মে দিবসের রাতভোরের গল্প

৩০শে এপ্রিল থেকে পয়লা মে-র দিকে যাওয়ার সময়ে ভোরে, যখন আলোটালো কিছুই ফোটেনি, তখন কালিশহরের মাঠে পাঁচখানি ছায়ামূর্তি এসে হাজির হল। সবকটাই চারপেয়ে। তোমার যদি চোখ খুব ভাল হয়, সেই আধো অন্ধকারেও তুমি বুঝবে যে একটা বিশাল কুকুর, একটা মাঝারি সাইজের হাতি, একটা গাধা, একটা গরু আর একটা ঘোড়া কালিশহরের মাঠে এসেছে। মাঠে তখন প্রচুর লোক তাঁবু খাটিয়ে বা খোলা আকাশের নিচে গভীর ঘুমে মগ্ন।

ঘোড়াটি বললো – “বাপ রে! এত্ত লোক! এর আগের দিন তো দেখিনি!”

গাধাটি বললো – “হ্যাঁ, ফিসফিস করে কথা বলাই ভাল। নইলে ঘুম ভেঙে টের পেলে একগাদা লোক চেঁচামেচি করবে -“

কুকুরটি শুধু বিশালই নয়। লোমশ আর বিজ্ঞবুড়ো হাবভাব। সে বললো – “এরা সবাই শ্রমিক। কাল পয়লা মে। এই মাঠে বিশাল সভা হবে। দূর জায়গা থেকে এসেছে, ঘুমিয়ে নিচ্ছে। কাল আরো তিনডবল লোক আসবে।”

গরু বলে – “তাই নাকি? পয়লা মে-তে কী হবে?”

এইবার হাতিটা, তার পক্ষে যতটা ফিসফিস করা সম্ভব, ততটাতে বলল – “পয়লা মে হল আন্তজ্জাতিক শ্রমজীবী দিবস। অর্থাৎ কিনা শ্রমিকদের অধিকারের দিবস।”

বোঝাই যাচ্ছে হাতি আর কুকুরটা জ্ঞানী, আর গাধা আর ঘোড়াটার জ্ঞানগম্যি কম। তাই বাকি কথাগুলোর মধ্যে কোনটা কার, সে তোমরা আন্দাজ করে নাও।

“শ্রমজীবী কী রে?”

“যারা শ্রম করে রোজগার করে।”

“ওহ! আমি এক কাঠ কারখানার মালিককে চিনতাম। সে সারাদিন সারাক্ষণ মাথা খাটাচ্ছে। মাত্র পাঁচ ঘন্টা ঘুমোয় সারাদিনে।”

“ওর কথা বলা হচ্ছে না। ও খাটতে পারে, কিন্তু ও কারখানার মালিক। এখানে যাদের কথা বলা হচ্ছে তারা কিছুরই মালিক নয়। কারখানার মালিক তাদেরও খাটনির মালিক। তাই তারা বলবে যে তাদের দাবী – দিনে আট ঘন্টার কাজ দিতে হবে রোজগার করার জন্য, আট ঘন্টা ঘুমের জন্য রাখতে হবে আর আট ঘন্টা বিশ্রাম করার জন্য। সব হিসেব করা। এগুলোই অধিকার।”

“খাটনির মালিক? আমি যে বাড়িতে থাকতাম সেখানে যে বউটা ছিল সে ভোরবেলা উঠেই কাজ করতে আরম্ভ করত, আট ঘন্টার বেশি কাজ করতো! তার খাটনির মালিক কে? এই বউটাও কি শ্রমজীবী?”

“হ্যাঁ, সেও শ্রমজীবী। আসলে তার বর যে কারখানায় কাজ করে সেই কারখানার মালিকেরই বউটাকে মাইনে দেওয়া উচিৎ – কারণ সে বরটাকে খাওয়াচ্ছে পরাচ্ছে যাতে সে কারখানায় কাজ করে ভালভাবে আর কারখানার মালিকের মুনাফা হয়।”

“মুনাফা কি রে?”

“লোকজনকে খাটিয়ে মালপত্র তৈরি করে তাকে বেশি দামে বাজারে বিক্রি করে মালিক যে টাকাটা চুপিচুপি হজম করে ফেলে সেটাই মুনাফা।”

“আচ্ছা। মানে যারা খাটে, কিন্তু মুনাফা করতে পারেনা তারা শ্রমজীবী।”

“অর্থাৎ কিনা যারা খেটে মরে – দিন আনে দিন খায়।”

“দিন খায়? সে আবার কি রে?”

“মানুষরা এভাবে কথা বলে। ওদের ব্যাকরণ জটিল, তাই বাক্যগুলো গুবলেট জাতীয়। এর মানে হল, এক একটা দিনের রোজগার সেই দিনের খাওয়া দাওয়াতেই ফুরিয়ে যায়।”

“হ্যাঁ, মানে কোনো সেভিংস নেই, গরুরা যেমন জাবর কাটে …”

“এই গরু নিয়ে বাজে কথা কইবি না!”

“আরে ঝগড়া করিস না! মেলা গোল করলে ঘুমন্ত মানুষগুলো উঠে যাবে যে! তো পয়লা মে হল খেটে খাওয়া মানুষদের অধিকারের দিবস …।”

এইসব কথা হচ্ছে, আর একটু একটু করে ভোরের আলো ফোটার দিকে যখন সময় এগোচ্ছে, তখন হঠাৎ গাধাটি উত্তেজনা চেপে চাপা গলায় বললো – “আরে ওই দ্যাখ! আটটা লোক দাঁড়িয়ে আছে! আমাদের মত!”

সত্যিই, আটখানা নীলচে ধোঁয়ার মানুষের শরীর মাঠের ওই প্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে।

কুকুরটা বললো – “রেসপেক্ট! ওরাই সেই আটজন শ্রমিকের ভূত, যারা ১৮৮৬-তে শিকাগোর হেমার্কেটে মারা গেছিল আট ঘন্টার কাজের দাবীতে।”

“ও! তাই ওরা আমাদের মত।”

হ্যাঁ, আমাদের গাধাটি, ঘোড়াটি, হাতিটা, গরুটা কুকুরটাও নীলচে ধোঁয়া দিয়ে তৈরি যেন। ওরাও ভূত। ভূতের গল্পগুলো সব ভূতকে যেমন ভয়ঙ্কর করে লেখে, ভূতেরা, বিশেষ করে জন্তুদের ভূতেরা তেমন হয়না।

এই গাধাটি তার তিনগুন ওজনের মোট পিঠে নিয়ে পাহাড়ে উঠছিল। সেটাই ওর কাজ, না উঠে উপায় কী? তারপর পা হড়কে গড়িয়ে পড়ে মরে যায়। হাতিটাও নদী পেরোচ্ছিল পিঠে মাল নিয়ে; তারপর চোরাবালিতে পড়ে যায়। তিনদিন ধরে চেষ্টা করেও মানুষজন ওকে তুলতে পারেনি; আস্তে আস্তে বেচারা ডুবে যাচ্ছিল বলে শেষমেশ মাথায় গুলি করতে হয়। কুকুরটা এত জ্ঞানী কারণ ও সেন্ট বার্নার্ড, সেই বরফের দেশে ওর কাজ ছিল বরফে চাপা পড়া মানুষ উদ্ধার করা। এক জায়গায় বরফের চোরা খাদ ছিল, তলিয়ে গেছিল। আর ঘোড়াটা? ও মরেছিল যুদ্ধে। যুদ্ধ তো মানুষে করে, সেখানে ঘোড়াদের তো আর খেয়ে দেয়ে কাজ নেই যে যুদ্ধ করবে! ঘোড়ারা তো সেখানে শ্রমিক। আর গরুটাও বেচারা – ওর মালিক ছিল এক চাষী। চাষবাস হচ্ছিল না তিন বছর, হঠাৎ কীভাবে যে এক দুপুরবেলায় চাষীর পরিবার মরে গেল ও বুঝতে পারেনি। গোয়ালে বাঁধা ছিল, বাছুর যা ছিল দুবছর আগে বিক্রি হয়ে গেছে, ও’ও দুঃখে ভূত হয়ে গেছিল।

ভোরের আলো উঁকি মারে। তখন একটু একটু করে সেই আটটি শহীদ মানুষ, আর চারটি শ্রমিক প্রাণীর অশরীরী অবয়ব মিলিয়ে যেতে শুরু করে। আমরা এই গল্পে শুধু পশুদের কথা শুনছি, তাই মানুষ ভূত গুলো কী বলেছিল তা আর এই গল্পে বলা হল না।

“চল ভাই যাই, ওই দ্যাখ – সব পতাকা লাল রঙের -” অল্প আলোয় মাঠে ঘুমিয়ে থাকা পতাকাগুলোর লাল রঙ ফুটে উঠেছে।

“যাওয়া কী আর আমাদের হাতে?” হাতি হাসে “আলো ফুটলে আমরা মিলিয়ে তো যাবোই – হ্যাঁ চল।”

“আজ আন্তজ্জাতিক মে মানুষ দিবস …” গাধা বললো মিলিয়ে যেতে যেতে।

তোমরা যারা গল্প পড়ছো, একদিন হয়তো তোমাদের মনে হবে যে সারা পৃথিবীতে বহু পশুও শ্রমিক, তারা ঠিকঠাক মাইনেও পায় না, তাদেরও অধিকারের দাবিতে একটা দিন থাকা উচিৎ। সেই দিনটা যেন মে মাসের ওই প্রথম দিনেই তোমরা ধার্য করে রেখো।

এই সংখ্য়ায় আরও পড়ুন

               মে দিবসের গল্প -চূর্ণী ভৌমিক

               ছোটদের চোখে মে দিবস

শেয়ার করুন

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *