ছোটোদের থিয়েটার

যে কোনো লেখা, শুরু করাটাই মুশকিল। ঠিক কী লিখলে যা বলার তার প্রতি সুবিচার করা হবে, আমি বুঝতে পারি না। গড়িমসি চলে তাই প্রথম লাইন নিয়েই, তারপর বাকিটা তুলনায় সহজ।   

নিজের কথা দিয়েই লেখা শুরু করলাম, কারণ এই গোটা লেখাটাই আমার নিজের কথা, আমার যা যতটুকু দেখা। ভারী তত্ত্বের কিছু সূত্র এর মধ্যে থাকলেও থাকতে পারে, যদিও লেখার বক্তব্য বিষয় আমার একা-দেখার আর একা-ভাবার মধ্যেই সীমাবদ্ধ। আমার বলা ঘটনাগুলির আরো নানা বিশ্লেষণ হতে পারে, তার নানা তাত্ত্বিক ব্যাখ্যাও হতে পারে; এই লেখায় আমি সবিনয়ে সেগুলো বাদ দিয়েছি।  

আমি যখন বড়ো উঠছিলাম, পুজোর সময় বা রবীন্দ্রজয়ন্তীতে মঞ্চ বেঁধে নাটক করার দিন প্রায় শেষ হয়ে এসেছে। আমাদে মফস্বল তখন বড়োজোর ‘গানের লড়াই’, বা ‘কুইজ কম্পিটিশন’, নিদেন ‘বসে আঁকো’ – এই নিয়েই মশগুল। স্কুলে স্কুলে অ্যানুয়াল ফাংশান ছাড়া আমাদের কপালে নাটক তেমন জুটতো না। 

এই রকম একটা সময়ে, ঠিক করে বলতে গেলে ১৯৯৮ সাল নাগাদ, কিছু মানুষ, যারা নিজেরাই সেই সময় ছোটোদের নিয়ে নাটকের কাজ করছিলেন মূলতঃ দক্ষিণ বঙ্গের মফস্বলে এবং শহরে, তারা ঠিক করলেন বছরের একটা নির্দিষ্ট সময়ে যদি নানা জায়গায় ছোটোদের এক সঙ্গে করে একটা আবাসিক নাট্য কর্মশালার আয়োজন করা যায় তাহলে ছোটোদের সাথে সাথে যারা কাজ করান তাদের মধ্যেও একটা ভাবনা আর কর্ম পদ্ধতির দেওয়া নেওয়া হতে পারবে। ‘শিশুনাট্য’ বলতে আমার যা দেখা বেশীরভাগটাই এই কর্মশালায়, কাজ করতে করতে জানা। এই কর্মশালায় পোশাকি নাম ‘শিশু কিশোর বিকাশ মেলা’, ডাক নাম ক্যাম্প। 

সেই কর্মশালায় আমি গেছিলাম, তখন ক্লাস ফাইভ। শিশুনাট্য বা ছোটোদের থিয়েটার বলার মতো বড়ো হইনি তখনও। নেচেকুঁদে নাটক করতাম সবাই মিলে।  

তারপর বড়ো হলাম। কেবল বড়োরাই বুঝি “ছোটোদের থিয়েটার” বা “Children’s Theatre” বলতে পারে; ছোটোদের কাছে সেটা খালি থিয়েটারই। যাই হোক, খানিক বড়ো হলাম যখন, এদ্দিন কাজ করতাম কোনো বড়োর তত্ত্বাবধানে, এবার সামলানোর দায়িত্ব পড়লো। আর কাজ বদলের এই সময়ে টের পেলাম দেখায় যায়গা পালটালে গল্পও কেমন পালটে পালটে যায়। সেইরকমই কয়েকটা গল্প, ঘটনা নিয়েই এই লেখা। কেন? কারণ, আমার ভাবনায় এই প্রতিটা গল্পই এক এক আঁজলা জলের মতো, বাইরে এনে ধরলে তাতে খানিকটা আকাশ দেখা গেলেও যেতে পারে। এই সব ঘটনা দেখে, শুনে আমি ছোটোদের থিয়েটার, থিয়েটারের ছোটোদের, নিজেকে আর চারপাশটাকে খানিক পর্দা সরিয়ে দেখতে জেনেছি। জানাটুকু ভাগাভাগি করে নিলে হয়তো সেটা কিছু পরিশুদ্ধ হতে পারে। এর বেশী চাওয়ার কিছু নেই, অন্তত আজকের এই লেখায়।  

১। কালাচাঁদ ও ডিমের গল্প/ রাজু আর তার বাস/ রাজুর পাঁপড়ভাজা

এই গল্পটার তিনটে নামই হতে পারে। মূল চরিত্র আর সেট সেটিং আলাদা হলেও মূল সুরটা একই রকম।

কালাচাঁদের বাড়ি শান্তিপুর। নাটকের কর্মশালায় যখন সে প্রথমবার এসেছিলেন তখন তার বয়স খুব মেরেকেটে নয়-দশ। ছেলেটি আদ্যন্ত উচ্চিংড়ে টাইপের। বয়সে সামান্য বড়ো এক দিদি ছাড়া আর কারো কথা সে শোনে না। সেই দিদির সাথে আলাপ অবশ্য এই ক্যাম্পে এসেই, দিন তিনেকের। একদিন সকালের জলখাবারে দেওয়া হয়েছে ডিম সেদ্ধ। নিজের ভাগেরটা খেয়ে নিয়ে ‘কালা’ অবলীলায় দিদির পাত থেকে খাবলা মেরে তার ভাগের ডিমটি তুলে গালে চালান। কিশোরী দিদিটি হাঁ হাঁ করে উঠতেই অম্লান বদনে তার উত্তর “দিদির পাত থেকে খাবো না তো কার পাত থেকে খাবো!” এ তো তার হক্কের পাওনা। ভালোবাসার হক।    

রাজুর আসল বাড়ি জয়নগর। তার সাথে আলাপ যদিও সরবেড়িয়ায়। অত্যন্ত দুরন্ত এবং মারাত্মক বুদ্ধিমান এই ছেলে। সেন্স অফ হিউমার অসাধারণ আর মুখে এক ভুবনভোলানো হাসি, গালে তিল। নাটক মূল চরিত্রে হাততালি  পেয়েও সে ততটাই নির্বিকার যতটা দুষ্টুমির পর বকুনি খেয়ে। বছর সাতেক বয়স যখন তার তখন রাজু আসে নাটক করতে। সময়ের সাথে সাথে জীবনের স্রোত তাকে এমন দিকে টেনে নেয় সেখানে নাটকের চিহ্নমাত্র নেই। প্রথমে বাসের হেল্পার থেকে ধাপে ধাপে উঠে ড্রাইভার হয়ে এখন রাজু মহানগরীর সড়কের খতিয়ান নেয়।   

এইরকম একদিন, নাটকের এক দিদির সাথে রাজুর দেখা হয়ে যায়। দিদিটি বাসে উঠেছেন, টিকিট কেটে সীট খুঁজতে খুঁজতে দেখেন চালকের আসনে চেনা মুখ। “রাজু”!! পলক তাকিয়ে রাজু তার পাশে বলা হেল্পারকে হুকুম করে, “এই সর, দিদিকে বসতে দে।” তারপর কন্ডাকটারকে ডেকে বলে টিকিটের পয়সা ফেরত দিতে। এইখানে এসে দিদিটি খানিক গাঁইগুঁই করায় রাজু-সুলভ নির্লিপ্ত গলায় সে জবাব করে, “তোমার বাড়িতে গিয়ে চা খেয়ে দাম দিলে তোমার ভালো লাগবে!” তার দাবির জোর ভালোবাসার কাছে। তাকে টলায় কার সধ্যি!   

আরেক রাজুর গল্প। কালা বা দস্যি রাজুর থেকে একটু বেশী বয়সে সে প্রথম আসে নাটকের ক্যাম্পে।  তখন সেই কর্মশালার আয়তন বেশ বেড়েছে ; এতোটাই যে মুখের সাথে নাম মনে রাখা আর ততটা সহজ হচ্ছে না। যে বছর রাজু সেই কর্মশালায় ছিল এই ঘটনা তার বছর দুই পরের। ওই ক্যাম্পের এক দিদি শহরে চাকরি সেরে লোকাল ট্রেনে করে বাড়ি ফিরছেন ঢুলতে ঢুলতে। সোদপুর স্টেশন প্রায় আসে আসে, এমন সময় নাম ধরে ডাকে কে রে! “…দিদি! ভালো আছো?” অপরিচয়ের অস্বস্তি নিয়েই দিদি জানেন, এই মুখ সে না চিনলেও মুখের মালিক তাকে  ঠিকই চেনে। “হ্যাঁ রে বাবু। আমি ভালো আছি। তুই কেমন আছিস?” দিদির চোখ দেখে হয়তো সে বুঝতে পারে ঠিক চেনা যায়নি তাকে। “আমাকে চিনতে পেরেছো?  আমি রাজু! এবারেও তো ক্যাম্পে শেষদিন গেছিলাম অনুষ্ঠান দেখতে!” দিদি আধাচেনা গোছের ঘাড় নাড়েন। রাজু বুঝতে পারে কারণটা, “আজকাল পাঁপড় বিক্রি করি।  নাটক করতে সময় পাই না। এই নাও।” চালের পাঁপড়ের একটা প্যাকেট দিদির হাতে ধরিয়ে দেয়। টাকা দেবো কি দেবো না ভাবতে ভাবতে ট্রেন থামে, রাজু অন্য কামরায় চলে যায়। যে অধিকারবোধ দিদিকে মানিব্যাগ বের করতে আটকায়, তার নামও ভালোবাসা। তার দাম হয় না।

ছোটোদের থিয়েটার নিয়ে নানা মুনির নানা মত রয়েছে। ছোটোদের থিয়েটার কেমন হবে, কী কী থাকবে তার মধ্যে, কীভাবে চলবে তার কাজ – হাজারো ফিরিস্তি আর বায়নাক্কা। ভালোবাসা আর সম্মানের কথা তেমনভাবে কোনো থিয়োরিতে বলা থাকে না; ওগুলোর থিয়োরি হয়ও না বোধহয়। ভাবের কথা না, বা ছোটোদের থিয়েটার নিয়ে অকারণ রোমান্টিসাইজ করাও নয়, ‘থিয়েটারের মধ্যে দিয়ে ছোটোরা ভালোবাসতে শিখবে’ মার্কা কথা এখন অনেকটাই ট্যালট্যালে, কারণ থিয়েটারে থেকে ছোটোরা যূথবদ্ধতা শিখবে বলে যে বিশ্বাস একসময় হয়তো যায়গা করে নিতে পেরেছিলো, তার সামাজিক বাস্তবতাই আর নেই। যূথদ্ধতা নাহয় ছোটোরা শিখলো, তর্কের খাতিরে যদি তা ধরেও নিই, তাহলেও সেই যূথবদ্ধতা চর্চা করার মতো যায়গা তো নেই ওই নাট্যকর্মশালার নিরাপদ গণ্ডীর বাইরে! 

তাহলে কি সব কাজ ছেড়ে দিয়ে হাত তুলে নেওয়াটাই রইলো! তা-ও নয়। ওই নাট্যকর্মশালার কাজের আর সম্পর্কের স্মৃতি রাজুরা মনের মধ্যে ধরে রেখেছে হয়তো, আর সেই স্মৃতি বাঁচিয়ে রেখেই যুঝছে দুনিয়ার সাথে, তাদের মতো করে। সেই স্মৃতি তাদের সবল করে না দুর্বল করে, তাদের অবস্থানে না থেকে বলার চেষ্টা করাও ভুল। হয়তো এর কোনোটাই তাদের বাস্তব নয়, হয়তো দুটোই বাস্তব। নাটক কতোদূর কী শিখলো, জানলো, তার চেয়ে হয়তো বড়ো করে তারা যা জেনেছে, সেটা ঐ নিরাপদ আশ্রয়ে জন্মানো ভালোবাসার ওপর ভরসা। নিজের ভেতরের শিশুটিকে, সারল্যকে রক্ষা করতে হয় নিজেকেই- শুধু এইটুকু যদি তারা জেনে থাকতে পারে তবে হয়তো তাদের চর্চার কোনো একটা সার্থক অভিমুখ দেখতে পাওয়া যায়; ক্যাম্প শেষ হয়ে যাবার দশ বছর পরে। 

প্রসংগত উল্লেখ্য, কালা-র সাথে দেখা হয়েছিল বছর পনেরো পর। সে তখন বিবাহিত এবং রোজগেরে। বাজারে তার তেলেভাজার দোকান। সেই দিদিকে দেখতে পেয়ে ক্ষয়ে যাওয়া চেহারার কালার মুখে হাসি, “ভাজার দোকান দিয়েছি দিদি, তুমি একদিন এসো।” কালা বা রাজুরা আর কোনোদিন থিয়েটার করতে পারবে না এই নিয়ে কষ্ট থাকতে পারে কিন্তু যে সব সম্পর্ক তারা অর্জন করেছে সেগুলো তাদের কাছে ফেলনা হয় না হয়তো!

২।  ঠুমরি ভার্সেস পুকু কিম্বা আমরা যতদূর ভাবতে পারি

সেবারে নাটকের কর্মশালায় হাফ-টেক্সট নিয়ে কাজ হচ্ছিল। চলতি ভাষায় হাফ-টেক্সট বলা হতো সেই সব  নাটককে যেখানে চরিত্রগুলো প্রায় সমাধানহীন একটা সমস্যার মুখে দাঁড়িয়ে নাটকটা থামিয়ে দেবেন, তিন রাস্তার মোড়ে। এরপর দর্শকরা সম্ভাব্য সমাধান বেছে নেবেন, তর্ক করে ঠিক করে নেবেন কোন পথে যাওয়া হবে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তর্কবিতর্কেই সময় চলে যেত কারণ কেউই সহজে নিজের ভাবনার জমি ছাড়তে রাজি হতো না; ফলে দর্শকদের বলে দেওয়া পথে চলে আবার কোনো সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছে কিনা চরিত্রগুলি সেটা আর যাচানো হতো না।  

এরকম একটা হাফ-টেক্সট অধ্যুষিত কর্মশালায় কয়েকজন সদ্য তরুণ-তরুণী, যাদের ওই কর্মশালায় ‘মেজ’ বলে ডাকা হয়, তারা বিষয় হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন একটি মেয়ের বিবাহ-বহির্ভূত সম্পর্কের গল্প। গল্পটা খানিকটা এই রকম, একটি মেয়ের, তার নাম পারিজাত,  স্বচ্ছল সংসার তার স্বামী আর কন্যাকে নিয়ে; স্বামী তার স্ত্রীর প্রতি দায়িত্ববান, কন্যাটিও অবাধ্য নয়; এক কথায় সুখের সংসার। কিন্তু কোথাও একটা স্বামীর সাথে স্ত্রীর ভাবনাগত ফারাক রয়ে গেছে, বৌদ্ধিক দেওয়া নেওয়া প্রায় নেই বললেই চলে, কেবল সাংসারিক দায়পালনেই তাদের যৌথতা সীমাবদ্ধ। এই অবস্থায় মেয়েটির আরেকজন মানুষের দেখা হয় যার সাথে তার পছন্দের নানা বিষয় নিয়ে কথা বলার একটা যায়গা তৈরি হয়। কিন্তু মুশকিল হলো সেই মানুষটি একজন পুরুষ ফলে এই বন্ধুত্ব নিয়ে হাজার ঝামেলা বাড়তে থাকে। এক সময় এমন একটা অবস্থা দাঁড়ায় যে মেয়েটির সামনে দুটি পথ খোলা থাকে, হয় সংসার ছেড়ে চলে যাওয়া নয় ওই বন্ধুত্ব ছেড়ে। এরকম একটা যায়গায় নাটকটা থামানো হয়।

প্রসঙ্গত বলে নেওয় দরকার এই গল্প তৈরি করেছিলেন যারা তার অনেকেই তখন সবে স্কুল ছেড়ে কলেজে গেছেন, নতুন নতুন ভাববনা তাদের মাথায় তখন গজগজ করছে বটে কিন্তু থিতোতে পারেনি ভালোমতো। বছর দুই পরে তারা আবার যখন নিজেদের এই নাটক নিয়ে আলোচনা করেন, তখন অনেকেরই মনে হয় খুব হালকা চালে নেওয়া হয়ে গেছিল অনেকগুলো বিষয়, কিছু কিছু ক্ষেত্রে অতি সরলীকরণও হয়ে গেছিল। যাইহোক, ক্যাম্পে ফিরছি। এক সন্ধ্যায়, দিনের কাজ শেষ হলে পর দেখানো হলো এই নাটকটা; দর্শকদের মধ্যে ছোটোরাই ছিল বেশি, বড়োরা ছিলেন মাত্র জনা পনেরো জন।  

এরপর দুই খেপে বিতর্ক শুরু হয়ে যায়। প্রথম পর্যায়ে, বড়োদের সাথে মেজদের, যেখানে বড়োদের বক্তব্য ছিল এই ধরণের বিষয় ছোটোদের নাটকের উপযুক্ত তো নয়ই তার ওপর ছোটোদের সামনে এই বিষয় নিয়ে নাটক করাও উচিত না। মেজরা কেউ কেউ বলেছিল, নাটকের পরিসরে না হোক এই বাস্তবতা ছোটোদের চারপাশে সব সময়েই থাকে, টিভিতে, সিনেমায় এমনকী জীবনেও এই ধরণের ঘটনা দেখতে পায় তারা; ছোটোদের এর থেকে দূরে সরিয়ে না রেখে বরং এগুলো সম্পর্কে ওয়াকিফহাল করাই কি বেশী জরুরী নয়! এই বিতর্কের নিস্পত্তি  হয়নি। কিন্তু বড়োরা একটা যায়গায় ভুল করেছিলেন, তাঁরা ভেবেছিলেন নাটকের এই বিষয় ছোটোদের ভেতর খুব একটা দাগ কাটবে না বা তারা খুব একটা বুঝেও উঠতে পারবে না। তা কিন্তু ঘটেনি।  

পরদিন কর্মশালার নানা কোণে নানা বয়সের ছোটোদের দেখা গেছে এই নিয়ে কথা বলতে, কেউ হাসাহাসি করেছে, কেউ বিরক্ত আর কেউ ক্রুদ্ধ। পুকুর বয়স তখন হয়তো বছর দশেক, সে সপাটেই বলেছিল, পারিজাতের মতো মহিলাদের থাপ্পড় মেরে ঘরে আটকে রাখা উচিত, স্বামী ছাড়া অন্য কোনো ‘পুরুষ মানুষের’ সাথে সে বন্ধুত্ব করে কোন সাহসে! অন্যদিকে, ঠুমরি তার থেকে বয়সে যারা অনেকটাই বড়ো তাদের সাথেও তর্ক করে যাচ্ছিল, কেন পারিজাতের বন্ধুত্বটাকে যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে দেখা উচিত সকলের, আর এই বন্ধুত্ব কোনো অন্যায় নয়। 

শেষতক কোন সিদ্ধান্তে পৌঁছতে পারা যায়নি এই নাটকটির ক্ষেত্রেও কিন্তু কথা ছড়িয়ে গেছিল অনেকটা দূর। ছোটোদের সাথে কাজ করার সময় অনেক সময় তাদের মাথায় ভালো কিছু বোধ, ভাবনা চারিয়ে দেওয়ার কিছু সৎ দায়িত্ব বড়োদের ঘাড়ে এমন চেপে বসে যে ছোটোদের মধ্যে আগে থেকেই থাকা হয়তো-ভুল/ হয়তো-ঠিক চিন্তাগুলো নাটকের ঘরে খুব একটা  যায়গা পায় না। পুকু আর ঠুমরির মধ্যে কার ভাবনা প্রগতিশীল, কে রক্ষণশীল, কোন প্রেক্ষিতে কার ভাবনা কতোটা ঠিক বা ভুল সে সব নিয়ে কথা হতেই পারে কিন্তু তার অনেক আগে বোধহয় এটা মেনে নেওয়া প্রয়োজন যে বড়োরা না জানলেও বা না মানলেও ছোটোদের মাথাতেও চারপাশ নিয়ে নানা সিদ্ধান্ত আর মতামত থাকে। সেগুলোকেই যদি অ্যাড্রেস না করা হয় তাহলে কী করে ভাবা সম্ভব যে নাট্যচর্চার মধ্যে দিয়ে ছোটোদের বৌদ্ধিক আর মানসিক বিকাশ হবে!   

প্রথম ঘটনায় (কালা রাজু এবং রাজু) বড়োদের মধ্যে রয়ে যাওয়া শৈশব আমাদের আশ্চর্য করে আর পরের ঘটনায় ছোটোদের মধ্যে বেড়ে ওঠা প্রাপ্তমনস্কতা আমাদের ধাক্কা দেয়। এর নানা ব্যাখ্যা হতে পারে, কিন্তু আমি যেভাবে দেখি সেটা খানিকটা এই রকম, তত্ত্বে অন্য রকম নির্দেশ থাকলেও বেশিরভাগ সময়েই শিশুনাট্যের শিশুদের, বা এমনি শিশুদেরও একটা নির্দিষ্ট মাপেই বড়োরা দেখে থাকেন, তার চাইতে একটু অন্যরকম হলেই দেখনেওয়ালা বড়োদের নিজেদের অবস্থান গুলিয়ে যায়, কী থিয়েটার আর কী থিয়েটারের বাইরে।  

বলার কথা এইটুকুই, যে লেখে তার কাছে ‘অপর’-এর একটা ছবি থাকে, সে শিশুই হোক বা অন্য কোনো অস্তিত্ব। তাকে নিজের মাপে দেখা আর লেখা সব চাইতে সহজ কাজ। হাতেপায়ে কাজের মধ্যে দিয়ে সেই মাপকাঠিটা এঁকেবেঁকে যায়, তখন নিজেকে চিনতে হয় পাশের জনের নিরিখে। সেই অভ্যাস না থাকলে, নিজেকে শুধু নিজেকে দিয়েই চেনার চেষ্টা করতে থাকলে কী এক ভয়াবহ সময়ে মুখোমুখি হতে হয়, সে আমরা বেশ টের পাচ্ছি। ঠিক কতোটা টের পেলে যে টনক নড়বে, সেটাই দেখার। 

চিত্রঋণ – www.turkiyenewspaper.com

শেয়ার করুন

1 thought on “ছোটোদের থিয়েটার”

Leave a Comment

Your email address will not be published.