খাতা

আমাদের সকলেরই একটা গোপন খাতা থাকে। আমাদের একটু ছেলেমানুষি করার জায়গা সেই ডায়েরি। যখন আমরা আরো ছোট ছিলাম, মনে পড়ে, সারাক্ষণ নজরদারিতে থাকা আমরা, স্বাধীন ভাবে এলোমেলো বাক্য, রঙিন আঁকিবুকি কাটার জন্য মাঝে মাঝেই পেন পেন্সিল নিয়ে বসে যেতাম। এখন যতই ফোন আমাদের হাতে আসুক না কেন, ছোট্ট ছোট্ট রঙিন মলাটের খাতার যে কী চাহিদা, তা আমার বন্ধুদের দেখলেই খুব বোঝা যায়। এত এত বছর ধরে বাচ্চাদের জীবনের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত এই খাতা নিয়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এক গল্প লিখেছিলেন। সেই গল্পের নামও খাতা। উমা একটি ছোট্ট মেয়ে। সে নানান জায়গায় সদ্য শেখা বর্ণমালা ফুটিয়ে তুলতে থাকে। দাদার প্রবন্ধের উপর একটি বাক্য লেখার জন্য দাদা গোবিন্দলাল তার লেখা সামগ্রী কেড়ে নেয়। পরে অবশ্য অনুতপ্ত হয়ে তাকে একটি লাইন টানা বাঁধানো খাতা কিনে দেয়। এই সেই খাতা! এই গল্পের চরিত্ররা ঘুরপাক খাচ্ছে এরই চারদিকে। তা আমাদের ছোট্ট উমা সাত বছুরে হওয়ার পর নিজের খাতাটা নিয়ে পাঠশালে যেতে শুরু করে। সেই খাতার মধ্যে ধীরে ধীরে কিছু স্বাধীন বাক্য দেখা যায়। এই বিদ্যা চর্চা অবশ্য বেশি দিন এগোতে দেয় না সমাজ। ন’ বছর বয়সেই তার বিয়ে হয়ে যায় দাদার বন্ধু প্যারীমোহনের সাথে। শ্বশুর বাড়ি যাওয়ার আগে তাকে পই পই করে সবাই বলে দেয় সেখানে গিয়ে যেন সে পড়াশোনা নিয়ে না পড়ে থাকে। ওইটুকু বয়সেই তার মনে ঢুকে যায় পুরুষতান্ত্রিক সমাজের ঐ হুমকি —- “মেয়েদের আবার পড়াশোনা কেন? বেশি জানলে বিধবা হয়।” তাই পরে শ্বশুর বাড়িতে “বন্দী” থাকার সময়ে সে শৈশবের চিহ্ন ডায়েরিটা বের করতেই লজ্জা পায়। তবে শেষ রক্ষা হয় না। প্যারীমোহন উমার কাছ থেকে তার খাতাটি কেড়ে নিয়ে তার শিশু কাল থেকে লেখা একান্ত আপন কথাগুলো চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে পড়তে থাকে তিন ননদের সামনে। তার এই খাতা আক্রোশের কারণ হলো, “বাড়িতে সাহিত্য ঢুকলেই নাটক নভেল ঢুকবে, এবং সংসার ধর্ম নষ্ট হবে”। উমা মাটিতে মুখ লুকিয়ে কাঁদতে থাকে।

এই গল্পটা আমার ভালো লাগে বলার কিছু বিশেষ কারণ অবশ্যই আছে। 

১) খাতা যেভাবে যুগে যুগে মানুষের আশ্রয় হয়ে উঠেছে, যেভাবে এই ডায়েরিতেই, উমা দাদার কাছে মায়ের কাছে বারবার অনুরোধ জানিয়েছে তাকে নিয়ে যাওয়ার জন্য, তা রবীন্দ্রনাথ ঠিক উমার মনের আকুলতা দিয়েই ফুটিয়ে তুলেছেন।

২) এই গল্পে রবীন্দ্রনাথ পুরুষতান্ত্রিক সমাজের হুংকার, মেয়েরা পড়াশোনা করবে না, কারণ করলেই তারা পুরুষের সমান হয়ে যাবে, এর বিরোধিতা করেছিলেন। পুরুষই বিদ্বানের মাপকাঠি এই ভাবনারও বিরোধিতা করেছিলেন বারবার উমার স্বাধীন লেখা ও তার দাদা, তার স্বামীর বাজার চলতি বস্তা পচা লেখার তুলনা করে। 

৩) এই গল্প রবীন্দ্রনাথ কৌতুক রসে পূর্ণ করে দিয়েছেন। এবং তার ফাঁকে ফাঁকে রয়েছে অন্তর্নিহিত ব্যঙ্গ। যেমন, ” উমা গোবিন্দর প্রবন্ধের উপর গোটা পাতা জুড়িয়া লিখিয়াছিল গোপাল বড় ভালো ছেলে, তাহাকে যা দেওয়া যায় সে তাহাই খায় — এই উক্তিটি গোবিন্দর পাঠকদের প্রতি কিনা আমি জানি না।” রবীন্দ্রনাথ ঠিক এইভাবেই লিখেছেন। 

প্রায় আমাদেরই বয়সী একটি বালিকার এই গল্প, যা আমাদের শিক্ষা দেয় তার মত কল্পনাপ্রবণ হতে, কিন্তু তার মত মুখ বুজে না থাকতে। গল্পটা যে বাক্য দিয়ে শেষ, আমিও সেই বাক্যটা দিয়েই আমার লেখা শেষ করছি।  “প্যারীমোহনেরও একটি সূক্ষ্ম তত্ত্ব বিশিষ্ট খাতা ছিল, কিন্তু সেটি কেড়ে নেওয়ার মত কেউ ছিলো না।”

শেয়ার করুন

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *