ে যায়। এখনও ছুটি বালিশে মুখ গুঁজে ছিল, মায়ের ডাক শুনে মনে হল এক্ষুণি ভ্যাঁ করে কেঁদে দেবে বুঝি। কান্না আটকাতে ছুটি আরো জোরে বালিশে মাথা গুঁজে দিল, উত্তর দিল না।

একদিন কেটে গেছে ইতিমধ্যেই। ছুটির মা বলেছে এখন এক সপ্তা ছুটির বাড়ি থেকে বেরোনো একেবারে বন্ধ। সাঁতার বন্ধ, খেলাধূলো বন্ধ, বিকেলবেলা ছাদে যেতে পারে একটুক্ষণের জন্য বড়জোর কিন্তু তার বাইরে একদম না।

কী হয়েছে জিজ্ঞাসা করছ? এমন কী করেছে ছুটি যে এরম লম্বা শাস্তি জুটল ভাগ্যে? হয়েছে আবার কি, যা নিয়ে চিন্তা ছিল হয়েছে ঠিক সেইটাই।

“ছুটি, তুমি নাকি বড়বাড়ির পাঁচিল ডিঙিয়ে ভিতরে গেছিলে? এই গড়াইদিদি দেখেছে তুমি নাকি কারসাজি দেখিয়ে উল্টো করে পাঁচিল টপকাচ্ছ?” ছুটি বাড়ি ফিরতেই ছুটির মা ছুটিকে জিজ্ঞেস করেছে। “তুমি জান ওই বুনো জংলা বাড়ির মধ্যে পোকামাকড় সাপখোপ কতকিছু থাকতে পারে? তোমাকে যদি কামড়ে দিত? আর সাপখোপ বাদও দিলাম যদি, তুমি তো জান সহজে কেউ ওবাড়ি যায় না। তোমার এত সাহস কবে থেকে হল?”

ছুটি ঢোক গিলে আর কিছু বলেনি। সবে আবার বড়বাড়ি থেকে আসছে শুনলে কী বলত মা? নির্ঘাত এক সপ্তার জায়গায় দু সপ্তা বাড়িতে বসে থাকতে বলত! আর গোলাপবাগানে রোজ ঘুরঘুর করছে শুনলে তো বোধহয় আর এই গোটা বছর বাড়ি থেকে বেরোনো হত না!

 আসলে বড়রা এত কম বোঝে! ছুটি মাকে কীকরে বোঝায় যে বড়বাড়ি মা যেরকম ভাবছে সেরকম আদৌ নয়! সোজা পাঁচিল ডিঙালে বড়বাড়ি একরকম, আর উল্টো ডিঙালে আরেক রকম। আর বললেও কী বাবা মা বিশ্বাস করবে? কাজেই ছুটি আর কিছুই বলেনি। ভেবেছে এখন থাক, মাথা ঠাণ্ডা হলে মাকে সব বুঝিয়ে বলবে।

তারপরে গতকালকের গোটা দিনটা আর আজকের দিনটাও একদম বিচ্ছিরি কেটেছে ছুটির। চিংড়িমাছের মালাইকারি খেয়েও মন ভালো হয়নি, বাবা মান ভাঙাতে ভ্যানিলা আইসক্রীম নিয়ে এসেছিল রাগ করে সেইটাও মুখে তোলেনি ছুটি। আজকে দুপরবেলা সবাই ঘুমিয়ে পড়বার পর ফ্রিজ থেকে চুরি করে একটুখানি আইসক্রীম খেতে ইচ্ছা করছিল, তাও খায়নি। সবাই ঘুমোচ্ছে সেই সুযোগে একটু যে লুকিয়ে বাইরে বেড়িয়ে আসবে, তারও উপায় নেই। বাড়ি থেকে বেরোনো বন্ধ বলে ঘরের দরজা বন্ধ করে চাবি সেই কোন টঙে তুলে রেখেছে মা। চেয়ারের উপরে উঠলেও অতদূর ছুটির হাতই যাবে না।

বিকেলবেলায় মাকে সব বুঝিয়ে বলতে গেল ছুটি, তাতেও মা পাত্তাই দিল না! হুঁ হাঁ করে অর্ধেক শুনে তারপরে দিদির ফোন আসতে উঠে চলে গেল। দিদি গেছে গরমের ছুটিতে বন্ধুর বাড়ি আম খেতে, নইলে দিদি থাকলে নিশ্চয় ছুটির কথা শুনত, মাকেও বুঝিয়ে বলত। কিন্তু দিদি তো নেই। অগত্যা কী করা। 

খুব অভিমান হয়েছে ছুটির। সেই থেকে ঘরের দরজা বন্ধ করে গোঁজ হয়ে বসে রয়েছ। রাগ করতে করতে ছোট্ট করে খানিকক্ষণ ঘুমিয়েও পড়েছিল। তারপরে ঘুম ভেঙে উঠে থেকে বেশ খিদে খিদে পেয়েছিল, কিন্তু তাও ছুটি সন্ধের টিফিন খেতে নামেনি।

এখন অবশ্য আর রাগেও বেশিক্ষণ খিদে আটকাল না। আর সন্ধেবেলায় বাবা কষা কষা মাংস করেছে, ঘরে বসে আছে বলে কি আর তা টের পায়নি ছুটি? দরজাটা খুলে ছুটি ঢাকা দেওয়া নরম রুটি আর মাংসের বাটিটা নিয়ে এল। রাস্তা থেকে একটা বেড়ালের ম্যাঁওম্যাঁও ভেসে আসছে। নির্ঘাত ওবাড়ির অমল, বাবার রান্নার গন্ধ পেয়ে মাংসের ভাগ চাইছে। 

ছুটির বাবার রান্নার হাত খুব ভালো। সূর্যাস্তদাদা তো গন্ধ পেয়ে মাঝেমধ্যেই ঠিক রাত্তিরের খাবারের সময় করে করে চলে আসে। এসে ডাক পাড়ে, কিরে ছুটি, কিরে রোদ্দুর কোথায় তোরা? খানিক গল্প টল্প করার পর ছুটির মা এসে বলে, খেয়ে যবি তো? তখন সূর্যাস্তদাদা এক গাল কান এঁটো করা হাসি নিয়ে লজ্জা লজ্জা করে বলে, তা বলছ যখন কাকীমা…

এইসব ভাবতে ভাবতে ছুটির দিব্যি খাওয়া হয়ে গেল। সত্যিই তার ভারী খিদে পেয়েছিল। ওদিকে বিড়ালটা আরো জোরে ডাকছে। একদম কানের কাছেই যেন প্রায়। আ মোলো যা!

জানলার দিকে ঘুরে তাকাতেই অবশ্য ছুটির হাত লেগে টেবিল থেকে মাংসের হাড় সমেত থালা বাটি আরেকটু হলে পড়ে যাচ্ছিল প্রায়। কাঁচের জানলার ওপাশে থাবা পেতে দিব্যি বসে রয়েছে একটা বেড়াল! পর্দার ফাঁক দিয়ে তার গোটা চেহারাটা দেখা যাচ্ছে না, তবে ফুটফুটে চাঁদের আলোয় ছুটির চিনতে অসুবিধে হয় না – এ যে গোলাপসুন্দরী! আর গোলাপসুন্দরীর পাশে পর্দার আড়াল দিয়ে উঁকিঝুঁকি মারছে – ওটা রুটি না?

ছুটি তাকিয়েছে দেখে গোলাপসুন্দরী আবার ম্যাঁও করে উঠল, তারপর থাবা দিয়ে জানলার কাঁচ আঁচড়াতে লাগল। জানলাটা অল্প ফাঁক ছিল, ছুটি তড়িঘড়ি গিয়ে পুরোটা খুলে দিল। 

“ম্যাঁওওও” গা ঝাড়তে ঝাড়তে জানলা দিয়ে ভিতরে ঢুকে এল গোলাপসুন্দরী। আর তার পিছন পিছন রুটি তারস্বরে চেঁচাতে চেঁচাতে, “আর আজকে ওনার সারাদিন পাত্তাটি নেই! আমার বুঝি চিন্তা হয় না? সেই কখন থেকে বসে আছি হাঁ করে, এই আসবে এই আসবে করে গোটা দিনটাই চলে গেল রে বাব্বা! আর বাড়ি খুঁজে পাওয়ায় কি আর সহজ? কতজনের জানলা দিয়ে উঁকি মারতে মারতে অবশেষে…”

“এই চুপ চুপ চুপ” ছুটি তাড়াতাড়ি চাপা গলায় বলল, “এক্ষুণি মা চলে আসবে।”

“তা আসুক না! আমি কাকীমাকে শোনাই কেমন মেয়ে ওনার – “

“ছুটি, কিছু বললি?” ওঘর থেকে মায়ের গলা ভেসে এল। ছুটি কটমট করে রুটির দিকে একবার তাকিয়ে তারপর ঘাড় ঘুরিয়ে বলল, “না গো মা, কিছু না তো।” তারপর আবার রুটির দিকে ফিরে ফিসফিসিয়ে বলল, “আরে আমি কি আর ইচ্ছে করে যাইনি! এই দ্যাখ না গতকাল ফিরে দেখি গড়াইকাকীমা মায়ের কাছে নালিশ করে বসে আছে। ব্যাস, তারপরে মা আজ সারাদিন আর বেরোতেই দেয়নি। যাবটা কীকরে?”

রুটি বোধহয় আরো খানিক ঝগড়া করার উদ্যম নিয়ে এসেছিল। তাই সব শুনে খানিক থতমত হয়ে মাথা চুলকে বলল, “ও।” তারপরে বলল, “গড়াইদিদিমা আবার তোর নামে নালিশ কখন করল?” 

“গড়াইদিদিমা না গড়াইকাকীমা। তোকে বললাম তো কাল, ওই এক রাস্তাতেই থাকে। কিচ্ছু শুনিসনা তুই!”

রুটি তাতে খানিক মাথাটাথা চুলকে বলল, “তা হতে পারে বাপু। এক পাড়ায় এত গড়াই থাকলে আমি কী করব? যাহোক চল এবার তবে? কাঠপরীরা আর কিছুক্ষণের মধ্যেই চলে আসবে তো।”

গোলাপসুন্দরী ছুটির এঁটো মাংসের বাটি শুঁকছিল। ছুটি তাকে কোলে নিয়ে সরাতে সরাতে অবাক হয়ে বলল, “আরে যাবটা কীকরে? এমনিই রাত্তিরবেলা বাবা মা আমাকে বেরোতে দেয় না। তার উপর নালিশের পর এখন তো আরোই দেবে না!”

“ম্যাঁওওও” গোলাপসুন্দরী ছটফট করতে করতে ছুটির কোল থেকে এক লাফে নেমে পড়ল। তারপর খাটের কোণায় বসে লেজ ফোলাতে লাগল। তা মাংস না পেয়ে না ছুটি কোলে তুলেছে বলে, কে জানে?

“যাবি কীকরে মানে? যাবি আমার সঙ্গে, জানলা দিয়ে। এই দ্যাখ দিদিমা কী পাঠিয়ে দিয়েছে।” ছুটি এতক্ষণ খেয়াল করেনি, রুটি আজকে একটা ছোট্ট সাদা রঙের ফুলফুল ব্যাগ কাঁধে ঝুলিয়ে এসেছে। এখন সেই ব্যাগের চেন খুলে একটা ক্ষুদে কাঁচের শিশি বের করল। খুদে হলেও ভারী অদ্ভুত সেই কাঁচের শিশিটা। কেমন বর্ষার মেঘের মতো গাঢ় তার রং। ভারী কষ্ট করে ছুটি দেখল সেই খুদে শিশির ভিতর আরো খুদে খুদে রামধনু রঙের কটা গুলি। আলোতে থেকে থেকে তাদের রং বদলে যাচ্ছে, শিশিখানা নড়লেই নীল থেকে সবুজ থেকে লাল, দেখলে হঠাৎ চোখে ধাঁধাঁ লেগে যায়।

ভারী সাবধানে রুটির হাত থেকে শিশিখানা নিয়ে তার থেকে খুব আস্তে আস্তে একটা গুলি মুখে পুরে দিল ছুটি।

বাঁদিক তাকাল, ডানদিক তাকাল, নিজের গা হাত পা খানিক টিপে দেখল ছুটি। “কিছু হচ্ছে না তো কই?”

রুটি গম্ভীর মুখে বলল, “এমনি দাঁড়িয়ে থাকলে হবেটা কীকরে? গড়াগড়ি দে, গড়াগড়ি দে!” 

বাবা মেঝেটা আজ দুপুরেই মুছেছে বটে ভালো করে ফিনাইল দিয়ে, কিন্তু তা বলে এখন গড়াগড়ি দিতে হবে? কিন্তু রুটিও এমন গম্ভীর মুখ করে বলল! কী আর করে বেচারা ছুটি! মাটিতে শুয়ে খানিক এদিক ওদিক করে গড়াগড়ি দিতে লাগল। অমনি রুটিও বেশ তাল দিয়ে গান ধরল,

“নিশিমাখা শিশি ফাঁকা খেয়ে রামধনু বড়ি

ওই দ্যাখো, খুদে ছুটি দেয় শুধু গড়াগড়ি”

তার সঙ্গে গোলাপসুন্দরীও তান ধরল “ম্যাঁওও” বলে। ছুটি ভারী অবাক হয়ে সবে জিজ্ঞেস করতে যাবে, এরকম রাতদুপুরে হঠাৎ দুজনে মিলে গান ধরেছে কেন, আর গড়াগড়ি দিলে কীই বা লাভ হয় – কিন্তু তার আগেই হঠাৎ কী যে হল! ঘর, পাখা, টিউবলাইট, দেওয়ালের টিনটিনের পোস্টার, মায় এমনকি গোলাপসুন্দরী আর রুটি পর্যন্ত বনবন করে ঘুরতে ঘুরতে হঠাৎ ধারে আকারে হুহু করে বাড়তে লাগল! 

আসলে অবশ্য রুটি গোলাপসুন্দরী বড় হয়নি, বরং ছুটিই আকারে ক্ষুদে হতে হতে রুটির সমান হয়ে গেছে! 

ছুটি নিজের হাত পা টিপে ফ্রকের জামা টেনে দেখছিল সব ধারে আকারে একইরকম আছে কিনা। তারপরে এদিক ওদিক চেয়ে দেখল, সবকিছু কী বিশাল! ঠিক যেন তেপান্তরের পারের সেসব দৈত্যদের পুরীর মতো!

“এই ত্তো কী সুন্দর হয়েছে! আর আমাকে ঘাড় এরম করে তুলে কথা বলতে হবে না!” রুটি বেশ খুশি খুশি হয়ে ছুটির গায়ে মাথায় হাত বোলাতে বোলাতে বলল। গোলাপসুন্দরী এসে ছুটির মাথা শুঁকছিল, হঠাৎ এখন একদলা জিভ বের করে ছুটিকে চেটে দিল। 

এত কাছ থেকে গোলাপসুন্দরীর গায়ে কি বোঁটকা গন্ধ! কিন্তু কিছু বললে অভদ্রতা হয় কিনা কে জানে, তাই ছুটি নাক চেপে কিছু বলল না।

“চল চল চল” রুটি এবার তাড়া দিয়ে বলল, “দিদিমা বলেছে একটা গুলিতে তিন ঘন্টা অবধি ছোট থাকবি তুই। তারমধ্যে গিয়ে আবার ফিরত আসতে হবে। চল চল চল”।

“আহা যাবটা কীকরে” ছুটি ব্যাজারমুখে বলল, “আমি কী আর তোর মতো দেওয়াল বাইতে পারি?”

রুটি অবাক হয়ে বলল, “যাবিটা কীকরে মানে? কীকরে আর, গোলাপসুন্দরীর পিঠে চেপে!” গোলাপসুন্দরী “ম্যাঁও” বলে সম্মতি জানাল।

ছুটি একবার রুটির দিকে একবার গোলাপসুন্দরীর দিকে তাকাল। ছুটি আমাদের বীরপুরুষ খুব, কিন্তু উঁচু জায়গায় তার ভয় লাগে একটু একটু। আর আকারে এই খুদে হওয়ার পর তো সবই তার জন্যে উঁচু জায়গা! আর তাকে কিনা সেখানে বিড়ালের পিঠে চেপে দোতলা থেকে কার্নিশ বরাবর চলতে হবে?

তা হোক! একটু সাহস না করলে কী আর কাঠপরী দেখা যায়? গোলাপসুন্দরী পা ভাঁজ করে পিঠ নামিয়ে বসেছিল। ছুটি ছোট্ট করে একটা ঢোক গিলে সোজা তার পিঠে খানিক হাঁচড়পাঁচড় করে চেপে বসল।  (চলবে)

চিত্রঋণঃ চূর্ণী ভৌমিক, স্নেহা বিশ্বাস 

ছুটি-রুটি (প্রথম পর্ব) পড়তে ক্লিক করুন। 

ছুটি-রুটি (দ্বিতীয় পর্ব) পড়তে ক্লিক করুন। 

শেয়ার করুন

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *