গাজার প্রত্যেক শিশুর নির্দিষ্ট নাম আছে

তিথি ভট্টাচার্য পারড্যু বিশ্ববিদ্যালয়ে ইতিহাসের অধ্যাপিকা, এবং গ্লোবাল স্টাডিজ বিভাগের ডিরেক্টর। আধুনিক দক্ষিণ এশীয় ইতিহাস তিথির চর্চার অন্যতম বিষয়। তিথি উপনিবেশবাদ, রাষ্ট্র এবং শ্রেণি চরিত্র, লিঙ্গ রাজনীতি এবং মুসলিম-বিদ্বেষের রাজনীতি নিয়ে নিয়মিত লেখালিখি, গবেষণা ও চর্চা করেন। ৯৯ শতাংশের জন্য নারীবাদ, সামাজিক প্রজনন তত্ত্ব ইত্যাদি বিভিন্ন বইয়ের লেখিকা তিথি। তিথি স্পেক্টর এবং স্টাডিজ অন এশিয়া জার্নালের সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য। তিথি সামাজিক ন্যায়ের পক্ষে দীর্ঘদিনের আন্দোলন কর্মী। নিজের স্থানীয় অঞ্চলের, এবং জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন প্রতিরোধী আন্দোলনের সাথী তিথি। বর্তমান লেখাটি ২০১২ সালে প্রকাশিত হয়েছিল।

মাঝরাতে হঠাৎ হঠাৎ ঘুম থেকে উঠি। দেখে আসি আমার বাচ্চা ঠিক আছে কিনা। শ্বাস নেয়, ঘুমের মধ্যে মৃদু শব্দ করে। আমি ঘর থেকে বেরিয়ে আসি। আবার, আধ ঘণ্টা পরে আমি দেখতে যাই ঠিক আছে কিনা। এখনও শ্বাস নিচ্ছে কিনা। সারারাত বারবার আমি ওকে দেখতে যাই, ও ঠিক আছে কিনা। আসলে, ঘুমিয়ে পড়ার বদলে আমি সারাক্ষণ ধরে গাজার খবর দেখেছি। আজ সাতদিন হতে চললো গাজায় চলমান বোমাবর্ষণের – ১০ জন শিশু এর মধ্যেই মারা গেছে, ১৪০ জন আহত। আমি ওদেরকে শিশু বলতে অস্বীকার করি। যেভাবে পশ্চিমী মিডিয়াগুলোতে ‘শিশু’ বলে ওদের সবাইকে একসাথে দেগে দেওয়া হচ্ছে, আমি তা অস্বীকার করি। ওদের প্রত্যেকের নির্দিষ্ট নাম আছে, ওদের প্রত্যেকের নিজস্ব খেলনা ছিল, একসময় হয়তো ওরা ঘুমের মাঝে কেঁদে উঠলে ওদের বাবামায়েরাও দেখতে যেত, ওরা ঠিক আছে কিনা।

আসুন, ওদেরকে নাম ধরে ডাকি: জুমানা আর তামের এসেইফান। জুমানা আর তামের জাবালিয়া শহরতলীতে ইজরায়েলের মিসাইল হানায় মারা যায়। তখনও ওদের চার বছর বয়স হয়নি। আসুন, ওদের নাম মনে করি: ইয়াদ আবু খৌসা। নিজেদের বাড়িতে ইজরায়েলের আরেকটি মিসাইল হানায় ইয়াদ মারা যায়। ওর এক বছর বয়স হয়েছিল। ইজরায়েলের বোমারু বিমানের হামলায় আল দালু পরিবারের ১০ জন সদস্য ঘুমের মধ্যেই মারা যান। আসুন, নাম ধরে ডাকি ওদের কয়েকজনকে: সারার বয়স হয়েছিল ৭, জামালের ৬, ইয়ুসেফের ৪, আর ইব্রাহিম? ইব্রাহিম ছিল সবে দু’বছরের। নিউ ইয়র্ক টাইমসের সাংবাদিক যোদি রুদোরেন আল দালু পরিবারের এই যৌথ মৃত্যু সম্বন্ধে লিখেছিলেন, “সাড়ম্বর সমারোহ।” রুদোরেন-এর মতে, এক দিনে পরিবারের দশজনকে হারিয়ে আল দালু পরিবার অজুহাত পেয়ে গিয়েছিল সবার সামনে উথালিপাথালি করে কাঁদার। ওরা ওদের সামাজিক ভদ্রতা মনেই রাখেনি। জুমানা আর তামের। ইয়াদ আর সারা আর জামাল। ইয়ুসেফ আর ইব্রাহিম। আসুন আমরা মনে রাখি, যে ওদের প্রত্যেকের নির্দিষ্ট নাম ছিল। মনে রাখি, যে ওদের প্রত্যেকের খেলনাও ছিল।

যখন বোমা পড়তে শুরু করে তখন ওদের বাবা-মায়েরা কেন পালিয়ে যাননি? প্যালেস্টাইনের সাংবাদিক মহম্মদ ওমেরের কাছেই সেটা শুনুন –

“গাজায় বোমাবর্ষণের জন্য বানানো কোনও শেল্টার নেই। গাজার সমস্ত সীমানা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। সমস্ত উপকূল অবরুদ্ধ। বেশিরভাগ সুড়ঙ্গ ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে। গাজা থেকে কেউ কোথাও যেতে পারবে না। প্যালেস্টাইনের শিক্ষামন্ত্রক আর জাতিসঙ্ঘের ত্রাণ আর কর্ম সংগঠন (ইউনাইটেড নেশন্স রিলিফ অ্যান্ড ওয়র্ক এজেন্সি) উপকূল অঞ্চলের সমস্ত স্কুল বন্ধ করে দিয়েছে। মসজিদ বা গীর্জা কোনওটাই সুরক্ষিত নয়। স্টেডিয়াম সুরক্ষিত নয়। মিডিয়ার অফিস সুরক্ষিত নয়। সরকারি দপ্তর সুরক্ষিত নয়। নিজেদের বাড়িঘর সুরক্ষিত নয়।”

কোথাও যাওয়ার নেই। গাজার এই ‘উন্মুক্ত জেল’-এ যাঁরা বাস করেন, যখন সেখানে একের পর এক বোম পড়তে শুরু করে, তাঁদের জীবনের ছবি কীরকম হয়ে ওঠে? যখন গাজায় কোন বিমান হানা হয় না, শৈশবের গন্ধ তখন সেখানে ঠিক কেমন? 

জাতিসঙ্ঘের মতে, ২০২০ সালের মধ্যেই গাজা আর বসবাসযোগ্য থাকবে না। ইজরায়েল রাষ্ট্র গাজার সীমানা অবরুদ্ধ করে রেখে গাজায় খাবার, আবাসন, স্কুল, হাসপাতাল, খাবার জল – সবকিছুর অভাব সুনিশ্চিত করেছে। যেসব শিশু বিমান হানায় মারা যায় না, এই ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে আছে তারা। এই তাদের ভবিষ্যতের ঠিকানা, আর তাদের বর্তমান প্রতিদিনের জায়নবাদী আগ্রাসী আক্রমণের শিকার। 

প্যালেস্টাইনে কাজ করা আন্তর্জাতিক-প্যালেস্টাইন শিশুসুরক্ষা বিভাগ (ডিফেন্স ফর চিলড্রেন ইন্টারন্যাশনাল-প্যালেস্টাইন সেকশন)-এর ২০০৮ সালের রিপোর্ট অনুযায়ী, ইজরায়েলের প্রায় সমস্ত সৈন্য তাদের প্রাত্যহিক রুটিনের একঘেয়েমি কাটাতে “নিছকই মজার জন্য” প্যালেস্টাইনের বাচ্চাদের লাথি মারে, বা তাদের উত্যক্ত করে। ২০০১ সালে এনপিআর-এর ফ্রেশ এয়ার অনুষ্ঠানে নিউ ইয়র্ক টাইমসের সাংবাদিক ক্রিস হেজেস প্যালস্টাইনের একটি বাচ্চার প্রতিদিন কেমনভাবে কাটে সেকথা বলছিলেন। হেজেস নিজের অভিজ্ঞতার কথা বলেছিলেন, 

“আমি হাঁটতে হাঁটতে বালিয়াড়ির দিকে এগিয়ে গেলাম। সেখানে বৈদ্যুতিন কাঁটাতারের ওপার থেকে ইজরায়েলের জিপে লাউডস্পিকার বাজিয়ে ওরা [প্যালেস্টাইনের] বাচ্চাদের উত্যক্ত করছিল। এরপর এই বাচ্চাগুলো পাথর ছুড়তে শুরু করে। এরা সবাই-ই প্রায় ১০, ১১ বা ১২ বছর বয়সের। প্রথমত, এই পাথরগুলো ওদের মুঠোর মত ছোট ছিল, আর তাও ওরা ছুঁড়ছিল বুলেটপ্রুফ বর্ম বসানো গাড়ির গায়ে। আমার মনেও হয় না একটাও পাথর গাড়িতে লেগেছিল। তারপর আমি দেখলাম ইজরায়েলের জিপ থেকে নির্বিচারে গুলি চালানো শুরু হল। মানে কী বলবো – আমি সারাজেভোতেও বাচ্চাদের গুলি খেয়ে মারা যেতে দেখেছি। সারাজেভোতে স্নাইপাররা বাচ্চাদের ওপর নিশানা করতো। আমি আলজেরিয়া বা এল সালভাদোরে দেখেছি কীভাবে মৃত্যুবাহিনী এসে গোটা পরিবারকে মেরে ফেলে। কিন্তু আমি কোথাও এরকম দেখিনি। সৈন্যরা শুধুমাত্র মজার জন্য প্রথমে বাচ্চাদের উস্কে দেয়, আর তারপর তাদের ওপর গুলি চালিয়ে মেরে ফেলে। আমি – কীভাবে বলবো – আমার এখনও এই ঘটনা অকল্পনীয় লাগে। আমি প্রত্যেকদিন ফিরে যেতাম ওখানে। আর প্রত্যেকদিন আমি একই ঘটনা দেখতাম।”

রাজনৈতিক কর্মী আর মানবাধিকার সংগঠনের কর্মী যারা প্যালেস্টাইনে কাজ করেন, তাঁরা তাঁদের প্রতিবেদনে বলেন কীভাবে ইজরায়েলি পরিবারগুলোতে বাচ্চাদেরকে হিংসা শেখানো হয়। এই ঘটনায় ক্রীতদাস প্রথা আর জিম ক্রো আইনের সময়কার আমেরিকার কথা মনে পড়ে। ২০০৮ সালে হেব্রোনের একটি স্কুলের বিবরণে বলা আছে,

“প্যালেস্টাইনে বসবাসকারী ইজরায়েলি পরিবারের বাচ্চারা ইজরায়েলি সৈন্যদের চোখের সামনেই প্যালেস্টাইনের মূলনিবাসী পরিবারগুলির বাচ্চাদের রোজ নানাভাবে উত্যক্ত করে, তাদের তাড়া করে, তাদের গায়ে পাথর ছোঁড়ে, তাদের যা খুশি বলে। তাদের (ইজরায়েলি পরিবারের বাচ্চাদের) বাবা-মা বা বাড়ির অন্যান্য প্রাপ্তবয়স্করাও একই ধরনের ব্যবহার করে এদের সাথে। স্কুলে ঢোকার সিঁড়ির মুখে গাড়ি খাড়া করে দেয়, যাতে বাচ্চারা সেখান দিয়ে যেতে না পারে। বাচ্চাদের ওপর কুকুর লেলিয়ে দেয় যাতে তারা বাচ্চাদের তাড়া করে। সবরকমে প্যালেস্টাইনের বাচ্চাদের আতঙ্কে সন্ত্রস্ত রাখা হয়।”

অধিগৃহীত প্যালেস্টাইনে, ইজরায়েলি রাষ্ট্রব্যবস্থায় শিশুদের ওপর গুলি চালানো এক দৈনন্দিন বিনোদন। এর সঙ্গে, ইজরায়েল রাষ্ট্রের অধীনে প্যালেস্টাইনের মানুষের আত্মরক্ষার কোনো পথ নেই। আত্মরক্ষামূলক যেকোনো আচরণকে ইজরায়েল অপরাধ হিসাবে চিহ্নিত করে বা দমনপীড়ন করে সমূলে বিনাশ করে।  

ইজরায়েল রাষ্ট্র ২০০০ সাল থেকে আজ অব্দি অধিগৃহীত প্যালেস্টাইন থেকে প্যালেস্টাইনের প্রায় ৭৫০০ বাচ্চাকে আটক করেছে, জেরা করেছে, অথবা কারাবন্দী করে রেখেছে। বেসরকারি নথি অনুযায়ী, ওয়েস্ট ব্যাঙ্কে আটক হওয়া প্যালেস্টাইনের বাচ্চাদের প্রায় ৯৪ শতাংশের কখনো জামিন হয়নি। একবার ধরা পড়ার পরে, ইজরায়েলি আইন অনুযায়ী বাচ্চাদের “অধিকার”গুলো এইরকম:

 

জেল হেফাজতে যাওয়ার জন্য ন্যূনতম বয়েস

জেরার সময়ে বাবা-মার উপস্থিতির অধিকার

জাজ-এর কাছে পেশ করার জন্য গড় সময়

কোনও অভিযোগ ছাড়া আইনীভাবে জেলে যতদিন আটকে রাখা যায়

প্যালেস্টাইনের একটি বাচ্চা

১২ বছর

কোন অধিকার নেই

৮ দিন

১৮৮ দিন

ইজরায়েলের একটি  বাচ্চা

১৪ বছর

বাবা-মা উপস্থিত থাকতে পারেন

২৪ ঘণ্টা

৪০ দিন

 এইসমস্ত পরিসংখ্যান যে নথিতে করা হয়েছে, সে নথি ব্রিটিশ সরকারের আর্থিক অনুদানের সাহায্যে তৈরি। ব্রিটিশ সরকার এই নথিকে সমর্থনও জানিয়েছে। এই প্রতিবেদনের সিদ্ধান্তে লেখা হয়েছে, “প্যালেস্টাইনের শিশুদের প্রসঙ্গে ইজরায়েল নির্লজ্জভাবে সমস্ত আন্তর্জাতিক আইন অমান্য করে। এর পিছনে কারণ হিসাবে ইজরায়েলের এক সামরিক উকিল আমাদের বলেন, প্যালেস্টাইনের সমস্ত বাচ্চা হলো “সম্ভাব্য সন্ত্রাসবাদী।” প্যালেস্টাইনের শিশুরা ইজরায়েলকে ফুটবল খেলতে খেলতে সন্ত্রস্ত করে, ঘুমের মধ্যে সন্ত্রস্ত করে। এই শিশুরা এক বছর থেকে দু’বছরে পা দিতে চেয়ে ইজরায়েল রাষ্ট্রকে আতঙ্কিত করে ফেলে।

আমি যখন আমার চার বছরের বাচ্চাকে একটা ছবি আঁকতে বলি, ও খাতা আর রংপেনসিল টেনে নিয়ে রামধনু আর বিড়ালের ছবি আঁকে। এই দুটো ওর সবচেয়ে পছন্দের বিষয়। গত শীতে আমি লেবাননে শাবরা আর শাতিলায় প্যালেস্টাইনের রিফিউজি ক্যাম্পে গেছিলাম। আমার সৌভাগ্য হয় সেখানে প্যালেস্টাইনের শিশুদের সাথে দেখা করার। ওরা আমাকে ওদের আঁকা ছবিও দেখিয়েছিল। একটা পাঁচ বছরের শিশু, যে মেঘের মধ্যে থেকে রক্তের বৃষ্টি আঁকছে, তাকে আমি কী বলব? একজন সাতবছরের বাচ্চা যে জানে কীভাবে মৃতদেহ আঁকতে হয়, আমি কী বলে তাকে সান্ত্বনা দেব?

আমাদের যাদের বাচ্চা আছে, আর আমরা যারা বাচ্চাদের জানি-চিনি – আমরা জানি বাচ্চামাত্রেই প্রত্যয়ী। একবার পড়ে যাওয়ার পরেও ওরা উঠে দাঁড়াতে পারে, ওরা আঙুল মুঠো করে মুষ্টিবদ্ধ করতে পারে ওদের হাত। রংপেনসিল দিয়ে একটা স্বাধীন দেশের সীমানা আঁকতে পারে ওরা কেউ কেউ। বাকিরা পাঁচিল ভেঙে ফেলতে পারে। আমাদের দায়িত্ব ওদের বাঁচিয়ে রাখা, যাতে ওরা এগুলো সবকিছু করে উঠতে পারে। এভাবেই,  হয়তো আজ থেকে অনেক বছর পরে, ওরাও রামধনু আঁকতে পারবে।

মূল লেখাটি পড়া যাবে এখানে

চিত্রঋণঃ মিডল ইস্ট চিলড্রেনস অ্যালায়েন্স-এর গাজা স্ট্রিপে প্যালেস্টিনীয় বাচ্চাদের আঁকা ছবির প্রদর্শনী, তিথি ভট্টাচার্য, রেজিং কেন ব্লগ, tithibhattacharya.net

শেয়ার করুন

Leave a Comment

Your email address will not be published.